দাহশয্যা পর্ব ৮৩ (২)
Raiha Zubair Ripti
রাত তখন আনুমানিক পোনে একটা বাজে। দীর্ঘ কয়েক ঘণ্টা অচেতন অবস্থায় পাটের বস্তার ভেতর বন্দি থাকার পর অবশেষে প্রেমাকে বের করা হলো। আর কিছুক্ষণ দেরি হলেই শ্বাসরোধ হয়ে তার মৃত্যু অনিবার্য ছিল। বস্তার মুখ খুলতেই প্রেমা ধীরে চোখ মেলল। চোখ খুলে সে প্রথম যেটা দেখল চারপাশে গোল হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা কয়েকজন অপরিচিত নারী। সবার দৃষ্টি একসাথে তার দিকে নিবদ্ধ। তাদের পরনের পোশাক অদ্ভুতভাবে চোখে লাগে। কারো বুক ঠিকমতো ঢাকা নেই, কারো অর্ধেক উন্মুক্ত। ঠোঁটে গাঢ় লাল লিপস্টিক, মুখভর্তি ভারী মেকআপ, কপালে অস্বাভাবিক বড় টিপ। চেহারায় বাঙালিয়ানার কোনো ছাপ নেই। দেখলেই গা ছমছম করে ওঠে।
একটা মেয়ে এগিয়ে এসে হাতের বাঁধন খুলে দিতে দিতে বলল-
“ এই মাইয়াডারে কই থিকা তুইল্লা আনছে জগু? ”
অন্যজন নির্বিকার কণ্ঠে উত্তর দিল,
“ কই থিকা তুলে আনছে। সেসব জেনে আমাগো কাজ কি? মাইয়াডারে সাজাইয়া রাখতে বলছে। সাজাইয়া রাখ। নতুন খদ্দের আইবো বলে হের লাইগা। ”
প্রেমা চমকে উঠলো একথা শুনে। আশেপাশে তাকালো ভালো করে। শেওলা ধরা পুরোনো অন্ধকার জানালা বিহীন রুম। দেওয়ালে অসংখ্য বাজে নোংরা ছবি। যা দেখলে গা ঘিনঘিন করে উঠবে। প্রেমা মেয়ে দুটোকে নিজের থেকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিয়ে বলল-
“ একদম কাছে আসবে না আমার। এটা কোথায় নিয়ে এসেছে আমায়? এখানে কি হয়? আর তোমরা কারা? ”
দিপা নামের মেয়েটা বলল-
“ এটা কান্দাপাড়া। নাম শুনো নি? পতিতালয় । ”
প্রেমা এমন কিছুই ধারণা করেছিল শুরুতে ওদের দেখে। শেখর সত্যি সত্যি তাকে পতিতালয় এনে ছাড়লো! প্রেমার ভেতরটা কেমন ছিঁড়ে যেতে লাগলো ভয়ে। তার এই দেহ এখন ভিন্ন ভিন্ন পুরুষ শোষণ করবে! চোখ দিয়ে পানি পড়তে লাগলো।
মনি নামের একটা মেয়ে হাতে আপেল কাটতে কাটতে রুমে প্রবেশ করলো। প্রেমা কে এখনও সাজায় নি দেখে রেগে বাকি মেয়ে দের দিকে তাকিয়ে বলল-
“ ওকে এখনও রেডি করাস নি কেনো? ”
মেয়ে গুলো ভয়ে শিউরে ওঠে বলল-
“ কাছেই তো যেতে দিচ্ছে না। ”
মনি এগিয়ে গেলো প্রেমার দিকে। আপাদমস্তক প্রেমাকে দেখে বলল-
“ সমস্যা কি? ধরতে দিচ্ছিস না কেনো? নতুন খদ্দের আসবে তোর জন্য। চুপচাপ যা বলা হচ্ছে তাই কর। ”
প্রেমা চাপা স্বরে দাঁত চেপে বলল-
