Home এক মুঠো চাঁদের আলো এক মুঠো চাঁদের আলো পর্ব ২১

এক মুঠো চাঁদের আলো পর্ব ২১

এক মুঠো চাঁদের আলো পর্ব ২১
নুসরাত ফারিয়া

সকাল নয়টার মধ্যে সবাই ভার্সিটিতে উপস্থিত। আজ সবাই ডিপার্টমেন্টাল ট্যুরে শ্রীমঙ্গলে যাবে। ওখানে তিন-চার দিন থেকে জঙ্গল, চা-বাগান, পাহাড়ে ঘোরাঘুরি করে চলে আসবে। ক্যাম্পাসে এক লাইনে দাঁড়িয়ে আছে ভার্সিটির বাস! সবার পরণে জামার ওপর সাদা টিশার্ট, আবার কেউ কেউ শুধু টিশার্ট ও জিন্স পরে আছে। টি-শার্টের পিছনে ভার্সিটির নাম লেখা রয়েছে। আলো তার বান্ধবীদের সাথে দোকান থেকে কিছু শুকনো খাবার কিনে নিল। তার আবার বাসে খুব খিদে পায়৷ শিক্ষকরা তাড়া দিতেই সবাই ফিজিক্স ডিপার্টমেন্টের আলাদা আলাদা বাসে উঠে পড়ল। আলো বাসে উঠে নিজের সিট খুঁজে দেখে সবার শেষে তার সিট। এটা দেখে ভরকে গেল। সামনে শালুক, ফারাহ্, তামান্নাদের সিট, অথচ তার সিট কি-না সবার লাস্টে? মানে কুচভি? মানছে সবার শেষে তার নাম লেখা হয়েছে, তাই বলে স্যাররা তাকে এইভাবে পিছনে দিবে? এখন সে একা একা এতিমের মতো থাকবে! ধুর, ধুর,! সব মজাই মাটি হয়ে গেল।

ছেলেদের বাস আলাদা! আলো নিজ মনে বিরবির করতে করতে সবার শেষে জানালার কাছে গিয়ে বসল। কাঁধ থেকে ব্যাগটা কোলের ওপর রেখে ফোন, ইয়ারফুন বের করে মিউজিক ছেড়ে কানে গুঁজল। সব মেয়েরা হইহট্টগোল করলেও একসময় হঠাৎই সবাই চুপ হয়ে যায়। নিজের পাশে সিটে কে বসল, সেটা দেখার প্রয়োজন মনে করল না আলো। সে তো মন খারাপ করে সিটে মাথা ঠেকিয়ে চোখ বুজে স্যাড গান শুনছে। কিন্তু পরক্ষণেই খুব চেনা পুরুষালী পারফিউমের ঘ্রাণ নাকে যেতেই চট করে চোখ মেলে তাকায়। তড়াক করে পাশে ফিরে আধার স্যারকে দেখামাত্রই খুশিতে চোখদুটো চিকচিক করে উঠল। এই তো কথা বলার সঙ্গী পেয়েছে সে। এখন এই লোকটাকেই পুরো রাস্তা জ্বালিয়ে খাবে!
আলো ঠোঁট কামড়ে হাসল। আধার চোখের সামনে খুলে শার্টের গলায় ঝুলিয়ে রেখে গম্ভীর কণ্ঠে বলল,

-“একটুও যদি ডিস্টার্ব করার চেষ্টা করেছো, তাহলে টুপ করে জানালার বাইরে ফেলে দেবো। সো ভদ্র মেয়ের মতো থাকার চেষ্টা করবা।”
আলো মুখ ভেংচি কেটে সোজা হয়ে বসল। ধীরে ধীরে বাস চলতে শুরু করল। আধার নিজের ফোনে ব্যস্ত! আলো সব চকলেট খেয়ে নেওয়ার পর আরো চকলেট খুঁজছে। কিন্তু একটাও পেল না। সেটা হয়তো টের পেল আধার। তাই তো ফোন পকেটে রেখে উঠে দাঁড়িয়ে নিজের ব্যাগ থেকে দুটো চকলেট বক্স বের করে মেয়েটার দিকে বাড়িয়ে দিল।
চকলেট পেয়ে তো আলো মহা খুশি। সে বক্সগুলো নিয়ে স্যারের দিকে তাকিয়ে বলল,
-“আমার জন্য নিয়েছেন?”
-“সঙ্গে তো একটা বাচ্চা যাচ্ছে, তাই তার জন্যই নেওয়া হয়েছে।”
আলো চকলেটের কাগজ খুলে মুখে দিতে দিতে বলল,
-“আমাকে দেখে আপনার বাচ্চা মনে হয়?”
-“নাহ, পাগল মনে হয়।”
-“আমি পাগল হলে আপনিও পাগলা!”
আধার কিছু না বলে সিটে মাথা এলিয়ে চোখ বুজে নিল। বাসের আচমকা ঝাঁকুনিতে আলো সামনে ঝুঁকে পড়ল। এবং সঙ্গে সঙ্গে সামনের শক্ত সিটে কপালটা ঠুকে গেল৷

