Home দাহশয্যা দাহশয্যা পর্ব ৭৮ (২)

দাহশয্যা পর্ব ৭৮ (২)

দাহশয্যা পর্ব ৭৮ (২)
Raiha Zubair Ripti

রাজকীয় স্টেজে বসে আছে ইব্রাহিম ঊর্মি পাশাপাশি। তাদের সামনেই চেয়ারে সোফায় বসে আছে লোকজন। কথা ছিলো হলুদ লাগানোর আগে নাচগান করবে। কিন্তু আমিরুল সুলতান বললেন হলুদের পর ওসব করতে। তাই করা হলো। একে একে সবাই হলুদ ছুঁইয়ে দিলো। ইতি বেগম যাবে না যাবে না বলেও গিয়ে হলুদ লাগিয়ে আসলো। কিন্তু ইমন কে পাওয়া গেলো না পুরো সেন্টার জুড়ে। সবাই খোঁজাখুজি করলো। দেখতে পাওয়া গেলো না। ঊর্মি বারবার এদিক ওদিক তাকাচ্ছে। লাগাবে না হলুদ ঊর্মি কে তার ভাই? ঊর্মি মেহরিনের হাত ধরে বলল তার ভাইকে এনে দিতে। এসে থেকে দেখে নি।
মেহরিনও আশেপাশে তাকালো সোলেমান কে খুঁজলো। মহাশয় সোফায় বসে ফোন টিপছে। মেহরিন এগিয়ে গিয়ে বলল-

“ ইমন ভাইকে দেখেছেন? ”
সোলেমান আগের ভঙ্গিতেই বলল-
“ না। ”
“ একটু খুঁজতে সাহায্য করুন তো। ”
“ ইমন বাচ্চা নাকি যে তাকে খুঁজতে হবে? ”
“ সে নেই এখানে। ঊর্মি খুব করে বললো ভাই কে আনতে। ”
“ কেউ যদি নিজ থেকে আসতে না চায়,তাহলে তার পেছন সময় ব্যয় করা বুদ্ধিমানের কাজ নয়। তারপরও তুমি খুঁজতে চাইলে বসো এখানে। আমি দেখছি। ”
সোলেমান সেন্টার থেকে বেরিয়ে দেখলো রাস্তার পাশে চায়ের দোকানে বসে আছে ইমন। সোলেমান এগিয়ে গিয়ে পাশে দাঁড়িয়ে বলল-
“ হোয়াটস রং উইথ ইউ? তোমাকে সবাই খুঁজছে। আর তুমি এখানে বসে চা খাচ্ছো? লোক দেখানোর জন্য হলেও গিয়ে বোনের পাশে দাঁড়াও। এমন বিহেভিয়ার করলে লোকজন জেনে যেতে খুব বেশি সময় নিবে না। ”
ইমন তাকালো না। হাতে থাকা চায়ের কাপ টা শক্ত করে ধরে বলল-

“ আমার এই একটাই সমস্যা। ”
সোলেমান জানতে চাইলো-
“ হোয়াট? ”
“ আমি আপনাদের মতো লোক দেখানোর জন্য ফেক সাজতে পারি না। ”
“ ফেক সাজি আমরা? ”
“ সাজেন না বলছেন? জনগণের সামনে আপনাদের এক রূপ,আর ভেতরে আরেক রূপ। ”
“ উমমম তুমিও তো সেই রাজনীতি তেই ঢুকলে কলা খেয়ে। তাহলে তো তোমাকেও প্র্যাকটিস করে রাখতে হবে ইমন। বোনের বিয়ে দিয়েই না হয় শুরু করো প্র্যাকটিস টা। নইলে তো সভায় গিয়ে মাইক তুলে আর কথাই বলতে পারবে না। তখন কি হবে? জনগণ কি দেখে তোমায় ভোট দিবে বলো তো? ভীষণ চিন্তার বিষয় এটা। ”

