নীরব উন্মাদনা দ্বিতীয় খন্ড পর্ব ২৪
সুরাইয়া জিয়াসমিন
আরহাম মুচকি হাসলো, কাউকে পরোয়া না করে নুবার কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিলো,দূরে দাঁড়িয়ে থাকা হাজেরা সবটা দেখে চোখের পানি ফেলে হাসলো।তার মেয়ে, হ্যাঁ তারি মেয়ে,আজ অনেক সুখে আছে।হাজেরা মন ভরে দুইজনের জন্য দোয়া করলো। এদিকে আশে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা আত্মীয় স্বজন সহ আরশি,ইশিতা,সবাই তাদের এরকম মূহুর্ত দেখে মুচকি হাসলো।
অনেকটা রাত করেই অনুষ্ঠান শেষে হলো, সুন্দর মতোই সব কিছুর সমাপ্তি টেনে যে যার কক্ষে ফিরে গেলো। আপাতত নুবা চুপচাপ দাঁড়িয়ে শরীর থেকে Ornament গুলো খুলে রাখছে, এমন একটা মূহুর্তে আরহাম পিছন থেকে এসে উঁকি মেরে দেখার চেষ্টা করলো নুবা কি করছে? আরহামকে এরকম বাচ্চাদের মতো উঁকি ঝুঁকি মারতে দেখে নুবা ভুরু কুঁচকে আয়নার দিকে তাকিয়ে বিরবির করে বললো
_”কি হয়েছে? এরকম উঁকি মারছেন কেনো?”
নুবার কথায় আরহাম বেশ শান্ত হয়ে নুবার কাঁধে থুতনি ঠেকিয়ে দিলো,পরপর আদুরে গলায় সুধালো
_”দেও,আমি খুলে দেই।”
নুবা কানের থেকে কানের দুল খুলতে খুলতে বেশ স্বাভাবিক কন্ঠেই বললো
_”কি খুলে দিবেন?”
আরহাম নুবার কাঁধ থেকে থুতনি সরিয়ে পিছন থেকে গলার ফুলের হারটা খুলতে লাগলো।নুবা আরহামের কান্ড দেখে মুচকি হেসে বললো
_”আমি পারবো, আপনার এতো সাহায্য করতে হবে না।”
তবে আরহাম নুবার কথা উপেক্ষা করে নিজেই সকল অলংকার সুন্দর মতো খুলে সামনে রাখলো,পরপর নুবার মাথায় লাগানো ফুল,ক্লিপ সব খুলে দিতে শুরু করলো।নুবাও বেশ স্বস্তি পেলো, সারাদিন এতো খাটাখাটনির পর এই সব খুলতেও তার কান্ত লাগছিলো হয়তোবা সেটা টের পেয়েছে আরহাম।চুলে এটে সেটে লাগানো ক্লিপ গুলো খোলার সময় নুবা নাক মুখ কুঁচকে বিরবির করে বলে উঠলো
_”আস্তে,ব্যথা লাগছে!”
আরহাম নুবার ব্যথাতুর মুখশ্রী দিকে এক পলক তাকিয়ে বিচলিত কন্ঠে সুধালো
_”oh, sorry , খেয়াল করিনি।”
নুবা আরহামের কথায় মুচকি হাসলো, অতঃপর পুরটা সময় আরহামের কার্যক্রম নিরিক করে লক্ষ করতে লাগলো।কতটা যত্নশীল এই মানুষটা,কতটা ধৈর্য নিয়ে এই নুবাকে সামলে নিচ্ছে।নুবা সত্যিই অনেক সন্তুষ্ট তার স্বামীর প্রতি । আরহাম ধীরে সুস্থে নিজের কাজ টুকু শেষ করে,নুবার শরীর থেকে লেহেঙ্গার দোপাট্টার(ওরনা) পিন খুলে দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে বললো
_”ডান,এবার চেন্জ করে আসো।”
নুবা চোখ তুলে আরহামের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলো পরপর বিরবির করে বললো
_”আমাকে সাহায্য করলেন?নাকি আমার ফায়দা নিলেন?”
নুবার কথায় আরহাম বেশ নিষ্পাপ দৃষ্টিতে নুবার দিকে তাকিয়ে মিনমিন করে বলে উঠলো
_”আ,আমি আবার কি করলাম?”
বেশ অবাক হয়ে বললো আরহাম,নুবা আরহামের বাম হাতটা নিজের কোমড় থেকে সরিয়ে মিটমিট করে হেসে বললো
_”ও তাই নাকি,তা গয়না খুলার সময় এক হাত আপনাআপনি এখানে ওখানে চলে যাচ্ছিলো?”
