Home পৌষপার্বণ পৌষপার্বণ পর্ব ২১

পৌষপার্বণ পর্ব ২১

পৌষপার্বণ পর্ব ২১
Irfa Mahnaj

বিপদ আর বসন্ত দুটো যেনো একে অপরের জন্যই। এদের জন্মই হয়েছে একে অপরের জন্য। দুটো শব্দই ব দিয়ে শুরু।
আসলে ঘটনা হয়েছে কি? সকালে মনের আনন্দে গান করছিলো আর ব্রাশ করছিলো। তো ঠিকই ছিলো সব। সাথে ঝাঁকানাকা ঝাঁকি আলা নাচ ও দিচ্ছিলো সে।
মানে এতটাই রং লেগেছিলো ওর মনে। কিন্তু, কিন্তু, কিন্তু!বিপদ মহাশয় বি লাইক,

— হে হে বন্ধু আমার একলা। আমাকে ছাড়া ভালো নেই সে। বন্ধুউউউ আমি আসছি।
বলেই বসন্তের মতো ভোলাভালা ছেলেটার গলায় ঝুলে পড়ে।ব্রাশ করে ওয়াক থু থু শব্দ তুলে যেই না বেলকুনির গ্রিলের মধ্যে দিয়ে মাথা বের করে থু থু ফেলে।
অমনি সেটা হিমসাগরের চাঁদ বদনে পড়ে।খেয়াল না করে দ্বিতীয় বারের মতো থু থু ফেলতেই সেটা এবার টুপ করে গিয়ে হিমসাগরের শশুর ফজলির টাক মাথায় পড়ে।
বসন্ত যেমন তার না হওয়া শশুর হিমসাগর কে দেখলেই হাটু কাঁপাকাঁপি করে তেমনি হিমসাগর তার শশুর ফজলিকে যমের মতো ভয় পান।
ওনার সবচেয়ে প্রিয় হচ্ছে ওনার তেল চক চক করা টাক টা। আর সেখানেই কিনা কোন বাঁদর ওর আকাম করেছে!
বহু দিন পর শশুর ফজলি আমের আগমন ঘটে হিমসাগরের বাড়ি। শশুরের ইচ্ছায় সকালে হাঁটতে বের হয়েছেন তারা।
নিজের মাথার চিন্তা বাদ দিয়ে ফজলির টাক মাথার চিন্তায় হিমসাগর হিমের মতো জমে যাচ্ছেন। তোতলাতে তোতলাতে জিজ্ঞেস করলেন,

— আব্বা ও আব্বাগো। আমনের মাথা সাফ করে দিচ্ছি এক্ষুনি।
চোখ দুটোকে বড় বড় তালের আঁটির মতো করে তাকিয়ে ফজলি হুংকার দিলেন,
— বেয়াদব আমার সাফ করবে মানে?তোমার মাথাই আমি সাফ করে দিবো।
হিমসাগর বুঝতে পারলেন অসুর থুড়ি শশুর মহাদয় তার কথার উল্টো মানে বুঝতে পেরেছেন।
এই বয়সে এসেও শশুরের হাতে কেলানি খেতে হবে!ভাবতেই তো যায় যায় অবস্থা হিমসাগরের।
আব্বা, আব্বা করতে করতে উনি শশুরের পিছন পিছন যেতে নিলো। তবে তার পূর্বে এই মহৎ কাজটি যে করেছে তার দিকে তাকালো।
এতক্ষন হিমসাগর তার যমের সামনে কাঁপছিলো এখন বসন্ত তার যমের সামনে কাঁপছে।ওর হাঁটু থর থর করে কাঁপছে।
আর বসন্ত কেবলার মতো ভেটকাইতে ভেটকাইতে হাত নাড়াচ্ছে। হিমসাগর তো বেজায় চটে গেলেন। বললেন,

— ও হতচ্ছাড়া তুমি তাহলে? আজ তোরে পাই একবার।
ঢোক গিললো বসন্ত। হিমসাগর আবার বলে উঠলো,
— এতো মানুষ থাকতে তোর হুদা আমার পাছাই পছন্দ হয় বাঁশ দিতে!শশুর যদি আমারে পিটায় তোরে ওই বটগাছের ডালে উল্টা ঝুলাইয়া ডিম থেরাপি দিমু আমি।
এই বলে আবারো ভেজা বিড়ালের মতো আব্বা ডাকতে ডাকতে চলে গেলেন। এদিকে বসন্তর চোখের সামনে ভেসে উঠলো ওরে উল্টা ঝুলাইয়া রাখছে!
বিড়বিড় করে বলে উঠলো,
— আব্বাআআআ!বাঁশ আপনার পাছা না ওর আমার এই সুন্দর পাছা ডা পছন্দ খুব।

