প্রণয়ের ঘোর রাত পর্ব ১২ (২)
আরাফাত আদনান সামি
মায়া কৌশিকের কথা শুনে বেশ লজ্জা পেয়ে গেল। কেনই বা পাবে না? নিজের কল্পনার পুরুষের মুখ থেকে এইভাবে নিজের প্রশংসা শুনে লজ্জা পাওয়ারি কথা। লজ্জায় মাথাটা নিচু করে কাঁপা কাঁপা স্বরে বলল,
“কৌ..কৌশিক ভা..ভাই আ..আপনিও না…।”
কৌশিক মায়ার দিকে তাকিয়ে বলল,
“কী, আমিও না?”
মায়া লজ্জায় জরানো স্বরে বলল,
“ইশ্ কৌশিক ভাই, আমার সরম করছে তো।”
কৌশিক মায়ার কথা শুনে এক হাত মায়ার থুতনিতে দিয়ে মায়ার মুখটা উচু করে চোখে চোখ রেখে বলল,
“জান, সত্যিই তোকে আজ ভীষণ সুন্দর লাগছে।”
মায়া ভ্রকুচকে বলল,
“অন্য দিন বুঝি লাগে না?”
“অন্য দিন তো তুই থ্রিপিস পড়ে থাকিস, কিন্তু আজ তুই শাড়িতে। কথায় আছে, শাড়িতেই নারী। আজ তার প্রমাণ পেলাম। আজ শাড়ি পড়েছিস, তাই তোকে অন্য রকম লাগছে। এক অন্য রকম ফিল হচ্ছে আমার। আমার এমন মনে হচ্ছে যেন আমি আমার সদ্য বিয়ে করা বউয়ের সামনে দাঁড়িয়ে আছি, যে কিনা নিজের স্বামীর জন্য টুকটুকে লাল শাড়ি পরে তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে।”
কথাটা বলেই কৌশিক থামে, তারপর আবার বলল,
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
“নিজেকে একবার আয়নায় দেখেছিস? লাল শাড়ীতে তোকে কী সুন্দরী লাগছে?এমনে যে আমার সামনে লাল আগুন সুন্দরী হয়ে আসলি, এখন যদি আমি তোর ওই আগুনে পুরে ছা…”
কৌশিক পুরো কথাটা শেষ করার আগেই মায়া তার আঙুল কৌশিকের ঠোঁটের উপর রেখে দিয়ে বলল,
“কীসব বলছেন আপনি। আমার এই রূপ, আমার সাজ যদি আপনার ধ্বংসের কারণ হয়, তাহলে এই রকম রূপ, এই রকম সাজ আমার চাই না। এইরকম কিছু ঘটার আগে আমি এগুলোকে আমি আগুনে পুরে ছাড়খাড় করে দেব।”
মায়ার কথাটা শুনে কৌশিক ভ্রকুচকে বলল,
“জান, পুরো ফিল্মি ডায়লগ ছিল। কিন্তু ডায়লগটা এক কথায় জোস ছিল। কোন মুভি দেখে শিখলি জান?”
মায়া কৌশিকের কথা শুনে মুহুর্তের মধ্যেই রাগে গদগদ করে ফুলে উঠল। রাগে ভরসা দু’গাল লাল হয়ে গেল। পরক্ষণেই দু’হাত উঠিয়ে কৌশিকের বুক বরাবর পাঞ্চ মারতে লাগল। মারতে মারতে রাগান্বিত স্বরে বলল,
“ফিল্মি ডায়লগ ছিল তাই না?”
“উফ্ জান, লাগছে তো।”
“ফিল্মি ডায়লগ ছিলো?”