“ নিষ্ঠা দেখে দিবে ভোট। ”
“ ওহ রিয়েলি? রাজনীতি তে নিষ্ঠা চলে? ”
“ কেনো চলবে না? ”
“ ইউ ক্যান ট্রাই। বেস্ট অফ লাক। তা ভোটে আদোও দাঁড়াতে পারবে তোমরা?”
“ কে আটকাবে? আপনারা? ৭১ কে বেচে আর কতদিন চলবেন? ”
সোলেমান গা দুলিয়ে হাসলো।
“ আওয়ামিলীগ ৭১ বেচে খেলে তোমরা জামায়াত তো তাহলে ধর্ম বেচে খাও। ইশ কি বিচ্ছিরি কারবার। আবার মুখের ডগায় সব সময় হাদিসের বুলি ছড়াও। আদোও নিজেরা তা মানো? ৭১ এ তোমাদের অবস্থান কি ছিলো দেশবাসী কি ভুলে গেছে নাকি? যেই দলের হয়ে পকপক করছো সেই দলের জন্য একেবারে অন্ধ হয়ো না। তোমার মেন্টালি নিয়ে করা রাজনীতি এই দেশের জন্য না। তোমার দলও তোমার এই মেন্টালির না। তাদের হয়ে সাফাই গেও না আমার সামনে অন্তত। পাঁচ বেলা মসজিদে নামাজ পড়ে রাতে যায় পতিতালয়। তাদের আবার এত বড় বড় কথা! হাস্যকর লাগে শুনতে। রাজনীতি তোমাকে ভালো থাকতে দিবে না। তোমার উচিত হয় নি রাজনীতি তে ঢোকা। ”

“ এখন আপনি শিখিয়ে দিবেন আমার কি করতে হবে না করতে হবে? ”
“ ভালোর জন্যই বলেছি। ”
“ খারাপ কিছু করার ইনটেনশন আছে নাকি? ”
“ তোমার? এত সময় এই সোলেমানের আছে নাকি? তোমাকে তো আমি গুনায়ই ধরি না। তাই নিজেকে শ্রেষ্ঠ দলের শ্রেষ্ঠ কর্মী ভাবা বন্ধ করো। ”
সোলেমান বেশ গাঢ় করেই কথাটা লাগালো ইমনের শরীরে। দুদিনের ছেলে আসছে তাকে রাজনীতি শিখাতে? কিসে লাভ হয় কিসে রাজনীতি হয় সোলেমান জানে না? রাজনীতি দেখে বড় হওয়া ছেলেকে আসছে রাজনীতি চেনাতে। বোকা ছেলে। এমন বোকা ছেলে কেউ হয়? হাসি পায়।

সোলেমান চলে গেলো। পেছন পেছন ইমন আসলো। তবে ঊর্মি কে হলুদ ছোঁয়ালো না। ইতি বেগম বললো। ইমন তার সিদ্ধান্তে অটল। জোরাজোরি করলে সে চলে যাবে সেন্টার থেকে। ইতি বেগম আর জোরাজোরি করলো না।
মেহরিন আর মাহি ছোঁয়ালো হলুদ ঊর্মি ইব্রাহিমের গালে। সোলেমান ছোঁয়ালো না। নিজের বিয়েতে সে হলুদ ছোঁয়ায় নি। সেখানে এখন অন্যকে হলুদ ছোঁয়ানোর বিষয় টা তার সাথে যাচ্ছে না।
হলুদ লাগিয়ে এসে মেহরিন বসলো সোলেমানের পাশে। সোলেমান পানির বোতলের মুখটা খুলে মেহরিনের হলুদে মাথা হাতটা ধুইয়ে পাঞ্জাবি দিয়ে মুছে দিলো। সেন্টারে বিয়ে হওয়ায় তাদের কাউকেই কিছু করতে হচ্ছে না। সব সেন্টার থেকেই করে দিচ্ছে তারা। টাকা দিবে মোটা অঙ্কের সেখানে নিজেরা কেনো করবে কাজ?
এজওয়ান ঊর্মি কে হলুদ লাগায় নি। শুধু ইব্রাহিম কে হলুদ লাগিয়ে বলল-
“ ওয়েল কাম টু বিবাহিত লাইফে ভাই। জীবন তোমার তেজপাতা থেকে ভাজাপাতা হবে নিঃসন্দেহে। বউয়ের কথা শুনে চলবা। বউ উঠতে বললে উঠবা। বসতে বললে বসবা। নো শাউটিং। বউ আগুন হলে তুমি শীতল পানি হয়ে যাবে। সংসার জীবনে পুরুষ রা এভাবেই সুখী হয়। ”
ইব্রাহিম ও কম না।

