Home নূর ই মহব্বত নূর ই মহব্বত পর্ব ২৮

নূর ই মহব্বত পর্ব ২৮

নূর ই মহব্বত পর্ব ২৮
তাবাসসুম তাজ্বওয়ারী

– প্রমাণ ছাড়া ডক্টর আযলান কোনো প্রেসক্রিপশনও লেখে না, আর এটা তো আমার কলিজার টুকরোর জীবনের ব্যাপার!
ড্রইং রুমে বিরাজ করছে নিস্তব্ধতা। সকলে উদ্বেগ নিয়ে তাকিয়ে আছে আহিলের পানে যে এখন সম্পূর্ণ নির্বিকার। সে তার মেজ চাচা অর্থাৎ মবিন আহমেদ এর দিকে তাকিয়ে থাকলে তিনি নিজেকে সামনে আহিলকে গলা উচিয়ে বললো,
– এসব মিথ্যে বানাচ্ছিস কেন? কি হয়েছে কি? আমার সাথে তোর কিসের শত্রুতা?
– এক্সেক্টলি আমিও এটাই বলছি! আপনার সাথে আমার কিসের শত্রুতা যে আপনি আদনানকে কিড’ন্যাপ করা অব্দি চলে গেলেন? নওমিকে হুমকি দিতে পিছপা হও নি! কি এমন দরকার তোমার যেটা ওদের সরিয়ে দিলেই পেতে?
আহিলের মা বলে উঠল,

– কি বলছিস তুই? নওমিকে হুমকি দিয়েছে মানে?
– নওমির আমার কাছে ফিরে আসতে না চাওয়ার কারণ হলো মেজো চাচা ওকে প্রতিদিন হুমকির উপর রাখতো। সেদিন যদি আমি ওকে জোর করে নিয়ে না আসতাম, যদি পরে মানাবো বলে রেখে আসতাম তাহলে হয়তো ও পরেরদিনই আমার নাগালের বাইরে চলে যেতো!
নওমি চমকিত চোখে তাকাল। আহিল কি করে জানে এই কথা? ও যে পরেরদিন চলে যাওয়ার চিন্তা করেছিল এটা ওকে কে বলল? আহিল পুরোটা খুলে বলল সবাইকে। আহিলের চাচী এখনো তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো,
– কি প্রমাণ আছে তোমার কাছে যে নওমিকে যে হুমকি দিয়েছিল সেটা তোমার চাচা? কিংবা আদনানকে যে নিয়েছে সেটা তোমার চাচা?

– প্রমাণ?
আহিল ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসল। ওর হাসিতে ছিল এক হিমশীতল ধূর্ততা। ও পকেট থেকে নিজের ফোনটা বের করে স্ক্রিনে কয়েকবার আঙুল ছোঁয়াল। পরক্ষণেই ড্রয়িংরুমের নিস্তব্ধতা ফালি ফালি করে একটা অডিও রেকর্ড বেজে উঠল। স্পিকারে ভেসে আসা কণ্ঠস্বরটি আর কারও নয়, খোদ মবিন আহমেদের!
– তোমাকে আমি মানা করছি তুমি আহিলের সাথে যোগাযোগ রাখবে না! ফেরা তো দূরে থাকুক! সেটা তোমার আর তোমার ছেলের জন্য ভালো হবে।
এরকম আরো কয়েকটা অডিও ক্লিপ যেখানে নওমিকে বলা হচ্ছে যেন ওর বা ওর ছেলের কোনো দাবি নিয়ে আহিলের সামনে না দাঁড়ায়। তাহলে ওর ছেলের জন্য খারাপ হবে। নওমি অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে কথা বললেও ওর কণ্ঠে যে অসহায়ত্ব আছে সেটা আহিল ভালো করেই বুঝতে পারছিল।
অডিও রেকর্ডিংয়ের এই প্রথম অংশটা বাজতেই ড্রয়িংরুমের সবার চোখ চড়কগাছ হয়ে গেল। মবিন আহমেদের মুখটা মুহূর্তের মধ্যে মতো ফ্যাকাশে হয়ে গেল। এই রেকর্ডিং কোথায় পেয়েছে সে?
নওমি নিজের অজান্তেই দুই হাত দিয়ে মুখ চেপে ধরল। এই কণ্ঠস্বর, এই শীতল হুমকি ও গত একমাস ধরে ফোনে শুনে এসেছে! আহিলের মেজো চাচা আমতা আমতা করে বললো,

