Home নূর ই মহব্বত নূর ই মহব্বত পর্ব ২৯

নূর ই মহব্বত পর্ব ২৯

নূর ই মহব্বত পর্ব ২৯
তাবাসসুম তাজ্বওয়ারী

রাত প্রায় একটা পেরিয়েছে, কিছুক্ষণ আগেই খেয়েদেয়ে রুমে এলো নওমি আর আহিল। আহিলের চাচী বিকালেই ওদের বাড়ি ফিরে গেছে। আহিল অবশ্য বলেছিল এখানে থাকতে কিন্তু উনি শুনেন নি। নওমির কাছে ক্ষমা চেয়ে চলে গেছেন।
বিছানার মাঝে হাত পা ছড়িয়ে ঘুমিয়ে আছে আদনান। ঘুম নেই আহিলের চোখে। সে জোর করে নওমিকে বসিয়ে রেখে ওকে শুনাচ্ছে আদনান ওকে কিভাবে বাবা ডেকেছে। কিভাবে নিজ থেকে বাবা ডেকে ওর দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। নওমির চোখে ঘুম থাকলেও সে মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে দেখছে আহিলকে। কেমন বাচ্চাদের মতো খুশি হয়ে ওকে পুরো কাহিনি শুনাচ্ছে! ও বিছানায় আধশোয়া হয়ে হাত-পা নেড়ে অনর্গল কথা বলে যাচ্ছে, যেন কোনো এক মহাবিজয়ী বীর তার জীবনের শ্রেষ্ঠ যুদ্ধজয়ের গল্প শোনাচ্ছে।
ক্লান্তি আর ঘুমে নওমির চোখের পাতা দুটো ভারি হয়ে আসলে সে হাই তুলে বললো,

– ঘুমাবেন না?
আহিল ওর আঙুলের ভাঁজে আঙুল গুঁজে বললো,
– আরেহ ঘুমাবো আগে তো শুনো! ট্রাস্ট মি নওমি, ওই এক সেকেন্ডের জন্য আমার মনে হয়েছিল আমার চারপাশের পুরো পৃথিবীটা থমকে গেছে। আমার হার্টবিট যেন কয়েক মুহূর্তের জন্য বন্ধ হয়ে গিয়েছিল! আমি তখন সব হিংস্রতা ভুলতে বসেছিলাম…
নওমি হেসে বললো,
– আমি জানি! এতদিন যেই ছেলেকে চকলেটের লোভ দেখিয়ে ডাকাতে চাইতেন সে হুট করে ডাকলে কেমন লাগবে!
আহিল নওমির কথার পিঠে কিছু বলল না। তারপর ঘুমন্ত আদনানের গোলগাল ফুটফুটে মুখের দিকে তাকিয়ে পরম মমতায় ওর কপালে হাত বুলাতে বুলাতে বলল,
– ও তোমাকে যেমন ভালোবাসে ও এখন থেকে ওর বাবাকেও ঠিক ততটাই ভালোবাসবে। দেখিও তুমি, কাল সকাল হলেই ও আবার আমার কোলে আসার জন্য বায়না ধরবে। চকলেট এর জন্য আমাকে মনে পড়বে হু!

