Home এক মুঠো চাঁদের আলো এক মুঠো চাঁদের আলো পর্ব ২২

এক মুঠো চাঁদের আলো পর্ব ২২

এক মুঠো চাঁদের আলো পর্ব ২২
নুসরাত ফারিয়া

-“আচ্ছা আলো? একটা কথা জিজ্ঞেস করি?”
আলো ফ্রেশ হয়ে হালকা খাবার খেয়ে কম্ফোর্টার জড়িয়ে মটকা মে’রে বিছানায় পরে ছিল। তখন ফারাহ্ তার পাশে শুতে শুতে জিজ্ঞেস করল। আলো কম্ফোর্টারের ভেতর থেকে মাথা বের করে বলল,
-“তুই আবার কবে থেকে অনুমতি নিতে শুরু করলি ফারু?
-“না মানে, আসলে…!”
-“মানে, মানে রেখে এখন বল—কী বলবি?”
ফারাহ্ একটু নড়েচড়ে ফিসফিসিয়ে বলল,
-“তুই কী আধার স্যারের সাথে রিলেশন করছিস?”
আলোর চোখদুটো বড়বড় হয়ে গেল। সে তড়াক করে উঠে বসে বলল,

-“আস্তাগফিরুল্লাহ…নাউজুবিল্লাহ! ছিহ, ছিহ! আমি ওই নিরামিষ স্যারের সাথে প্রেম করতে যাবো কেন? তোর মাথাটা ঠিক আছে তো? ওই লোক আদৌ প্রেমের ‘প’- জানে কি-না সন্দেহ৷”
-“তাহলে…তখন তোকে কোলে নিয়েছিল কেন?”
আলো ধপাস করে বালিশে মাথা রাখল। তারমানে ওই দৃশ্যটা দেখে ফেলেছে এই মেয়ে। কিন্তু সে তো আসল কথা বলবে না। তাই ধীর কণ্ঠে বলল,
-“আসলে আমি তখন ভুলবশত সুইমিংপুলে পরে গেছিলাম। ওঠার সময় পায়েও ব্যথা পাই! তারওপর আবার সাদাও পরে ছিলাম। আর স্যার তখন ফোনে কথা বলতে বলতে ওইদিক দিয়েই যাচ্ছিল। আমার ওমন নাজেহাল অবস্থা দেখে ওই আরকি…একটু সাহায্য করেছে এই। মানুষটা ত্যাড়া, গম্ভীর হলে কী হবে? মনের দিক দিয়ে তো ভালো। আর উনি কখনোই মেয়েদের অসম্মান করে না! বিপদে কেউ পড়লে অবশ্যই সাহায্য করার চেষ্টা করে।”
-“তাই বলে সোজা কোলে? যেখানে ওই লোকটা কোনো মেয়ের আশেপাশেও যায় না।”
আলো হতাশ হয়। উবুড় হয়ে বালিশের মাঝে মুখ গুঁজে নাক ঘষাঘষি করে বিরবির করে বলল,

-“এখন আমার মাথা না খেয়ে স্যারকে গিয়ে জিজ্ঞেস কর, কেন আমাকে কোলে নিয়েছিল।”
-“ধমক খাওয়ার কোনো ইচ্ছে নেই আমার।”
-“তাহলে এখন চুপচাপ ঘুমা। আর আমাকেও ঘুমাতে দে।”
ফারাহ্ কিছুক্ষণ চুপ থেকে জিজ্ঞেস করল,
-“তুই কী আধার স্যারকে পছন্দ করিস?”
আলো ঘুমু ঘুমু কণ্ঠে বিরবির করল,
-“ওই বদমাইশ, ঘাড়ত্যাড়া লোকটাকে সবচেয়ে বেশি অপছন্দ করি আমি। আর একটা কথাও যদি বলেছিস, তাহলে লাথি মে’রে সোজা বেডের নিচে ফেলে দেবো।”
ফারাহ্ আর কিছু বলল না। তবে তার মনে কিছু একটা নিয়ে খটকা রয়েই গেল। আলো আড়ালে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। কারণ সে ওই পঁচা স্যারকেই পছন্দ করে। উমম…ভীষণ পছন্দ! যাকে একটু না দেখলে তার হৃদয়টা ছটফট করে। এই যে এখনো সে ওই লোকটাকেই মিস করছে খুব! বাড়িতে থাকলে নিশ্চয়ই এখন সে ওই পঁচা স্যারের বুকে থাকত। আচ্ছা, ওই মানুষটা কী তাকে মিস করছে? নাকি সে বিহীন খুব শান্তিতে ঘুমিয়ে আছে? উমম…হতে পারে। এখন তো আর কেউ উনাকে ডিস্টার্ব করছে না! আলো জোরে নিঃশ্বাস ছেড়ে অস্ফুটস্বরে বলল,
-“আই রেলি মিস ইউ…পঁচা স্যার!”