– এইসব কি হ্যাঁ? আমি… আমি কেন এগুলো বলবো?
আহিলের মা বলল,
– এখানে তো তোমার গলায় শোনা যাচ্ছে!
– ভাবি এখন এইসব বানানো যায়! আমি কেন এমন করতে যাবো আপনিই বলেন? এইসব বিশ্বাস করবেন না! আহিল? তোর কিসের শত্রুতা আমার সাথে?
– এইটা তো আমার প্রশ্ন আপনাকে!
ওর মেজ চাচাকে কিছু বলতে না দিয়ে আরেকটা অডিও রেকর্ডিং অন করলো যেখানে একই গলা শোনা যাচ্ছে,
– কাজটা যেন নিখুঁত হয়। বাচ্চাটাকে ট্যানারিতে আঁটকে রাখো। ওকে ফিরিয়ে দেওয়া যাবে না। ওকে আজকে এখানে রেখে দুইদিন পর পরিস্থিতি শান্ত হলে তারপর পা’ চা’র করে দিবে। ওর মাকে তারপর দেখছি। বারবার মানা করার পরও ছেলেকে নিয়ে হাজির হয়েছে!
পুরো ড্রয়িংরুমে যেন এক পিনপতন নীরবতা নেমে এলো। মেজো চাচী ধপ করে সোফায় বসে পড়লেন। ওনি যেন বিশ্বাস করতে পারছেন না কি হচ্ছে এসব! আহিল ফোনটা লক করে পকেটে পুরল। আহিলের চোখমুখ তখন এক ভয়ঙ্কর প্রলয়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে। ও এক পা এগিয়ে আসলো। ক্রোধিত কণ্ঠে বললো,

– এখনো বলবেন বানানো অডিও, মেজো চাচা? নাকি ভালোই ভালোই স্বীকার করবেন কেন এসব করেছেন?
মেজো চাচা তেজ দেখিয়ে বলে উঠলো,
– আমি কিছুই করিনি সব মিথ্যে!
আহিলের মাথায় ধপ করে আ’গুন ধরে গেল। সে আর নিজেকে শান্ত রাখতে পারলো না। ও বিদ্যুৎবেগে এক পা এগিয়ে গিয়ে মোবিন আহমেদের শার্টের কলারটা এক হাতে খা’মচে ধরল। আচমকা আহিলের এই হিংস্র রূপ দেখে ড্রয়িংরুমের সবাই আঁতকে উঠল।
আহিল দাঁতে দাঁত চেপে হাড়হিম করা কণ্ঠে বলল,
– মুখটা খুলুন মেজো চাচা! নিজের পাপে ফেঁসে গিয়েও কিসের এত তেজ দেখাচ্ছেন, হ্যাঁ? আমি চাইলে আপনার এই মিথ্যা বলা জিভটা এক সেকেন্ডে টেনে ছিঁ’ড়ে ফেলতে পারি! ল’ক-আপে গিয়ে ট’র্চার না পেতে চাইলে ভালোই ভালোই নিজের মুখে স্বীকার করুন কেন করেছেন এসব?
বেশ কিছুক্ষণ চেষ্টা করার পরও আহিলের চাচা কিছুই স্বীকার করছে না দেখে আহিল ওনাকে একটা ঝটকা দিয়ে সোফার ওপর ফেলে দিল তারপর ড্রয়িংরুমে উপস্থিত সবার দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত শীতল গলায় বলতে লাগল,

