নূর এ সাহাবাদ শেষ পর্ব
জান্নাতুল ফেরদৌ
আবিদ আর মিরানের মৃত্যুর দুদিন হয়ে গেছে। রাজ্য এখন সম্পূর্ণ শান্ত। প্রজাদের ভয়ভীতি কমেছে অনেকাংশে। জান্নাত আর সাহারা সবসময় শাখার সাথে সাথে থাকে। বাবা-মা হারিয়ে মেয়েটা শোকে পাথর হয়ে গেছে। তার এখনও বুঝ হয়নি বিধায় মায়ের জন্য খারাপ লাগছে। বুঝ হলে হয়তো ঘৃনা করতো মা কে। মেহেরুন্নেসা খাবার নিয়ে এলো। সাথে নিয়ে এলো অনেক গুলি নতুন পোষাক। জান্নাত সাহারা কে খাইয়ে দিলো আর মেহের শাখা কে। শাখা খাবার মুখে নিয়েই বলল
“বড় আম্মি, আপা আর সাহারা দুজনের গলায়ই এক রকম হার আছে। আমার কেন নেই?”
মেহের তাকালো মেয়েদের দিকে। দুজনেরই জন্মের পর মিরান তাদের একই রকম দেখতে দুইটা নীলচে হীরের লকেট দিয়েছে। মুচকি হেসে শাখা কে বলল
“তোমার চাই ওমন?”
শাখা ওপর নিচ মাথা নাড়ে। মেহের হেসে বলল
“ঠিক আছে মা। আনিয়ে দিব”
ওদের খাইয়ে মেহের চলে গেল। দুই মেয়েকে এত দামী উপহার দেওয়ার বিষয়টা বোধগম্য হয় না মেহেরুন্নেসার। মিরান এত দামী হীরা কোথায় পেল? আবার বাইজিদ বলল এমন লকেট তার মায়েরও ছিল। নানা ভাবনা নিয়ে বাইজিদ এর কাছে গেল সে। বাইজিদ বারান্দায় দাঁড়িয়ে দূরের জঙ্গল দেখছে। মেহেরুন্নেসা এসে পাশে দাঁড়ালো।
“একটা কথা বলব শাহজাদা”
বাইজিদ পিছনে ঘুরে বলল।
“এখনও শাহজাদা? জমিদার বলো জমিদার। সারা জীবন কি শাহজাদা বানিয়েই রাখবে নাকি?”
মেহেরুন্নেসা চিন্তিত হয়েও ফিক করে হেসে ফেলল।
“আচ্ছা ঠিক আছে। জমিদার মশাই আপনাকে একটা কথা বলার ছিলো”
“বলুন বেগম”
“মেয়েদের গলার লকেট গুলো যে মিরান দিল, মনে আছে আপনার?”
“অবশ্যই আছে। অতটাও বুড়ো হয়ে যাইনি যে মনে থাকবে না”
“আমি রসিকতা করছি না মোটেও। আচ্ছা মিরান ওগুলো কোথায় পেল? না মানে অত দামী নীল হীরা তো এত সহজে পাওয়ার কথা না। তারপর আপনি বললেন সেগুলো আপনার মায়ের কাছেও ছিলো। আমার মাথায় কিছু ধরছে না কিন্তু”
বাইজিদ মেহেরকে নিজের সাথে মিশিয়ে নিলো। কপালের ঘামটুকু মুছে দিয়ে বলল
“ওগুলো আমার মায়ের ই। আমার দুই মা এখন পরছে।”
মেহেরুন্নেসা অবাক হয় ভীষণ
“মানে?”