“ তোর বউয়ের মতো আমার বউয়ের এতো চাপা নেই। ”
“ দেখা যাবে হু। মাঝ রাতে কখন ঘর থেকে বের করে দিবে টের ও পাবা না। তখন এই এজওয়ান ই তোমার সঙ্গ দিবে। ”
“ অ্যাম নট লেসবিয়ান এজু। ”
“ হ আর আমি তো লেসবিয়ানদের বাপ। দেখো না মেয়ের বদলে ছেলে বিয়ে করছি। ব্যাটা ছাওয়াল নিয়ে সংসার করি। ”
মাহি দূর থেকে এজওয়ান কে বকবক করতে দেখলো। কি এত বকবক করছে?
হলুদের অনুষ্ঠান শেষ হলে নাচ গানের পালা আসে। ইয়াসিন বসে ছিলো। আকস্মিক মায়ের ফোন আসায় বাহিরে আসলো। রিসিভ করে কানে নিতেই জিজ্ঞেস করলো- কেমন আছিস?
ইয়াসিন জবাব দিলো –
“ ভালো আছি তুমি? ”
“ ভালো আছি। এত আওয়াজ আসতেছে ক্যান? কই তুই? ”
“ ইব্রাহিম ভাইয়ের বিয়ে সেখানে আমি। ”
“ ওহ্ ইব্রাহিমের বিয়ে! ”
“ হ। রাইতে খাইছো? ”
“ হ। নে বউমার লগে কথা ক। ”
পাশেই বাতাসি বসে ছিলো। আকস্মিক ফোন হাতে ধরিয়ে দেওয়ায় চমকে উঠলো। কি কথা বলবে সে। ইশারায় না করলো। কিন্তু শুনলো না ইয়াসমিন বেগম। বাতাসি কানে নিয়ে কাঁপা কাঁপা গলায় হ্যালো বলতেই ইয়াসিন বিরক্ত গলায় বলল-

“ রাখছি। ”
বাতাসি সে কথা শুনে চট করে বলল-
“ ভালো আছেন? ”
ইয়াসিন বলল-
“ এতক্ষণ ভালোই ছিলাম। তোমার গলা শুনেই খারাপ বোধ করছি। রাখলাম, মায়ের যত্ন নিও। ”
বাতাসির মুখের উপর ফোন কে’টে দিলো ইয়াসিন। বাতাসির মুখের উপর ভীড় করলো এক আকাশ সম কষ্ট। ইয়াসমিন বেগম যেন তা বুঝতে না পারে সেজন্য বাতাসি হাসার চেষ্টা করে বলল-
“ নেট সমস্যা বোধহয়। কে’টে গেলো। ”
ইদানিং বেশ নেটওয়ার্কের সমস্যা পোহাতে হয়। এক বেলা নেট থাকলে বাকি দু বেলা নেট থাকে না। ভীষণ বিরক্ত লাগে।
ইয়াসমিন বেগম ভাবলো আসলেই নেট সমস্যা। ফোনটা চার্জে দিয়ে বাতাসি কে নিয়ে লুডু খেলতে বসলো। দু’জন যেন দুজনের বন্ধু, মা হয়ে গেছে।

এজওয়ানের মুড আসছে না নাচার এখানে। সে চাচ্ছে ঐসব রাজাদের মতো জলসার ঘরে আয়েশ করে লাল পানি হাতে নিয়ে বাঈজিদের নাচ দেখতে। এজওয়ান মাল খেয়ে টাল হয়ে বলবে- এই নাচ। আর মাহি বাঈজি ঘুঙুর পায়ে টুকটুক করে নাচবে। এজওয়ান নেশা ধরা চোখে দেখবে। কিন্তু না সে রাজা,আর না মাহি বাঈজি সেজে তাকে নাচ দেখাবে। তার বউ তো তাকে নাচ দেখাবে সানি লিওনের মতো লায়লা ম্যা লায়লা গানে। পুরো শরীর সহ হার্টবিট পর্যন্ত গরম করে দেওয়ার জন্য।
এজওয়ান তার এই সুপ্ত বাসনা সাইডে রেখে চেয়ার টেনে বসলো। বউ আর বোন নাকি নাচবে। স্বামী কে হাতের ইশারায় নাচানো বউয়ের নাচ দেখার সৌভাগ্য ক’জনেরই বা হয়?
মাহি আর রুমাইসা chunari chunari আর Sauda Khara Khara গানে নাচলো। মেহরিন সোলেমানের কাঁধে মাথা ঠেকিয়ে হাই তুলছে। সোলেমানের পূর্ণ মনোযোগ তার ফোনে।
রুমাইসা মাহির নাচ শেষ হলে রুমাইসা মেহরিন কে টানতে আসলে সোলেমান শুধু বাঁকা চোখে তাকায় রুমাইসার দিকে। এতে রুমাইসা বুঝে যায় ভাইয়ের চোখের ভাষা। ২য় বার আর টানলো না। রুমাইসা চলে গেল। ইব্রাহিম ঊর্মি কে টেনে এনে নাচ করালো । সবশেষে এজওয়ান নিজেও আসলো। তখন বক্সে গান বাজলো-