– উনি নিজে মুখে বলবেন না, কারণ ওনার এই নোংরা সত্যটা শোনার মতো সাহস এই বাড়ির কারও নেই। তাহলে আমিই সবার সামনে ওনার কুৎসিত মুখোশটা খুলে দিচ্ছি। তিন বছর আগে নওমি যখন চলে যায়, তার দেড় বছর পরেই তো আব্বু মা’রা যান। আব্বু মারা যাওয়ার আগে আমাদের সমস্ত সম্পত্তি আমার নামে লিখে দিয়ে যান। নওমি পাশে নেই, সংসারটা ভেঙে চুরমার সব মিলিয়ে আমি তখন চরম মানসিক হতাশায় ভুগছিলাম। একদিন এই ড্রয়িংরুমেই মেজো চাচার সামনে আমি আক্ষেপ করে বলেছিলাম, “এত সম্পত্তি দিয়ে আমি একলা মানুষ কী করব? মেজো চাচার ছেলে মেয়ে অর্থাৎ আদিল, আনায়াকে না হয় দিয়ে দেবো!” ব্যস, আমার ওই একটা কথাই ওনার মনের ভেতরে লোভের এক বিশাল পাহাড় তৈরি করে দিল।
সবাই অবিশ্বাস্য চোখে মবিনের দিকে তাকালো। আহিল আবারও বললো,

– মেজো চাচা মনে মনে ধরে নিয়েছিলেন এই অঢেল সম্পত্তি এখন ওনার ছেলে-মেয়েরাই পাচ্ছে। কিন্তু ওনার সেই গুড়ে বালি পড়ল তখন, যখন ওনারা জানতে পারলেন নওমি একা নেই, আমার একটা ছেলেও আছে! ওনার মনে কুৎসিত ভয় ঢুকে গেল আদনান আর নওমি যদি আমার জীবনে ফিরে আসে, তবে এই বিশাল সম্পত্তির এক আনাও ওনি পাবেন না। আর সেই লোভের বশেই ও গত একমাস ধরে নওমিকে অনবরত হুমকি দিয়ে গেছে যাতে ও ভয়ে আমার কাছে না ফেরে। আর শেষমেশ যখন নওমি আদনানকে নিয়ে আমার কাছে চলেও এলো, তখন নিজের লোভ চরিতার্থ করতে মেজো চাচা আমার নিষ্পাপ বাচ্চাটাকে ট্যানারিতে আটকে রেখে পা’চা’রকা’রীদের হাতে তুলে দেওয়ার চেষ্টা করতেও দ্বিধা করলেন না!
সকলে যেন কথা বলতে ভুলে গেছে। একেকটা কথা তীরের মতো বিঁধেছে! আহিলের চাচী মবিন সাহেবের সামনে গিয়ে অনুভূতিশূন্য হয়ে দাঁড়াল।

– আপনি সত্যিই এমন করেছেন? আহিল এসব কি বলছে?
মবিনের হাত-পা কাঁপছিল। নিজের স্ত্রীর এই পাথরের মতো শান্ত আর তীক্ষ্ণ প্রশ্নের মুখে ওনার জিভ যেন একদম আড়ষ্ট হয়ে গেল। উনি মাথা নিচু করে রইলেন, চোখ মেলানোর সাহসটুকুও ওনার অবশিষ্ট ছিল না। আহিলের চাচী ওনার এই নীরবতা দেখেই উত্তর পেয়ে গেলেন। ওনার দীর্ঘদিনের চেনা স্বামী যে এতটা কুৎসিত মানসিকতার মানুষ হতে পারেন, তা ওনার কল্পনাতেও ছিল না।
আহিল সামনে এসে বললো,
– ওনি কি বলবে চাচী? সেদিন যখন আদনানের জন্য আমরা দিশেহারা তখন ওনি নাটক করছিলেন আহাজারির! আমি আদনানকে খুঁজতে বের হওয়ার সময় ওনার কথা শুনতে পেয়ে যায়! নাহয় আদনানকে খোজা এত সহজ হতো না আমার জন্য!
– কি কথা?
আহিল বলতে শুরু করল,

