সে আমার বন্দিনী পর্ব ৩১
তানিয়া হুসাইন
দড়িতে বাঁধা শরীরটা চিৎ হয়ে পড়ে আছে ঠান্ডা মেঝেতে।
পিঠে ব্যথা, ঘাড়ে টান লাগছে, বাঁহাতের ব্যাথায় তার শরীর অবশ হয়ে আসছে।
__ চোখের সামনে অস্পষ্টভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছে ঘাসফড়িং আর পিঁপড়ের দল, একটা মিলিপিড তার কাঁধ বেয়ে ঘাড়ে উঠে
ইশায়া ভয়ে জমে যাচ্ছে চিৎকার করতে চাইছে কিন্তু তার গলা শুকিয়ে কাঠ।
ভয়ে গলা দিয়ে কোন শব্দ বের হচ্ছে না।
কণ্ঠস্বর কেবল ফিসফিস করে উঠে
—দয়া করো,কেউ আছো?
গলার আওয়াজ ও কমে আসছে।
কিন্তু কেউ নেই।
তার ডাক শোনার মতো।
পোকাগুলো বার বার তার শরীরে উঠছে,
ইশায়া দূরে সরে যাওয়া ব্যর্থ চেষ্টা করে যাচ্ছে।
কিন্তু হাত পায়ের শক্ত বাধনের কারনে এক চুল ও নড়তে পারছে না।
___ব্যাথা, ভয়, শ্বাসকষ্ট, কাঁপুনি সবকিছু মিলে শরীরটা শূন্য হয়ে পড়ছে।
চোখে ঝাপসা হয়ে আসছে, মাথা একপাশে হেলে পড়ে।
শেষ মুহূর্তে মা এর মুখটা চোখের সামনে ভাসে, তারপর আর কিছু না।
অন্ধকার।
পুরোপুরি।
___নিকোর রুমে বসে আছে ভীর।
ডাক্তার মাথায় ব্যান্ডেজ করে দিয়েছে সামান্য কেটেছে।
কিন্তু তাতে নিকোর ভাবনায় কোনো আঁচ নেই।
— ঠিক আছো এখন?
ভীর গম্ভীর গলায় বলে।
—চিল ব্রো, আমি একদম ঠিক আছি।
নিকো মাথা নাড়ায়, ঠোঁটে হালকা বিরক্তি।
— ভাই, সামান্য একটা ব্যাপারে এত রিয়্যাক্ট করার মানে হয়?
ওকে তুমি এমনিতেই মারতে পারবা না। তোমার ভেতরে তো আগুন, কিন্তু তোমার মনে।
এই মেয়ে দিন দিন তোমার দুর্বলতা হয়ে যাচ্ছে।
দেখো সামনে না ও আবার আমাদের পথের কাঁটা হয়ে দাঁড়ায়।
___ভীর কিছু বলে না।
চোখে এক ধরণের ফাঁকা ঠান্ডা রাগ।
সে নিঃশব্দে উঠে দাঁড়ায়।
— রেস্ট নে।
এটুকু বলে রুম থেকে বেরিয়ে যায়।
ঘন্টা দুয়েক পর,
মারিয়া এলেনা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে পায়চারি করছে।
ভেতর থেকে কোনো শব্দ নেই অনেকক্ষণ।
কান পেতে দাঁড়িয়েও সে কিছু শুনতে পায় না।
সে গার্ডদের চোখে তাকায় কিন্তু কিছু করার সাহস কারো নেই।
তখনই,
ভীরের ফোন আসে।
মারিয়া তড়িঘড়ি করে রিসিভ করে।
—বস!
কিন্তু কিছু বলার আগেই ভীরের গলা,
—দরজা খুলে দাও। আর ডাক্তার ডাকো,
কোন সমস্যা হলে,
ইনফেকশন যেন না হয়, সব কিছু চেক করতে বলো।
মারিয়া অবাক হয়।
এই মানুষটাই কি কিছুক্ষণ আগেও তাকে মেরে ফেলছিলো একপ্রকার, পোকাভরা ঘরে ফেলে রেখে গিয়েছিল।
আর,
এই মানুষটাই এখন।
__ভীর ফোন রেখে দেয়।
___মারিয়া আর সময় নষ্ট না করে গার্ডদের ইশারা দেয়।
দরজা খুলতেই এক ভয়াবহ দৃশ্যের সম্মুখীন হয় সবাই।
ইশায়া মেঝেতে পড়ে আছে এক কোণে নিশ্চল, নিস্পন্দ।
তার শরীরে পোকাগুলো ঘুরছে, গালে লাল লাল ফোলা দাগ, পায়ে রক্ত লেগে আছে, মুখ সাদা ফ্যাকাসে।
___মারিয়া দৌড়ে এগিয়ে যায়।
তাকে ছুঁতেই বোঝা যায় সে জ্ঞান হারিয়েছে।
গার্ডরা এসে খুব সাবধানে ইশায়াকে নিয়ে যায় রুমে।
___মারিয়া এলেনা নিজে ইশায়াকে ফ্রেশ করিয়ে দেয় মাথা মুছে দেয়,
ডাক্তার এসে চেকআপ করে।
— শরীরে বেশ কিছু জায়গায় এলার্জি ও ইনফেকশনের মতো প্রতিক্রিয়া হচ্ছে। বিশেষ করে বাম হাতের অবস্থাটা খারাপ।
মারিয়া চোখে চোখ রাখে
—কি হয়েছে হাতটাতে?