নওমি এবার ফিক করে হেসে ফেলল। আহিলের এই বাচ্চাদের মতো ঈর্ষা আর অধিকারবোধ ওর বড্ড মিষ্টি লাগল। ও নিজের ভারী হয়ে আসা চোখ দুটো টেনে কোনোমতে মেলে রেখে বলল,
– হ্যাঁ ডক্টর সাহেব, আপনার ছেলে আপনার ন্যাওটা হয়ে গেছে অলরেডি! এবার অন্তত চোখ দুটো বন্ধ করবেন চলুন! রাত দেড়টা বাজতে চলল, আপনার কাল সকালে আবার রাউন্ডে যাওয়ার তাড়া আছে না? কালকে কিন্তু মিস দিতে পারবেন না! আজকেও যান নি!
– হু চলেন ম্যাডাম।
আহিল আর কোনো আপত্তি করল না। নওমি রুমের লাইট বন্ধ করে বিছানায় ফিরে এসে দেখল আহিল এক হাত আদনানের বুকের ওপর রেখে এক দৃষ্টিতে ওর দিকেই তাকিয়ে আছে।
নওমি শুয়ে পড়ে গায়ে চাদরটা টেনে নিতে নিতে বলল,
– কী দেখছেন অমন করে? ঘুমান এবার।
ওর গলার স্বরে গভীর এক অনুভূতির ছোঁয়া,
– দেখছি আমার হারিয়ে যাওয়া পূর্ণতাকে। তিনটে বছর এই ঘরটা, এই বিছানাটা কতটা খাঁ খাঁ করত জানো নওমি? মাঝরাতে যখন ঘুম ভেঙে যেত, অভ্যাসবশত পাশে হাতড়াতাম তোমায় খোঁজার জন্য। কিন্তু যখন দেখতাম ফাঁকা বিছানা, বুকের ভেতরটা হু হু করে উঠত। আজ মনে হচ্ছে আমার আর কিচ্ছু চাওয়ার নেই। সব চাওয়া আল্লাহ পূরণ করে দিয়েছেন! আমায় সব ফিরিয়ে দিয়েছেন।
আহিলের এমন আকুল করা কথায় নওমির বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। এতদিনের সব অভিমান, দূরত্ব যেন ধুয়েমুছে সাফ হয়ে গেছে। ও একটু এগিয়ে এসে নিজের হাতটা বাড়িয়ে আহিলের চুলে বিলি কেটে দিতে দিতে বলল,

– এইসব আর চিন্তা করবেন না! এখন থেকে প্রতিদিন চোখের সামনেই আমাদের দেখতে পাবেন।
আহিল নওমির হাতটা ধরে নিজের ঠোঁটের কাছে নিয়ে এলো, তারপর ওর হাতের তালুতে একটা গভীর চুমু খেল। নওমি সামান্য শিউরে উঠলেও হাতটা সরিয়ে নিল না। আহিল চোখ দুটো বন্ধ করে নওমির হাতটা নিজের বুকের বাম পাশে, ঠিক হৃদস্পন্দনের ওপর চেপে ধরে বলল,
– আর কোনোদিন তোমাদের আমার জীবন থেকেই যেতে দেবো। তোমরা দুজন এখন আমার এই বুকের খাঁচায় আজীবনের জন্য বন্দী!
আহিল নওমির হাতটা নিজের বুকের ওপর শক্ত করে চেপে ধরে শেষমেশ ঘুমের দেশে তলিয়ে গেল।

সকাল হতেই সবার আগে ঘুম ভাঙল আদনানের। সে উঠে বসেই চোখ ডলতে ডলতে দেখল, ওপাশে ওর মা ঘুমিয়ে আরেকপাশে বাবা ঘুমিয়ে আছে। আদনান কিছুক্ষণ ওদের দিকে পিটপিট করে তাকিয়ে রইল, তারপর ও নিজের ছোট্ট হাত দুটো দিয়ে আহিলের নাক আর গাল টেনে ওর পেটের উপর বসে পড়লো। ছোট্ট আদনানের এই হঠাৎ হা’ম’লায় আহিলের ঘুমটা এক ঝটকায় ছুটে গেল। পেটের ওপর ছোট্ট একটা মানুষের ভর, আর গালে নরম তুলতুলে দুটো হাতের অত্যাচার। আহিল চোখ মেলা মাত্রই দেখল আদনান ওর মুখের ঠিক ওপরে ঝুঁকে এসে খিলখিল করে হাসছে। আহিল চোখের পলক ঝাপটে ঘুম তাড়ানোর চেষ্টা করে তাকালো। আদনানকে ঝাপটে ধরে ওভাবেই নিজের বুকের ওপর শুইয়ে দিয়ে বললো,
– গুড মর্নিং! উঠে গেছে আমার বাপধন?
আদনান খিলখিল করে হেসে আহিলের গলার নিচে নিজের মাথাটা গুঁজে দিয়ে আধো আধো গলায় জবাব দিল,