নুবার কথায় আরহাম কেমন ধরা পড়ে যাওয়ার ভাব করে নুবাকে আবারো কাছে টেনে নিলো,নুবা আরহামের কান্ডে কিছুই বললো না, বরং আরহামের বুকে এক হাত রেখে আদুরে গলায় সুধালো
_”অনেক গড়ম পড়েছে, শাওয়ার নিতে হবে। আমার দেরি হবে,তাই আপনি আগে ফ্রেশ হয়ে আসুন। ”
নুবার কথায় আরহাম নাচোক করলো,নুবা আরহামের মুখ ভঙ্গি দেখে দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে ফিসফিস করে বললো
_”আপনি চাইলে আমার সাথে ফ্রেশ হতে পারেন,আমি mind করবো না।”
নুবার কথায় আরহাম এক পায়ে রাজি হয়ে গেলো,নুবা আরহামকে মিচকে শয়তানের মতো হাসতে দেখে এক পলক বিছানায় শুয়ে থাকা আয়রার দিকে তাকালো,মেয়েটা গভীর ঘুমে মগ্ন,আয়রাকে শান্তিতে ঘুমাতে দেখে নুবাও প্রশান্তি পেলো।মাথা উঁচু করে আরহামের দিকে তাকিয়ে বিরবির করে বললো
_”আপনি যান,আমি দুইজনের ড্রেস নিয়ে আসছি।”
সকাল সকাল পরি উদাস মনে বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে।জীবনটা বিষাদ ছুঁয়েছে তার কাছে।কোনো কিছুতেই সুখ পাচ্ছে না সে,তার উপর হঠাৎ করেই নাবিল তাকে এভাবে বুকে টেনে নিলো,এতো আবেশে,এতোটা যত্ন করে,সেটাই ধরতে পারছে না পরি।এই নিয়েই চিন্তিত পরি। এদিকে ৭/৮ মাসের পড়েছে প্রায়। ডেলিভারির সময় ঘনিয়ে আসছে আর পরির দুশ্চিন্তা ততই বাড়ছে।
নাবিল সকাল সকাল গোসল সেরে রেডি হয়ে নিলো , হয়তোবা সকাল সকাল মস্তানগিরি করতে যাচ্ছে।পরি ধীরো পায়ে রুমে এসে নাবিলের দিকে নিরবে তাকিয়ে রইলো।নাবিল ড্রেসিং টেবিলের আয়নার দিকে তাকিয়ে ভেজা চুল গুলো তাওয়াল দিয়ে মুছে নিতে লাগলো। পরি কেমন করে সেদিকে তাকিয়ে রইলো। এদিকে নাবিল পরিকে এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে বিরবির করে বলে উঠলো
_”কিরে এমনে তাকায় আছসো কেন? আজকে কি আমারে বেশি সুন্দর লাগতাছে নাকি?”
পরি চাঁপা নিঃশ্বাস ফেলে চোখ সরিয়ে নিলো, আস্তে আস্তে যেয়ে বিছানায় বসলো।বেশ ক্ষুধা লেগেছে পরির,কাল থেকে কিছুই খায়নি,আর না রান্না করা হয়েছে।তবে আফসোস মুখ ফুটে বলতে পারছে না পরি।এই সময়ে তার খনে খনে অনেক কিছু খেতে ইচ্ছে করে তবে কোনো কিছুই সে বলতে পারে না।কার কাছে বলবে?নাবিলের কাছে? হাস্যকর!নাবিল কখনোই তার অনুভূতি গুলো বুঝবে না । অনুভূতির দাম দেওয়ার বদলে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করবে।
নাবিল ভেজা চুল ঝেড়ে পরির দিকে ফিরে তাকালো,হেলামি কন্ঠে বললো
_”খাইতে টাইতে দিবি না নাকি?”
পরি মাথা নিচু করে নিলো,বেশ শান্ত কন্ঠে বললো
_”আমি রান্না করতে পারবো না। আপনার ইচ্ছা হলে আপনি বাইরে যেয়ে খেতে পারেন।”
_”বাইরে যাইয়া খাওয়ার জন্য তোর থাইকা অনুমতি নিমু না আমি আর আমি না হয় খাইয়া নিমু, তুই কি খাবি?”