ডাক্তার গম্ভীর গলায় বলে, মনে হচ্ছে পড়ে গিয়ে বাঁহাতের কবজিতে রেডিয়াস বোনে স্প্রেইন হয়েছে। এটা হাড় ভাঙা না হলেও খুবই যন্ত্রণাদায়ক। চোটের জায়গায় ব্লাড সার্কুলেশন ব্যাহত হচ্ছে।
একটি ব্যান্ডেজ সাপোর্টেড স্প্লিন্ট তার হাতে লাগানো হয়,
ডাবল শক-প্যাড আর অ্যান্টিসেপটিক জেল দিয়ে ব্যথা নিয়ন্ত্রণে আনা হয়।
— ব্যথার ইনজেকশন দিয়েছি,
আর কিছুক্ষণের মধ্যে জ্ঞান ফিরে আসবে।
বলে ডাক্তার আরো কিছু মেডিসিন আর মলম দিয়ে চলে যান।
রুমে নিস্তব্ধতা।
ইশায়া এখনো জ্ঞানহীন অবস্থায় শুয়ে আছে।
তার মুখে এখনো আতঙ্কের ছাপ।
শরীরটা কাঁপছে, ভেতরের দহন যেন এখনো ঠান্ডা হয়নি।
ভয় কি এমন হয়,
মানুষ কি এরকম ভেঙে যায়।
_____চতুর্দিকে নিস্তব্ধতা।
মেক্সিকোর সেই বিশাল প্রাসাদের নির্জন রুমে কেবল স্যালাইনের ফোঁটা টুপটাপ শব্দ করছে।
ইশায়া ঘুমিয়ে আছে।
কিন্তু তার মুখে অশান্তির ছাপ।
কপাল ভেজা, ভ্রু কুঁচকে আছে।
মুখের কোণে কান্নার রেখা।
হঠাৎ একসময় তার নিঃশ্বাস ভারী হয়ে আসে,যেন সে কোনো এক অজানা যন্ত্রণার ভেতর ঢুকে যাচ্ছে,
তারপর আলো ঝাপসা হয়ে আসে, কুয়াশা,
সব কিছু সাদা, নিস্তব্ধ
তারপর সেই কুয়াশার মধ্যে থেকে কেউ হেঁটে আসে।
একটা চেনা কণ্ঠ,
ইশু!
ইশায়া ধীরে ধীরে মুখ তোলে।
অবাক কন্ঠে বলে,
— আপু!
সামনে দাঁড়িয়ে সাফা।
একটা সাদা পোশাক পরে আছে।
চুল খোলা, মুখে প্রশান্তি।
তার চোখে মায়া।
ইশায়ার চোখ ছলছল করে ওঠে।
সে এগিয়ে যেতে চায়, কিন্তু পা নড়ে না।
— তুমি,তুমি এসেছো?
