Home নূর ই মহব্বত নূর ই মহব্বত পর্ব ১৫

নূর ই মহব্বত পর্ব ১৫

নূর ই মহব্বত পর্ব ১৫
তাবাসসুম তাজ্বওয়ারী

– ফটাফট মুখ খোল। সবটা এ টু জেড জানতে চাই! একটা কথা লুকালে একটা একটা আঘা’ত পড়বে তোর শরীরে।
সামিয়া চুপচাপ বসে আছে। তার পায়ের তলার মাটি আর অবশিষ্ট নেই। সে ফাঁদে পড়ে গেছে, আর এই ফাঁদ থেকে বেরোনোর কোনো পথই তার জানা নেই। এতক্ষণ বহু চেষ্টা করেছিল মোড় ঘোরানোর। অনেক ন্যাকা কান্না আর ইমোশনাল কথা বলে, কিন্তু আযলান আর তুহি যে আঁটঘাট বেঁধে নেমেছে! এর মধ্যে তুহি আবার আরেকটা দিয়েছে কানের নিচে। তারপর আযলানের ভয়ে এখন চুপ করে গেছে সামিয়া। এর মধ্যে কোথা থেকে যেন আবরার ও হাজির হয়েছে।
আযলান ঠান্ডা শীতল কণ্ঠে বলে উঠল,

– সামিয়া তুই কিছু বলবি নাকি আমাকে অন্য ব্যবস্থা নিতে হবে?
– হ্যাঁ, করেছি! আমিই করেছি সব।
চিল্লিয়ে বলে উঠল সামিয়া। আযলান টেবিলে জোরে বাড়ি দিয়ে বললো,
– গলা নিচে! তুই যে করেছিস এটা আমরা জানি। কেন করেছিস সেটা বল! আর একা তো কিছু করিস নি, কার সাথে হাত মিলিয়েছিস?
হঠাৎ সামিয়া হেসে উঠল,
– যাক! তাহলে তোরা বোকা না যে ভাবছিস এই পুরো প্ল্যানটা শুধু আমার একার ছিল! এত নিখুঁতভাবে তোদের ঘরের ভেতরের খবর, নওমির বাপের বাড়ির খবর আমি একা একা পেতাম নাকি?
– পরিষ্কার করে বল সামিয়া! কথা পেচাবি না নাহয় আরেকটা থাপ্পড় পড়বে সেটা হবে আমার হাতের!
সামিয়া ফুঁসে উঠল,
– তুই আমার সাথে রাগ দেখাচ্ছিস কেন? তোর টাকায় কেনা আমি?
বলতে দেরি গালে আরেকটা থাপ্পড় পড়তে দেরি হয়নি। এবারও মে’রেছে তুহি! এদিকে আবরারের হাসি পাচ্ছে তুহির থাপ্পড় দেখে। বেচারি সব রাগ একসাথে ঝাড়তে চাইছে আর ডক্টর সামিয়ার অবস্থা বেহাল করতে চাইছে!
– এই মেয়ে তুমি আমাকে…
– আরেকটা খাওয়ার আগে সত্যি কথা বলে দিলেই তো হয়! ডক্টর হয়ে এভাবে থাপ্পড় খাওয়াটা সম্মানের কিছু নয় নিশ্চয়ই!
আবরারের গম্ভীর কণ্ঠস্বর। এই সিরিয়াস মোমেন্টে হাসা যাবে না তখন দেখা যাবে তুহি ওকেও মে’রে না বসে! আযলান বিরক্ত হয়ে বললো,

– দেখ এত সময় নেই দ্রুত বল! আমার ছেলেকে দেখতে যেতে হবে!
সামিয়া অবাক হয়ে বলল,
– ছেলে মানে?
– ছেলে মানে আমার ছেলে। তুই তোর কথা বল, আমার ছেলের উপর তোর কুনজর দিবি মা ডা’ইনি!
সামিয়া এবার আর চুপ থাকলো না। সে বলতে শুরু করল,
– তোর ওই বউটার যে একটা সৎ মা আছে, তার কথা বলছি! নওমিকে তোরা যতটা ভালোবাসতিস, ওই মহিলা ওকে ততটাই চোখে হারাতে পারত না… মানে ঘৃণায়! নওমিকে তোর মতো বড় ডাক্তারের সাথে বিয়ে দিয়ে ও সুখে থাকবে, এটা ওই মহিলা কোনোদিন মেনে নিতে পারেনি। আর আমার চাই ছিল তোকে। ব্যস, শত্রুর শত্রু তো বন্ধুই হয়, তাই না?
আযলান আর আবরার রাগে ফেটে পড়ল। এদের তো চেনা আছে তাদের! তুহি বললো,