পরি কেমন করে নিঃশ্বাস ফেলে বলে উঠলো
_”সেই চিন্তা আপনার করতে হবে না, আমার না খেয়ে থাকার অভ্যাস হয়ে গেছে।”
নাবিল ধীরো পায়ে পরির কাছে এগিয়ে আসলো। ভুরু উঁচিয়ে বললো
_”না খাইয়া থাইকা থাইকা যদি আমার পোলাপাইনের কোনো ক্ষতি হয়,যদি লেংরা খুড়া হয় তখন কি করবি তুই।ওরোতো পুষ্টির দরকার।”
পরি নাবিলের কথায় কিছুটা রেগে গেলো,আর চোখে নাবিলের দিকে তাকিয়ে ক্ষিপ্ত কন্ঠে বললো
_”কখনো কখনো এই জঘন্য মুখ দিয়ে ভালো কথাও বেড় করা শিখুন। কারণ বাপ মায়ের মুখে কথা কবুল হতে হয় নেয় না। আল্লাহ না করুক আপনার কর্মের ফল নিষ্পাপ বাচ্চাটা যাতে না পায়, অবশ্য বড়ো হয়ে হবে তো জানোয়ারি, কারণ আপনার রক্ত তো,তবে এখন তো নিষ্পাপ তাই মুখ সামাল দিয়ে কথা বলুন।”
নাবিল এগিয়ে এসে পরির সামনে বসলো পরপর হেলামি ভঙ্গিতে বলে উঠলো
_”মাঝে মাঝে তোর কথার সাইজ শুইনা মনে হয় তোরে তুইলা এক আছার মারি, কিন্তু বিশ্বাস কর তোরে মারোনেরো রুচি আহে না আমার।এখন তোরে মারতে বকতেও কেমন বিরক্ত লাগে।যেনো মুখে রুচি নাই এমন,তাই বইলা যে ছাড় পাইবি তা কিন্তু না,তাই জবান কম চালা।”
পরি বিরক্ত নিয়ে মুখ ঘুরিয়ে নিলো পরপর রাগি কন্ঠে বললো
_”আপনি আমার চোখের সামনে থেকে দূর হন তো, আপনাকে দেখতেই ইচ্ছা হয় না আমার, ঘৃণা লাগে, ইচ্ছা করে নিজের চোখ নিজেই তুলে ফেলি,ছ্যে,যান নিজের কাজে যান,আশা রাখছি আর কখনোই এই রাস্তায় ফিরে আসবেন না।”
নাবিল পরির বিরক্তিকর মুখশ্রীর দিকে তাকিয়ে একটু হেসে বললো
_”হারাদিন বরদোয়া দেস,তাও এখনো মারি নাই,তার মানে হাতায় আমার বহুত আছে।তাই পটপট কইরা হুদাই নিজের মুখ ব্যথা করিস না।”
পরি বিরক্তিতে মুখ দিয়ে ‘চ’ উচ্চারণ করলো,নাবিল কিছু সময় পরির দিকে তাকিয়ে থেকে রুম থেকে বেড় হয়ে গেলো।নাবিল যেতেই পরি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো।এক পলক রুমের দরজার দিকে তাকিয়ে নিজের পেটে হাত রেখে আফসোসের সুর টানলো।এ ব্যতিত তার কিছু করার নেই।
দুপুরের রোদটা জানালার কাঁচ ভেদ করে ঘরের মেঝেতে এসে পড়েছে। বাইরে মির্জা বাড়িটা আজ সকাল থেকেই মানুষের আনাগোনায় মুখর। নিচতলা থেকে ভেসে আসছে একের পর এক মানুষের হাসির শব্দ।আজ বাড়িটা যেন একটু বেশিই ব্যস্ত।কারণ আজ আরহাম আর নুবার বিয়ের অনুষ্ঠান।
দুপুরের একটু পরেই গাড়ির শব্দে বাড়ির সামনে হৈচৈ শুরু হলো।
_“এসেছে ! নুবা কোথায়?”
আরশির চিৎকার শুনে ইশিতা সিঁড়ি দিয়ে দ্রুত নেমে এলো,ইশিতাও নুবার বিয়ের অনুষ্ঠান বেশ উপভোগ করছে।যতোই হোক সে বাড়ির ছোট্ট বউ।ইশিতা আরশির দিকে এগিয়ে এসে মৃদু কন্ঠে বললো
_“কে এসেছে?”
আরশি দরজার দিকে তাকিয়ে শান্ত কন্ঠে বললো
_“পার্লারের আপুরা!”
