Home দাহশয্যা দাহশয্যা পর্ব ৮০ (৩)

দাহশয্যা পর্ব ৮০ (৩)

দাহশয্যা পর্ব ৮০ (৩)
Raiha Zubair Ripti

ঢাকার নামকরা একটা প্রাইভেট হসপিটালে ভর্তি করা হয়েছিল সামির কে। তবে হাতের যেই বাজে অবস্থা তাতে বেশিক্ষণ রাখা যায় নি। ডাক্তাররা হাত দেখে প্রথমেই মাথা নাড়ে। পরিষ্কার জানিয়ে দিলো-
“এই হাত আর এখানে কিছু করার মতো অবস্থায় নেই। যত দ্রুত সম্ভব উন্নত সেন্টারে নিয়ে যান।”
এই হাত এখন অকেজো। সামির যন্ত্রণায় ছটফট করছে। শেখর খবর পেয়েই কান্দাপাড়া না গিয়ে মাঝপথ থেকেই ঘুরে আসে।
ওয়ার্ডে ঢুকতেই সামিরের হাতের অবস্থা দেখে তার চোখ-মুখ রাগে বিকৃত হয়ে যায়। শ্বাস ঘন হয়ে আসে, মুখ থেকে শব্দ বের করতে কষ্ট হয়।
অস্থির কণ্ঠে সে ঝাঁপিয়ে জিজ্ঞেস করে-

“ কে করেছে তোর এমন অবস্থা? বল কে করেছে? শুধু নামটা বল। ”
সামির সব ব্যথার মাঝেও রাগে, ক্ষোভে দাঁত চেপে বলে-
“ ঐ এজওয়ান সুলতান আমার মুখে মুইতা দিছে ভাই। ঐ শুয়োরের বাচ্চার সো*না কাইটা আনতে না পারলে আমি মরেও শান্তি পামু না ভাই। ”
শেখর ভ্রু কুঁচকালো।
“ এজওয়ান সুলতান কে? ”
মহসিন আলী বলল-
“ বাশারের পোলা। দেশে আইছে। কু’ত্তার বাচ্চার সো*না কাইটা আনার ব্যবস্থা কর। ”
“ ঐ এজওয়ান সুলতান ই সব করছে? কি কারনে এসব করলো? ওর তো আমাদের চেনার কথা না। ”
সামির চুপ হয়ে গেল। শেখর ফের জিজ্ঞেস করলো-
“ কিছু করেছিলি তুই? ”

মহসিন আলী বাঁধা দিলো। ছেলে যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে। আর এই ছেলে এসব জিজ্ঞেস করছে।
হাসপাতাল ডাক্তাররা জানিয়ে দিয়েছে, এই কেস আর বাংলাদেশে সামলানো সম্ভব না।
সামিরকে জরুরি ভিত্তিতে ইউএসে পাঠাতে হবে হ্যান্ড রিকনস্ট্রাকশন বা কৃত্রিম আঙুল লাগানোর জন্য। শেখর দ্রুত ফ্লাইট বুক করে ইউএস ছুটলো। ভাইয়ের হাত ঠিক করে দেশে ফিরে দেখছে বাকিটা।
প্রেমার আজ ভালো লাগছে। বাড়িতে কেউ নেই। মহসিন আলি ক্লাবঘরে। শেখর দেশে নেই। কেমন মুক্ত পাখির মতো ফুরফুরে লাগছে। জীবনটা আজকের মতো যদি হতো তাহলে প্রেমা এই জীবনটা কে অনায়াসে হাসতে হাসতে বরণ করে নিত। আজকের জীবন টা সুন্দর,একদম নির্মল সতেজ। প্রেমা গুনগুন করে গান গাইছিলো। ঠিক সেই মুহুর্তে লিভিং রুমের টেলিফোন টা বেজে উঠে। প্রেমা গান গাওয়া থামিয়ে দিলো। কে ফোন করলো? প্রেমা এগিয়ে গিয়ে টেলিফোন টা কানে নিতেই বুঝতে পারলো সামিরের কলেজ থেকে ফোন করেছে। যেতে বলল। সামির কে নাকি রেস্ট্রিকটেড করা হয়েছে। প্রেমা বলল- বাসায় লোক নেই। প্রিন্সিপাল প্রেমাকেই আসতে বলল।

