Home প্রণয়ের অমল কাব্য প্রণয়ের অমল কাব্য পর্ব ৪২

প্রণয়ের অমল কাব্য পর্ব ৪২

প্রণয়ের অমল কাব্য পর্ব ৪২
Drm Shohag

ফাইজদের বাড়ির সামনে এসে গাড়ি থামানো হয়। ইনায়া কাঁদতে কাঁদতে ক্লান্ত হয়ে ফাইজের কাঁধে মাথা রেখে ঘুমিয়েছে। ফাইজ শান্ত চোখে ইনায়ার পানে চেয়ে থাকে। হাত বাড়িয়ে ইনায়ার গাল স্পর্শ করে। ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটে ওঠে।
কিছু সময় পেরোতেই ইনায়া পিটপিট করে চোখ মেলে তাকায়। ফাইজকে তার এতো কাছে দেখে চোখ বড় বড় করে তাকায়। নিজের অবস্থান বুঝতে পেরে দ্রুত মাথা তুলে নেয় ফাইজের কাঁধ থেকে। ভীষণ ল’জ্জা পেয়েছে মেয়েটা। মাথা নিচু করে চোখ বুজে নেয়। ফাইজ হাসলো। ফিসফিসিয়ে বলে,
“লিটল কুইন, ঘরে গিয়ে ল’জ্জা পেও। এটা তো গাড়ি। নয়তো শুদ্ধর কথা ফলে যেতে পারে।”
ইনায়া বন্ধ চোখের পাতা আরও খিঁচে নেয়। বিড়বিড় করে, “অ’স’ভ্য।”
ফাইজ ঠোঁট বাঁকিয়ে হেসে ইনায়ার কোমড় জড়িয়ে তার দিকে টেনে আনে। ইনায়া চোখ বড় বড় করে ফাইজের দিকে তাকিয়ে বলে,

“কি করছেন?”
ফাইজ ঠোঁট কা’ম’ড়ে হেসে বলে,
“কি করছি লিটল কুইন?”
ফাইজের দৃষ্টিতে ইনায়া এলোমেলো দৃষ্টি ফেলে। চোখ নামিয়ে নেয়। ফাইজ আর জ্বালালো না। গাড়ির দরজা খুলে বের হয়ে ইনায়াকে কোলে তুলে নেয়। ইনায়া আমতা আমতা করে বলে,
“আমাকে নামিয়ে দিন প্লিজ!”
ফাইজ ইনায়ার দিকে তাকিয়ে হেসে বলে,
“লিটল কুইন আমার, কোলটাও আমার, ইচ্ছেটাও আমার। সো ডোন্ট টক।”
ইনায়া ল’জ্জা পায়। ফাইজ আর দেরি করল না। গটগট পায়ে এগিয়ে গিয়ে বাসার গেইটের দিকে যায়। পিছু পিছু ফাইজের কাজিনেরা। ফারাহ ফটাফট তার ফোনে কয়েকটা পিক উঠিয়ে নিয়েছে তার ভাই আর ভাবির। এরপর ফাইজের পিছু যেতে যেতে হেসে বলে,
“ভাইয়া তোমার বউ কি অসুস্থ?”
ফাইজ সামনে এগোতে এগোতে বলে,
“মারাত্মক অসুস্থ আমার বউ। কেন?”
ফারাহ হেসে বলে,

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

“আমার কেন যেন মনে হচ্ছে ভাবি সুস্থ। কিন্তুু তোমার হাত নিশপিশ করছিল ভাবিকে কোলে নেওয়ার জন্য।”
ফাইজ বোনের কথায় থতমত খেয়ে তাকায়। বিরক্ত হয়ে বলে,
“শুদ্ধর হাওয়া গায়ের মাখিয়ে এলি না-কি? একদম জ্বালাবি না। সর।”
ফারাহ হাসল। তবে শুদ্ধর কথা মনে পড়ায় মুখ টা মলিন হলো।
ফাইজ বাড়ির দরজার সামনে দাঁড়িয়ে পড়লে দেখল তার মা দাঁড়িয়ে আছে। ফাইজ হাসল তার মাকে দেখে। ইনায়ার ভীষণ ল’জ্জা লাগছে। এখানে কত মানুষ? ফাইজের আম্মু হেসে বলে,
“আমার বউমাকে নামিয়ে দাও। এখন ওকে আমাদের কাছে দিয়ে যাও। তোমার কাজ শেষ।”
ফাইজ মুখ ছোট করে বলে,
“নাআআ। আমার কাজ শেষ হয়নি আম্মু। তুমি তোমার বউমাকে কালকে দেখবে। আজ যেতে দাও।
চোখ উঁচিয়ে তার বাবাকে সোফায় ক্লান্ত হয়ে বসে থাকতে দেখে বলে,
“বাবা আজ তোমার বউকে তোমাকে দিয়ে দিলাম। নিয়ে যাও।”
ফাইজের কথায় সবাই হেসে ফেলে।

ফাইজের মা ফাইজের কান টেনে বলে,
“তাই না? আমার বউমাকে নামিয়ে দাও অ’স’ভ্য ছেলে।”
ফাইজ অসহায় মুখ করে ইনায়াকে নামিয়ে দিল। এরপর ইনায়ার হাত ধরে ভেতরে প্রবেশ করে তার বাবার দিকে চেয়ে বলে,
“বাবা তুমি কিন্তুু ভীষণ ক্লান্তু। তোমার বউকে নিয়ে গিয়ে দ্রুত তোমার সেবা করতে বলো। আমার বউটা এখানে ১০ মিনিট থাকুক।”
ইনায়ার ভীষণ ল’জ্জা লাগছে। এই লোকটা এমন কেন? কখন থেকে সবার সামনে শুধু বউ বউ করছে।
ফাইজ তার কাজিনসহ, খালা মামাদের দিকে তাকিয়ে বলে,
“তোমরাও গিয়ে ঘুমাও। তোমাদের ক্লান্তিমাখা মুখ দেখে আমার একদম সহ্য হচ্ছে না।”
ফাইজের চাচা হেসে বলে,