“ লজ্জা করে না এসব করতে? এক দেহ কত পুরুষ কে বিলিয়ে বেড়াও তোমরা? গা ঘিনঘিন করে না? ঘৃণা করে না তোমাদের নিজেদের কে দেখে? আমার তো ঘৃণা করছে তোমাদের দেখে। ”
কথাগুলো কর্ণকুহর হতেই মনি যখন ডান হাত টা উঁচু করে প্রেমার গালে চ’ড় মা’রতে যাবে ঠিক সেই সময় প্রেমা হাত টা ধরে মুচড়ে দিয়ে বলল-
“ ভুলেও এই কাজ টা করবে না। হাত একদম ভেঙে ফেলবো বলছি আমাকে দিয়ে বাজে নোংরা কাজ করানোর চেষ্টা করলে। তোমাদের মালিক কে আসতে বলো। আমি কথা বলবো শেখরের সাথে। কাপুরষ, অমানুষ, জা’নোয়ার একটা। বউকে দিয়ে,বউয়ের শরীর বেঁচে টাকা কামাতে চাইছে এখন! ”
মেয়েগুলো চমকে উঠলো। এই মেয়েটা ঐ লোকের বউ! মনি ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিলো প্রেমাকে। প্রেমা পড়ে গেলো ফ্লোরে। মনি আপলে ছুড়ি ফ্লোরে ফেলে দিয়ে প্রেমার গলা চেপে ধরে বলল-
“ তোর সাহস তো কম না। তুই আমার হাত ধরিস! জানিস আমি কে? তোর কি হাল করতে পারি আমি? আর শেখর? ও আমার কথায় উঠে আর বসে। তোর সাথে ও কিসের কথা বলবে? এই তোরা ওকে সাজা। খদ্দের আসার আগে ওকে রেডি চাই আমার। মনে যেন থাকে। ”
মনি চলে গেলো। দিপা নামের মেয়েটা দূর থেকে বলল-
“ শুনে নাও না ওদের কথা গুলো। না শুনলে অনেক অত্যাচার করবে। না খাইয়ে রাখবে একা একটা অন্ধকার রুমে। বাঁচতে চাইলে ওদের কথা শুনো। ”
কথাটা শেষ করে দিপা এগোতে চাইলে প্রেমা ফ্লোরে পড়ে থাকা ছুরি টা হাতে তুলে নিয়ে বলল-
“ আমার কাছে আসার চেষ্টা করবে না বলে দিচ্ছি। তাহলে খু’ন করে ফেলবো একদম। আমি মরে যাব তারপরও তোমাদের মতো দেহ বিক্রি করবো না আমি। আল্লাহর ভয় নেই তোমাদের? কিভাবে পারো তোমরা এসব নোংরা কাজ করতে? ছিঃ! ”
“ আমরা কেউ মুসলিম না। তাই আল্লাহর ভয়ও নেই আমাদের। ”
“ তাহলে তোমরা কারা? তোমাদের ধর্ম নেই? নাস্তিজ তোমরা? ”
“ আমরা নাস্তিক নই। আমাদের মধ্যে কেউই মুসলিম না। আমরা কেউ হিন্দু, কেউ খ্রিস্টান তো কেউ বৌদ্ধ ধর্মের, উপজাতি আমরা। এই কান্দাপাড়ার পতিতালয়ের একমাত্র মুসলিম হয়ে আসা প্রথম নারী তুমি। ”
“ তোমরা যাই হও। আমি কিচ্ছু শুনতে চাই না। আমার কাছে আসার চেষ্টা করো না। রুম থেকে বের হও। বের হও বলছি। ”
দিপা শুনলো না। এই মেয়েকে না সাজালে তে তাদের উপর আবার অত্যাচার শুরু হতে পারে। এই মেয়ের জন্য তারা কেনো অত্যাচার সইবে?