নিজের হাতে এক হাত সমান একটা বাঁশের টনি ধরে আছে পৌষ। পার্বণ আগালেই ওকে খোঁচা দিচ্ছে সেটা দিয়ে।
পার্বণ কাঁদো কাঁদো হয়ে বলে,
— সরি মেরি মা!আর হবে না। এ বউ।বউ?
— উহু কোনো তেলই কাজে আসবে না।তখন আমারে সাহায্য করিসনি তু্ই। এখন আসছিস আমার ধারে।
টনির মাথাটাকে তর্জনী দিয়ে একটু সরাতেই ওইটা ওর পেটে ঢুকিয়ে ক্ষিপ্ত বাঘিনীর মতো বলে,
— আমি যখন তোর কাছে হেল্প চাইছিলাম তখন কি করলি? আমাকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে চলে গেলি এখন আসছিস আমার কাছে না?
মানুষ বলে পুরুষ বাইরে যাইই থাক বউয়ের কাছে সে ভিজা বিড়াল। এর খপ্পর থেকে আজ বেচারা পার্বণ ও রেহাই পায়নি।
ওর আজীবনের শিক্ষা হয়ে গেছে বউকে সাহায্য না করার। এখন নাগিনীর মতো ফণা তুলে ফোঁসফাঁস করছে।
একটু ছুঁবে তো দূর ধারেও ঘেঁষতে দিচ্ছে না। বেচারা বডি পার্ট গুলো বলছে “আমরা জং ধরে যাবো। তোর শরীরে আর থাকবোই না।”
মন টা করছে আকুপাকু। ওর শুধু বউ চাই। কিন্তু বউ তার ছাওয়ালি মুরগির মতো হয়ে গেছে।
ছাওয়ালি মুরগি গুলো যেমন মা হয়ে গেলে ওর ছানার কাছে কেউ গেলেই খেপে যায়। ফুলে ফেঁপে ভোম্বল হয়ে ঠোকর মারতে নেয়।
সেরকমই পৌষের দশা।প্রেগন্যান্ট হয়েছে থেকে মেয়েটা মানুষ থেকে ঠোকর দেওয়া ছাওয়ালি মুরগি হয়ে গেছে!

— আমার ছাওয়ালি মুরগি তোর মোরগ টা যে তু্ই নামক ভিটামিনের অভাবে শুকিয়ে পাঠ কাঠি হয়ে যাচ্ছে।
— উহু। কোনো কথা তেই কাজ হবে না। তখন মনে ছিলো না বউয়ের ধারে তো আমার যাওয়া লাগবে।
— সত্যি বলছি বিশ্বাস কর শয়তান ধোঁকা দিয়েছিলো। ও আমাকে ভাবতেই দেয়নি তখন যে এখন বউয়ের আমার দরকার পড়েছে পরে আমার বউকে দরকার পড়বে।
পার্বণের কথা শুনে শয়তান ভাবছে,
— ভন্ডের বাচ্চার কথা হুনছোনি!আমি বলে ওরে মনে করতে দেয়নি। শা*লা তু্ই নিজেই তো আমার থেকে বড় শয়তান!

— বাবা আমার কথা তোমাকে মানতেই হবে।
আষাঢ়ের পিছ পিছ ঘুরছে বসন্ত। ওর একদফা একদাবি। দুই ছেলেকে বিয়ে করিয়ে দিয়েছে দাঁত পড়ার আগেই আর এই যে ওর বয়স ১৫ হয়ে গেছে ওকে কি চোখে দেখছে না?
আশ্চর্য!পার্বণ বিয়ে করে বাপ হয়ে গেছে অলরেডি আর ও কি করছে? আঙ্গুল চুষছে। পরে দেখা যাবে পার্বণ দাদা হয়ে গেছে ও তখনো বিয়ে করেনি।
আঁতকে উঠলো বসন্ত এসব ভেবেও। তাই তো বাবার সাথে আজ যাই হোক কথা বলবেই। এতে ওকে মেরে ওর চামড়া রোদে শুকিয়ে শুঁটকি বানাক!
অন্যদিকে আষাঢ়ের হালুয়া টাইট। ও যাবে হাগতে কিন্তু এই ছেলে যেতেই দিচ্ছে না!সকালে উঠে পেট খালি করার মতো শান্তি আর কিছুতে নেই।
বিরক্ত হয়ে আষাঢ় বলে,
— বাপ আমার আগে আমি হেগে টা করে আসি তারপর তোর কথা শুনবো।
— না তোমার হাগা পরে আগে আমার কথা।
— ওরে পাঠারে…
বলতে গিয়েও থেমে গেলো আষাঢ়। ওর পেটে গুড়গুড় করছে। ছেলেকে ঠেলে দৌড় দিতে নিলেই ওর লুঙ্গি টেনে ধরে বসন্ত।
— ছাড় আমার লুঙ্গি বেয়াদব ছেলে।
— আগে আমার কথা শোনো।
বিপদ সীমা ক্রমেই বাড়ছে। দম আটকে আসছে। ইমার্জেন্সি ওকে পায়খানায় বসতে হবে। কিন্তু হতচ্ছাড়া ছেলে হয়েছে ওর।
পেটের মধ্যে আরেবার গুড় গুড় করতেই সহ্য হলো না আষাঢ়ের। লুঙ্গি যাক জাহান্নামে আগে ওর হাগা।
লুঙ্গি খুলেই দৌড় সে। বাবার পায়খানার জন্য এমন ম্যারাথন রেস দেখে তব্দা খেয়ে গেলো বসন্ত। লুঙ্গি খুলে হাতে চলে এসেছে আর ওর বাপ শর্ট প্যান পড়েই হা*গতে চলে গেছে!
আষাঢ়ের যাওয়ার পানে তাকিয়ে বসন্ত বলল,
— ছেলের আগে তোমার পায়খানা টা বড় হয়ে গেলো বাবা!

