Home এক মুঠো চাঁদের আলো এক মুঠো চাঁদের আলো পর্ব ২০

এক মুঠো চাঁদের আলো পর্ব ২০

এক মুঠো চাঁদের আলো পর্ব ২০
নুসরাত ফারিয়া

ভার্সিটি থেকে ফিরে নিজের রুমে প্রবেশ করতেই আধারের কপাল কুঁচকে যায়। নরম তুলতুলে বিছানার মাঝে বুকের নিচে বালিশ রেখে, উবুড় হয়ে তাতে ভর দিয়ে শুয়ে থেকে দুই পা নাড়াচ্ছে আর ফোনে হাসতে হাসতে কথা বলছে আলো। প্লাজু সরে হাঁটুর কাছে নেমেছে, ফলস্বরূপ ফর্সা চিকন পা জোড়া উন্মুক্ত। পিঠের দিকেও জামা সরে গিয়ে পাতলা বাঁকানো কোমর দৃশ্যমান। মাঝখান থেকে একটা লালচে তিল উঁকিঝুঁকিও দিচ্ছে। আধার কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে নজর সরিয়ে নিল। এই অসভ্য মেয়ের শোয়ার স্টাইল ভীষণ বাজে। ব্যাগ রেখে শরীর থেকে কোট খুলতেই কিছু কথা তার কানে এল। যেটা শুনে তড়াক করে মেয়েটার দিকে তাকাল।

-“হা হা হা! আর বলিস না বইন। বিশ্বাস কর, এখনো আমার পেট ফেটে হাসছি আসছে। শালু আর প্রপোজ করার মানুষ খুঁজে পেল না! ওই নিরামিষ, খট্টাশ, ত্যাড়া লোককেই করতে হলো? আমি ওকে বারবার মানা করেছিলাম ওই বাঁশঝাড়ের বাঁকা বাঁশের ওপর কেরাস খাস না। নয়তো কপালে দুক্কু আছে। কিন্তু কে শোনে কার কথা? ওই বদমাইশ লোকটার প্রেমেই পড়তে হলো, যে কি-না প্রেমের ‘প’ ও জানে না। ভাগ্যিস থাপ্পড়-টাপ্পড় মা’রেনি, নয়তো কী যে হতো। আমি জীবনে এমন আনরোমান্টিক ব্যাডা আর দুটো দেখিনি। শ্লার আমার বুইড়া জামাইয়ের বয়স বেশি হইলে কি হইবো? হেই ব্যাডা বহুত রোমান্টিক। ফোনের ওপার থেকেই সারাক্ষণ চুম্মা দেয়। তাহলে ভাব কাছে থাকলে কি করত। ভাবছি, মুইও টিকিট কেটে মুর পরাণের সোয়ামির কাছে উড়াল দিমু। বিয়ের পরেও কী এইভাবে সিঙ্গেল হয়ে থাকা যা…যা….য়!”
কথা বলতে বলতে পিছনে ফিরতেই আলোর চোখদুটো ছানাবড়া হয়ে গেল। একই সাথে গলায় কথা আটকে যায়। কান থেকে ঠাস করে ফোনটা বিছানায় খসে পড়ল। আলো শুকনো ঢোক গিলে আস্তে করে উঠে বসল। এই লোকটার না আজ দেরিতে আসার কথা ছিল? তাহলে এখন কীভাবে এল? নাকি সে জেগে জেগেই স্বপ্ন দেখছে?
ফোন থেকে ক্রমশই ‘হ্যালো, হ্যালো’ শব্দ ভেসে আসছে। আলো শুকনো ঢোক গিলে স্ক্রিনের দিকে তাকায়। হাতে নিতেই শুনতে পেল,