প্রেমা দিপার এগোনো দেখে সত্যি সত্যি দিপার হাতে ছু’রি দিয়ে একটা টান বসিয়ে দিলো। দিপা ব্যথায় হাত চেপে মৃদু আওয়াজ করলো।
হাত দিয়ে গলগল করে র’ক্ত বের হচ্ছে। বাকি সবাই সবার দিকে তাকাচ্ছে। প্রেমা ফের ছুরি নাড়িয়ে বলল-
“ আসবে কেউ? এসো। এবার বুকে বিঁধে দিব। ভালোয় ভালোয় বলছি তোমরা বের হও। আমাকে যেতে দাও। ”
দিপা বাকিদের বের হতে বলে বাহির থেকে দরজা লাগিয়ে দিয়ে মনির কাছে চলে গেলো। প্রেমা দৌড়ে ভেতর থেকে ছিটকানি লাগিয়ে দিলো। তারপর চিৎকার করে কাঁদতে লাগলো। আল্লাহর উপর প্রেমার আজ কি যে অভিমান রাগ হচ্ছে। সে কি আল্লাহর প্রিয় বান্দা হতেই পারে নি! এতো নামাজ কালাম এতো ইবাদত করলো। শেষমেশ তাকে আজ এই জায়গায় আসতে হলো! প্রেমা এবার নিজেকে কি করে রক্ষা করবে? এতো লোকের সাথে কি প্রেমা পেরে উঠবে? আল্লাহ কি একটুও সাহায্য করবে না প্রেমা কে? আগেও করে নি। এখনও কি করবে না? এই জায়গায় আসার আগে কি মৃত্যু দিতে পারতো না। এই বার আর প্রেমা মাথায় রাখবে না কিন্তু যে আ’ত্মহত্যা মহাপাপ। সত্যি সত্যি নিজেকে মে’রে ফেলবে। এই পৃথিবী এত নিকৃষ্ট! এত! ছিঃ। স্বামী হয় স্ত্রীর পোশাক স্বরূপ। যেখানে স্বামীর দায়িত্ব তার স্ত্রীর সম্মান রক্ষা করা। সেখানে এই শেখর প্রেমার সম্মান পরপুরুষের কাছে চড়া দামে বিক্রি করে দিতে চাইছে! প্রেমার এই সম্মান টুকু ছাড়া আর কিই বা ছিলো জীবনে? শেখর করলো ভোগ। ছিলো তো হালাল। এখন সেটুকু নিয়েও এভাবে টানাটানি করছে শেখর! অধম। এই লোক প্রেমার সামনে আসলে প্রেমা এবার খু’ন করে ফেলবে। উন্মাদ হয়ে যাচ্ছে প্রেমা ভয়ে,নিজের জীবনের শেষ সম্বল টুকু বাঁচানোর জন্য।
মেহরিন খবর টা দেখেছে টিভিতে। আর দেখামাত্রই পাগলের মতো ছুটে এসেছে ইব্রাহিমের সাথে হসপিটালে। কাঁদতে কাঁদতে অবস্থা খারাপ হয়ে গেছে। হসপিটালের বাহিরে সাংবাদিকদের উপচে পড়া ভীড়। ইব্রাহিম আর মেহরিন কে দেখামাত্রই তারা ক্যামেরা নিয়ে সেদিকে যেতে লাগলো। তারা জিজ্ঞেস করতে লাগলো সাথের মেয়েটা কে? ইব্রাহিমের যে ওয়াইফ না সেটা জানে। কারন ইব্রাহিমের ওয়াইফ কে তারা দেখেছে বিয়ের ছবিতে। জিজ্ঞেস করলো সোলেমানের ওয়াইফ নাকি?
