Home দাহশয্যা দাহশয্যা পর্ব ৯৭

দাহশয্যা পর্ব ৯৭

দাহশয্যা পর্ব ৯৭
Raiha Zubair Ripti

হাসপাতালের কেবিনে তখন গভীর রাত। বাশার সুলতানের মুখে ব্যথার ছাপ স্পষ্ট। কোমরে শক্ত বেল্ট পরানো, হাতে স্যালাইন ঝুলছে। তবুও চোখ মুখে আগুন। কেবিনের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল সোলেমান।
“চাচা… এখন কেমন লাগতেছে?”
বাশার সুলতান চোখ মেলে তাকালো। দাঁত চেপে বললো,
“ব্যথা কমে নাই। কিন্তু ওই তিনডারে যদি একবার সামনে পাই। তাইলে ব্যথাও ভুলে যামু।”
সোলেমান চেয়ার টেনে তার পাশে বসল।
“যারা তোমাকে মেরেছে, যদি সামনে আনতে পারি… চিনতে পারবে? ওখানে কোনো সিসিটিভি নেই। চেহারা শনাক্ত করতে হবে তোমায়। পারবে? ”
বাশার সুলতান দাঁত চেপে বললেন,

“ চোখ বাঁইধা রাখলেও চিনমু। একশো জনের ভিড়েও চিনমু। ওই তিনডার মুখ আমি মরার আগ পর্যন্ত ভুলমু না।”
সোলেমানের ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি ফুটল।
“এই কথাটাই দরকার ছিল। এখন চলো।”
“কই?”
“ গেলেই দেখতে পারবা। উঠো। ”
সোলেমান ধরে উঠাতে চায়। বাশার সুলতান ব্যথায় চিৎকার করে উঠে।
“ ওরে আল্লাহ রে! ব্যথা পাইতাছি তো। ছাড় আমারে। ”
সোলেমান সোজা হলো।
“ যেতে পারবা না তাইলে? ওদের যে ধরে আনছি। ”
বাশার সুলতানের মুখের উপর থেকে ব্যথার ছাপ সরে গেলো। নিজ থেকেই উঠার চেষ্টা করে বলল,
“ কি কইলি তুই! ধরে আনছস! সত্য? ”
“ হু। ”

বাশার সুলতান নিজেই খোঁড়াতে খোঁড়াতে হাঁটা ধরলো। সোলেমান তিক্ত শ্বাস ফেলে বিরবির করলো,নাটকবাজ একটা।
রাত প্রায় দুইটা। শহরের এক পুরোনো গুদামঘরের সামনে একটি কালো প্রাইভেট কার এসে থামল।বাশার সুলতানকে ধীরে ধীরে নামিয়ে ভেতরে নিয়ে যাওয়া হলো। ঘরের মাঝখানে তিনজন যুবক মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে। তাদের দেখেই বাশার সুলতানের চোখ লাল হয়ে উঠল। তিনি কাঁপা আঙুল তুলে বললেন,
“এই তিনডা… এই শয়তানগুলা আমারে মারছে!”
“ তুমি নিশ্চিত?”
“একশো ভাগ।”
সোলেমান ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে এলো। একজন মাথা নিচু রেখেই বলল,
“ভুল হইছে…”
সোলেমান গর্জে উঠলো। চুলের মুঠি ধরে বলল,
“ভুল না! অন্যায় করেছিস! আমার চাচার গায়ে হাত দিছস৷ কতবড় কলিজা তোদের ভাবা যায়! চাচা, পাঁচ মিনিটের জন্য বাহিরে যাও৷ ”
বাশার সুলতানের ভ্রু কুঁচকে আসলো,

“ কেনো? ”
“ ওদের কলিজাটা বের করে মাপবো। দেখবো কতবড় হয়েছে। তোমার শরীর এমনিই অসুস্থ নিতে পারবা না সামনে থেকে এসব। যাও বাহিরে যাও। ”
বাশার সুলতান কে বাহিরে নিয়ে যাওয়া হলো। দরজাটা ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে গেল। কয়েক সেকেন্ড নীরবতা। তারপর হঠাৎ বক্সের স্পিকার কেঁপে উঠল Le… Le… Le… Maza Le… গানে। পুরো গুদামঘরে তুমুল শব্দে গান বাজতে শুরু করল।
বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা বাশার সুলতান ভ্রু কুঁচকে বললেন,
“এইডা আবার কী? ভেতরে কী হইতাছে? গান বাজে কেন? ”
ইয়াসিন বিরক্ত হয়ে বলল,
“ কলিজা মাপতেছে ভাইয়ে। বুঝেন না? খালি নাটক করেন। ”
বাশার সুলতান বিরক্ত হলো ইয়াসিন কে দেখে।
“ দাঁড়া তোরটাও মাপানোর ব্যবস্থা করাচ্ছি। ”
“ আমার হে’ডা ডাও মাপানোর চেষ্টা কইরেন। ”