“না.. না, জান কে বলেছে ফিল্মি ডায়লগ ছিল? এটা একদম খাঁটি বাঙালির মুখ থেকে বেরোনো খাঁটি সদ্য নতুন ডায়লগ ছিল।”
“মজা করা হচ্ছে আমাকে নিয়ে তাই’না? দেখাচ্ছি মজা।”
কথাটা বলেই মায়া আরো জোরে জোরে পাঞ্চ মারতে লাগল কৌশিকের বুকে। কৌশিক এবার নিজের বুকে হালকা ব্যথা অনুভব করল।
“উফ্ জান, থাম, এবার লাগছে তো।”
“অসভ্য নীর চৌধুরী।”
“চুপ, বেয়াদব। বেশি বড় হয়ে গেছিস তাই না? আরে বোকা, ওটা কথার কথা বলছি।”
একটু থেমে আবার বলল,
“তোকে কী ভীষণ সুন্দরী লাগছে রে জান।”
মায়া ভ্রকুচকে বলল,
“হইছে হইছে, নজরটা সরান এবার।”
“তোর উপর থেকে চোখটা সরাতেই পারছি না। আর কীভাবে বা সরাবো? একদম আমার কল্পনার লাল পরির মতো লাগছে যে তোকে।”
কৌশিকের কথাটা শুনা মাত্রই মায়া মৃদু করে কৌশিকের বুকে আবার পাঞ্চ মেরে বলল,
“আপনার কল্পনার লাল পরির মতো মানে? সত্যি করে বলেন, ওই মেয়েটা কে না হলে এখনি আপনাকে মেরে নদীতে ভাসিয়ে দেব। কী হলো, বলেন না কেনো ওই মেয়েটা কে?”
“আরে আরে, ওইটাও তুই’ই, যাকে আমি বহু বছর আগে আমার কল্পনায় লাল পরি সাজিয়ে আমার কল্পনার রাজ্যে রাণি করে রেখেছি।”
কৌশিকের কথা শুনে মায়ার মুখে মুহুর্তের মধ্যেই হাসি ফুটে উঠল।
“সত্যি বলছেন?”
“হ্যাঁ রে জান, সত্যি।”
মায়া কৌশিকের কথাটা শুনে খুশি হলেও মুহুর্তের মধ্যে কড়া স্বরে বলে উঠল,
“এই, এই কী বললেন আমাকে? নিজের কল্পনায় আমাকে সাজিয়েছেন, মানে? সত্যি করে বলেন, কল্পনায় আমার সাথে আর কী কী করেছেন, না হলে…”
মায়ার কথাটা শুনে কৌশিক আনমনে আকাশের দিকে তাকিয়ে মনে মনে বিড়বিড় করে বলল,
“শাড়ি পড়া থেকে খুলা, ধরা থেকে করা, খাওয়া থেকে ঘুম… আরও অনেক কিছু করেছি জান, অনেক কিছু।”
কৌশিককে আকাশের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করতে দেখে মায়া আড়চোখে কৌশিকের দিকে তাকিয়ে বলল,
“আপনি আকাশের দিকে তাকিয়ে মনে মনে কী বিড়বিড় করছেন, শুনি?”
“কিছু না।”
“আমার কথার উত্তর দেন না কেনো?”
মায়ার কথাটা ঘুরানোর জন্য কৌশিক বলল,
“আকাশটাই দেখছিলাম, সন্ধ্যা হয়ে যাচ্ছে, তো মেলায় যাবি না?”
মায়া আকাশের চারিপাশে একনজর তাকিয়ে অবাক হয়ে বলল,
“ওহ্ হ্যাঁ, চলেন চলেন। কিন্তু যাবো কী করে, মোড় থেকে একটা রিকশা নিয়ে আসতে পারলেন না?”
“রিকশা লাগবে কেনো? আমার বাইক আছে, কী করতে, শুনি?”
