প্রণয়ের ঘোর রাত পর্ব ৪১
আরাফাত আদনান সামি
ওয়াশরুমের ভারী দরজার ওপাশ থেকে যখন খিল আটকে দেওয়ার খটখট শব্দটা রাজকীয় ঘরের নীরবতা ভেঙে দিল, কৌশিক তখনো বিছানায় আধবসা অবস্থায় স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল। ওর ঠোঁটের কোণে লেগে থাকা সেই বাঁকা, নেশাতুর হাসিটা আরও কিছুটা চওড়া হলো। ও নিজের চওড়া, উন্মুক্ত বুকের ওপর দুই হাত ভাঁজ করে খাটের রাজকীয় ব্যাকরেস্টে পিঠ ঠেকাল। জানালার সিল্কের পর্দা ভেদ করে সকালের সোনালী রোদ এখন সরাসরি ওর নিখুঁত সুগঠিত শরীরের ওপর এসে পড়েছে। ওর পিঠে আর বুকে মায়ার নখের সেই লালচে আঁচড়গুলো রোদের আলোয় যেন এক একটি যুদ্ধজয়ের পদকের মতো জ্বলজ্বল করছে।
কৌশিক একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে খাটের পাশে রাখা সাইড টেবিল থেকে সিগারেটের প্যাকেট আর লাইটারটা তুলে নিল। একটা সিগারেট ঠোঁটে চেপে লাইটারটা জ্বালাতেই হালকা একটা ‘ক্লিক’ শব্দ হলো। ও এক টান দিয়ে ধোঁয়াটা ঘরের সিলিংয়ের দিকে উড়িয়ে দিল। ধোঁয়ার কুন্ডলীর মাঝেই ও ওয়াশরুমের দরজার দিকে তাকিয়ে নিচু, গম্ভীর গলায় বলল,
“ভেতরে গিয়ে দরজা লক করলেই কি কৌশিক নীর চৌধুরীর হাত থেকে রেহাই পাওয়া যায়, সুইটহার্ট? তুই ভালো করেই জানিস, এই ঘরের চাবি, এই ভিলার প্রতিটা ইটের নিয়ন্ত্রণ আর তোর এই ছোট্ট দেহের ভেতরের হৃদয়ের প্রতিটা ধড়কনের মালিকানা কার কাছে।”
ওয়াশরুমের ভেতর তখন মায়া বাথটাবের পাশে দেওয়া বড় আয়নাটার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের দিকে তাকিয়ে লজ্জায় আর অপমানে চোখ বন্ধ করে ফেলেছিল। ওর পরনে তখনো সেই সাদা সুতির পাতলা চাদরটা জড়ানো, যা ও খাট থেকে প্রায় এক দৌড়ে টেনে নিয়ে এসেছে। আয়নায় নিজের প্রতিচ্ছবি দেখেই মায়ার ফর্সা কপালে ছোট ছোট ভাঁজ পড়ে গেল। ওর গলার নিচে, সুডৌল চিবুকের ঠিক পাশে এবং বুকের উন্মুক্ত উপত্যকার প্রতিটা ভাঁজে কৌশিকের দেওয়া সেই বুনো, কামুক ভালোবাসার গাঢ় বেগুনি আর লালচে দাগগুলো স্পষ্ট হয়ে ফুটে আছে। মায়া নিজের কাঁপতে থাকা আঙুল দিয়ে একটা দাগের ওপর স্পর্শ করতেই ওর পুরো শরীর আবার সেই রাতের তীব্র শিহরণে কেঁপে উঠল। ও নিচু গলায় ফিসফিসিয়ে নিজেকেই নিজে গাল দিল,
“অসভ্য! একটা আস্ত জানোয়ার! লোকটার শরীরে কি কোনো দয়ামায়া নেই? একটা মানুষ কীভাবে এতটা বেসামাল হতে পারে? কাল রাতের পর আজ আমি সবার সামনে মুখ দেখাব কীভাবে? ভুল বসত এই দাগ গুলো যদি কেউ দেখে ফেলে তখন? লোকটার মাথার মধ্যে কী একটুও বুদ্ধি নেই?”
