পৌষপার্বণ পর্ব ২০
Irfa Mahnaj
আজ বারোমাসি নীড়ে নতুন অথিতির আগমন ঘটেছে। বৈশাখদের এক পেঁচানো ফুফু হন।
মজার ব্যাপার হলো যেহেতু এদের ফ্যামিলির সবার কাজিন বিয়ে তাই যারা পৌষ, পার্বণ, ভাদ্র, চৈত্র, বসন্ত, হেমন্তের দাদু তারাই আবার তাঁদের নানু।
ওই যে বাবা এবং মায়ের দুজনের দিকেরই তো আত্মীয়টি এক। পৌষ তো তাই কদবেল আলী ও পেয়ারা বানুকে দানা ও দানি বলে ডাকে।
দাদা থেকে দা আর নানা থেকে না নিয়ে দানা। আবার দাদি থেকে দা আর নানি থেকে নি নিয়ে দানি।
পৌষের নাম বানানের বহর দেখে পার্বণ তো সেই হাসে। সাথে ওকে পঁচানো তো আছেই। মশকরা করে আবার এও বলে,
— দুই দিনের বৈরাগি ভাতেরে বলে অন্ন সে আবার দিয়েছে এইসব ছাতার মাথার নাম ভিন্ন!
[আজগুবি ছড়া ফ্রম ইরফা🙂]
কদবেল আলী ও পেয়ারা বানু এসেছেন মূলত ডাক্তার দেখাতে। ওনারা গ্রামে থাকেন। তাঁদের কোনো সন্তান নেই।
বৈশাখরাও এই বৃদ্ধ দুজনকে নিজের আপন ফুফুর মতোই দেখেন। তাই তো যতবার ডাক্তার দেখানোর হয় ততবার ওনারা বৈশাখদের বাড়িতেই উঠে।
তবে এইবার এসে যে এতো বড় একটা খুশির খবর পাবেন কদবেল আলী ও পেয়ারা বানু দুজনের কেউই ভাবতে পারেননি।
তাঁদের নাতি নাতনি না থাকলেও পৌষদের নিজেদের নাতি নাতনি বলেই মনে করে। ওদের ভীষণ ভালোবাসেন। পৌষরাও তাকে অনেক সম্মান করেন।
সবসময় ওদের আসায় পৌষ খুশি হলেও এবার হতে পারছে না। প্রত্যেকবার ওনারা এলে ও লাফিয়ে লাফিয়ে চলে যেত।
তবে আজ পারছে না। উল্টো সেই কখন পেয়ারা বানু তাকে ডেকেছে কিন্তু সে ঘাপটি মেরে বসে আছে নিজের ঘরে।
পার্বণের নয় নিজের ঘরেই বসে আছে সে। পার্বণের রুমে থাকতে পারছে না। ওর পারফিউমের গন্ধ ওর নিকট বাজে ঠেকছে।
সে যাইহোক এখন চিন্তা হচ্ছে অন্য। পেয়ারা বানু গ্রামে থাকেন। তার মনভাব ও সেরকমই হবে।
এমনিতেই পেয়ারা বানু কথা বেশি বলে। সবসময় তো একাই থাকেন। কথা বলার মানুষ পেলে সব উগড়ে দেন আরকি।
এইবার তো আরো বলবেন। তার কাছে যাওয়া মানে ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি। ছাড়তেই চান না।
এবারে পৌষকে ডেকেছেন ওর মাতৃত্ব কালীন সময়ে কি কি করবে তার জ্ঞান দিতে। বেশ বুঝে গেছে আজকের টপিক থেকে যে পৌষ সহজে ছাড়া পাবে না।
তাই তো একপ্রকার বাহানা বানানোর চেষ্টায় আছে। কিছুতেই সে যাবে না। নয়তো রাত কাবার হয়ে যাবে তবুও পৌষ ছাড়া পাবে না।
বসন্ত খুঁড়িয়ে হাটছে আর ওকে ধরে ধরে নিয়ে যাচ্ছে হেমন্ত। হেমন্ত কোচিং শেষে বাসায় ফিরছিলো তখন দেখে তার বিপদের বন্ধু ভাই রাস্তায় পড়ে কাতরাচ্ছে।
এই বিপদের বন্ধু সেই বিপদের বন্ধু না যে বিপদে পড়লে হেল্প করে বরং এটা হলো ও নিজেই বিপদ গলায় ঝুলিয়ে হাটে।
— শা*লা রাম পাঠা শশুর একটা!কিভাবে আছাড় টা মারলো!উই মা!আমার কোমর শেষ।
— তো তোকে কে বলেছিলো ওনার কোলে উঠতে?