– আপনি ওনাকে কোথায় পেয়েছেন?
– বিয়ের পর আমি একবার ওদের বাড়ি গিয়েছিলাম। আহিল তোর মনে আছে কি না জানি না। সেবার আমি অনেক কিছু দেখলাম বুঝলাম। তোর আড়ালে নওমিকে কে কি বলে সেসব আমার চোখে পড়েছিল, ব্যাস আমার বুঝতে অসুবিধা হলো না। বুঝতে পারছিলাম আমার স্বার্থ হাসিল করতে ওনাকে প্রয়োজন!
আযলান দাঁতে দাঁত চেপে বললো,
– তোর কিসের স্বার্থ নওমির সাথে? কেন করেছিস তুই এসব?
সামিয়া কোনো দ্বিধা ছাড়া বললো,
– সেই মেডিকেলের ফার্স্ট ইয়ার থেকে আমি তোকে পছন্দ করি আর তুই আমাকে পাত্তাই দিস না! ভেবেছিলাম হয়তো পড়ালেখার জন্য কিন্তু মেডিক্যাল পার করে ফেলার পর ও তোর মধ্যে কোনো চেঞ্জ নেই। হুট করে একদিন শুনলাম তুই বিয়ে করছিস! রাগ হবে না আমার বল? তোর জন্য এফোর্ট দেই নি আমি? কত চেষ্টা করেছি তোকে পেতে! আর তুই কি না সাধারণ একটা মেয়েকে বিয়ে করে নিয়ে আসলি, যার পুরো জীবনটাই সাধারণ! স্মার্টনেস বলতে কিছু নেই তার মধ্যে আর না হায়ার এডুকেটেড! একদম আন….
এই পর্যায়ে আযলান থামিয়ে দিলো ওকে। আঙুল তুলে বলল,

– যেইটুকু বলেছিস ওইটুকুটতেই থেমে যা! আর আগানোর চেষ্টা করিস না!
আযলানের চাহনি দেখে আর বলার সাহস পেল না। কথাগুলো জোর করে গিলে নিলো। আযলান কঠিন কণ্ঠে বললো,
– নওমি সাধারণ নাকি অসাধারণ, উচ্চশিক্ষিত নাকি স্মার্ট সেটা জাজ করার তুই কে সামিয়া? ও আমার স্ত্রী ছিল, এখন আমার সন্তানের মা। আর তুই? তুই তো স্রেফ একটা লোভী, ঈ’র্ষাপরায়ণ নারী! নিজের স্বার্থের জন্য একটা মেয়ের জীবন ধ্বং’স করতে গিয়ে তুই আজ ডক্টর থেকে একটা সস্তা ক্রি’মিনা’ল হয়ে গেছিস। তোর এই তথাকথিত “স্মার্টনেস” আর “হাই এডুকেশন” আজ তোকে কোথায় নামিয়েছে, দেখতে পাচ্ছিস?
সামিয়া চোখ নিচু করে বসে রইল। আবরার বলে উঠল,
– আমার আগেই সন্দেহ হয়েছিল ওই মহিলাকে! তার মানে আপনি আর ওই ডাইনি মহিলা মিলে দিনের পর দিন নওমিকে মেন্টালি টর্চার করেছেন? আপনারাই ওর মাথায় বি’ষ ঢুকিয়েছেন, যে আযলান আপনাকে ভালোবাসে, আর নওমি এ সংসারে একটা বোঝা? আপনারই ওকে বাড়ি ছাড়তে বাধ্য করেছেন?
সামিয়া নিচু স্বরে বললো,