-“আহহ!”
মেয়েটার আর্তনাদে চট করে চোখ মেলে তাকায় আধার। আলো নিজের কপাল চেপে ধরে বসে আছে। আধার তড়িঘড়ি করে মেয়েটাকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে হাত সরিয়ে কপালের দিকে তাকায়। হালকা লাল হয়ে গেছে। দেখেই বোঝা যাচ্ছে বেশ জোরেই লেগেছে।
-“ব্যথা করছে?”
আধার হালকা হাতে মেয়েটার কপাল স্পর্শ করে ধীর কণ্ঠে জানতে চাইল। আলো চোখের পানি আড়াল করে দুইদিকে মাথা নাড়িয়ে বলল,
-“উঁহু।”
আধার একপলক পাশে তাকায়। সবাই নিজেদের মতো ব্যস্ত! তারমধ্যে তারা সবার পিছনে হওয়ায় সকলের নজরের আড়ালেই পড়েছে। আধার ঠোঁট কামড়ে কিছুক্ষণ চুপ থেকে সহসাই মেয়েটার মাথা নিজের বুকের মাঝে রাখল। নয়তো হ্যাংলাপাতলা মেয়েটা গাড়ির ঝাঁকুনিতে আরো ব্যথা পাবে!
আলোর মনটা এক নিমিষেই ভালো হয়ে গেল। সে আরো কাছে এগিয়ে এসে একহাতে মানুষটার কোমর ও অন্য হাতে বুকের কাছটায় শার্ট খামচে ধরে মুখ গুঁজে রাখল। আধার বাম হাত মেয়েটার চুলের ভাঁজে গলিয়ে দিয়ে শব্দ করে নিঃশ্বাস ছাড়ল৷ তারপর ধীর কণ্ঠে জানতে চাইল,

-“এখন কম্ফর্ট ফিল করছো?”
আলো ছোট্ট করে জবাব দিল,
-“হু!”
আধার কিছু না বলে বাসের ছাঁদের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকল। সে এসব কেন করছে, কি জন্য করছে, কিচ্ছুটি জানে না। শুধু জানে এই মেয়েটা একটু হলেও তার শান্তির কারণ! যাকে আজকাল বুকের মাঝে নিয়ে থাকতেও অদ্ভুত ভালো লাগা কাজ করে৷
-“এ্যাই? ওঠো! আর কত ঘুমাবে?”
স্যারের ডাকে আলো একটু নড়েচড়ে উঠল। মাথা তুলে ঘুমু ঘুমু চোখে তাকায়। সদ্য ঘুম থেকে ওঠা রমণীর কিউট ফেস দেখে আধার থমকায়। মেয়েটা বিড়াল ছানার মতো তার বুকের সাথে লেপ্টে আছে। যাকে সে চোখ বন্ধ করেও অনুভব করতে পারছিল।
-“আর একটু ঘুমাই?”
মেয়েটার আবদারে কপাল কুঁচকে গেল আধারের৷ সে মেয়েটার নাক টেনে বলল,
-“ভাল্লুক কোথাকার! পুরো রাস্তা ঘুমিয়েও হয়নি? আর কয়েক মিনিটের পর আমরা নামব। নিজেকে ঠিকঠাক করে নাও।”
কথাগুলো শুনে আলোর চোখদুটো বড়বড় হয়ে গেল। সে সোজা হয়ে বসে জিজ্ঞেস করল,