কথাটা বলে মায়া কুসুম গরম জলের শাওয়ারটা ছেড়ে দিল। জলের ধারা ওর মাথার ওপর পড়তেই ওর সারা শরীরের সেই কামনার চড়া ক্লান্তি আর তলপেটের হালকা মিষ্টি ব্যথাটা যেন একটু উবে যেতে লাগল। কিন্তু ও মনে মনে জানে, এই ওয়াশরুমের দেয়াল ওকে বেশিক্ষণ আড়াল করে রাখতে পারবে না। বাইরে ওই বহুরূপী ইচ্ছাধারী কালনাগটা ওত পেতে বসে আছে, যে যেকোনো মুহূর্তে আবার ওকে নিজের বিষাক্ত অথচ মধুর ছোবলে নীল করে দিতে পারে। এদিকে কৌশিক সিগারেটটা শেষ করে অ্যাশট্রেতে গুঁজে রাখল। ও খাট থেকে নেমে আলতো পায়ে ওয়াশরুমের দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। ভেতরের জলের ঝরঝর শব্দ আর মায়ার হালকা নিশ্বাসের আওয়াজও ও স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছিল। আন্ডারওয়ার্ল্ডের মোস্ট ওয়ান্টেড, নিষ্ঠুর মাফিয়া ডন আজ নিজের শোবার ঘরের বাথরুমের দরজার সামনে একটা সাধারণ, তৃষ্ণার্ত প্রেমিকের মতো দাঁড়িয়ে মুচকি হাসছে এই দৃশ্য যদি বাইরে ওর কোনো শার্পশুটার বা শত্রু দেখত, তবে তারা নির্ঘাত হার্ট অ্যাটাক করত। কৌশিক দরজায় হালকা করে দুই আঙুলের টোকা দিল।
“মায়া? আধ ঘণ্টা পার হতে চলল। ভেতরের জল কি আমার চেয়েও বেশি আদর দিচ্ছে তোকে, যে বের হওয়ার নামই নিচ্ছিস না?”
ভেতর থেকে জলের শব্দের মাঝেই মায়ার রাগী কণ্ঠস্বর ভেসে এল,
“আপনি ওখান থেকে সরুন বলছি! আমি যতক্ষণ ইচ্ছে ভেতরে থাকব। আপনার মতো একটা অসভ্য লোকের মুখ আমি আজ সারা দিনেও দেখতে চাই না। নিচে যান আপনি!”
“নিচে যাব? একা একা?”
কৌশিক একটু ঝুঁকে দরজার হাতলে হাত রাখল।
“আমি যদি নিচে যাই, তবে সবাইকে গিয়ে কী বলব জানিস? বলব যে, আমার ছোট্ট বউটা কাল রাতে মিস্টার চৌধুরীর ভালোবাসার চোট এত বেশি খেয়েছে যে ও আজ বিছানা থেকে ওঠার ক্ষমতাই হারিয়ে ফেলেছে। এটা বললে ভালো হবে তাই না হার্টবিট?”
“কৌশিক…!”
মায়া ভেতর থেকে প্রায় চিৎকার করে উঠল, কিন্তু ওর গলার সেই চিৎকারে রাগের চেয়ে লজ্জার ভাগটাই বেশি ছিল।
“আপনি একটা জঘন্য লোক। আপনার মুখে কি কোনোদিন ভালো কথা আসবে না?”
“ভালো কথা শোনার জন্য তোকে বাইরে আসতে হবে। আর হ্যাঁ, তোকে একটা কথা মনে করিয়ে দিই সুইটহার্ট। এই ওয়াশরুমের ডুপ্লিকেট চাবিটা কিন্তু আমার ড্রয়ারের ঠিক ডান পাশের লকারেই থাকে। আমি যদি তিন গোনার মধ্যে লক খোলার শব্দ না শুনি, তবে আমি নিজে চাবি দিয়ে ঢুকে তোকে এই চাদর সুদ্ধু তুলে এনে আবার এই বিছানায় আছাড় মারব। তখন কিন্তু দুপুর আর রাতের সিনটা সকালেই রিপিট হবে।”
কৌশিকের এই চূড়ান্ত হুকুমদারি আর ফ্লার্ট মেশানো হুমকি শুনে মায়ার কলিজা যেন শুকিয়ে গেল। ও ভালো করেই জানে, কৌশিক নীর চৌধুরী যা বলে, তা করার ক্ষমতা এবং জেদ দুটোই ওর আছে। মায়া তড়িঘড়ি করে শাওয়ার বন্ধ করল। ও একটা শুকনো টাওয়াল দিয়ে নিজের শরীর আর ভেজা চুলগুলো ভালো করে মুছল। কিন্তু সমস্যা হলো, ও তাড়াহুড়োয় কোনো পোশাক ভেতরে নিয়ে আসেনি। ঘরের আলমারিতে সব পোশাক রয়ে গেছে। এখন ওকে ওই চাদরটা দিয়েই শরীর ঢেকে বাইরে বের হতে হবে। মায়া অত্যন্ত ভয়ে ভয়ে, কাঁপতে থাকা হাতে ওয়াশরুমের লকটা খুলল। দরজাটা সামান্য ফাঁক করতেই ও দেখল কৌশিক ঠিক দরজার মাঝখানে দুই দেয়ালে হাত দিয়ে ওর যমদূতের মতো দাঁড়িয়ে আছে। ওর চোখে সেই পরিচিত কামনার নীল আগুন, যা মায়াকে এক নিমিষে পুড়িয়ে ছাই করে দিতে পারে।
মায়া দরজার আড়ালে নিজের শরীরটা যতটা সম্ভব লুকিয়ে রেখে বলল,
“সরুন… আমি আলমারি থেকে কাপড় নেব।”
কৌশিক কোনো কথা না বলে এক ঝটকায় দরজাটা পুরোটা খুলে ফেলল। মায়া চমকে উঠে নিজের বুকের ওপর চাদরের বাঁধন আরও শক্ত করল। কিন্তু কৌশিক সেদিকে পাত্তা না দিয়ে মায়ার ভেজা, ফর্সা কোমরে নিজের এক হাত গলিয়ে ওকে এক টানে নিজের শক্ত বুকের সাথে লেপ্টে নিল। মায়ার ভেজা চুলের সুগন্ধ আর ওর শরীরের কুসুম গরম জলের উষ্ণতা কৌশিকের ভেতরের ঘুমন্ত বাঘটাকে আবার জাগিয়ে তুলছিল।
“আপনার মাথা খারাপ হয়ে গেছে? ছাড়ুন আমাকে!”