– গুত মোন্নিং
– সকাল সকাল বাবার পেটের ওপর চড়ে বসা হয়েছে, হ্যাঁ? ভারী দুষ্টু হয়েছো তো তুমি!
বাবা-বেটার এই খিলখিল হাসির আওয়াজে নওমিরও ঘুম ভেঙে গেল। ও পিটপিট করে চোখ মেলে তাকিয়েই দেখল, আদনান আহিলের বুকের ওপর উপুড় হয়ে শুয়ে দুই পা দুলিয়ে দুলিয়ে খেলছে। নওমি সময় দেখে উঠে বসলো। চুলগুলো খোপা করতে করতে বললো,
– হয়েছে বাপ ব্যাটা এবার উঠুন! নাহয় এভাবে হেলাফেলা করে চাকরি হারাবেন!
আহিল সেসব পাত্তা দিলো না। ও আদনানকে ওভাবেই বুকে জড়িয়ে রেখে নওমির দিকে তাকিয়ে ভ্রু নাচিয়ে বলল,
– দেখেছ ম্যাডাম? আমি রাতে কী বলেছিলাম? ও সকাল হতেই আগে বাবার কাছেই আসবে। ডক্টর আযলানের প্রেডিকশন কখনো ভুল হয় না।
– যা মন চাই করেন। প্রতিদিন এই লেট লেট বিছানা ছাড়া আমার একদম পছন্দ নয়!
নওমি বিছানা থেকে নেমে ফ্রেশ হতে চলে গেল। আহিল আদনানকে নিয়ে উঠে বললো,
– চল চল তোর মা ফা’য়ার হয়ে যাচ্ছে।
আদনান কিছু বুঝলো না সে গোলগোল চোখে মায়ের যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইলো। আহিল ওকে নিয়ে উঠতেই ও আহিলের গলা জড়িয়ে বললো,
– পাইয়ার?
আহিল হো হো করে হেসে ফেললো।
– হ্যাঁ রে বাবা ফা’য়ার!

নওমি আদনানকে নিয়ে ডাইনিং টেবিলে বসে আছে। ছেলেটাকে কোনোভাবেই খাওয়াতে পারছে না সে। কেন খাচ্ছে না এটাও বুঝতে পারছে না। ও বিরক্ত হয়ে বললো,
– কি সমস্যা তোমার আদনান? খাওয়া নিয়ে ডিস্টার্ব করছো কেন আবার?
কথাটা কিছুটা ধমকের সুরে বলতেই আদনানের চোখ ছলছল করে উঠল। তা দেখে ফুঁস করে শ্বাস ছাড়ল নওমি। কিছু বলা যায় না! আলালের ঘরের দুলাল হয়েছেন!! এবার নওমি নরম সুরে বললো,
– কি হয়েছে আব্বু? খাচ্ছো না কেন? মজা হয় নি?
আদনান মাথা নাড়িয়ে বললো,
– বাবা কাওয়াবে
নওমি ছোট ছোট চোখে তাকিয়ে বললো,
– আমি খাওয়ালে কি সমস্যা? আম্মুর হাতে খাবে না?
আদনান সরাসরি না সূচক মাথা নাড়ল।
– বাবা… বা..বাআ
আদনান ডেকেই চলেছে আহিলকে। নওমি বিরক্ত হয়ে বললো,
– আদনান, আমি খাইয়ে দিচ্ছি তো তোমাকে! বাবা পরে খাওয়াবে।
এই বলে এক লোকমা মুখের সামনে ধরতেই আদনান মুখ সরিয়ে নিলো। এক হাত মুখে চেপে জেদ ধরে বললো,