ইব্রাহিম ভীড় ঠেলে যেতে যেতে উত্তর দিলো কোনোরকমে- হু।
ব্যস মেহরিনের ছবি তোলা হয়ে গেলো। বেচারি মেহরিন কোনো রকমে তাড়াহুড়ো করে বোরকা টা গায়ে জড়িয়ে পড়নে থাকা ওড়নাটাই মাথায় দিয়ে চলে আসছিলো। নিকাব বাঁধে নি।
করিডরে স্ট্রেচারে এত এত লা’শ এত এত আহত মানুষ দেখে মাথা ঘুরে যাওয়ার উপক্রম। মেহরিনের বুক ফেটে যেতে লাগলো এদের এমন আহাজারি দেখে। ইব্রাহিম রিসিপশনে জিজ্ঞেস করলো-
“ সোলেমান কোথায়? ”
মেয়েটা জানালো-
“ জরুরি বিভাগের ওখানে আছে। ”
ইব্রাহিম মেহরিন কে নিয়ে জরুরি বিভাগের ওদিল টায় গেলো। জরুরি বিভাগের সামনে আছে শুধু বাশার সুলতান। সোলেমান কে দেখতে না পেয়ে মেহরিন জিজ্ঞেস করলো-
“ চাচা উনি কোথায়? উনি ঠিক আছে? চুপ কেনো বলুন না। ”
বাশার সুলতান মেহরিনের দিকে তাকিয়ে বলল-
“ ঐ যে ওখানে আছে। ”
বাশার সুলতান হাতের আঙুল দেখিয়ে একটা কেবিন দেখালো। মেহরিন সেই কেবিনের দিকে ছুটে গেলো। দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকে দেখলো সোলেমানের হাতে ব্যান্ডেজ করে দিচ্ছে একটা ডক্টর। মেহরিন দৌড়ে কাছে আসলো। অস্থির গলায় জিজ্ঞেস করলো-
“ হাতে কি হয়েছে আপনার? ”
আকস্মিক মেহরিন কে দেখে চমকে উঠলো। আপাদমস্তক তাকালো। মুখে নিকাব নেই। বাহিরে যে মিডিয়া আছে। ওদের নজরে আসে নি তো?
সোলেমান ডক্টর কে চলে যেতে বলল। ডক্টর চলে যেতেই সোলেমান মেহরিন কে টেনে বসিয়ে বলল-
“ শান্ত হও। ঠিক আছি আমি। আমার কিচ্ছু হয় নি। নিকাব কোথায় মুখে? ”
মেহরিন কাঁদতে লাগলো। নওগাঁ থেকে মোতালেব ভুঁইয়া, আনোয়ার সুলতান,আমিরুল সুলতান, রুমাইসা রওনা হয়েছে।
“ নিকাব বাঁধার মতো অবস্থায় ছিলাম না। আপনার আর কোথাও চোট লাগে নি তো? ”
মেহরিন শরীর চেক করতে লাগলো সোলেমানের। সোলেমান মেহরিন কে এবার বুকের সাথে জড়িয়ে ধরলো।
“ শান্ত হও। আর কোথাও চোট লাগে নি । ঠিক আছি আমি। ”
মেহরিন চেষ্টা করলো কান্না থামানোর। তারপর মনে পড়লো এজওয়ানের কথা। এজওয়ান ভাইয়ার যে গুলি লেগেছে দেখলো। উনি কেমন আছে?
মেহরিন চোখ মুখ মুছে বলল-
“ এজওয়ান ভাইয়ার দেখলাম গুলি লেগেছে। উনি ঠিক আছে? সুস্থ আছে তো? ”
“ অপারেশন চলছে। শেষ হয় নি। ”
ইব্রাহিম আসলো কেবিনে। সোলেমানের দিকে তাকিয়ে বলল-
“ অপারেশন হয়ে গেছে এজওয়ানের । ”
সোলেমান বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বলল-
“ কি বললো? অপারেশন সাকসেসফুলি হয়েছে ? কোনো ভয় নেই তো আর? ”
“ অপারেশন সাকসেসফুলি হয়েছে। কিন্তু…
“ কিন্তু কি? ”
“ ১ ঘন্টার মধ্যে সেন্স না ফিরলে। হয়তো কোমায় চলে যাবে। ”
সোলেমান কেবিন থেকে বের হয়ে গেলো। চাচার কাছে দাঁড়াতেই চাচা কেঁদে উঠলো।
“ এজওয়ান রে ডাকলাম,পোলা আমার ডাক শুনলো না সোলেমান। আমার পোলার এই অবস্থা সহ্য করতে পারতেছি না বাপ। এমন নিস্তব্ধ হয়ে থাকার মতো ছেলে তো এজওয়ান না। একটু তুই বল না চোখ মেলে তাকাতে। তোর সব কথা তো শুনে। ওর কথা বলতে হইবো না। খালি তাকাক। ”
সোলেমান কেবিনে ঢুকলো এজওয়ানের। মুখে অক্সিজেন মাস্ক লাগানো। সোলেমান গিয়ে পাশে বসলো। মেহরিন বাহিরে চাচার পাশে। সোলেমান এজওয়ানের হাতের উপর হাত রেখে বলল-
