দুইজনাতেই পর্ব ৭
অলকানন্দা ঐন্দ্রি
দ্বিতী সেদিনের পর দুইমাস সাক্ষ্যর দিকে ফিরেও চাইলই না যেন এমন একটা ভানই করল। আড়ালে আবড়ালে মানুষটাকে খেয়াল করলেও সরাসরি এমন ভাব রাখল যেন সেও চেনে না এই মানুষটাকে। একটুও চেনে না। সেও নেচে নেচে বিয়ে করেনি সাক্ষ্যকে এটা বুঝাতেই দ্বিতী নিজের সাধ্যমতো এড়িয়ে চলল এই মানুষটিকে। দ্বিতী বোধহয় মনে মনে শান্তিও পাচ্ছিল এড়িয়ে চলে। দ্বিতী তখন ভার্সিটির সামনেই কিয়ান আর সাদাবের জন্য দাঁড়িয়ে ছিল। পরনে সাদা ব্লাউজের সাথে হালকা নীল রঙা একটা শাড়ি৷ ফর্মাল ধরনে পড়া শাড়িটায় দ্বিতীকে খারাপ লাগছে না। বরং স্নিগ্ধ লাগছে ভীষণ। একটু পরই বোধহয় প্রেজেন্টেশন শুরু হবে । খেয়া এসে গেলেও মিহু এখনো আসেনি। দ্বিতীরা মিহুর জন্যই রাস্তার এককোণে দাঁড়িয়ে রাস্তার দিকে পথ চেয়ে ছিল এতোটা সময়। সবসময় লেইট করা মেয়েটা যে আজও লেইট করবে তা তাদের জানা কথা৷ দ্বিতীয় ছোটশ্বাস ফেল। কিয়ানই তখন বিরক্তির স্বরে বলল,
“ এই মহিলা আসবে না তো। চল আমরা যাই। ওর জন্য দাঁড়িয়ে লাভটা কি? ”
দ্বিতী মিনমিন করে চাইল। উত্তর করল,
“ তুই কি এমনি এমনি দাঁড়িয়ে আছিস নাকি এখানে? আছিস তো মেয়েদেরকে এই ফর্মাল গেটাপ দেখাতে। জুনিয়ররা যাতে দেখে চক্ষু জুড়ায়।”
কিয়ান সঙ্গে সঙ্গেই দ্বিতীর মাথায় চাটি মারল। দাঁত কেলিয়ে বলল,
“ এমনিতে তো এক্সামে খারাপ করোস, সিজিপিএ টেনেটুনে উঠাস কিন্তু এখন এত বুদ্ধি কি করে আসল তোর মাথায়? ”
দ্বিতী মুখ বাঁকিয়ে বলল,
“ আমার মাথা তোর মতো খালি নয় বলদ। ”
খেয়া তখন হাঁটতে হাঁটতে এল। ভেতরে এক ফ্রেন্ডের শাড়ি ঠিক করে দিচ্ছিল বলে এতক্ষন আসতে পারেনি। নয়তো সেও এদের সাথে এখানে হা করে দাঁড়িয়ে থাকত। খেয়া এসেই ছোটশ্বাস ফেলল। এদের ঝগড়া করতে দেখেই বলল,
“ তোরা এতক্ষন রোদে দাঁড়িয়ে ঝগড়া করছিলি? মিহু এসেছে? ”
কিয়ান বড়ই বিরক্ত হয়ে বলল,
“ আসে নাই। ওই বাসা থেকেই প্রেজেন্টেশন দিবে। ”
“ একটা কল দে না। আমার ফোন তো আনা হয়নি। কিয়ান, একটা কল দে তো। ”
“ ব্যালেন্স নাই। ঐ ছাগলের জন্য দুই পয়সা লস করে কল দেওয়া বৃথা। ”