ইয়াসিন সরে গেলো।
রুমের ভেতরে সোলেমান চেয়ারের উপরে বসে ছেলে তিনজন কে নিয়ে বার্গার আর কোকাকোলা খাচ্ছে। খাওয়া দাওয়া শেষে সোলেমান পকেট থেকে হাজার টাকার অনেকগুলো নোট বের করে ওদের পকেটে গুঁজে দিলো। তারপর নিজ হাতে তাদের চোখ মুখে মেক-আপ করে দিলো। যাতে দেখতে মনে হয় মুখে মারা হয়েছে। তারপর হাত পায়ে গিড়ায়, কনুইতে ব্যান্ডেজ লাগিয়ে তার উপর লাল রং দেয়। যাতে দেখে রিয়েলিস্ট লাগে৷ সব শেষে সোলেমান তাদের বলল,
“ ঠিকমতো অ্যাক্টিং করতে পারবি তো? ”
“ একশো,একশো। ”
“ ক’টা দিন জেলে থাকবি এসির নিচে। তিন বেলা কাচ্চি, ঠান্ডা,সিগারেট পাবি৷ চলবে না? ”
“ চলবে,চলবে একশোবার চলবে। ”
সোলেমান শরীরে পানি ছিটিয়ে নিলো। দেখে যেন মনে হয় মারতে মারতে ঘেমে গেসে। খুব রাগী ভয়ংকর একটা ভাব নিয়ে দরজা খুলে দিলো। শার্ট এলোমেলো, কপালে ঘাম, বাশার সুলতান উঁকি দিয়ে দেখলো ছেলে তিনটা ব্যথার চোটে ছটফট করে চিৎকার করছে৷ কিন্তু ব্যান্ডেজ দেখে বলল,

“ ব্যান্ডেজ করসে কে? ”
“ আমি? পুলিশ নিয়ে যাবে এখন৷ হাত পা কাটাছেঁড়া দেখলে বাজে দেখাবে। তাই ব্যান্ডেজ করে দিছি। ”
দুইজন পুলিশ সদস্য এগিয়ে এসে তিনজনকে হেফাজতে নিল। সোলেমান চাচার দিকে তাকিয়ে বলল,
“চাচা, এবার নিশ্চিন্তে চিকিৎসা করাও। বাকিটা আইন দেখুক।”
বাশার সুলতান কে আবার হসপিটালে দিয়ে নিবাসে আসলো। ফ্রেশ হয়ে পাতলা টি-শার্ট পরে নিচে নামে খাবার খেতে। শফিক এসে খাবার দিয়ে যায়। সোলেমান খাবারটা ধীর গতিতে খেয়ে পানি খেয়ে হাত ধুয়ে উঠে রুমে চলে আসে৷ বিছানায় বসে কিছুক্ষণ ঝিমোয়। কেমন শরীরে কাঁপুনি দিচ্ছে একটা। অস্বস্তি হচ্ছে ভীষণ, ঘুমঘুম পাচ্ছে। সোলেমান ওভাবেই বিছানায় শুতেই ঘুমিয়ে যায়।
তিন ঘন্টা পর একটা মেসেজের শব্দে তার ঘুম ভাঙে৷ ঘুমঘুম চোখে বিছানা হাতরে ফোনটা খুঁজে মেসেজটা দেখতেই পায়ের রক্ত মাথায় উঠে আসে৷ ফোনটা শক্ত করে ধরে রুমের বাহিরে আসে। বসার ঘরে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে চাচাকে ডেকে বলে,

“ চাচা,চাচা! কোথায় তুমি? আমার একাউন্টে এতগুলো টাকা আসলো কোথা থেকে? ”
সোলেমানের ডাক শুনে শফিক বেরিয়ে আসে। সোলেমান তাকে দেখে বলে,
“ চাচাকে ডেকে আন। ”
শফিক সোলেমানের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে৷ সোলেমান সেটা দেখে বিরক্ত গলায় বল,
“ চেয়ে থাকতে বলছি আমি তোকে? যা বলছি তাড়াতাড়ি কর। ”
শফিক ধাতস্থ হয়ে বলল,
“ বড় সাহেব তো হাসপাতালে। আপনি ভুলে গেছেন? ”
সোলেমান ভ্রু কুঁচকালো।
“ চাচা হাসপাতালে! ”
“ হ্যাঁ। আপনি তো সারা রাত ওখানেই ছিলেন। সকালে আসলেন। তারপর খাবার খেয়ে ঘুমাইলেন। ভুলে গেছেন সব? ”
সোলেমান কপাল স্লাইড করতে লাগলো বৃদ্ধা আঙুল দিয়ে। তার মনে পরলো। কি আশ্চর্য সে ভুলে গেলো কি করে কথাটা!

পরন্ত বিকেলের নরম আলো জানালার কাঁচ ভেদ করে এজওয়ানের স্টাডি রুমে ছড়িয়ে পড়েছে। টেবিলজুড়ে ছড়িয়ে আছে কয়েকটি পুরোনো ফাইল, কিছু নথি আর হাতে লেখা নোট। একেকটা কাগজ উল্টে-পাল্টে দেখছিল সে, যেন কোনো অমিল খুঁজে বের করার চেষ্টা করছে।
ঠিক তখনই টেবিলের ওপর রাখা ফোনটা কেঁপে উঠল।
স্ক্রিনে ভেসে উঠল সোলেমানের নম্বর। এজওয়ান কল রিসিভ করে ফোনটা কানে তুলল। কুশল বিনিময়ের পর এজওয়ান আর সময় নষ্ট করল না।
“আব্বার ব্যাপারে… যারা জড়িত ছিল, তাদের কিছু করতে পেরেছ?”
ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা। তারপর সোলেমানের শান্ত গলা ভেসে এল,
“পেরেছি। সবাই এখন ভেতরে আছে। আপাতত কোথাও যাওয়ার সুযোগ নেই।”
এজওয়ান ধীরে মাথা নেড়ে শুধু বলল,