-“ঐ ছেমরি! ভাতারের দুঃখে কই হারাইলি হুহ্? নাকি এখনই উড়াল দিলি আদর নিতে?”
আলো খুকখুক করে কেশে উঠে তড়িঘড়ি করে লাইন কেটে দিল। সামনে তাকিয়ে খেয়াল করল—লোকটা শার্টের বোতাম খুলতে খুলতে তার দিকেই এগিয়ে আসছে। এই দৃশ্যটা দেখে আলোর দমটা বন্ধ হয়ে এল। ঝড়ের বেগে বিছানার আরো উপরে উঠতে গিয়ে ধরাম করে হেড বোর্ডে তার মাথাটা ঠুকে গেল। মেয়েটা ব্যথায় চোখমুখ কুঁচকে মাথার পিছনের অংশে হাত বুলিয়ে স্যারের দিকে ভয়ার্ত চোখে তাকায়। বেয়াদব লোকটা উদোম শরীরে তার কাছে চলে এসেছে। আলো চট করে হামাগুড়ি দিয়ে বিছানা থেকে পালিয়ে যেতে চাইল। কারণ এই লোকের মতিগতি তার সুবিধার লাগছে না৷ কিন্তু তাকে পালিয়ে যেতে না দিয়ে হঠাৎই এক পা চেপে ধরে হ্যাচকা টানে কাছে নিয়ে এল আধার। আলো হতভম্বের মতো উবুড় হয়ে পড়ে থেকে দু’হাতে বিছানার চাদর খামচে ধরল। সে মনে মনে প্রতিজ্ঞাও করে নিল, আর জীবনেও বান্ধবীদের কাছে স্যারের ব্যাপারে কিছু বলবে না।
আধার আলোকে সোজা করে পাশে দু’হাত রেখে, ভর দিয়ে মেয়েটার ওপর সামান্য ঝুঁকে পড়ল। তারপর ধীর কণ্ঠে আওরাল,

-“আমি বুইড়া?”
আলো চটপট দু’দিকে মাথা নাড়িয়ে বলল,
-“না, না, না! আপনি বুইড়া না। আপনি তো কচি খোকা!”
শেষের কথাটা বলে আলো দাঁত দিয়ে জিহ্বা কাটল। আধার আরেকটু ঝুঁকে থেমে থেমে বলল,
-“আদর চাই আপনার? সোয়ামির আদর চাই হুম? তা সহ্য করতে পারবেন তো—আপনার পরাণের সোয়ামির আদর, মিসেস খান? নাকি মাঝপথেই পালিয়ে যাবেন?”
আলো কী বলবে ভাষা খুঁজে পেল না। সে তো মজা করে তখন বান্ধবীকে ওই কথাগুলো বলছিল, কিন্তু এখন যে এইভাবে মজা বাঁশে পরিণত হবে বুঝতে পারেনি। সে জোরে জোরে শ্বাস নিতে নিতে বলল,
-“স…সরি স্যার। আর এমনটা করব না!”
আধার চট করে এক হাতে মেয়েটার দুই গাল চেপে ধরে দাঁতে দাঁত পিষলো,
-“সব নষ্টের গোড়া তোমার এই বেয়াদব মুখ। একটা কাজ করি! তোমার ঠোঁট দুটোই সেলাই করে দিই।”
বলেই আধার সরে গিয়ে সুই, সুতা খুঁজে বের করে আনল। এইদিকে আলো হতবাক হয়ে গেল। স্যারকে কাছে আসতে দেখে সে দু’হাতে নিজের মুখ চেপে ধরল। আধার টি-টেবিলের ওপর সুই, সুতা রেখে বিছানা থেকে শার্ট তুলে মেয়েটার মাথার ওপর ছুঁড়ে মে’রে গম্ভীর কণ্ঠে বলল,

-“ভদ্র মেয়ের মতো শার্টের বোতাম সেলাই করে দাও।”
একথা বলে আধার ওয়াশরুমে চলে গেল। আর আলো হাঁপ ছেড়ে বাঁচল। উফফ…আর একটুর জন্য তার প্রাণপাখিটাই উড়ে যায়নি!
আধার একটু সময় নিয়ে গোসল করে বেরিয়ে এল৷ রুমে কোথাও মেয়েটাকে দেখা গেল না। হটাৎ তার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি উঁকি দিল। ওই সময়ে মেয়েটার ভয়ার্ত চেহারা দেখে তার খুব হাসি পেয়েছিল। আজকে অসভ্য মেয়েটাকে একটু হলেও জব্দ করতে পেরে ভালোই লাগছে। আধার আনমনে এসব ভেবে মাথার চুলগুলো মুছতে মুছতে সোফার দিকে এগিয়ে যায়। কাঁধে তোয়ালে ঝুলিয়ে রেখে সাদা শার্টটা তুলে নিয়ে বোতাম চেক করতেই চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। বেয়াদব মেয়েটা সেলাই এর জায়গায় সব বোতাম ছিঁড়ে রেখে দিয়েছে।
আলো সন্ধ্যার দিকে রুমের ভেতর কফি নিয়ে প্রবেশ করল। এত সময় সে দাদাজানের রুমে ঘাপটি মে’রে বসে ছিল। স্যারকে শান্ত চেহারায় সোফায় বসে থেকে ল্যাপটপে কাজ করতে দেখে লম্বা শ্বাস ফেলে চুপচাপ এগিয়ে গিয়ে কাঁচের টি-টেবিলের ওপর কফির মগ রাখল। তারপর বিছানায় গিয়ে বসতেই ফোনটা বেজে উঠল। আলো উঁকি দিয়ে দেখে ফারাহ্ কল দিয়েছে। সে কপাল কুঁচকে কল রিসিভ করে ধীর কণ্ঠে বলল,