মায়া কৌশিকের খালি বুকে নিজের দুই হাত দিয়ে ধাক্কা দেওয়ার চেষ্টা করল। কৌশিক মায়ার ভেজা গালটা নিজের একহাতে শক্ত করে ধরে ওর চোখের দিকে তাকাল। ওর গলার স্বর এবার বড্ড ভারী আর নেশাতুর শোনাল,
“তোর এই ভেজা শরীরের রূপ দেখার পর তোর এই অসভ্য পুরুষের মাথা ঠিক থাকে কিরে রে হার্টবিট? তুই কি চাস আমি পাগল হয়ে যাই? সারারাত তোকে নিজের ভেতরে ধারণ করার পরও কেন মনে হচ্ছে আমার এই তৃষ্ণা মেটার নয়?”
কৌশিক আর কোনো কথা বলার সুযোগ দিল না। ও মায়ার ঠোঁটের ওপর নিজের ঠোঁট জোড়া শক্ত করে চেপে ধরল। মায়ার ঠোঁটে তখনো বাথরুমের ঠান্ডা জলের স্বাদ লেগে ছিল, আর কৌশিকের ঠোঁটে ছিল সিগারেটের কড়া তামাকের গন্ধ এবং তীব্র উষ্ণতা। এই দুইয়ের মিলনে ঘরের ভেতরের পরিবেশ আবার মুহূর্তের মধ্যে গরম হয়ে উঠল। মায়া প্রথমে একটু ছটফট করলেও, কৌশিকের জিভের সেই চেনা ও কড়া আগ্রাসনের সামনে ও আবার নিজের সমস্ত হাঁটু দুর্বল হয়ে যেতে অনুভব করল। ও কৌশিকের কাঁধটা শক্ত করে ধরে নিজের চোখ দুটো বুজে ফেলল। প্রায় দশ মিনিট পর কৌশিক ধীরে ধীরে মায়াকে ছেড়ে দিল। মায়ার বুক দ্রুত ওঠানামা করছে, সে যেন এখনও স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করছে। লজ্জায় তার মুখ রাঙা হয়ে উঠেছে, তাই কোনো কথাই বলল না। কৌশিকের কাছ থেকে নিজেকে আলতো করে সরিয়ে নিয়ে সে দ্রুত আলমারির দিকে এগিয়ে গেল। আলমারি খুলে একটি কালো শাড়ির সেট বের করল। তারপর শাড়িটা হাতে নিয়ে ওয়াশরুমের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা কৌশিককে হালকা ধাক্কা দিয়ে সরে যেতে ইশারা করল। পরমুহূর্তেই মায়া ওয়াশরুমে ঢুকে দরজাটা ভেতর থেকে লক করে দিল। ঠিক তখনই হঠাৎ কৌশিকের ফোন বেজে উঠল। রিংটোনের শব্দে তার দৃষ্টি সেদিকে ঘুরে গেল। সাইড টেবিলের ওপর রাখা ফোনটি হাতে তুলে নিয়ে সে ধপাস করে বিছানায় বসে পড়ল। অতঃপর কলটি রিসিভ করে বিছানার ব্যাকরেস্টে পিঠ ঠেকিয়ে আরাম করে বসল এবং অপর প্রান্তর ব্যক্তিটির সাথে কথা বলতে লাগল।
১৭ মিনিট পর। কৌশিক তখন খাটের কোণে বসে অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে ফোনে রিলস দেখছিল। ঠিক এমন সময় ওয়াশরুমের দরজা লক খোলার খটাস শব্দ হলো। কৌশিক অবলীলায় সেদিকে তাকাল এবং তার জীবনের পরবর্তী পাঁচ সেকেন্ডের জন্য সময় থমকে গেল। ভেতর থেকে মায়া কালো শাড়ি পরে, মাথায় সাদা একটা