বলেই কৌশিক মায়াকে ছেড়ে পাশ থেকে বাইকে নিয়ে মায়ার সামনে এসে বলল,
“পিছনে উঠে বস।”
মায়া কোন কথা না বাড়িয়ে বাইকের পিছনে উঠে কৌশিকের কাধ শক্ত ধরে বসে বসল। বাইক চলাকালীন তারা আর কোনো কথা বলল না। হঠাৎ কৌশিক যেই রাইড নিল, এমনি মায়া ভয়ে কৌশিককে জরিয়ে ধরে বলল,
“কৌশিক ভাই, একটু আস্তে চালান, আমার ভীষণ ভয় করছে।”
কৌশিক একটু মুচকি হেঁসে বলল,
“ঠিক আছে।”
এইভাবে বেশ অনেকক্ষণ কেটে গেল। সন্ধ্যা নেমে এল। সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে অবশেষে তারা মেলার সামনে এসে পৌঁছাল। কৌশিক বাইকটা থামাতেই মায়া বাইক থেকে নেমে পড়ল। মায়া বাইক থেকে নামতেই কৌশিক মেলার পাশে গেরেজে গিয়ে বাইকটা রেখে এল। সাথে মায়াও ছিল। কী জেনো একটা মনে পড়তেই কৌশিক বলল,
“মেলায় নিয়ে এসেছি, এখন দে..”
মায়া ভ্রকুচকে বলল,
“কী দিব?”
“কী দিবি, মানে? তুই না বলেছিলি মেলায় নিয়ে আসলে আমাকে কিস দিবি?”
“হ্যাঁ, বলেছিলাম।”
“তাহলে দে।”
“কিন্তু আমি কী একবারও বলেছি যে মেলায় নিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে দিব?”
“দেখ, মায়া, এটা কিন্তু ঠিক না। এখন এইসব বললে চলবে না, দে কিস বলছি..”
“আমি কী একবারও বলেছি, দিব না? দিব, তবে মেলা থেকে ফেরার সময়।”
“সত্যি তো?”
মায়া ভ্রকুচকে বলল,
“হ্যাঁ, সত্যি।”
বলেই মায়া মেলার বড় গেটের সামনে এসে খুশিতে লাফিয়ে উঠল। যেই ঢুকতে যাবে, ওমনি একজন সিকিউরিটি গার্ড বলল,
“ম্যাম, টিকেট।”
“কিসের টিকেট?”
ওমনি কৌশিক এসে হাজির হল। সিকিউরিটি গার্ডের হাতে দুইটা টিকিট ধরিয়ে দিয়ে বলল,
“এই যে নিন, আপনার টিকিট।”
সিকিউরিটি গার্ড টিকেট দুইটা দেখে বলল,
“ঠিক আছে, এবার আপনারা প্রবেশ করতে পারেন।”
বলেই কৌশিক মায়ার এক হাত ধরে মেলার ভেতরে প্রবেশ করল। মায়া বেশ অবাক হয়ে বলল,
“আপনি না, আমার সাথে ছিলেন, তাহলে টিকেট কখন আনলেন? আর আপনি কীভাবে জানলেন ভিতরে প্রবেশ করতে টিকেট লাগে?”
“উপরে সাইনবোর্ড’এই তো, সব লেখা আছে। বাইক রেখে আসার সময় উপরে তাকাতেই দেখলাম, পরে তারাতাড়ি টিকেট কাউন্টারে গিয়ে টিকেট নিয়ে আসলাম।”
“বাহ্’বাহ্, খুব ফাস্ট দেখছি আপনি, আমি বুঝতেই পারলাম না।”
কৌশিক ভ্রকুচকে বলল,
“কত কথা বলিস তুই, হ্যাঁ? কথাই বলবি নাকি মেলা ঘুরে দেখবি?”
মায়া মুচকি হেঁসে বলল,
“হ্যাঁ, চলেন।”
বলেই তারা প্রায় ঘন্টা খানিক লাগিয়ে পুরো মেলাটা এদিক ওদিক ঘুরে দেখতে লাগল। সাথে মায়া একের পর এক আচার, আইসক্রিম, হাওয়াই মিঠাই, ফুসকা, ঝালমুড়ি, যেতে যেতে সেখানে যেটা চোখে পড়ছে, সেখানেই সেটা কিনে খেতে লাগল। আর এগুলো সব কৌশিক চুপচাপ দেখতে লাগল। মায়া একের পর এক আইটেম কিনে খাচ্ছে, আর বেচারা কৌশিক বার বার পকেট থেকে নোট বের করে দোকানদারদের দিচ্ছে।
কৌশিক অবাক হয়ে বলল,
“তুই এত খাবার খাচ্ছিস কেমন করে?”