খেয়া ছোটশ্বাস ফেলে। এবার দ্বিতীর দিকেই চাইল। দ্বিতীও ঠিক একই উত্তরটাই দিল। ব্যালেন্স শেষ। খেয়া অবশেষে উপায় না পেয়ে সাদাবের দিকেই চাইল। ছেলেটা তার দিকে তাকায় না, কথা বলে না, শুনেছে বন্ধু হিসেবেও মানে না। অথচ ঐ ছেলেটার সাথেই খেয়া বারবার কথা বলে।বলতে হয়। আজও বলল,
“ সাদাব, তোর ফোনে তো ব্যালেন্স আছে নিশ্চয়? একটা কল দে। ”
সাদাব এবারে কপাল কুঁচকে তাকাল। সবার শেষেই কেন তাকে বলল কল দেওয়ার কথাটা? এটা ইগোতেও লাগল। গম্ভীর কন্ঠে বলল,
“ চলে আসবে ও দুই মিনিটের মধ্যে। কল দেওয়া লাগবে না। ”
খেয়া আর কিছু বলল না। দ্বিতীও ওভাবেই চুপ করেই দাঁড়ানো৷ ভাবল সাদাবের কথা অনুযায়ী দুই মিনিট পরেই চলে আসবে মিহু। ঐটুকুই তে পথ। অতঃপর অপেক্ষা করতে করতেই কানে এল সাদাব, কিয়ান আর খেয়ার সমস্বরে বলা ,
“ আসসালামুআলাইকুম স্যার। ”
সাক্ষ্য এক নজর তাকাল। দূর থেকেই দ্বিতীকে চোখে পড়েছিল। শাড়ি পরেছে। সেদিনের বিয়েবাড়ির মতো চকমকে শাড়ি না। স্নিগ্ধ একটা শাড়ি। তবুও বোধহয় এই মেয়েকে সেদিনের মতোই সুন্দর দেখাচ্ছিল। দূর থেকে ক্লিপ দিয়ে বাঁধা চুল প্রায় ছেড়ে রাখা চুলের মতোই দেখাচ্ছিল। সাক্ষ্য একনজর মাথা তুলে তাকিয়েই ব্যস্ত ভঙ্গিতে নজর সরাল। যেন সে সালাম পেয়েই তাকাল৷ সাক্ষ্য শুনল। দ্বিতীও তখন একবার তাকিয়েই ফের নজর ফিরিয়েছে। ঠিক পরমুহুর্তেই আরও একবার তাকাল। সাক্ষ্য আজ হোয়াইট কালারের শার্ট পরেছে। হাতা গুলো ফোল্ড করা ঠিক কনুই পর্যন্ত। চোখে কালো ফ্রেমের চশমা। সাক্ষ্যকে সুন্দর লাগছে অবশ্যই তবে দ্বিতী সুন্দর লাগছে বলেই তাকাল না। তাকাল কারণ সাক্ষ্য সাদা রং এরই শার্ট পরেছে। অপরদিকে নিধিও সাদা রংয়ের একটা শাড়ি পরেছে। কি দারুণ! ম্যাচিং ম্যাচিং! দ্বিতী ঐ একনজর চেয়েই নজর সরিয়েছে। নিচের দিকে চেয়েই মুখটা থমথমে করে রেখে মিনমিন করে সাক্ষ্যকে বলল
“ আসসালামুআলাইকুম স্যার। ”
সাক্ষ্য ভ্রু উঁচাল শুধু। তাকাল না তার দিকে? এমন একটা ভাব করল যেন বাধ্য হয়েই সালাম জানাল। সাক্ষ্য পরমুহুর্তেই গম্ভীর কন্ঠে সালামের উত্তর দিয়ে বলল,
“ চারজন কি এখানে দাঁড়িয়ে থেকেই প্রেজেন্টেশন দিবেন? ”
খেয়া ভদ্রতা স্বরূপ হেসেই উত্তর করল,
“ না না স্যার। আসলে আমাদের ফ্রেন্ড মিহু আসেনি তো তাই। ”
“ আচ্ছা। ”