-“হুম, ফারু বল!”
অপর প্রান্ত থেকে কী বলা হলো বোঝা গেল না। তবে সবটা শুনে আলো অবাক কণ্ঠে বলল,
-“কিন্তু, আমি তো নাম দেইনি! তাহলে?”
ফারাহ্ আরো কিছু বলে কল কেটে দিল। আলো ফোন করে ধপ করে বিছানায় শুয়ে বিরবির করল,
-“স্যার? ভার্সিটিতে কী কোনো ভুত-টুত আছে?”
-“আমার জানা মতে, তুমি ছাড়া আর নেই।”
আলো তর্কে গেল না। বরং উদাস কণ্ঠে বলল,
-“আমার সাথেই কেন এসব হচ্ছে বলুন তো?”
আধার চোখের রিডিং গ্লাস ঠিক করে জানতে চাইল,
-“কী হয়েছে?”
-“দেখুন না স্যার! আমি যেটা চাই সেটা হচ্ছে না, কিন্তু আমি যেটা চাই না, ঠিক ওইটাই হচ্ছে।”
-“যা বলার সোজাসাপ্টা বলো।”
-“অনুষ্ঠানে নাচতে চেয়েছিলাম, কিন্তু আমার নামটা হাওয়া হয়ে গেল। আর এখন শুনছি গ্রুপ ট্যুরে যাওয়ার লিস্টে আমার নামও আছে। অথচ আমি ওইসবের আশেপাশেও যাইনি।”

-“ট্যুরে যাবে না কেন? যেখানে তোমার বান্ধবীরাও যাচ্ছে।”
আলো দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। সে তো যেতে চায় সবার সাথে। কিন্তু তার বাজেটে সমস্যা৷ বিকাশে মাত্র পাঁচশ টাকা পড়ে আছে। আর ট্যুরে যেতে লাগবে পাঁচ হাজারের মতো। সে এখন এতগুলো টাকা কোথায় পাবে? বাবাকেও বলে নিতে পারবে না। সে যদি বিয়ের পরও বাপ, চাচা, ভাইয়ের কাছ থেকে টাকা চায় তাহলে সেটা খুবই বাজে দেখাবে। তাই তো নিজের ইচ্ছেটাকে বিসর্জন দিয়ে চুপচাপ ছিল। কিন্তু এখন শুনছে তার নামও আছে৷ এইজন্যই ফারাহ্ কল দিয়েছিল। কারণ তারা জানে সে যাবে না। শেষ মূহুর্তে এসে যে, এমন চমক পাবে ভাবতেও পারেনি। আলো তপ্ত শ্বাস ফেলে ছাঁদের দিকে তাকিয়ে থেকে ধীর কণ্ঠে বলল,
-“বেকার মানুষদের সবকিছুতে মানায় না।”
-“নিজ ইচ্ছেতেই যদি বেকার থাকতে চাও, তাহলে কিছু বলার নেই।”
আলো কিছু না বলে চুপ করে থাকল। আধার উঠে এসে ড্রয়ার খুলে দুটো এটিএম কার্ড বের করে আলোর সামনে রেখে শান্ত গলায় বলল,