বড়সড় তোয়ালে মুড়ে বের হয়ে এল। মায়াকে এই রূপে দেখে কৌশিকের হাত থেকে ফোনটা ফসকে বিছানার ওপর ‘ধপাস’ করে পড়ে গেল। সে কিঞ্চিৎ হাঁ হয়ে মায়ার দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। তার চোখ দুটি শাড়ির কুঁচি পার হয়ে সোজা গিয়ে আটকে গেল মায়ার নরম, চিকন, পাতলা কোমরের দিকে। মায়া যেন আজ মনে মনে কোনো বিশেষ এজেন্ডা নিয়ে নেমেছে! সে কোমরটা জিলাপির প্যাঁচের মতো হেলিয়ে-দুলিয়ে, তোয়ালে দিয়ে ভেজা চুল মুছতে মুছতে কৌশিকের দিকে ধীর পায়ে এগোচ্ছে। কৌশিক একটা শুকনো ঢোক গিলল। তার চোখের মণি মায়ার কোমরের তালে তালে বাম থেকে ডান, আবার ডান থেকে বামে দুলতে লাগল। সে তার দুই আঙুল দিয়ে মায়ার কোমরের দুলুনিটা বাতাসে মাপার চেষ্টা করল। মায়া আরও কাছে আসতেই কৌশিক নিজের বেসামাল ঠোঁট জোড়া কামড়ে ধরে, একেবারে নির্লজ্জের মতো গদগদ কণ্ঠে বলে উঠল,
“আস্তে কোমরওয়ালী… আমার কিছু মিছু খুব ফাস্ট ফণা তুলে নড়েচড়ে উঠছে! লাইক… জাস্ট গোখরো সাপ!”
মায়া প্রথমটায় কিঞ্চিৎ লজ্জা পেল। সে কোমরে হাত দিয়ে কপালে ভাঁজ ফেলে বলল,
“ফণা তুলেছে তো আমি কী করব? মাথায় দুটো বারি দিবো? বেশি নড়াচড়া করলে স্কচটেপ মেরে সোজা করে রেখে দিন!”
কৌশিক বিছানায় আরেকটু ঘেঁষে এসে চোখ টিপে বলল,
“তুই নিজ হাতে এসে একটু মেরে দিয়ে যা না আমার সুইটহার্ট!”
মায়া চোখ কপালে তুলে চেঁচিয়ে উঠল,
“হোয়াট?!”
কৌশিক নিষ্পাপ মুখে বলল,
“না মানে স্কচটেপ! আমি স্কচটেপের কথা বলছি, তুই আবার কী ভাবলি শুনি? ওইযে ওইসব নাতো? হ্যাঁ হ্যাঁ তলে এইসব ভাবনা? দুষ্টুগিরি করো আমার সাথে?”
মায়া তোয়ালেটা কৌশিকের মুখের ওপর ছুড়ে মেরে বলল,
“নির্লজ্জ বেটাছেলে! রোমান্স করার আর জায়গা পান নাই? দিনকে দিন আপনার ইয়েগুলো একদম সিলেবাসের বাইরে চলে যাচ্ছে!”
কৌশিক তোয়ালেটা মুখ থেকে সরিয়ে মাথা চুলকে বলল,
“অন্তত তুই সিলেবাসের কথা বলিস না! মনে নেই? সেদিন তো সিলেবাসের বাইরে গিয়ে আমার গুলু-মুলু টমেটোর মতো লাল আ**ন্ডা বরাবর চোট দিয়েছিলি? ব্যাথা তো বড্ড হয়েছিল বটে তবে আজও একটু রিভিশন দিতে চাচ্ছিলাম আরকি। তা, ব্ল্যাক বিউটি, নিজ হাতে যদি না মারো…”
মায়া রাগী চোখে ভ্রু-কুচকে তাকাল। কৌশিক গলা ঝাঁকুনি দিয়ে বলল,
“না মানে ইয়ে… স্কচটেপ স্কচটেপ। নিজ হাতে যদি না মারো স্কচটেপ তবে একটা স্কচটেপ অন্তত দাও? হার্টটা বড্ড লাফাচ্ছে!”