— কু*ত্তার দৌড়ানি খেয়েছিস তু্ই? খেলে বুঝতি। তাছাড়া ওই পাঠাকে কে বলেছিলো আমার সামনে আসতে?দরকার পড়লে গাছের গলায় ঝুলে পড়ে জীবন দিতাম।
— গাছের গলায় ঝুলে কেউ জীবন দেয় না।
— কেউ না দিলে আমি দিতাম। তোর কোনো সমস্যা? শালা তুইও দেখি ওই পাঠার দলের লোক। ভাই আমার কথা বলিস ওই পাঠার হয়ে!
হেমন্ত কিছু বলবে তার আগেই শুনতে পায় পরিচিত গলা। পাশে তাকিয়ে দেখতে পায় পার্বণকে। সাথে ভাদ্রও আছে।
পার্বণ বলে,
— নিজে এক পাঠা হয়ে তুই আবার কোন পাঠার কথা বলছিস শুনি?
— আমি তো ছোট পাঠা। আমি বলছি রামপাঠা হিমসাগরের কথা।
— তোর শশুর লাগে না সে?
ভাদ্রের কথা শুনে মাথা উপর নিচ করে হ্যা জানায় বসন্ত। পার্বণ জিজ্ঞেস করে,
— হেমন্ত কাহিনী কিরে?
তারপর হেমন্ত সব ঘটনা খুলে বলতেই রাস্তার মাঝেই হাসতে হাসতে দুই ভাইয়ের জান যায়। পার্বণ তো হাসতে হাসতে বসন্তের ব্যথা জায়গায় থাপ্পড় লাগায়।
ব্যাস বসন্ত বেচারা গগন কাঁপিয়ে চিৎকার জুড়ে দেয়।
— ওরে মা গো তোমার পোলা গেলো গোওওও!
পৌষের কোনো ষড়যন্ত্রই কাজ করেনি। ওর মা নামক জাত শত্রু মহিলাটি ওকে টেনে হিচড়ে, বগলদাবা করে নিয়ে গিয়েছে।
এই মহিলাকে মা কম পাশের বাড়ির খালা বেশি মনে হয়। এই যে পৌষ মা হচ্ছে। পৌষ ও এই মহিলাকে দেখিয়ে দিবে মা কিভাবে হতে হয়। হুঁহ!
এই যে পৌষ মা হবে । সবাই কত খেয়াল রাখছে।কিন্তু এই মাতারি ও গতকাল শুধু বলেছিলো খাবে না।বলে কিনা,
— মনে করিস না তু্ই অসুস্থ বলে তোকে আমি মারতে পারবো না। তু্ই মা হয়ে গেলেও আমি তোরে কেলাইতে পারবো।ঝাড়ুর বাড়ি একটাও মাটিতে পড়বো না তাড়াতাড়ি খা।
অগত্যা নাক সিটকে হলেও পৌষকে গিলতে হয়েছে।
ফ্ল্যাশব্যাক থেকে বেরিয়ে এলো পৌষ। কারণ এখন সে দাঁড়িয়ে আছে বিপদের দরজার সামনে।
— মা তুমি এটা করতে পারো না আমার সাথে।
বাংলা সিনেমাতে যেভাবে ইমোশনাল ডায়লগ গুলো বলে না ঠিক সেভাবেই নাটকীয় ভঙ্গিমায় পৌষ কথাটা বলে।
— আমি তোর মা সবই করতে পারি।
— নাআআআ!চৌধুরী সাহেবা আপনি এটা করতে পারেন না। আপনি বড়োলোক হতে পারেন ঠিকই কিন্তু আমিও এই অন্যায় মেনে নিবো না।
পৌষের ঘাড় ধরে রুমের ভিতর ঢুকিয়ে দিতে দিতে বলে,
— ফুটাঙ্কির পো। নাটক মারায় ওয়। যা ভিতরে। বাংলা সিনেমার বা*ল ছা*ল ডায়লগ দিতে আইছে ওয়।
তারপর আবার যাওয়ার আগে বর্ষা নিজের কল্লা দরজার ফাঁক দিয়ে ঢুকিয়ে পেয়ারা বানুর উদ্দেশ্যে বলে,
— ফুফু এই নাটকবাজরে ভালো মতন শিখাইয়া পড়াইয়া দিবেন।
বর্ষা শুধু নিজের মাথা টুকুই দরজার ফাঁক দিয়ে ভিতরে ঢুকিয়ে ছিলো। দেখতে কল্লা কাঁটা ভুতের মতো দেখাচ্ছিলো।
বেচারা বৃদ্ধা পেয়ারা বানু এইটা দেখে তো ভয়ে চিৎকার করেই উঠে,
— ওরে বাফুরে এই আবার কি ঢং!ওই ছেড়ি তোর মায় এমন ভাবে আছে কেন?