“খাইজ বাবা মনে হচ্ছে আজ আমাদের সবার জন্য একটু বেশিই চিন্তা করছে।”
ফাইজ হেসে বলে,
“আসলে তোমাদের বউমা সারা রাস্তা আমায় বোঝালো আমি যেন সবার কথা চিন্তা করি, তাই আর কি।”
ইনায়া চোখ বড় বড় করে তাকায় ফাইজের দিকে।
ফাইজ ইনায়ার দিকে চেয়ে এক চোখ টিপ দেয়। ইনায়া থতমত খেয়ে চোখ সরিয়ে নেয়। বিড়বিড় করে, ‘কি মিথ্যুক’
ইনায়া অবাক হলো এই লোককে এতো হাসতে দেখে। সে তো তার ভাইয়ের কপি ভাবতো এই লোককে।
ফাইজের মা ইনায়াকে নিয়ে গিয়ে সোফায় বসায়। থুতনিতে হাত দিয়ে ছোট করে একটা চুমু খায়। ফাইজের আরও আত্মীয়স্বজন সবাই ইনায়াকে ঘিরে বসেছে। টুকটাক অনেক কথা বললো ইনায়ার সাথে।খুব বেশি সময় ইনায়াকে রাখল না। কিছুক্ষণ পরেই ফারাহসহ, তার কাজিনরা ইনায়াকে ফাইজের ঘরে বসিয়ে আসে।

রাত ১২ টার কাছাকাছি। ইনায়া বেডের মাঝখানে ঘোমটা টেনে বসে থাকার কথা। অথচ মেয়েটা ঘুমে কাদা। বেচারি ঘুমে তাকাতে পারছিল না, কখন যে ঘুমিয়েছে বুঝতেই পারেনি। মাথাটাও কেমন ঝিমঝিম করছিল। আলগাভাবে বসতে পারছিল না, তাই বেডের সাথে হেলান দিয়ে বসে ছিল। কখন যে ঘুমিয়েছে বুঝতেই পারেনি। মাথার ঘোমটা কাঁধ বেয়ে মেঝেতে পড়ে গিয়েছে।
ফাইজ তার রুমে ধীরপায়ে প্রবেশ করে। দরজা লক করে দেয়। উল্টো ঘুরে বেডের দিকে তাকালে ইনায়াকে বসে বসে ঘুমাতে দেখে ভীষণ খারাপ লাগলো তার। লিটল কুইন এতো কাঁদলো। সারাটা রাস্তা কেঁদেছে। একটু ঘুমিয়েছিল যদিও, সেটুকু সময় একটু চুপ ছিল।
ফাইজ ধীরপায়ে এগিয়ে যায়। ইনায়া বেডের কিনারায় হেলান দিয়ে ঘুমিয়ে আছে। ফাইজ ইনায়াকে কোলে নিয়ে মাঝখানের দিকে শুইয়ে দেয়। এরপর ইনায়ার পাশে বসে ইনায়ার গালে হাত রাখে। মেয়েটা ঘেমে গিয়েছে। সবচেয়ে বড় কথা সারাদিনে এতো ভারি জিনিস পরে তার কুইন ভীষণ উইক। ফাইজ ইনায়ার গালে হাত দিয়ে আলতো স্বরে ডাকে,

“লিটল কুইন?”
ইনায়া তার মতো ঘুমিয়ে। ফাইজ আরও বেশ কয়েকবার ডাকে। ইনায়ার কপালে বিরক্তির ভাঁজ ফুটে ওঠে। চোখ না খুলেই দু’হাত তুলে ফাইজের হাত ধরে ঘুম জড়ানে কণ্ঠে বিরক্তি নিয়ে বলে,
“কোন বে’য়া’দ’ব রে? দেখছিস না আমি ঘুমাচ্ছি?”
ফাইজ বোকাচোখে ইনায়ার ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। ঘুমের ঘোরে এসব কি বলছে তার বউটা! ফাইজ ইনায়াকে টেনে তুলে বসালো। ইনায়া তবুও চোখ খুলল না। ফাইজ এক হাতে ইনায়াকে তার সাথে জড়িয়ে নিয়ে ডাকে, “লিটল কুইন?”
ইনায়া চোখ বুজে ঘুম জড়ানো কণ্ঠে রেগে বলে,,
“আমাকে লিটল বলছিস? লিটল মানে তো ছোট্ট। তুই জানিস আমার বিয়ে হয়ে গিয়েছে। আমি বড় হয়ে গেছি। যা ভাগ। আমার বর তোকে পেলে উগান্ডা পাঠাবে।”
ফাইজ তব্দা খেয়ে চেয়ে আছে। এসব কি বলছে তার লিটল কুইন? ফাইজ ইনায়ার গালে আলতো থাপ্পড় দিয়ে কিছুটা শব্দ করে বলে,