-“এইগুলো দিয়ে যা ইচ্ছে তাই করতে পারো।”
-“আমি আপনার টাকা কেন নিবো?”
-“স্বামীর টাকার ওপর স্ত্রীদেরও হক রয়েছে।”
-“কিন্তু…আমি আপনার টাকা এমনি এমনি নেবো না।”
-“এমনি এমনি নিতেও বলছি না। ধরে নাও এটা তোমার বেতন!”
-“মানে? কিসের বেতন?”
-“এই যে আমাদের জন্য এতকিছু করছো! তিনবেলা হাত পুড়িয়ে রান্না করছো, আমার সেবা করছো, রুম শেয়ার করছো, বেড শেয়ার করছো, ওয়াশরুম শেয়ার করছো, জামাকাপড় ধুয়ে দিচ্ছো, সবার খেয়াল রাখছো…. এভরিথিং! তারজন্য তোমাকেও তো কিছু দিতে হয়।”
-“আমি যা কিছু করি সবটাই মন থেকে৷ এসব টাকার জন্য না!”
-“আমি জাস্ট উদাহরণ দিলাম।”
একটু থেমে পুনরায় বলল,
-“আমার টাকা খরচ করতে তোমার এত সমস্যা কেন?”
-“জানি না।”
-“ঠিক আছে। এখন নাহয় ধার হিসেবেই নাও। পড়াশোনার পর জব করে ফিরিয়ে দিও। তখন চাইলে তুমি আমায় বসিয়ে রেখেও খাওয়াতে পারো, আই ডোন্ট মাইন্ড!”
আলো মূহুর্তেই হেঁসে উঠে বলল,

-“আপনি বাচ্চাকাচ্চা পালবেন আর আমি বাইরে জব করব। ব্যাপারটা সত্যিই দারুণ!”
আধার এক ভ্রু উঁচিয়ে শুধাল,
-“বাচ্চাকাচ্চা?”
-“হুম! কিছু ভুল বললাম নাকি?”
-“উঁহু! রেডি হয়ে নাও, বেরোবো আমরা।”
আলো শোয়া থেকে উঠে বসে জানতে চাইল,
-“কোথায় যাবো?”
-“আমি যেখানে নিয়ে যাবো, সেখানে।”
-“আমার মতো ভোলাভালা মেয়েকে নিয়ে গিয়ে যদি বেচে দেন, তখন?”
-“তুমি আর ভোলাভালা? সিরিয়াসলি মিস. কালো? তোমাকে বিক্রি করতে গিয়ে দেখা যাবে, উল্টো তুমি আমাকেই বিক্রি করে দিয়ে, বসে থেকে বাদাম খাচ্ছো।”
আলো মুখ ভেংচি কেটে আলমারি খুলে একটা সুতির শাড়ি বের করতেই আধার গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
-“শাড়ি বাদে যা ইচ্ছে পরা হোক।”
-“শাড়ি পরলে কী সমস্যা?”
-“অনেক সমস্যা!”

বলেই আধার রুম থেকে বেরিয়ে গেল। আলো কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। সে তো শাড়ি পরে মানুষটার সাথে ঘুরতে চেয়েছিল। কিন্তু এই ব্যাডার এখন তার শাড়ি পরা নিয়েও সমস্যা! আলো সুন্দর দেখে একসেট কারুকাজের সেলোয়ার-কামিজ বের করে নিল। তারপর তৈরি হতে শুরু করল।
আধার আলোকে নিয়ে শপিংমলে এসেছে। বিয়ের পর মেয়েটাকে কিছু দেওয়া হয়নি তার। তাই আজ মেয়েটার যা যা প্রয়োজন সবকিছু নিয়ে দিতে এসেছে। তারমধ্যে কিছুদিনের জন্য তারা ভার্সিটি থেকে গ্রুপ ট্যুরে যাবে। সবকিছু মিলিয়ে শপিং করাটা জরুরী হয়ে দাঁড়িয়েছে। এত এত মানুষের মধ্যে আলো বারবার পিছিয়ে যাচ্ছে। এতে বেশ বিরক্ত হয় আধার। সে পিছনে গিয়ে আলতো হাতে মেয়েটার ডান হাত চেপে ধরে ভেতরে নিয়ে গেল। তারপর যেটা যেটা পছন্দ হয়, সেটা সেটা নিতে বলল৷ আলো সরু চোখে তাকিয়ে বিরবির করল,