– আমি শুধু এখানে নওমিকে বলতাম। আর আমি এখান থেকে শুধু বলতাম কখন আননোন নম্বর থেকে কল দিয়ে আহিলের কান ভাঙ্গাতে হবে বা মেসেজ করতে হবে সেটা, বাকিটা ওই মহিলা করতো। আহিল আর আমার ছবি বানানো এসব ওর মায়ের কোন এক ভাইয়ের কাজ। এমনকি যেদিন শপিং মলে নওমিকে আহিল দেখেছিল সেটাও ওদের প্ল্যানড! আমি এসব জানতাম না। পরে আমায় বলেছে। আর ডায়েরি এবং চিঠি…
আযলান আগ্রহ নিয়ে বললো,
– চিঠি নাহয় তুই রেখেছিস কিন্তু ডায়রিতে নওমির হাতের লেখা কিভাবে লিখেছিস?
সামিয়া একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। এতক্ষণে তার গলার তেজ পুরোপুরি দমে গেছে। ধরা যখন পড়েই গেছে, তখন আর লুকিয়ে কোনো লাভ নেই। লেখিকার আসল পেজ তার নাম দিয়ে এআই দিয়ে গল্প না পড়ে ওখানে পড়ুন। লুকালে তারই ক্ষতি এটা ভেবেই সামিয়া নিচু আর জড়তাহীন গলায় বললো,
– ডায়েরিটার পুরো আইডিয়াটাই ছিল ওই মহিলার। নওমির হাতের লেখা নকল করা আমার পক্ষে কোনোভাবেই সম্ভব ছিল না। কিন্তু ওই মহিলা তো বছরের পর বছর ধরে নওমিকে খুব কাছ থেকে দেখেছে। নওমির ইন্টারমিডিয়েটের কিছু পুরনো খাতা ছিলো ওই বাড়িতে এসব ওই মহিলার বেশ ভালো করেই জানা ছিল। ওখান থেকেই নওমির কিছু পুরনো লেখার পাতা ও ছিঁ’ড়ে রেখেছিল।
আযলান তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে রইল। সামিয়া আবার বলতে লাগল,
– সেই ছেঁড়া পাতা সে আমার কাছে পাঠায়। গ্রামে তো আর গ্রাফোলজিস্ট (হাতের লেখা বিশেষজ্ঞ) পাবে না তাই। আর এই…
একটু থেমে গেল। সকলের দিকে চোখ বুলিয়ে বললো,

– এই গ্রাফোলজিস্ট এর প্ল্যানটা আমারই ছিলো।
বলেই গালে হাত দিয়ে দিল। এটা দেখে আবরার না হেসে পারলো না। পরক্ষণেই সিরিয়াস হয়ে দাঁড়াল।
সামিয়া গালে হাত দিয়ে এক মুহূর্ত চুপ করে রইল, যেন নিশ্চিত হতে চাইল তুহি আবার হাত চালায় কি না। তুহি অবশ্য এবার মা’রল না, তবে তার চোখমুখের ঘৃণা আর তাচ্ছিল্য যেন সে সামিয়াকে জীবন্ত পু’ড়িয়ে মা’রবে।
সামিয়া একটা শুকনো ঢোক গিলে বাকিটুকু বলতে শুরু করল,
– আমি…. আমি ঢাকার একটা চেনা গ্রাফোলজিস্টকে দিয়ে নওমির ওই পুরনো খাতার লেখার স্টাইলটা হুবহু কপি করাই। দিনের পর দিন প্র্যাকটিস করিয়ে একটা পুরো ডায়েরি রেডি করা হয়, যেখানে এমনভাবে কথাবার্তা সাজানো ছিল যেন মনে হয় নওমি তোকে কোনোদিন ভালোই বাসেনি। আর চিঠির কথা যেটা বলছিস… তুই যেদিন ইমার্জেন্সি ওটিতে ব্যস্ত ছিলি, আমি তোর কেবিনে এসে তোর জ্যাকেটের পকেট থেকে চাবির গোছাটা সরাই। তারপর ডায়েরি আর বানানো চিঠিগুলো তোর ঘরের আলমারিতে সেট করে দিয়ে আসি। এই সবটাই ওই মহিলার কথামতো হয়েছে। ওই বাড়ি থেকে নওমির আড়ালে তার নামে জিনিসপত্র রাখা আর তোকে ফোন করে উসকে দেওয়ার কাজটা ও-ই সামলেছে। নওমি বোকা মেয়ে এতকিছু ধরতে পারেনি।
সামিয়ার মুখে এই ঠান্ডা মাথার নিখুঁত ব্লু-প্রিন্ট শুনে সকলের রাগে মুখ লাল হয়ে উঠলো। আযলান বলল,
– একটা মানুষ এতটা নিচে নামতে পারে? তাও কি না একটা মানুষের সংসার ভা’ঙার জন্য!! তোর একটুও বুক কাঁপলো না?
নিজের ফোন হাতে নিতে নিতে বললো,