“আচ্ছা…”
কথাটা বললেও তার কণ্ঠে স্বস্তির চেয়ে চিন্তাই বেশি ছিল।হঠাৎ যেন একটা কথা মনে পড়তেই সে নিচু স্বরে বলল,
“ভাইজান… একটা কথা বলব?”
“বল।”
“তোমার… কখনো আমার ওপর রাগ হয় না?”
ওপাশ থেকে হালকা হাসির শব্দ ভেসে এল।
“হঠাৎ এই প্রশ্ন?”
“এমনিই। জানতে ইচ্ছে হলো।”
সোলেমান কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর খুব ধীরে বলল,
“ আমার প্রথম সন্তান কারা ছিলো জানিস? তুই আর রুমাইসা। তোদের আমি নিজের সন্তানের মতো ভালোবেসেছি। সেভাবে আগলে রাখার চেষ্টা করেছি৷ দুজন কে তো হারিয়েই ফেললাম। এখন হারাতে হারাতে কেবল আছিস তুই৷ ”

“ আমি জানি ভাইজান,আমাকে তুমি অনেক ভালোবাসো। আমার জন্য তুমি যা করেছো সেটা কোনোদিন শোধ করার নয়। সেজন্য… ”
“ সেজন্য বলছি,আগুন নিয়ে খেলিস না৷ এখনই থেমে যা। আগুন দূর থেকে সুন্দর লাগে, এজওয়ান। খুব কাছে গেলে সেটা আর আলো দেয় না। পুড়িয়ে দেয়।”
এজওয়ান ভ্রু কুঁচকে বলল,
“আমি বুঝতে পারছি না।”
“ আমি কি বলেছি সেটা তুই ঠিকই বুঝেছিস। শুধু বুঝতে না পারার অভিনয় করছিস।”
আবারও নীরবতা। এজওয়ান ধীরে ধীরে বলল,
“তুমি কি আমাকে সাবধান করছো?”
“ করছি। কারন এখন যে দরজাটার সামনে তুই দাঁড়িয়ে আছিস। সেটা যদি একবার খুলে যায়, তখন আর কেউ সেটা বন্ধ করতে পারবে না। এমনকি তুইও না। তোকে আমি আর বাঁচাতে পারবো না। ”

“ তুমি এত নিশ্চিত কীভাবে?”
“কারণ এই খেলাটার সমাপ্ত আমি আগেই দেখে নিয়েছি।”
“তাহলে আমাকে শুরুতেই আটকাওনি কেন?”
সোলেমান দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
“ভাবছিলাম, তুই বুদ্ধিমান। নিজেই ফিরে আসবি।”
“আর যদি না আসি?”
“তাহলে আমার হাতে আর কিছু থাকবে না। শুধু আফসোস ছাড়া।”
এজওয়ান ধীরে ধীরে চোখ বন্ধ করল।
“অনেক দেরি হয়ে গেছে, ভাইজান। ফিরে আসার পথ নেই। যাই হোক শোনো,অন্যের জন্য আর নিজের জীবনটা বিলিয়ে দিও না৷ আমার মতো স্বার্থপর হও। ”
সোলেমান হাসে,

“ এখানেই তো তোর আর আমার মাঝে বিশাল একটা তফাৎ। স্বার্থপর হতে পারি না। হতে পারলে আজকের এজওয়ান সুলতান কবেই হারিয়ে যেত সময়ের গহ্বরে। আমি আছি তোদের সব ঝড়-ঝাপটা নিজের উপর দিয়ে বয়ে নেওয়ার জন্য৷ তবে নিজের পতন নিজে ডেকে আনিস না। মানতে পারবো না। কিছু জিনিস গোপন আছে,গোপন থাকতে দে৷ সম্মুখে আনার চেষ্টা করিস না৷ রাখছি। ”
সোলেমান ফোন কেটে দিলো। এজওয়ান কিছুক্ষণ থম মেরে বসে থেকে আবার কাজে মনোযোগ দিলো। মাহি এসে পাশে বসতেই এজওয়ান কাজ থামিয়ে দিয়ে বলল,
“ এখানে কি তোমার? কি চাই? ”
মাহি চমকালো একথা শুনে।
“ এখানে কি! কি চাই মানে! আমার আসা বারন? এখানে আসতে হলে আমার অনুমতি নিয়ে আসতে হবে? ”
“ ইয়েস, অনুমতি নিতে হবে। রুমে ঢুকার আগে নক করে আসতে হয়৷ জানো না সেটা? ম্যানার্স শিখো নি? ”
মাহির রাগ হলো এমন কথা শুনে।