মায়া আইসক্রিম খেতে খেতে কৌশিকের দিকে তাকিয়ে বলল,
“কই, এত খাবার খাচ্ছি?”
“তাই তো? কে এত খাচ্ছে? আমার চোখেই সমস্যা।”
“হো, বাসায় গিয়ে আগে চোখের ডাক্তার দেখান।”
বলেই মায়া আইসক্রিম খেতে লাগল। তখন কৌশিকের নজর পড়ল একটা বড় দোকানের দিকে। কৌশিক একটু এগিয়ে গিয়ে কিছুক্ষণ দোকানের এদিক ওদিক তাকিয়ে কী যেন একটা দাম দর করে কিনে সোজা চলে আসল মায়ার দিকে। মায়া এখনো আইসক্রিম খাচ্ছে। প্রায় শেষের দিকে।
এমন সময় মায়া বলল,
“চলেন না, কৌশিক ভাই, ওইদিকটায় যাই।”
কৌশিক মুচকি হেঁসে নরম স্বরে বলল,
“চল।”
বলেই তারা যেতে লাগল। যেতে যেতে কৌশিক ভ্রকুচকে বলল,
“আরও কিছু খাওয়ার বাকি আছে কি? বাকি থাকলে ওটাও খেয়ে নে।”
কৌশিকের কথা শুনে মায়া একটা দোকানের দিকে আঙুল তুলে ইশারা করে বলল,
“ওই যে, ওই দোকানটা দেখতে পাচ্ছেন?”
“কোনটা?”
“আমার আঙুল বরাবর তাকান, দেখতে পাচ্ছেন?”
“হ্যাঁ।”
“তাহলে দাঁড়িয়ে আছেন কেন? মেলায় আসছি, আর গুড়ের জিলাপি খাবো না? গুড়ের জিলাপি ছাড়া মেলা জমে? তারাতাড়ি ওই দোকান থেকে গুড়ের জিলাপি নিয়ে আসেন যান।”
কৌশিক মায়ার দিকে আড়চোখে তাকিয়ে বলল,
“আর কত খাবি তুই?”
“আপনিই না বললেন, যা খাওয়ার বাকি খেয়ে নিতে। তারাতাড়ি যান, আমি এই সামনের ফাকা জায়গাটায় গিয়ে বসছি।”
“হ্যাঁ হ্যাঁ, যাচ্ছি যাচ্ছি।”
বলেই কৌশিক যেতে লাগল। যেতে যেতে দাঁতে দাঁত পিষে একটু জোরে জোরেই বলল,
“এ তো বিয়ের আগেই আমাকে ফকির করে দিচ্ছে, বিয়ের পরে না কী করে, আল্লাহ’ই জানে, রাক্ষসী মেয়ে একটা।”
মেলায় মানুষের কোলাহলের জন্য মায়া কৌশিককে বলা কথা মধ্যে কিছুই শুনতে পেল না। তাই কৌশিক চলে যেতেই মায়া সেই ফাঁকা স্থানে গিয়ে গাছের নিচে বেঞ্চে বসে পড়ল। একটু পরেই কৌশিক গুড়ের জিলাপি নিয়ে মায়ার সামনে হাজির হলো। কৌশিক মায়ার পাশে বসে জিলাপির থলে টা মায়ার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল,
“নে, ধর।”