“অঙ্কুর যখন মা কে বন্দি করে রেখেছিলো, তখন মিরান যেত মাঝেমধ্যে মায়ের কাছে। মা দিয়েছিলো ওকে আমার সন্তানদের দেওয়ার জন্য।”
মেহেরুন্নেসার চোখ জোড়া পুলকিত হয়।
“মিরান এত নির্লোভ ছিল? অথচ ওর জীবন কাটলো কারাগারে। ও চাইলেই ওগুলে বহু মূল্যে বিক্রি করতে পারতো। রাজ্য ছেড়ে চলে গিয়ে দূরে ঘর বড়ি জমি-জমা সব করতে পারতো”
বাইজিদ ফিচলে হাসলো
“ওকে আটকে রাখার সাধ্যি কারও ছিল না মেহের। অঙ্কুরের মত লোক কেও ও ফাঁকি দিয়ে উত্তরের প্রাসাদ থেকে এটা ওটা সরিয়েছে, বন্দি দের সাথে দেখা করেছে। এত নিরাপত্তা থাকা সত্ত্বেও বারবার কারাগার থেকে বেড়িয়ে গেছে দেখো নি? আবার ফিরেও এসেছে। মূলত ও নিজের ইচ্ছেতে থেকেছে এখানে।”
মেহেরুন্নেসা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো। হুট করে তার মনে জাগলো আরেক ভাবনা
“আচ্ছা চন্দ্রার বোন কোথায়? ওই যে রুবায়েত? সেও কি তার পরিবারের সাথে জাহাজে……”
“নাহহ, সুনেরাহ ওকে কবেই মেরে দিয়েছে। ওর হাড়গোড় গুলোই আছে বোধহয় এখন অবশিষ্ট। আর জাহাজে যারা আগুনে পুড়েছে, জীবিত তিনজন ই ছিল। বাকি রা আগে থেকেই মৃত। দুজন নাবিক আর সেই অরণ্যের মত দেখতে ও। শালা বেইমানি না করলে আরও কিছুদিন বেঁচে যেত। ওকে আমি এনেছিলাম নগর থেকে। কিন্তু ও এসে হাত মেলালো আমার পিতা বাকের শাহ্ এর সাথে।”
মেহেরুন্নেসা উদগ্রীব হয়ে বলে
“আচ্ছা আব্বার সাথে ওর কি ছিল?”
“বাকের শাহ ছিল একজন নিখুঁত মুখোশধারী। তার মুখোশ এতগুলো বছর ধরতে পারিনি। এই নোংরা খেলায় সামিল ছিল সে নিজেওন। তাই তো কতবার অঙ্কুরকে হটানোর পরিকল্পনা করেছি, বাধা হয়ে দাড়িয়েছে সে। আমরা নাকি ওদের সাথে পারবো না। কখনোও চেষ্টাই করেনি। আমারই বুকে বসে পাথর ভাঙছে অথচ আমি কিছুই করতে পারবো না এই বিষয়টা ভেবে দেখেছো একবার? এক রাজা নিজের রাজ্য ছেড়ে পাশের রাজ্যে গেলেই সে দুর্বল। আর ও আমার ই রাজ্যে বিজ্ঞানের ভুল প্রয়োগ করে মানব সমাজ কে ধ্বংসের পায়তারা করবে, অথচ আমি নাকি রুখতে পারবো না। এত বছর পরে এসে না বুঝলাম। আসলে সর্ষের মধ্যেই ভূত ছিল।”
“আব্বা যদি এমনই হতো। তাহলে আমাকে সম্রাজ্ঞী কেন বানিয়েছিল?”