Arey Haan,
Nahin Aasan Hai Tujhko Paana
Aa Tere Nakhre Uthaoon Sanam
Mujhko Teri Kasam,
Taang Doon Chaand Ko
Teri Khidki Pe Main
Arey Jo Bhi Main Kahun
Tujhe Lagta Hai Kyun Galat
Arey Palat!

শেষে বাহু দিয়ে মাহির পিঠে জোরে একটা ধাক্কা দিলো এজওয়ান। মাহি সামলে নিলো নিজেকে।
এদিকে মেহরিন হাই তুলতে তুলতে কখন যে ঘুমিয়ে গেল। সোলেমান আর ডাকলো না মেহরিন কে। মেহরিন ঘুমিয়েছে দেখে সোজা পাঁজা কোলে নিয়ে রুমে চলে গেল। নিব্বিরা যত ইচ্ছে নাচ-গান করুক গিয়ে।
মেহরিন কে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে সোলেমান মেহরিনের শরীরে গয়না গুলো এক এক করে খুলে দিলো। তারপর শরীরের কোথায় কোথায় সেফটিপিন মেরেছিল সেগুলোও খুলে দিলো। কোনো রিস্ক নিতে চায় না সোলেমান। সেফটিপিন না খুললে শরীরে লেগে ব্যথা পেতে সময় নিবে না।
সব শেষে মেহরিনের গায়ে চাদর টেনে দিয়ে কপালে গাঢ় এক চুম্বন একে দিলো। তারপর বিরবির করে কানের লতিতে ঠোঁট ছুঁইয়ে বলল-
“ তোমার উপস্থিতি যেন আমার দুঃখের রাতে চাঁদের মতো। ” তারপর আরেকটু থেমে সোলেমান গম্ভীর গলায় বলল- তুমি আমার আবাবিল,সেই তুমিই আমার প্রাণভোমরা। কি দারুন কম্বিনেশন!”
সোলেমান মেহরিন কে বুকে টেনে জড়িয়ে ধরে চোখ বন্ধ করে ফেললো।

বিয়ের দিন..সকালের ব্রেকফাস্ট করে সবাই যার যার মতো তৈরি হতে যায়। আজ পার্লারের লোক সেন্টারেই এসেছে ঊর্মি কে সাজাতে। মেহরিন ফুল হাতার ব্লাক কালারের লেহেঙ্গা পড়েছে। লম্বা চুল গুলো খোঁপা করে ওড়না দিয়ে ঢেকে নিয়েছে। সোলেমান ব্লাক কালারের শার্ট প্যান্ট পড়েছে। উপর দিয়ে ব্লাক কালারের কোটও পড়ে নিলো।
রুম থেকে বেরিয়ে বোনের মেয়েকে দেখতে পেয়ে বোনের থেকে নিয়ে নিলো। চেয়ারে গিয়ে বসলো। সোলেমান দূর থেকে দেখলো মেহরিন কে বোনের মেয়ের সাথে। কেমন আগলে রেখে আদর করছে। মাঝেমধ্যে সোলেমানের ইচ্ছে করে মেহরিন কে বলতে বাবু নেওয়ার কথা। পরক্ষণেই মনে পড়ে বউয়ের বয়স কম। বউ বাচ্চা ক্যারি করতে হিমশিম খাবে। তখন সোলেমান পাগল হয়ে যাবে বউ বাচ্চার কথা ভেবে ভেবে। নো রিস্ক। আর একটু পরিপক্ব হোক।
বাহাদুর ইব্রাহিম কে রেডি করাচ্ছে। ইব্রাহিম মূলত শেরওয়ানি পড়ে মাথায় পাগড়ি পড়বে। তো সেই পাগড়িটাই বাহাদুর বেঁধে দিচ্ছে। অনেক যুদ্ধের পর অবশেষে বাঁধা শেষ হলো। তারপর এক সাইড দিয়ে চাদর জাতীয় কিছু দিয়ে দিলো।