“লিটল কুইন?”
এবার ইনায়ার পুরোপুরি ঘুম ভেঙে যায় বোধয়। মেয়েটার ঠিক করে তাকাতে পারছে না। আদো আদো চোখ খুলে ফাইজের মুখটা ঝাপসা দেখে। মনে হলো চিনলো না। দুর্বল শরীরে ফাইজকে ধাক্কা দিয়ে জড়িয়ে যাওয়া কণ্ঠে বলে,
“আমাকে ধরেছিস কেন? ছাড় আমায়। অ’স’ভ্য, মেয়ে দেখেছে আর ধরেছে। তোকে কিন্তুু আমার বরকে দিয়ে পিটিয়ে পিঠের ছাল তুলে নিব বলে দিচ্ছি।”
কথাগুলো বলে ফাইজকে আবারও ধাক্কা দেয়। তবে ইনায়া নিজেই হেলে পড়ে যেতে নেয়, ফাইজ শক্ত করে দু’হাতে ইনায়াকে চেপে ধরে। তীক্ষ্ণ চোখে ইনায়ার দিকে চেয়ে আছে ফাইজ। ইনায়া কি যেন বিড়বিড় করছে চোখ বুজে।
এরপর জোর করে ফাইজের থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে ঢুলতে ঢুলতে জড়ানো কণ্ঠে বলে,
“স্বামী কোথায়? স্বামী? কোথায় তুমি? আজকে আমাদের বা’স’র রাত। এসো স্বামী।”
ইনায়ার কথা শুনে ফাইজ বিষম খায়। ইনায়া ঢুলতে ঢুলতে ফাইজের দিকে এগিয়ে গিয়ে দু’হাতে তার চোখ কচলে ভালো করে দেখে বলে,

“তোমাকে আমার স্বামী স্বামী লাগছে? তুমি আমার স্বামী?”
ফাইজ অদ্ভুদ চোখে তাকায় ইনায়ার দিকে। কোন ভূত ধরল তার বউটাকে? ইনায়া ঢুলতে ঢুলতে ফাইজের বুকে ঢলে পড়ে। ফাইজ দু’হাতে ইনায়াকে আগলে নেয়। ইনায়া বিড়বিড় করে,
“স্বামী আমার ঘুম পাচ্ছে।”
ফাইজ ডান হাতে ইনায়ার মুখ তুলল। ইনায়া চোখ বুজে। ইনায়া আবারও ডাকে, “স্বামী?”
ফাইজ মৃদুস্বরে বলে, “বলো লিটল কুইন।”
ইনায়া ফাইজের বুকে নাক ঘষে বলে,
“আমি ঘুমাতে চাই।”
ফাইজ ইনায়ার মাথায় একটা চুমু খেয়ে বলে, “ঘুমাও।”

এরপর ইনায়ার থুতনিতে হাত রেখে ইনায়ার মুখ উঁচু করে ধরে। গালের দু’পাশে হাত দিয়ে মুখ গোল করে ইনায়ার মুখের কাছে নাক নিয়ে যায়, যা বোঝার বুঝল। কিন্তুু কে করেছে এই কাজ? মেজাজ চরম লেভেলের গরম হলো।
ফাইজের ফোনে কল আসে কারো। ফাইজ ইনায়ার দিকে চেয়েই পকেট থেকে ফোন বের করে নাম্বার না দেখেই রিসিভ করে কানে দেয়। ওপাশ ঘেকে শুদ্ধ হেসে বলে,
“বাসর ঘরে ঘুমন্ত কন্যাকে পেয়ে কেমন ফিল করছিস সোনা?”
ফাইজের চোয়াল শক্ত হয়। শুদ্ধ আবারও হেসে বলে,
“চাপ নিস না। একটু পরই কেটে যাবে। তুই বোরিং ফিল করলে আমি তোকে প্রক্সি দিই কিছুক্ষণ।”
ফাইজ রেগে শক্ত গলায় বলে,

“আমি তোকে ছাড়বো না শুদ্ধ।”
“এমা ছিঃ! ছিঃ! বাসর রাতে বউ কে না ধরে এসব কি অলক্ষুণে কথা বলছিস সোনা? আমাকে আজকের রাত টা ছাড়। আবার কালকে ধরিস। আজ ঘুমন্ত কন্যাকে ধরে থাক।”
ফাইজ রাগান্বিত স্বরে বলে,
“কাজটা একদমই ঠিক করিস নি শুদ্ধ। ফান লিমিটের মাঝে রাখতে হয়। তুই যেটা ক্রস করলি।”
শুদ্ধ ভ্রু কুঁচকে তাকায়৷ ফাইজের কণ্ঠস্বরে বুঝল সে সিরিয়াস। অতঃপর ভ্রু কুঁচকে বলে,
“কি হয়েছে? আমি কম পাওয়ারের এক ঘুমের ওষুধ দিয়েছি। একটু পরই দেখবি ইনায়া তোর কোলে উঠে বসবে।”
ফাইজ দাঁতে দাঁত চেপে বলে,
“ওকে অ্যালকোহল দিয়েছিস কেন?”

শুদ্ধ অবাক হলো। মুখ থেকে হাসি মিলিয়ে যায়। সিরিয়াস হয়ে বলে,
“পা’গ’ল নাকি তুই? ওকে আমি এসব দিতে যাব কেন?”
ফাইজ চোখ বুজে শ্বাস নিল। অতঃপর কণ্ঠে রাগ নিয়ে বলে,
“পা’গ’ল আমি না, তুই। ফান করতে করতে আকাশে উঠে গিয়েছিস। ঠিক-ভুল এর তফাৎ বুঝতে ভুলে গিয়েছিস। এখন আমার সত্যিই আফসোস হচ্ছে, তোর মতো বে’য়া’দ’ব ছেলেকে আমি আমার লাইফে বন্ধু হিসেবে পেয়েছি বলে।”
কথাটা বলেই কল কেটে ফোন সুইচ অফ করে বেডের উপর ছুঁড়ে মারলো।
শুদ্ধ যেমন অবাক হলো, তেমনি ফাইজের লাস্ট কথাটায় মুখটা কেমন ফ্যাকাশে হয়ে গেল। ফাইজের ফোনে আবারও কল দিলে ফোন বন্ধ দেখায়। কপালে চিন্তার ভাঁজ। ফাইজের ফোনে বারবার কল দেয়, প্রতিবার ফোন বন্ধ বলে। শুদ্ধর রাগ হয়। তাকে মিথ্যা ব্লেম দিচ্ছে কেন? এমনিতেই মায়ের উপর রেগে আছে। আজ ভরা বাড়িতে কিছু বলতে পারলো না। ভেবেছিল ওখানে যেতে না পারলেও ফাইজকে একটু জ্বালানো যাক। কিন্তুু এসব মিথ্যা ব্লেম তার হজম হলো না। ফাইজের ফোন বারবার বন্ধ পেয়ে রাগে হাতের ফোন ছুঁড়ে মারে। সবকিছু অ’স’হ্য লাগছে।