“ওই যে বললাম না অরণ্যের মত দেখতে ও হাত মিলিয়েছিল আব্বার সাথে। ও আব্বার কুকীর্তির নথি জোগাড় করে। অঙ্কুরের সাথে যে চুক্তি হয়েছিলো তারও নথি জোগাড় করে। সেগুলো আমিরাবাদ এর সম্রাট কে দেখানোর হুমকি দিয়ে আব্বার থেকে বাগানবাড়ি দাবি করে। কিন্তু সেই পরিত্যক্ত বাগান বাড়িও অঙ্কুরের জিম্মায়। ওষুধ তৈরির সকল উপাদান রাখার গুদাম ঘর হিসেবে ব্যবহৃত হতো। ওটা দেওয়ার উপায় ই নেই। সেসময় তোমাকে ক্ষমতায় বসায় চক্রান্ত করে। কারণ ওখানে রাজ্যের শাসনকর্তা কৃত চুক্তি। রাজ্যের সিলমোহর দেওয়া। আমিরাবাদ থেকে আক্রমণ নিলে উনি নির্দ্বিধায় তা তোমার ঘাড়ে চাপিয়ে দিতে পারতো। এটাই ছিল মূল কারণ। পরিস্থিতি বুঝে আমি সেই ছদ্মবেশির কাছ থেকে নথিপত্র নিজের কব্জায় করে নিই। যখন শোনে বিপদের আশঙ্কা শেষ, তখন ক্ষমতা হস্তান্তর করে নেয়”
মেহেরুন্নেসার গা গুলিয়ে ওঠে একেক জনের ন্যায়ের মুখোশের আড়ালে থাকা নোংরা চেহারার বর্ণনা শুনে। বাইজিদ আগলে নেয় বুকে
“চিন্তা করো না দেওয়ানী আমার। সেসব অতীত, আমরা রক্ত ঝড়িয়ে প্রিয়জনদের হারিয়ে এই অতীত জয় করেছি। এ সকল ষড়যন্ত্রের নোংরা ছোয়া আমাদের গা থেকে ধুয়েমুছে যাক। বাকি জীবন টুকু সন্তানদের নিয়ে ভালোভাবে কাটাবো।
বাগানবাড়িটার পিছনের অংশে খুব একটা কেউ আসে না। সামনের দিকটায় ফুলের বাগান, ফলের গাছ, পাথরের পথ সবকিছু এখনও যত্নে রাখা হয়। কিন্তু পিছনের অংশটা যেন সময়ের কাছে হার মেনে বসে আছে। পুরনো কৃষ্ণচূড়া গাছ ভাঙা পাথরের বেদি, লতাপাতায় ঢেকে যাওয়া দেয়াল। তার ঠিক ওপারে ঘন জঙ্গল। সুনেহেরা সেই ভাঙা পাথরের বেদির ওপর চুপচাপ বসে আছে। সন্ধ্যা নেমে এসেছে। কৃষ্ণচূড়ার ডালপালা দুলছে বাতাসে। মাঝে মাঝে শুকনো ফুল ঝরে পড়ছে তার পাশে।
এখানেই প্রথম দেখা হয়েছিল তাদের। এত বছর পরও জায়গাটা একটুও বদলায়নি। শুধু বদলে গেছে মানুষগুলো। সুনেহেরা চোখ বন্ধ করলো। মুহূর্তের মধ্যেই বহু বছরের পুরনো সেই দিনটা জীবন্ত হয়ে উঠলো তার সামনে। সেদিন ছিল কাকডাকা শীতের ভোর। উত্তরের জঙ্গল থেকে ফিরলো সুনেহেরা। মুখ ওড়নায় ঢাকা ছিল।
চোখ ছাড়া কিছুই দেখা যাচ্ছিল না। হঠাৎ ঝোপের আড়াল থেকে একটা ছায়ামূর্তি বেরিয়ে। এক মুহূর্তও দেরি না করে তলোয়ার বের করে সরাসরি আক্রমণ করলো সুনেহেরা ওপর
“কে ওখানে?”
