Home নূর এ সাহাবাদ নূর এ সাহাবাদ পর্ব ৫১

নূর এ সাহাবাদ পর্ব ৫১

নূর এ সাহাবাদ পর্ব ৫১
জান্নাতুল ফেরদৌ

শীতের সকাল। চারপাশে সাদা কুয়াশায় ঢাকা। উঠানের গাছ গুলোতেও শিশির জমে আছে। আশে পাশের বাড়ি গুলোতে মোরগ ডাকছে। আবিদ সেই ভোর থেকেই ব্যস্ত হয়ে তৈরি হচ্ছে। পছন্দের পাঞ্জাবি টাই খুজে পাচ্ছে না। ওদিকে সময় গড়িয়ে যাচ্ছে। পাঞ্জাবি যাও পেল চিরুনি পাচ্ছে না। পুরো ঘরময় হাঁটাহাঁটি করছে।
খাটে বসে চুল আঁচড়াচ্ছিল রত্নপ্রভা। ভ্রু কুচকে তাকালো ওর দিকে।
“কি ব্যাপার? সকাল সকাল এমন লাফাচ্ছেন কেন?”
আবিদ আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে পাঞ্জাবির হাতা ঠিক করতে করতে বলল

“আজ মহলে অনেক কাজ শাহজাদি।”
“কীসের কাজ?”
“আল্লাহ রহম করেছেন না? ভাবি আর ছোট শাহজাদি সুস্থ আছে। তাই জমিদার বাবু আজ অনেক গুলো মহিষ আর ছাগল জবাই করাবেন। পুরো রাজ্যে মাংস বিলি হবে। গরীবদের খাবার দেওয়া হবে। এজন্য জলদি যেতে হবে।”
রত্নপ্রভা কিছুক্ষণ চুপ করে তাকিয়ে রইলো।
তারপর ধীরে বলল
“ও…”
আবিদ তখন চিরুনী পেয়ে তা দিয়ে চুল আচড়াতে আচড়াতে তাড়াহুড়ো করছে। এমন সময় হাত ফসকে চিরুনীটা ধপ করে পড়ে গড়িয়ে চলে গেল খাটের নিচে।
“ধুররর।”

বিরক্ত হয়ে নিচু হলো আবিদ। খাটের নিচে অন্ধকার। হাত ঢুকিয়ে চিরুনী ধরতে গিয়েই থেমে গেল সে। কপাল কুঁচকে এদিক ওদিক তাকালো।
খাটের একেবারে কোণায় একটা ছোট কাঠের বাক্স। গতকালও কি এটা ছিল? আবিদ ভ্রু কুচকে বাক্সটা টেনে বের করলো। রত্নপ্রভার বুক ধক করে উঠলো বাক্স টা দেখে। মুহূর্তেই মুখের রং একটু ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
“ও…ওটা আবার ধরছেন কেন?”
আবিদ অবাক হয়ে তাকালো।
“কেন? আপনার নাকি?”
“হ্যা…মানে… পুরোনো কিছু জিনিস।”
আবিদ ততক্ষণে বাক্সটার ঢাকনা খুলে ফেলেছে।
খুলতেই তার চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল। ভেতরে সারি সারি কাঁচের শিশি। কোনোটায় নীল তরল। কোনোটায় লাল। আরেক পুটলিতে আবার শুকনো গুঁড়ো। আবার কিছুতে অদ্ভুত কালচে পদার্থ। আবিদ একটা শিশি হাতে তুলে নিয়ে অবাক গলায় বলল