পাহাড়ের চুড়ায় সূর্যের আলো উঁকি দিতেই সবাই শ্রীমঙ্গলের কাছে মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলায় অবস্থিত এক অপূর্ব প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জায়গা—মাধবপুর লেকের উদ্দেশ্য রওনা দিয়েছে। ওখানে পৌঁছাতে একটু সময়ই লাগল বটে! তবে প্রকৃতির অশেষ সৌন্দর্যে সবাই মুগ্ধ হলো। মেয়েদের পরণে জিন্স, টপস, টি-শার্ট, জ্যাকেট ইত্যাদি ইত্যাদি রয়েছে। যেহেতু পাহাড়ি এলাকায় তারা এসেছে এবং যেখানে সেখানে পায়ে হেঁটে যেতে হবে তাই এ ধরনের পোশাক!
আধার, তূর্ণ ও আরেকজন স্যার সবাইকে সাবধান করল, বেশিদূর না যেতে এবং কোনো সমস্যা হলে অবশ্যই তাদেরকে জানতে। কারণ তারা তো আর সব স্টুডেন্টের পিছু পিছু যেতে পারবে না। সবাই নিজেদের মতো ঘুরাফেরা করে আনন্দ করবে এটাই তো! সকল স্টুডেন্টরা দলবল বেঁধে হাঁটতে হাঁটতে সবকিছু উপভোগ করছে, ভিডিও করছে, ছবি তুলছে আবার কেউ কেউ টিকটকও করছে।

মাধবপুর লেকটি মূলত পাহাড়ঘেরা একটি জলাধার। এর চারপাশে রয়েছে ন্যাশনাল টি কোম্পানির মাধবপুর চা বাগান-এর উঁচু-নিচু অসংখ্য টিলা। টিলাগুলোতে সারিবদ্ধ সবুজ চা গাছ আর লেকের স্বচ্ছ নীল জল মিলে এক চমৎকার নৈসর্গিক পরিবেশ তৈরি করে। এখানকার চারপাশ খুব শান্ত ও নিরিবিলি, যা মানসিক প্রশান্তির জন্য যথেষ্ট! এখানকার অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হলো এর লেকের টলটলে জলে ফুটে থাকা প্রচুর পরিমাণে নীল ও সাদা শাপলাফুল। বিশেষ করে সকালে ফুটে থাকা ফুলগুলোসহ পুরো লেকটিকে চমৎকার সুন্দর লাগছে। সাথে ভীষণ মায়াবীও! আর সেই লেকের পাশেই মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে থেকে গালে এক হাত রেখে দাঁড়িয়ে আছে আলো। তার কাছে এখন ফোন থাকলে সেও ছবি তুলতো আর ভিডিও করত! কিন্তু খচ্চর স্যারটা তার ফোনের প্রাণ কেঁড়ে নিয়েছে। স্যারের কথা মনে হতেই আলো চট করে আশেপাশে তাকায়। সবাই যে যার মতো আনন্দ করতে ব্যস্ত!
-“স্যার?”

লেকের দুই পাশে উঁচু উঁচু টিলা রয়েছে। পর্যটকদের জন্য টিলার ওপর ওঠার সিঁড়ি তৈরি করা আছে। ওপর থেকে পুরো লেক এবং ভারতের পাহাড়ের দৃশ্য স্পষ্টভাবে দেখা যায়। আর সেখানেই একমনে দাঁড়িয়ে ছিল আধার। তখন পাশ থেকে খুব পরিচিত এক মেয়েলি কণ্ঠস্বর শুনে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায়। আলোর পরণে সাদা লেডিস্ জিন্স, সাদা হাঁটুসমান টপস আর ওপরে কালো লেডিস্ জ্যাকেট! পায়ে কালো স্নিকার্স, মাথার লম্বা চুলগুলো উঁচু করে ঝুটি বাঁধা, দু কানে ইয়া বড় বড় দুল, চোখে গাঢ় করে কাজল, ঠোঁটে হালকা লুড লিপস্টিক, নাকে থাকা ছোট্ট ডায়মন্ডের নোজপিনটা জ্বলজ্বল করছে, মাথার ওপর সানগ্লাসও রাখা রয়েছে! দু’হাতে চুড়ি দেখা গেল না, মেবি হাতার ভেতর লুকিয়ে রেখেছে।
আধার কপাল কুঁচকে মেয়েটাকে পর্যবেক্ষণ করতে করতে বিরবির করল,
-“তুমি সবসময় সাদা আর আকাশি পরো কেন, বলো তো?”
একথা শুনে আলো চট করে নিজের দিকে তাকায়। আজকে আবার কিছু দেখা যাচ্ছে নাকি! নাহ, সব ঠিকঠাক আছে। সে ফোঁস করে তপ্ত শ্বাস ফেলে বলল,
-“আপনার যেমন সাদা-কালো পছন্দ, ঠিক তেমন আমারো সাদা-আকাশি পছন্দ।”
আধার নিজেও আজ সাদা শার্ট আর কালো স্যুটবুট পরেছে। অজান্তেই মেয়েটার সাথে ড্রেসআপ মিলে গিয়েছে তার। আধার আলোর ঠোঁটের নিচে থাকা তিলটার দিকে তাকিয়ে বলল,