রাত প্রায় ১২:৩০ এ ইরফান মাইরা গ্রামে পৌঁছায়। মাইরা তাদের দরজায় লক করে কয়েকবার।
মাইরার মায়েরা বেশিক্ষণ হয়নি পৌঁছেছে। জেগেই আছে তারা। দরজা ধাক্কানোর শব্দে মাইরার মা এসে দরজা খুলে দেয়। মাইরা আর ইরফানকে দেখে বিস্ময় দৃষ্টিতে তাকান। মায়ের পিছু পিছু লাবিব এসে দাঁড়ায়। বাচ্চাটা সারা রাস্তা ঘুমিয়ে ছিল, বাড়ি আসার পর ঘুম ভেঙে গিয়েছে। মায়ের শাড়ি ধরে উঁকি দিয়ে দেখছিল কে এসেছে। তার আপুকে দেখে মায়ের শাড়ি ছেড়ে দৌড়ে আসে মাইরার দিকে। শব্দ করে ডাকে, “আপুই।”
মাইরা তার ভাইকে দেখে হেসে ফেলে। দ্রুত হাঁটু মুড়ে বসে লাবিবকে দু’হাতে জড়িয়ে নেয়। লাবিব তার আপুর গলা জড়িয়ে ধরে হেসে বলে,

“আপুই টুমি এসিচো?”
মাইরা লাবিব এর মুখে ছোট ছোট চুমু দিয়ে হেসে বলে,
“এসেছি তো ভাইয়া। তুই কেঁদেছিলি?”
লাবিব ঠোঁট উল্টে বলে,
“আবু, মা পুচা। টুমিও পুচা। একুন টুমি বালু।”
মাইরা হেসে ফেলে। লাবিব মাইরার দু’গালে দু’টো চুমু দিয়ে বলে,
“আপুই একুন বালু। আমাকে তুমু দিচে।”
ইরফান অবাক দৃষ্টিতে চেয়ে আছে মাইরা আর লাবিবের দিকে। ভাইবোনের সম্পর্ক এরকম হয়, তার হয়তো জানাই ছিল না। কেমন অদ্ভুদ লাগলো তার কাছে। কৌতুহল দৃষ্টিতে ভাইবোনের দিকে চেয়ে রইল।
লাবিবের হঠাৎ ইরফানকে চোখে পড়ে। দু’হাতে মাইরার গলা জড়িয়ে মাথা উঁচু করে ইরফানের দিকে চেয়ে বলে, “খুবিচ ডুলাবাই।”

লাবিবের কথা শুনে ইরফান ভ্রু কুঁচকে বলে, “হোয়াট?”
মাইরা চোখ বড়বড় করে ইরফানের দিকে তাকায়। ইরফানের মুখের এক্সপ্রেশন দেখে তার হাসি পায়। মুখ ঘুরিয়ে লুকিয়ে একটু হেসে নেয়। এরপর নিজেকে সামলে মাইরা তার হাতে থাকা তিনটে ব্যাগ লাবিব এর হাতে দেয়। যার ভেতর বেশ অনেকগুলো চকলেট এর বক্স ভর্তি। ইরফান কিনে দিয়েছিল। অবশ্যই মাইরা আবদার করেছিল, তবে এতোগুলো চায়নি। মাইরার এই ব্যাপারটা ভীষণ ভালো লাগে। সে ছোট্ট একটা জিনিস চাইলে ইরফান তার চাওয়ার চেয়ে অনেক বেশি পরিমাণে এনে দেয়, পারলে দোকান কিনে আনে। মাইরা লাবিবের হাতে চকলেটের বক্স দিয়ে লাবিবের দু’গাল তার দু’গালে হাত রেখে বলে,
“এখানে চকলেট আছে। এবার খুশি?”
লাবিব হেসে মাইরার কাঁধে মাথা দিয়ে হেসে বলে,
“হু হু খুচি খুচি।”
মাইরা লাবিবের গালে দু’টো চুমু খেয়ে বলে,

“এবার আমি চলে যাবো। তুই কাঁদতে পারবি না কিন্তুু। কাঁদলে এরপর এসে আর চকলেট চুমু কিছু দিব না।”
লাবিবের মুখ ছোট হয়ে যায় আপু চলে যাবে শুনে। মাইরা মৃদু হেসে বলে,
“আপু আবার আরেকদিন আসবো তো সোনা ভাইয়া।”
লাবিব হেসে বলে,
“আচ্চা, আপুই তুমি আসপে, আমি কাদবু না। চলকেট, তুমু দিবে?”
মাইরা হেসে মাথা নেড়ে বলে,
“হু দিব। কাঁদা যাবে না। কাঁদলে দিব না।”
লাবিব সম্মতি দেয়। “আর কাঁদবু না আপুই। বালু আপুই।”
মাইরা লাবিবকে ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। তার মায়ের দিকে তাকালে দেখল তার মা ভেজা চোখে তার দিকে চেয়ে আছে। মাইরা মৃদুস্বরে বলে,
“দরজা লাগাও। আসছি।”
মাইরার মা নিজেকে সামলে নিস্তেজ গলায় বলেন,
“আজকের রাত টা থেকে যা মা। অনেক রাত হয়েছে।”