– না বাবা…
এর মধ্যে একদম রেডি হয়ে, শার্টের হাতা দুটো কনুই পর্যন্ত গুটিয়ে ডাইনিং টেবিলে এসে উপস্থিত হলো আহিল। ওদের দিকে তাকিয়ে হেসে বললো,
– কি হয়েছে? সকাল সকাল মাকে এত জ্বালানো হচ্ছে কেন?
নওমি প্লেটটা টেবিলের ওপর একটু শব্দ করে রেখে আহিলের দিকে তাকিয়ে বলল,
– আপনার আদর আর আদিখ্যেতা! আপনি নাকি খাইয়ে দিবেন। আমার হাতে এখন আর ওনার মুখে খাবার রুচছে না! মাত্র দুই দিনেই অভ্যাস একদম বিগড়ে ফেলেছেন ওর!
– আরেহ তাই নাকি? আদনান আয় আয়!
আদনানকে ডাকতেই আদনান দুই হাত বাড়িয়ে দিল। নওমির কোল থেকে গিয়ে আহিলের গলা জড়িয়ে আয়েশ করে বসলো। আহিল খাবার নিয়ে ওর মুখের সামনে ধরতেই গপগপ করে খেয়ে নিল কোনো বায়না ছাড়াই। নওমি হাত গুটিয়ে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে চোখ ছোট ছোট করে ওদের কাণ্ড দেখতে লাগল।
আহিল আদনানের গালটা একটু টিপে দিয়ে বলল,
– কী রে বাপধন? মায়ের হাতের চেয়ে বাবার হাতে খেতে এত টেস্ট, তাই না?
আদনান মুখে খাবার নিয়েই মাথা ওপর-নিচ করে সায় দিল। নওমি কৃত্রিম রাগ দেখিয়ে বলল,
– বাহ এখন মা আর ভালো লাগে না? বাবা পেয়ে মা-কে ভুলে যায়!
নওমি মুখ ভার করে ওপাশ ফিরে বসার ভান করতেই আদনান একটু ঘাবড়ে গেল। ও আহিলের গলা ছেড়ে দিয়ে নওমির দিকে তাকাল। মুখে আঙুল দিয়ে কিছুক্ষণ ভেবে নিয়ে বলল,
– মা বালু। মজা কাবার
নওমির এই মিষ্টি তোষামোদ শুনে আহিল আর নওমি দুজনেই একসাথে হেসে উঠল। আহিল আদনানকে আর এক লোকমা খাইয়ে দিয়ে বলল,