-“কিছু বলবে?”
আলো মাথা নাড়িয়ে বলল,
-“হুম! আপনার ফোনটা দিন।”
-“কেন?”
-“ছবি তুলবো আর ভিডিও করব। আপনি তো আমার ফোনটাকে মে’রে ফেলেছেন!”
-“ফোনের জায়গায় তো আর তোমাকে মা’রিনি।”
-“সুযোগ পেলে ওই আমাকেও মা’রবেন।”
-“তাহলে এখান থেকেই তোমাকে নিচে ধাক্কা মে’রে ফেলে দিই?”
আলো চোখমুখ কুঁচকে বলল,
-“ঝগড়া না করে ফোনটা দিন!”
-“দেবো না।”
আলোর মনটা খারাপ হয়ে গেল। সে ঘাড় ঘুরিয়ে নিচে তাকায়। যেখানে লেকের পাশে সবাই কী সুন্দর করে নিজেদের ছবি তুলছে। এসব দেখে আড়ালে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। তারপর কিছু না বলে পিছনে ফিরে চলে যাওয়ার উদ্দেশ্যে পা বাড়াতেই নিজের চুলে টান পড়ল।

-“এ্যাই? এ্যাই? আপনার কী সমস্যা বলুন তো? সবসময় শুধু আমার চুল ধরেই কেন টানাটানি করেন?”
-“পেছন থেকে চুল ধরাটাই একদম পারফেক্ট! এছাড়া আর কী ধরব?”
আলোর চোয়াল ঝুলে পড়ল। সে কোন পাগলের পাল্লায় পড়েছে? এ তো যেখানে সেখানে শুধু তার চুলই টেনে ধরে। এই লোকটার জন্য না জানি কবে তার সব চুল ছিঁড়ে হাতে চলে আসে।
আধার মেয়েটার চুলের ঝুটি ধরে টেনে কাছে নিয়ে এল, তারপর প্যান্টের পকেট থেকে একটা স্মার্টফোন বের করে সামনে বাড়িয়ে ধরে বলল,
-“নাও!”
আলো ফোনটা হাতে নিয়ে উল্টেপাল্টে দেখতে দেখতে কপাল কুঁচকে বলল,
-“এটা তো আপনার ফোন না! দেখে মনে হচ্ছে নতুন।”
-“এখন থেকে এটা তোমার ফোন। নিউ সিমকার্ড তোলা রয়েছে।”
আলো চমকে উঠল। কারণ এটা আইফোন সিক্সটিন! এত দামী ফোন যে তার, সেটা ঠিক হজম হচ্ছে না।

-“মজা করছেন আমার সাথে?”
আধার বিরক্তিতে বলল,
-“ফোন দিলেও দোষ, না দিলেও দোষ।”
-“না মানে, এত দামী ফোন…”
-“তুমি না ছবি তুলতে পছন্দ করো? আর এটাতে ভালো ছবি আসবে। তাহলে এত আপত্তি করছো কেন? চোর-ডাকাতের ভয় পেলে না-হয় ঢাকায় ফিরে আরো একটি নরমাল ফোন কিনে দিবো। আপাতত এখানে এটা দিয়েই যা করার করো। তবুও মাথা খেও না!”
আলো আর কিছু বলল না। তবে সে মনে মনে বেশ খুশি হয়েছে। আধার কোটের পকেট হাতড়ে দুটো ‘S’ ডেইরি মিল্ক চকলেট বের করে দেয়৷ আলো একগাল হেঁসে চকলেট নিয়ে জিজ্ঞেস করল,
-“আপনি আমাকে এত চকলেট দিচ্ছেন কেন?”
আধার স্বাভাবিক গলায় জবাব দিল,
-“কারণ আমি চাই তাড়াতাড়ি তোমার দাঁতে পোকা লেগে সব দাঁত পরে যাক!”
আলো শব্দ করে হেঁসে উঠে বলল,

-“সমস্যা নেই! আপনি যত ইচ্ছে চকলেট দিন, আমি সব খাবো। কারণ চকলেট আমার ভীষণ প্রিয়! তারপর দাঁত পরে গেলে না-হয় নকল দাঁত লাগিয়ে নিবো।”
আধার কিছু বলল না। আলো তার নিউ ফোনের ক্যামেরা অন করে স্যারের উদ্দেশ্যে বলল,
-“লুক অ্যাট মি, স্যার!”
আধার ভ্রু কুঁচকে তাকাতেই আলো ফটাফট কয়েকটা ছবি তুলে নিল। তারপর আবারো বলল,
-“একটু হেঁসে সুন্দর করে পোজ দিন!”
আধার মুখ সরিয়ে নিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
-“আমি ছবি তুলতে পছন্দ করি না মিস. কালো।”
-“শ্লার নিরামিষ, গোমড়া মুখা, আনরোমান্টিক ব্যাডা কোথাকার!”
মুখ ফস্কে ভুল জায়গায় সঠিক বাক্যগুলো বলে দিয়ে নিজের মুখ চেপে ধরল আলো৷ মেয়েটার এহেন কথা শুনে আধার চট করে ফিরে তাকায়। ততক্ষণে আলো উল্টো দিকে ঘুরে ভো-দৌড় দিয়েছে৷ আধার চিল্লিয়ে উঠে বলল,
-“পরে গিয়ে যদি কোনোরকম অঘটন ঘটিয়েছেন…মিসেস খান! তাহলে আই সোয়ার—আপনাকে মাথায় তুলে পাহাড়ের চুড়ায় থেকে নিচে আছাড় মা’রব।”

