এক মুঠো চাঁদের আলো পর্ব ২৩
নুসরাত ফারিয়া
-“তুমি কী সোহানকে লাইক করো?”
আলো রেস্টুরেন্টের ভেতর একটা ফাঁকা টেবিলে বসে থেকে নানরুটি দিয়ে পোড়া মাংস খাচ্ছিল। দেরিতে লাঞ্চ করার ফলে এখন একা একা বসে থেকে খেতে হচ্ছে৷ কারণ সবাই অলরেডি খেয়েদেয়ে রেস্ট নিতে চলে গিয়েছে। বিকেলে তারা লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে যাবে। সে যখন একমনে বসে থেকে মাংস চিবোচ্ছিল, তখন আধার স্যার কই থেকে এসে ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল। আলো বড়বড় চোখে তাকিয়ে মুখের খাবার শেষ করে বলল,
-“আমি কেন ওই চাশমিশকে পছন্দ করতে যাবো?”
-“তাহলে গতকাল ওর থেকে ফুল, চিঠি নিলে কেন?”
আলো কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেল। তারপর কিছু একটা ভেবে দাঁত কেলিয়ে বলল,
-“আপনি কী জেলাস মি. খান?”
-“আধার খান আর জেলাস? তাও তোমাকে নিয়ে? সিরিয়াসলি মিস. কালো? পুরো দুনিয়া উল্টে গেলেও আধার খান কখনো তোমাকে নিয়ে জেলাসফিল করবে না। ওই অপশনটাই নেই আমার মাঝে! সো এসব ফালতু চিন্তাভাবনা বাদ দাও।”
-“আরে আপনি এত রাগছেন কেন? আমি তো মজা করছিলাম।”
-“তোমার এই সো কোল্ড মজা—তোমারই কাছে রাখো!”
আলো বিরক্তিতে খাবার খেতে লাগল। তখন একজন ওয়েটার এসে হাঁসের কালা ভুনা দিয়ে যেতেই আধার দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
-“এ্যাই বেয়াদব মেয়ে? তোমার না এতে এলার্জি আছে? তাহলে আবার কোন শরমে এটা অর্ডার দিয়েছো হুহ্? খাওয়ার পর কী হসপিটালে যাওয়ার মতলব করেছো? নাকি আমাকে জ্বালানোর?”
আলো হা করে তাকিয়ে থেকে বলল,
-“আপনি এইভাবে কথায় কথায় ছাঁৎ করে উঠছেন কেন, আশ্চর্য!”
-“তুমি কাজই এমন করেছো তাই।”
-“কী করেছি আমি, হুম?”
আধার ঝুঁকে একহাতে মেয়েটার নরম দুগাল চেপে ধরে চোখে চোখ রেখে বলল,
-“এমন কিছু, যেটা তোমার করা একদম উচিত হয়নি মিস. কালো!”
গালের ব্যথায় আলোর চোখদুটো ছলছল করে উঠল। সে নাক টেনে বলল,
-“এমনভাবে বলছেন যেন, আমি আপনার বউকে নিয়ে ভেগে গেছি।”
আধার কিছু বলতে যাবে তখনই তার নজর যায় মেয়েটার রক্তিম ঠোঁটের ওপর। দুগাল চেপে ধরার ফলে ঠোঁট জোড়া কিঞ্চিৎ ফাঁক হয়ে আছে। লোভনীয় ওষ্ঠপুটের দিকে তাকিয়ে থেকে আধার কপাল কুঁচকায়। কিছুদিন আগেই এই বেয়াদব ঠোঁট জোড়া ছুঁয়েছিল তার গাল! এটা মনে হতেই সে চট করে গাল ছেড়ে সোজা হয়। তার ঘুমের সুযোগ নিয়ে যে এই অসভ্য মেয়েটা আর কী কী করে কেহ জানে।
গাল ছাড়া পেতেই আলো একহাতে নিজের গাল ডলতে ডলতে বিরবির করে বলল,
-“হাত যেন নয়, আস্ত একটা লোহা!”