“ ভেবে বলছেন তো কথা গুলো? আমাকে আপনার কাছে আসতে হলে নক করে আসতে হবে? ”
“ হ্যাঁ। ”
“ আমি তাহলে কে? কি হই আমি আপনার? আমাদের সম্পর্ক টা আসলে কি যে তারজন্য নক করে আসতে হবে? ”
“ তুমিই ভালো জানো সেটা। ”
“ না জানি না। আপনি জানান আমাকে। ”
“ তুমি আমার কে,সেটা জানো না? সিরিয়াসলি? ওকেই, মাই প্রিটি গার্ল। লিসেন কেয়ারফুলি, ইয়্যু আর মাই ওয়ানলি ফা’কিং বেড পার্টনার সুইটহার্ট। আর এজওয়ান সুলতানের বেড পার্টনার হওয়া কিন্তু চাট্টিখানি কথা না। যে কেউ হতে পারে না। তুমি লাকি গার্ল বলেই হতে পেরেছো। তাও হালাল ভাবে,সসম্মানের সাথে বৈধতা নিয়ে। আর তুমি কি না সেখানে শুকরিয়া আদায় না করে বিয়ের দু বছর পর আজ গাল ফুলিয়ে জানতে চাইছো তোমার আমার এগজ্যাক্ট সম্পর্কটা কি! হাউ ইডিয়টিক গার্ল ইয়্যু তরিকুলের বেটি। ”
মাহি এজওয়ানের কল্লাটা চেপে ধরে বলল,
“ জানোয়ার আমি তোর বেড পার্টনার? ”
“ তা নয়তো কি? লাইফ পার্টনার? ”
“ তা নয় তো কি? ”
“ ওরে শালি তুই কি আমারে মনে প্রানে জামাই মানস? মানস না তো। তাইলে কেন তোরে আমি লাইফ পার্টনার বলবো? তুই শুধুই আমার বেড পার্টনার জান্স। উই আর খ্রাপ মার্কা জুটি। ”

এক্সামের দিন ভোরে মোতালেব ভুঁইয়া ফজরের নামাজ পড়ে মোনাজাতে মেয়ের জন্য প্রার্থনা করলেন৷ তার মেয়ের সব স্বপ্ন যেন পূরণ হয়। আজকের পরীক্ষা টা যেন খুব ভালে হয়। এক্সাম হল থেকে তার মেয়ের যখন বের হবে মোতালেব ভুঁইয়া যেন মেয়ের মুখে হাসি দেখতে পান। তার মেয়ে যেন আজীবন দুধে ভাতে থাকে। আর কোনো দুঃখ যেন তার আদরের মেয়েটাকে না ছুঁতে পারে। মেয়েটা তার যে দুঃখে অভ্যস্ত নয়৷ মোতালেব ভুঁইয়া আজীবন যে তাকে সুখে অভ্যস্ত হওয়া শিখিয়েছে। লম্বা এক মোনাজাত শেষে তিনি উঠলেন জায়নামাজ ছেড়ে। একটা কলা আর পাউরুটি খেয়ে বেরিয়ে গেলেন ঢাকার উদ্দেশ্যে।
তানভীর দের বাসায় আজ ইমন এসেছে। মেহরিন সকালে ফজরের নামাজ পড়ে বাবার সাথে একদফা কথা বলে তারপর সকল পড়া আবার রিভিশন দিচ্ছিলো। ইমন এসেছে শুনে,বই খাতা বন্ধ করে ওড়না টেনে বসার ঘরে এসে সালাম দিলো। ইমন নত মাথায় সালামের জবাব দিয়ে জিজ্ঞেস করলো,

“ প্রিপারেশন কেমন মেহরিন? ”
“ জি ভাইয়া ভালো। ” মেহরিন বসলো সোফায়৷ খবর পেয়েছে ঊর্মির ছেলেটার নাকি শরীর খারাপ৷ ইমন সেখানেই ছিলো৷ তার বাবা কেন যে ইমন ভাইকে বিরক্ত করলো। মেহরিন একাই চলে যেত। এতদিন ধরে থাকছে এখানে। রাস্তাঘাট তো চেনাই। “ ইমন ভাই,আপনি আব্বু কে মানা করে দিলেও পারতেন। এমনিই ঊর্মির ছেলেটার শরীর অসুস্থ। তার কাছে থাকা উচিৎ ছিলো। ”
ইমন পানির গ্লাসে চুমুক দিয়ে বলল,
“ ইহরামের কাছে মা আছে৷ আর চাচার পক্ষে সম্ভব নয় বলেই আমাকে বলেছে৷ আশা নিয়েই বলেছে যে ইমন না করবে না। সেখানে না করে চাচাকে দুশ্চিন্তায় ফেলি কি করে বলো? বিশ্বাস করো আমার সমস্যা হচ্ছে না৷ আজ কাজও ছিলো না তেমন। তুমি বরং রেডি হয়ে এসো। ”