-“এ্যাই? তুই আইফোন কই পেলি?”
বান্ধবীর কথা শুনে আলো আশেপাশের ভিডিও করতে করতে ধীর কণ্ঠে বলল,
-“স্বামী দিয়েছে।”
শালুক আফসোসের সুরে বলল,
-“আজ একটা বিদেশি সুগার ড্যাডি নেই বলে।”
আলো চট করে বলল,
-“উনি মোটেও সুগার ড্যাডি নয়! অনেক সুদর্শন আর ইয়াং। লাইক আধার স্যার।”
স্যারের উদাহরণ দিলেও যে ওই লোকটা তারই। শুধু তার ব্যক্তিগত পুরুষ! আলো আনমনে হেঁসে গ্যালারিতে ঢুকে তখনকার স্যারের তোলা ছবিগুলো বের করে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগল। তখন শুনতে পেল,
-“তোর স্বামী সুগার ড্যাডি বলেই আমাদেরকে দেখাচ্ছিস না। আধার স্যারের মতো হট মা** হলে নিশ্চয়ই এতদিন লুকিয়ে রাখতিস না।”
শালুকের কথা শুনে আলো চোখমুখ কুঁচকে বলল,

-“ছিহ শালু! উনি আমাদের স্যার হোন। উনাকে তো এইভাবে বলিস না। আর আমি আমার স্বামীকে দেখাব নাকি লুকিয়ে রাখব, সেটা একান্তই আমার ব্যাপার। তোর যদি মনে হয় আমার স্বামী সুগার ড্যাডি! তাহলে তাই। কারণ আমি তোর মতো শুধু রূপ দেখে পাগল হই না! আমার রূপের থেকেও বেশি প্রয়োজন গুণের।”
শালুক কিছু বলতে যাবে তখনই ওখানে সোহান আসে। ছেলেটাকে দেখে তামান্না একটু নড়েচড়ে বসল। সোহান আলোর উদ্দেশ্যে বলল,
-“আমার সঙ্গে একটু আসবে আলো?”
আলো লম্বা শ্বাস নিয়ে ফোনটা জ্যাকেটের পকেটে ঢুকিয়ে চুপচাপ সোহানের সাথে চলে গেল। আর তাদের যাওয়ার পথের দিকে তামান্না শুধু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল।
পাহাড়ের ওপর কিছু বেঞ্চ ও ছাতা দেওয়া বসার স্থান আছে, যেখানে বসে লেকের সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়। সেখানে সোহান দু’কাপ চা নিয়ে এসে আলোর সামনে বসল। মেয়েটার দিকে এক কাপ চা এগিয়ে দেয়, আলো ধন্যবাদ দিয়ে চায়ে চুমুক দিল। তখন সোহান ধীর কণ্ঠে বলে উঠল,
-“একটা কথা বলি আলো?”
-“উমম…বলো!”

সোহান কিছুক্ষণ চুপ থাকল। তারপর শার্টের বুক পকেট থেকে একটা চিঠি বের করে আলোর দিকে এগিয়ে দিল।
-“আমাকে চিঠি দিয়ে লাভ নেই সোহান। কারণ আমি বিবাহিত!”
আলো স্বাভাবিক গলায় বলল। সেটা শুনে সোহান মুচকি হেঁসে বলল,
-“আই নো, তুমি বিবাহিত। আর এটা তোমার জন্য নয়! অন্য একজনের জন্য।”
-“তাহলে আমাকে দিচ্ছো কেন?”
-“তাকে আমি বলতে পারছি না। সে যদি আমাকে রিজেক্ট করে দেয়, তখন?”
আলো কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
-“আমি কী তাকে চিনি?”
-“হুম, খুব ভালো করে।”
আলো আর কিছু না বলে চিঠিটা নিয়ে পড়তে শুরু করল। তারপর হঠাৎই শব্দ করে হেঁসে উঠে বলল,
-“এটা কিন্তু ঠিক না সোহান! তারমানে তুমি এটার জন্যই আমার সাথে ভাব জমাচ্ছিলে?”
সোহান মাথা নিচু করে হেঁসে বলল,

-“হু!”
মূহুর্তেই আলো খিলখিল করে হেঁসে উঠে সোহানের মাথায় চাটি মে’রে বলল,
-“পাগল ছেলে! এটা আগে বলবে না আমায়? তাহলে এতদিনে মিঙ্গেল হয়ে যেতে।”
সোহান ঠোঁট কামড়ে হেঁসে দুটো গোলাপ এগিয়ে দিল। আলো সেগুলো নিয়ে বলল,
-“আজ রাতে তোমার কাজ হয়ে যাবে। আমি ওর রুমে এগুলো রেখে আসব। তারপর দেখব, বেচারি কেমন রিয়াকশন দেয়!”