এইটুকু বলেই পা ফেলে যখন সাক্ষ্য এগিয়ে গেল তখনই দ্বিতী সুচালো চাহনিতে মুখ তুলে চাইল। চাহনিতে একপ্রকার রাগ, ক্ষোভ সব নিয়েই বাঁকা চোখে তাকিয়ে সাক্ষ্যর যাওয়া দেখল। মুখ ভেঙ্গিয়ে বিদ্রুপ ভঙ্গিতে বলল,
“ চারজন কি এখানে দাঁড়িয়ে থেকেই প্রেজেন্টেশন দিবেন? ঢং! দিব এখানে দাঁড়িয়ে। সমস্যা কি উনার? বেশি এটিটিউড দেখায়। মনে হয় কোন দেশের কোন প্রেসিডেন্ট! ”
দ্বিতীকে রাগ ফুুঁসতে দেখেই কিয়ার বলে উঠল,
“ তবুও তো ছাগলের মতো তোরা ঐ লোকের দিকেই তাকাই থাকস। মনে হয় ভার্সিটিতে আর ছেলেফেলেই নেই।”
দ্বিতী নাক মুখ কুঁচকে তীব্র অস্বীকৃতি জানিয়ে বলল,
“ আমি তাকাই না। ”
সাদাব হেসে বলল,
“ তুই ও তাকাস খালি লুকিয়ে লুকিয়ে। আর সামনে ঢং দেখাইয়া এটিটিউড দেখাস। ”
“ সাদাবের বাচ্চা সাদাব। তোরে তে ভালো ভাবতাম। ”
দ্বিতী যখন রেগে এইটুকু বলল তখনই দেখা গেল তাদের সামনেই এসে থামল একটা রিক্সা। এবং বেশ আয়েশি ভঙ্গিতেই তা থেকে নামল মিহু। যেন কত ভয়, কত চিন্তা এমন একটা ভাব ধরেই বলল,
” এই এই, দেরি হয়ে গিয়েছে কি? শুরু হয়ে গিয়েছে? আমি লেইট করে ফেললাম তাই না? ”
কিয়ান বাঁকা নজরে তাকায়। মুখ ভেঙ্গিয়ে বলে,
“ এইতো আসছে লেইট লতিফ ড্রামা দেখাতে। বলি, তোর হাতে ঘড়ি নেই? টাইম দেখতে পাস না তুই? লেইট করছিস নাকি না করছিস তা আমরা জানব কি করে? ”
মিহুর মুখটা দেখার মতো হলো। কিয়ানের দাঁতে দাঁত চেপে অতি বিরক্তিকর ভঙ্গিতে বলা কথাগুলো শুনে যখন কিছু বলতে নিবে ঠিক তখনই কিয়ান মুখের দিকে চেয়ে আবারও বলল,
“ মুখে ময়দা মাখছিস কতক্ষন যাবৎ? লাগতেছে তো সাদা ছাগলের মতো। ”
মিহু এবার প্রায় কেঁদে দিবে যেন। এল কত সুন্দর ফ্রেশ মাইন্ড নিয়ে। অথচ এসেই এরা এমন করছে! বলল,
“ দেখলি দ্বিতী, কিয়ানের বাচ্চা কি বলল? সাদাবটাই ভালো। ”
সাদাব নিজেও হাসল মুখ চেপে। বলল,
“ কিয়ান তে সত্যই বলল। মুখে এত আটাময়দা মাখছিস কেন? এটা প্রেজেন্টেশন নাকি বিয়েবাড়ি? ”
মিহু আর কথাই বলল না। মুখ ফুলিয়ে চলে গেল ওদের সামনে দিয়েই। দ্বিতী, খেয়া, কিয়ান আর সাদাব কেবল তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছিল। অবশেষে কিয়ানই বলল,
“ দেখলি কি বেঈমান! এতক্ষন দাঁড়িয়ে আছি আর বেঈমানটা আমাদের রেখেই চলে যাচ্ছে। ”