– কাল যখন আদনান নিখোঁজ হলো আর আমরা সবাই পুরো বাড়ি মাথায় তুলছিলাম, তখন এই মানুষটা সোফায় বসে আমাদের সান্ত্বনা দিচ্ছিলেন আর ভেতরে ভেতরে আদনানকে চিরতরে সরিয়ে দেওয়ার আনন্দে ভাসছিলেন। আমি যখন পাগলের মতো আদনানকে খুঁজতে বাড়ি থেকে বের হচ্ছিলাম, ঠিক তখনই সদর দরজার পাশের করিডোরে ওনাকে ফিসফিস করে ফোনে কথা বলতে শুনি।
মবিন আহমেদ এবার চমকে উঠে চোখ বড় বড় করে তাকালেন। ওনার সেই চোরের মতো চাহনি উপেক্ষা করে আহিল বলতে লাগল,
– উনি তখন ফোনে ওনার ভাড়াটে লোকগুলোকে বলছিলেন “বাচ্চাটাকে ভালো করে বেঁধে রাখো। মুখ যেন একদম বন্ধ থাকে। আর শোনো, কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত ওখানেই থাকবে। আর ওই নম্বর ওপেন করে ওকে একটা মেসেজ কিরে দাও। যদিও সে ছেলের শো কে পা গল হয়ে আছে।”
উনি ঠিক এই কথাটুকু বলেই তাড়াহুড়ো করে কলটা কেটে দেন। নিজে নিজেই বললেন, “আমার কথা তো শুনো নি! এবার ভয়ংকর একটা মেসেজ দেখবে” ওনি ফোন বের কাটতেই আমি ছুটে গিয়েছিলাম আবার রুমে। নওমির ফোন নিয়ে দ্রুত দেখলাম মেসেজ এসেছে কিন্তু চাচা ভেবেছিল নওমি তো অ’জ্ঞান! এই ভেবে ফোন অফ করতে বলেন নি আর এই সুযোগটাই আমি নিয়েছিলাম!
আহিল এক নাগারে বলে একটু থামলো।

– মেজো চাচা ভেবেছিলেন নওমি অ জ্ঞান, তাই ফোনটা কেউ চেক করবে না এবং ওনার ওই গোপন নম্বরটার হদিসও কেউ পাবে না। সেজন্যই উনি ওনার লোকজনকে ফোনটা পুরোপুরি বন্ধ করতে বলেননি। আর ওনার এই অতি চালাকিটাই ওনার জন্য কাল হয়ে দাঁড়াল! আমি নওমির ফোন থেকে ওই নম্বরটা নিয়ে সাথে সাথে ট্র্যাক করতে পাঠিয়ে দিই! আইটি টিম ওই সচল নম্বরটার লাস্ট টাওয়ার লোকেশন ট্র্যাক করতেই খুব সহজে আমি খোঁজ পেয়ে গেলাম!
এবার বলুন চাচী, আপনার স্বামীর এই পৈশাচিক রূপ জানার পর আর কোনো প্রমাণের প্রয়োজন আছে কি? চাইলে আমার কাছে কল রেকর্ডগুলোও আছে!
আহিলের চাচী মবিন সাহেবের দিকে তাকিয়ে স্তব্ধ হয়ে গেলেন। ওনার চোখের ভেতরের সব শূন্যতা এবার এক তীব্র ঘৃণা আর ধিক্কারে রূপ নিল। উনি আর এক মুহূর্তও নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারলেন না। তীব্র আ’ক্রোশে মবিন আহমেদের সামনে এগিয়ে গিয়ে সজোরে এক চ’ড় বসিয়ে দিলেন ওনার গালে!
– ধিক্কার জানাই আপনাকে! টাকার লোভে আপনি এতটা অ’ন্ধ হয়ে গেলেন যে নিজের ভাইয়ের র’ক্তের সাথে, একটা দুই বছরের নিষ্পাপ বাচ্চার সাথে এই নোংরা খেলাটা খেলতে পারলেন?
মবিন কিছু বলার সুযোগ পেল না। আহিল বললো,

– এমন কেন করছেন মেজো চাচা? আপনি সম্পত্তি চাইলে আমাকে বলতেন! আমি খুশিমনে দিয়ে দিতাম! আল্লাহ আমাকে অনেক দিয়েছেন! আমি যা আয় করি তা দিয়ে আমি আমার ছেলের জন্য আবার ধনসম্পদ গড়তে পারবো! তার জন্য আমার বাপদাদার সম্পত্তির দরকার নেই! আপনি বললেই আমি দিয়ে দিতাম কিন্তু এই নোংরা পথটা বেছে না নিলে কি হতো না?
এর মধ্যে ওদের রুম থেকে বেরিয়ে এলো আদনান। এতক্ষণ রুমের ভেতর খেললেও বাইরে সকলের আওয়াজ শুনে সে বাইরে এলো। সোজা মবিনকে বসে থাকতে দেখে সে ছুটে গেল। কালকে তাকে নিয়ে পুরো এলাকা ঘুরেছে তো সে!