বলেই হাসতে লাগল৷ তার এসব চিঠি নেওয়া থেকে ফুল নেওয়া এবং হাসাহাসি—সবটাই দূর থেকে তীক্ষ্ণ চোখে লক্ষ্য করে আধার। মূহুর্তেই চোয়াল শক্ত করে হাতদুটো মুষ্টিবদ্ধ করল। কতবড় সাহস মেয়েটার! অন্য কারোর থেকে লাভ-লেটার, গোলাপ নেয়। আবার দাঁত বের করে হেঁসে হেঁসে কথাও বলছে। এমনকি নতুন সিমের নাম্বারটাও দিয়েছে ওই ছেলেটাকে। আচ্ছা, মেয়েটা কী ভুলে গেল—সে বিবাহিত একজন?
সারাদিন ঘুরে-ফিরে, আড্ডা দিয়ে একটি রেস্টুরেন্ট থেকে ডিনার করে সবাই ফিরে এসেছে রিসোর্টে। তখন বাজে রাত বারোটা। সবাই এ সময়ে নিজ নিজ কটেজ রুমে ঘুমিয়ে থাকলেও আজ আধারের চোখে ঘুম নেই। সে তো রিসোর্টের বাইরে একটি কটেজ রুমের বারান্দার নিচে দাঁড়িয়ে আছে। তার শূন্য চোখের দৃষ্টি অদূরে খোলা বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা এক রমণীর ছায়ার ওপর। যে কি-না এত রাতেও জেগে থেকে হাসতে হাসতে ফোনে কারোর সাথে কথা বলতে ব্যস্ত। মেয়েটার হাসি দেখে অজান্তেই ভীষণ রাগ হলো। এই বেয়াদব মেয়ে এত হাসে কেন? একটু কী ভদ্র হয়ে, চুপ করে থাকা যায় না? সারাক্ষণ ইঁদুরের মতো তিড়িংবিড়িং করে বেড়ায়, অসহ্য!
আধার অধৈর্য্যের মতো নিজের শার্টের তিনটে বোতাম খুলে ফেললো। ভালো লাগছে না তার, সবকিছু কেমন জানি বিরক্ত লাগছে। সে চোখ বুজে লম্বা শ্বাস নিতেই পাশ থেকে শুনতে পেল,

-“এত রাতে একজন স্টুডেন্টের বারান্দার নিচে দাঁড়িয়ে থেকে তাকে দেখা কিন্তু মানায় না ভদ্র স্যারের!”
আধার ঘাড় কাত করে পাশে তাকিয়ে তূর্ণ স্যারের উদ্দেশ্যে গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
-“ওই স্টুডেন্ট যদি হয় নিজের বউ, তাহলে?”
তূর্ণর চোখদুটো বড়বড় হয়ে গেল। অবাক কণ্ঠে শুধাল,
-“মানে?”
আধার ওই বারান্দার দিকে ইশারা করে বলল,
-“ওই বেয়াদবটা আমার বউ! আর আমার বউয়ের রুমের বারান্দার নিচে দাঁড়িয়ে থাকব নাকি রুমের ভেতর থাকব, সেটাও একান্তই আমার ব্যাপার।”
আধারের কথা শুনে তূর্ণের মাথা গুলিয়ে গেল। যেই ছেলেটা ওই মেয়েটাকে সহ্য করতে পারে না, আর এখন কি-না বলছে ওই মেয়েটাই তার বউ? সিরিয়াসলি? এ ও সম্ভব?
তূর্ণ কিছুক্ষণ চুপ থেকে অবিশ্বাস্য সুরে আওরাল,

-“তোর মাথা ঠিক আছে? না মানে এসব কী বলছিস? তুই না আলোকে অপছন্দ করতিস?”
-“সো হোয়াট? কাউকে অপছন্দ করলে বুঝি বিয়ে হয় না?”
-“সেটা বলিনি! কিন্তু তুই আর আলোকে বিয়ে….না মানে, এটা ঠিক হজম হচ্ছে না।”
আধার দু’হাত প্যান্টের পকেটে গুঁজে মাথা উঁচু করে খোলা আকাশের দিকে তাকিয়ে জোরে শ্বাস ফেললো। তারপর তূর্ণকে তার বিয়ের কাহিনীটা শর্টকাটে বলল৷ সবটা শুনে মূহুর্তেই শব্দ করে হেঁসে উঠল তূর্ণ।
-“দাদাজান একটা কাজের কাজ করেছে। আমি ভীষণ খুশি হয়েছি। তুই ওই বিচ্ছু মেয়েটাকেই ডিজার্ভ করিস। যে কি-না তোকে সবসময় জ্বালিয়ে খাবে!”
আধার শব্দ করে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। অতঃপর বিরবির করে বলল,
-“ওই বেয়াদবটা অলরেডি আমাকে জ্বালিয়ে শেষ করে দিচ্ছে।”