“ জি। ”
মেহরিন রেডি হয়ে বের হলো। তানভীর, তানজিলা বেগম খুব দোয়া দিলো। বাতাসি জড়িয়ে ধরে বলল,
“ দেখো তুমি ঠিক চান্স পাবা। তোমার পরিশ্রম বিফলে যাবে না। ”
অনেক মাস পর আজ তেহরান ফোন করলো মেহরিন কে। পরীক্ষার জন্য শুভকামনা জানালো। তেহরান আগের মতো স্বাভাবিক জীবনে ফিরেছে৷ তবে সে দেশে আসবে না আর। ব্লগিং ছেড়ে দিয়েছে। নিজের মতো একাকী থাকছে৷ তানজিলা বেগম অবশ্য ঘাটায় না ছেলে কে৷ ছেলে তার সুস্থ স্বাভাবিক হয়েছে এতেই খুশি।
সবার দোয়া আর শুভকামনা নিয়ে তারা বাসে চড়ে পৌঁছে গেল পরীক্ষা কেন্দ্রে। বাস থেকে নামতেই মেহরিন একবার চারপাশে চোখ বুলিয়ে তাকালো। কিছু খুঁজলো? নাকি কাউকে খুঁজলো? ঠিক বোঝা গেল না। তারপর আল্লাহর নাম নিতে নিতে ভেতরে ঢুকে গেল।
মেহরিন কেন্দ্রে প্রবেশ করার কয়েক মিনিটের মধ্যেই ঢাকা মেডিকেল কলেজে এসে পৌঁছাল সোলেমান। নিজের স্ত্রীর ভর্তি পরীক্ষা, আর সে আসবে না,এটাও হয় নাকি?
দ্রুত পায়ে সে সোজা ডিনের অফিসের দিকে এগিয়ে গেল।
মেহরিনের এইচএসসি ফলাফল দেখার পর থেকেই তার আত্মবিশ্বাসে সূক্ষ্ম একটা ফাটল ধরেছে। জিপিএ–৫ নেই। ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতিও ঠিক কতটা হয়েছে, সে জানে না। যদি এবারও মেহরিন ব্যর্থ হয়? যদি আবারও তার মুখের হাসিটা মুছে যায়? সেই আশঙ্কাই তাকে এই সিদ্ধান্তে নিয়ে এসেছে। অফিসে ঢুকেই সে হাতে থাকা ভারী ব্যাগটি ডিন অধ্যাপকের টেবিলের ওপর রাখল। চেইন খুলতেই পরপর সাজানো টাকার বান্ডিল চোখে পড়ল।

“এই ব্যাগে বিশ লাখ টাকা আছে। আমার স্ত্রীর জন্য একটা মেডিকেল সিট আমি কিনে নিতে চাই। সে যত নম্বরই পাক, পাস করুক কিংবা না-ই করুক,ফল প্রকাশের দিন তার নাম যেন প্রথম দশজনের মধ্যেই থাকে। ” ডিন অধ্যাপক কিছু বলতে নিলে সোলেমান তাকে থামিয়ে দিয়ে বলল, “ আইন, নিয়ম কিংবা নীতির গল্প শুনতে আমি আসিনি। এই দেশে এর আগেও টাকার বিনিময়ে অনেক কিছু হয়েছে, আজও হয়। প্রয়োজন হলে আরও টাকা দেব। তারপরও ঢাকা মেডিকেলে একটা সিট আমার স্ত্রীর জন্য লাগবে। ”
ডিন অধ্যাপক চশমাটা খুলে টেবিলের ওপর রাখলেন। কয়েক সেকেন্ড নীরবে বসে থেকে গভীর একটা নিঃশ্বাস ছাড়লেন। তাঁর দৃষ্টি একবার টাকার ব্যাগে, আরেকবার সামনে বসে থাকা সোলেমানের মুখে। সোলেমানও নিশ্চুপ। তার চোখে একফোঁটা দ্বিধা নেই। সে জানে টাকার কাছে শেষ পর্যন্ত সবাই নতি স্বীকার করে।
ডিন ধীর কণ্ঠে বললেন,

“আপনি জানেন, আপনি আমাকে কী করতে বলছেন?”
“খুব ভালো করেই জানি।”
“এটা ধরা পড়ে গেলে শুধু আমার চাকরি নয়, আমার পুরো ক্যারিয়ার শেষ হয়ে যাবে।”
সোলেমান ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি টেনে বলল,
“আপনার ক্যারিয়ার শেষ হওয়ার আগেই আমি আপনাকে এমন জায়গায় পৌঁছে দিতে পারি, যেখানে এই চাকরির প্রয়োজনই হবে না। আর আপনি নিশ্চয়ই জানেন, একজন এমপির অনুরোধ আর সাধারণ মানুষের অনুরোধ এক জিনিস নয়।”
কক্ষটা আবারও নিশ্চুপ হয়ে গেল। ডিন আঙুল দিয়ে টেবিলে ধীরে ধীরে টোকা দিতে লাগলেন। তাঁর মাথার ভেতর হিসাব চলতে লাগল। সামনে বিশ লাখ টাকা। প্রয়োজন হলে আরও দেবে বলেছে। অন্যদিকে একজন ক্ষমতাবান এমপির অনুরোধ না বলা কি সত্যিই এত সহজ?
কিছুক্ষণ পর তিনি চেয়ার ছেড়ে উঠে দরজার কাছে গিয়ে বাইরে তাকালেন। করিডোরে কেউ নেই। ফিরে এসে দরজাটা ভেতর থেকে আটকে দিলেন। নিজের চেয়ারে বসে নিচু স্বরে বললেন,
“ব্যাগটা এখানেই রেখে যান। বাকিটা আমি দেখছি।”
সোলেমানের ঠোঁটে সন্তুষ্টির হাসি ফুটে উঠল। সে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়িয়ে কোটের বোতাম লাগাতে লাগাতে বলল,