মাইরা তাকালো না তার মায়ের দিকে। উল্টো ঘুরে ইরফানের পাশে দাঁড়িয়ে নিজেই ইরফানের হাত ধরল। ইরফান অবাক হয়। মাইরা ইরফানকে বলে,
“রাতে শহরে যেতে কি প্রবলেম হবে?”
ইরফান ছোট করে বলে, “নো।”
মাইরা হেসে বলে,
“তবে চলুন।”
এরপর তার মায়ের দিকে চেয়ে হেসে বলে,
“কিছু হবে না। তুমি ঘুমাও।”
কথাটা বলে মাইরা ইরফানের হাত ধরে টানে। মজার ব্যাপার মাইরার মা আর একবারো মাইরাকে থাকতে বললো না। না তো ইরফানকে কিছু বললো। ইরফান ঘাড় বাঁকিয়ে মাইরার মায়ের দিকে তাকালে দেখল ভদ্রমহিলা যেন এখনই কেঁদে দিবেন। ইরফান অবাক হলো।

মাইরা ইরফানের হাত ধরে বারবার টানলে ইরফান নিজেই মাইরার হাত ধরে বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসে।
মাইরার মা তার স্বামীর কড়া দৃষ্টি উপেক্ষা করে মাইরাকে একবার এখানে থাকতে বলেছিল। দ্বিতীয়বার আর সাহস করে উঠতে পারেননি। মাইরা আর ইরফান বাড়ি থেকে বেরিয়ে দু’পা এগোতেই লাবিবের বাবা এসে ঠাস করে দরজা লাগিয়ে দেয়। মাইরার মুখে মলিন হাসি ফুটে ওঠে। ইরফান বোধয় বিরক্ত হলো।
ইরফান তার গাড়ির কাছে এসে দাঁড়িয়ে পড়ে। মাইরাকে তার দিকে ফেরায়৷ চাঁদের স্নিগ্ধ আলো মাইরার কোমল মুখায়ব জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। জ্বলজ্বল করা চাঁদের আলোয় মাইরার ফর্সা ত্বক শ্বেতপাথরের মতো মায়াবী লাগলো। এভাবে কখনো মাইরাকে দেখেনি। ইরফান এক ধ্যানে চেয়ে থাকে মাইরার পানে। ডান হাত বাড়িয়ে মাইরার গালে রাখে। মাইরা ইরফানের দিকে তাকায়। ইরফান মৃদুস্বরে বলে,
“তুমি চাইলে আজকে রাতে এখানে থাকতে পারি। বাট নেক্সট ডে খুব ভোরে যেতে হবে। আমার ভার্সিটি আছে।”
মাইরা ইরফানের কথায় বেশ অবাক হলো। এভাবে তো ইরফান কথা বলে না তার সাথে। আড়চোখে তার গালে রাখা ইরফানের হাত দেখল। ভাবনা রেখে নির্জীব গলায় বলে,

“থাকবো না। বাড়ি চলুন।”
ইরফান মাইরার মুখে দৃষ্টি বুলিয়ে গম্ভীর গলায় বলে,
“আমি তোমাকে অফার করছি। তুমি ফিরিয়ে দিচ্ছো, স্টুপিট গার্ল।”
মাইরা ইরফানের দিকে চেয়েই মৃদু হেসে বলে,
“আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।”
তখনই মাইরার পায়ের সাথে কিছু একটা স্পর্শ লাগে। মাইরা চেঁচিয়ে ওঠে। পায়ের গোড়ালির উপরের জ্বায়গাটা কেমন জ্বলে উঠল। ইরফান দ্রুত মাইরার কোমড় দু’হাতে জড়িয়ে মাইরাকে উঁচু করে ধরে। মাইরা পড়ে যাওয়ার ভয়ে দু’হাতে ইরফানের গলা জড়িয়ে ধরে। নিচের দিকে তাকিয়ে দেখার চেষ্টা করে কি লাগলো। অন্ধকারে তেমন কিছু চোখে পড়ল না। ইরফান মাইরাকে গাড়ির ডিকিতে বসিয়ে চিন্তিত কণ্ঠে বলে,
“হোয়াট হ্যাপেন্ড?”

মাইরা তার ডান পা উঠিয়ে লেহেঙ্গা সামান্য উপরে উঠালো। ইরফান পকেট থেকে ফোন বের করে ফ্লাশ জ্বালায়। মাইরা পায়ে হাত দিয়ে রেখেছে, ইরফান ফ্লাশ লাইট মাইরার পায়ের দিকে ধরে, পায়ের একটা জায়গায় কেমন চিঁড়ে গিয়ে র’ক্ত বেরিয়ে এসেছে। ইরফান অবাক হলো। ডান হাত বাড়িয়ে মাইরার পায়ের জুতো খুলে ডিকির উপর রাখে। এরপর
চামড়ার উপর লেগে থাকা র’ক্ত মুছে দেয়। পা উল্টেপাল্টে চেক করে আর কোথাও লেগেছে কি-না! চিন্তিত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে,
“এটা কিভাবে হলো?”
মাইরা ব্য’থা’তুর আওয়াজে বলে,
“জানি না। নরম কিছু পায়ে লেগেছিল মনে হয়েছে। কিন্তুু কাটলো কেন।”
ইরফান দৃষ্টি ঘুরিয়ে মাইরার দিকে তাকায়। ফোনের ফ্লাশ মাইরার মুখের দিকে ধরলে মাইরা মুখ বাঁকিয়ে চোখমুখ কুঁচকে বলে,