ঊর্মি কে আজ গোল্ডেন কালারের লেহেঙ্গা পড়ানো হয়েছে। সাজগোজ সেজে দুজন কে স্টেজে বসানো হলো। দুজনের সামনে দিয়ে মাঝখানে ফুলের পর্দা। কাজি সাহেব আসলেন। ঊর্মির পাশে বসে বললেন-
“ সাইদুল ইসলাম ও ইতি বেগম দম্পতির কন্যা ঊর্মিলা ঊর্মি আপনি কি মোহাম্মদ সেলিম পাশা ও সোফিয়া পাশা দম্পতির ইব্রাহিম পাশাকে ১৫ লক্ষ টাকার দেনমোহরে বিয়ে করতে রাজি আছেন? ”
ঊর্মি আশেপাশে তাকালো। তার মা ভাই কেউ নেই পাশে। কত কষ্ট দিয়েছে ভাবা যায়? কাজি তাড়া দিতে লাগলো।
ঊর্মি সকালেও কিছু খায় নি। মাহি এগিয়ে গেলো। ঊর্মির পাশে গিয়ে বসলো। ঊর্মি এবার মেহরিন কে খুঁজলো। মেহরিন দূর থেকে দাঁড়িয়ে ইতি বেগম কে বললেন-
“ কি বলবো তোমায় চাচি বুঝতে পারছি না। শেষ বেলায় একটু থাকো মেয়েটার পাশে। তোমাদের খুঁজছে। যতই অন্যায় করুক মেয়ে তো। তুমি তো মা। বুক টা খাখা করছে তোমার জানি। অল্প সময়ের জন্য হলেও গিয়ে পাশে দাঁড়াও। ”

ইতি বেগম এসে দাঁড়ালেন। যে মেয়ের বিয়ে করার সময় মা ভাইকে দরকার হয় নি সেই মেয়ে এখন কেনো তাদের খুঁজবে? ঊর্মি মা কে পাশে পেয়ে কবুল বললো।
কাজি সাহেব ইব্রাহিমকে জিজ্ঞেস করলে ইব্রাহিম কবুল বলে দেয়।
বিয়ের কার্যক্রম শেষ করে খাওয়া দাওয়া শুরু হয়। ঊর্মি ইব্রাহিম এক পাতে বসেছে খেতে। দু লোকমা ইব্রাহিম খাইয়ে দেওয়ার পর আর খেতে পারলো না। কেমন অস্থির অস্থির লাগলো। ইব্রাহিম জোর করলো না।
খাওয়াদাওয়া শেষে বিদায় বেলায় কেউ এগিয়ে আসলো না ঊর্মি কে ইব্রাহিমের হাতে তুলে দেওয়ার জন্য। ইমন কে খুঁজলো মেহরিন। কোথায় সে? ছেলে আসছে না দেখে শেষমেশ ইতি বেগমই তুলে দিলেন। ঊর্মি চাপা স্বরে কাঁদলো। ইতি বেগমের চোখ জলে টইটুম্বুর করলো।

ঊর্মির ভাই আসলো না! এত রাগ! মেহরিন পুরো সেন্টার খুঁজতে খুঁজতে ছাঁদে এসে দেখলো ওয়ালের উপর পা ঝুলিয়ে বসে আছে ইমন। মেহরিন পেছনে দাঁড়িয়ে বলল-
“ আপনাকে খুঁজছিলাম ইমন ভাই। আর আপনি এখানে? ঊর্মির সামনে আসবেন না? বিদায় জানাবেন না? ”
ইমন আকাশের দিকে তাকালো। চোখের জল আটকানোর তীব্র চেষ্টা চালাচ্ছে সে। তারপরও গম্ভীর গলায় বলল-
“ আমাকে আর ঊর্মির দরকার নেই মেহরিন। বড় হয়ে গেছে ঊর্মি। তাকে বিদায় জানাতে হবে না। সে নিজ থেকেই বিদায় নিয়ে নিছে আমার থেকে। ”
মেহরিন ইমনের দিকে তাকালো।
“ আপনার কষ্ট হচ্ছে আমি জানি ইমন ভাই। কিন্তু রাগ অভিমানের জন্য তা ঢাকা পড়ে যাচ্ছে। কি করবেন বোন তো। ”