দ্বিতীর প্রেজেন্টেশন দেওয়া ভালো হলো না। সারাদিন বকবক বকবক করলেও ওখানে গিয়ে ও আবোল তাবোল বকে এসেছে। এবং এটা নিয়ে দ্বিতীর বিন্দুমাত্র আফসোসও হচ্ছে না। চিলমুডেই ভার্সিটির আনাচে কানাচে ছবি তুলেছে। তাও ছবিগুলো তুলে দিয়েছে ডিপার্টমেন্টেরই ফটোগ্রাফার ঈশান। যে কিনা বছর দুয়েক হলো দ্বিতীকে অসংখ্যবারই জানিয়েছে সে দ্বিতীকে ভালোবাসে, ভালোবাসে এবং ভালোবাসে। অথচ দ্বিতীর থেকে খুব একটা পাত্তা পায়নি ছেলেটা। অবশেষে বন্ধুত্ব সম্পর্কটাকেই মেনে নিয়েছে। কিন্তু মনে মনে তো এখনো মেয়েটাকে ভালোবাসে। এই যে সুন্দর শাড়ি পরা অবস্থায় তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছে হচ্ছে এটা ভালোবাসা না? ঈশান ছোটশ্বাস ফেলে। ভার্সিটির অলিগলির রাস্তা গুলোতে দ্বিতী, মিহু আর খেয়া সহ অন্যদেরও ছবি তুলে দিতে যখন ক্লান্তপ্রায় ঠিক তখনই চোখে পড়ল অদূরে গোলাপ গাছে ফুটে থাকা একটা লাল গোলাপ ফুল। ঈশান দেরি করল না। ফুলটা দ্রুত নিয়ে এসেই দ্বিতীর কানের দিকে এগিয়েই বলল,
“ এটা কানে গুঁজে ছবি আরো সুন্দর আসবে দোস্ত। দে.. ”
ঈশান যখন প্রায় কানে গুঁজেই দিচ্ছিল তখনই দ্বিতী ছিনিয়ে নিল। নিজেই কানের পাশে ফুলটা গুঁজে নিয়ে ক্যামেরায় তাকাল একটা মিষ্টি হাসি নিয়ে। ঈশান হাসল। বলল,
“ সত্যিই সুন্দর লাগছে। ”
দ্বিতী হেসে আরো গুঁটিকয়েক ছবি তুলতেই ফুলটা পড়ে গেল অবহেলায়। দ্বিতী বোধহয় খেয়ালই করল না। অথচ ঈশান খেয়াল করল। কয়েক পা এগিয়ে এসে ফুলটা তুলে নিয়ে ফের আবারও গুঁজে দিল দ্বিতীর কানের পাশে। বলল,
“ ফুলের কানে ফুল। ”
আর এই দৃশ্যটাই দূর থেকে দেখতে পেল একজন যুবক। দেখেই ভ্রু বাঁকাল। কপাল কুঁচকে আরো সরু চাহনিতে চাইতেই বুঝল শুধু ফুলই গুঁজে দেয়নি, খুব ধৈর্য্য নিয়ে একের পর এক ছবিও তুলে দেওয়া হচ্ছে।বাহ!
অপর দিকে দ্বিতী তো ছবিই তুলছিল কেবল। খেয়ালই করেনি কে তাকাল, কে ভাবল। শুধু শুনল মিহুর ফিসফিস করে বলা কথা,
“ দোস্ত, সাক্ষ্য স্যার আজও নিধির সাথে মিলিয়ে শার্ট পরেছে। নিধির তো ভাবে পাই পড়ছে না মাটিতে। ছিঃ! সাক্ষ্য স্যারের চয়েস এত খারাপ হতে হবে কেন? কেন? ”
দ্বিতী তাকাল। বলল,
“কেন? তোর কি উনার চয়েসলিস্টে যাওয়ার ইচ্ছে হচ্ছে? যাবি? ব্যবস্থা করব? ”
মিহু মুহুর্তেই উত্তর করল,
“ ছিঃ! নাহ..”