– দাদুবাই…
দুই হাত বাড়িয়ে মবিনের দিকে এগিয়ে গেল আদনান। কিন্তু মাঝপথে থামিয়ে দিলো নওমি। ওকে টেনে কোলে তুলে নিলো। আদনান মুখে আঙুল দিয়ে একবার মায়ের দিকে তো আরেকবার আহিলের মেজ চাচার দিকে তাকাচ্ছে।
ওর ছোট্ট মাথা কালকের ভয়ংকর ঘটনা ভুলে বসেছে কিন্তু এইটুকু মনে আছে এই দাদুভাইইয়ের সাথে তো কাল সে খেলেছিল। মা বলেছিল খেলতে। ওকে চকলেট ও দিয়েছিল! তাহলে আজকে যেতে দিল না কেন?
– মা..
নওমি ওর ডাকে সাড়া দিয়ে বলল,
– বলো আব্বু?
– দাদুবাই কেলবো
– পরে খেলিও। তোমাকে বললাম না রুমে খেলতে।এখানে পরে খেলবে কেমন?
বাধ্য ছেলের মতো মাথা নাড়ল আদনান।
– আচ্চা। বা..বাআ
এবার অদূরে আহিলকে দেখে ডেকে উঠলো আদনান। নওমি চমকে তাকাল ওর ডাকে। ও বাবা ডাকছে? আহিলের দিকে তাকিয়ে দেখলো সে ওদের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলো শুধু!
আহিল হিংস্রতা ভুলে ধীর পায়ে এগিয়ে এসে নওমির কোল থেকে আদনানকে নিজের শক্ত ও নিরাপদ বুকে জড়িয়ে নিল। আদনান খিলখিল করে হেসে আহিলের গলা জড়িয়ে ধরল। আহিল ওর কপালে একটা গভীর চুমু খেয়ে বলল,

– হ্যাঁ, বাবা। আমরা পরে খেলব। এখন তুমি মায়ের সাথে ভেতরে যাও তো সোনা?
আদনান মাথা নাড়ল। নওমি ওকে নিয়ে রুমে যেতেই আহিল আবার আগের রূপে ফিরে আসলো। তখনই ওর ফোনে একটা কল এলো। সে রিসিভ করে শুধু বললো,
– ভেতরে, আমার বাড়িতে চলে আসুন।
বাড়ির সদর দরজা পেরিয়ে ভেতরের ড্রয়িংরুমে প্রবেশ করলেন চারজন লোক। ওনাদের পরনে সিভিল ড্রেস থাকলেও প্রত্যেকের চোখে-মুখে বোঝা যাচ্ছে পেশাদারী কঠোরতা। ওনাদের মধ্যে যিনি টিমের দায়িত্বে ছিলেন, তিনি সোজা আহিলের সামনে এসে দাঁড়ালেন। আহিল ওনাকে দেখে হালকা মাথা ঝাঁকিয়ে মবিন আহমেদের দিকে ইশারা করে শান্ত গলায় বলল,
– ইনিই মবিন আহমেদ। চাইল্ড ট্রা’ফি’কিং গ্যাং এর সাথে ওনার ডিরেক্ট কানেকশন, আমার ওয়াইফকে হুম’কি দেওয়ার সমস্ত ভয়েস রেকর্ড আর ওনার ব্যাংক ট্রানজেকশনের যা যা ডিটেইলস আমি আপনাদের পাঠিয়েছিলাম সব কিছুর মূল হোতা এই লোকটাই। আমার ছেলেকে কিড’ন্যাপ করার পেছনের আসল কালপ্রিটও ওনি!
মবিন উঠে দাঁড়িয়ে গর্জে উঠে বললো,