“ হ্যাঁ ভাই আমি। যখন ভাইয়ের দরকার হবে ভাই সব ছেড়ে ছুঁড়ে এগিয়ে যাবে। এই দায়িত্ব আমি কখনো এড়াবো না। ভাইয়ের কর্তব্য আমি পালন করবো। তবে তার সাথে আমার সেই সুন্দর স্নেহময় সম্পর্ক টা সে সেদিনই ধ্বংস করে দিয়েছে। ভাই হিসেবে আগেও যা করেছি এখনও করবো ভবিষ্যতেও করবো। তাকে চিন্তা করতে না করো। অবশ্য তার সময় হবে না আমাদের কথা ভাববার। ভালো থাকবে সুখে থাকবে দোয়া করি। ”
“ আসবেন না তাহলে? ”

“ না,ঐ যে বললাম তার এখন প্রয়োজন নেই আমার। যখন বুঝবো তার আমাকে প্রয়োজন, তার এই ভাই ছাড়া আর কেউ নেই সাহায্য করার মতো তখন সে পাবে তার সামনে এই ইমন কে তার সুরক্ষা দেওয়াল হিসেবে। ইমন রক্ষা করবে বোন কে তখন। তবে তার আগে সে হাজার ডাকলেও ইমন আসবে না। তাকে খুব কষ্ট করে মানুষ করেছি মেহরিন। আমার সব কষ্ট সব দুঃখ কে ঊর্মি বুঝিয়ে দিয়েছে দুদিনের ভালোবাসার কাছে আমার এই কষ্ট দুঃখ সব তুচ্ছ। আমি শুধু মানুষ হারাই মেহরিন। সেদিন একজন কে হারালাম আর আজ নিজের বোনের কাছ থেকে ঠকে গেলাম। সব সময় শুধু আমিই কেনো সাফার করি? ”
মেহরিন আনমনে জিজ্ঞেস করলো-
“ আপনি কাকে হারিয়েছেন ইমন ভাই? ”
ইমন সচকিত হলো।
“ আব্বার কথা বললাম মেহরিন। ”

মেহরিন আস্তে করে ওহ্ বললো। ইমন কে আর বলতেও ইচ্ছে করলে না দ্বিতীয় বার আসার কথা। নিজেকেও অপরাধী মনে হয়। মেহরিন উঁকি দিয়ে দেখলো নিচে ঐ তো ঊর্মি কে গাড়িতে বসানো হচ্ছে। ইমন নেমে আসলো। এখন সে সোজা বাড়ি চলে যাবে। আর কোনো কিছুতে সে অ্যাটেন্ড করবে না। সুলতান বাড়ির বউ তাদের বুঝিয়ে দিয়ে দেওয়া হয়েছে, ইমনের দায়িত্ব শেষ।
সুলতান ভিলায় আগেই ইব্রাহিমের রুম টা সাজানো হয়েছে ফুলে। নতুন বউ ঘরে প্রবেশ করানোর সব নিয়মকানুন শেষ করে ঊর্মি কে নিয়ে ইব্রাহিমের রুমে বসানো হলো। এজওয়ান বাসর ঘরের সামনে চেয়ার নিয়ে বসেছে। গুনে গুনে এক লাখ টাকা না দিলে সে সরবে না। ইব্রাহিম রুমে ঢুকতে এসে এজওয়ান কে দরজার সামনে দেখে বলল-

“ সর ঢুকতে দে। ”
এজওয়ান হাত পেতে বলল-
“ এক লাখ টাকা দাও। তারপর দিব ঢুকতে। ”
“ টাকা কি গাছের পাতা? ”
“ অবশ্যই। গাছ থেকে দাও ছিঁড়ে। নইলে আমিও সরবো না। ”
ইব্রাহিম সোলেমান কে ফোন করে বলল- তার এই পাগল ভাইকে সরাতে। সোলেমান সাথে সাথে বলে দিলো- সে পারবে না। সে বউ নিয়ে বিজি। নিজের ঝমেলা নিজেকে সামলাতে বলল।
ইব্রাহিম পকেট থেকে ক্রেডিট কার্ড টা বের করে দিয়ে বলল-
“ সর আর জ্বালাবি না আমায়। ”
এজওয়ান চুমু দেখিয়ে চলে গেল। হাঁটতে হাঁটতে বাগানে এসে দেখলো রুমাইসা কিছু একটা করার চেষ্টা করছে। সাথে পাশের বাড়ি থেকে কিছু মেয়েও আছে। এজওয়ান এগিয়ে এসে বলল-