“আমি জানতাম, আপনি আমাকে নিরাশ করবেন না।”
কথা শেষ করে সে দরজার দিকে এগিয়ে গেল। দরজা খুলে বের হওয়ার ঠিক আগে থেমে পেছন ফিরে আরেকবার বলল,
“একটা কথা মনে রাখবেন, ডিন সাহেব। আমার স্ত্রী যেন কোনোভাবেই জানতে না পারে, তার জন্য আমি কী করেছি। ও বিশ্বাস করুক,সবটাই ওর মেধার অর্জন।”
এই বলে সোলেমান অফিস থেকে বেরিয়ে গেল। দরজা বন্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পুরো কক্ষে আবার নীরবতা নেমে এল।ডিন অধ্যাপক ধীরে ধীরে ব্যাগের চেইন খুললেন। নতুন নোটের গন্ধ চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল। কয়েক মুহূর্ত স্থির দৃষ্টিতে টাকার বান্ডিলগুলোর দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর আস্তে করে চোখ বন্ধ করলেন।

টানা চার দিন। এজওয়ান স্বাভাবিকভাবেই অফিসে যাওয়া-আসা করছিল। যেন কিছুই ঘটেনি। ড্যানিয়েল ক্রসের সঙ্গেও আগের মতোই কথা বলত, মাঝে মাঝে কফিও খেত। এমনকি দু-একবার নিজের কিছু অপারেশনের গল্পও ইচ্ছে করেই বলেছিল, যাতে ড্যানিয়েলের মনে সন্দেহ না জাগে। কিন্তু প্রতি রাতেই নিজের ব্যক্তিগত ল্যাবে বসে সে মাইক্রো-ট্র্যাকারের পাঠানো তথ্য বিশ্লেষণ করত। প্রথম তিন দিন তেমন কিছুই পাওয়া গেল না। ড্যানিয়েলের বাসা,অফিস,জিম একই রুটিন। কিন্তু চতুর্থ রাত। রাত ২টা ১৩ মিনিট। এজওয়ানের ফোনে হঠাৎ একটি নীরব নোটিফিকেশন ভেসে উঠল। Unknown Route Detected. সে সঙ্গে সঙ্গে অ্যাপ খুলল। সবুজ বিন্দুটি এবার সম্পূর্ণ ভিন্ন পথে এগোচ্ছে। ড্যানিয়েল শহরের বাইরে যাচ্ছে। এজওয়ান এক মুহূর্ত দেরি করল না। পেছনে গান টা ভরে হাঁটা ধরলে মাহি ডেকে উঠে,
“ কোথায় যাচ্ছেন? ”
“ তুমি যাবে? ”
“ হু। ”
” তাহলে দশ মিনিটের মধ্যে বের হও।”

কালো এসইউভিটি নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে ড্যানিয়েলের গাড়িকে অনুসরণ করতে লাগল এজওয়ান। শহরের আলো ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল। রাস্তার দুই পাশে শুধু শুকনো ঝোপঝাড় আর পাথুরে প্রান্তর। প্রায় এক ঘণ্টা পর ড্যানিয়েলের গাড়ি ঢুকে পড়ল বহু বছর আগে পরিত্যক্ত একটি খনিজ খনির এলাকায়। সরকারি নথিতে জায়গাটিকে বহু আগেই বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছিল। চারদিকে মরিচা ধরা লোহার কাঠামো। ভাঙা কনভেয়ার বেল্ট। ধসে পড়া ওয়্যারহাউস। ড্যানিয়েল গাড়ি থামিয়ে চারপাশে একবার তাকাল। তারপর একটি ছোট ধাতব দরজা খুলে ভূগর্ভে নেমে গেল। এজওয়ান দূর থেকে সব দেখছিল। মাহি ফিসফিস করে বলল,
“ওখানেই কি মনস্টার আছে?”
এজওয়ান মাথা নাড়ল।
“না। ড্যানিয়েলের মতো চুনোপুঁটি লোক কখনো আসল খেলোয়াড়ের সাক্ষাৎ পায় না। ”
এজওয়ান নিজের কব্জির ডিভাইসে কয়েকটি বোতাম চাপল। ড্যানিয়েলের ব্যাগে লাগানো মাইক্রো-ডিভাইস সঙ্গে সঙ্গে সক্রিয় হয়ে আশপাশের সব ওয়্যারলেস সিগন্যাল সংগ্রহ করতে শুরু করল। কয়েক সেকেন্ড পর স্ক্রিনে ভেসে উঠল একটি এনক্রিপ্টেড ডেটা ট্রান্সমিশন। এজওয়ানের চোখ চকচক করে উঠল।

“পেয়ে গেছি…”
মাহি অবাক হয়ে তাকাল।
“কী পেয়েছেন?”
এজওয়ান দ্রুত টাইপ করতে করতে বলল,
“মনস্টার নিজের অবস্থান কখনো কাউকে জানতে দেয় না। কিন্তু যার সঙ্গে যোগাযোগ করে, তার ডিভাইসের সঙ্গে কয়েক মিলিসেকেন্ডের জন্য সরাসরি এনক্রিপ্টেড হ্যান্ডশেক হয়। সেই হ্যান্ডশেকের টাইমিং আর সিগন্যালের শক্তি থেকেই আমি দূরত্ব বের করতে পারব।”
স্ক্রিনে একের পর এক সংখ্যার সারি বদলাতে লাগল। তারপর হঠাৎ একটি লাল বিন্দু জ্বলে উঠল। ড্যানিয়েলের অবস্থান থেকে প্রায় বারো কিলোমিটার দূরে। একটি পরিত্যক্ত সামরিক গবেষণা কেন্দ্র। যেটি সরকারি রেকর্ড অনুযায়ী দশ বছর আগে আগুনে পুড়ে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল।
এজওয়ান ধীরে ধীরে হাসল। সে সঙ্গে সঙ্গে গোয়েন্দা সংস্থার এনক্রিপ্টেড লাইনে কল করল।
“অ্যালফা টিম, ব্রাভো টিম এবং স্নাইপার ইউনিট প্রস্তুত করুন। কোনো সাইরেন নয়। কোনো হেলিকপ্টার নয়। রেডিও সাইলেন্স বজায় থাকবে। টার্গেট যেন বুঝতে না পারে আমরা আসছি।”