_“ওহ্, তাই বলো।”
আরশি উঠে দাঁড়ালো,সে শান্তিতেই আছে আরশি কারণ তার ছোট্ট পুঁচকে মেয়ে রিহানের কাছে।বেচারা রিহান পড়েছে মহাবিপদে, সারাদিন বাচ্চাকে নিয়ে ঘুরতে হচ্ছে।আর এদিকে আরশি অনুষ্ঠানের মজা নিচ্ছে।আরশি চাপা নিঃশ্বাস ফেলে এগিয়ে গেলো পিছনে ইশিতা।
চার-পাঁচজন মেয়ে বড় বড় ব্যাগ হাতে ভেতরে ঢুকল। কারও হাতে মেকআপের বক্স, কারও হাতে চুল সাজানোর সরঞ্জাম, আবার একজনের হাতে ছিল ফুল আর নানা রকম সাজসজ্জার জিনিস।
আরশি তাদের নিয়ে সোজা ওপরে উঠতে উঠতে বলল,
_“এতো দেরি করলেন কেনো? বলুন তো, অপেক্ষা করতে করতে সবাই ধৈর্য হারা হয়ে গেছে। মেহমান চলে আসছে কিন্তু বউ সহ আমরাও এখনি রেডি হতে পারিনি।”
আরশির কথায় একজন জোরপূর্বক হেসে বলল,
_”রাস্তায় জেমের জন্য একটু দেরি হয়ে গেলো আপু, চিন্তা করবেন না,সব সময়ের আগে হয়ে যাবে।”
আরশি মুচকি হাসলো, তাদের নুবার রুমের দিকে নিয়ে যেতে যেতে বললো
_“ আস্তে ধিরে, সুন্দর মতো সাজাবেন। আমার ভাই যাতে টাস্কি খায়।”
পেছন থেকে ইশিতা হেসে বলল,
_”শুধু বড় ভাবির চিন্তা আরশি,আর আমি? আমাকে কি চোখে পড়ে না।”
আরশি ঘুরে মুচকি হেসে বললো
_“ভাবি, চিন্তা করো না, তুমি এমনিতেই সুন্দর।”
_”হ্যাঁ হয়েছে,ঢপ মারা বন্ধ করো ননদিনী।”
নুবা বারান্দায় মেয়েকে নিয়ে বসে বাইরে তাকিয়ে আছে ,পরনে সাধারণ একটা হালকা রঙের পোশাক, চুল খোলা। মুখে কোনো সাজ নেই। শুধু বাইরের দিকে তাকিয়ে সবকিছু পর্যবেক্ষণ করছে নুবা।তার ঠিক সামনে নিচেই আরহাম দাঁড়িয়ে আছে, হয়তোবা কারো সাথে আলাপ করছে।লোকটা বেশ হেসে হেসে কথা বলছে।আরহামকে এরকম ভদ্র লোকের মতো কথা বলতে দেখে নুবা শুধু মুচকি হাসছে।
হাজেরা কিছু সময় আগেই এসেছে রুমে,সে এসে নুবার আর আয়রার দিকে তাকিয়ে ছিলো হয়তোবা মেয়ের সুখ দেখে নিজেও খুশি হচ্ছিলো।হাজেরা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে যেয়ে মেয়ের কাধে হাত রেখলো,নুবা প্রথমে চম্কে উঠলেও,হাজেরাকে দেখে শান্ত হলো,পিছন ঘুরে মৃদু কন্ঠে বললো
_”কখন আসলে আম্মু।”
_”এই তো এখনি।”
_”oh,এসেছো ভালোই করেছো,আয়ারকে একটু ধরো, চুল গুলো এখনো ভেজা একটু শুকিয়ে নি।”
হাজেরা মুখে হাসি বিদ্যমান রেখে নাতিনকে কোলে নিলেন পরপর আয়রার মুখের দিকে তাকিয়ে আদুরে কন্ঠে বললেন
_”এতো হাসতে হয় না নানু,নজর লেগে যায়।”
নুবা মায়ের কথা শুনে রুমে যেতে যেতে বললো
_”ওর মুখ থেকে হাসি সরেই না মা,তবে যখন কান্না শুরু করে তখন কি আর বলবো। তুমি বরং এসে রুমে বসো।তা সকালের নাস্তা করেছো?”
হাজেরা আয়ারকে নিয়ে দোল দিতে দিতে সুধালো
_”হ্যাঁ , তুই খেয়েছিস?”