প্রেমা কিছুক্ষণ ভেবে আচ্ছা বলে ফোনটা কেটে শেখর কে ফোন করলো। ফোন ঢুকছে না। মহসিন আলী কেও ফোন করলো। রিসিভ হচ্ছে না। অগ্যতা প্রেমা বোরকা পড়ে নিকাব বেঁধে সাইড ব্যাগটা নিতেই খেয়াল করলো তার কাছে তো টাকা নেই যাওয়ার। সিকিউরিটি কে বলল ড্রাইভার কে গাড়ি নিয়ে আসতে। সিকিউরিটি ফোন করে ড্রাইভার কে আসতে বলল। ড্রাইভার আসতেই প্রেমা উঠে বসলো। ঘন্টাখানেক সময় লাগলো তার রাজউক উত্তরা মডেল কলেজে আসতে। গাড়ি থেকে নেমেই প্রেমা আশেপাশে তাকাতে তাকাতে হাঁটছিল। কলেজ ছুটি হয়েছে। ছেলেপেলে বের হচ্ছে একএক করে। প্রেমা হাঁটতে হাঁটতে আকস্মিক কারো সাথে ধাক্কা খেয়ে দু কদম পিছিয়ে যায়। অস্থির গলায় বলল-
“ দুঃখিত আমি খেয়াল করি নি…”
কথাটা বলেই মাথা উঁচু করে সামনে তাকাতেই দেখলো একটা মেয়ে। মাটির দিকে তাকিয়ে কিছু খুঁজছে। প্রেমা জিজ্ঞেস করলো-

“ কিছু খুঁজছো? ”
মেহরিন হেঁটে আসছিল অন্যমনস্ক হয়ে। হুট করে ধাক্কা লাগায় হাতের ফোনটা ছিটকে পড়ে যায়। মেহরিন মাথা ঝাঁকিয়ে বলল-
“ হুমম। আমার ফোনটা পাচ্ছি না। হাত থেকে ছিটকে কোথায় যে পড়লো ”
প্রেমা আশেপাশে তাকিয়ে বলল-
“ আচ্ছা আমিও খুঁজছি তাহলে। কি ফোন তোমার? ”
“ জ্বি আইফোন। ”
“ ওহ্ আচ্ছা..

কথাটা বলে প্রেমা ঘাসের সাইড দিয়ে খুঁজতে লাগলো। ছাত্রছাত্রী রা ততক্ষণে চলে গেছে। ঘাসের সাইডে বসার এক বেঞ্চের কাছে প্রেমা একটা ফোন দেখতে পেলো। ঐ তো ফোনটা। প্রেমা স্বস্তির শ্বাস ফেলে ফোনটা উঠালো। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে ব্যাক পার্টের দিকে চোখ যেতেই প্রেমার শরীর হিম হয়ে গেলো। স্পষ্ট করে লেখা একটা নাম। নওয়াজ সোলেমান সুলতান! শুধু কি এই নাম? তার আগে লেখা মেহরিন সুলতান ওয়াইফ অফ নওয়াজ সোলেমান সুলতান!
ঐ মেয়েটা কি তাহলে তার সোলেমানের বউ? প্রেমার চোখ ঝাপ্সা হয়ে আসে। ঘাড় বেঁকিয়ে তাকিয়ে দেখে সেই রমণী কে। ব্যস্ত ভঙ্গিতে এই ফোনটা খুঁজে চলছে। শরীরে কলেজ ড্রেসের কালারের বোরকা,মুখে নিকাব। প্রেমার মতোই….