– দেখেছ নওমি? ছেলে কিন্তু অলরেডি ডিপ্লোম্যাটিক হওয়া শিখে গেছে।
নওমি হেসে ফেলে বলল,
– হবে না কেন? কার র ক্ত শরীরে বইছে শুনি? ডক্টর আযলানের ছেলে বলে কথা! মানুষকে কীভাবে মিষ্টি কথায় ভোলাতে হয়, তা তো ওনার ভালোই জানা আছে।
আহিল নওমির দিকে একটু ঝুঁকে এসে, চোখে মুখে দুষ্টুমির আভাস ফুটিয়ে নিচু গলায় বলল,
– তা ম্যাডাম, ডক্টর আযলান শুধু মিষ্টি কথায় ভোলাতেই জানে না, ভোলানো মনটা কীভাবে আজীবনের জন্য নিজের খাঁচায় আটকে রাখতে হয় তাও খুব ভালো করে জানে। প্রমাণ তো আমার ঠিক সামনেই বসে আছে।
আহিলের এই হুট করে রোমান্টিক ডায়ালগে নওমি একদম থতমত খেয়ে গেল। আড়চোখে একবার আদনানের দিকে তাকালো তারপর নয়না বেগমের রুমের দিকে। নয়না বেগম আগে আগে খেয়েই রুমে গিয়েছেন। আহিল ওকে চো’রের মতো তাকাতে দেখে বললো,
– ওদিকে তাকিয়ে লাভ নেই। আম্মু নেই আশেপাশে।
নওমি টেবিলের নিচ দিয়েই আহিলের পায়ে নিজের পা দিয়ে একটা খোঁ’চা মা’রল। চোখ রাঙিয়ে শাসিয়ে বলল,
– চুপচাপ খাবার শেষ করেন। আদনান চুপচাপ আমার কাছে খেতে আসো।
মায়ের গম্ভীর স্বর শুনে আদনান আর বায়না করলো না চুপচাপ মায়ের হাতেই খেয়ে নিলো। কিন্তু আহিল মিটিমিটি হাসছে খেতে খেতেই। আহিলের সেই অর্থপূর্ণ হাসি দেখে নওমির কান দুটো দিয়ে যেন ধোয়া বের হলো। ও ইচ্ছে করেই আর আহিলের চোখের দিকে তাকাল না, বরং পুরো মনোযোগ দিল আদনানের মুখে শেষ কয়েক লোকমা খাবার তুলে দেওয়ায়। আহিল আর কথা বাড়াল না। সে চুপচাপ খাওয়া শেষ করে বেরিয়ে গেল। আজকের দিন অনেক ব্যস্ততায় কাটবে তার।
কেবিনে বসে ছিলো আহিল। পেশেন্টের সিরিয়াল চলছিল। হুট করে একজন পেশেন্ট এলো। আহিল চোখ না তুলেই বললো,

– ভেতরে এসে বসুন। কি সমস্যা?
বেশ কিছুক্ষণ কোনো উত্তর না পাওয়ায় চোখ তুলে তাকিয়ে চমকে উঠল সে। উঠে দাঁড়িয়ে বললো,
– তুই এখানে!! তুই এখানে কেন এসেছিস?
সামনে বসে থাকা মেয়েটাও দাঁড়িয়ে বললো,
– হাইপার হোস না আহিল! আমি কিছু কথা বলেই চলে যাব! একটু সময় দে।
– দেখ সামিয়া আমার ডিউটি আছে! অনেক পেশেন্ট বাইরে অপেক্ষা করছে তোর অপ্রয়োজনীয় কথা শুনার সময় আমার নেই।
সামিয়া অনুনয়ের সুরে বললো,
– প্লিজ আহিল, একটু বস!
আহিল একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে ঘড়ির দিকে তাকাল। বাইরে সত্যিই অনেক পেশেন্ট। সামিয়ার জেদ দেখে সে বাধ্য হল বসতে। ওর চেহারা বরাবরের মতোই গম্ভীর কোনো ভাবাবেগ নেই সেখানে। সে ঠান্ডা গলায় বলল,