“মুখে লাইট ধরছেন কেন? সরান।”
ইরফান কিছু বলল না। ফোনের ফ্লাশ ডানদিকে ঘুরিয়ে দেখল কিছু আছে কি-না! একটু দূরেই একটা কালো বিড়াল দেখে ইরফান ভ্রু কুঁচকে নিল। বুঝলো এই বে’য়া’দব বিড়াল মাইরার এই অবস্থা করেছে। বিড়ালের চোখেমুখে লাইট পড়লে মিআউ করে শব্দ করে ওঠে। মাইরা বিড়ালের ডাক শুনে বামদিকে ঘাড় বাঁকিয়ে বিড়ালটির দিকে তাকালো। একদম কুটকুটে কালো বিড়াল। কালো বিড়াল দেখে মাইরার একটু ভ’য়ই লাগলো। ইরফান রেগে ডিকির উপর থেকে মাইরার জুতো নিয়ে বিড়ালটির দিকে ছুঁড়ে মারে। মাইরা চেঁচিয়ে ওঠে,
“আরে আরে কি করছেন? ও নিরীহ প্রাণী।”

ইরফান মাইরার কাছে এসে অশান্ত কণ্ঠে বলে,
“ও নিরীহ নয়। ও ফ্লাওয়ারকে পেইন দিয়েছে।”
মাইরা অদ্ভুদ চোখে ইরফানের দিকে তাকায়। ইরফান হাতের ফোন পকেটে রেখে মাইরাকে কোলে তুলে নেয়। মাইরা চেঁচিয়ে বলে,
“আমার জুতো।”
ইরফান মাইরাকে ড্রাইভিং সিটের পাশের সিটে বসিয়ে সিট বেল্ট লাগিয়ে দিতে দিতে মৃদুস্বরে বলে,
“হাজারটা কিনে দিব।”
মাইরা চুপ হয়ে গেল। হাজার টা? সত্যি সত্যি যদি হাজারটা কিনে দেয়? মাইরা মনে মনে দুঃখ করল। তার জুতোর জন্য আফসোস করা একদম উচিৎ হয়নি।
ইরফান মাইরার দিকে তাকালে দেখল মাইরা ঘেমে গিয়েছে। বা হাতে মুখে লেগে থাকা ঘাম মুছে দিয়ে মাথা থেকে হিজাব নামিয়ে দিল।

মাইরা পিটপিট করে ইরফানের দিকে চেয়ে আছে। ইরফান মাইরার গলায় নজর করে। ঘেমে গিয়েছে দেখেই হিজাব গলা থেকেই টেনে গাড়ির পিছনে ছুঁড়ে মারে। এরপর বা হাতে গলার ভাঁজে হাত দিয়ে ঘাম মুছে দেয়। মাইরা শিউরে ওঠে।
ইরফান মাইরার লেহেঙ্গার ওড়নায় হাত দিলে মাইরা ইরফানের হাত ধরে আমতা আমতা করে বলে,
“কি করছেন?”
ইরফান মাইরার দিকে তাকিয়ে বিরক্তি কণ্ঠে বলে,
“এসব খোলো।”
মাইরা ইরফানের মতিগতি বুঝতে পেরে বলে,
“এসি ছেড়ে দিন। তাহলেই আর গরম লাগবে না।”
ইরফান ভ্রু কুঁচকে বলে,
“ইয়াহ! সিইওর।”

এরপর ইরফান ড্রাইভিং সিটে গিয়ে বসে গাড়ির গ্লাস তুলে দেয়। এসি ছেড়ে দেয়। গাড়ির লাইট অফ করে দেয়। মাইরা কিছু বললো না। ভালো লাগছে না তার। অন্ধকারে বাইরে দৃষ্টি দিয়ে রাখে আনমনে। চোখের কোণে পানি। তবে তা গড়াতে দিল না।
ইরফান ঘণ্টাখানেক গাড়ি ড্রাইভ করে একটা হসপিটালের সামনে গাড়ি দাঁড় করায়। এরপর কোনো কথা না বলেই মাইরাকে কোলে নিয়ে গাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়। মাইরা ডান হাত ইরফানের ঘাড়ে রেখে মিনমিন করে বলে,
“আমি হাঁটতে পারবো।”
ইরফান মাইরার দিকে একবার তাকালো। এরপর সামনে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বলে,
“মি ঠু।”
মাইরা কিছু বললো না। এমনিতেই তার ভালো লাগছে না। আর সবচেয়ে বড় কথা এই লোক শুনলে নাহয় বলতো। শুনবেই না, বলবে কী করতে।
বেশি রাত হওয়ায় কোনো ডক্টর পায়নি। সিস্টার মাইরার পা পরিষ্কার করে দিয়ে ব্যান্ডেজ করে দেয়। ইরফান বিরক্ত হয়৷ বিড়াল খামচি দিয়েছে। ইনজেকশন দিতে হবে। কিন্তুু এখন কোনোভাবেই ম্যানেজ করতে পারলো না। মাইরাকে গাড়িতে বসিয়ে ইরফান চোখ বুজে ভাবতে লাগলো কি করা যায়। মাইরা পিটপিট করে ইরফানের দিকে চেয়ে বলে,
“আপনার কি মাথা ব্য’থা করছে?”
ইরফান রেগে যায়। হঠাৎ-ই চোখ খুলে দাঁতে দাঁত চেপে বলে,