– ইউ নো? আমার হাত নিশপিশ করছে কিন্তু আমি বাইরের মেয়ে মানুষ ছুঁই না আর সেখানে তোর মতো নোংরা নর্দমা তো একদমই না! নাহলে তুই ছেলে হলে আজ তোর সুস্থ অবস্থা থাকতো না।
আযলান টেবিলের ওপর রাখা ফাইলটা সজোরে একপাশে ছুড়ে ফেলে সোজা সামিয়ার সামনে এসে দাঁড়াল। দাঁতে দাঁত পিষে বললো,
– ডক্টর সামিয়া, তুই ভেবেছিলি এই সাদা অ্যাপ্রোন তোকে সারাজীবন আড়াল করে রাখবে? তোদের এই পা’পের শাস্তি আজ তোদের পেতেই হবে। এই যে ডাক্তারি পেশা নিয়ে তোর এত দেমাগ, এত অহংকার আজ এই মুহূর্ত থেকে তোর সেই পরিচয়ের সমাপ্তি ঘটল। তুই আর কোনোদিন এই পেশায় থেকে কোনো মানুষের সেবা করার যোগ্যতাই রাখিস না!
সামিয়া অবাক হয়ে গেল। কি বলছে এসব! আযলান শুধু একটা ফোন কলে কিসব বললো তারপর ওকে বললো বের হয়ে যেতে। ও আগেই সব রেডি করে রেখেছিল। প্রমাণ সহ সবটা এখন পৌঁছে গেছে ওখানে। সামিয়া অবাক কণ্ঠে বললো,

– কি বলছিস তুই? কি করেছিস?
আযলান বাঁকা হেসে বললো,
– যা যা নোটিশ চলে আসবে তখন জানবি। তবে এইটুকু জেনে রাখ তোর এতক্ষণ ধরে স্বীকার করা সবটা বিএমডিসিতে পৌছে গিয়েছে। তোর ক্যারিয়ার আজ এখানেই আমার কেবিনে আমার হাতেই শেষ!
আযলান নিজের ফোন আর গাড়ির চাবি নিয়ে কেবিনের বাইরে পা বাড়ালো। সামিয়া পেছন থেকে চিৎকার করে উঠল,
– আহিল! কি করেছিস তুই এটা!! এটা করতে পারিস না তুই!
আযলান হেঁটে চলে গেল আর সামিয়ার চিৎকার বিলীন হয়ে গেল। গাড়িতে বসে মাথা ঝাঁকিয়ে সব ঝেড়ে ফেলার চেষ্টা চালালো। এখন সে ঠান্ডা মাথায় আদনানকে দেখতে যেতে চাই। সেই কাল রাতে দেখেছিল! এখনই বুকটা পু’ড়ছে অথচ তিনটা বছর সে জানতেই পারে নি তার একটা ফুটফুটে ছেলে আছে! জানলে কি হতো? থাকতে পারতো তিনটা বছর দূরে? কখনোই না! দরকার পড়লে নওমির পা ধরে ক্ষমা চেয়ে নিয়ে আসতো ওদের নিজের কাছে! এখনও সে যত দ্রুত সম্ভব ওদের নিয়ে আসার চেষ্টা করবে। নওমি আর আদনানের খবর জানার পর ওদের ছেড়ে থাকতেই ইচ্ছা হয় না!

হাসপাতালে যখন ও প্রথমবার ছেলেটাকে দেখেছিল, তখন এক অদ্ভুত টান অনুভব করেছিল বুকে। অথচ তখনো জানত না, এই নিষ্পাপ মুখটাই তার জীবনের সবচেয়ে বড় হাহাকার আর সবচেয়ে বড় আনন্দের কারণ হতে যাচ্ছে। তিনটা বছর! তিনটা দীর্ঘ বছর ধরে তার কলিজার টুকরোটা এই পৃথিবীর আলো-বাতাস দেখছে, বড় হচ্ছে, অথচ বাবা হয়ে সে তার অস্তিত্বেরই খবর জানত না! নওমি কতটা কষ্ট বুকে চেপে একা একা এই মা হওয়ার জার্নিটা পার করেছে, ভেবেই আযলানের নিজের ওপর এক চরম ধিক্কার জন্মাল।

নূর ই মহব্বত পর্ব ১৪

যদি সে চার বছর আগে একটু ঠান্ডা মাথায় ভাবত, যদি সামিয়া আর ওই ডাই’নির পাতা ফাঁ’দে পা না দিয়ে নিজের ভালোবাসার ওপর ভরসা রাখত তাহলে আজ আদনান তার বুকেই বড় হতো। ভেবে একটা আফসোস কাজ করলো মনে। সেসব পরে ভাবা যাবে এই ভেবে দ্রুত গাড়ি স্টার্ট দিলো সে। ফোন বের করে কল দিয়ে বললো,
– আম্মু রেডি থাকো আমি পাঁচ মিনিটে আসছি। তোমাকে নিয়েই বেরোবো

নূর ই মহব্বত পর্ব ১৬

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here