আধার ঘাড় কাত করে মেয়েটার গালের দিকে তাকায়৷ যেখানে ধরেছিল, সেখানে লাল হয়ে গেছে৷ মেয়েটাকে দেখতে এখন মন্দ লাগছে না! বরং কিউটই লাগছে।
-“আমাকে বকাবকি করা হয়ে গেলে এখন বসে থেকে লাঞ্চ করুন।”
আধার নিজের হাতঘড়ির দিকে তাকায়। আড়াইটা বেজে গিয়েছে! তাই সে কথা না বাড়িয়ে মেয়েটার পাশের চেয়ারে বসল। আলো হাঁসের মাংস খেতে গেলে স্যারের চোখ রাঙানো দেখে আর খাওয়ার সাহস পেল না। বদমাইশ লোকটা এমনভাবে তাকিয়ে আছে যেন সে হাঁসের মাংস নয়, বরং বি’ষ খেতে যাচ্ছে! আলো একবুক কষ্ট নিয়ে হাঁসের মাংসের প্লেট স্যারের দিকে এগিয়ে দিল। শুধু শুধু খাবার নষ্ট করার কোনো মানে হয় না! আধার মেয়েটার জন্য চিকেন চাপ আর কাবাব অর্ডার করল।
খাওয়ার একফাঁকে খেয়াল করল মেয়েটার ঠোঁটের কোণে খাবার লেগে আছে। অথচ মেয়েটার সেদিকে কোনো হুঁশ নেই, সে তো একমনে খেতে ব্যস্ত! আধার তপ্ত শ্বাস ফেলে টিস্যু বক্স থেকে টিস্যু নিয়ে মেয়েটার ঠোঁটের কোণ মুছে দিল। এতে আলোর চোখদুটো বড়বড় হয়ে যায়৷ পর মূহুর্তে স্যারের চোখের আড়ালে ঠোঁট কামড়ে মিটমিট করে হাসল৷ এই লোকটা যতোই তার সাথে রাগারাগি, বকাবকি, ঝগড়া করুক না কেন! দিনশেষে এই পঁচা মানুষটাই তো তার খেয়াল রাখে, যত্ন করে। আর এতেই সে ভীষণ খুশি।
আলো আশেপাশে নজর বুলিয়ে নিয়ে পোড়া মাংস তুলে স্যারের মুখের সামনে ধরল। এটা নিয়ে না আবার লোকটা এখন ত্যাড়ামি শুরু করে। আধার একপলক তাকিয়ে বিরবির করে বলল,
-“আমাকে দেখে তোমার বাচ্চা মনে হয়? একটু সুযোগ পেলেই তুলে খাওয়াও!”
-“আপনাকে খাওয়াতে আমার ভালো লাগে তাই।”
আধার ফোঁস করে শ্বাস ফেলে মেয়েটার হাত ধরে মাংস মুখে নেওয়ার সময় জোরসে কামড়ও বসিয়ে দিল। আলো হকচকিয়ে উঠে চট করে হাত সরিয়ে নিয়ে ছলছল চোখে তাকায়। এই লোকটা তার সাথে এমন করে কেন? অন্যদিকে, আধার আড়ালে নিঃশব্দে হাসল। তার কেন জানি মেয়েটাকে জ্বালাতে ভালোই লাগে! উমম…হয়তো একটু বেশিই।
-“আই হোপ! নেক্সট টাইম আর তুলে খাওয়ানোর চেষ্টা করবে না।”
স্যারের কথা শুনে আলো নিজের লাল হয়ে ফুলে ওঠা আঙুলের দিকে তাকায়৷ আগের বারেরও লোকটা এইভাবে কামড় মে’রেছিল, কিন্তু আজকে একটু জোরেই মে’রেছে। কেমন চিনচিনে ব্যথা হচ্ছে! আলো দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল,
-“আপনাকে নিজ হাতে খাওয়ানোর বিনিময়ে যদি আঘাত পেতে হয়, তাহলে সেটাই সই। তবুও আমি হাল ছাড়ব না!”
আধার অন্যদিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে ধীর কণ্ঠে জানতে চাইল,
-“কেন আমার মতো খারাপ লোকের কাছে থাকো?”
-“কে বলেছে আপনি খারাপ?”
-“খারাপ না হলে তোমাকে কষ্ট দেই?”
আলো হেঁসে বলল,
-“আমাদের সম্পর্কটা একটু অদ্ভুত স্যার। যেখানে আমরা কেউই একে অপরের পিছনে না লেগে থাকতে পারি না। আর আমি কী ভালো নাকি? মনে নেই আপনার? একবার আমার জন্য আপনি ড্রেনে পড়েছিলেন!”