গম্ভীর সেই কণ্ঠস্বর এখনও কানে বাজে সুনেহেরার। সে নিজেও ভয় পেয়ে গিয়েছিল। তবে ভয় পেলেও পালায়নি। কোমর থেকে তলোয়ার বের করে আক্রমণ করল সে ও। হয়েছিল দুইপক্ষিক যুদ্ধ। তলোয়ারে তলোয়ারে আগুনের ফুলকি ছিটকে উঠেছিল। মাহাদি তখন ভেবেছিল সে শত্রুপক্ষের কেউ। আর সুনেহেরা ভেবেছিল একজন উন্মাদ লোক তাকে হত্যা করতে এসেছে।
দুজনের কেউ কাউকে চিনতো না। মাহাদির আঘাত ছিল ভয়ংকর। একটার পর একটা আক্রমণ। একটুও থামছিল না। আর সুনেহেরা তখন প্রাণপণে প্রতিরোধ করছে। শেষ পর্যন্ত সুযোগ বুঝে দূরে সরে গিয়েছিল সে। তারপর পিঠের তূণীর থেকে একটা তীর বের করে ছুড়ে মারল মাহাদি কে।
আজও তার মনে আছে সেই মুহূর্তটা। আত্মরক্ষার তাড়নায় সে তীর ছুঁড়েছিল। তীরটা সোজা গিয়ে বিদ্ধ হয়েছিল মাহাদির বুকে। মাহাদি টলতে টলতে পিছিয়ে গেল। সুনেহেরা আর এক মুহূর্তও দাঁড়ায়নি। পালিয়ে গিয়েছিল সেখান থেকে। চোখ খুলতেই সুনেহেরার বুকটা মোচড় দিয়ে উঠলো।
তারপরের ঘটনাগুলোও স্পষ্ট মনে আছে।
কয়েকদিন পর জানতে পারে যাকে সে আহত করেছে, সে কোনো শত্রু নয় সে সাহাবাদের সেনাপ্রধান মাহাদি। যুদ্ধক্ষেত্রের ভয়ংকর যোদ্ধা।
সাহাবাদের সবচেয়ে দক্ষ সেনানায়ক। তীরের আঘাতে মানুষটাকে প্রায় এক মাস শয্যাশায়ী থাকতে হয়েছিল। সেদিন খবরটা শুনে কী ভয়ই না পেয়েছিল সে! মনে হয়েছিল বাইজিদ জানতে পারলে তার মাথা কেটে ফেলবে।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় কেউ কিছু বলেনি।
তারপর থেকেই লুকিয়ে লুকিয়ে দেখতে যেত মাহাদিকে। প্রথমে অপরাধবোধ থেকে। মানুষটা বেঁচে আছে কি না দেখতে। ক্ষতটা শুকাচ্ছে কি না দেখতে। কিন্তু ধীরে ধীরে সেই দেখাটাই অভ্যাস হয়ে গিয়েছিল। দূর থেকে দেখতো। মাহাদি সৈন্যদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। মাহাদি ঘোড়ায় চড়ছে।
মাহাদি আহত শরীর নিয়েও যুদ্ধের মানচিত্র আঁকছে। নিজের অজান্তেই একদিন বুঝতে পেরেছিল সে মানুষটার প্রেমে পড়ে গেছে খুব গভীরভাবে। সুনেহেরার চোখ বেয়ে একটা অশ্রুবিন্দু গড়িয়ে পড়লো। কৃষ্ণচূড়ার একটা লাল ফুল এসে পড়লো তার কোলের ওপর। সে ফুলটা হাতে তুলে নিল। ঠিক এমনই একদিন এই জায়গাতেই প্রথম তলোয়ার তুলেছিল তারা একে অপরের বিরুদ্ধে।
বুকের ভেতর সেই দগদগে ব্যথা সময় যত যাচ্ছে, ততই যেন আরও গভীর হয়ে উঠছে। আর বসে থাকতে ভালো লাগছে না।বচারপাশের সবকিছু যেন স্মৃতি হয়ে তাকে কষ্ট দিচ্ছে।বসন্ধ্যা গড়িয়ে রাত নেমে এসেছে। আকাশে অল্প কিছু তারা জ্বলছে। দূরে নদীর শব্দ ভেসে আসছে।