“ কি রে রুমু,তুই বাগানে কি করিস? ”
রুমাইসা বক্সে লাইন দিতে দিতে বলল-
“ ভাই আমরা নাচবো। ”
“ কোন উপলক্ষে? ”
“ এমনি ভাই। তুমি নাচবে? ”
“ আমি গান বাজাবো আর তোরা নাচবি ওক্কে?
“ ওক্কে ভাই। ”
এজওয়ান বক্সের কাছে এগিয়ে গিয়ে নিজের ফোন টা লাগিয়ে বলল-
“ রেডি?
“ হু। ”
রুমাইসা নাচার জন্য গিয়ে দাঁড়ালো।
এজওয়ান ওয়ান টু থ্রি বললো। রুমাইসা সবেই নাচতে যাবে এমন সময় বেজে উঠলো -তুমি দিও না গো বাসর ঘরের বাত্তি নিভাইয়া…
ইব্রাহিম সবেই বাত্তি টা নিভিয়ে ড্রিম লাইট জ্বালিয়েছিল। এমন গান শুনে চমকালো।
রুমাইসা ভরকে গেলো।

“ এসব কি গান ভাই? ”
এজওয়ান ভ্রু কুঁচকালো।
“ কি গান বেজে উঠলো রে এটা। আমিও বুঝতে পারলাম না। দ্বারা চেঞ্জ করি।
“ হু করো ভালো গান দিবা। ”
এজওয়ান গান চেঞ্জ করে পরের টা দিলো। খেতার নিচে জোনাক জ্বলে বন্ধুরে তুই থাকিলে। এই গান শুনে ফের বিরক্ত হয়ে পরের গান দিলো।
তেল মাইরা দে যৌবনের তালায়..
“ এসব কি গান বাজাচ্ছ ভাইয়া? এসব গানে নাচা যায়? ”
“ আমিও বুঝতেছি না রুমু। এসব গান কেনো এই ফোনে? ভালো গান কোথায়? এসব নোংরা গান কে শুনে? ”
“ ভাই ফোনটা তো তোমারই। তুমিই তো জানবা এসব গান কি করে তোমার ফোনে। ”
এজওয়ান তাকালো ফোনের দিকে। এটা তার ফোন?
“ এটা আমার ফোন! ওহ্! ওয়েট ওয়েট ভালো গান দিচ্ছি। ”

ভালো গান খুঁজতে খুঁজতে এজওয়ান একটা গান চালু করলো- কোন ভুলে তুমি শুলে বলো এই ফুলসজ্জায়? ”
ইব্রাহিম খাটে বসতেই এমন গান শুনে ইচ্ছে করলো রাগে নিজেরই মাথা ফাটাতে। কে বাজাচ্ছে এসব গান?
কি মরা মরা স্যাড গান এটা? রুমাইসা দাঁত চেপে বলল-
“ ভাই আজ কি আমার শ্রাদ্ধ? এমন স্যাড গান কেনো বাজালে এখন আবার? ”
“ ধূর এবার জম্পেশ একটা গান দিব। চুপচাপ নাচবি। ”
“ ভালো হওয়া চাই। ”
এজওয়ান এবার এসেছে এসেছে আবার ইলেকশন জিতবে নৌকা জিতবে জনগণ। ১৬ কোটি মানুষের একটাই ডিসিশন জিতবে নৌকা নাই কোনো টেনশন,জয় বাংলা জিতবে এবার নৌকা।
রুমাইসা দীর্ঘ শ্বাস ফেললো। ভাইয়ের থেকে ভালো গান আশা করা বোকামি। বাকি গান গুলোর থেকে এটা ভালো আছে। রুমাইসারা নাচা শুরু করলো। এজওয়ান ইয়াসিন বাহাদুর তার এক সাইডে নাচা শুরু করলো উড়া ধুরা। এদিকে যে কারো কারো সমস্যা হচ্ছে তাদের এই গান গুলোতে সেদিকে এদের হুঁশ নেই।
সোলেমান ঘুমের মধ্যে জয় বাংলা গান শুনে ধড়ফড়িয়ে উঠে বসে। শা’লা এই গান বাজাচ্ছে কে আবার? সোলেমান করিডরের জানালা দিয়ে এজওয়ান কে দেখে বুঝতে পারলো হতচ্ছাড়ার কাজকর্ম এসব। নিচে গিয়ে এজওয়ানের কান বরাবর দুটো থাবা দিয়ে বলল-