আজকের অভিযান কোনো সাধারণ অভিযান নয়। এজওয়ান মাথা থেকে পা পর্যন্ত কালো ট্যাকটিক্যাল কমব্যাট ইউনিফর্ম পরেছে। বুক ও পিঠে হালকা ওজনের বুলেট-রেজিস্ট্যান্ট প্লেট, তার ওপর কালো ট্যাকটিক্যাল ভেস্ট। ভেস্টজুড়ে সারি সারি ম্যাগাজিন পাউচ, মেডিক্যাল কিট, ফ্ল্যাশব্যাং, স্মোক গ্রেনেড এবং প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম নিখুঁতভাবে গুছিয়ে রাখা। দুই কাঁধে অস্ট্রেলিয়ার পতাকার ক্ষুদ্র প্যাচ, আর ভেস্টের বুকের ঠিক মাঝখানে সাদা অক্ষরে লেখা, ASIO
কনুই পর্যন্ত টেনে পরা কালো কেভলার গ্লাভস হাত দুটিকে পুরোপুরি ঢেকে রেখেছে। ডান উরুতে বিশেষ হোলস্টারে রাখা তার ব্যক্তিগত সাইডআর্ম। কোমরের পেছনে কমব্যাট নাইফ। হাঁটুতে কালো প্রটেকটিভ প্যাড। পায়ে ভারী ট্যাকটিক্যাল কমব্যাট বুট।

তার ডান কানে ছোট্ট এনক্রিপ্টেড কমিউনিকেশন ইয়ারপিস, আর বাঁ কব্জিতে নিজের তৈরি মাল্টি-ফাংশনাল স্মার্ট ডিভাইস। বাইরে থেকে দেখতে সাধারণ ঘড়ির মতো হলেও, এর ভেতরে ছিল লাইভ স্যাটেলাইট ট্র্যাকিং, থার্মাল স্ক্যান, এনক্রিপ্টেড কমিউনিকেশন এবং তার তৈরি বিশেষ ট্র্যাকিং সিস্টেম।
এজওয়ানের ঠিক পেছনেই দাঁড়িয়ে ছিল মাহি।
সেও কালো ট্যাকটিক্যাল ইউনিফর্ম পরে এসেছে। হালকা ওজনের বডি আর্মারের ওপর ট্যাকটিক্যাল ভেস্ট, কোমরে সাইডআর্ম, কাঁধে কমপ্যাক্ট অ্যাসল্ট রাইফেল।
তাদের চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকা বিশেষ অপারেশনস টিমের প্রতিটি সদস্যের পোশাকও প্রায় একই রকম। মাথায় ব্যালিস্টিক হেলমেট। চোখে নাইট-ভিশন গগলস তুলে রাখা।
মুখের নিচের অংশ কালো বালাক্লাভায় ঢাকা। বুকজুড়ে প্লেট ক্যারিয়ার। হাতে কেভলার গ্লাভস। পায়ে কমব্যাট বুট।প্রত্যেকের কাঁধে আধুনিক অ্যাসল্ট রাইফেল, যার মুখে সাইলেন্সার লাগানো।
পরিত্যক্ত গবেষণা কেন্দ্রটিকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলেছে বিশেষ বাহিনীর সদস্যরা। রাতের বাতাসে ভাঙা কংক্রিটের গায়ে শোঁ শোঁ শব্দ তুলে বয়ে যাচ্ছে হিমেল হাওয়া। চাঁদের আলোয় বহু বছর আগের ধ্বংসস্তূপটা যেন আরও ভয়ংকর লাগছে। এজওয়ান হাত তুলে ইশারা করতেই সবাই নিজেদের অবস্থান নিল।

“Alpha Team, east entrance. Bravo Team, with me.”
কথা শেষ হতেই ভারী লোহার দরজাটা ধীরে ধীরে ঠেলে খুলে দিল একজন কমান্ডো। দরজার কর্কশ শব্দ পুরো ভবনে প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরে এল। ভেতরে ঘন অন্ধকার।সামনের পথ আলোকিত করতে একে একে জ্বলে উঠল ট্যাকটিক্যাল ফ্ল্যাশলাইট। ভাঙা দেয়াল। ধুলোর স্তর। মরিচা ধরা যন্ত্রপাতি। মেঝেতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে কাচের টুকরো। মনে হচ্ছিল, বহু বছর ধরে এখানে মানুষের পা পড়েনি।
দুই দলে ভাগ হয়ে পুরো ভবন তন্ন তন্ন করে খুঁজতে শুরু করল সবাই। একটি কক্ষ। দ্বিতীয় কক্ষ। তৃতীয় কক্ষ।কোথাও কেউ নেই। এজওয়ান নিচু হয়ে মেঝে স্পর্শ করল।আঙুলে ধুলো লেগে গেল। কিন্তু কয়েক কদম সামনে যেতেই তার চোখ আটকে গেল। ধুলোর ওপর স্পষ্ট জুতোর ছাপ।একেবারে নতুন। ফিসফিস করে বলল,