আধার ঠোঁট কামড়ে হাসল। তারপর বলল,
-“ভাগ্যিস ওইদিন তোমাকে থাপ্পড় মা’রিনি। শুধু আমার স্টুডেন্ট হওয়ায় বেঁচে গিয়েছিলে!”
-“আর এখন?”
-“এখন ওমন করলে, সোজা মাথায় তুলে আছাড় মা’রব।”
আলো চোখমুখ কুঁচকে বলল,
-“আপনি কখনো ভালো হবেন না, তাই না?”
আধার মাথা নাড়িয়ে বলল,
-“উঁহু….কখনোই না!”
পড়ন্ত বিকেলের দিকে সবাই লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে ঘুরতে এসেছে। এটি বাংলাদেশের সবচেয়ে সুন্দর এবং বৈচিত্র্যময় বনাঞ্চলগুলোর মধ্যে একটি। এখানকার বনের ভেতরে সূর্যের আলো খুব কম পৌঁছায়, কারণ এখানে গাছের কয়েক স্তরের বিন্যাস রয়েছে। ফলে বাইরের তাপমাত্রার চেয়ে বনের ভেতরটা অনেক বেশি শীতল ও শান্ত! এখানে সেগুন, লোহাকাঠ, আগর, গর্জন এবং চ্যাপালিশের মতো বিশাল বিশাল সব গাছ রয়েছে। বনের গাছে গাছে ঝুলে থাকা লতাগুল্ম এবং বুনো অর্কিড একে একটি আদিম বনের রূপের মতো লাগছে। বনের ভেতর দিয়ে ছোট ছোট অনেক বালুময় পানির ধারা বয়ে গেছে, যা পরিবেশকে আরও জীবন্ত করে তুলেছে।
বনের সৌন্দর্যের চেয়ে বেশি গা ছমছমে পরিবেশ দেখে আলো কিছুটা ভরকায়। কারণ যেখানেই নজর যাচ্ছে, সেখানেই শুধু ঘন জঙ্গল আর ঘন জঙ্গল। আশেপাশে ছোট ছোট পাহাড়ও দেখা যাচ্ছে। তাদের সাথে কয়েকজন এখানকার গাইড এসেছে। তাদের নিদর্শনায় সবাই বনের ভেতরে ঢুকবে এবং চারপাশে ঘুরে দেখবে। নয়তো ঘন জঙ্গলের ভেতর পথ হারিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সে আশেপাশে তাকাতে তাকাতে বান্ধবীদের থেকে দূরে সরে গেল। মূলত সে একজনকে খুঁজছে কিছু বলার জন্য।
-“আমি সোহানকে পছন্দ করি না স্যার!”
আধার এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থেকে ফোনের নেটওয়ার্ক খুঁজছিল। তখন মেয়েটার কথা শুনে পাশে তাকায়। আজ মেয়েটা আকাশি রঙা গাউন পরেছে। যেটা বাতাসের তালে তালে দুলছে! আলো আশেপাশে তাকিয়ে আবারো বলল,
-“ওইগুলো চিঠি, ফুল তামান্নার জন্য ছিল। আসলে সোহান তামান্নাকে ভালোবাসে। কিন্তু বেচারা ভয়ে বলতে পারছিল না। তাই আমার সাথে ভাব জমিয়েছিল, যেন আমি তাকে সাহায্য করি। বোকা ছেলেটা জানতই না, তাকে তামান্নাও মনে মনে পছন্দ করে। আর আমি ওইগুলো তামান্নার রুমে রেখেছিলাম। তারপর ফোনে তাকে সবটা জানিয়েছি।”
আধার কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
-“তো এসব আমাকে বলছো কেন? তুমি কাকে পছন্দ করবে নাকি করবে না, সেটা তোমার ব্যাপার। এতে আমার কী!”
-“আমি চাই না অহেতুক আপনি আমাকে ভুল বুঝুন।”
-“আমি ভুল বুঝলাম নাকি বুঝলাম না, এতে তোমার কী?”
-“অনেক কিছু।”
আলো গোমড়া মুখে বলল। আর আধার শান্ত চোখে তাকিয়ে রইল। তারপর ধীর কণ্ঠে আওরাল,
-“আমার চোখের আড়াল হবে না আজ।”
আলো কপাল কুঁচকে জিজ্ঞেস করল,
-“কেন?”