প্রেমার শ্বাস আঁটকে আসে। এই মেয়েটাকেই বুঝি প্রেমা হিংসা করে তাই না? পিচ্চি একটা মেয়ে! সবে কলেজে পড়ে! সামির ও তো এই কলেজেই পড়ে। কত কি ভাবনা এসে হাজির হলো তার মস্তিষ্কে!
মেহরিন যখন ফোনটা না পেয়ে একদম হাল ছেড়ে দিয়ে দাঁড়িয়ে যাচ্ছিলো। তখন ঘাড় ঘুরিয়ে প্রেমার দিকে তাকাতেই দেখলো তার ফোন টা। স্বস্তির শ্বাস ফেললো। এগিয়ে গিয়ে বলল-
“ ধন্যবাদ আপু। ”
প্রেমা হকচকিয়ে গেলো। ফোনটার দিকে দ্বিতীয় তাকিয়ে বলল-
“ তুমি সোলেমান সুলতানের বউ? ”
মেহরিন আকস্মিক সোলেমানের বউ ডাকটা শুনে ভরকে গেল। উনি জানলো কি করে সে সোলেমান সুলতানের বউ? ফেস তো দেখা যাচ্ছে না। তাহলে?

“ আপনি জানলেন কি করে?”
প্রেমা নিকাবের আড়ালে স্মিত হাসলো। ফোনটা বাড়িয়ে দিয়ে বলল-
“ ফোনে লেখা আছে। সেজন্য ধারণা থেকে জিজ্ঞেস করা। এই নাম তো একটাই। আর সেটাও আবার…আবার একজন এমপির। ”
“ ওহ্ আচ্ছা, ধন্যবাদ আপনাকে,ফোনটা খুঁজতে সাহায্য করার জন্য। ”
“ আমার জন্যই তো হারিয়েছিল। তাই ধন্যবাদ দিও না। তুমি নতুন এসেছো এই কলেজে? ”
“ জ্বি। ”
“ বাসায় যাবে এখন? ”
“ একটু দেরি হবে যেতে। উনার আসতে সময় লাগবে বললো। ”
“ ওহ্ আচ্ছা তাহলে বসা যাক একসাথে? ”
মেহরিন একবার গেটের দিকে তাকালো। সুলতান সাহেবের আসতে নাকি একটু দেরি হবে। মেহরিন কে অপেক্ষা করতে বলেছিল। এখন সাথে একজন কথা বলার মতো সঙ্গি থাকলে অবশ্য বোর লাগবে না। মেহরিন মাথা নেড়ে বলল-

“ অবশ্যই। ”
প্রেমা আর মেহরিন গিয়ে বসলো একটা বেঞ্চে। প্রেমা তাকিয়ে আছে মেহরিনের দিকে। চোখের পলক ফেলছে না। নিকাবের আড়ালে ঢেকে থাকা মুখটা দেখার তৃষ্ণায় প্রেমায় কাতর হয়ে যাচ্ছে। তার সোলেমানের বউ দেখতে নিশ্চয়ই খুব সুন্দরী রূপবতী! হ্যাঁ তাই হবে। যে মেয়ের গলার স্বর এত সুমধুর, সেই মেয়ে অবশ্যই দেখতেও সুন্দর। তারপরও নারীময় মন প্রেমার। ভেতর টা জ্বলেপুড়ে খাক হয়ে যাচ্ছে অসীম যন্ত্রণায়। হুহু করে কাঁদতে ইচ্ছে করছে। একটু আগেই সে বলল আজকের দিনটা সুন্দর। অথচ আজকেই কি খারাপ লাগছে প্রেমার।
মেহরিন কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থাকলো। কি বলবে বুঝতে পারছে না।
“ আপনি কি কোনো কাজে আসছিলেন আপু কলেজে? ”
প্রেমার ঘোর ভাঙে। উপর নিচ মাথা নেড়ে বলল-