কৌশিকের এমন কথা শুনে মায়া এবার আড়ালে হাসল। তারপর আয়নার সামনে গিয়ে চিরুনি টা হানে নিয়ো বলল,
“স্কচটেপ লাগবে না, আমার কাছে একটা বড় সাইজের গামছা আছে। মুখ আর হাত-পা একসাথে বেঁধে খাটের তলায় রেখে দেওয়ার মতো, আশা করি তখন সব ফণা তোলা ঠাণ্ডা হয়ে যাবে!”
কৌশিক ভয়ের অভিনয় করে বুকে হাত দিয়ে বলল,
“বাপরে! মুই তো ভয় পেলুম! শাড়ি পরে একী খড়গহস্ত রূপ! তুই কি মায়া, নাকি মায়ারূপী কোনো ডাকাত? কোমরের দুলুনিতে মন চুরি করলি, আবার এখন গামছা দিয়ে বাঁধার হুমকি দিচ্ছিস? এ তো ডাবল স্ট্যান্ডার্ড!”
মায়া ভ্রু জোড়া উচু করে বলল,
“অসভ্য! আপনি থাকুন আপনার এসব ফ্লার্টিং নিয়েই। আমি আর এক মুহূর্তও এখানে থাকছি না। চললাম আমি।”
কৌশিক তড়িঘড়ি করে বলে উঠল,
“আরে আরে,কোমরওয়ালী কোথায় যাচ্ছিস? কথাটা তো শুনে যা। এইভাবে অন্তত তোর কয়টা ছবি তো তুলতে দে আমাকে।”
মায়া ভেংচি কেটে বলল,
“পরে… পরে… বায়।”
বলেই মায়া হনহন করে বাতাসের বেগে রুম থেকে বেরিয়ে যেতে লাগল। সাথে সাথে কৌশিক পেছন থেকে বলে উঠল,
“আরে আরে শুনে তো যা। মায়া….”
মায়া শেষ পর্যন্ত চলেই গেলো। কৌশিক চোয়াল শক্ত করে মুখ গম্ভীর করে বলল,
“স্টুপিট গার্ল।”
সকাল তখন ৯টা বেজে ১৫ মিনিট। চৌধুরী ভিলার বিশাল এবং রাজকীয় ডাইনিং টেবিলটি নানা পদের খাবারে সাজানো। মাহিমা চৌধুরী এবং সায়েরা চৌধুরী দুজনে মিলে টেবিল তয়-তরদারকি সাযাচ্ছেন। আজ বাড়ির পরিবেশটা অনেক হালকা। তিয়াশা মায়া সুস্থ শরীরে বাড়ি ফিরে এসেছে এবং তিয়াশা নিজের ভুল বুঝতে পেরেছে, এটা এই পরিবারের জন্য এক মস্ত বড় স্বস্তি। রোহিত ডাইনিং চেয়ারে বসে এক হাত দিয়ে ফোন স্ক্রল করছিল আর অন্য হাতে কফির কাপে চুমুক দিচ্ছিল। ওর পরনে একটা ক্যাজুয়াল সাদা শার্টের হাতা কনুই পর্যন্ত গুটানো। ও একটু পরপরই ডাইনিং হলের প্রবেশদ্বারের দিকে তাকাচ্ছিল, যেন ও কারো আসার অপেক্ষা করছে।
ঠিক তখনই সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে এল নিধি। নিধি আজ একটা হালকা নীল রঙের কুর্তিতে বড্ড সাধারণ অথচ এক অদ্ভুত মায়াবী লাগছিল। ওর লম্বা চুলগুলো একটা ক্লিপ দিয়ে পেছনে আটকানো, ফর্সা মুখে কোনো মেকআপ নেই, তবুও ওর চোখের সেই চেনা জেদ আর অহংকার যেন দূর থেকেই স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল। নিধিকে দেখেই রোহিত কফির কাপটা টেবিলে রাখল। ওর ঠোঁটে সেই চেনা ড্যাশিং মাফিয়া হাসিটা ফুটে উঠল। ও নিচু গলায় বলল,
“গুড মর্নিং, নিধি পাখি। আজ নীল রঙ পরেছ? আকাশকে নিজের করে নেওয়ার ইচ্ছা নাকি?”
নিধি রোহিতের গলা শুনতেই নিজের মুখটা গম্ভীর করে ফেলল। ও রোহিতের ঠিক উল্টো দিকের চেয়ার টা টেনে বসল, যাতে ও রোহিতকে পুরোপুরি এড়িয়ে যেতে পারে। নিধির সাথে এই কয়দিনে চৌধুরী পরিবারের সবার সাথে ভালো একটা সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। তিয়াশা যেইদিন নিখোঁজ হয়েছিল সেইদিন রাতে নিধি এসেছিল এখনো যায়নি চৌধুরী বাড়িতে থাকা কালিন সে তার বাবা-মায়ের কাছ থেকে আরো কিছুদিন থাকার পারমিশন নিয়েছে। ও মাহিমা চৌধুরীর আর সায়েরা চৌধুরী’র দিকে তাকিয়ে মিষ্টি করে বলল,
“গুড মর্নিং। আন্টি আমি কী সাহায্য করবো?”