দ্বিতী প্রেজেন্টেশন খারাপ দিয়েও সারাটাদিন হৈচৈ করে যখন চিলমুডে রিক্সায় করে বাড়ি ফিরছিল ঠিক তখনই দ্বিতী ফোন হাতে নিল। ভ্রু কুঁচকে তাকাতেই দেখল ঘন্টা দুয়েক আগের ম্যাসেজ,
“ এত বকবক করেও প্রেজেন্টেশনটা তো ঠিকভাবে দিতে পারেন না মিসেস দ্বিতীকা তাসনিম। আপনার বকবক সব চলে কেবল অকাজের ক্ষেত্রেই!কাজের ক্ষেত্রে তো ঘোড়ার ডিম! ”
দ্বিতী ভ্রু কুঁচকাল। ঘোড়ার ডিম? সে মোটেই ঘোড়ার ডিম পাবে না। ভালো হয়নি তা সে জানে, কিন্তু এতোটাও খারাপ হয়নি। দ্বিতী ফোঁসফোঁস করে শ্বাস ছাড়ল। খুঁজে খুঁজে প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই সাক্ষ্যকে কল দিল। কল রিসিভড হতেই বলল,
“ আপনি কি সব স্টুডেন্টদেরই তাদের প্রেজেন্টেশন নিয়ে মন্তব্য করে ম্যাসেজ করেছেন স্যার? ”
সাক্ষ্য এমন প্রশ্ন শুনে শুধু কপাল কুঁচকাল। বলল,
“ করলে খুশি হবেন? ”
“ খুশি হবো কি হবো না তা তো টপিক না। করেছেন ম্যাসেজ? ”
কথাগুলো কাটকাট স্বরেই বলল। যে দ্বিতী সাক্ষ্যকে ফ্যালফ্যাল করে দেখত, সারাক্ষণ তাকিয়ে থাকত সে দ্বিতীই এখন সাক্ষ্যকে পাত্তা দেয় না। ফিরেও চায় না। আবার কথা বলছে দেখো? যেন কি ভাব! সাক্ষ্য এবারে গম্ভীর কন্ঠে বলল,
“ আপনাকে এতো এটিটিউড দেখানো কে শিখিয়েছে দ্বিতী? আমার সাথে মিট করতে বলবেন তাকে। মাথায় তুলে আঁছাড় দিব। ”
দ্বিতী মুহুর্তেই বলল,
“ কেন কেন? এটিটিউড দেখানোর রাইট কি কেবল আপনারই আছে? বাকিদের নেই? ”
“ আপনার নেই। ”
দ্বিতী তাচ্ছিল্য নিয়ে হাসল। বলল,
“ হোয়াই? ”
“ কজ আপনি সাক্ষ্য এহসানের ওয়াইফ। ”
দ্বিতী হাসল এবারে। দ্বিগুণ জেদ নিয়ে বলল,
“ তাহলে এবার থেকে দ্বিগুণ এটিটিউড দেখাব। ওকে? ”
সাক্ষ্য জানত উত্তরটা এমনই আসবে। দ্বিতীকা তাসনিমকে সে খুব ভালোভাবেই চেনে। বলে,
“ নো প্রবলেম। আমিও দেখলাম নাহয় আপনার এটিটিউড কতদূর গড়াতে পারে। ”
দ্বিতী এর পর আর কিছুই বলল না। শুধু মুখের উপর ফোন রেখে দিল ধপাস করেই। তারপর ওভাবেই বাসার সামনে নামল। ব্যাগ হাতিয়ে ভাড়া খুঁজতে খুঁজতেই পাশ থেকে কেউ ভাড়া এগিয়ে ধরল। দ্বিতী তাকাতে তাকাতেই ততক্ষনে পুরুষটি তার কানে গুঁজে দেওয়া ফুলটা ফেলে দিল রাস্তার খসখসে জমিনেই। অতঃপর নিজের বাম হাতে থাকা সাদা গোলাপটা ডানহাতে নিয়ে মুহুর্তের মধ্যেই গুঁজে দিল কানের পাশে। চাপা অথচ দৃঢ় গলায় বলল,