” পালিয়ে গেছে…”
মাহি বিস্মিত চোখে তাকাল।
“কীভাবে বুঝলেন?”
এজওয়ান আঙুল তুলে ছাপটা দেখাল।
“পুরোনো ধুলোর ওপর নতুন পায়ের ছাপ চাপ। খুব বেশি হলে আধঘণ্টা আগে।”
সবাই আরও সতর্ক হয়ে এগিয়ে গেল। হঠাৎ করিডরের শেষ মাথায় একটি কক্ষের দরজা আধখোলা দেখা গেল।এজওয়ান ধীরে ধীরে দরজাটা ঠেলে ভেতরে ঢুকল। ঘরটা ফাঁকা। মাঝখানে শুধু একটি ধাতব টেবিল। টেবিলের ওপর একটি কালো দাবার বোর্ড। বোর্ডে মাত্র একটি ঘুঁটি দাঁড়িয়ে আছে। কালো রাজা। তার নিচে সাদা কাগজে ইংরেজিতে লেখা,
“Too late, Captain.”
এজওয়ানের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। সে চারদিকে তাকাল।কেউ নেই।
ঠিক তখনই কানে ভেসে এল ক্ষীণ এক শব্দ। টিক… টিক…
মাহি ফিসফিস করে বলল,

“এই শব্দটা কিসের…?”
এজওয়ান উত্তর দেওয়ার আগেই চিৎকার করে বলা হলো, ফায়ার..!!
তারপরই একটি প্রচণ্ড গুলির শব্দ ভবন কাঁপিয়ে দিল।মুহূর্তের মধ্যে এজওয়ানের ডান বাহু ঝাঁকুনি খেল। গুলিটা বাহু ভেদ করে বেরিয়ে গেল। গরম রক্ত ঝরে পড়তে লাগল মেঝেতে। মাহি চিৎকার করে উঠল,
“এজওয়ান!”
বিশেষ বাহিনীর সদস্যরা মুহূর্তের মধ্যে চারদিকে অবস্থান নিল।
“Sniper! Find the shooter!”
পুরো ভবন কেঁপে উঠল দৌড়াদৌড়িতে। দুই মিনিট…পাঁচ মিনিট…দশ মিনিট…প্রতিটি কক্ষ। ছাদ। বেসমেন্ট। বাতাস চলাচলের সরু পথ পর্যন্ত খুঁজে দেখা হলো। কিন্তু,কোথাও কেউ নেই। যেন গুলিটা শূন্য থেকে ছুটে এসেছিল। এজওয়ান দাঁত চেপে নিজের ক্ষতস্থানে চাপ দিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। র’ক্ত গলগল করে পড়ছে এখনো ফ্লোরে। মাহি চেপে ধরে আছে। ঠিক সেই সময় বাইরে একের পর এক গাড়ির ব্রেক কষার শব্দ শোনা গেল। সবাই অস্ত্র তাক করল প্রবেশপথের দিকে। কয়েক সেকেন্ড পর দ্রুত পায়ে ভেতরে ঢুকল একজন। নাম তার সাফওয়ান মির্জা। তার সঙ্গে আরও কয়েকজন সশস্ত্র কর্মকর্তা। ভেতরে ঢুকেই সে এজওয়ানের বাহুতে রক্ত দেখে এগিয়ে এসে বলল,

“এজওয়ান! আপনি ঠিক আছেন?”
এজওয়ান কোনো উত্তর দিল না। তার চোখ স্থির হয়ে রইল সাফওয়ানের মুখে। মাহিও স্তব্ধ। এই অভিযানের কথা জানত মাত্র হাতে গোনা কয়েকজন। লোকেশন শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত গোপন রাখা হয়েছিল। রেডিও যোগাযোগও ছিল সম্পূর্ণ সীমিত। তাহলে? সাফওয়ান এখানে এল কীভাবে? ঘরের ভেতর অদ্ভুত নীরবতা নেমে এল। সাফওয়ান চারদিকে তাকিয়ে ধীরে বলল,

দাহশয্যা পর্ব ৯৬ (৩)

“কী হয়েছে? সবাই এভাবে আমার দিকে তাকিয়ে আছেন কেন? মনস্টার কে পাওয়া যায় নি? ”
কেউ উত্তর দিল না। এজওয়ানের দৃষ্টি একটুও সরল না। তার অভিজ্ঞতা বলছিল তখন অন্য কিছু। কিন্তু একজন তদন্তকারীর সবচেয়ে বড় ভুল হলো প্রমাণের আগে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলা। তবু সেই মূহূর্তে উপস্থিত প্রত্যেকের মনে একই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছিল ,সাফওয়ান এখানে আসলো কি ভাবে?খবর পেলো কিভাবে?নাকি কেউ তাকে খবর দিয়েছিল?আর যদি খবর দিয়েই থাকে তাহলে সে কে?

দাহশয্যা পর্ব ৯৮

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here