রুমে বসে নিজের চেহারার ঘষা মাজা করছে চৈত্র। হাত পায়ে, মুখে হাবিজাবি মাখছে। ঠিক তখন রুমে আগমন ঘটে ভাদ্রের।
ও এসেই তড়িৎ গতিতে চৈত্রকে নিজের কাছে টেনে নেয়। হঠাৎ টানায় অবাক চৈত্র বলে,
— আরে আরে কি করছিস কি করছিস তুই?
— ভাই আর বোন দুটোই এক। ভাই দিয়ে রাখছে ফোনের রিংটোন “লেংটা সুলেমান আর বোন দিয়ে রাখছে “বেগুন তুলিতে”!
— হে হে ওই আরকি!
মূলত ঘটনা ঘটেছে ভাদ্র যে শো রুমে কাজ করে আজকে সেই শো রুমের ওনার এসেছিলো।
লোকটা একটু খিটখিটে। বুড়ো তো। তো আজ ওনার নাকি বউয়ের সাথে ঝামেলা হইছে। নার্গিস আপার বিখ্যাত সং নিয়ে।
ওইটার টিকটিক দেখছিলো বুড়ো। আর ওর বউ ভেবে বসেছিল অন্য কাহিনী। ওনাদের একটা বেগুন ক্ষেতও আছে।
যেই ক্ষেতের টাটকা বেগুন নিতে লোকটার বউয়ের বান্ধবী এসেছিলো। এমনিতেই সেই বান্ধবী কে দেখতে পারে না সেই বউ।
তারপর ঘরে এসে শুনে এটা-
“সন্ধ্যা বেলা বেগুন ক্ষেতে করতে গেলাম চুরি।
বেগুন ওলা অমনি আমার হাতটা নিলো ধরি। ধইরা নিয়া,ভইরা দিলো~
ধইরা নিয়া ভইরা দিলো ~
বেগুন আমার থলিতে আর যাবোনা বেগুন তুলিতে।”
বউ তো বুঝে বসেছে উল্টো ব্যাস মেরে একদম চোখ কানা করে দিছে। সাথে হুমকি দিছে,
— তোর বেগুন ও আমি গোড়া সমেত তুলে ফেলবো। শা*লা লুইচ্চা!
তারপর যেই না ভাদ্রের ফোন রিংটোন শুনলো এই একই গান। মারের কথা মনে পড়ে যায়। ব্যাস উনি যতক্ষণ ছিলেন সারা সময় ওনার সামনে মুরগি হয়ে বসে থাকতে হয়েছে ভাদ্রকে।
ভাদ্র আর চৈত্রের ফোন একই মডেল ও কালারের হওয়ায় ভাদ্র ভুলে ওর ফোন নিয়ে গেছিলো। ব্যাস বাকিটা ইতিহাস হয়ে রইলো!