– ফাইভ মিনিটস অনলি! এর বেশি এক সেকেন্ডও নয়। কী বলতে চাস, দ্রুত বল।
সামিয়া ধপ করে সামনের চেয়ারটায় বসে পড়ল। ওর দুই হাত কাঁপছিল। ও টেবিলের ওপর রাখা একটা কাগজের ওয়েট পেপারটার দিকে তাকিয়ে থেকে ভাঙা গলায় বলতে শুরু করল,
– আমি জানি আহিল, তোদের জীবনে, বিশেষ করে নওমি আর তোর মাঝে আমি যে ঝড়টা তোলার চেষ্টা করেছি, তার জন্য কোনো ক্ষমাই যথেষ্ট নয়। তোর লো ভে অ’ন্ধ হয়ে আমি ভেবেছিলাম, তোকে নওমির থেকে আলাদা করতে পারলে হয়তো তোকে আমি পেয়ে যাব। কিন্তু আমি এখন বুঝতে পারি জোর করে সবকিছু পাওয়া যায় না। আজ আমার বড্ড ঘৃণা হচ্ছে নিজের ওপর। আমি কতটা নিচে নেমে গিয়েছিলাম, ভাবতেই নিজের গা শিউরে উঠছে।
এইটুকু বলে দম নিলো সামিয়া।
– আসলে আমি ছোট থেকে সব বলার আগে পেয়ে এসেছি তো তাই তোকে পাবো না এটা মানতে পারছিলাম না। তাই যেভাবে পেরেছি চেষ্টা করেছিলাম! যাইহোক আমি শুধু তোকে এইটুকু বলতে এসেছি আহিল… আমি সত্যিই নিজের ভুলটা বুঝতে পেরেছি। নওমির জীবনের এত বড় ক্ষ’তি করার চেষ্টা করার পর তোদের সামনে দাঁড়ানোর যোগ্যতাও আমার নেই। আমি জানি, মুখে একটা ‘সরি’ বললেই তোদের এই তিন বছর ফিরে আসবে না। তাও… তুই পারলে আমাকে ক্ষমা করে দিস। নিজের ভেতরের এই অপরাধবোধ নিয়ে বেঁচে থাকা বড্ড কঠিন।
আহিল এবার মুখ খুলল,

– ক্ষমা চাওয়ার অধিকার আমার কাছে নেই সামিয়া। তুই অন্যায়টা আমার চেয়ে নওমির সাথে অনেক বেশি করেছিস। যে মেয়েটা এতগুলো বছর নিজের সন্তানকে একা বুকে আগলে রেখে প্রতিনিয়ত চাতক পাখির মতো দিন গুনেছে, ক্ষমা করার হলে ওই তোকে করবে। তবে হ্যাঁ, আজ তোর এই অনুশোচনা দেখে এতটুকু স্বস্তি পাচ্ছি যে তোর ভেতরের সামিয়াটা পুরোপুরি ম’রে যায়নি।
সামিয়া আলতো করে মাথা নাড়ল। ও চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে ব্যাগটা কাঁধে নিতে নিতে বলল,
– আমি নওমির সামনে যাওয়ার সাহস পাচ্ছি না। তুই… তুই পারলে ওকে আমার হয়ে এই কথাটা বলে দিস। আর… আর বাবা আমার বিয়ে ঠিক করেছে। আগামী সপ্তাহে আমার বিয়ে হয়তো। ছেলের আগে একটা বিয়ে ছিলো। আগে বয়স বাড়লেও ডক্টর থাকায় ভালো প্রস্তাব আসতো কিন্তু এখন এইরকম প্রস্তাব ছাড়া কিছুই আসে না তাই বাবা না পারতে এখানেই বিয়ে ঠিক করলো। যে আভিজাত্য আর অহংকার নিয়ে আমি চলতাম, আজ তা ধুলোয় মিশে গেছে। নিজের জিদ আর ভুলের শাস্তি যে এভাবে পেতে হবে, তা ভাবিনি। যাই হোক, আমার জন্য দোয়া করিস। তোদের আর কোনোদিন ডিস্টার্ব করব না। ভালো থাকিস তোরা।

নূর ই মহব্বত পর্ব ২৮

এই বলে সামিয়া আর এক মুহূর্তও কেবিনে দাঁড়াল না। ও দ্রুত পায়ে দরজা খুলে বেরিয়ে গেল। আহিল কিছুক্ষণ শূন্য দরজার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে আহিল নিজেকে সামলে নিল। বাইরে অনেক পেশেন্ট অপেক্ষা করছে, এখন ব্যক্তিগত আবেগ নিয়ে বসে থাকার সময় নয়। ও ইন্টারকমের বাটনটা চেপে বাইরে থাকা অ্যাসিস্ট্যান্টকে বলল,
– নেক্সট পেশেন্টকে ভেতরে পাঠান।

নূর ই মহব্বত পর্ব ৩০

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here