মায়া গুড়ের জিলাপির থলেটা দেখে লোভ সামলাতে না পেরে কৌশিকের হাত থেকে থলেটা ছিনিয়ে নিল। তারপর নখ দিয়ে থলেটার ওপরের অংশ ছিঁড়ে ফেলল। থলেটা খোলার সঙ্গে সঙ্গেই লালচে রসালো গুড়ের জিলাপিগুলো চোখে পড়তেই সে আর নিজেকে থামাতে পারল না। একের পর এক হাতে তুলে মুখে পুরে খেতে শুরু করল। মায়ার এই কাণ্ড দেখে কৌশিক গালে এক হাত রেখে অবাক চোখে ড্যাবড্যাব করে তার দিকে তাকিয়ে রইল। কৌশিক আসলে জিলাপি তেমন পছন্দ করে না, কিন্তু মায়াকে এভাবে লাল গুড়ের রসে ভেজা জিলাপি খেতে দেখে তার মুখেও যেন পানি এসে গেল। মায়ার খাওয়া দেখতে দেখতে কৌশিকও অজান্তেই বারবার শিকনো ডোক গিলতে লাগল, জিহ্বা দিয়ে নিজের ঠোঁট ভিজিয়ে নিচ্ছিল বারবার।
আরেকবার ডোক গিলে নিয়ে মনে মনে বিড়বিড় করে বলল,
“দেখো দেখো, রাক্ষসী রাণী কীভাবে তার রাজাকে বাদ দিয়ে একা একা লাল রসে ভেজা জিলাপি কটমটিয়ে খাচ্ছে! হ্যাঁ, মানছি আমি জিলাপি পছন্দ করি না, কিন্তু তাই বলে কি একটু স্বাদবেও না? অন্তত মানবতার খাতিরে, লোক দেখানোর জন্য হলেও কি জিজ্ঞেস করতে পারত না ‘কৌশিক ভাই, আপনি খাবেন?’ এতগুলো জিলাপির মাঝে একটা খণ্ড নিজে থেকে দিলে কী বা এমন ক্ষতি হতো?”
মায়া এখনো জিলাপি খাওয়ায় পুরোপুরি মগ্ন। কৌশিকের চোখ একবার মায়ার হাতে, একবার সেই হাতের সাথে মুখে উঠা জিলাপির দিকে ঘুরে ঘুরে বারবার উঠানামা করছে। মায়ার হাতের তাল মিলিয়ে তার চোখও যেন তাল মিলিয়ে নাচছে। হঠাৎই খেতে খেতে মায়ার নজরে পড়ল কৌশিক আড়চোখে ড্যাবড্যাব করে তার দিকে তাকিয়ে আছে তারদিকে চোখে মুখে অদ্ভুত এক ছটফটানি। কৌশিকের এমন অবস্থা দেখে মায়া মুখে জিলাপি পুরে খেতে খেতে বলল,
“আমার দিকে এমন করে তাকিয়ে আছেন কেন?”
হঠাৎ মায়ার বলা কথাটা কানে আসতেই কৌশিক হালকা করে চমকে উঠল। মুখে একটু অপ্রস্তুত ভাব নিয়ে আমতা আমতা করে বলল,
“ক…কই? কই না তো!”
মায়া ব্যাপারটা বুঝতে পেরে হালকা মুচকি হেসে শিশুসুলভ স্বরে বলল,
“মুখে পানি চলে এসেছে বুঝি…?”
কৌশিক সঙ্গে সঙ্গে আমতা আমতা করে বলল,
“ক…ক…কী সব বলছিস?”
“ওলেলেল…”
বলে মায়া কৌতুক করে আরেকটা জিলাপির টুকরো হাতে নিয়ে তার ঠোঁটের সামনে ধরল। তারপর জিভ দিয়ে পুরো ঠোঁটটা আস্তে আস্তে চেটে নিয়ে বলল,
“উম্’ম্’ম্… কী মজা! রসে ভরা গুড়ের জিলাপি খেতে কী যে মজা… উম্’ম্’ম্…”
কৌশিক এবার আর নিজের লোভ সামলাতে পারল না। হাত বাড়িয়ে মায়ার হাত থেকে জিলাপির টুকরোটা নিতে যাবার মুহূর্তেই মায়া দ্রুত সেটা মুখে পুরে দিয়ে আড়চোখে মুচকি হেসে বলল,
“হে-হে… কৌশিক ভাইয়াআআ… আমি তো জানতাম আপনি বলে জিলাপি খান না, তাই না?”