_”হুম,নিচে অনেক মানুষ ছিলো তাই তোমার জামাই রুমে নাস্তা এনেছিলো।”
নুবার কথায় হাজেরা এক গাল হাসলো কিছু বলতে যাবে এমন সময় পার্লারের মেয়েরা দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকলো,সাথে আরশি আর ইশিতা।হাজেরা পাশ ফিরে তাদের দেখলো,নুবাও তাকালো,আরশি এগিয়ে এসে সুধালো
_”নুবা নে, তাড়াতাড়ি বস তো।”
নিচতলায় তখন আরহাম পুরোপুরি তৈরি,রুমে যেতে দেওয়া হয়নি তাকে, অপেক্ষা করতে বলা হয়েছে
আরহাম নিজের ঘরে দাঁড়িয়ে শেরওয়ানির বোতাম লাগাচ্ছিল।আজ তার পরনে অফ-হোয়াইট শেরওয়ানি। গলার কাছে আর বুকজুড়ে সূক্ষ্ম সোনালি কাজ। সঙ্গে মেরুন রঙের ওড়না ধরনের অ্যাকসেসরি। আপাতত সে একাই নিতলার একটা রুমে বসে আছে।কি দিনকাল আসলো এখন নিজের রুমে নিজেই যেতে পারবে না। আরহাম যখন সবটা নিয়ে ভাবতে ব্যস্ত তখনি আরাফ দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে ভাইকে ডেকে বললো
_“ভাই?”
_“হুম?”
আরহাম ফিরে তাকালো, আরাফ বিরক্ত হলো কারণ এই সব কিছুই তার অসহ্য লাগছে তাও সে বেশ শান্ত কন্ঠে বললো
_”তোমার রেডি হওয়া হয়ে গেলে আম্মু ডেকেছে।”
আরহাম বেশ গম্ভীর কন্ঠেই বললো
_”তুমি যাও,আমি আসছি।”
আরাফ মুখ বাঁকিয়ে চলে গেলো।যা অবশ্য খেয়াল করলো আরহাম তবে কিছুই বললো না।
উপরে তখন নুবার সাজ প্রায় শেষ।আরহামকে বলা হয়েছিলো একবারে কবুল বলার পড়েই নিয়ম অনুযায়ী পর্দা সরিয়ে দুইজন দুইজনকে দেখবে তবে আরহামের এতো ধৈর্য নেই,সে তার মায়ের সাথে দেখা করে ডিরেক্ট নিজের রুমে চলে আসলো।
তখন নুবার সাজ শেষ,আরশি আর ইশিতা বসেছে,আর হাজেরা আয়ারকে নিয়ে বসে আছে।আয়রাও প্রায় তৈরি বললেই চলে।
নুবা আয়নায় নিজেকে দেখে কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল।পেছনে বসে থাকা হাজেরা মেয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন,
_“মাশাআল্লাহ।”
নুবা ঘুরে মায়ের দিকে তাকাল।হাজেরা আয়ারকে নিয়ে এগিয়ে এসে নুবার কপালে চুমু দিলেন।ছলছল চোখে মেয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন
_“সারাজীবন এভাবছি সুখে থাকিস মা।”
নুবা মায়ের হাত ধরে মিষ্টি কন্ঠে বলল,
_“তুমি দোয়া করলেই থাকব।”
আরশি সাজতে সাজতে এক পলক নুবার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বললো
_“নুবারে,?”
_“হ্যাঁ।”
আরশি মিচকে শয়তানের মতো হেসে বলে উঠলো
_“আজকে ভাইয়া শেষ।”
নুবা বেশ লজ্জা পেলো,মাথা নিচু করে বললো,
_“আবার শুরু করলে,আপু please?”
ইশিতা পাশ থেকে বলে উঠলো
_“সত্যিই তো বলছে নুবা, তোমাকে অনেক সুন্দর লাগছে।”
নুবা কিছু বলতেই যাবে তখনি অধৈর্য আরহাম দরজা ঠেলে ভিতরে প্রবেশ করলো। হঠাৎ রুমে কেউ প্রবেশ করার সবাই সেদিকে তাকালো।
নাবিল পরির দিকে কেমন ভুরু কুঁচকে তাকিয়ে আছে।নাবিল গিয়েছিলো বাইরে থেকে খাবার আনতে তবে আসতে আসতে অনেক দেরি হয়ে গেলো, কিন্তু আশ্চর্যের ব্যপার হলো ,পরি বলেছিলো রান্না করবে না তবে পরি রান্না করে খেতে বসেছে। নিশ্চয় তাকে তাড়ানোর জন্য বলেছিলো
নাবিলকে দেখে পরির গলায় খাবার আঁটকে গেলো।আবার বিরক্ত হলো সে,এতো সময় শান্তিতে ছিলো,আবার কেন যে আসলো।নাবিল দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে এগিয়ে এসে পরির সামনে বসলো।মুখে রাগি ভাব তার, ভীষণ তেতে আছে নাবিল। অবশ্য কারনটা পরিরর অজানা।
নাবিল কিছু সময় পরির দিকে তাকিয়ে থেকে বেশ শান্ত কন্ঠে বললো
_”তুই না সকালে কইলি রানবি না?”