-“তুমি যেই বিচ্ছু মেয়ে, তাতে দেখা যাবে জঙ্গলের ভেতর হারিয়ে গেছো। তারপর কোনো জীবজন্তুর পেটে গিয়ে বসে আছো। তখন দাদাজান আমাকে বলবে, আমি তোমাকে মে’রে-টেরে কোথাও একটা গুম করে দিয়েছি। সো…এই রিক্স নিতে চাচ্ছি না আমি, আর না বিনাদোষে জেলে যেতে চাই!”
আলো শব্দ করে হেঁসে উঠে বলল,
-“বলা তো আর যায় না, এটাই আমাদের শেষ দেখা। আর কখনো আপনার সাথে খান বাড়িতে ফিরলাম না! উমম… তখন ব্যাপারটা কেমন হবে? নিশ্চয়ই আপনি খুশি হবেন?”
মেয়েটার হেঁয়ালি কেন জানি আধারের পছন্দ হলো না। সে চোখ পাকিয়ে তাকাতেই আলো দাঁত বের করে বলল,
-“আরে রাগ করবেন না, মজা করছিলাম। আমি কিন্তু এত সহজে আপনার পিছু ছাড়ছি না হুহ্! আচ্ছা আপনি এখানে দাঁড়িয়ে থেকে নেটওয়ার্ক খুঁজুন, আমি একটু ঘুরে আছি। বাই, বাই স্যার!”
একথা বলে আলো পিছনে ফিরতেই আধার খপ করে তার হাতের বাহু চেপে ধরল। তারপর নিজের সাথে মেয়েটাকে টেনেটুনে নিয়ে যেতে যেতে গম্ভীর কণ্ঠে বলে উঠল,
-“যেতে হবে না কোথাও!”
বনের গভীরে যাওয়ার জন্য তিন ঘণ্টার দীর্ঘ ট্রেকিং ট্রেইল নেওয়া হয়েছে। সবাই চারটে আলাদা আলাদা দলে ভাগ হয়েছে। প্রতিটা গ্রুপে একজন করে গাইড, শিক্ষক ও দশজন স্টুডেন্ট।
বনের ভেতর পা রাখতেই প্রথমে নাকে এল ভেজা মাটি আর বুনো লতাপাতার একটা সতেজ ঘ্রাণ। আকাশ দেখার কোনো উপায় নেই, কারণ মাথার ওপর শত বছরের পুরোনো বিশাল বিশাল সেগুন, গর্জন আর চ্যাপালিশ গাছের ডালপালা একে অপরের হাত ধরে চাঁদোয়া বানিয়ে রেখেছে। সূর্যের আলো সেই ঘন পাতা চিরে নিচে নামতে পারে না বললেই চলে, কেবল ছোট ছোট আলোর রেখা তলো/য়ারের মতো অন্ধকার ভেদ করে মাটির ওপর আছড়ে পড়েছে।
সকলে সাবধানে হাঁটছে আর বড় বড় চোখে চারপাশ দেখছে এবং ছবি তুলছে। তাদের সামনে গাইড হাঁটছে আর সবার পিছনে হাঁটছে আধার স্যার। আলো যেটাই দেখছে, সেটারই ছবি তুলে নিচ্ছে। একটা রঙিন প্রজাপতি দেখে থেমে গেল। পা টিপে টিপে বাঁকা পথে গিয়ে ছবি তুলে নিল। কারণ প্রজাপতিটা একটা ছোট গাছের পাতার ওপর বসেছে।
চর্তুপাশে নিস্তব্ধতা ছেয়ে আছে। ঝিঁঝিঁ পোকার একঘেয়ে ডাক বনের নিস্তব্ধতাকে আরও গম্ভীর করে তুলেছে। হঠাৎ দূরে কোথাও কোনো গাছের মগডালে শুনতে পাওয়া গেল
‘হুক্কু-হুক্কু’ শব্দে উল্লুকের ডাক—যা এই বনের সবথেকে পুরোনো আদিম গান। গাছের ডালে ডালে হনুমানের লাফালাফি আর শুকনো পাতার ওপর দিয়ে কোনো বুনো প্রাণীর দৌড়ে যাওয়ার খসখস শব্দে সবার হৃদস্পন্দন বাড়িয়ে দিল।
-“ওই যে দেখা যায়, তোমার মতো আরেকজনকে।”
পিছন থেকে স্যারের কথা শুনে আলো চমকে উঠে ডান দিকে তাকায়। গাছের মগডালে একটা বাঁদরের বাচ্চা বসে থেকে লেজ নাড়াচ্ছে। তারমানে এই লোকটা ওই বাঁদরের সাথে তাকে তুলনা করল?