সায়েরা চৌধুরী তৎক্ষনাৎ বলে উঠল,
“না মা তুমি বসে থাকো তোমাকে কোন কাজ করতে হবে না।”
“ঠিক আছে আন্টি। তা আজ ব্রেকফাস্টে কী কী আছে? আন্টি আমার কিন্তু খুব খিদে পেয়েছে।”
পাশ থেকে মাহিমা চৌধুরী হাসে বললেন,
“সেই কবে তুমি আসলে আমাদের বাড়িতে। আমাদের খারাপ সময়ে পাশে থাকলে সাহস চুকালে আর আমরা এখনো তোমার কোন সেবাযত্ন করতে পারলাম না। মা তুমি কুছু মনে করো না।”
“আন্টি এটা কী বলছেন আপনি? তিয়াশা আমার একমাত্র ফ্রেন্ড’স। ওর পরিবার আর আমার পরিবার একি কথাই তো হলো তাই না? আপনারা আমাকে আপনাদের পরিবারের অংশ মনে করেন না?”
সায়েরা চৌধুরী বলল,
“আরে না মা। তুমি অবশ্যই আমাদের পরিবারের অংশ। আর ভাবি তো ঠিকি বলেছে সেই কবে তুমি এসেছো আর আমরা তোমার ভালো মন্দ আপ্যায়নই করতে পারলাম না।”
“আন্টি আপনিও?”
সায়েরা চৌধুরী আবার বলল,
“তিয়াশা বলে গেলো তোমার দুইজনে নাকি পরোটা আর আলুদ দম পছন্দ? তাই আজ তোসাদের পছন্দের পরোটা আর আলুর দম করা হয়েছে মা। আর মায়ার জন্য স্পেশাল সুপ বানিয়েছি। মেয়েটার শরীরে এখনো রক্তের অভাব।”
“সত্যি আন্টি?”
“বসো আমি দিচ্ছি।”
এই বলে সায়েরা চৌধুরী নিধির প্লেট সহ সব প্লেটে একে একে পরোটা আলুর দম আরো টেবিলে থাকা নানান রকমের রান্নার আইটেম একটু একটু করে সব প্লেটে সাজিয়ে দিল। ঠিক তখনই সিঁড়ির দিক থেকে ভারী জুতো আর শাড়ির খসখস আওয়াজ শোনা গেল। ডাইনিং টেবিলের সবার নজর চলে গেল সেদিকে।
কৌশিক নিচে নেমে আসছে। ওর পরনে এখন একটা কালো রঙের ফিটেড শার্ট, যার ওপরের দুটো বোতাম খোলা, এবং অফ-হোয়াইট ফরমাল প্যান্ট। ওর চুলগুলো নিখুঁতভাবে ব্যাক-ব্রাশ করা, চোখে সেই চেনা গম্ভীর এবং আধিপত্যবাদী মাফিয়া লুক। কিন্তু সবার চোখ আটকে গেল ওর পাশে থাকা মায়ার ওপর। মায়া একবার নিচে নেমেছিল কিন্তু তার শরীর ভালো লাগছিল না বলে সে আবার কিছুক্ষণ পর রুমে চলে গিয়েছিল। তার পরনে সেই কালো শাড়ি ও মাথার ওপর আর গলার চারপাশে এত বড় করে আঁচলটা জড়িয়ে রেখেছে যে ওর গলার এক ইঞ্চি চামড়াও বাইরে থেকে দেখার উপায় নেই। ও মাথা নিচু করে, বড্ড ধীর পায়ে কৌশিকের হাত ধরে নিচে নামছে। ওর হাঁটার গতিতে এক ধরনের আড়ষ্টতা আর শারীরিক ক্লান্তি স্পষ্ট, যা এই টেবিলের অন্তত একজন মানুষের চোখ এড়াতে পারল না। রোহিত কৌশিক আর মায়াকে দেখেই নিজের মুখটা কফির কাপ দিয়ে আড়াল করে এক শব্দহীন শয়তানি হাসি হাসল। ও মনে মনে বলল,
“এ তো দেখছড আস্ত একটা কসাই! ভাবির যে অবস্থা করেছে, ও তো ঠিকমতো হাঁটতেই পারছে না।”
কৌশিক টেবিলে এসে নিজের প্রধান চেয়ারটায় বসল। মায়াকে ও নিজের পাশের চেয়ারটায় বসিয়ে দিল বড্ড যত্ন করে। মাহিমা চৌধুরী মায়ার দিকে তাকিয়ে চিন্তিত গলায় বললেন,
“কী রে মায়া? মুখটা এত ফ্যাকাশে লাগছে কেন তোর? আর এই গরমে গলার ওপর এত ভারী করে আঁচল জড়িয়ে রেখেছিস কেন? ঠান্ডা লেগেছে নাকি?”