“ চাচা কিন্তু কাঁদছে এজওয়ান। এই বয়সে ছেলের জন্য কাঁদে কোনো বাবা? তাড়াতাড়ি ওঠ ভাই আমার। আমাদের কষ্ট না তুই সহ্য করতে পারিস না? এই যে বলছি কষ্ট হচ্ছে। কানে যাচ্ছে না সেসব আর্জি? ভালোয় ভালোয় উঠবি কি না বল? উঠবি তো? ”
এজওয়ানের হাতের ভাজে চুমু খেলো সোলেমান। আমিরুল সুলতান,রুমাইসা,মোতালেব ভুঁইয়া রা চলে এসেছে। রুমাইসা এসে থেকেই কাঁদছে ভাইয়ের এই অবস্থা শুনে। আমিরুল সুলতান বাশার সুলতান কে সামলিয়ে খেয়াল করলো মাহি কে দেখতে পাচ্ছে না।
“ মাহি কোথায়? ”
আমিরুল সুলতানের কথায় সবার মাথার টনক নড়ে। আসলেই তো মাহি কোথায়? এত বড় ঘটনা ঘটে গেলো। নওগাঁ থেকে তারা আসলো। মাহি কোথায়?
মেহরিন বলল-
“ মাহি আপু তো সকালে উনার বোনের বাসায় গিয়েছে। বোনের বাসা তো বেশি দূরে না। উনার কানে তো এতক্ষণে পৌঁছে যাওয়ার কথা এই খবরটা। ”
রুমাইসা আর আনোয়ার সুলতান গিয়ে এজওয়ানের সাথে নিজেদের মতে করে কথা বলে আসলো। হয়তো এজওয়ানের কানে গিয়েছে সেসব কথা। হয়তো যায় নি।
মাহি রমনায় গিয়েছিল প্রথমে। সেখান থেকে জানলো আহত নিহত সবাই কে ঢাকা মেডিকেল হসপিটালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। মাহি রিকশায় করে হসপিটালে আসলো। রিসিপশনে জিজ্ঞেস করলো সাফওয়ান মির্জা কত নম্বর ওয়ার্ডে এডমিট আছে। তারা চেক করে জানালো এই নামে কেউ ভর্তি নেই। অনেক অজানা লোক আছে আহত নিহত দের ভেতর যাদের আইডেন্টিটি পাওয়া যায় নি। তাই সংরক্ষণ ও করা হয় নি। নিজ দায়িত্বে খুঁজতে হবে মাহি কে।
মাহি গ্রাউন্ড ফ্লোর থেকে শুরু করলো। প্রতিটি কেবিন চেক করে দেখছে সে। তারপর মনে পড়লো গুলি লেগেছে। তাহলে তো জরুরি বিভাগে নিবে। মাহি সেদিক টায় ছুটলো।
সাফওয়ান শুনেছে এজওয়ানের অপারেশন টা সাকসেসফুলি হয়েছে। কিন্তু জ্ঞান ফিরে নি। এ-ও শুনেছে এক ঘন্টার ভেতর জ্ঞান না ফিরলে ধরে নিতে হবে সে কোমায় চলে গেছে।
নিজেকে ভীষণ অপরাধী লাগছে সাফওয়ানের। তার কারনে কারো এমন অবস্থা হোক সেটা সে কখনও চাই নি। আর সেটাই হলো। এজওয়ানের সাথে দেখা করার জন্য ব্যুরো থেকে হসপিটালে আসলো। রিসিপশনে জিজ্ঞেস করে দু তলায় আসলো। করিডরে দেখলো এজওয়ানের আত্মীয় স্বজন দের দাঁড়িয়ে থাকতে। এগিয়ে গেলো। জিজ্ঞেস করলো-
“ এজওয়ানের জ্ঞান ফিরেছে? ”
সবাই মাথা তুলে তাকালো। বাশার সুলতানের পছন্দ না এই সাফওয়ান কে। এই ছেলের জন্যই তার ছেলের জীবনে এত অশান্তি।
ইব্রাহিম বলল-
“ জ্ঞান ফিরে নি। ডক্টর আছে ভেতরে। ”
সাফওয়ান ট্রান্সপারেন্ট গ্লাস দিয়ে একবার দেখলো এজওয়ান কে। তারপর দাঁড়িয়ে রইলো।
মাহি দিকবিদিকশুন্য হয়ে ছুটে আসছিলো আশেপাশে তাকাতে তাকাতে। আকস্মিক মোড় ঘুরে যাওয়ার সময় সাফওয়ান কে দেখছে ভেবে দাঁড়িয়ে গেলো, ভ্রম নাকি? মাথা ঘুড়িয়ে দেখলো সত্যি সাফওয়ান দাঁড়িয়ে আছে। পড়নের শার্ট টা র’ক্তে ভিজে আছে।
মাথাতে একবারও আসলো না। সাফওয়ানের না গুলি লেগেছিল? তাহলে সুস্থ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে কি করে?