“ হুমম। দেবর টা এই কলেজে পড়ে। অফিস থেকে ফোন করে আসতে বলেছে সেজন্য আসা। ”
“ ওহ্ আচ্ছা। আপনি বিবাহিত তাহলে…”
“ হুমম। তোমার মতই। ”
“ আপনার নাম টা কি…?”
প্রেমা আশেপাশে তাকিয়ে বলল-
“ সূচনা..। ”
মেহরিন দুবার নামটা উচ্চারণ করলো ঠোঁটের আগায়..সূচনা.।
“ সুন্দর নাম। ”
“ তোমার নাম টাও সুন্দর। আচ্ছা তোমাদের বিয়ে কিভাবে হলো? ”
মেহরিন বুঝলো না কথাটার মানে। সেজন্য বলল-

“ মানে? ”
“ অ্যারেঞ্জ নাকি লাভ…”
“ অ্যারেঞ্জ ম্যারেজ আপু। ”
“ তোমার স্বামীর জীবনের প্রথম নারী তাহলে তুমি? ”
প্রশ্ন টা ঠিক পছন্দ হলো না মেহরিনের। এত গভীর কথা জিজ্ঞেস করছে কেনো?
“ হয়তো প্রথম,সঠিক জানি না। কিন্তু আমি যে তার সর্বশেষ এটুকু জানি। ”
প্রেমা স্মিত হাসলো। হ্যাঁ সর্বশেষ ই তো। সূচনা তো ছিলো প্রেমা। প্রেমা মেহরিনের গালে হাত রেখে বলল-
“ তুমি ভীষণ ভাগ্যবতী মেয়ে। জানো সেটা? ”
“ হুমম জানি। ”
প্রেমা আদুরে গলায় বলল-
“ একটু জড়িয়ে ধরি তোমায়? ”

মেহরিন ভরকে গেলো। হা না কিছু বলার আগেই প্রেমা জড়িয়ে ধরে বলল-
“ তুমি সুখী হও মেয়ে। খুব সুখী হও। যতটা সুখী হলে আমার মতো দুঃখ তোমায় স্পর্শ না করে। ”
মেহরিনের মস্তিষ্ক বারবার বাড়ি খাচ্ছে একটা কথাই..আমার মতো দুঃখ তোমায় স্পর্শ না করুক। তাহলে কি আপুটার অনেক দুঃখ?
মেহরিন প্রেমার পিঠে হাত রাখতেই প্রেমা তড়িঘড়ি করে ছেড়ে দিলো মেহরিন কে। সামনে তাকাতেই দেখলো একটা কালো প্রাইভেট কার এগিয়ে আসছে। বাহির থেকে ঝাপ্সা দেখা গেলো সোলেমানের মুখশ্রী। এই তো সেই মুখ..যেটার দিকে তাকিয়ে থাকার অধিকার আগে ছিলো শুধু প্রেমার। আর এখন সেই অধিকার তার সামনে থাকা রমণীর। প্রেমা উঠে দাঁড়িয়ে বলল-

“ আসছি, ভালো থেকো। ”
মেহরিন প্রতিত্তোরে কিছু বলার সুযোগ পেলো না। তার আগেই প্রেমা প্রস্থান করলো।
সোলেমান গাড়ির ভেতর থেকে মেহরিনের পাশে বসে থাকা কালো বোরকা পরিহিত মেয়েটাকে তার খুব চেনাচেনা লাগলো। সেজন্য তড়িঘড়ি করে গাড়ি টা পার্ক করে কাছে আসতেই দেখলো মেয়েটা নেই। মেহরিন সোলেমান কে দেখে মুচকি হেঁসে বলল-
“ এতক্ষণে আসলেন তাহলে! ”
সোলেমান আশেপাশে খোঁজার চোখে তাকিয়ে মেহরিনের হাত টা ধরে বলল-
“ কার সাথে কথা বলছিলে তুমি? কে ছিলো সাথে? ”
মেহরিন সোলেমানের সাথে পা মিলিয়ে হেঁটে বলল-