“ জুতা খুলে পিটাবো এবার,আর একটা আওয়াজ যদি আমার রুমে আসে তো। বাহিরে গিয়ে বাজা। ”
এজওয়ান আর বাহাদুর বক্স তুলে নিয়ে ইব্রাহিমের রুমের নিচে গেলো। যাক এদিকে বাজালে সমস্যা হবে না কারো।
ইব্রাহিম সবেই ঊর্মির ঘুমটা টা তুলতে যাচ্ছিলো এমন সময় ফের গান শুনে চমকে উঠলো। কি বিশ্রী গান এসব! কে বাজাচ্ছে! ইব্রাহিম এগিয়ে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে দেখলো তার ঘরের নিচে পার্টি চলছে। ঐ তো এজওয়ান নাচতে ছে। সাথে পাশে রুমাইসাও আছে। ইব্রাহিম ডাকলো কতবার। কিন্তু তার আওয়াজ গিয়ে পৌঁছালো না। মধ্য রাত অব্দি এসব গান বাজলো। ইব্রাহিম আর না পেরে ওয়াশরুম থেকে মগে করে পানি নিয়ে ছিটিয়ে দিলো এজওয়ান দের শরীরে।
এজওয়ান আকস্মিক শরীরে পানি দেখে উপরে তাকালো। ইব্রাহিম কে দেখে বলল-

“ আরে ভাই তুমি! বাসর না করে জানালার সামনে কি করো? যাও যাও ভাবি কে সময় দাও। আমরা ব্যাচেলর মানুষ। আমরা এনজয় করি। ”
ঊর্মি কে আদোও সময় দিতে পারবে সে এভাবে গান বাজালে? এখন রুমের নিচে এসে বাজাচ্ছে। ঊর্মির মাথা ধরে গেলো। হাসফাস করলো বিছানায়। ইব্রাহিম এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করলো-
“ সমস্যা হচ্ছে? ”
“ হু। গান বন্ধ করতে বলুন। ”
ইব্রাহিম নিচে নেমে গানের লাইন কেটে দিয়ে বলল-
“ হতচ্ছাড়ার দল কোথাকার। তোদের এই গানে ঊর্মির অস্বস্তি হচ্ছে। আর বাজাবি না বলে রাখলাম। বক্স ভেঙে ফেলবো। ঘুমা গিয়ে। ”
এজওয়ান মুখ ভেঙিয়ে ফোন নিয়ে চলে গেলো। ইব্রাহিম রুমে এসে দেখলো ঊর্মি ওয়াশরুমে বমি করছে। বেচারি জল ভেবে দুধ খেয়ে ফেলছিল গ্লাস থেকে।
ইব্রাহিম এগিয়ে গেলো। দেখলো বমির সাথে সাথে রক্তও বের হচ্ছে মুখ দিয়ে। ইব্রাহিম চমকে উঠলো। তড়িঘড়ি করে বলল-

“ এই জান কি হয়েছে? রক্ত কেনো বের হচ্ছে? ”
ঊর্মি ঢলে পড়লো ইব্রাহিমের শরীরে। সারাদিনের ধকল, না খাওয়ায় এখন আবার বমি,বমির সাথে রক্ত বের হওয়ায় ক্লান্তিতে সেন্সলেস হয়ে গেলো।
ইব্রাহিম ভয়ে আৎকে উঠলো। ঊর্মির চোখ মুখ মুছে পাঁজা কোলে নিয়ে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে পারিবারিক ডক্টর কে ফোন করলো।

দাহশয্যা পর্ব ৭৮

এজওয়ান বাহাদুর আর ইয়াসিনের রুমের বেলকনি দাঁড়িয়ে সিগারেট খাচ্ছিলো। মাহি রুম থেকে বের করে দিছে। আকস্মিক ডক্টর কে বাড়ির ভেতরে ঢুকতে দেখে কপাল কুঁচকে ফেললো। ইব্রাহিম হন্তদন্ত হয়ে ডক্টরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এজওয়ান শরম পেলো। হায় আল্লাহ! ডক্টর আনতে হলো বাসর ঘরে! কি লজ্জা কি লজ্জা! এরজন্য পুচকু মেয়ে বিয়ে করতে নেই। সে কত সুখী। তার একবারও ডক্টর ডাকতে হলো না। এজওয়ান সিগারেট ফেলে দিয়ে রুমে চলে আসলো।

দাহশয্যা পর্ব ৭৮ (৩)