“এগুলো কিসের?”
রত্নপ্রভার গলা শুকিয়ে এলো।
“ওগুলো… ওষুধ।”
“এত রকম?”
আবিদ আরেকটা শিশি তুলে আলোয় ধরলো। “এই গন্ধটাও কেমন অদ্ভুত…”
রত্নপ্রভা দ্রুত এগিয়ে এসে শিশিটা নিয়ে নিলো। “আপনি এসব বুঝবেন না। পুরোনো জিনিস।”
আবিদ এবার পুরোপুরি কপাল কুঁচকে তাকালো তার দিকে।
“শাহজাদি… আপনি এসব কোথায় পেলেন?”
রত্নপ্রভা দ্রুত শিশিগুলো আবিদের হাত থেকে নিয়ে নিলো। তারপর তাড়াহুড়ো করে একটার পর একটা আবার কাঠের বাক্সে ভরতে লাগলো।
হাত কাঁপছে অনবরত। কিন্তু মুখে সেটা প্রকাশ হতে দিল না। ঢাকনাটা বন্ধ করে খাটের নিচে ঠেলে দিতে দিতে বলল

“এত প্রশ্ন করার কী আছে? মেয়েদের কিছু জিনিস থাকে।”
আবিদ এখনও দাঁড়িয়ে আছে। চোখে স্পষ্ট সন্দেহ।
“শাহজাদি, এগুলো সাধারণ ওষুধ মনে হলো না আমার।”
রত্নপ্রভা এবার বিরক্ত হয়ে তাকালো।
“আপনি কি এখন হেকিমও হয়ে গেলেন?”
আবিদ চুপ করে যায়। রত্না জোর করে স্বাভাবিক গলায় বলল
“যান এখন। আমি খাবার বাড়ছি।”
সে উঠে খাবার দিতে যাবে তখনই আবিদ নিচু স্বরে বলল
“আজ খাবার খাব না”
রত্নপ্রভা থামলো।
“মানে?”
“জমিদার বাবু বলেছেন সবাই যেন মহলেই সকালের খাবার সাড়ে । আজ অনেক আয়োজন।”
তার গলায় অদ্ভুত গাম্ভীর্য। আগের মত হাসিখুশি লাগছে না তাকে। পাগড়িটা ঠিক করে দরজার দিকে হাঁটতে হাঁটতে আবার থামলো সে। একবার পিছনে তাকালো রত্নপ্রভার দিকে।

“আর হ্যা…কিছু প্রয়োজন হলে আম্মাকে বলবেন। একা একা বের হবেন না”
কথাটা বলেই বেরিয়ে গেল আবিদ। দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ হতেই কয়েক মুহূর্ত স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো প্রভা। তারপর দ্রুত গিয়ে দরজা আটকিয়ে দিলো। বুকের ভেতর ধুকপুক করছে। তড়িঘড়ি করে খাটের নিচ থেকে বাক্সটা বের করলো আবার। ঢাকনা খুলতেই সারি সারি শিশিগুলো দেখা গেল। রত্নপ্রভা একটা একটা করে হাতে নিয়ে দেখতে লাগলো। কোনোটা ভেঙেছে কিনা। কোনোটা কমেছে কিনা। সব ঠিক আছে দেখে যেন একটু শান্ত হলো।
তারপর একটা ছোট কালচে তরল ভর্তি শিশি তুলে নিলো। শিশিটার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো স্থিরভাবে। ঠোঁটের কোণে অদ্ভুত হাসি ফুটে উঠলো। বাইরে থেকে আবিদের মায়ের কণ্ঠ ভেসে এলো
“মা রত্না? তুমি খাবে না?”
প্রভা চট করে শিশিটা আঁচলের ভেতর লুকিয়ে ফেললো। তারপর সম্পূর্ণ স্বাভাবিক মুখে বাইরে বেরিয়ে এলো। রান্নাঘরে গিয়ে দেখলো বৃদ্ধা মহিলা সকালের খাবার গুছাচ্ছে। রত্না মিষ্টি গলায় বলল