“ চিনি না আপুটাকে। আজই প্রথম দেখা। ”
“ কি বললো? ”
“ বললো আমি অনেক ভাগ্যবতী,উনার মতো দুঃখী যেন না হই। ”
সোলেমান চমকে উঠলো। অস্থির চিত্তে জিজ্ঞেস করলো-
“ নাম জানো তার? ”
“ হুমম। ”
“ কি? ”
” সূচনা। ”
সোলেমান কেমন শান্ত হয়ে গেল। বোধহয় আশা করেছিল নামটা প্রেমা হবে। হুট করে ঐ মেয়েটাকে দেখে সোলেমানের মস্তিষ্ক প্রেমা ভেবে নিয়েছিল। কেনো ভাবলো জানা নেই।
প্রেমা দুতলার করিডর থেকে দেখলো তার সোলেমান কেমন তার বউকে আগলে হাত ধরে হেঁটে যাচ্ছে। পুরোনোদের জায়গায় নতুন রা কি সুন্দর চমৎকার মানানসই ভাবে বসে যায় তাই না?
প্রেমার চোখ দিয়ে গড়ালো অশ্রু। সূচনা দের কেউ মনে রাখে না। সব সূচনা যে অন্তিম হতে পারে না। কিছু সূচনা মাঝপথেই থেমে যায়। সেখানে তুমি মেহরিন অন্তিম।
মির্জা গালিব ঠিকই বলেছিলেন –

যখন আমি তার পাশে অন্য কাউকে দেখলাম! তখন বুঝলাম আল্লাহ কেনো শিরক পছন্দ করেন না! আমি উন্মাদ হয়ে যায় তাকে দেখার জন্য একবার! ভাবো গালিব যে তাকে রোজ দেখে তার ভাগ্য কত চমৎকার!!
প্রেমারও তেমনটাই হচ্ছে। প্রেমা আর দাঁড়ালো না। অফিস কক্ষে গিয়ে জানতে পারলো প্রিন্সিপাল নেই। একটু আগেই চলে গেছে। ফের কাল পরশু আসতে বললো। প্রেমা একটু খুশি হলো। তাহলে আবার দেখতে পাবে সে তার সোলেমান আর সোলেমানের বউ কে!
বিধাতা..সবাই ঠিকই তাদের নিজ নিজ জীবনে ঠিকই রইলো। মাঝখান থেকে আমার জীবনটা শুধু নষ্ট হইলো তাই না?

রমনায় কাজ চলছে দ্রুত সমাবেশের। বড় বড় করে প্যান্ডেল বাঁধা হচ্ছে। এজওয়ান একবার এসে দেখে গেছে আয়োজন। বিরোধী পক্ষ যেন কোনো সহিংসতা করতে না পারে সেজন্য সেনাবাহিনী, সিআইডি সহ বেশ কিছু গোপন ইউনিটের লোক নামানো হবে। এজওয়ান সিআইডি নামানো হবে শুনেই একটু বাঁকা হাসলো। তারপর পকেট থেকে ফোনটা বের করে কাউকে কল দিয়ে বলল-
“ সাফওয়ান মির্জা কে চাই আমার বডিগার্ড হিসেবে। ”
ওপাশ থেকে বলা হলো ঠিক আছে।
সাফওয়ান দীর্ঘ তিন মাস খাগড়াছড়ি থেকে গতকাল রাতে ঢাকায় ফিরেছে। আর ফিরেই জানতে পারলো তাকে এজওয়ানের বডিগার্ডের জন্য তলব করা হয়েছে। নিউজ টা শুনেই মন মেজাজ খারাপ হয়ে গেল। ইউনিট থেকে যেখানে পাঠানো হবে সেখানেই সাফওয়ান যেতে বাধ্য। তাই কথাটা জানার পর তেমন প্রতিক্রিয়া করলো না সাথে সাথে।