সুনেহেরা ধীরে ধীরে হাঁটতে শুরু করলো। কোনো গন্তব্য নেই কোনো উদ্দেশ্য নেই। শুধু হাঁটছে। কৃষ্ণচূড়া গাছটা পেছনে পড়ে গেল। পুরোনো বাগান পেরিয়ে গেল। শুকনো পাতার ওপর তার পদচারণার শব্দ হচ্ছে। একসময় সে পৌঁছে গেল নদীর পাড়ে। এই নদীটাকেও সে ঘৃণা করতে পারে না। কারণ এই নদীর সাথেও জড়িয়ে আছে মাহাদি। নদীর ধারে একটা পাথরের ওপর বসে পড়লো সুনেহেরা। তার চোখের সামনে ভেসে উঠতে লাগলো একটার পর একটা দৃশ্য।
সেদিনের কথা, মাহাদি তাকে প্রথমবার ঘোড়ায় চড়তে শিখিয়েছিল। সে ইচ্ছে করে ঘোড়া সামলাতে পারছিল না। মাহাদি বুঝেও কিছু বলেনি। পেছন থেকে লাগাম ধরে বলেছিল,
“শাহজাদী, এভাবে চললে যুদ্ধ নয়, গরুর গাড়িও চালাতে পারবেন না।”
অথচ সুনেহেরা ছিল একজন দক্ষ যোদ্ধা এবং ঘোড়া চালনায় পটু। কেবল মাহাদির সঙ্গ পাওয়ার আশায় সে অবুঝ সাজতো।
আরেকদিন শীতের তুষার পাতের মধ্যে দুজন আটকা পড়েছিল পাহাড়ি পথে। মাহাদি নিজের চাদরটা খুলে তার মাথার ওপর ধরেছিল।
নিজে ভিজেছিল। তাকে ভিজতে দেয়নি। সেদিন সুনেহেরা অনেক বকেছিল। কিন্তু মাহাদি শুধু মুচকি হেসেঋে বিনিময়ে। আরও কত স্মৃতি।
কত অভিমান কত না বলা কথা। বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠলো। সত্যিই কি মাহাদি আর ফিরবে না? তাহলে কেন সেদিন সেই ফুলটা দিয়েছিল? সব ঠিক হয়ে যাবে? আসলে কি আদৌ সব ঠিক হয়? সুনেহেরা উত্তর খুঁজে পায় না। তার মনে হয় মাহাদি ইচ্ছে করেই হারিয়ে গেছে। কিন্তু কেন? কী এমন অভিমান ছিল মানুষটার? কী এমন কষ্ট ছিল? সে কিছুই বুঝতে পারে না। চোখের পানি এবার আর আটকে রাখা গেল না। ধীরে ধীরে নদীর কিনারায় নেমে গেল সে। হাঁটু গেড়ে বসলো। দুই হাত পানিতে ডুবিয়ে রাখলো। শীতল পানি শরীর কাঁপিয়ে দিল।
তারপর মাথা নিচু করে মুখ ডুবিয়ে দিল নদীর পানিতে। পানির নিচে দুনিয়াবী কোনো শব্দ যায় না। বেশ শান্তি অনুভব করলো। ইচ্ছে করছে পানির নিচেই চেঁচিয়ে বলতে ‘ইয়া রব! হয় ধৈর্য দাও না হয় মাহাদি কে ফিরিয়ে দাও।’
তারপর আবার মাথা তুললো। চোখ-মুখ ভিজে গেছে। ভেজা পানি আর চোখের পানি আলাদা করা যাচ্ছে না। তার বুকের ভেতরটা ফেটে যেতে চাইছে। চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছে করছে।
চিৎকার করে আকাশকে জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করছে কোথায় সে? কোথায় গেল মাহাদি?
নদীর কালো পানির দিকে তাকিয়ে সুনেহেরা কাঁপা কাঁপা গলায় ফিসফিস করে বললো,
“হে আল্লাহ! যদি সে বেঁচে থাকেতাহলে তাকে ফিরিয়ে দিন। আর যদি আমার কপালে তার অপেক্ষাই লেখা থাকে, তবে আমাকে ধৈর্য দিন। আমি আর পারছি না।”