পরি অন্য দিকে তাকিয়ে মুখ কালো করে বললো
_”খেতে তো হবে আমার,না খেয়ে কত সময় থাকবো।কেউ তো রান্না করে খাওয়াবে না আমাকে। মরে গেলেও নিজেরটা নিজের করে খেতে হবে।”
নাবিল খাবারের প্যাকেটটা সামনে রেখে ভুরু কুঁচকে বললো
_”তা তোরটা কে করবে, তোর লাইগা কি এহন কামের লোক রাখমু। আমার টেকার গাছ আছে?”
পরি তর্ক করতে চাইলো না,তাই শান্ত কন্ঠে বললো
_”আমি কাউকে রাখতে বলিনি, নিশ্চয় আমি করে খেতে পারি।”
আরহাম অবিশ্বাস চোখে নুবার দিকে তাকিয়ে আছে,গায়ে হলুদের থেকে বিয়ের সাজে নুবাকে বেশি সুন্দর লাগছে।নুবাকে আজ যেন চেনাই যাচ্ছে না।গায়ে পরেছে গাঢ় লাল আর হালকা গোল্ডেন কাজ করা ভারী লেহেঙ্গা। লেহেঙ্গার পুরোটা জুড়ে সূক্ষ্ম জরি আর পাথরের কাজ, আলো পড়লেই ছোট ছোট সোনালি বিন্দুর মতো ঝিকমিক করে উঠছে। কোমর থেকে নেমে আসা ঘেরটা এতটাই সুন্দর যে হাঁটলেই কাপড়ের স্তরগুলো নরম ঢেউয়ের মতো দুলে উঠবে।
লেহেঙ্গার সঙ্গে পরেছে কারুকাজ করা ছোট্ট ব্লাউজ, আর মাথার ওপর টেনে দিয়েছে পাতলা লালচে-গোল্ডেন ওড়না। ওড়নার চারপাশে ভারী সোনালি বর্ডার, কপালের ওপর দিয়ে নামানো অংশটা নুবার মুখটাকে আরও মায়াবী করে তুলেছে।
গলায় একাধিক স্তরের ভারী সোনার হার,মাঝখানে বড় একটা ঝুমকো নকশার লকেট। গলায় বসে থাকা হারগুলোর সোনালি ঝিলিক তার সাজে রাজকীয় একটা আভা এনে দিয়েছে। কানে বড় সোনার ঝুমকা, যার নিচের অংশটা নড়লেই টুংটাং করে মৃদু শব্দ হচ্ছে। নাকে ছোট্ট নথ, কপালে টিকলি, হাতে একের পর এক সোনার চুড়ি আর তার মাঝখানে লাল পাথর বসানো কয়েকটা চুড়ি। আঙুলে আংটি, হাতে সূক্ষ্ম নকশার সোনার বালা,সব মিলিয়ে নুবার হাত দুটোও যেন আলাদা করে সাজানো কোনো অলংকার।
চুলগুলো সুন্দর করে খোঁপা করে তাতে সাদা ছোট ছোট ফুল গুঁজে দেওয়া হয়েছে। কপালের দুপাশে কয়েকগাছা চুল ইচ্ছে করে আলগা রাখা, তাই সাজের মাঝেও একটা কোমল স্বাভাবিকতা রয়ে গেছে। চোখে গাঢ় কাজল আর হালকা শিমারি মেকআপ, ঠোঁটে গাঢ় লালচে রঙ। মুখের ওপর নরম একটা লাজুক আভা,যেটা কোনো প্রসাধনীর নয়, আজকের দিনের আনন্দের।
তার উপর আয়রা,মা-মেয়েকে একই রঙের পোশাকে সাজানো হয়েছে। ছোট্ট মেয়েটার গায়েও লাল-গোল্ডেন রঙের ক্ষুদ্র লেহেঙ্গা, কোমরে ছোট্ট ঝুমঝুমি লাগানো বেল্ট, আর মাথায় ছোট্ট টিকলি। তার ছোট্ট হাতে দুটো সোনালি রঙের চুড়ি, কানে ক্ষুদ্র ঝুমকা আর পায়ে রুপালি নূপুর। নুবার লেহেঙ্গার মতোই তার পোশাকেও সূক্ষ্ম গোল্ডেন কাজ করা, তবে শিশুটার পোশাকটা একেবারেই হালকা ও আরামদায়ক।
আরহাম কিছুটা হা হয়ে তাকিয়ে আছে,একবার নুবার দিকে তাকাচ্ছে তো একবার হাজেরার কোলে থাকা আয়রার দিকে।আলহামকে এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে হাজেরা বড্ড বিব্রত হলো। যেহেতু সে শাশুড়ি তাই বিব্রত হওয়ারি কথা।তবু হাজেরা কিছুটা মুখ বাঁকিয়ে বললেন
_”মুখটা বন্ধ করো বাবা,মুখে মাঝি ঢুকে যাবে তো!”