“স্টুপিট, কেয়ারফুল থাকতে পারো না? বড় হতে পারো না? থাপ্পড় দিয়ে সব দাঁত ফেলব তোমার।”
মাইরা ঢোক গিলল। একটু আগেই তো ঠাণ্ডা ছিল। মুহূর্তেই এমন আগুন হয়ে কেন? মিনমিন করে বলে, “আমি বুঝতে পারি নি।”
ইরফান রেগে বলে,
“তো পারো টা কি? শুধু মানুষের মাথা খেতে?”
মাইরা বোকা চোখে ইরফানের দিকে তাকালো। সে আবার কার মাথা খেয়েছে? মাইরা বিরক্ত হয়ে মুখ বাঁকিয়ে জানালার দিকে ফিরে বসল। অ’স’হ্য লোক একটা। সে তো ভালোর জন্যই জিজ্ঞেস করল, মাথা ব্য’থা করছে কি না। কিন্তুু এই লোক তো অ’স’ভ্যের দাদা। মুখ থেকে শুধু নিম এর রস ঝরে।
ইরফান মাইরাকে উল্টো দিকে ফিরে বসতে দেখে রেগে যায়। মাইরার হাত ধরে টেনে তার দিকে ফেরায়। মাইরা বিরক্ত হয়ে বলে,
“কি সমস্যা আপনার? বাড়ি চলুন তো।”

ইরফানের কণ্ঠে চাপা রাগ, সাথে আফসোসের সুরে বলে,
“তুমি আমার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছ কেন?”
মাইরার মুখ আলগা হয়ে গেল। এই লোক কখন কি বলে, আল্লাহই জানে। মাইরা আমতা আমতা করে বলে,
“বাড়ি চলুন।”
ইরফান বিরক্ত হয়ে বলে,
“নো।”
“নো মানে?”
ইরফান ভ্রু কুঁচকে বলে,
“নো মিন’স না।”
মাইরা বিরক্ত হয়ে বলে,
“আমি সেটা জানি। অনেক রাত হয়েছে। প্লিজ চলুন।”
ইরফান মাইরার দু’হাত তার দু’হাতের মাঝে নিয়ে চেক করে। মাইরার গাল, গলা চেক করে। কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ে। মাইরার দিকে চেয়ে চিন্তিত গলায় বলে,

“তোমার শীত লাগছে? তোমার বডি এমন কেন?”
মাইরা ইরফানের দিকে তাকালো। বেশিক্ষণ এসির মাঝে থাকতে পারেনা সে। অভ্যাস নেই। কিন্তুু ইরফান এসির মাঝেও ঘামছে, সেখানে ও কীভাবে বলবে, এসি অফ করুন। সে বললো না। তাও লোকটা কিভাবে যেন বুঝে গেল। ইরফান বিরক্ত হয়ে মাইরার হাত ছেড়ে এসি অফ করে দেয়। মাইরা মিনমিন করে,
“আপনি এসি দিন। আপনি তো ঘেমে গিয়েছেন।”
ইরফান মাইরার পানে চেয়ে গম্ভীর গলায় বলে,
“নো নিড।
কিছু একটা ভেবে বলে,
“তুমি ক্ষুধার্ত। আমাকে বলছো না কেন?”
মাইরা অবাক হয়। এটাও বুঝে গেল? এই লোকটার সবই মাথায় থাকে। মিনমিন করে বলে,
“বাড়ি গিয়ে খাবো।”
ইরফান ধমকে বলে,

“সব কথা বলতে পারো, যাস্ট কাজের কথা ছাড়া, রাইট? স্টুপিট গার্ল।”
মাইরা অসহায় মুখ করে তাকালো। ইরফান আর কিছু বললো না। চুপচাপ গাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়।
মাইরা ডাকল, “কোথায় যাচ্ছেন?”
ইরফান গাড়ির দরজা লাগিয়ে মৃদুস্বরে বলে,
“ওয়েট।”
কিছুক্ষণ পর ইরফান মাইরার হাতে একটা ভাত এর প্যাকেট ধরিয়ে দেয়। মাইরা নিরবে ইরফানের হাত থেকে প্যাকেট টা নেয়। বাস্মতি চালের গরম ভাত, সাথে হাসের মাংস।
মাইরার ভীষণ খিদে পেয়েছে আসলেই। ইরফানের দিকে কৃতজ্ঞতার চোখে তাকায়। মেয়েটার মন খারাপ ছিল, ইরফানের কাজে না চাইতেও মন ভালো হলো। ইরফান পানির বোতল মুখ খুলে মাইরার দিকে এগিয়ে দেয়। মাইরা তৃপ্তির শ্বাস নিয়ে ইরফানের হাত থেকে পানির বোতল নিয়ে জানালা দিয়ে ঝটপট হাত ধুয়ে খাবার খাওয়ায় মনোযোগ দেয়।
খাওয়ার মাঝে ইরফানের দিকে তাকালে দেখল ইরফান শান্ত চোখে তার দিকে চেয়ে আছে। মাইরা মুখের খাবারটুকু শেষ করে ইরফানের উদ্দেশ্যে বলে,

“আপনি খেয়েছেন?”
ইরফান পাল্টা প্রশ্ন করে,
“তুমি খাইয়েছ?”
মাইরা বোকাচোখে ইরফানের দিকে চেয়ে থাকে। ইরফান গাড়ি থেকে নেমে মাইরার পাশের ডোর খুলে বলে,
“বেরিয়ে এসো।”
মাইরা ঢোক গিলে বলল,
“কেন?”
ইরফান মৃদুস্বরে বলে,
“ব্যাক সিটে এসো।”
মাইরা চুপ করে গাড়ি থেকে বের হয়। ইরফান ফ্রন্ট সিটের দরজা লাগিয়ে ব্যাক সিটের ডোর খুলে দেয়৷ মাইরা এবারেও কথা না বাড়িয়ে চুপ করে উঠে বসল৷ ইরফান মৃদুস্বরে বলে,
“ওদিকে যাও।”
মাইরা অবাক হয়ে তাকায় ইরফানেের দিকে। ইরফানের এই কথাটাও চুপচাপ মেনে নিল। সরে বসল খানিক। ইরফান দ্রুত মাইরার পাশে বসে গাড়ির ডোর লাগিয়ে দেয়। এরপর মাইরার দিকে ফিরে বসে। ডান পা সিটের উপর উঠিয়ে বাম পা নিচে রাখে। সিটের উপর রাখা ইরফানের হাঁটু মাইরা শরীর স্পর্শ করে। ইরফান মাইরার দিকে চেয়ে শান্ত কণ্ঠে বলে,