তবে আজ অনেক গুলো দিন পর ডিজিএফআইয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে আবার। তারা আন্দাজ করেছে রিসেন্ট কোথাও একটা বড় পরিসরে কোনো ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে। যেখানে সাধারণ জনগনের জীবন বিপন্ন হতে পারে। বিষয়টা তারা তাদের মধ্যেই রেখেছে। স্থান টা এখনও শিওর না। বেশ কয়েক জায়গায়ই এবার বড় পরিসরে সমাবেশ হচ্ছে রাজনৈতিক দল গুলোর। ডিজিএফআইয়ের প্রধান Aj কে নক করলো। Aj পাল্টা রেসপন্স করে জানালো- সে সজাগ আছে বিষয় টা নিয়ে। খুব সম্ভবত ঢাকাতেই হতে পারে বোমা হামলা। আর হামলা টা হয়তো অভ্যন্তরীণ কোনো রাজনৈতিক দল থেকে আসতে পারে না।
ডিজিএফআইয়ের প্রধান জিজ্ঞেস করলো-
“ তুমি কি সশরীরে উপস্থিত থাকবে সেখানে…”
Aj কথা সম্পূর্ণ শেষ করতে না দিয়েই বলল-
“ থাকবো উপস্থিত, চিন্তা করবেন না। ফোর্স রেডি তো? ”
“ হুমম। ”
“ তাহলে বাকিটা আমি সামলে নিচ্ছি। ”

ডিজিএফআইয়ের প্রধান একটু স্বস্তি পেলো। উপর মহল থেকেও বারবার সতর্ক করছে। রাজনৈতিক সমাবেশ গুলো তে যেন কোনো সহিংসতা না হয়। তাহলে জনগণের উপর এর প্রভাব পড়বে। যা রাজনীতির জন্য কাল হয়ে দাঁড়াবে।
শীতকাল.. আকাশে নেই কোনো রূপালি থালার মতো সুন্দর চাঁদ.. নেই কোনো ঝিলমিল করে জ্বলতে থাকা আকাশ ভর্তি তারা। আছে শুধু তীব্র ঘণ ধোঁয়ার মতো কুয়াশা আর গা কাঁপানো ঠাণ্ডা। বিস্তার খোলা মাঠ। যতদূর চোখ যায় ততোদূর শুধু কুয়াশা আর কুয়াশা দেখা যায়। স্কুল ঘরের বারান্দায় বসে আছে বাতাসি। সারাটা দিন ধরে সে এখানেই বসা। কেউ খুঁজতে এলো না তাকে। ওড়না দিয়ে শরীর ঢেকে রেখেছে যাতে শীত কম লাগে। কিন্তু এই পাতলা ওড়না যে তা মানতে নারাজ। থেকে থেকে আসা একটা দমকা হাওয়া বাতাসির শরীর সহ অন্তরাত্মা পর্যন্ত কাঁপিয়ে দিচ্ছে। বাতাসি চেয়েও আর আটকে রাখতে পারছে না চোখের জল। হুহু করে কেঁদে কেঁদে
তার জীবন কে নিয়ে অভিযোগ তুলে বলল…

“ দুঃখ তুই তোর আম্মারে বলিস। তুই একটা বেহায়া নির্লজ্জ ছ্যাছড়া শ’য়তান। আমার রূপ নাই সৌন্দর্য নাই টাকা নাই পয়সা নাই, বাপ নাই,মা নাই,ভাই নাই,কেউ নাই। সবাই ছাইড়া চইলা গেছে অথচ তুই আমার পিছু ছাড়স না। তোরে দিন রাত ২৪ ঘন্টা আমি বাজে বিশ্রী ভাষায় বকি।ভালো মায়ের সন্তান হয়ে থাকলে আমার পিছু ছাইড়া দে হা’রামজাদা। ”
তারপর আবার চুপ হয়ে গেল। দুঃখ যদি মানুষ হতো তাহলে নিশ্চয়ই আজ ভীষণ করে লজ্জা পেত। চারিপাশে শেয়াল ডাকতে লাগলো। এখন বাজে কত? উমমম সাড়ে আটটা বোধহয়। সন্ধ্যা হলেই গ্রামের সবাই দরজা কপাট দিয়ে ফেলে। সেখানে এই গা কাঁপানো শীতে সুতি একটা ময়লা জামাকাপড় পড়ে বসে আছে বাতাসি।