আলো ঘুম থেকে উঠে ফ্রেশ হয়ে বান্ধবীদের সাথে নিচে যায় নাস্তা করার জন্য। তখন তূর্ণ স্যার এসে তাকে ডেকে নিজের সাথে নিয়ে যায়। আলো স্যারের পিছু পিছু হাঁটতে হাঁটতে খেয়াল করল—তারা একটি ভিলায় এসেছে। এটা দেখে সে অবাক কণ্ঠে বলল,
-“স্যার? এখানে কেন নিয়ে এলেন? না মানে, এখানে তো আধার স্যার রয়েছেন।”
-“তোমার স্বামীর কাছেই তো নিয়ে যাচ্ছি! আর কারোর কাছে নয় তো?”
স্যারের কথা শুনে আলো চমকে উঠল। তারমানে কী এই লোকটা জানে তাদের সম্পর্কের কথা? উমম…হতে পারে। কারণ দুজন তো পরিচিত! তাই আধার স্যার বলতেও পারেন। কিন্তু কেন বলল?
-“এসো!”

আলোর ভাবনার মাঝেই তূর্ণ স্যার ডাকল। আলো আর কিছু না ভেবে চুপচাপ ভিলার ভেতরে প্রবেশ করল। তাকে যে এখন কেন এখানে নিয়ে এসেছে, সেটা বুঝতে পারছে না। আর আধার স্যার-ই বা এতক্ষণ ধরে কী করছে? নাস্তা করতেও আসেননি।
তূর্ণ স্যার একটি রুমের সামনে এসে দরজা খুলে দিলেন। আলো কপাল চুলকিয়ে ভেতরে প্রবেশ করতেই স্তব্ধ হয়ে গেল। মূহুর্তেই চোখদুটো ছলছল করে উঠল। তার ঠিক সামনে বিছানার মাঝখানে উদোম শরীরে উবুড় হয়ে ঘুমিয়ে আছে আধার স্যার। নগ্ন পিঠ জুড়ে ক্ষতচিহ্নগুলো তাজা হয়ে আছে। কপালের একপাশে ওয়ানটাইম ব্যান্ডেজ করা, গালে ছোট্ট একটা কাটার দাগ!
আলো ঠোঁট কামড়ে কান্না আটকিয়ে রাখার চেষ্টা করে কাঁপা কাঁপা গলায় জানতে চাইল,

-“ক…কী হ-হয়েছে উনার? এত আঘাতের চিহ্ন কেন উনার শরীরে?”
তূর্ণ লম্বা শ্বাস নিয়ে বলল,
-“রাতে ওর মন ভালো ছিল না। তাই সামনের পাহাড়ে হাঁটতে বেরিয়েছিলাম। কিন্তু ভুলবশত একটা পাথরের সাথে পা বেঁধে আমি নিচে পরে যাওয়ার সময় ও আমাকে বাঁচিয়েছিল। আর আমাকে সাহায্য করতে গিয়ে ও নিজেই ব্যালেন্স হারিয়ে পরে যায়। তখন ওর শরীরে ওখানে থাকা ছোট ছোট পাথরে আঘাত লেগেছে! ভাগ্যিস, খাদে পরে যায়নি।”
কথাগুলো শুনে আলোর দমটা বন্ধ হয়ে এল। ছুটে এসে বিছানার পাশে বসে কাঁপা কাঁপা হাতটা পিঠের ক্ষতস্থানে ছোঁয়াল। অন্য হাতে নিজের মুখ চেপে ধরে ফুপিয়ে কেঁদে উঠল। ইশশ…মানুষটা কত আঘাত পেয়েছে। তখন যদি কোনো বড় দূর্ঘটনা ঘটে যেত, তখন তার কী হত? সে কোথায় পেত এই পঁচা স্যারকে? সারাজীবনের জন্য তো হারিয়ে ফেলতো মানুষটাকে!
ঘুমের ঘোরে মেয়েলি কণ্ঠের কান্নার শব্দ পেয়ে চট করে চোখ মেলে তাকায় আধার। শোয়া থেকে উঠে সোজা হয়ে বসতেই অনুভব করল তার বুকের মাঝে একখানা ছোট্ট শরীর আছড়ে পড়েছে৷ যার চোখের জলে ভিজে যাচ্ছে তার নগ্ন বুক!