“আমি দিচ্ছি মা, আপনি বসুন।”
ভদ্রমহিলা হাসলেন।
“আহা, আমার মেয়েটা কত লক্ষি।”
প্রভা নিচু হয়ে খাবারের বাটিটা হাতে নিলো।
চারপাশে একবার তাকালো। কেউ নেই। আবিদের মা হাত ধুতে গেছে। মুহূর্তের মধ্যে আঁচলের আড়াল থেকে শিশিটা বের করে কয়েক ফোঁটা তরল মিশিয়ে দিলো খাবারে। তারপর চামচ দিয়ে ভালো করে নেড়ে দিল। মুখে তখনও শান্ত হাসি।
যেন কিছুই হয়নি।
খাবার খাওয়ার পর উঠানে বসে কিছুক্ষণ রোদ পোহাচ্ছিল আবিদের মা। শীতের নরম রোদ। হালকা বাতাস বইছে। ভদ্রমহিলা উলের শালটা গায়ে আরও ভালো করে জড়িয়ে নিলেন। রত্নপ্রভা পাশে বসে শান্ত মুখে সুতা ছাড়াচ্ছিল। কিছুক্ষণ পরই মহিলা কপালে হাত দিলেন।

“আরে… মাথাটা কেমন ঘুরছে যেন…”
রত্নপ্রভা সঙ্গে সঙ্গে তাকালো।
“কি হয়েছে মা?”
“জানি না রে… চোখে কেমন ঝাপসা লাগছে…”
কথা বলতে বলতেই শরীরটা ঢলে এলো তার।
রত্না দ্রুত ধরে ফেললো।
“চলুন ভিতরে গিয়ে শুয়ে পড়ুন।”
ভদ্রমহিলা আর তেমন কিছু বললেন না। মনে হচ্ছে হঠাৎ করেই খুব ক্লান্ত লাগছে। রত্না তাকে ধরে ধীরে ধীরে কক্ষে নিয়ে গেল। খাটে শুইয়ে দিতেই মহিলা চোখ বন্ধ করে ফেললেন।
“একটু ঘুমালে ঠিক হয়ে যাবে বোধহয়…”
রত্নপ্রভা মাথার কাছে বসে মৃদু স্বরে বলল
“হ্যা, আপনি ঘুমান।”
কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই গভীর ঘুমে তলিয়ে গেলেন তিনি। রত্নপ্রভা কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো তার দিকে। তারপর উঠে দাঁড়ালো। নাহহহ ঘুমিয়ে গেছে। বাইরে গিয়ে চারপাশ দেখে নিলো। পুরো বাড়ি নিস্তব্ধ। আবিদ তো মহলে। এই সুযোগটাই দরকার ছিল তার। দ্রুত কক্ষে ফিরে খাটের নিচ থেকে কাঠের বাক্সটা বের করলো। বাক্সটা হাতে নিয়েই আলমারি খুলে কালো বোরখা বের করলো। মাথা থেকে পা পর্যন্ত নিজেকে ঢেকে ফেললো। মুখেও নিকাব টেনে নিলো সাবধানে।
শুধু চোখদুটো দেখা যাচ্ছে এখন। শেষবারের মত ঘরের দিকে তাকালো সে। তারপর বাক্সটা শক্ত করে বুকে চেপে নিঃশব্দে বেরিয়ে গেল বাড়ি থেকে।

সাহাবাদ মহল আজ উৎসবের নগরী। চারপাশে মানুষের কোলাহল। বড় বড় হাঁড়িতে রান্না হচ্ছে মাংস। মহিষ জবাই হচ্ছে। ছাগল কাটছে কসাইরা। প্রাসাদের বাইরের বিশাল প্রাঙ্গণে লম্বা লাইন ধরে দাঁড়িয়ে আছে প্রজারা। সবার মুখে আনন্দ। হাতে আবার কাপড়ের থলে। আজ সাহাবাদে অভাবী মানুষ কেউ খালি হাতে ফিরবে না। বাকের শাহ্ নিজে দাঁড়িয়ে সব তদারকি করছেন। বয়স হলেও আজ মুখে আলাদা জ্যোতি। মাঝে মাঝে এটা ওটা দেখিয়ে বলছেন
“ওই বৃদ্ধ লোকটার ঝুড়িতে আরেকটু দাও। ওদিকে বাচ্চা বেশি, ওদের ভাগ বাড়িয়ে দাও।কেউ যেন খাবার ছাড়া না যায়।”
প্রজারা দূর থেকে দোয়া দিচ্ছে।