হাজেরার কথায় আরহামের টনক নড়লো ,অবশ্য আরহামকেও কম লাগছে না।মনে হচ্ছে কোনো রাজ্যের রাজা আরহাম আর নুবা রানি,আয়রা রাজকন্যা। আরহাম নিজেকে নিয়ন্ত্রণে এনে এক গাল হেসে হাজেরাকে খোঁচা মেরে বললো
_”ঢুকে যাক মশা- মাঝি আম্মা,বউটাতো আমার তাই আমি হা করে,শুয়ে,বসে যেভাবেই দেখি না কেন সৌন্দর্য কমে যাবে না।”
হাজেরা আরহামের কথায় মুখ বাঁকিয়ে বললো
_”হ্যাঁ তা দেখো তুমি, তোমাকে তো আর না করিনি। শুধু আমাদের একটু লিহাজ করো, আমরা সবাই সামনে আছি।”
আরহাম হাজেরার কথা পাত্তা না দিয়ে তাকে আর বিরক্ত করার জন্য এগিয়ে যেয়ে নুবার কোমড় জড়িয়ে ধরে কপালে চুমু খেলো।আয়রা খিলখিল করে হেসে উঠলো,আরশি আর ইশিতা মিটমিট করে হাসতে লাগলো তাদের কান্ড দেখে হাজেরা মনে মনে খুশি হলেও।তবে নির্লজ্জ বলতে ভুললেন না।
নুবা আরহামের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলো,আর ফিসফিস করে বললো
_”আপনাকে বেশ লাগছে বর মশাই।”
আরহাম উত্তরে ব্যাস হাজেরার দিকে তাকিয়ে হাসলো,নুবার মনে হলো নতুন করে প্রেমে পড়লো সে। আরহাম এগিয়ে যেয়ে আয়ারকে কোলে তুলে নিলো,আয়রা আরহামের কোলে যেয়েই ঠাস করে একটা থাপ্পর বসিয়ে দিলো আরহামের গালে,পরপর আরহামের গাল খামচে ধরলো। কেমন পটপট শুরু করলো আয়রা যেনো আরহামকে বকে দিচ্ছে।আয়রার কান্ড দেখে হাজেরা সহ সবাই হেসে দিলো।হাজেরা বেগম নিজের হাসি আটকাতে না পেরে বিরবির করে বললো
_”আমার সাথে তর্ক করেছো,আমি তো শাশান করতে পারবো না,তাই আমার নানুই শাশন করে দিয়েছে,তাই না নানু ভাই?”
আয়রার দিকে তাকিয়ে বললো,আয়রা হেসে আঙ্গুল নাড়িয়ে কি যেনো পকপক করলো। আরহাম মেয়ের কান্ড দেখে ভুরু কুঁচকে বললো
_”মেরি বিল্লি মুঝিকো মেওউ,নানুর সাইড নেওয়া হচ্ছে তাই না।এখনি পাপাকে শাশন করা হচ্ছে?”
আয়রা খিলখিল করে হাসলো,পিছন থেকে নুবা বিরবিল করে হেসে বললো
_”ঠিকি আছে,কেউতো একজন শাশন করার জন্য থাকা দরকার।”
নাবিল মুখ মনোযোগ দিয়ে কারো সাথে মোবাইলে কথা বলছে। এদিকে দেওয়ালের আড়ালে দাঁড়িয়ে সবটা শুনছে পরি, কারণ কল আসার পড়েই নাবিলের মুখের রং কেমন আগের ন্যায় ভয়ংকর হয়ে উঠেছিলো, পরিবর্তন দেখা গিয়েছিলো তার ভিতরে,তাই নিজ অজান্তেই সবটা জানার আগ্রহে পরি পিছন পিছন এসেছে।
নাবিল হাত মুঠো বদ্ধ করে দাঁতে দাঁত চেপে বললো
_”এহন কইতাছোস আমারে,এহন!”