ব্রেকিং নিউজ,
ছাওয়ালি মুরগীকে অবশেষে বাগে আনতে পেরেছে ওর পার্সোনাল মোরগটি।
কনুই দিয়ে পার্বণের পেটে গুঁতো মেরে পৌষ বলে,
— সর তু্ই আমার কাছ থেকে। তোর ঢং করা লাগবে না।
পৌষকে আরো ভালো মতো আষ্টেপিষ্টে জড়িয়ে ধরলো পার্বণ। পিছন দিক থেকে ওকে জড়িয়ে ধরেছে পার্বণ।
এক হাত কলার বোন জড়িয়ে আরেক হাত ওর জামা গলিয়ে উদরে রাখলো পার্বণ। চুলের ভাঁজে নাক ডুবিয়ে আফিমের ন্যায় চুল থেকে আসা ঘ্রাণ নাসিকায় মন ভরে নিলো ও।
আহা!কি শান্তি!এই গন্ধ যার জন্য ও পাগল হয়ে গেছে। এই একটু খানি ছোঁয়া ওকে কেমন অস্থির করে দিয়েছিলো।চুলের ভাঁজে আরেকটু মুখ ডুবিয়ে রাখলো।
প্রশান্তিতে চোখ বুঝে ফেললো পার্বণ। তারপর সেভাবেই বলতে লাগলো,
— সরি জান।
অভিমানে টইটুম্বুর হয়ে পৌষ জবাব দিলো,
— হুঁ তোর সরি তোর কাছেই রাখ। আমার কাছ ঘেষবি না তু্ই।
পৌষের পিঠটা পার্বণের বুঁকের সাথে লেগে আছে। ও নিজের বাঁধন আরেকটু টাইট করলো। পৌষের কাঁধে মুখ রেখে বলল,

— শোন পৌষ আমি তোকে ছাড়া না কোনো কালে থাকতে পেরেছি না পারবো। ছোট বেলাতেও এতো মারামারি হতো তাও পারতাম না আর না তো বড় বেলায়। এখন তো প্রশ্নই উঠে না।
তারপর থেমে গিয়ে আবারো বলল পার্বণ,
— তোর কাছ এই পার্বণ ঘেঁষবে না তা কোনোদিনও হবে না।
— ভালোবাসিস আমায়?
বুঝে রাখা চোখ জোড়া খুলে ফেলে পার্বণ পৌষের এমন হুট্ করে করা প্রশ্ন শুনে। পৌষকে এবার নিজের দিকে ঘুরায় ও। ওর কাঁধে দুই হাত রেখে বলে,
— কি বললি আবার বল তো?
পার্বণের গভীর চোখের দিকে বেশিক্ষন তাকিয়ে থাকতে পারলো না পৌষ।দৃষ্টি নামিয়ে নিলো। হাত দিয়ে পার্বণের বুঁকের উপর আঁকিবুকি করতে আরম্ভ করলো।
পৌষের থুতনি ধরে ওকে নিজের দিকে ফিরালো পার্বণ। চোখে চোখ রেখে বলল,

— এই চোখ দুটো কি কখনোই আমার পৌষকে কিছু বলেনি?
কিছু বলল না পৌষ। পার্বণই বলে,
— সবাই যেমন ভালোবাসি ভালোবাসি কথা বলে মুখে ফেনা তুলে ফেলে সেরকম কোনো কিছুই আমরা করিনি মানছি আমি তাই বলে তোর মধ্যে এমন প্রশ্নের উদয় হবে ভাবিনি!
— এমন করছিস কেনো সামান্য প্রশ্নই তো ?
— কিন্ত আমার কাছে সামান্য নয়। তু্ই কি আমার পাগলামির মধ্যে আমার ভালোবাসা খুঁজে পাসনি? আমি যে তোর আগে পিছে ঘুরি একেবারের জন্যও কি তু্ই এতে ভালোবাসা অনুভব করিসনি?
চুপ করে রইলো পৌষ। ওর থেকে ভালো কে জানবে এই ছেলেটাকে। পৌষ তো শুধু ওর মুখ থেকে ভালোবাসি যা কথাটা শুনতে চেয়েছিলো।
কিন্ত কে জানতো ছেলেটা সিরিয়াস হয়ে যাবে। ছেলেটা যে কোনো কিছু নিয়েই সিরিয়াস না। সারাক্ষন চঞ্চলতায় থাকবে।

— তু্ই নিজেও জানিস তুই আমার জন্য কি আর আমিও জানি আমি তোর জন্য কি। ভালোবাসা মুখে বলে বোঝানোর বিষয় না এটা অনুভব করার বিষয়। যারা এটা পারে তারাই প্রকৃত অর্থে ভালোবাসা কি জানে।
— একটা কথা বলি শোন, পৌষপার্বণ নামটা খেয়াল করেছিস তু্ই?
মাথা নাড়ালো পৌষ। যে ও খেয়াল করেছে।

পৌষপার্বণ পর্ব ২০

— পৌষ শব্দ ছাড়া কিন্তু পার্বণ আসে না। পৌষ ছাড়া পার্বণ যেমন আসে না তেমনি তু্ই মানবী পৌষ ছাড়া এই মানব পার্বণ কিছুই না।
শেষে শুধু পার্বণ একটা কথাই বলে,
— পৌষ ছাড়া পার্বণের অস্তিত্ব নেই। না শব্দের পৌষপার্বণে আর না তো মানুষ পৌষপার্বণে!

পৌষপার্বণ পর্ব ২২