-“এখন যদি পুরো শপিংমল নিয়ে নিই তখন?”
আধার নিজের জন্য ড্রেস দেখতে দেখতে ধীর কণ্ঠে বলল,
-“নিতে পারো সমস্যা নেই৷”
আলোর নজর একটি আকাশি রঙা শার্টের দিকে যায়। সে শার্টের দিকে ইশারা করে বলল,
-“ওই শার্টে আপনাকে সুন্দর লাগবে স্যার!”
আধার একপলক তাকিয়ে বলল,
-“আমি সাদা-কালো ছাড়া পড়ি না।”
আলো চোখমুখ কুঁচকে ওখান থেকে সরে যেতে যেতে বিরবির করল,
-“বে-রঙিন মানুষ!”
ড্রেস নেওয়া শেষে তারা একটি জুয়েলারি শপে প্রবেশ করল। আলো আশেপাশে তাকাতে তাকাতে জিজ্ঞেস করল,
-“আমরা এখানে কেন এলাম স্যার?”
-“কাবাডি খেলার জন্য।”

আধার মেয়েটাকে নিয়ে সামনে এগিয়ে যায়। তারপর সেলস গার্লকে কিছু চুড়ির ডিজাইন দেখাতে বলে। সিম্পল ডিজাইনের খুব সুন্দর একজোড়া চুড়ি পছন্দ করে মেয়ের দু’হাতে পরিয়ে দিতেই আলো হকচকিয়ে উঠে বলল,
-“আমি এসব পড়ি না স্যার!”
-“দাদাজান বলেছে, বাড়ির বউদের খালি হাতে মানায় না। এখন থেকে সবসময় এইগুলো পরে থাকবা।”
আলো নিজের হাতের দিকে তাকায়। মানুষটার পছন্দের তুলনা হয় না। আধার ছোট্ট একটি ডায়মন্ডের নোজপিন আলোর সামনে রেখে বলল,
-“এটা পরা হোক!”
আলো কপাল কুঁচকে বলল,
-“আপনি কী আমাকে ছিন’তাইকারীদের হাতে তুলে দিতে চান? এত দামী দামী জিনিস শরীরে থাকলে আমাকে দিন দুপুরে তুলে নিয়ে যাবে রাস্তায় থেকে।”
-“তোমার মতো পাগলকে কেউই নিয়ে যাবে না। সো রিল্যাক্স!”
আলো কিছু বলতে যাবে তখনই স্যারের কঠিন নজর খেয়াল করে আর বলার সাহস পেল না। চুপচাপ নাকে নোজপিনটা পরে নিল। আধার ঠোঁট কামড়ে দুটো নেকলেস সেটের দিকে তাকিয়ে আছে। ওইদিনের সব গহনা তাহমিনা খান নিজের কাছে রেখে দিয়েছে। এখানে আসার আগে সোবহান খান বলে দিয়েছিলেন, মেয়েটাকে কিছু গহনাগাঁটি নিয়ে দিতে। এটার জন্য উনি নিজেই টাকা দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু আধার নেয়নি! মেয়েটাকে যা দেওয়ার সবটা নিজের টাকা দিয়েই দিবে। তিথির জন্যও একটা ব্রেসলেট নিয়েছে। আপাতত সে কনফিউজড এই দু’টো নেকলেসের মধ্যে থেকে কোনটা পরলে মেয়েটাকে মানাবে। আধার কল্পনা করার চেষ্টা করল। শেষমেশ অধৈর্য্যের মতো দুইটাই নিয়ে নিল।