মাহির মাথায় আসলো এটা- সাফওয়ান সুস্থ আছে।
সাথে সাথে দৌড়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরলো। কাঁদতে কাঁদতে বলল-
“ থ্যাংক গড তুমি ঠিক আছো। আমি তো পাগল হয়ে গেছিলাম যখন খবরে দেখলাম কেউ তোমার দিকে বন্দুক তাক করেছিল। আল্লাহর কাছে লাখ লাখ শুকরিয়া তুমি ঠিক আছো। ”
পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সবাই অবাক বিস্ময় চোখে তাকিয়ে দেখছে মাহি কে। ভেতরে তার স্বামী জীবন-মরণের মাঝখানে। আর মাহি পরপুরুষ কে জড়িয়ে ধরে কাঁদছে!
তখনই কেবিনের দরজা ঠেলে বেরিয়ে আসলো ডক্টর। বেডে শুয়ে থাকা এজওয়ান পিটপিট করে চেয়েছিলো একবার। তারপর ট্রান্সপারেন্ট গ্লাসের দিকে তাকাতেই তার বুকের ভেতরটা দুমড়ে মুচড়ে উঠেছিল । চোখ মেলে তাকানোর সাথে সাথে এমন দৃশ্য যে এজওয়ান দেখতে পাবে তা কখনো ভাবে নি । এই কান্না টা না এজওয়ান তার নামে করে নিয়েছিল? সেখানেও ভাগ বসিয়ে দিলো সাফওয়ান! তরিকুলের বেটির এই কান্না টা কি সুখের? সাফওয়ান বেঁচে আছে সেজন্য? নাকি দুঃখের? যে এজওয়ান পুরোপুরি মরলো না সেজন্য? অক্সিজেন মাক্স মুখে থাকার পরও এজওয়ানের মনে হলো তার অক্সিজেনের সংকট হচ্ছে। বুকের আঘাতের ব্যথার থেকেও ভেতরের ব্যথা টা যেন তীব্র হলো। শালার এত অসহায় জীবন তার! এজওয়ানের শরীর থেকে যতবার র’ক্ত ঝড়েছে,তা শুধুমাত্র তার তরিকুলের বেটির জন্য। এই তো দেড় বছর আগে তরিকুলের বেটি কে বাঁচাতে গিয়ে ছু’রির আঘাত খেলো। তরিকুলের বেটির জন্য সাফওয়ান জেলে পিটালো। আর আজ ও তরিকুলের বেটির ভালোবাসা কে বাঁচাতে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হলো। অথচ একবার ও তরিকুলের বেটির চোখমুখে এজওয়ান তার নিজের জন্য একটু খারাপ লাগা বোধ টুকুও দেখলো না!
ডক্টর কে দেখে মাহি সাফওয়ান কে ছেড়ে দিলো। আশেপাশে তাকাতেই শ্বশুর বাড়ির সবাকেই দেখে হকচকিয়ে গেলো। সবাই বিস্ময়কর চাহনি নিয়ে তাকিয়ে আছে। সোলেমান এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করলো-
“ এজওয়ান কেমন আছে এখন? জ্ঞান ফিরেছে? ”
মাহির কানে বাজতে লাগলো- এজওয়ান কেমন আছে? জ্ঞান ফিরেছে? মানে টা কি? এজওয়ানের কি হয়েছে?