রাতের বাতাস এসে তার চুল উড়িয়ে দিল। নদীর ঢেউ তীরে এসে ভাঙলো। সুনেহেরা পানির দিকে ঝুকে অঝোরে কাঁদছে। আজ সব কান্না এখানেই বিসর্জন দেবে, যাতে বাকি জীবন টুকু সবার সামনে শক্ত খোলসে আবেগ ঢেকে রেখে চলতে পারে। কাঁদতে কাঁদতে ঝাপসা হয়ে যাওয়া চোখ জোড়া দিয়ে সামনে তাকাতেই দেখতে পায় তার সুপরিচিত কামনাকৃত সেই অবয়ব। লোহার বর্ম পরিহিত হৃষ্টপুষ্ট পুরুষটা তলোয়ার হাতে এগিয় আসছে এদিকেই। চোখ মুখ ভালো করে মুছে তাকায় সেদিকে। নাহহ সে ভুল দেখছে না। এদিকেই আসছে। দ্রুত উঠে ভেজা ঘাগড়া দুই হাতে উচু করে ছুটে যায় সেদিকে। তার বুকে আছড়ে পড়ার প্রয়াস। কিন্তু যতই কাছে যাচ্ছে অবয়বটা আবছা হচ্ছে। আস্তে আস্তে কুয়াশার সাথে মিলিয়ে গেছে যেন। একি! কোথায় গেল তার পাথর মানব। চারিদিকে খুঁজে। পাগলের মত ঘুরতে থাকে। নিজের মাথার চুল খামচে ধরে। বাচ্চাদের মত কাঁদতে কাঁদতে লুটিয়ে পড়ে নদীর পাড়ের বালু তে। এ যে কেবল ই তার চোখের ভুল। আসেনি মাহাদি। সে তো আর ফিরবে না। ভালোবাসার বায়না করে নিজেই ভাসিয়ে দিয়ে গেল।
কথা ছিল সে নদীর পাড়ে অপেক্ষা করবে। মাহাদি বুনো গোলাপ নিয়ে নৌকা চড়ে আসবে। সে স্বপ্ন কি কেবল স্বপ্নই রয়ে গেল? মাহাদির সাথে কাটানো মূহূর্ত গুলো কি আজ কেবল ই স্মৃতি? সুনেহেরা পানির দিকে মাথা দিয়ে টান টান হয়ে শুয়ে পড়লো। ঢেউ এসে এসে তার মাথা ভিজিয়ে দিয়ে যাচ্ছে। এ কি রকম পাগলামি? গলা ছেড়ে গেয়ে উঠলো
“পিরিতি করে যারা সুখের আশে
সুখের বদলে দুখ সাগরে ভাসে!
ওরে মনটা তোমার নিবে তোমায় দিবে না দিবে না গো
পিরিতে শান্তি মিলে না।
জগতের পিরিত ভালা না ভালা না গো
পিরিতে শান্তি মেলে না”
রাজ্যের শেষ দিকে ফুলতলি গ্রাম। ছোটখাটো একটা হাট বসে। চন্দ্রা ছেড়া পোষাকে এলোমেলো জরজীর্ন ময়লা চুলে সেখানে হাটছে আনমনে। মাথা চুলকাচ্ছে আর এদিক ওদিক দেখছে। এক পায়ে এক টা পুরনো চটি। অন্য পায়ে নেই। হাঁটতে হাঁটতে এর ওর কাছে হাত পেতে পেতে খাবার চায়। সবাই ফিরিয়ে দেয় তাকে। কিছু লোক চিনতে পেরে করুনা করে। ইতিমধ্যেই রাজ্যে ছড়িয়ে পড়েছে চন্দ্রার বিষয়টা। তাই সে সবার কাছে ঘৃণা এবং করুণার পাত্রী। এর ওর কাছে হাত পেতেও কিচ্ছু পায় না। ক্ষুধায় কাঁদতে থাকে। মানুষ শুধু তামাশা দেখে। কেউ তাকে এক মুঠো খাবার দেয় না। পাপ যে বাপ কেও ছাড়ে না তার জলজ্যান্ত উদাহরণ হয়ে চন্দ্রা ঘুরতে থাকে সাহাবাদ এ। ঘুরতে ঘুরতে একদিন যায় আবিদের বাড়িতে। কেমন জানি বিকৃত মস্তিষ্ক খানাও কিছুর ইঙ্গিত দেয়। পুরনো বাড়িটার যত্ন করা হয় না বহুদিন।