“আল্লাহ ছোট শাহজাদী কে দীর্ঘ জীবন দিক। আল্লাহ সাহাবাদ রক্ষা করুক।”
মহলের ভেতরেও উৎসবের আবহ। দাসীরা নতুন কাপড় পরে ঘুরছে। করিডোরে আতরের গন্ধ। চারপাশের সকলের মুখে হাসি। অনেকদিন পর যেন এই মহল একটু প্রাণ ফিরে পেয়েছে।
অন্দরমহলের বড় কক্ষে আধশোয়া হয়ে বসে আছে মেহেরুন্নেসা। কোলে ছোট্ট শিশুটি। সাদা নরম কাপড়ে জড়ানো। একদম তুলোর পুতুলের মত লাগছে তাকে। বাইজিদ পাশে বসে মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে আছে মেয়ের দিকে। তার বিশাল শক্ত হাতের এক আঙুল শক্ত করে ধরে রেখেছে ছোট্ট শিশুটি। মেহেরুন্নেসা তা দেখে মৃদু হেসে বলল
“দেখেছেন? আপনার হাত ছাড়ছে না।”
বাইজিদ নিচু হয়ে মেয়ের কপালে চুমু খেল।
তারপর শান্ত গলায় বলল

“ছাড়বেও না। এ যে আমার কলিজা।”
তখনই বাকের শাহ্ কক্ষে প্রবেশ করলেন।
মুখভর্তি হাসি। এসেই নাতনির দিকে তাকিয়ে বললেন
“ কি করছে আমার দাদু? শোনো, নাম ঠিক করা হয়েছে।”
মেহেরুন্নেসা চোখ তুলে তাকালো।
“কি নাম আব্বাজান?”
বাকের শাহ চোখে মুখে উপচে পড়া আনন্দ নিয়ে বললেন
“জান্নাত।”
মেহেরুন্নেসার চোখ ভিজে উঠলো।
“জান্নাত…”
বাইজিদ নামটা আস্তে করে আবার বলল। তারপর মেয়ের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে উঠলো। “আমিও আগে থেকে এই নাম ই ঠিক করে রেখেছিলাম। বলো মেহের? একদম ঠিক নাম। এ আসার পর থেকেই তো মনে হচ্ছে আমাদের জীবনে জান্নাত নেমেছে।”

বাকের শাহ্ মশকরা করে বললেন
“হুমমম। এখন আমার দেওয়া নাম তুমি নিয়ে যাবে? ওটি হচ্ছে না”
সাহাবাদ মহলে এখন সবচেয়ে আদরের মানুষ একটা ছোট্ট প্রাণ। জান্নাত। সারাদিন তাকে ঘিরেই যেন পুরো মহল ঘুরছে। সবচেয়ে বেশি পাগলামি করছে সুনেহেরা। সকাল হলেই ছুটে আসে।
দাসীদের ওবদি ধমকে দেয়
“এই এই সাবধানে ধরো। আমার বাবুকে কষ্ট দিও না। কি যে করে না এরা।”
মেহেরুন্নেসার পাশে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা তাকিয়ে থাকে বাবুর দিকে। কিন্তু সমস্যা একটাই। সে কোলে নিতে ভয় পায়। এত ছোট্ট মানুষ! মনে হয় হাত ফসকালেই পড়ে যাবে। একদিন খুব সাহস করে কোলে নিতে গিয়ে এমন কাঁপাকাঁপি শুরু করলো যে পাশ থেকে মাহাদি হেসে ফেলেছিল।
সেদিন থেকে মাহাদির সাথে কথা বলে না। আর দাঁড়িয়ে কোলেও নেয় না। পালঙ্কে বসে দুই হাঁটুর ওপর আলতো করে রাখে। আর সারাক্ষণ বকবক করে।