আমি তো আমি তো… তোমাকে হারিয়ে ফেলেছি।
__সাফা হেসে ফেলে।
একটা হালকা মায়াবী হাসি।
— হ্যাঁ, আমি এসেছি ইশু।
তোর জন্যই আসা আমার।
সাফা এগিয়ে এসে ইশায়ার মাথায় হাত রাখে।
আজ তুই যা করেছিস, আমি খুব খুশি হয়েছি।
তুই ভয় পাস না, ইশু।
এই ভয়, এই অন্যায়, এই নীরবতা সব ভেঙে দে।
___ইশায়া স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকে সাফার দিকে।
তারপর ধীরে ধীরে বলে,
আপু,আমার খুব ভয় লাগে।
ওরা অনেক শক্তিশালী।
আমি তো একা,
আমি…
___সাফার চোখে তখন তীব্র একটা আগুন জ্বলে ওঠে,
অন্যায় যে করে আর যে সয়ে নেয় তারা দুজনেই সমান অপরাধী ইশু।
তুই প্রতিবাদ করবি।
ধ্বংস করে দে ওদের।
ওদের ধ্বংস যেন তোর হাতে হয়, তুই পারবি তোকে পারতে হবে।
তারপর ফিরে আয়,
বাড়িতে সবাই তোকে ভীষণভাবে মিস করছে।
তোর জায়গা তোকে নিয়েই পূর্ণ। আমি নেই তুই আছিস।
তুই সব সামলে নিস।
তার কণ্ঠ ভার হয়ে আসে।
আদ্রিয়ানকে দেখিস,ওকে বলিস আমি তাকে খুব ভালোবাসি।
আমার বাবা-মাকে দেখিস।
আমার জন্য কাঁদিস না ইশু আমি শান্তিতে আছি।
তুই বাঁচ, বুক ফুলিয়ে বাঁচ, প্রতিবাদ করে বাঁচ।
সাফা ধীরে ধীরে পেছনে হাঁটতে থাকে।
— আপু, না!
ইশায়া কাঁদতে কাঁদতে তার দিকে হাত বাড়ায়।
— যেও না,প্লিজ যেও না। আমি এখানে একা।
কিন্তু সাফা চলে যায়।
আলো ও কুয়াশার ভেতর হারিয়ে যায়।
__আপু!
ইশায়া হঠাৎ করে ঘেমে নেয়ে চিৎকার করে উঠে বসে।
— আপু যেও না, প্লিজ না!
ঘরের বাতাস হঠাৎ ভারী হয়ে যায়।
মারিয়া এলেনা দৌঁড়ে আসে।
চোখেমুখে ভয়।
সে ছুটে এসে ইশায়ার কাঁধে হাত রাখে।
—শান্ত হোন ম্যাম। প্লিজ,
ইশায়া ঘেমে একেবারে ভিজে গেছে।
কাঁপছে তার শরীর।
চোখে পানি, ঠোঁট কাঁপছে।
কিন্তু সে কোনো কথা বলে না।
শুধু তাকিয়ে থাকে সামনে, ফাঁকা চোখে।
তার চোখে কেবল সাফার হাসি,
তার কণ্ঠ,তার কথা ঘুড়ছে।
— তুই প্রতিবাদ কর ইশু,
না হয় হারিয়ে যাবি চিরদিনের মতো।
ইশায়া চোখ বন্ধ করে নেয়।
___মারিয়া এলেনা তাকে আবার আস্তে আস্তে শুইয়ে দেয়।
বাংলাদেশ।
_____সন্ধ্যা নামছে ধীরে ধীরে।
বাইরের আকাশে মেঘ।
একটু পরেই বৃষ্টি হবে হয়তো।
___সায়মা রহমান খিচুড়ি রান্না করছেন আরেক চুলায় গরুর মাংস।
তার মেয়ের সব থেকে পছন্দের খাবার।
চোখের জল মুচ্ছেন আর কাজ করছেন।
এখন এটা তার অভ্যাস হয়ে গেছে।
কত মাস দেখেন না মেয়েটাকে।
এই তো কয়দিন পর তার জন্মদিন।
মেয়েটা আর নেই ভাবতেই বুকটা হু হু করে ওঠে।
কিভাবে কি হয়ে গেলো।
____আদ্রিয়ান অফিস থেকে ফিরেই নিজের রুমে ঢুকেছে।
সামনে খোলা ল্যাপটপ, চোখে ক্লান্তি, কিন্তু কপালে গাম্ভীর্য।
স্ক্রিনের আলোয় মুখের রেখাগুলো আরও কঠোর লাগছে।
এই কাজের মধ্যেই থাকে সে সারাটাক্ষন।
অফিসে ও বাসায় ও।
অবশ্য অল্প কয়েকদিনেই অনেক নাম কড়েছে সে।
দুই ভাই অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছে নিজেদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বড় করে তোলার জন্য।
আর এখন আবির অসুস্থ থাকায় সবকিছু আদ্রিয়ানকেই দেখতে হচ্ছে, এজন্য তার উপর চাপ বেশি।
___আদ্রিয়ান ল্যাপটপ এ কি হিসাব নিকাশ করছে,
___এমন সময় দরজায় কড়া নারার শব্দ হয়,
আদ্রিয়ান থামে না, চোখ সরায় না স্ক্রিন থেকে।
ভেতরে আসো।
কণ্ঠটা বরাবরের মতো ঠান্ডা, কড়া।
___দরজা খুলে রাহি ভেতরে ঢোকে।
হাতে একটা ট্রে, তাতে ধোঁয়া উঠতে থাকা কফির কাপ।
তার চলার ভঙ্গি শান্ত, কিন্তু চোখে ধুকধুকানি।
সে কিছু বলে না।
চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে দরজার কাছে।
তার দৃষ্টি আদ্রিয়ান এর উপর, আদ্রিয়ান কে পর্যবেক্ষণ করছে সে।
___আদ্রিয়ান স্ক্রিনে চোখ রেখে কয়েক সেকেন্ড আরামে কাজ চালিয়ে যায়।
কিন্তু পরিবেশে নীরবতার হালকা চাপটাও তার চোখ এড়ায় না।
সে একটু বিরক্ত গলায় বলে
— কে?