রঙ্গন ফুল গাছটা ফুল পাতায় ভরে গেছে। আবিদ থাকলে ছেঁটে ছুটে রাখতো। কোচ ভর্তি করে ফুল ছিড়লো চন্দ্রা। মাচাল চার ওপর বসে সেগুলো ছিটাতে লাগলো। আশেপাশের মানুষ দেখছে তার পাগলামি। ভয়ে কেউ কাছে যায় না যদি কামড়ে দেয়, তাড়া করে। ফুল টুল ছুড়ে ফেলে ফের পাগলী হাঁটতে লাগলো অজানা গন্তব্যে। চলে আসে জমিদার দের পারিবারিক কবরস্থানে। প্রহরী বাধা দেয় না তাকে। বাইজিদ ই অনুমতি দিয়েছে। আবিদের কবরের ওপর টানটান হয়ে শুয়ে থাকে। হাসে আবার মনে চাইলে জোরে জোরে কান্না করে। খানিকক্ষণ পরে আবার ফিরে যায়। এভাবেই চলছে তার যাযাবর জীবন।
সকালের নাস্তা শেষ হয়েছে। এক্ষুণি গৃহ শিক্ষক এসে যাবে মেয়েদের পড়াতে। মেয়েদের তৈরি করে পাঠাগারে পাঠিয়ে দিয়ে নিজের কক্ষে আসলো মেহেরুন্নেসা। গোসল সেরে বেরোতেই দেখলো পালঙ্কের ওপর লাল টুকটুকে একখানা ঘাগড়া রাখা। সুক্ষ্ম পুতি তে চিকচিক করছে। পাশেই রাখা এক খানা চিঠি
“তুমি বড়ই পাষাণী প্রিয়তমা। প্রেমিকের মন বোঝো না। তোমাকে আত্মহত্যার ভয় দেখালাম, তুমি আমায় না আটকিয়ে নিজের হৃদয়ে ফাঁসির মঞ্চ সাজালে। ভুলে গেছো কি? আজ আমাদের নবম বিবাহবার্ষিকী। এভাবেই বছর বছর ফিরে আসুক এই দিন। গোটা বছর যে সঙ্গ দিয়েছি তা আজকের দিনে অন্তত মনে পড়বে কি বলো।
আমার বা পাঁজরের অর্ধাঙ্গিনী। তোমার তরে সব সমর্পণ করে দিলাম। চিঠিখানা অপ্রিয় হলেও মারাত্মক সত্য। নিজের সর্বনাশ কে ভালোবাসার সুখকর অনুভূতি ভেবে নিজের অজান্তেই ভালোবেসেছি নিজের সর্বোচ্চ সুখকে। অতঃপর আমাকে দিয়েছো তিনটি পাখির বাচ্চা, আর গুছিয়ে নিয়েছো আমি টাকে।
তুমি অস্ত্রের ন্যায় ধারালো এক ফালি চাঁদ
পূর্ণ বিদ্রোহে রক্তঞ্জয়ী তুমি, নূর-এ-সাহাবাদ”
ফিক করে হেসে উঠলো মেহেরুন্নেসা। লোকটা আসলেই পাগল। তার কি আর এসব পরার বয়স আছে? তক্ষুনি চোখ পড়লো আয়নায়। বাইজিদ একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে তার দিকে। মেহেরুন্নেসা লজ্জায় পড়ে গেল। বাইজিদ এগিয়ে আসে
“আমার বেগম এত লজ্জা পাচ্ছে কেন? আোখ নামিয়ে রাখলে বুঝি তাকে ভালো দেখায়? তার তেজী নয়ন জোড়া যে জমিদার কে বড্ড টানে তা সে জানে না? কিসের ভয়ে তার চোখ নত?”
মেহেরুন্নেসা বাইজিদ এর চোখে চোখ রাখে।
নূর এ সাহাবাদ পর্ব ৬৮
“আমি মোটেও আপনার ভয়ে চোখ নামাই নি হুহহ”
“ভয় পাও না আমায়?”
মেহেরুন্নেসা বাইজিদ এর গা ঘেষে পাঞ্জাবির বোতাম আটকে দিতে দিতে বলল
“ভালোবাসা দিয়ে পায়ের কাছে বসিয়ে রাখতে পারবেন, ভয় দেখিয়ে চোখ ও নামাতে পারবেন না”
“যথা আজ্ঞা সম্রাজ্ঞী”
দুজনেই হেসে উঠলো সমস্বরে। যে কেউ দেখলেই হয়তো এখন বলতো
“তাদের সুখে কারও নজর না লাগুক”
সমাপ্ত