“বাবু তুমি এত ছোট কেন হ্যা? এই হাত দেখো তো… ওমা আঙুল গুলো দেখো… ভাবি, আল্লাহ , এত সুন্দর বাচ্চা আমি জীবনে দেখি নাই। আমার মত হয়েছে বলো?”
জান্নাত সত্যিই অসম্ভব সুন্দর হয়েছে। গায়ের রং দুধের মত ফর্সা। শীতের সকালের রোদের মত নরম আভা পুরো মুখে। মাথাভর্তি নরম চুল।
কপাল ছোট্ট। নাকটা টিকালো। আর চোখ দুটো একদম বাইজিদের মত গভীর। তবে রংটা মেহেরুন্নেসার মত । মনে হয় চোখে মধু মিশে আছে। যখন তাকিয়ে থাকে, মনে হয় বোঝে সব।
ঠোঁট দুটো ছোট্ট গোলাপের পাপড়ির মত।
কাঁদলেও মিষ্টি লাগে।
হাসলে তো পুরো রাগোল্লা লাগে। আর সবচেয়ে সুন্দর হলো তার গাল। একটু চাপ দিলেই লাল হয়ে যায়। সুনেহেরা প্রায়ই গাল টিপে বলে
“তুমি কিন্তু বড় হয়ে একদম আমার মত হবে”
বাইজিদ পাশে বসে মুচকি হেসে বলে
“আগে হাঁটতে শিখুক। তারপর তোর মত ঘোড়া চালাবে।”
সুনেহেরা গাল ফুলায়

“আমি ঘোড়া চালানোর কথা কখন বললাম? আমি তো বললাম আমার মত দেখতে হবে”
জান্নাত তখন ছোট্ট ছোট্ট হাত নাড়ায়। মাঝে মাঝে বাবার আঙুল শক্ত করে চেপে ধরে। তখন বাইজিদের মত শক্ত মানুষটাও ঘণ্টার পর ঘণ্টা মেয়ের দিকে তাকিয়ে থাকে নিঃশব্দে। সুনেহেরা আজও পালঙ্কের ওপর পা মুড়ে বসে আছে।
কোলের ওপর ছোট্ট জান্নাত। আগের মত ভয় ভয় করছে না এখন আর। আস্তে আস্তে অভ্যাস হয়ে গেছে। জান্নাতের ছোট্ট হাতের মুঠোয় নিজের আঙুল ঢুকিয়ে দিয়ে মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে আছে সে। আর সঙ্গে সঙ্গে বাচ্চাটা শক্ত করে ধরে ফেললো আঙুলটা। সুনেহেরা সাথে সাথে খিলখিল করে হেসে উঠলো।
“ভাবি দেখেছো? দেখেছল? এটাই আমার সবচেয়ে ভালো লাগে।”
মেহেরুন্নেসা আয়নার সামনে বসে চুল আচড়াচ্ছিল। হেসে বলল
“কী ভালো লাগে?”
“এই যে বাচ্চারা কিছু হাতে দিলেই শক্ত করে ধরে ফেলে। মনে হয় ছাড়বেই না। ওমা দেখেন না কেমন আঁকড়ে ধরেছে আমায়।”
সুনেহেরা এবার নিজের ওড়নার কোণা দিলো জান্নাতের হাতে। সাথে সাথে সেটাও মুঠো করে ধরে ফেললো ছোট্ট মেয়েটা। সুনেহেরা যেন আনন্দে আত্মহারা।
“আহহহ আল্লাহ। আমার বাবুটা এত মিষ্টি কেন?”
মেহেরুন্নেসা তাকিয়ে মৃদু হেসে ফেললো।বহঠাৎই মেহেরুন্নেসার মুখের হাসিটা একটু ম্লান হলো।
চিরুনীটা ধীরে নামিয়ে রেখে বলল

“আপা…”
“হুম?”
“সেদিন… বাবুকে কে নিয়ে গেছিল?”
প্রশ্নটা শুনেই চুপ হয়ে গেল সুনেহেরা। মুহূর্তের মধ্যে হাসিখুশি মুখটা চুপসে গেল। চোখের ভেতরের আলো নিভে গেল যেন। জান্নাতের ছোট্ট হাতটা তখনও তার আঙুল ধরে আছে। সুনেহেরা কিছুক্ষণ চুপ করে রইলো। তারপর মুখ নামিয়ে বলল
“আমার মা…”
মেহেরুন্নেসার বুক কেঁপে উঠলো।
“মারজান বেগম?”
সুনেহেরা তিক্ত হেসে ফেললো।
“ওনাকে মা বলতে এখন ঘেন্না লাগে ভাবি। আমি নিজের চোখে দেখেছি। দাইমা ওর লোক। বাবুকে মৃত বাচ্চার সাথে বদল করে দিচ্ছিল।”
মেহেরুন্নেসার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। সুনেহেরা দাঁতে দাঁত চেপে বলল