আলো পিছনে ফিরে দাঁত কিড়মিড় করে বলল,
-“আমাকে দেখে আপনার বাঁদর মনে হয়?”
-“বাঁদর ছাড়াও আরো অনেক কিছুই মনে হয় মিস. কালো।”
-“এই আপনার কালো, কালো ডাকে না জানি আমি সত্যি সত্যিই কবে কালো হয়ে যাই!”
-“নো প্রবলেম…কালো হলেও চলবে।”
আধার বিরবির করল। তবে সেটা শুনতে পেল না আলো। সে তো একটা পাখির ছবি তোলার জন্য গাছের দিকে ছুটেছে। তখন আধার সাবধান করে বলল,
-“এখানে কিন্তু অনেক জোঁক রয়েছে। দেখেশুনে চলাফেরা করো।”
সবাই জঙ্গলের গভীরে প্রবেশ করেছে। আধারের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি সবার ওপর থাকলেও বেশিরভাগ আলোর ওপরই থাকছে। কারণ এই মেয়েটা অঘটন ঘটাতে ওস্তাদ। এখানকার সবাই যথেষ্ট ম্যাচিউর হলেও এই মেয়েটা ভীষণ বাচাল! সে তো প্রথমে মেয়েটাকে নিয়ে জঙ্গলের ভেতরেই আসতে চায়নি। কিন্তু মেয়েটা কানের কাছে ঘ্যানঘ্যান-প্যানপ্যান করে মাথা খেয়ে নিচ্ছিল তার। তাই তো বাধ্য হয়েই নিয়ে এসেছে। আর এখন চোখেচোখে রাখার চেষ্টা করছে। নয়তো এই মেয়ের কিছু হলে তার দাদাজান তাকে আবার আস্ত রাখবে না। সব দোষ তার ঘাড়ের ওপরই এসে পড়বে। কোথাও তার একটু শান্তি নেই। কেন যে মেয়েটাকে ট্যুরে নিয়ে এসেছিল, কে জানে!
শালুক ঘুরছিল আর ক্যামেরা দিয়ে এটা-সেটার ছবি তুলছিল। তখন সে গাছের ডালে একটা সাপ দেখে ভয় পেয়ে ছুটে এসে স্যারের বাহু আঁকড়ে ধরল। শরীরে অন্য মেয়ের স্পর্শ অনুভব করতেই আধারের চোয়াল শক্ত হলো। অন্যদিকে এই দৃশ্য দেখতে দেখতে হাঁটছিল আলো। সামনে ফিরতেই গাছের সাথে ধরাম করে বারি খেল। মেয়েটা সামান্য আর্তনাদ করে বামহাতে নিজের কপাল চেপে ধরল।
আধার এক ঝটকায় নিজের হাত ছাড়িয়ে ছুটে এল আলোর কাছে। মেয়েটাকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে দেখে ফর্সা কপালটা কালচে-লাল হয়ে ফুলে গেছে। বেশ জোরেই আঘাত লেগেছে।
-“এই তুমি কানা? চোখে দেখতে পাও না? সবসময় কিছু না কিছু করে নিজেকে হার্ট না করে শান্তি পাও না? এখন কপালের মাঝে আলু গজিয়ে তৃপ্তি পেলে?”
আলো চোখের পানি মুছে নাক টানলো। সে কী ইচ্ছে করে ধাক্কা খেয়েছে নাকি আশ্চর্য! সব দোষ এই পঁচা গাছটার। এখানে কে দাঁড়িয়ে থাকতে বলেছিল? যদি না থাকত, তাহলেই তো সে আর ব্যথা পেত না।
সঙ্গে করে ব্যাগে প্রাথমিক চিকিৎসার বক্স নিয়ে আসা হয়েছিল। আধার একজনের থেকে সেটা নিয়ে মলম আর ওয়ানটাইম টেপ বের করে আনল। তারপর মেয়েটার কপালে গজানো আলুতে লাগিয়ে দিয়ে বিরবির করল,
-“রিসোর্টে ফিরে এই আলুর চপ করে খেও!”
আলো খ্যাক করে বলল,
-“আর আপনাকে আমি ব্যাঙের চপ করে খাওয়াবো, অসভ্য লোক কোথাকার!”