“খাইয়ে দাও।”
মাইরা পিটপিট করে তাকায় ইরফানের দিকে। ইরফানের কথা বোঝার চেষ্টা করছে মেয়েটা। আমতা আমতা করে বলে,
“জ্বি?”
ইরফান ভ্রু কুঁচকে বলে,
“অ্যা’ম অল্স হাঙরি।”
মাইরা তার হাতে থাকা প্যাকেট ইরফানের দিকে বাড়িয়ে দেয়। ইরফান গম্ভীর গলায় বলে,
“তোমাকে খাইয়ে দিতে বলেছি।”
মাইরা ঢোক গিলে। ইরফানের কথার অর্থ মাইরা তাকে খাইয়ে দিক। মাইরা ইরফানের দিকে তাকালে দেখল ইরফান তার দিকেই চেয়ে আছে। মাইরা হাতের প্যাকেট তার দিকে ফিরিয়ে আনে। মাথা নিচু করে মিনমিন করে বলে,
“আপনি খান।”
ইরফান মাইরাকে টেনে তার ডান পায়ের উরুর উপর বসিয়ে দেয়। মাইরা নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে বলে,
“কি করছেন?”

ইরফানের ডান পায়ের উরুর উপর বসানোয় মাইরা আর ইরফানের মুখ এখন সামনাসামনি। ইরফান ডান হাত বাড়িয়ে মাইরার ঠোঁটের কোণে লেগে থাকা সামান্য তরকারি বুড়ো আঙুল দ্বারা মুছে দেয়। এরপর মাইরার চোখের দিকে তাকিয়ে শীতল গলায় বলে,
“খাইয়ে দাও। আমি ক্ষুদার্থ। ইংলিশ বোঝো না?”
মাইরা আমতা আমতা করে বলে,
“এখানে তো আমি খেয়েছি।”
ইরফান ভ্রু কুঁচকে বলে,
“আই নো। স্টার্ট কর। ফাস্ট।”
মাইরা আবারও কিছু বলতে চায়, ইরফান ধমকে বলে,
“সাট আপ। যা বলেছি কর।”
মাইরা ধমক খেয়ে কেঁপে ওঠে। ঢোক গিলে ইরফানের পায়ের উপর থেকে নামতে নিলে ইরফান ডান হাতে মাইরাকে টেনে বসায় তার দিকে। গম্ভীর গলায় বলে,
“স্টুপিট, রাগিয়ো না আমাকে। খাওয়াও। ফাস্ট।”

মাইরা মাথা তুলে ইরফানের দিকে একবার তাকায়। ইরফানের চোখে চোখ পড়লে মেয়েটা সাথে সাথে চোখ নামিয়ে নেয়। নিজেকে সামলে ভাত মাখায়। ইরফান মাইরার ভাত মাখানোয় ব্যস্ত হাতের দিকে চেয়ে ঠোঁট বাঁকায় সামান্য।
মাইরা তার ছোট হাতে যেটুকু ভাত ধরল সেটুকু নিয়েই ইরফানের দিকে বাড়িয়ে দেয়। ইরফান তীক্ষ্ণ চোখে চেয়ে আছে মাইরার হাতের দিকে। মাইরার হাত না কাঁপলেও ভেতর কাঁপছে উ’ত্তে’জ’নায়।
মাইরার হাতের গতি ভীষণ স্লো।
ইরফান বিরক্ত হলো। তার মুখে এই ভাত পৌঁছাতে তিনদিন লাগবে মনে হচ্ছে। সে আপাতত তিন সেকেন্ডও অপেক্ষা করতে পারলো না।

সময় নষ্ট না করে ইরফান তার বা হাতে মাইরার হাত টেনে নিজেই খাবার মুখে নেয়, দৃষ্টি মাইরার পানে। মাইরা চোখ বড় বড় করে তাকায়। মেয়েটার শরীর কেমন শিরশির করে।
মাইরা তার হাতে যতটুকু খাবার নিয়েছিল, তা ইরফানের গালের এক কোণায় পড়ে থাকলো। ইরফান ব্যাপারটায় বেশ মজা পায়। মাইরার হাতের দিকে চেয়ে ঠোঁট বাঁকিয়ে বিড়বিড় করে, ‘লিটল গার্ল।’
এরপর আবারও ইরফান মাইরার পানে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রেখে মুখ নাড়ায়।
মাইরা ইরফানের দৃষ্টিতে দৃষ্টি মিলাতে পারে না বেশিকক্ষণ। চোখ নামিয়ে মিনমিন করে বলে,
“আপনি অন্যদিকে তাকান।”
ইরফান মাইরার জড়তায় ঠোঁট বাঁকিয়ে একপেশে হেসে বলে,

প্রণয়ের অমল কাব্য পর্ব ৪১

“ওকে।”
মাইরা ভাবলো ইরফান অন্যদিকে তাকিয়েছে। তবে মাইরার মনে হয়েছে ইরফান হেসেছে। তাই তড়াক করে চোখ তুলে ইরফানের দিকে তাকাল। দৃষ্টিতে দৃষ্টি মিললো। ইরফানের মুখ স্বাভাবিক। মাইরা যে দু’টো কথা ভাবলো একটাও মিললো না। এই লোক হাসেও নি। অন্যদিকে তাকায়ও নি। মাইরা আবারও চোখ নামিয়ে নেয়।

প্রণয়ের অমল কাব্য পর্ব ৪২ (২)