“ কার জীবনের ব্যাক্তিগত ফুল হয়েছেন তা মাথায় রাখবেন মিসেস দ্বিতীকা তাসনিম। একজনের জীবনের ব্যাক্তিগত ফুল হয়ে অন্য কারোর হাতে ফুল পরার মতো দুঃসাহস দ্বিতীয়বার করবেন না। ”
এইটুকু বলেই সাক্ষ্য আবারও পিছু ঘুরল। দুয়েক পা বাড়িয়ে উঠে বসল রিক্সায়। দ্বিতী শুধু চেয়ে দেখল। তার মানে তার পিছু পিছুই এসেছে এ লোক? এতক্ষন তার পিছনের রিক্সাতে থেকেই কথা বলেছে? কেন? এতই যদি অধিকারবোধ তো ভার্সিটিতেই ফুলটা ফেলে দিয়ে নিজের দেওয়া ফুলটা গুঁজে দিত। সামান্য ফুলটা দিতেই এতটুকু এল? নাকি এই লোক নিধির জন্যই তাকে ভার্সিটিতে পাত্তা দেয় না? নির্ঘাত নিধির সাথে কিছু আছে। নয়তো মানুষ এই দুইজনকে নিয়ে এত আলোচনা কেনই বা করে?
দ্বিতী ভার্সিটি থেকে ফিরেই লম্বা একটা ঘুম দিল।অতঃপর ঘুম ছেড়ে উঠল রাতের বেলা। উটেই ফোনটা হাতে নিতেই মিহুর থেকে ম্যাসেজ পেল,
“ দ্বিতী, নিধি নাকি সাক্ষ্য স্যারের সাথে ঘুরতেও গেছে। ডিপার্টমেন্টের গ্রুপে দেখ। দেখ, কত আলোচনা। আর নিধির কি ভাবরে! ”
দ্বিতী ভ্রু বাঁকাল। ঘুরতে গেলে তার কি? তার কিছু যায় আসে? কিন্তু ঘুরতে গেছে টা কোন জায়গায়? দ্বিতী অলসতা করে ম্যাসেজটা দেখেই ডুকল নিজেদের পাঁচ বন্ধুর আড্ডাগ্রুপে। দেখল কাহিনী সাধারণ নয়। বেশ আলোচিত কাহিনীই। বেশ কৌতুহলেরও। এবারে দ্বিতীর কপাল কুঁচকাল। আগ্রহ, কৌতুহল কিছুই রাখবে না রাখবে না করেও কৌতুহল জন্মাল। ডিপার্টমেন্টের গ্রুপে এসে সে কৌতুহলের মাত্র আরো দ্বিগুণ বাড়ল। বসে বসে প্রায় আধঘন্টা সময় নষ্ট করে সে গ্রুপের সবগুলো ম্যাসেজ পড়ল। একদম অযথাই! যা বুঝল নিধি একটা ছবি গ্রুপে দিয়েছে। যেখানে সাক্ষ্যর পেছনের দিকটা খুব ভালোভাবেই দেখা যাচ্ছে। জায়গাটা সম্ভবত কোন মেলার। এবং ছবিটা দিয়েই নিধি বেশ হাসিখুশি ভাবেই লিখেছে, “ গাইসস দেখো তো এটা কে? ”
দ্বিতী ঐটুকু দেখেই মোবাইল ছুড়ে রাখল। রাগ লাগছে তার? নাকি জেদ হচ্ছে? সাক্ষ্য কেন গেল নিধির সাথে? কি প্রয়োজন ছিল? দ্বিতী ছোটশ্বাস ফেলে। পরমুহুর্তেই ভাবে হয়তো এটা সাক্ষ্য নয়। হয়তো নিধিই মজা করছে। কিন্তু দ্বিতীর ধারণা ভুল হলো। প্রায় মিনিট পনেরো ব্যয় করে ছবিটা খুঁটিয়ে খুঁটিয় দেখে বুঝল এটা সাক্ষ্যই। চুল, শার্ট সবই ঐ পুরুষের। দ্বিতীর সম্ভবত এবার রাগে চোখ লাল হয়ে এল। রাগে দুঃখে না পেরে ইচ্ছে হলো সাক্ষ্যর চুল টেনে ফেলতে। কেন গেল? কেন গেল নিধির সাথে? কি প্রয়োজন ছিল? দ্বিতী এইটুকু ভাবতে ভাবতেই রাগে দুঃখে কথাকে কল দিল। হেসে হেসে বলল,