-“এই কান্নার ড্রামকে এখানে নিয়ে এসেছিস কেন? তোকে না নিষেধ করেছিলাম বলতে?”
আধার চোয়াল শক্ত করে তূর্ণের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বলে উঠল। ওইদিকে তূর্ণ কিছু না বলে দরজা লাগিয়ে দিয়ে চলে যায়। আর আধার থম মে’রে বসে রইল।
-“এখন কী নিজের নাকের, চোখের জলে আমাকে গোসল করিয়ে দেবে?”
আলো নীরবে কেঁদে চলেছে। সে ভীষণ ভয় পেয়েছে। হয়তো নিজের প্রিয় মানুষটিকে হারানোর ভয়! তাই তো অবুঝের মতো কাঁদছে। অন্যদিকে, আধার প্রচন্ড বিরক্ত হয়। এইভাবে ম’রার মতো কাঁদার মানে কী বুঝতে পারছে না। সে দাঁতে দাঁত চেপে মেয়েটাকে নিজের কাছ থেকে সরিয়ে দিয়ে বলে উঠল,
-“এ্যাই কাঁদছো কেন? আমি ম’রে গেছি?”
আলো আহত ভরা চোখে তাকায়। এই লোকটা কী একটুও বুঝতে পারছে না? তার যে কষ্ট হচ্ছে? ভীষণ…ভীষণ কষ্ট হচ্ছে! সে আড়ালে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে কান্না থামিয়ে চোখের পানি মুছে ওড়না টেনে মানুষটার ভেজা বুক মুছে দিতে দিতে বলল,

-“স…সরি!”
আধার শান্ত চোখে মেয়েটার রক্তিম চোখের দিকে তাকায়। যেখানে এখনো অশ্রু চিকচিক করছে! মেয়েটা ঠোঁট কামড়ে কান্না আটকিয়ে রাখার ফলে পুরো চেহারা লালচে হয়ে এসেছে। সরু নাকের ডগা টকটকে লাল হয়ে গিয়েছে। কান্না আটকিয়ে রাখলে যে—কাউকে এতটা কিউট লাগতে পারে, সেটা জানা ছিল না তার। আধার ঠোঁট কামড়ে হাত বাড়িয়ে হালকা ছুঁয়ে দিল মেয়েটার নাকের ডগা। তারপর ফিসফিসিয়ে বলল,
-“তোমাকে এখন দেখতে ঠিক বাঁদরের ইয়ের মতো লাল লাগছে।”
অন্য সময় হলে এটা নিয়ে ঝগড়া শুরু করে দিত আলো। কিন্তু এখন সে নিশ্চুপ! চোখের সামনে থাকা সুন্দর মুখখানা একটু দেখে নিয়ে উঠে দাঁড়ায়৷ তারপর কিছু না বলে পিছনে ফিরে চলে যেতে লাগল। কিন্তু যেতে পারল না। তার আগেই চুলের বিনুনিতে শক্তপোক্ত টান পড়ল। আলো ব্যথায় আর্তনাদ করে দাঁতে দাঁত পিষে বলল,
-“আপনার জন্য কিন্তু আমি সব চুল কেটে ফেলবো!”
-“তুমি টাকলু হতে পারলে, আমার কোনো সমস্যা নেই।”
-“ছাড়ুন!”

আধার বিনুনি ছেড়ে দিল। মেয়েটাকে চলে যেতে দেখে, কিছু বলতে চেয়েও বলল না। কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থেকে ওয়াশরুমে চলে গেল। ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে এসে আনমনে হাসল। কারণ মেয়েটা আবারো ফিরে এসেছে। আলো এলোমেলো বিছানা সুন্দর করে গুছিয়ে রাখছে। পাশের টি-টেবিলের ওপর কফির মগ ও নাস্তার প্লেট, সাথে কিছু মেডিসিন এবং এইড বক্স রাখা। আধার হাতে থাকা আধভেজা তোয়ালে মেয়েটার মাথার ওপর ছুঁড়ে মে’রে বলল,
-“চলে গিয়ে আবার ফিরে এলে কেন?”
আলো মাথার ওপর থেকে তোয়ালে নামিয়ে শান্ত গলায় বলল,
-“কাউকে কৈফিয়ত দিতে বাধ্য নই।”
আধার কফির মগ নিয়ে চুমুক দিতে দিতে বিরবির করে বলল,
-“আমার জবাব আমাকেই?”
আলো বিছানায় ইশারা করে বলল,
-“বসুন!”

আধার উল্টো সোফায় গিয়ে বসল। আলো দাঁতে দাঁত চেপে এইড বক্স নিয়ে এগিয়ে গেল। সে বুঝতে পারছে, এই অসভ্য লোকটা তাকে ইচ্ছে করে জ্বালাচ্ছে।
আলো পিঠের সকল ক্ষতস্থানে অ্যান্টিসেপটিক ঢেলে পরিষ্কার করে দিয়ে মলম লাগিয়ে দিল। তারপর সামনে এসে বসল। আধার চুপচাপ বসে থেকে কফি খাচ্ছে আর আলোকে দেখছে। আঘাত লেগেছে তার, অথচ কষ্ট হচ্ছে এই মেয়েটার! ব্যাপারটা বড়োই অদ্ভুত৷ আলো লম্বা শ্বাস নিয়ে কাঁপা কাঁপা হাতে মানুষটার বাম গালে মলম লাগিয়ে দিল। তারপর কপালের ব্যান্ডেজ খুলে নতুন করে আবারো ব্যান্ডেজ করে দিল। সে প্রাথমিক চিকিৎসাটুকু বাপের বাড়িতে থাকাকালীন শিখেছে।
-“কষ্ট হচ্ছে না?”
আলোর কথা শুনে আধার নজর সরিয়ে বলল,
-“তোমার মতো আমি দূর্বল নই।”