-“তোমার নূপুর বেচে খেয়ে নিয়েছো?”
আধার কয়েক জোড়া রুপোর নূপুর দেখতে দেখতে জিজ্ঞেস করল। আলো জোরে শ্বাস নিয়ে বলল,
-“একটা হারিয়ে গেছে, তাই আরেকটা খুলে রেখেছি।”
-“তোমার থেকে এটাই আশা করা যায়।”
-“আমি নূপুর নিবো না।”
-“নূপুর পরলে আমি যেন তোমার অস্তিত্ব বুঝতে না পারি এবং এই সুযোগে হুটহাট ওয়াশরুমের ভেতর ঢুকে যাবে, এটাই কী চাও?”
আধার মেয়েটার দিকে ঝুঁকে ফিসফিসিয়ে বলে। আলো দাঁতে দাঁত চেপে টুলের ওপর বসে নিজের পা জোড়া এগিয়ে দিয়ে বলল,
-“নিন, পরিয়ে দিন!”
আলো ভেবেছিল মানুষটা কথা শুনবে না। কিন্তু তাকে অবাক করে দিয়ে আধার সকলের সামনে হাঁটু গেড়ে বসে মেয়েটার পায়ে নিজের পছন্দের নূপুর জোড়া পরিয়ে দিল। কিছুক্ষণ ঠোঁট কামড়ে সুন্দর পায়ের দিকে তাকিয়ে থেকে অস্ফুটস্বরে বিরবির করল,
-“নূপুরের জন্য পায়ের সৌন্দর্য বাড়ল নাকি পা জোড়ার জন্য নূপুরের সৌন্দর্য বাড়ল?”

শপিং শেষ করতে করতে রাত হয়ে আসে। দু’জন রেস্টুরেন্ট থেকে ডিনার করে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছে। ড্রাইভিং সিটের পাশে বসে আলো সেই তখন থেকে নিজের হাতপা দেখছে আর মনে মনে হাসছে। এখন তাকে দেখে বিবাহিত বিবাহিত মনে হচ্ছে। মেইন রোডে আসতেই জ্যামে আঁটকে গেল। আধার বিরক্তিতে চোখমুখ কুঁচকাল। তবে ঘাড় ঘুরিয়ে পাশে তাকাতেই চোখজোড়া শীতল হয়ে এল। সে নিজেও জানে না, ঠিক কতক্ষণ একইভাবে তাকিয়ে থাকল মেয়েটার দিকে।
-“ভাইয়া ফুল নিবেন?”
একটি বাচ্চা মেয়ের কণ্ঠস্বর শুনে আধারের হুঁশ ফিরল। সে চট করে নজর সরিয়ে ডানপাশে তাকায়। বাচ্চা মেয়েটা দু’হাতে এক গুচ্ছ গোলাপ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আধার কিছুক্ষণ চুপ থেকে ধীর কণ্ঠে দাম জানতে চাইল। মেয়েটা জানাল—ত্রিশ টাকা করে, আর ওখানে আছে বিশটার মতো গোলাপ। আধার হাজার টাকার নোট বের করে দিয়ে সবগুলোই ফুল নিয়ে নিল। মেয়েটা টাকার নোট হাতে নিয়ে বলল,

-“ভাইয়া আমার কাছে খুচরো নেই।”
-“সমস্যা নেই। তুমি পুরোটাই রেখে দাও।”
মেয়েটা হেঁসে একটা বেলি ফুলের মালা দিয়ে বলল,
-“এটা ভাবীকে দিন।”
আধার চুপচাপ মালাটা নিল। মেয়েটা একগাল হেঁসে ছুটে চলে গেল। আলো ফুলের দিকে তাকিয়ে থেকে বিরবির করে বলল,
-“গার্লফ্রেন্ডের জন্য বুঝি ফুল নেওয়া হলো?”
আধার ফুলগুলো মেয়েটার কোলের ওপর ছুঁড়ে মে’রে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
-“হ্যাঁ!”
আলো ঠোঁট কামড়ে হেঁসে ফুলগুলো গুছিয়ে নিয়ে ঘ্রাণ শুকতে শুকতে বলল,
-“আমি আমার জিনিসের ভাগ কাউকে দেওয়া পছন্দ করি না।”
রাস্তা ফাঁকা হয়ে এসেছে। আধার গাড়ি স্টার্ট দিতে দিতে আনমনে বলল,
-“আমিও!”
গাড়িটা একটা গলির দিকে আসতেই আলো তড়িঘড়ি করে বলে উঠল,
-“স্যার…স্যার? ফুচকা, ভেলপুরি খাবো। গাড়ি থামান!”
আধার ব্রেক কষে বলল,