রাত বাড়তে লাগলো ক্রমশ। এখানে থাকাটাও ঠিক হবে না। কিছুটা দূরেই শেয়াল ডাকছে ক্ষেতে। কখন জানি বাতাসি কে দেখে ঝাঁপিয়ে পড়ে। বাতাসি উঠে দাঁড়ালো। টিন সেটের স্কুল থেকে বেরিয়ে পাশে থাকা বিল্ডিং করা স্কুলটার দিকে গেল। সিঁড়ির কাছে উঠে বসে রইলো। এখানে একটু বাতাস কম আসছে। রাতটা হয়তো কাটিয়ে দেওয়া যাবে। বাতাসি মাথা দেওয়ালে ঠেকিয়ে চোখ বন্ধ করলো। কিছু মুহূর্ত যেতেই বাতাসি কেমন যেন মেঘ ডাকার আওয়াজ শুনলো মনে হলো। সেজন্য আতঙ্কিত হয়ে চোখ মেলে তাকালো। এই শরীর কাঁপানো শীতের মাঝেও মেঘ কেনো ডাকছে? আস্তেধীরে বাতাসের তীব্রতা বাড়লো। রাস্তার ধুলোবালি উড়তে শুরু করলো সেই বাতাসের সাথে। বাতাসি দিকবিদিকশুন্য হয়ে পড়লো। এই শীতে বৃষ্টি নামলে তো বাতাসি ভিজে যাবে। সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতেই আকাশের বুক চিঁড়ে হাজির হলো ঝুম বৃষ্টি। বাতাসির সর্বাঙ্গ ভিজে গেল সেই বৃষ্টির পানিতে। এই বৃষ্টির ফোঁটা গুলো মনে হলো যেন সূচের মতো করে বিঁধতে লাগলো।

বাতাসি এবার ভেজা মাটিতে বসে শব্দ করে কেঁদে উঠলো। এই বাতাসি কে মানুষ গুলোর সাথে সাথে প্রকৃতিও এভাবে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করছে! তারা কি জানে না বাতাসির কি অবস্থা আজ? জেনেও কেনো বৃষ্টি নিয়ে হাজির হলো? মানুষ মনে হয় না কারো বাতাসি কে? বাতাসি এবার দু হাত তুলে স্রষ্টার নিকট নিজের মৃত্যু কামনা করে বসলো। আর বাঁচতে চায় না সে এই নিষ্ঠুর পৃথিবীতে। বেঁচে থাকলেই শুধু কষ্ট আর কষ্ট। এরচেয়ে মৃত্যু সুন্দর। বাতাসির এই আহাজারি যদি কেউ স্বচক্ষে দেখতো।

দাহশয্যা পর্ব ৮০ (২)

তাহলে নিশ্চিত সেও এই বাতাসির সাথে পাল্লা দিয়ে কাঁদতো। বাতাসি কাঁদতে কাঁদতে হাঁপিয়ে গেল। বৃষ্টির পানিকে আঁকড়ে ধরে যখন ভারসাম্য হারিয়ে পড়ে যেতে নিবে ঠিক তখনই আকস্মিক শক্ত দুটো হাত এসে জড়িয়ে ধরলো বাতাসি কে। বাতাসি পিটপিট করে তাকালো। এক পুরুষালি মুখ। অতি পরিচিত সেই মুখ। বাতাসি চিনে এই মুখের মালিক কে। পুরুষটির চুল মুখ শরীরে বেয়ে পানি এসে পড়ছে বাতাসির মুখের উপর। এটা কি বাতাসির ভ্রম নাকি বাস্তব! বাতাসি কোনো রকমে উচ্চারণ করলো-
“আ…আপনি এসেছেন…! ”

দাহশয্যা পর্ব ৮১