-“আমরা চলে এসেছি?”
-“হু!”
আলো চমকে উঠল। তারমানে সে ছয়ঘন্টার পথ এক ঘুমিয়েই পার করে দিয়েছে? এই লোকটার বুকে নিশ্চয়ই কিছু একটা আছে। নয়তো সে ম’রার মতো এত ঘুমাবে কেন?
কাঙ্ক্ষিত জায়গায় বাস থামতেই সবাই এক এক করে নেমে গেল। আলো নেমে হাত-মুখ ধুয়ে নিল। তারা সবাই একটি পাহাড়ের ওপর অবস্থিত নভেম ইকো রিসোর্টে চেক ইন করল। কারণ এটা অনেক আগে থেকেই পুরোটা বুকিং করা ছিল। প্রতিটা কটেজ রুমে দুজন করে থাকবে। আলোর রুম পার্টনার ফারাহ্, আর তামান্নার রুম পার্টনার শালুক। এতদূর পথ জার্নি করে এসে সবাই ভীষণ ক্লান্ত। তাই ঠিক করা হলো সন্ধ্যা পর্যন্ত সবাই রেস্ট নিবে। তারপর সবাই মিলে আড্ডায় বসবে আর আগামীকাল লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে যাবে। তারপর মাধবপুর লেক, গ্র্যান্ড সুলতান, ডিনস্টন চা বাগান, খাসিয়া পুঞ্জি, নীলকণ্ঠ টি কেবিনে যাবে।
আলো লম্বা শাওয়ার নিয়ে খাবার খেয়ে নিয়েছে। খাবার সবার রুমেই পৌঁছে দেওয়া হয়েছিল। তাই কষ্ট করে আর নিচে যেতে হয়নি। কিন্তু তার রুমে থাকতে ভালো লাগছে না। কারণ সে পুরোটা পথ ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে এসেছে। এইজন্য শরীর, মন একদম ফুরফুরে। ওইদিকে ফারাহ্ খেয়েদেয়ে নাক ডেকে ঘুম দিয়েছে। আলো কিছুক্ষণ পায়চারি করে গলায় ওড়না জড়িয়ে ফোনটা নিয়ে বেরিয়ে যায়।

নভেম ইকো রিসোর্টটি রাধানগর এলাকায় একটি উঁচু টিলার পাহাড়ের ওপর অবস্থিত। এর চারপাশে যতদূর চোখ যায়, শুধু ঢেউ খেলানো চা বাগান দেখা যায়। সকালবেলা যখন কুয়াশা পাহাড়ের খাঁজে আটকে থাকে, তখন মনে হয় পুরো রিসোর্টটা একটা সাদা মেঘের ওপর ভেসে বেড়াচ্ছে। চা বাগানের সরু আঁকাবাঁকা পথগুলো রিসোর্টের গেট থেকেই শুরু হয়েছে। শ্রীমঙ্গলের এই এলাকাটি লেবু আর আনারস চাষের জন্য বিখ্যাত। রিসোর্টের ঠিক পাশেই রয়েছে বিশাল কাগজি লেবুর বাগান। বাতাসের সাথে লেবুপাতার সেই সতেজ ঘ্রাণ সারাক্ষণ নাকে লাগে। পাহাড়ের ঢালে থরে থরে সাজানো আনারসের গাছগুলো পরিবেশকে আরও বৈচিত্র্যময় করে তুলছে।
আলো মুগ্ধ চোখে চারিপাশে ঘুরেফিরে দেখছে আর ছবি তুলছে। শুধু সে বাহিরে একা নয়, আরো অনেকেই রয়েছে। তারা নিজেদের মতো ঘুরাফেরা, ফটোশুট করতে ব্যস্ত! আধার হট শাওয়ার শেষে কোমরে শুধু তোয়ালে পেঁচিয়ে কফির মগ হাতে নিয়ে বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে৷ দৃষ্টি তার নিচে থাকা এক রমণীর ওপর। যে কিনা চা বাগানের মধ্যে ঢুকে নিজের ছবি তুলছে। পরণে সাদা টপস ও লং নীল স্কার্ট! কোমর অবধি ভেজা চুলগুলো বাতাসে উড়ছে! মেয়েটা ছবি তোলার সময় কয়েকবার উস্টাও খেল। একসময় বিরক্তিতে বাগান থেকে বেরিয়ে এল।