– আহিল! তুই নিজের মেজো চাচাকে পুলিশে দিচ্ছিস? দুনিয়ার মানুষ জানলে কী বলবে? আমাদের বংশের একটা সম্মান আছে!
সেই গর্জনে আহিল মোটেও দমলো না বরং তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বললো,
– বংশের সম্মান? যে মানুষটা টাকার লোভে নিজের বংশের সাথে বেইমানি করতে পারে তার মুখে বংশের সম্মানের কথা বড্ড বেমানান মেজো চাচা! সম্মান আপনি কাল রাতেই ট্যানারির ওই নোংরা নর্দমায় বিসর্জন দিয়ে এসেছেন।
অফিসারের ইশারায় বাকি কনস্টেবলরা এগিয়ে এসে মবিন আহমেদের দুই হাত পেছনে নিয়ে শক্ত করে হাতকড়া পরিয়ে দিল। এবার নিজের স্ত্রীর দিয়ে তাকিয়ে বললো,
– আদিলের মা, তুমি একটু বলো আহিলকে! কি করছে ও?
কিন্তু আহিলের চাচী তখনো পাথরের মতো শক্ত হয়ে দেয়ালের দিকে মুখ ফিরিয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। ওনার চোখ দিয়ে টপটপ করে জল পড়লেও স্বামীর এই জঘন্য অপ’ রাধের পক্ষে দাঁড়ানোর মতো মানসিকতা ওনার ছিল না।

পুলিশ যখন মবিন আহমেদকে টেনে সদর দরজার দিকে নিয়ে যাচ্ছিল, পুরো ড্রয়িংরুমে তখন থমথমে নীরবতা নেমে এলো। কেউ ওনার দিকে তাকাচ্ছিলো না বরং ঘৃণার সাথে বিদায় দিচ্ছিলো।
মবিন আহমেদকে নিয়ে পুলিশের গাড়িটা সাইরেন বাজিয়ে চলে যাওয়ার পর আহিল একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। এতক্ষণের জমানো সমস্ত মানসিক উত্তেজনা আর ক্রো’ধ উগরে দেওয়ার পর ও যেন কিছুটা ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। ও ধীর পায়ে হেঁটে গিয়ে সোফায় বসল এবং নিজের দুহাতে মুখটা ঢেকে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। মাথা প্রচন্ড ব্য থা করছে। সে উঠে রুমে চলে গেল। আদনান গাড়ি নিয়ে খেলছে আর নওমি বসে ছিলো অন্যমনষ্ক হয়ে। আহিল গিয়ে ধপ করে শুয়ে পড়ল। ওর শুয়ে পড়ার আওয়াজে নওমি চমকে উঠে পাশে তাকাল। আহিল চোখ বন্ধ করে কপালে কনুই রেখে বললো,

– কেউ যেন ডিস্টার্ব না করে। আমি কালকে সারারাত ঘুমোয় নি। এখন ঘুমাবো।
বলে চুপ হয়ে গেল। বেশকিছুক্ষণ যেতেই কপালে একটা ঠান্ডা নরম হাতের ছোঁয়া পেল সে। সেই হাত পুরো কপাল জুড়ে টিপে দিচ্ছে। যেটা আহিলের ব্যথা নিরাময় করার সাথে সাথে বুকের একপাশেও প্রশান্তি দিচ্ছে। ওর ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠলো। আচ্ছা? আহিলের বর্তমান সময়গুলো এতো সুন্দর যাচ্ছে কেন?
ঠোঁটের কোণে ফুটে ওঠা সেই এক চিলতে হাসির রেখা নওমির চোখ এড়াল না। নওমি একটু থমকে গেল, হাতটা সরিয়ে নিতে চাইল। কিন্তু আহিল তা হতে দিল না। ও চট করে নিজের এক হাত দিয়ে নওমির কবজিটা চেপে ধরে নিজের কপালের ওপরই রেখে দিল। এবার ও ধীরে ধীরে চোখ মেলল। সে নওমির চোখের দিকে তাকিয়ে নিচু গলায় বলল,

নূর ই মহব্বত পর্ব ২৭

– হাত সরাচ্ছ কেন? প্রেসক্রিপশন ছাড়া ডক্টর আযলান কোনো ওষুধ দেয় না ঠিকই, কিন্তু ডক্টরের নিজেরও যে কখনো কখনো এমন একটা নিরাময়ের প্রয়োজন হয় সেটা বুঝি জানো না?
নওমি লজ্জায় আর আবেশে চোখ নামিয়ে নিল। নিজের হাতটা ছাড়িয়ে নেওয়ার কোনো জোরালো চেষ্টাও ও করল না।

নূর ই মহব্বত পর্ব ২৯

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here