কৌশিক হাতটা নিচু করে ভ্রু কুঁচকে গম্ভীর গলায় বলল,
“খাই বা না খাই সেটা আলাদা বিষয়, কিন্তু তাই বলে তুই একবারও জিজ্ঞেস করবি না, আমি খাবো কি না?”
মায়া হালকা ভেংচি কেটে হাসতে হাসতে বলল,
“সোজা সাপটা বলেন না, আপনার লাল লাল রসে ডোবানো গুড়ের জিলাপিগুলোই চান।”
কৌশিক আর নিজেকে দমিয়ে রাখতে পারল না। ঝড়ের বেগে বলে উঠল,
“সেটা আর বলতে! তুই যেভাবে খাচ্ছিস, তোর খাওয়া দেখে আমার মুখে সমুদ্রের ঝড় বইছে।”
কথাটা বলে কৌশিক যখনই জিলাপির থলিতে হাত বাড়াতে গেল, তখনই মায়া সেটা সরিয়ে নিয়ে দুষ্টুমি ভরা চোখে বলল,
“না না না কৌশিক ভাই, আমি তো দেব না এইগুলো। এগুলো শুধু আমার জন্য। আপনি চাইলে নিজেরটা কিনে নিন।”
কৌশিক ভ্রু কুঁচকে মুখ বাঁকিয়ে বলল,
“মেলায় আসার পর থেকে তুই যে হাড়ে হাড়ে একটার পর একটা খাবার খাচ্ছিস…”
মায়া নির্ভীক স্বরে উত্তর দিল,
“হ্যাঁ তো? খাচ্ছি তো খাচ্ছি, তাতে কী?”
কৌশিক দীর্ঘশ্বাস ফেলে অসহায়ের মতো বলল,
“একটা ৫ টাকার কয়েনও অবশিষ্ট নেই আমার কাছে এখন।”
কৌশিকের কথা শুনে মায়ার ভ্রু সঙ্গে সঙ্গেই কুঁচকে উঠল। কেনই বা উঠবে না?গুড়ের জিলাপি তার ভীষণ পছন্দের খাবার, আর সেই জায়গা থেকে ভাগ করে দেওয়া তার কাছে একেবারেই বিলাসিতা। মায়া দ্রুত জিলাপির থলেটা শাড়ির আচলের নিচে রেখে কৌশিকের দিকে তাকিয়ে বলল,
“আমি কিছু জানি না, আমি আমার জিলাপির ভাগ কাউকে দেব না।”
কৌশিক মুখটা একটু গোমড়া করে বলল,
“এখানে তো অনেকগুলো আছে। একটা দিলে কী এমন ক্ষতি হবে? আমিও একটু দেখে নিই, গুড়ের জিলাপি খেতে কেমন লাগে।”
মায়া ঠোঁট ফুলিয়ে উত্তর দিল,
“না না না! একদমই বাজে খেতে হয় এই গুড়ের জিলাপি। আপনার খাওয়ার দরকার নেই।”
কৌশিক হাল না ছেড়ে অনুনয়ের সুরে বলল,
“আচ্ছা যাই হোক, একটা দে না।”
“না না! আমি দিব না।”
“একটা… প্লিজ।”
মায়া একটু ভেবে বলল,
“ঠিক আছে, দেব… তবে একটা শর্তে।”
“বল।”
“একটাই দেব, কিন্তু পরে আর চাইতে পারবেন না,এই বলে দিলাম কিন্তু।”
কৌশিক কিছুক্ষণ চুপ থেকে মুচকি হেসে বলল,
“ঠিক আছে, চাইবো না আর।”
কৌশিকের কথাটা শোনার পর মায়া শাড়ির আচলের নিচ থেকে থলেটা বের করে আনল। সেখান থেকে একটিমাত্র জিলাপির টুকরো তুলে কৌশিকের হাতে দিল।
এটা দেখে কৌশিক একটু বিরক্ত গলায় বলল,
“একটা চাইছি বলে একটাই দিলি?”