-“হাই আলো!”
পিছন থেকে অপরিচিত কণ্ঠস্বর শুনে আলো ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায়। তাদেরই ডিপার্টমেন্টের একজন ছেলে দাঁড়িয়ে আছে। নাম তার সোহান! ক্লাসের ফার্স্ট বয়! খুবই শান্তশিষ্ট একটা ছেলে। আলো মুচকি হেঁসে হাত নাড়িয়ে বলল,
-“হাই!”
সোহান চোখের চশমা ঠিক করে এগিয়ে এসে বলল,
-“অনেক্ক্ষণ ধরে দেখছিলাম তুমি ছবি তোলার চেষ্টা করছো। কিন্তু ভালো করে পারছো না। আচ্ছা, আমি তোলে দেই?”
আলো মাথা চুলকিয়ে বলল,
-“তোমার কোনো অসুবিধা হবে না? না মানে আমার একটু অল্প ছবিতে মন ভরে না।”
সোহান হেঁসে মাথা নাড়িয়ে বলল,
-“না, না, কোনো অসুবিধা নেই। আর তুমি যতগুলো চাও ততোগুলো ছবি তুলে দেবো। নো প্রবলেম!”
-“ঠিক আছে, দাও তবে।”
আলো নিজের ফোনটা দিয়ে চলে আসতে চাইলে সোহান বাঁধা দিল। এতে মেয়েটার কপাল কুঁচকে গেল। সোহান কিছু না বলে এগিয়ে এসে তার মাথার খোলা চুলের ভাঁজ থেকে শুকনো পাতা বের করে দিল। আলো হেঁসে ধন্যবাদ দিয়ে চটজলদি বাগানে ঢুকে পোজ দিতে লাগল। আর সোহান খুব মনোযোগ সহকারে মেয়েটার ছবি তুলে দিতে থাকল।
সবকিছু ঠিক থাকলেও ঠিক নেই আধার। মেয়েটার খিলখিল করে হাসা, ছেলেটার সাথে গল্প করা, একেক রকমে বিভিন্ন পোজ দেওয়া মোটেও পছন্দ হচ্ছে না তার। ইচ্ছে করছে এখনই ছুটে গিয়ে দুইটারই ঘাড় ধরে পাহাড়ের চুড়ায় থেকে ফেলে দিতে। তারপর বলতে—নে এখন, ছবি তোল বেশি করে!
জিসা হুসাইন নামের এক পেজে এআই দিয়ে লিখে ফেইক পর্ব দেওয়া হচ্ছে। লেখিকার পেজ বর্তিত অন্য কোথাও গল্প পড়বেন না। ফেইক পর্ব দেখলে রিপোর্ট মা’রুন।

সন্ধ্যার সময় একটি সিঙ্গেল ভিলায় উঁকিঝুঁকি মা’রছে আলো। এখানে আসার পর থেকে মানুষটার দেখা নেই। সে চাইলেও হুটহাট এখানে আসতে পারবে না। কেউ তো আর জানে না, তারা স্বামী-স্ত্রী! যদি একসাথে দেখে তাহলে ভুল বুঝতে পারে। তাই তো একটু সুযোগ পেতেই লুকিয়ে এসেছে। কারণ এখন সবাই আড্ডায় বসেছে। এদিকে আসার কোনো চান্স নেই, কারণ এই সিঙ্গেল ভিলায় শুধু স্যারই রয়েছেন। উনি আবার কারোর সাথে রুম শেয়ার করতে পছন্দ করেন না। অথচ তার সাথে নিজের বুকটাও শেয়ার করে। এটা ভাবতেই ফিক করে হেঁসে দিয়ে পাশে তাকাতেই ভরকে গেল।
-“যতদূর মনে আছে, আমি সবাইকে এই ভিলায় প্রবেশ করতে নিষেধ করেছিলাম। তাহলে তুমি এখানে কেন? মনে একটুও ভয়ডর নেই?”
স্যারের কথা শুনে আলো ধীর কণ্ঠে বলল,

-“আমি আর সবাই এক?”
-“এক নও তো কী অন্য গ্রহের এলিয়েন?”
-“আপনি আমার সাথে ঝগড়া করতে চাচ্ছেন?”
-“ঝগড়ুটে মেয়েদের আমি চয়েস করি না।”
বলেই আধার সামনে হাঁটতে শুরু করল। আলো পিছু পিছু ছুটতে ছুটতে বলল,
-“ওই স্যার দাঁড়ান! আমাকে রেখে কোথায় যাচ্ছেন?”
আধার থেমে পিছনে ঘাড় ঘুরিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
-“এখন কী তোমাকে কোলে নিয়ে ঘুরব?”
-“কোলে নিতে হবে না। আমি তো আপনাকে আমার ছবি দেখাতে এসেছি। দেখুন কী সুন্দর হয়েছে, সবগুলো সোহান তুলে দি….!”
কথাগুলো বলতে বলতে আলো হঠাৎই খেয়াল করল তার হাতে ফোন নেই। সে চমকে উঠে সামনে দাঁড়ানো মানুষটার দিকে অদ্ভুত চোখে তাকায়। তারপর চেঁচিয়ে উঠে বলল,