“ তোর ভাই বাসায় আছে কথা? ”
উত্তর এল,
“ আছে তো।”
“ তোর ভাই কি কালার শার্ট পরে বাসায় ফিরল কথা? স্কাই ব্লু কালার? ”
কথা এবারর ভ্রু বাঁকাল। বলল,
“ হ্যাঁ তো। কিন্তু কেন বল তো? ”
দ্বিতী এই পর্যায়ে কিছুক্ষন থম মেরে বসে রইল। একদম চুপ হয়েই থাকল। অতঃপর চাপা রাগ ফুসতে ফুঁসতেই বিড়বিড় করল,
“ মাথায় তুলে আঁচাড় দিব বলে। বউ তাকালে শাস্তি দেয়, অথচ স্টুডেন্টের সাথে ঠিকই ঘুরে। বাহ! ”
ওপাশ থেকে কথা বোধহয় বুঝে উঠল না কথাটা। প্রশ্ন ছুড়ল,
“ হু? ”
দ্বিতী এবারে সরাসরিই প্রশ্ন করল,
“ কথা, সত্যি করে বলো। নিধি কে হয় তোর ভাইয়ের ? ”
“ নিধি কে? ”
দ্বিতী ছোট ছোট চোখে চেয়ে এবারে বলল,
” দুররর! তুই থাক। তোর ভাইকে বলবি আমার সামনেও না পড়তে। সোজা মেরে দিব বুঝলি? ”
ঠিক এরপরই দ্বিতী কল রাখল। রাগ ফুঁসতে ফুঁসতে ঐ রাতের বেলাতেই ও চোখ লাল করে বেলকনিতে পায়চারি করল। সত্যি? সত্যি সত্যিই নিধি আর সাক্ষ্যর মধ্যে যদি কিছু থেকেও থাকে? দ্বিতী কিভাবে মানবে? দেখা গেল সাক্ষ্য দ্বিতীর হাতে সত্যিই খু’ন হয়ে গেল। দ্বিতী মানবে নাকি এহেন কান্ড? কোনভাবেই না। এই নিয়ে রাগতে রাগতেই যখন রাত দশটা বাঁজল দ্বিতী তখন বসার ঘরে সোফায় বসা। টেলিভিশনের রিমোটটা হাতে নিয়ে আন্দাজে কি কি পাল্টাচ্ছিল। অথচ মন মেজাজ খারাপ। চরম খারাপ। এই চরম খারাপ মেজাজকেই আরো খারাপ করতে কেউ একজন এই রাতের বেলাতেই কলিং বেল বাঁজাল। দ্বিতীর মেজাজ আরও খারাপ হলো। দ্বিতীর আম্মু গিয়ে মাত্রই দরজা খুলল। আর ঠিক তখনই দরজার আড়াল থেকে ওপাশে কেউ একজন বলল,
দুইজনাতেই পর্ব ৬
“ আন্টি, আপনার মেয়ে তৈরি হয়নি এখনো? ঘুরতে যাওয়ার কথা ছিল তো আমাদের। ”
দ্বিতী মুহুর্তেই বিদ্যুৎ গতিতে ঘাড় বাঁকিয়ে চাইল। দরজার আড়ালে মানুষটাকে দেখা যাচ্ছে না। একটুও না। তবে কন্ঠটা? কন্ঠটা তো সাক্ষ্যর। কি বলল মাত্র? ঘুরতে যাওয়ার কথা ছিল? কি মিথ্যুক এই লোকটা! কি চালাক..!