মায়া সঙ্গে সঙ্গেই ভ্রু কুঁচকে বলল,
“দেন দেন, আপনার খাওয়ারি দরকার নেই।”
কৌশিক একটু হাসির ভান ধরে মাথা নাড়িয়ে বলল,
“না না থাক, একটাই যথেষ্ট।”
বলেই কৌশিক জিলাপির টুকরোটা হাতে নিয়ে একটু এদিক-ওদিক ঘুরিয়ে দেখল। তারপর এক কামড় বসাতেই তার পুরো শরীর যেন শিউরে উঠল। টুকরোটা চিবোতে চিবোতে চোখ বন্ধ করে অনুভূতিতে ভেসে গিয়ে বলল,
“উম্’ম্… জান, তুই খেতে কী মজার!”
কৌশিকের কথা শুনে মায়া জিলাপি খাওয়া থামিয়ে হালকা করে তার হাতে একটা আলতো চাঁটি মেরে বলল,
“কী বললেন?”
“না মানে… জিলাপি খেতে কী মজার।”
“ওহ্, তাহলে সেটা বলেন।”
কৌশিক এবার হাসতে হাসতে বলল,
“বিশ্বাস কর, এর আগে আমি কখনো এত মজার জিলাপি খাইনি। ছোটবেলায় একবার আমতা-আমতা করে খেয়েছিলাম, ভালো লাগেনি। এরপর থেকে আজ পর্যন্ত জিলাপির নামটাই মুখে আনিনি। কিন্তু আজ খেয়ে মনে হচ্ছে যেন আমি কোনো অমৃত খাচ্ছি। ইশ্… কী মজা! ছোট থেকে এত মজার খাবারটা মিস করে আসছি। তুই ঠিকই বলেছিলি,রসে ভরা লাল লাল গুড়ের জিলাপি ছাড়া মেলা জমেই না। দাঁড়া, আমি আরো জিলাপি নিয়ে আসি।”
মায়া ভ্রু কুঁচকে বলল,
“কিন্তু আপনার তো টাকা নাই বলেছিলেন?”
“ওটা তো আমি এমনিই বলেছিলাম।”
মায়া ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,
“মিথ্যুক একটা।”
“তুই যা মন চায় বল, আমি এখনই গিয়ে আগে জিলাপি নিয়ে আসি।”
কথাটা বলে কৌশিক যেই উঠতে যাবে, ওমনি মায়া তাড়াতাড়ি বলল,
“জিলাপি আনতে হবে না, এখানেই অনেক আছে।”
“ওটা না বললে তোর লাগবে?”
“ওটা আমি এমনিই মজা করেই বলেছি। আর যতই পছন্দের হোক, এতগুলো জিলাপি একা তো আর খেতে পারব না, তাই না?”
“হ্যাঁ, তা তো ঠিক।”
মায়া পাশ থেকে জিলাপির থলেটা মাঝখানে রেখে বলল,
“চলেন কৌশিক ভাই, খাওয়া শুরু করি।”
এই বলে দু’জন আর কোনো কথা না বলে মন দিয়ে জিলাপি খেতে শুরু করল। এভাবে বেশ কিছুক্ষণ কেটে গেল। অবশেষে অনেক আনন্দ আর হাসি-খুশির সঙ্গে জিলাপিগুলো খেয়ে শেষ করল তারা।
খাওয়া শেষ হতেই মায়া বলল,
“কৌশিক ভাই…”
“কী?”
“আপনার কাছে রুমাল আছে কি?”
“না, কেন?”