মাহিমা চৌধুরীর এই সরল প্রশ্নে মায়ার মনে হলো ও এখন মাটির নিচে ধসে যাবে। ও লজ্জায় লাল হয়ে আমতা আমতা করে বলল,
“নাহ্,মানে মা,আসলে ঘরের এসিটা একটু বেশি ছিল তো,তাই সকালের দিকে একটু শীত শীত করছিল…ও-ও কিছু না।”
মায়ার এই কাঁপতে থাকা মিথ্যা কথা শুনে রোহিত আর নিজের হাসি চেপে রাখতে পারল না। ও একটু জোরেই কেশে উঠল,
“খুক খুক! বড় আম্মু… আসলে হয়েছে টা কী আমাদের চৌধুরী ভিলার এসিগুলো বড্ড বেশি পাওয়ারফুল। বিশেষ করে ভাইয়ার ঘরের এসিটা। ওখানে মাঝে মাঝে ঠান্ডার চোটে এত বেশি গরমের ঝড় ওঠে যে, সেই ঝড়ের পর শরীর ম্যাজম্যাজ করাটা বড্ড স্বাভাবিক। তাই না কৌশিক ব্রো?”
রোহিতের এই ডাবল মিনিং টিপ্পনী শুনে মায়ার ইচ্ছা করছিল ও টেবিলের নিচে লুকিয়ে পড়ে বা মাটিটা ফাঁক হয়ে যাক সাথে সাথে ও ডুকে যাবে। ও রাগে আর লজ্জায় কৌশিকের প্যান্টের ওপর হাত রেখে ওর উরুতে একটা জোরে চিমটি কাটল। কৌশিক চিমটি খেয়েও নিজের মুখে এক ফোঁটা ভীতি বা ব্যথার রেখা প্রকাশ পেতে দিল না। ও নিজের গম্ভীর, বরফশীতল চোখ দুটো তুলে সরাসরি রোহিতের দিকে তাকাল। ওর সেই চোখের চাহনি আন্ডারওয়ার্ল্ডের যেকোনো মানুষের বুক কাঁপিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল।
“রোহিত…”
কৌশিক চোখ রাঙিয়ে গম্ভীর গলায় বলল। কৌশিক দাঁত কিরমির করতে করতে বলল,
“তোর হাতে যেটা আছে, ওটা মন দিয়ে খা। নিজের চরকায় তেল দে, না দিলে আজ বিকেলের পর তোকে এমন এক জায়গায় পাঠাব যেখানকার এসি কোনোদিন বন্ধই হয় না। উপর থেকে নিচ পর্যন্ত জমিয়ে দিব বিশেষ করে মাঝ বরাবর। বুঝিস তো?”
কৌশিকের এই প্রচ্ছন্ন হুমকি শুনে রোহিত তৎক্ষণাৎ হাত তুলে সারেন্ডার করার ভান করল।
“ওকে ব্রো, কুল! আমি তো জাস্ট মজা করছিলাম।”
টেবিলের অন্য পাশে বসা নিধি পুরো ব্যাপারটা লক্ষ্য করছিল। ও রোহিতের এই ফাজলামি দেখে মনে মনে বড্ড বিরক্ত হচ্ছিল। ও নিজের প্লেটে চামচ দিয়ে খোঁচাতে খোঁচাতে নিচু গলায় বলল,
“অসভ্য! ঘরের ভেতরেও এর এসব নোংরামি ছাড়া কোনো কাজ নেই।”
নিধির এই ফিসফিসানি রোহিতের কান এড়াতে পারল না। ও নিধির দিকে তাকিয়ে এক চোখ টিপ মারল, যার পরিষ্কার অর্থ ছিল,
“আজ আমাদের পালা, নিধি পাখি।”
নিধি রাগে নিজের মুখ ঘুরিয়ে নিল। এমন সময় তিয়াশা সেখানে এসে হাজির হলো। সে নিধির পাশের চেয়ারটা টেনে বসে বলল,
“সরি আস্তে একটু দেরি হয়ে গেলো।”
নিধি পরোটা খেতে খেতে বলল,
“ইটর্স ওকে।”
ঠিক এমন সময় রোহিত নিধির দিকে তাকিয়ে বলল,
“কেন এতক্ষণ তুই কোথায় ছিলি?”