পৌষ পিছনে ফিরে নিজের মা বর্ষার দিকে একবার তাকিয়ে সামনে ঘুরে যায়। আউশি দিয়ে অলস ভঙ্গিতে বলে,
— চিল দানি। ভুতনি মহিলার কথা বলার স্টাইলই ওইটা।
ক্লাস চলছে পেয়ারা বানুর। পৌষের ভালো ভাবে ক্লাস নিচ্ছে সে। এই সময় পৌষ কি করবে, কোনটা, খাবে কোনটা খাবে না এইসব হেনটেন।
সেরকমই কোন খাবার খাবে না সেটাই বলছিলো। উদাহরণস্বরূপ জোড়া কলা রেখেছিলো।
পৌষ ভেবেছিলো এটা ওকে খেতে হবে কেনোনা কিছুক্ষন আগেই ছাগলের ঘাস দিয়ে বলেছিলো খেতে।
এই ঘাস আবার শিক্ষিত ঘাস। মানুষ নাকি খায়। তবে পৌষ তো আর এইসব মানুষ রুপী ছাগল না যে খাবে। ও তো পিওর মানুষ। হিউম্যান।
তাই সুন্দর করেই বলেছিলো বুড়িকে যে ও খায় না। কিন্তু বুড়ি করলো কি ওর মুখে জোর করে ভরে দিয়েছে।
তাই এবার আর রিস্ক না নিয়ে যেই জোড়া কলাটা খেয়েছে অমনি বুড়ি হায় হায় করে উঠলো।
এটা নাকি ওর খাওয়ার কথা ছিলো না। খেলে নাকি যমজ সন্তান হয়।তো ভাই সেটা পৌষ কেমনে জানবে!আজব!
কতবার যে কূটনামি করেছে পেয়ারা বানুর থেকে মুক্তি পেতে কিন্তু পেয়ারা বানু তো বানুই। বুড়ি ছাড়েই না।
শেষে এই এতক্ষন পর পরে পানি খাওয়ার নাম করে ছাড়া পেয়েছে। তাও দিতো না।
সাথে ব্যবহার করেছে মহাস্র ” বমি “। বাহ্ নিজের বুদ্ধি দেখে নিজেরই তারিফ করতে ইচ্ছে করছে।
করেও ফেলে ও সেটা। নিজেরই কাঁধ চাপড়ে নিজেকে বাহবা দিচ্ছিলো ও। তখনই সেখানে উপস্থিত হয় পার্বণ।
পৌষের মাথায় চাপড় মেরে জিজ্ঞেস করে,
— কিরে জংলী এই জায়গায় কি?
— উফ! আবে কন বে হালা।
পার্বণের হার্টবিট টা বোধহয় একটুর জন্য বিট করাই বন্ধ করে দিলো। ওইযে একটা ইমোজি আছে না? সেন্টি ইমোজি।
সেরকম দশা হয়েছে পার্বণের। ও বলে,
— তুই মহিলা আমারে অল্প বয়সেই উপরে উঠাইয়া দিতে চাস।
ঘুরলো পৌষ মাথা ডলে বলল,
— তো আমার পিছে কি চোখ আছে নাকি? আমি দেখবো কেমনে? তুইও তো বুড়ির মতো কথা বলতেছোস দেখি।
— কোন বুড়ি?
কষ্টে দুঃখে পৌষ মুখটা অসহায় করে ফেলে। ও গিয়ে পার্বণের কাঁধে হাত দেয়। সেটা দেখে পার্বণ ওর কাঁধ থেকে হাত সরিয়ে ভোঁতা মুখে বলে,
— জামাই লাগি ছেড়ি আমি তোর। এমন ভাবে ধরছোস মনে হয় আমি তোর বান্ধবী লাগি।
— বান্ধবী না হোক বন্ধু তো, ব্যাচমেট, ক্লাসমেট, সহপাঠী আরো যা আছে সবই তো তু্ই। এখন আমার কথা শুন
— বল।
তারপর পৌষ পার্বণকে সব খুলে বলে। বেচারা বোধহয় আজকে হাসতে হাসতেই যাবে। ও পেট চেপে হাসতে লাগলো।
ওর হাসি পৌষের কাঁটা গায়ে বুঝি নুনের ছিটা দিলো। তেতে উঠে বলল,
পৌষপার্বণ পর্ব ১৯
— আমাকে এখান থেকে উদ্ধার কর।
— পারবো না। পরে আমি নিজেই ফেঁসে যাবো।
হাসতে হাসতেই জবাব দিলো পার্বণ। পৌষ গলা আরেকটু জোরে করে বলে,
— পার্বণের বাচ্চাআআআ! আমাকে হেল্প করতে বলেছি।
পৌষের কথা গায়েই মাখলো না পার্বণ উল্টে হাওয়ায় উড়িয়ে দিলো এমন ভাব করে হেটে চলে গেলো।
যেতে যেতে পৌষের পেটের দিকে আঙ্গুল তাক করে এও বলতে ভুলে না,
— সে তোর পেটে। ওর কাছেই সাহায্য চা আমি গেলাম তাহলে।
