Home প্রণয়ের ঘোর রাত প্রণয়ের ঘোর রাত পর্ব ৩৪

প্রণয়ের ঘোর রাত পর্ব ৩৪

প্রণয়ের ঘোর রাত পর্ব ৩৪
আরাফাত আদনান সামি

​রাত তখন ৩টা বেজে ১০ মিনিট। পিচঢালা হাইওয়ের বুকে জিপের চাকার তীক্ষ্ণ ঘর্ষণের শব্দ তুলে ঝড়ের গতিতে ছুটে চলেছে কৌশিকের কালো রঙের পাজেরো জিপটি। চারদিকের নিস্তব্ধতাকে চিরে গাড়ির হেডলাইটের দুটো তীব্র আলো সামনের ঘন কুয়াশা আর ধুলোবালি মিশ্রিত অন্ধকারকে ফালাফালা করে দিচ্ছে। স্টিয়ারিং হুইলের ওপর কৌশিকের দুই হাতের মুঠো এতটাই শক্ত যে ওর হাতের শিরা-উপশিরাগুলো স্পষ্ট ভেসে উঠেছে, আঙুলের গাঁটগুলো সাদা হয়ে গেছে। চোয়ালের হাড় পাথরের মতো শক্ত, আর চোখ দুটোতে জ্বলছে এক পৈশাচিক আগুন। যে মানুষটাকে পুরো ঢাকা শহরের কর্পোরেট দুনিয়া এক নামে চেনে ওর নিখুঁত ও ঠান্ডা মাথার বুদ্ধির জন্য, সেই কৌশিক নীর চৌধুরী আজ এক উন্মাদ, রক্তাক্ত সিংহের মতো আচরণ করছেন। ওর বুক চিরে প্রতি সেকেন্ডে যে নিশ্বাস বের হচ্ছে, তা যেন আগ্নেয়গিরির উত্তপ্ত লাভা। ওর ঠিক পাশের সিটে বসে আসে রোহিত। ওর বাম হাতটা ড্যাশবোর্ডের ওপর শক্ত করে রাখা, আর ডান হাত দিয়ে সে অনবরত ফোনের কিপ্যাডে আঙুল চালাচ্ছে। রোহিতের মুখেও আজ সেই চিরচেনা চঞ্চলতা, ফাজলামির বিন্দুমাত্র রেশ নেই। ওর চোখের নিচে এক কালচে ছায়া, আর কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম। মায়া ভাবি ওর কাছে শুধু ওর বড় ভাইয়ের স্ত্রী ছিলেন না, ছিলেন এক পরম স্নেহের বোন, এক পরম আশ্রয়ের নাম। সেই ভাবি আজ ওরই আপন বোনকে বাঁচাতে গিয়ে এক অন্ধকার নরপশুদের নরকে হারিয়ে গেছে, এই অপরাধবোধ রোহিতকে ভেতর থেকে কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছিল।

​“ব্রো, গুলশান আর বাড্ডা জোনের এসি (Assistant Commissioner) লাইনে এসেছেন। ওনারা অলরেডি ওই লেক পাড়ের পরিত্যক্ত গুদামঘরটা কর্ডন করেছেন। কিন্তু…”
রোহিত একটু আমতা আমতা করে কথাটা বলে কৌশিকের দিকে তাকাল। কৌশিকের সেই হিমশীতল, অন্ধকার মুখের দিকে তাকাতেও আজ রোহিতের ভয় লাগছিল।
​“কিন্তু কী, রোহিত? স্পষ্ট বল!”
কৌশিকের কণ্ঠস্বর গাড়িটির ইঞ্জিনের গর্জনকে ছাড়িয়ে গেল। কোনো সাধারণ মানুষের গলা ছিল না, ওটা ছিল এক অবরুদ্ধ হিংস্রতার বহিঃপ্রকাশ।
​“কিন্তু ওনারা বললেন, গুদামঘরে শুধু একটা ভাঙা হ্যারিকেন, কিছু দড়ি আর মেঝেতে রক্তের দাগ ছাড়া আর কিছুই পাননি। তিয়া যেই কালো মাইক্রোবাসটার কথা বলেছিল ওই কালো মাইক্রোবাসটার কোনো হদিস সিসিটিভি ফুটেজে এখনো মেলেনি। ওটা কোনো ফেক নাম্বার প্লেট ব্যবহার করছিল।”
রোহিত নিচু স্বরে কথাটা বলল। ​কৌশিক জিপের স্পিড আরও এক ধাপ বাড়িয়ে দিলেন। স্পিডোমিটারের কাঁটা এখন ১৪০ ছাড়িয়ে গেছে। সে অত্যন্ত মারাত্মক গলায় বলল,