একথা বলে আলো হনহনিয়ে চলে গেল। আধার ঠোঁট কামড়ে পথ অনুসরণ করতে চেয়েও থেমে যায়। পিছনে ঘাড় ঘুরিয়ে শালুকের উদ্দেশ্যে গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
-“আমার থেকে দূরত্ব বজায় রাখুন। অর, ডোন্ট টাচ মি!”
অপমানে শালুকের চেহারা রক্তিম হয়ে এল। তবে কিছু না বলে ওখান থেকে চলে গেল।
হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ বনের বুক চিরে চলে যাওয়া সেই বিখ্যাত রেললাইনের সামনে গিয়ে সবাই থমকে দাঁড়ায়। দুই পাশে ঘন বন, মাঝখানে চলে গেছে পাথুরে রেললাইন। মনে হবে এই বুঝি দূর থেকে কু-ঝিক-ঝিক শব্দে একটা ট্রেন সকল নিস্তব্ধতা আর সবুজ চিরে সামনে হাজির হবে। আবছা অন্ধকারের মাঝে সবাই রেললাইনে হাঁটছে আর ফটোশুট করছে। কিছুক্ষণ পরই এখান থেকে বেরিয়ে যাবে। কারণ রাত হতে আর বেশি দেরি নেই।
আলোর পা জোড়া ব্যথায় টনটন করছে। তাই সে রেললাইনের ওপর বসল। লং হ্যান্ডব্যাগ থেকে চকলেট বের করে খেতে খেতে আশেপাশে তাকায়। তামান্না সোহানের সাথে গল্প করছে। আর শালুক ফারাহ্কে ছবি তুলে দিচ্ছে। নির্ঝর তার গার্লফ্রেন্ডের সাথে অন্য দলে। সাথে মারুফও আছে। আলো কিছুক্ষণ আরাম করে উঠে দাঁড়ায়। আশেপাশে স্যারকে কোথাও দেখা গেল না। এতে কপাল কুঁচকে গেল তার। এই লোকটা আবার কই হারালো! এক মিনিট…এক মিনিট…কোন বিপদে পড়ল না তো? এটা ভাবতেই আলো ছুটে চললো জঙ্গলের ভেতরে। কিছুদূর এগিয়ে যেতেই দেখতে পেল—আধার স্যার এদিকেই আসছে। মানুষটাকে সুস্থ অবস্থায় দেখে স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়ল। সে তো একটুর জন্য ভয়ই পেয়ে গেছিল।
-“ভুতের দাদার মতো কোথায় হারিয়ে গিয়েছিলেন হ্যা?”
আধার সামনে হাঁটতে হাঁটতে ধীর কণ্ঠে বলল,
-“এখন কী তোমাকে সবকিছুর কৈফিয়ত দিতে হবে?”
-“আলবাত দিতে হবে। বলুন কই গেছিলেন!”
-“গার্লফ্রেন্ডের সাথে দেখা করতে গিয়েছিলাম।”
-“আমাকেও নিয়ে যেতেন। আমিও একটু আপনার প্রেয়ারের গার্লফ্রেন্ডকে দেখতাম!”
আধারের পা জোড়া শ্লথ হয়ে যায়৷ সে চট করে পিছনে ফিরে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
-“এখন কী তোমাকে আমার পার্সোনাল কাজের মধ্যেও নাক গলাতে হবে?”
আলো কপাল কুঁচকে জিজ্ঞেস করল,
-“পার্সোনাল কাজ মানে?”
-“মুত্রত্যাগ করতে গিয়েছিলাম। এখন ভাবছি আবারো যাবো! তা তুমি যাবে? চাইলে আসতে পারো। বিকজ…আই ডোন্ট মাইন্ড।”
আলো কী বলবে ভাষা খুঁজে পেল না। সে তো লজ্জায় এতিওতি তাকাতে তাকাতে চট করে পাশ কাটিয়ে কেটে পড়ল। আজকাল এই অসভ্যের মুখে কিছুই আটকাচ্ছে না! যেটা মুখে আসছে ওটাই নির্লজ্জের মতো বলে দিচ্ছে।
আচমকা একজন মেয়ে পরে গিয়ে আঘাত পাওয়ার ফলে তাকে নিয়ে সবাই ব্যস্ত হয়ে গেল। পা থেকে ব্লিডিং হচ্ছে। আধার সবার উদ্দেশ্যে বলে—তারা এখনই জঙ্গল ছেড়ে বেরিয়ে যাবে। তাই কেউ দূরে যেন না যায়! ইনজুরি মেয়েটাকে নিয়ে যাওয়ার সময় আবারো সবাইকে সাবধান করল। কারণ রাত প্রায় হয়ে এসেছে। এখন এখানে থাকাটা সেফ নয়!