“কেন দেখতে পারছেন না? হাতে-মুখে জিলাপির রস লেগে আছে।”
“অন্ধকার রে জান, ঠিকমতো দেখতে পারছি না। আরেকটু কাছে আয়, কই দেখি।”
কৌশিকের কথা অনুযায়ী মায়া আরেকটু কাছে গেল। মিষ্টি গলায় বলল,
“এই যে, দেখেন।”
“কই, দেখতে পাচ্ছি না তো… আরেকটু কাছে আয়।”
মায়া আরেকটু কাছে যেতেই কৌশিক মায়ার কাধে হাত রেখে মায়াকে সাথে সাথে তার হাঁটুতে শুইয়ে দিল। মায়া যেই কিছু বলতে যাবে ওমনি কৌশিক মায়ার ঠোঁট জোরা নিজের আয়ত্তে নিয়ে নিল। মায়া নিজেকে ছাড়ানোর আপ্রাণ চেষ্টা করতে লাগল কিন্তু পারল না। জায়গাটা মেলা থেকে একটু পিছন সাইটে ছিল তাই কেউ দেখতেও পেল না। প্রায় ১০ মিনিট পর কৌশিক মায়ার ঠোট ছেড়ে দিল। মায়া ছাড়া পেতেই জোরে জোরে নিশ্বাস নিতে লাগল।মায়ার কাছে সব কিছু যেন কল্পনার মত হয়ে গেল। কারণ সব কিছু বুঝে উঠার আগেই কৌশিক এর দখলে চলে গেছিল। মায়া ভারি ভারি নিশ্বাস ফেলতে দেখে কৌশিক আঙুল দিয়ে নিজের ঠোঁট জোরা মুছে মায়ার দিকে হালকা ঝুকে মুচকি হেসে বলল,
“যাক বাবা জিলাপির আসল মজা এইবার পেলাম তাহলে। থ্যাংকইউ,আমার মায়াবতী। আমাকে এমন মিষ্টি রসালো জিলাপির স্বাধ টেস্ট করানোর জন্য।”
কথাটা বলেই কৌশিক বেঞ্চ থেকে উঠে দাঁড়িয়ে মুচকি হেসে বলল,
“তুই এখানেই বস, আমি পানি নিয়ে আসছি।”
এই বলে কৌশিক চলে গেল। মায়া তখনও নিশ্চুপ। কোনো কথা বলছে না, শুধু স্থির হয়ে বসে আছে। প্রায় দুই মিনিটের মধ্যেই কৌশিক হাতে পানির বোতল নিয়ে ফিরে এল। মায়ার মনমরা মুখটা দেখে কৌশিক হাঁটু গেড়ে তার সামনে বসল।
“কী হয়েছে? মন খারাপ?”
মায়া মুখটা একটু তুলতেই কৌশিক বিস্মিত গলায় বলল,
“এ কী মায়া, তুই কাঁদছিস কেন?”
সে বোতলটা বেঞ্চে রেখে আলতো করে মায়ার চোখের পানি মুছিয়ে দিয়ে আবার বলল,
“কী হলো? কিছু বল, কাঁদছিস কেন?”
হঠাৎ মায়া কোনো কথা না বলে কৌশিককে চমকে দিয়ে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়ল। কৌশিকও তাকে শক্ত করে বুকে টেনে নিল।
“কী হয়েছে মায়া? কিছু বল।”
মায়া ধীরে ধীরে কান্না থামিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“এইভাবে আর কতদিন, কৌশিক ভাই?”
কৌশিক বিস্মিত হয়ে বলল,
“কী কতদিন?”
“এইভাবে প্রতিনিয়ত আমি হারাম ভাবে আপনার কাছাকাছি আসতে চাই না। আমি চাই আপনি আমাকে সম্পূর্ণ অধিকারের সাথে, হালাল উপায়ে আপন করে নিন।”
“এখন আমাকে কী করতে হবে সেটা বল..”
“শুনেন না কৌশিক ভাই।”
“হ্যাঁ আমি শুনছি তো,বলনা আমার মায়াবতী।”
প্রণয়ের ঘোর রাত পর্ব ১২
“বললে রাগ করবেন না তো?”
“না করবো না, বল..”
“সত্যিই বলবো?”
“হ্যাঁ বল।”
মায়া কান্না থামিয়ে কৌশিককে আরো শক্ত করে চেপে ধরে কিছুটা লাজুক স্বরে বলল,
“চলেন না কৌশিক ভাই আমরা বিয়ে করে ফেলি। পরে না হয় সম্পূর্ণ অধিকারের সাথে আমাকে ভালোবাসবেন।”