“ও চাইছিল তেমার সন্তান যাতে বাঁচতে না পারে। সাহাবাদের উত্তরাধিকার শেষ হয়ে যাক।”
মেহেরুন্নেসা নিঃশব্দে জান্নাতের দিকে তাকালো।
এত ছোট্ট একটা বাচ্চা, তাকেও ছাড়ে নি তারা।
সুনেহেরা চোখ নামিয়ে ফিসফিস করে বলল “আমি এখনো বুঝি না… একজন মা কীভাবে এমন হয়”

রাতের অন্ধকার পুরোপুরি মহলে নামেনি মহলপ। এই সময়ই প্রবেশ করল মিরান। চাদরের রঙটা একটু চটে গেছে। তার হাঁটার ভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছে কিছু খুঁজছে। মেহেরুন্নেসা পালঙ্কের পাশে বসে ছিল জান্নাতকে নিয়ে। মিরানকে দেখেই একটু উঠে দাঁড়ালো।
“এসেছো?”
মিরান মাথা নত করল।
“হ্যাঁ সম্রাজ্ঞী।”
তার চোখ একবার কেবল শিশুটার দিকে গেল।
জান্নাত তখন ছোট্ট আঙুল নেড়ে কারও দিকে তাকিয়ে আছে। মেহেরুন্নেসা নরম গলায় বলল
“কোল নেবে?”
মিরান এর চোখ জোড়া চিকচিক করে উঠলো। হাত বাড়াতে গিয়েও মাঝপথে থেমে গেল। মুখ শক্ত হয়ে এলো। মাথা নেড়ে বলল

“না।”
মেহেরুন্নেসা অবাক হয়ে তাকালো।
“কেন?”
মিরান চোখ নামিয়ে বলল
“আমি খুনি। রাজ্যের নামকরা অপরাধী সম্রাজ্ঞী। আমার হাতে এই শিশুকে দিলে, যদি আমার ছোঁয়ায় কোনো কলঙ্ক লাগে?”
কথাটা শুনে মেহেরুন্নেসা মৃদু হাসলো। তারপর শান্ত, দৃঢ় গলায় বলল
“যে অন্যায় থামায় তাকে কেউ কলঙ্ক বলে না মিরান। দুষ্টের দমন কখনো হত্যা নয়।”
মিরান কিছু বলল না। কিছুক্ষণ নীরবতার পর সে ধীরে এগিয়ে এলো। এবার আর হাত সরালো না।
জান্নাতকে আলতো করে কোলে তুলে নিল। শিশুটা সঙ্গে সঙ্গে খিলখিলিয়ে হেসো উঠলো। কি বুঝলো কে জানে। মিরানের চোখে বিস্ময়। যেন এতদিনের বরফ একটু গললো। সে এক হাত দিয়ে নিজের পকেট থেকে ছোট্ট একটা বস্তু বের করল। নীলচে চকচকে একটা লকেট। আলো পড়তেই সেটা যেন ভেতর থেকে জ্বলে উঠছে।
মেহেরুন্নেসা কৌতূহলী হয়ে বলল