-“আমার ফোনটা ছুঁ’ড়ে মা’রলেন কেন?”
-“ভাগ্যিস ফোনের জায়গায় তোমাকে ছুঁ’ড়ে মা’রিনি।”
রাগে আলোর শরীর জ্বলে উঠল। তার এখানে আসাটাই ভুল হয়েছে। লোকটার একটু ভালো ব্যবহারে ভুলে গেছিল এই লোকটা আসলেই কেমন। আলো রাগে গজগজ করতে করতে ওখান থেকে দৌড়ে চলে গেল। শয়তান লোকটা জানালা দিয়ে তার শখের ফোনটা নিচে ছুঁড়ে মে’রেছে। এতক্ষণে নিশ্চয়ই ফোনটা পটল তুলে ফেলেছে। সে ছুটে এসে দেখে—ফোনটা পাথরের ওপর পড়ে টুকরো টুকরো হয়ে আশেপাশে সরিয়ে ছিটিয়ে আছে।
আলো নিজের সিমকার্ড খুঁজে বের করে মাথা তুলে বারান্দার দিকে তাকায়। বদমাইশ লোকটা ওখানে দাঁড়িয়ে থেকে তার দিকেই চেয়ে আছে। আলো তর্জনী আঙুল তাক করে দাঁতে দাঁত চেপে শাসল,
-“আপনার ফোনকে যদি আমি পাথর দিয়ে না পিটিয়ে বাঁকা করেছি, তাহলে আমার নামও আলো নয়!”
আধার ডোন্ট কেয়ার ভাব নিয়ে বিরবির করে বলল,
-“আমার ফোনকে বাঁকা করতে এসে যেন নিজেই বাঁকা হয়ে না যাও মিস….কালো!”
আলো আবারো চেঁচিয়ে উঠল,

-“আমার অবুঝ ফোনটা আপনার কোন পাকা ধানে মই দিয়েছিল হুহ্?”
-“ওখানে দাঁড়াও আমি আসছি। তারপর বলছি!”
বলেই আধার সরে গেল ওখান থেকে। আলো পাগল নাকি যে ওখানে দাঁড়িয়ে থাকবে? সে আগেই কেটে পড়ল! নয়তো ফোনের মতো তাকেও ছুঁ’ড়ে মা’রতে দু’বার ভাববে না ওই বদমাইশটা।
রাতের বেলা সব স্টুডেন্ট ​উডেন রেস্টুরেন্টে আড্ডায় বসেছে। ​রেস্টুরেন্টের ভেতরটা উষ্ণতায় ভরা। বাইরে পাহাড়ি অরণ্যে ঝিঁঝিঁ পোকারা সমবেত সংগীত শুরু করেছে। সিলিং থেকে ঝুলছে হলদেটে মৃদু আলোর বাতি, যা পালিশ করা গাঢ় বাদামী কাঠের দেয়ালে এক ধরণের ছায়া তৈরি করে রেখেছে। বিশাল বারান্দার সাথে লাগানো কাঠের দীর্ঘ টেবিলটার চারপাশ ঘিরে বসে আছে পুরো গ্রুপটা। বাইরে অন্ধকার চা বাগানের ওপর তখন রুপোলি জোছনা এসে ঠিকরে পড়েছে। কাঠের মেঝেতে কারো চেয়ার টেনে বসার শব্দ বা দূর থেকে ভেসে আসা হাসির প্রতিধ্বনি—সবই এখানে খুব গম্ভীর মনে হচ্ছে।

টেবিলের ওপর ধোঁয়া ওঠা চা আর গরম পকোড়ার প্লেটগুলো সাজানো। কেউ একজন টেবিলের এক কোণে বসে গিটারটা হাতে নিয়ে টুংটাং সুর তুলছে। কাঠের রেলিংয়ে হেলান দিয়ে কেউ কেউ বাইরের অন্ধকার পাহাড় দেখার চেষ্টা করছে, আবার কেউ সেই নরম আলোয় বন্ধুদের সাথে মেতেছে গভীর গল্পে। ​মাঝেমধ্যে ঠান্ডা পাহাড়ি বাতাস খোলা জানালা দিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়ছে, আর সেই ঝাপটায় টেবিলের ওপর রাখা মোমবাতির শিখাগুলো কেঁপে উঠছে। এই উডেন রেস্টুরেন্টে বসে গল্প করতে করতে মনে হয়, বাইরের জগৎটা যেন অনেক দূরে রয়ে গেছে। কেবল এই কাঠের দেয়াল, বন্ধুদের গলার স্বর আর পাহাড়ের নীরবতাটুকু ছাড়া আর কিছুই সত্যি নয়।