ওপাশ থেকে ইমন বলে উঠলো
_”ভাই আমরাও জানতাম না,,আপনে বললেন পড়ে ওই বেডারে দেইখা নিবেন,কোনো প্লান করবেন নাকি,তাই তো আমার চুপচাপ বইসা আছি।”
নাবিল কিছু সময় চুপ থেকে সুধালো
_”সাগরের কাছে দে।”
ইমন তাড়াতাড়ি মোবাইল সাগরের হাতে দিলো,ওপাশ থেকে সাগর বলে উঠলো
_”ভাই এহোনো সময় আছে,আর এতো প্লান করোনের কি আছে,কেউ আমগো বিরুদ্ধে যাইতে পারবো না।লোন,ওই খানির পুতের বিয়ার সাদ ঘুচাই দেই।”
নাবিল কিছু সময় চুপ রইলো অতঃপর ঠোঁট বাঁকিয়ে হেসে সুধালো
_”ঠিক কইছোস,ওর বউ বাচ্চা ওর প্রান,আজকে আগে ওগোরে মারমু।তার পর ও তরপাইবো,(ছটফট করবো),তরপাইয়া মরলে মরবো,না মরলে আমিই মাইরা দিমু।”
সাগর নাবিলের কথায় শান্তির নিশ্বাস ফেললো,যাক নাবিল তাদের উপর রেগে যায়নি, সাগর দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে বললো
_”তা কয়জন নিয়া যামু নাকি আপনে আইবেন?”
নাবিল একটু ভেবে শান্ত কন্ঠে বললো
_”তোরা অল্প কয়জন নিয়া যা,ওগো উপর নজর রাইখা আমারে খবর দে কেমন পরিবেশ ওই জাইগায়।হেরপর আমি আইয়া যা করার করমু,আর হো ভুলেও কাউকে মারিস না,আমি আইয়া নিজে হাতে মারমু।না হইলে শান্তি পামু না। আজকে মির্জা পরিবার দেখবো আমি কি জিনিস,ভুল মানুষের লোগে শত্রুতা কইরা ফালাইছে।এবার টাকার বদলে প্রান নিবো ওগোর।সব দেমাগ ঘুচায় দিমু।”
_”আচ্ছা ভাই,আমরা যাইয়া খবর নেই,কল করমুনে,তার পর আইয়েন।”
বলেই সাগর কল কেটে দিলো।নাবিল কথা টুকু শেষ করে তাড়াহুড়ো করে রুমের দিকে চলে গেলো। এদিকে অন্য পাশে দাঁড়ানো পরি স্তব হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।তার কানে শুধু দুটো শব্দি বিঁধছে ‘ মির্জা পরিবার’ , নিশ্চয় নাবিল তাদেরি কোনো ক্ষতি করতে যাচ্ছে। অবশ্য পরি এই বিষয়ে তেমন কিছুই জানে না তবে তার মনে হচ্ছে তার কারনেই এমন হচ্ছে।পরির মন বলছে ঝামেলা হচ্ছে তার বিষয় নিয়ে,ওই যে আরহামের সাথে পরির বিয়ে ঠিক হয়েছিলো। অবশ্য পরির মন আরো বলছে এর পিছনে নিশ্চয় জটিল কোনো কারণ আছে।তার উপর আরহাম নাকি নাবিলকে গুলিবিদ্ধ করেছিলো,সবি বুঝতে পারছে পরি,তবে এর আসল কাহিনিটা কি,মানে মেইন পয়েন্ট টা কোথায় বা কিভাবে এই সব শুরু হয়েছে ,কেনো হয়েছে? কিছুই জানা নেই পরিরর।
নীরব উন্মাদনা দ্বিতীয় খন্ড পর্ব ২৩
পরি বেশি সময় নষ্ট করলো না,মাথায় তার একটা কথাই ঘুরছে আজ নাবিল এই apartment থেকে বেড় হলে আর একটা পরিবার শেষ হবে।সবটা জেনেও পরি যদি নাবিলকে যেতে দেয় তবে সারাটা জীবন পরির নিজেকে দোষী মনে হবে।
পরি বুকে হাত দিয়ে ভারি নিঃশ্বাস ফেললো,নাবিলকে এখান থেকে কোনো মতেই বেড় হতে দেওয়া যাবে না।যেই ভাবনা সেই কাজ,পরি কোনো মতে কম্পিত শরীরে রুমের দিকে এগিয়ে গেলো।