“কোথাও না রুমেই ছিলাম।”
“তাহলে এতক্ষণ পরে নিচে এলি যে?”
“ফ্রেশ হচ্ছিলাম তাই এত দেরি হয়েছে?”
“ফ্রেশ হতে এত সময় লাগে? কই নিধির তো এত সময় লাগে না।”
নিধি যখন পরোটা’টা মুখে নিতে যাবে ঠিক সেই সময় রোহিত কথাটা মুখ ফসকে বলে ফেলল। সায়েরা চৌধুরী মাহিমা চৌধুরী সহ সবাই রোহিতের দিকে তাকাল। নিধি রোহিতের দিকে কড়া চোখে তাকিয়ে আছে। রোহিত গলা ঝাঁকুনি দিয়ে বলল,
“না মানে ইয়ে….”
সাথে সাথে মায়া দুষ্টামি করে বলল,
“কী ব্যাপার রোহিত ভাইয়া? আজকাল মনে হয় নিধির খোজ খবর একটু বেশির রাখা হচ্ছে, ব্যাপার কী?”
রোহিত যেই কিছু বলতে নিবে ওমনি নিধি বলে উঠল,
“ভাবি এইসব পাগলের কথা শুনতে নেই আপনি খান তো।”
মায়া মুচকি হেঁসে বলল,
“ঠিক আছে।”
পাশ থেকে তিয়াশা বলল,
“তা ভাবি তোমার শরীরের অবস্থা এখন কেমন?”
মায়া তিয়াশার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেঁসে বলল,
“এই দেখো আমি একদম ঠিক আছি।”
এমন সময় কৌশিক খাবার খেতে খেতে তার মায়ের দিকে তাকিয়ে একটু উচ্চ স্বরেই বলে উঠল,
“মা, বাবা আর কাকা’কে কোথাও দেখছি না উনারা কোথায়?”
মাহিমা চৌধুরী নিজের ছেলের দিকে তাকিয়ে বললেন,
“কোথায় গেছে জানি না রে বাপ, তবে হ্যাঁ একসাথে দুইজন গেছে এতটুকুই জানি। কেন কোনো দরকার?”
কৌশিক বলল,
“না মা তেমন কোন ব্যাপার না। নিচে এসে উনাদের দেখতে পেলাম না তাই জিজ্ঞেস করলাম।”
বলেই কৌশিক খাওয়ায় মন দিলো। সায়েরা চৌধুরীও আর কিছু বললেন না। নাস্তা শেষ হওয়ার পর কৌশিক রোহিতকে নিয়ে ওর ভিলার ভেতরের পার্সোনাল স্টাডি রুমে গিয়ে ঢুকল। এই ঘরটি অত্যন্ত সুরক্ষিত। এখানে কোনো বাইরের মানুষের প্রবেশাধিকার নেই। ঘরের চারদিকের দেয়াল সাউন্ডপ্রুফ এবং এখানে আন্ডারওয়ার্ল্ডের সমস্ত গোপন ফাইল ও চৌধুরী বংশের সমস্ত অস্ত্র রাখা থাকে। কৌশিক নিজের রাজকীয় চামড়ার চেয়ারটায় বসল। ও টেবিলের ওপর রাখা একটা কালো ফাইল খুলল। ওর মুখের সেই সকালের মিষ্টি রোমান্টিক ভাবটা এখন সম্পূর্ণ উধাও। এখন ও শুধুই ‘কৌশিক নীর চৌধুরী’ আন্ডারওয়ার্ল্ডের সেই নিষ্ঠুর লিডার, যার এক ইশারায় শত শত মানুষের ভাগ্য নির্ধারিত হয়।
প্রণয়ের ঘোর রাত পর্ব ৪০
“রোহিত, তিয়াশা আর মায়াকে যে গ্যাংটা কিডন্যাপ করেছিল, অর্ধেক কে তো আমরা ধরেছি কিস্তু তাদের পেছনের মূলে যে আছে সেটার খোঁজ কতদূর?”
কৌশিক ফাইল থেকে চোখ না তুলেই জিজ্ঞেস করল। রোহিত টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে নিজের পকেট থেকে একটা পেনড্রাইভ বের করে টেবিলের ওপর রাখল। ওর মুখটাও এখন বড্ড গম্ভীর এবং পেশাদার।
“ভাইয়া, কাজটা যতটা সাধারণ আর সহজ মনে করেছিলাম, আসলে ততটা নয়। তিয়াশা আর ভাবিকে যে লোকগুলো ধরেছিল, তারা শুধু টাকার জন্য করেনি। আমি নিশ্চিত এইসবের পেছনে অন্য কোন বড় কারণ অবশ্যই ছিলো।”