-“এই আলো, এই আলো! এবার তোর পালা। নে শুরু কর একটা ঝাকানাকা গান।”
আলো মুখ ভর্তি করে পকোড়া খাচ্ছিল আর নির্ঝরের সাথে ঝগড়া করছিল তার গার্লফ্রেন্ডকে নিয়ে। এই ছেলেটা গার্লফ্রেন্ড পাওয়ার পর তাদেরকে ভুলেই গেছে। তাদের ঝগড়ার মাঝেই মারুফ কই থেকে গিটার নিয়ে এসে টেবিলের ওপর রেখে কথাটা বলে৷ আলো চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে বলল,
-“আপনে কে ভাই? আমি আপনাকে চিনি না।”
মারুফ চেয়ার টেনে নিয়ে বসতে বসতে বলল,
-“নাটক কম কর! আর তাড়াতাড়ি গান শুরু কর।”
-“আমি কানে শুনি না।”
পাশ থেকে তামান্না খোঁচা মে’রে বলল,
-“এই গা না একটা গান!”
আলো কিছু বলতে যাবে তখনই ফারাহ্ বলে উঠল,
-“ওয়েট ওয়েট, আমি আলোর তরফ থেকে একটা গান গাইছি।”
ফারাহ্ গলা ঝেড়ে গেয়ে উঠল,
~ভাতার আমার কাতার গেছে চাকরি করিতে,
এক বিছানায় ঘুম আসেনা ছোটফোটাই রাইতে!
কোলবালিশে মোড়ামুড়ি আর কত করুম…~
পাশ থেকে তামান্নাও গেয়ে উঠল,
~বরিশালের লঞ্চে উইঠা আলো নিবে কেবিন রুম,
বন্ধুরে লইয়া…ইয়ে মানে…বিদেশি স্বামীরে বুকে লইয়া দিবে একটা ঘুম…!~

দুজনের গান শুনে আশেপাশের সবাই হো হো করে হেঁসে উঠল। আলো পায়ের হিল খুলে হাতে নিয়ে ছুটে যেতেই ফারাহ্, তামান্না চেয়ার ছেড়ে দৌড় দিল। আলো তাদের পিছু ছুটতে ছুটতে চেঁচিয়ে উঠল,
-“দাঁড়াআআ বেয়াদবগুলো! তোদের আজ গান বলা ছুটিয়ে দিমু। আমাকে নিয়ে মজা করা হচ্ছে? আলোকে নিয়ে? কতবড় সাহস!”
আধার চেয়ারে বসে থেকে কফি খাচ্ছে আর মেয়েটার ছোটাছুটি দেখছে। তার কানেও অদ্ভুত গানগুলোর লাইন এসেছে। কি বিচ্ছিরি গান! মেয়েটা যেমন পাঁজি, তার বান্ধবীগুলোও তেমন। সব পাগলগুলো এক জোট হয়েছে। ফারাহ্, তামান্নাকে ধরতে পেরে পিঠের ওপর দু ঘা লাগিয়ে দিল আলো। মেয়ে দুটো মা’র খেয়েও খিলখিল করে হাসছে। ফারাহ্ বান্ধবীর ফুলে ওঠা দুগাল টেনে দিয়ে বলল,
-“ওলে ওলে আমার বাবুটা। রাগ করে না। দোয়া করে দিলুম, আমাদের দুলাভাই তাড়াতাড়ি দেশে আসুক। তারপর তোকে ডজন ডজন বাচ্চাকাচ্চা দিয়ে ভরিয়ে দিক।”
তামান্না বলে উঠল,

-“আমীন!”
আলোর রাগে, লজ্জায় মাথা গরম হয়ে গেল। ইশশ…স্যারের সামনে তার মানইজ্জতের রফাদফা করে দিল শয়তান মাইয়া-রা! আলো আরো কয়েকটা ধুমধাম করে বসিয়ে দিল পিঠে। তারপর দাঁত কিড়মিড় করে বলল,
-“আর একটা যদি ভুলভাল কথা বলিস, তাহলে আমি তোমাদেরকে পাহাড় থেকে ফেলে দেবো অসভ্য।”
-“ঠিক আছে বাবা, আর বলব না। এখন চল একটা গান শোনা!”
আলোর ভালো লাগছে না। তবুও বান্ধবীরা তাকে টেনেটুনে নিয়ে গিয়ে চেয়ারে বসিয়ে হাতে গিটার ধরিয়ে দিল। আলো লম্বা শ্বাস নিয়ে আড়চোখে স্যারের দিকে তাকায়। মানুষটা বসে থেকে তূর্ণ স্যারের সাথে কথা বলছে। আলো আড়ালে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে গিটারে টুংটাং শব্দ তুলে চোখ বুজে গেয়ে উঠল—