আলো তপ্ত শ্বাস ফেলে বুকের কাছে ক্ষতস্থানে মলম লাগিয়ে দিতে দিতে বলল,
-“শক্তিশালী বলেই পাহাড় ভেঙে নিয়ে উল্টে পড়েছেন।”
-“খোঁচা মা’রছো?”
-“যা মনে হয় আপনার।”
আধার কিছু না বলে চুপ থাকল। আলো নিজের কাজ শেষ করে ওয়াশরুম থেকে হাত ফ্রেশ করে বাহিরে এল। তারপর নাস্তার প্লেট নিয়ে স্যারের সামনে বসে পরোটা ছিঁড়ে মাংস নিয়ে মুখের সামনে ধরল। তখনই আধার গম্ভীর কণ্ঠে বলল,

-“হাত ভেঙেছে আমার?”
সামনে বাড়িয়ে রাখা আলোর হাত কাপলো। তবুও বেহায়ার মতো ধরেই রাখল খাবার! আধার ফোঁস করে শ্বাস ফেলে চুপচাপ মুখে তুলে নিল। তারপর মনে মনে ভাবল—এই মেয়েটা এমন কেন?
সকাল গড়িয়ে দুপুর হয়ে এসেছে। সবাই আশেপাশে ঘুরে ফিরে এসেছে। বিকেলে দূরে কোথাও যাবে! সবাই সুন্দর প্রকৃতি উপভোগ করতে ব্যস্ত থাকলেও আজ আলোর মুখে একটুও হাসি নেই। মেয়েটা সকাল থেকে চুপ করে আছে। বান্ধবীদের সাথে ঘুরতেও যায়নি।
-“মন খারাপ তোমার?”
সোহানের কণ্ঠস্বর শুনে আলো ঘাড় ঘুরিয়ে পাশে তাকিয়ে বলল,

-“উঁহু, ঠিক আছি আমি।”
-“চকলেট খাবে?”
-“ইচ্ছে করছে না।”
-“লাঞ্চ করবে না?”
-“তুমি যাও, আমি একটু পর আসছি।”
সোহান মাথা নাড়িয়ে ওখান থেকে চলে যেতে শুরু করল। তখন আলো পিছন থেকে বলে উঠল,
-“আশা করছি, তুমি খুব শীঘ্রই তোমার প্রেয়সীকে পেতে চলেছো।”
-“মানে?”
-“মানে এটাই যে, আমার বান্ধবীও তোমাকে একটুআধটু পছন্দ করে।”
সোহান হেঁসে বলল,
-“প্রথমেই বুঝতে পেরেছিলাম।”
-“এখন প্রেয়সীর বান্ধবীকে না পটিয়ে, নিজের প্রেয়সীকে পটানোর চেষ্টা করো।”
-“চেষ্টা করব! আর হ্যাঁ, তোমাকে অনেক ধন্যবাদ আমাকে সাহায্য করার জন্য।”
আলো হালকা হেঁসে বলল,
-“ইট’স ওকে সোহান।”

সোহান মুচকি হেঁসে চলে গেল। আলো কিছুক্ষণ চা বাগানের পাশে দাঁড়িয়ে থাকল। পিছনে ফিরতেই স্যারের সাথে দেখা হলো। সে কিছু না বলে পাশ কাটিয়ে চলে যাওয়ার সময় খেয়াল করল, লোকটা একটা বড় সাইজের ডার্ক চকলেট বাড়িয়ে দিয়েছে তার সামনে। আলো আড়চোখে স্যারের শান্ত চেহারার দিকে তাকিয়ে চকলেট নিয়ে চলে গেল। হাঁটতে হাঁটতেই চকলেটের কাগজ খুলে বড়সড় কামড় বসিয়ে দিল। তারপর ঘাড় ঘুরিয়ে পিছনে তাকিয়ে মুচকি হেঁসে ছুটে ওখান থেকে চলে যায় ভেতরে।
দূর থেকে এই দৃশ্যটা তূর্ণ দেখে আধারের পাশে এসে দাঁড়িয়ে ধীর কণ্ঠে বলল,

এক মুঠো চাঁদের আলো পর্ব ২১

-“জীবনে আর যাই কর, কিন্তু কখনো মেয়েটাকে ছাড়িস না।”
আধার দু’হাত প্যান্টের পকেটে গুঁজে সটান হয়ে দাঁড়িয়ে থেকে চা বাগানের দিকে তাকিয়ে ছিল। তখন কথাগুলো শুনে ঠোঁট কামড়ে কিছুক্ষণ চুপ থেকে হঠাৎই ঘাড় কাত করে তূর্ণর দিকে তাকিয়ে বলে উঠল,
-“ওই শ্যামা পাখিকে ছাড়ার কোনো প্রশ্নই ওঠে না!”

এক মুঠো চাঁদের আলো পর্ব ২৩