মাহি ট্রান্সপারেন্ট গ্লাস দিয়ে তাকালো। দেখতে পেলো বেডে শুয়ে আছে একটা পুরুষালি দেহ। অক্সিজেন মাক্স মুখে থাকায় পুরো মুখটা দেখা যাচ্ছে না। মাহি প্রশ্নাতীত চাহনি নিয়ে সাফওয়ানের দিকে তাকালো। তার চোখের ভাষা জিজ্ঞেস করছে- ওটা সত্যি এজওয়ান!
সাফওয়ান চোখে হ্যাঁ সূচক সম্মতি প্রকাশ করলো। মাহির বিশ্বাস হচ্ছে না ওটা এজওয়ান। তার মাথা তে একবারের জন্যও আসলো না ওখানে তো এজওয়ান ও ছিলো!
মাহি কেমন একটা থতমত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলো-
“ কি করে হলো? ”
সাফওয়ান মাথা নত করে বলল-
“ আমাকে বাঁচাতে গিয়ে। ”
কথাটা কেমন বিঁধলো কানে মাহির। সাফওয়ান কে বাঁচাতে গিয়ে এজওয়ানের এই অবস্থা! এজওয়ান না সাফওয়ান কে সহ্য করতে পারে না? তাহলে?
মাহি ডক্টরের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো।
“ দেখা করা যাবে? আমি দেখা করতে চাই ডক্টর এজওয়ানের সাথে। ”
ডক্টর চুপ। বাশার সুলতান ডক্টরের দিকে তাকিয়ে বলল-
“ এই চুপ কেনো আপনি? আমার পুলা কেমন আছে? জ্ঞান ফিরছে? কথা কন না কেনো? ”
মাহির কেমন যেন লাগলো। ডক্টরকে আবার প্রশ্ন করলো-
“ চুপ কেনো আপনি? আমি দেখা করবো উনার সাথে। আপনি সরুন সামনে থেকে। ”
মাহি কেবিনের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতে চাইলে ডক্টর বলল-
“ দুঃখিত মিসেস সুলতান, আপনি দেখা করতে পারবেন না আপনার স্বামীর সাথে। ”
মাহির হাত পা দুটোই থেমে গেলো। পিছু ফিরে বলল-
“ দেখা করতে পারবো না মানে? ”
“ He has gone into a coma. ”
বাশার সুলতান কথাটা শুনতেই ভারসাম্য হারিয়ে পড়ে যেতে নিলে আমিরুল সুলতান ধরে ফেলে ভাইকে। রুমাইসা শব্দ করে কেঁদে উঠে। মাহি কে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে বাশার সুলতান কেবিনের ভেতর প্রবেশ করে। মাহির কানে শুধু একটাই শব্দ বাজছে,এজওয়ান কোমায় চলে গেছে! মানতে পারছে না। এজওয়ান কোমায় যাবে! এজওয়ানের মতো পাঁজি লোক কোমায় যায় কি করে? মাহি তাকালো সেই গ্লাস পার্টিশন দিয়ে। বাশার সুলতান কাঁদছে। রুমাইসা কাঁদছে। মেহরিনের জলে ভরা চোখ। আনোয়ার সুলতান পায়ের কাছটায় বসা। সোলেমান ঠাই দাঁড়ানো। মাহির চোখে জল নেই! ফুরিয়ে গেছে সব জল! একটু আগেই না জল ছিলো এই চোখে? এখন নাই!
দাহশয্যা পর্ব ৮৩
বেচারা এজওয়ানের জন্য চোখে জল নেই মাহির। এজওয়ান এখন সামনে থাকলে বলতো কান্না আসছে না আমার জন্য? গ্লিসারিন নিয়ে আসি? একটু কাঁদো আমার জন্য। দেখি না এজওয়ানের জন্য কাঁদলে আমার তরিকুলের বেটি কে কেমন লাগে। সুন্দর ই লাগবে দেখে নিও।