❝Tu aata hai seene mein
Jab jab saansein bharti hoon
Tere dil ki galiyon se
Main har roz guzarti hoon
Hawaa ke jaise chalta hai tu
Main ret jaisi udti hoon
Kaun tujhe yun pyar karega
Jaise main karti hoon… ❞

মূহুর্তেই পুরো রেস্টুরেন্টের ভেতর পিনপতন নীরবতা ছেয়ে গেল। সবাই গানটা নিঃশব্দে অনুভব করলেও আধার একদৃষ্টিতে গান গাইতে থাকা রমণীর দিকে তাকিয়ে আছে। এটা যে কাকে উদ্দেশ্য করে গাওয়া হচ্ছে সেটা বুঝতে একটুও বাকি নেই।
আলোর গান থামতেই সবাই হাততালি দিল। ফারাহ্ চোখমুখ কুঁচকে বলল,
-“দিলি তো স্যাড গান শুনিয়ে মুডের বারোটা বাজিয়ে!”
-“আমার মুড যেখানে ভালো নেই, সেখানে তোদের মুড ভালো রাখতাম কী করে বল?”
-“কেন? তোর আবার কি হইছে?”
-“উঁহু, কিছু না। এমনই ভালো লাগছে না!”
একথা বলে আলো উঠে বাইরে চলে গেল। একটু খোলা আকাশের নিচে হাঁটলে হয়তো ভালো লাগবে। এখানকার সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো এর ইনফিনিটি সুইমিং পুল। এটা পাহাড়ের একদম কিনারায় অবস্থিত, যেখান থেকে চা বাগান এবং দূরের পাহাড়গুলোও দেখা যায়।

আলো হাঁটতে হাঁটতে সুইমিংপুলের পাশে এসে দাঁড়ায়। চোখ বুজে লম্বা শ্বাস নিতেই দমকা হাওয়া এসে তার সর্বাঙ্গ ছুঁয়ে দিল। একই সাথে কারোর অস্তিত্ব টের পেয়ে চট করে পিছনে তাকাল। আধার স্যার ফোনে কারোর সাথে কথা বলছে আর সুইমিংপুলের পাশ দিয়ে হাঁটছে। তাকে দেখে মনে হচ্ছে, সে বর্তিত আর এখানে কেউই নেই। আলো মনে মনে ভেংচি কেটে সোজা হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু পরক্ষণেই মাথায় শয়তান চাপলো। সে আবারো পিছনে ফিরে চায়। মানুষটা বাম হাত প্যান্টের পকেটে গুঁজে পুলের সামনে সটান হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সে কিছুক্ষণ চুপ থেকে পায়ের জুতা খুলে হাতে নিয়ে নিঃশব্দে এগিয়ে গেল। তার ফোন ছুঁড়ে মা’রা তাই না? আজ সে-ও যদি এই বদমাইশটাকে পানিতে নাকানিচুবানি না খাইয়ে ছেড়েছে, তাহলে সেও এই লোকের খচ্চর বউ নয়!
পা টিপে টিপে স্যারের পিছনে এসে দাঁড়ায় আলো। জিহ্বা দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে আশেপাশে তাকায়। নাহ, কেউ নেই। সবাই এখন রেস্টুরেন্টের ভেতর আড্ডা দিতে ব্যস্ত! সো এটাই ভালো সুযোগ নিজের ফোনের মৃ’ত্যুর প্রতিশোধ নেওয়ার। আলো জুতা নিচে রেখে জোরে শ্বাস নিয়ে নিজের মনে সাহস জুগিয়ে দু’হাত উঁচু করল। উদ্দেশ্যে ছিল, স্যারকে ধাক্কা মে’রে পানিতে ফেলে দিয়েই সে দৌড়ে কটেজের ভেতর চলে যাবে। দরকার হলে সে আর রুম থেকেই বেরোবে না। যেই ভাবা সেই কাজ! কিন্তু শেষ পর্যায়ে এসে হিতে বিপরীত হয়ে গেল।
আলো যখন এক বুক সাহস নিয়ে এগিয়ে এসে দু’হাতে ধাক্কা দিতেই যাবে তখনই আধার চট করে পাশে সরে যায়। ফলস্বরূপ নিজেই সুইমিংপুলের ভেতর ধপাস!