“এটা কী?”
মিরান ধীরে বলল
“এটা বিরল এক ধাতব শিলা।”
সে আঙুলের মধ্যে ঘুরিয়ে দেখালো।
“এটা পাওয়া যায় খুব গভীর পাহাড়ের গুহায়, যেখানে সূর্যের আলো কখনো পৌঁছায় না। একে বলে নীল অবসিডিয়ান।”
মেহেরুন্নেসা বিস্মিত হয়ে তাকিয়ে রইলো। মিরান তা দেখে হেসে বলল
“এটা খুব শক্ত, কিন্তু ভেতরটা কাচের মত মসৃণ। আলো পড়লে নীল আগুনের মত ঝলক দেয়। আমাদের দেশে খুব অল্পই আছে। রাজাদের গোপন ভাণ্ডারে রাখা হয়।”
সে আলতো করে লকেটটা জান্নাতের ছোট্ট হাতে গুঁজে দিল।
“এটা ভবিষ্যত সম্রাজ্ঞীর জন্য।”
জান্নাত তখন সেটাকে শক্ত করে ধরে ফেলেছে।
মিরান নিচু গলায় বলল

“যেন সে মনে রাখে, অন্ধকার যতই গভীর হোক, ভেতরে আলো থাকতেই পারে।”
মিরান বেশিক্ষণ আর থাকলো না। জান্নাতকে একবার শেষবারের মতো তাকিয়ে দেখে সে ধীরে মাথা নত করল।
“সম্রাজ্ঞী, আমি যাই।”
মেহেরুন্নেসা শুধু মাথা নাড়লো। বাইরে আজও প্রজাদের খাবার বিতরণ চলছে। কিছুক্ষণ পরই দরজায় পায়ের শব্দ শোনা গেল। বাইজিদ ঢুকলো। ক্লান্ত কিন্তু শান্ত মুখ। বাইরে সারাদিন দাঁড়িয়ে থেকে প্রজাদের খাবার দেখাশোনা করেছে। কাপড়েও ধুলো-ময়লা। চোখে সন্তুষ্টি।
মেহেরুন্নেসার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলো।
“আজ কেউ খালি হাতে ফেরেনি। আমাকেও ফেরাবেন না মহারাণী”
মেহেরুন্নেসা মুচকি হেসে ধমক দিল
“চুপ করুন অসভ্য লোল। যান আগে হাতমুখ ধুয়ে আসুন”
বাইজিদ হাত মুখ ধুয়ে এসে মেহেরুন্নেসার পাশে বসে জান্নাতকে কোলে নিতে গেল।
“এখন আমার পালা আমার মেয়েকে একটু আদর করার।”
সে আলতো করে শিশুটাকে কোলে তুললো। সঙ্গে সঙ্গে তার ভ্রু কুঁচকে গেল। জান্নাতের ছোট্ট মুঠো শক্ত করে কিছু একটা ধরে আছে। বাইজিদ একটু ঝুঁকে দেখে নিল। একটা নীলচে চকচকে লকেট। আলো পড়তেই ভেতর থেকে হালকা নীল ঝিলিক উঠছে। সে অবাক হয়ে বলল

“এটা কী?”
তার চোখ মেহেরুন্নেসার দিকে উঠলো।
“এটা কোথায় পেল?”
মেহেরুন্নেসা শান্ত গলায় বলল
“মিরান দিয়েছে।”
বাইজিদের চোখ একটু সরু হলো।
“মিরান?”
তার কণ্ঠে জড়তা। মেহেরুন্নেসা মাথা নেড়ে বলল
“হ্যাঁ। ও এসেছে আজ। খুব বেশি সময় ছিল না।”
বাইজিদ লকেটটা হাতে নিয়ে একবার ঘুরিয়ে দেখল। নীল আলোটা তার আঙুলে পড়ে হালকা ঝিলিক দিচ্ছে। জান্নাত তখনও নির্ভাবনায় আঙুল নাড়াচ্ছে। বাইজিদ ধীরে মেয়ের কপালে চুমু খেল।
তারপর নিচু গলায় বলল

নূর এ সাহাবাদ পর্ব ৫০

“এই মিরানেরও কোনো গোপন পরিচয় আছে মেহের।”
মেহেরুন্নেসা কপাল কুচকে বলল
“মানে?”
বাইজিদ লকেট টা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখে বলল
“এটা আমার মায়ের লকেট। ছোট আম্মার পিতা এটা আরব দেশ থেকে এনে দিয়েছিল তাদের দুই জা কে। এই লকেট মিরানের কাছে কোথ থেকে এলো?”

নূর এ সাহাবাদ পর্ব ৫২