-“তোমরা মেয়েরা ভালো খাবার চোখে দেখো না? সবসময় এমন রাস্তার খাবার পছন্দ করো কেন?”
-“মজা লাগে তাই।”
আধার কিছু না বলে গাড়ি সাইড করে বেরিয়ে গেল। আলো সিট বেল্ট খুলতে খুলতে বলল,
-“আরে আরে স্যার…আমিও যাবো, দাঁড়ান!”
আধার হঠাৎই থেমে গেল। ফিরে এসে দাঁত কিড়মিড় করে বলল,
-“ওই দোকান দেখেছো? কত ভিড় আর ছেলে? তুমি এদের মধ্যে যেতে চাও? সিরিয়াসলি?”
আলো ভরকে গেল। সে মাথা ঘুরিয়ে জানালা দিয়ে উঁকি দিল। মেয়ে-ছেলে গিজগিজ করছে। ওটার মধ্যে যাওয়া মানে বাজে পরিস্থিতিতে পড়া একই ব্যাপার।
-“ইয়ে না মানে স্যার….আমি আসলে খেয়াল করিনি।”
আলো আমতাআমতা করে বলল। আধার কিছু না বলে চলে গেল দোকানের দিকে। এইদিকটায় ফুচকার দোকান একটা হওয়ায় ভীড়টাও বেশি। আলো একা একা বসে থেকে বোর হচ্ছিল। তাই সে ডোর খুলে বেরিয়ে আসতে চাইল। কিন্তু পারল না। ওই বদমাইশ লোকটা বাহির থেকে দরজা লক করে গেছে। সে কী পালিয়ে যাবে নাকি আশ্চর্য!
বেশ কিছুক্ষণ পর আধার এক প্লেট ফুচকা আর এক প্লেট ভেলপুরি নিয়ে এসে জানালা দিয়ে আলোকে দিল। আর সে জানালার পাশে পানির বোতল হাতে নিয়ে গাড়ির সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকল। আলো বাইরে মাথা বের করে ধীর কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,

-“খাবেন স্যার?”
-“পঁচা পানিযুক্ত ফুচকা তুমিই খাও!”
আলো আর কিছু না বলে চুপচাপ খেতে থাকল। কয়েক মিনিটের মধ্যেই দুটো প্লেট ফাঁকা করে স্যারের হাতে ধরিয়ে দিয়ে পানির বোতল নিল। আধার দোকানে প্লেটগুলো দিয়ে আইসক্রিম নিয়ে ফিরে এল। কারণ ঝালে মেয়েটার চেহারা পুরো টমেটোর মতো লাল হয়ে গেছে।
-“আর কিছু খাবে?”
আলো আইসক্রিম খেতে খেতে হাত দিয়ে একটা দোকানে ইশারা করে বাচ্চাদের মতো আবদার করল,
-“শিক কাবাব খাবো স্যার!”
আজ যেন আধার প্রচুর বাধ্য ছেলে। সে মেয়েটার কথামতো কাবাবও নিয়ে এল। আলো আইসক্রিম শেষ করে প্লেট হাতে নিয়েই বেরিয়ে এসে স্বামীর পাশে দাঁড়াল। তারপর ধীর কণ্ঠে বলল,
-“এটাতে পঁচা পানি নেই। খাবেন?”

আধার দু’হাত পকেটে গুঁজে গাড়িতে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। পাশে ঘাড় ঘুরিয়ে মেয়েটার রক্তিম চেহারার দিকে তাকায়। তারপর মুখ খুলে কিছু বলতে যাবে তখনই আলো কাবাবের টুকরো নিয়ে তার মুখের ভেতর চট করে ঢুকিয়ে দিল। মেয়েটার এহেন কাজে আধারের চোখদুটো বড়বড় হয়ে যায়। সে বিস্ময়ে চেয়ে রইল হাসিমাখা মুখের দিকে।
আলো ঠোঁট কামড়ে হাসি আটকিয়ে রাখার চেষ্টা করছে। কিন্তু পারছে না। বহু কষ্টে নিজেকে সামলিয়ে কাছে একটু এগিয়ে এসে নিজের ওড়নার আঁচল টেনে নিয়ে, মানুষটার ঠোঁটের কোণ মুছে দিতে দিতে শান্ত গলায় বলল,
-“নিজের চারপাশে এত অদৃশ্য দেয়াল না রেখে, একটু খোলা আকাশে মুক্ত পাখির মতো উড়ে দেখুন স্যার। তাহলে বুঝবেন জীবনটা কত সুন্দর!”