নাকেমুখে পানি ঢুকে, সাথে পানি খেয়ে খুকখুক করে কেশে উঠল আলো। উঠতে চেয়ে কয়েকবার পা পিছলে চুবানি খেয়ে অবশেষে দেয়াল ধরে ভেসে উঠতে পারল। এক হাতে চোখমুখ মুছে কাশতে কাশতে মাথা তুলে উপরে তাকায়। নির্দয় লোকটা দু-হাত বুকের মাঝে ভাজ করে রেখে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছে।
-“কথায় আছে, অন্যের জন্য গর্ত খুঁড়লে সেই গর্তের ভেতর নিজেকেই পড়তে হয়।”
স্যারের কথা শুনে আলো শব্দ করে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। পানি-টানি খেয়ে তার অবস্থা কাহিল! ভীষণ শীতও করছে। আধার হাঁটু গেড়ে বসে মেয়েটার ভেজা থুতনি চেপে ধরে, একটু উঁচিয়ে বলল,
-“বোকা মেয়ে! বিড়াল কী কখনো গলায় ঘন্টা পরে মাছ চুরি করতে যায়? তাহলে তুমি কোন আক্কেলে নূপুর পরে আমাকে ফেলতে এসেছিলে হুহ্? এখন ঠান্ডা পানিতে চুবানি খেয়ে কেমন লাগছে ম্যাডাম?”
পাহাড়ি শীতল বাতাসে আলোর শরীর থরথর করে কেঁপে উঠল। এখন নিজের ওপরই ভীষণ রাগ হচ্ছে। কেন যে স্যারের পিছনে লাগতে গিয়েছিল কেহ জানে! আধার ভেজা মুখের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে সোজা হয়ে দাঁড়ায়। তারপর গম্ভীর কণ্ঠে বলল,

-“এখন কী সারা রাত এখানেই থাকার প্ল্যান করেছো?”
আলো আস্তেধীরে পুল থেকে উঠে এল। ভেজা স্কার্টের সাথে পা বেঁধে পড়তে পড়তেও নিজেকে সামলে নিল। আধার কিছু বলতে গিয়েও কথা গলায় আঁটকে যায়। সে তীক্ষ্ণ চোখে মেয়েটার পা থেকে মাথা পর্যন্ত পর্যবেক্ষণ করে নিয়ে অস্ফুটস্বরে বলল,
-“সাদার সাথে আকাশি? নট ব্যাড!”
একথা শুনে আলো চমকে উঠে নিজের দিকে তাকায়। আরে সে তো ভুলেই গেছিল সাদা পরে আছে। পানিতে ভেজার কারণে সবকিছু দৃশ্যমান! মূহুর্তেই আলো লজ্জায় লাল হয়ে মাথা নিচু করে দু’হাত আড়াআড়িভাবে বুকের সামনে রেখে তড়িঘড়ি করে সামনে পা বাড়াতেই আধার বাঁধা দিল!
-“দাঁড়াও।”

আলো থেমে গেল। আধার এগিয়ে এসে শরীর থেকে শার্ট খুলে মেয়েটার ভেজা শরীরে ভালো করে জড়িয়ে দিল। তারপর নিচ থেকে হিল জোড়া বাম হাতে নিয়ে মেয়েটার কাছে এসে, ঝুঁকে উরুর নিচে ডান হাত রেখে এক ঝটকায় কোলে তুলে নিল। হঠাৎ এমন হওয়ায় আলো হকচকিয়ে উঠে দু’হাতে গলা জড়িয়ে ধরল। আধার মেয়েটাকে নিয়ে রিসোর্টের ভেতর যেতে যেতে গম্ভীর কণ্ঠে বলে উঠল,

এক মুঠো চাঁদের আলো পর্ব ২০

-“খুব সহজে কাউকে বিশ্বাস করবে না। সুযোগ পেলে কেউই ছোবল মা’রতে পিছপা হবে না। কারণ সবাই আধার খান নয়! আই রিপিট…আধার খান নয়!”
আলো কিছু বুঝতে পারল কি-না কে জানে! তবে সে শব্দ করে নিঃশ্বাস ছেড়ে মানুষটার উন্মুক্ত কাঁধে মাথা ঠেকিয়ে রাখল। তখন হঠাৎই তার হৃদয় টা বলে উঠল,
-“আধার তার আলোর কখনোই ক্ষতি হতে দেবে না। আলোকে আগলে রাখার জন্য, তার আধারই যথেষ্ট…!”

এক মুঠো চাঁদের আলো পর্ব ২২

1 COMMENT

  1. আপু প্লিজ প্লিজ প্লিজ প্লিজ পরের পাট দেন প্লিজ প্লিজ প্লিজ প্লিজ প্লিজ

Comments are closed.