চোখ তোলে।
সানমনে তাকিয়ে অবাক হয়ে যায়।
রাহি দাঁড়িয়ে।
পুরো সাফার গেট আপে।
চুলের স্টাইল, গায়ের পোশাক, এমনকি চোখের কাজলটা ও।
___না, এ সাফা নয়।
সাফা নেই।
মনে মনে আওরায় আদ্রিয়ান।
তবুও আদ্রিয়ানের চোখে হঠাৎ রক্ত উঠে আসে।
সে বিছানা থেকে উঠে দাঁড়ায়, চোয়াল শক্ত করে বলে,
—তুই এখানে কী করছিস?
প্রায় চিৎকার করে বলে।
___রাহি কাঁপা কাঁপা হাতে কাপটা সামনে বাড়িয়ে দেয়।
তোমার কফি।
— আমি কি কফি চেয়েছিলাম?
গলা নামিয়ে শীতলভাবে বলে আদ্রিয়ান।
তার চোখে বিদ্ধ করা ক্ষোভ।
আর তোকে কে বলেছে আমার রুমে আসতে?
___রাহির মুখটা ছোট হয়ে যায়।
চোখ নামিয়ে নেয়।
হৃদপিণ্ড কাঁপছে তার, এই অপমানে।
এই কণ্ঠ, এই অবজ্ঞা, এই মানুষটার কাছ থেকে সে নিতে পারে না।
রাহির চোখ ভিজে আসে।
সে কাপটা টিবিলে রেখে চুপচাপ ঘুরে দাঁড়ায়।
___কিন্তু ঠিক তখনই আদ্রিয়ানের গলা আবার উঠে আসে পেছন থেকে।
— আর একটা কথা এই রকম ড্রেসআপ করবি না।
তুই যার মতো হওয়ার চেষ্টা করছিস, তার মতো হতে পারবি না কখনো।
উল্টো, নিজেকে হারিয়ে ফেলবি।
তোর বয়স কম, কিন্তু এটা যত সহজে বুঝে ফেলবি তোর জন্যই ভালো হবে।
___শব্দগুলো ধারালো ছুরির মতো আঘাত করে রাহির আত্মায়।
সে দাঁড়িয়ে থাকে কয়েক সেকেন্ড, মাথা নিচু করে।
তার চোখ বেয়ে নীরব অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে।
কিছু বলার ভাষা নেই তার।
সে বেরিয়ে যায় চুপচাপ।
ট্রের কাপটা ঠান্ডা হয়ে পড়ে থাকে,
আর ল্যাপটপ স্ক্রিনে ঝাপসা হয়ে আসে লেখাগুলো।
__আদ্রিয়ান এক মুহূর্তে চেয়ারটা মুঠোয় চেপে ধরে।
তার বুকের ভেতর হঠাৎ অসহ্য এক ধাক্কা।
সে জানে,
এই মেয়েটা আজ কিছু চাইতে আসেনি,
শুধু একটু সান্নিধ্য, একটু প্রশ্রয় আর একটু সাহস নিয়ে এসেছিল।
কিন্তু তার হৃদয়ে যে জায়গায় একমাত্র সাফা ছিল,
সেখানে অন্য কাউকে দেখলেই সে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে।
তবুও সে জানে, রাহি যা করছে তা ভালোবাসা থেকে।
সে আমার বন্দিনী পর্ব ৩০
কিন্তু তার মুখে তা প্রকাশের অবকাশ নেই।
সাফার মৃত্যুর পর তার ভেতরের মানুষটা মরে গেছে।
শুধু একটা দহন আর অভিমান ঘিরে রেখেছে তাকে।
রাহি কাঁদতে কাঁদতে সিঁড়ি দিয়ে নামছে,
আর আদ্রিয়ান পেছন ফিরে জানালার দিকে তাকিয়ে থাকে,
বাইরে হালকা বৃষ্টি শুরু হয়েছে।
আর সেই ভেজা বাতাসে
তার নিঃশব্দ যন্ত্রণা ঘুরে বেড়ায়।