আধার কিছু না বলে সোজা হয়ে কাবাব চিবোতে লাগল। আলো খেতে খেতে স্যারের গা ঘেঁষে দাঁড়াল। সে আবারো এক পিস কাবাব তুলে মানুষটার মুখের সামনে ধরল। এবার আধার বিনাবাক্যে মুখে তুলে নিল। এটা দেখে আলোর ঠোঁটের কোণেও হাসি ফুটে উঠল। সে নিজেও খাচ্ছে আর স্যারকেও খাইয়ে দিচ্ছে। লাস্ট পিস কাবাব মুখে নেওয়ার সময় আধার ইচ্ছে করে মেয়েটার আঙুলে জোরসে কামড় বসিয়ে দিল। এতে মেয়েটা হকচকিয়ে উঠে আর্তনাদ করে হাত সরিয়ে নিল।
আলো ছলছল চোখে নিজের লাল হয়ে ফুলে ওঠা আঙুলের দিকে তাকিয়ে আছে। বেয়াদব লোকটা যে এমন কিছু করবে কল্পনাও করতে পারেনি৷ সে নাক টেনে খেঁকিয়ে উঠল,
-“রাক্ষস কোথাকার!”
আধার পানি খেতে খেতে নিঃশব্দে হাসল। তারপর বোতলটা বাড়িয়ে দিল মেয়েটার দিকে। আলো বোতলটা নিয়ে পিছনে ফিরে দরজা খুলে গাড়ির ভেতর ঢোকার সময় অনুভব করল, তার ওড়না পিছন থেকে টেনে ধরা হয়েছে। আলো চমকে উঠে পিছনে তাকায়। ততক্ষণে তার আঁচল টেনে নিয়ে নিজের ভেজা ঠোঁট মুছে নিয়েছে আধার।

সন্ধ্যা থেকে রাত দশটা অবধি বাহিরে তারা কী কী করেছে সবকিছুর ঝুড়ি খুলে বসেছে সোবহান খানের ঘরে। এতদিন পর আজ মেয়েটাকে এত খুশি দেখে সোবহান খান মনে মনে স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়লেন। মেয়েটার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে শুধু বললেন,
-“কখনো আমার নাতিটাকে ছেড়ে যেও না। এইভাবেই সবসময় পাশে থেকো নাতবউ!”
আলো তখন হেঁসে জবাব দেয়,
-“একবার ভুল করেছিলাম দাদাজান। কিন্তু ওই একই ভুল আর কখনোই করব না। স্যার না চাইলেও আমি উনার পাশে থাকব!”
আলো দাদাজানের সাথে গল্প করে রুমে গেল। তখন বাজে রাত বারোটা। রুমে এসে দেখে মানুষটা ঘুমিয়ে পড়েছে। আলো দরজা বন্ধ করে ফ্রেশ হয়ে বিছানায় এল। তারপর কিছুক্ষণ বসে থেকে স্যারের কাছে গিয়ে চেক করল, মানুষটা আদৌ ঘুমিয়ে গেছে কি-না! যখন শিওর হলো লোকটা ঘুমিয়ে আছে, তখন সে আস্তে করে বুকের মাঝে শুয়ে দু’হাতে স্যারকে জড়িয়ে ধরে গলায় মুখ গুঁজে দিল। কিছুক্ষণ চুপ থেকে নাকেমুখে শব্দ তুলে নিঃশ্বাস ছাড়ল, তারপর মাথাটা তুলে ছোঁচা গালে চুমু খেয়ে ফিসফিসিয়ে বলল,

এক মুঠো চাঁদের আলো পর্ব ১৯

-“সুন্দর কিছু মূহুর্ত উপহার দেওয়ার জন্য, আপনাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ…আমার পঁচা স্যার!”
কথাগুলো বলে উন্মুক্ত বুকের মাঝে কিছুক্ষণ নাক ঘষাঘষি করে একসময় ঘুমের দেশে হারিয়ে গেল আলো। ঠিক তখনই এক জোড়া রক্তিম চোখ খুলে গেল! এবং আপনাআপনি এক হাত চলে গেল নিজের গালে। যেখানে মেয়েটা একটু আগেই চুমু খেয়েছে…

এক মুঠো চাঁদের আলো পর্ব ২১

2 COMMENTS

Comments are closed.