-“ওয়াও…কত সুন্দর অর্কিড!”
শালুক একটা বিরল অর্কিড দেখে ফোন নিয়ে ছুটে জঙ্গলের ভেতরে গেল। তার সাথে আলোও ছিল। মেয়েটা বারবার যেতে মানা করল। কারণ সবাই এগিয়ে গেছে সামনে। আলো বিরক্তিতে মুখ দিয়ে ‘চ’ বর্গীয় শব্দ বের করল। সামনে এগোতে চেয়েও পারল না। এই মেয়েটাকে একা ফেলে কখনো যেতে পারবে নাকি? উঁহু, পারবে না।
আলো এগিয়ে এসে বান্ধবীর উদ্দেশ্যে বলল,
-“চল এখন! নয়তো স্যার বকা দিবে।”
শালুক মাথা নাড়িয়ে বলল,
-“হুম। চল, চল!”
তারা সামনে ফিরতেই চমকে উঠল৷ কারণ সামনেই বিশাল দেহীর বুনো শূকর রয়েছে। তাদের দিকে কেমন অদ্ভুত চোখে তাকিয়ে আছে। আলো, শালুক ভয়ে শুকনো ঢোক গিলে একে অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করল। তারা চিৎকার দেওয়ার আগেই বনের সব নিস্তব্ধতা চিরে বুনো শূকরটা চিৎকার করে উঠল, তারপর ছুটে আসতেই দুই’জনে দৌড় মা’রল!
শালুক গ্রামের মেয়ে হওয়ায় সে খুব অনায়াসে গাছে উঠতে পারে। আর আজ এটারই ফায়দা হলো। সে সবকিছু ভুলেটুলে ছুটে এসে একটা ছোটখাটো গাছের ওপর উঠে গেল। অন্যদিকে, আলো প্রাণপণে দৌড়াচ্ছে! বারবার চিৎকার করে আধার স্যারকে ডাকছে। সে কিছুতেই ওই বুনো শূকরের গুঁতা খেতে চায় না।
ছুটতে ছুটতে একসময় পাথরের সাথে তার পা বেঁধে গেল। মেয়েটা কিছু বুঝে ওঠার আগেই সে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পাহাড়ের ঢাল দিয়ে গড়িয়ে নিচে পড়ে যায়। তবে সে সরাসরি নিচে থাকা লেকের পানিতে পড়ে না, বরং লেকের সাথে মিশে থাকা একটি পাথুরে ঢিলায় গিয়ে পড়ল। এবং তার গোড়ালি মচকে যায়।
এক মুঠো চাঁদের আলো পর্ব ২২
শরীরের ও পায়ের অজস্র যন্ত্রণায় আলো গুঙিয়ে উঠল। পরণের পোশাক ছিঁ’ড়ে গিয়ে নাজেহাল অবস্থা মেয়েটার। ধারালো পাথর লেগে যেখানে-সেখানে চামড়া ছিঁ’ড়ে গিয়েছে। কপাল কেটে র’ক্তও গড়িয়ে পড়ছে! আলো আধোআধো চোখে তাকিয়ে নীরবে কেঁদে উঠল। শরীরটা থেঁতলে গিয়ে ব্যথায় শেষ হয়ে যাচ্ছে তার। সামান্য ওঠারও শক্তি নেই। মনে হচ্ছে কেউ সব শক্তি শুষে নিয়ে নিয়েছে! চোখের সামনে শুধুই অন্ধকার আর অন্ধকার দেখছে। সে একটু নড়াচড়া করতে গিয়ে অনুভব করল, তার পেটের ওপর দিয়ে কিছু একটা বেয়ে চলে গেল। আচমকা বরফের মতো ঠান্ডা স্পর্শে তার সর্বাঙ্গ কেঁপে উঠল। কয়েক মিনিটের মতো নিঃশ্বাস আঁটকে ম’রার মতো পড়ে রইল। তারপর আবারো কিছু একটা অনুভব করে মূহুর্তেই পুরো জঙ্গল কাঁপিয়ে চিৎকার করে উঠল,
-“আধার স্যারররররর…..!”

Thanks aj golpotao deyar jonno