“পুলিশ ওনাদের নিয়ম অনুযায়ী খুঁজবে, রোহিত। কিন্তু আমি আমার নিয়ম অনুযায়ী খুঁজব। ওই জানোয়ারের দল জানে না তারা কার প্রোপার্টিতে হাত দিয়েছে। মায়া আমার নিশ্বাস, ও আমার জান। ওর শরীরে যদি একটা আঁচও লাগে, তবে এই শহরের প্রতিটি ক্রাইম সিন আমি রক্ত দিয়ে ধুয়ে দেব। তুই জিপিএস ট্র্যাকারটা অন কর। তিয়াশার ফোনটা ট্র্যাকিংয়ে বসিয়েছিস?”
​“হ্যাঁ ভাই, তিয়াশার ফোন তো বাড়িতেই আছে। কিন্তু ভাবির ফোনটা… ওর ফোনটা তো বন্ধ দেখাচ্ছে। তবে আমি আমাদের চৌধুরী গ্রুপের আইটি হেডকে বলেছি, ভাবির ফোনের লাস্ট টাওয়ার লোকেশন বের করতে। ওনারা ট্রাই করছেন।”
রোহিত দ্রুত জবাব দিল। ​কৌশিক এক হাত দিয়ে স্টিয়ারিং ধরে অন্য হাত দিয়ে নিজের ফোনের স্পিকার অন করে ওনার পার্সোনাল সিকিউরিটি ফোর্সের হেড ‘জহির’কে কল করলেন। জহির লাইনে আসতেই কৌশিক আদেশ দিলেন,

“জহির! এই মুহূর্তে আমাদের আন্ডারে যতগুলো সিকিউরিটি উইং আছে, সবাইকে ঢাকার চারদিকের হাইওয়ে,বিশেষ করে কাঁচপুর ব্রিজ, মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ে আর গাবতলীর দিকে পাঠাও। প্রতিটি কালো মাইক্রোবাসের ভেতরে কী আছে, আমি নিজে দেখতে চাই। কোনো গাড়ি যেন চেক ছাড়া পার না হয়!”
ওপাশ থেকে জহির দৃঢ় গলায় বলল,
​“ইয়েস বস, অলরেডি টিম মুভ করেছে।”
​কৌশিক ফোনটা কেটে দিয়ে সামনে তাকালেন। ওর মনে বারবার ভেসে উঠছিল মায়ার সেই ফর্সা, নিষ্পাপ মুখখানি। মায়ার চোখের সেই তীক্ষ্ণ চাহনি, ওর শাড়ির আঁচল সামলানোর সেই ভীরু অথচ সুন্দর ভঙ্গি। কৌশিক নিজেকে কিছুতেই ক্ষমা করতে পারছিল না। কেন সে মায়াকে একা রেখে গিয়েছিল? কেন সে ওর সুরক্ষার জন্য আরও এক ডজন বডিগার্ড ভিলার চারদিকে রাখেননি? ওর এই পজেসিভ ভালোবাসা আজ ওরই চোখের সামনে ওর মায়াবতী পরীকে এক অন্ধকারে ঠেলে দিল, এই চিন্তা ওর মস্তিষ্ককে অবশ করে দিচ্ছিল।

​অপরদিকে, চৌধুরী ভিলার ভেতর তখন যেন এক জীবন্ত নরক নেমে এসেছে। ড্রইংরুমের বড় ঘড়িটায় টিকটিক শব্দ হচ্ছে, যা বাড়ির প্রতিটি মানুষের বুকের ভেতর হাতুড়ির মতো আঘাত করছিল। সায়েরা চৌধুরী ওর ঘরের বিছানায় শুয়ে অনবরত বিলাপ করছেন। ওর এক হাত নিজের বুকে আর অন্য হাত দিয়ে সে তিয়াশাকে আঁকড়ে ধরে আছেন। ​তিয়াশা তখনো পুরোপুরি কাঁপছিল। ওর পরনের জামাকাপড় ধুলোবালিতে মাখামাখি, চোখ দুটো কান্নায় ফুলে একেবারে লাল হয়ে গেছে। ওর মনের ভেতর এখন কোনো অহংকার নেই কাজ করছে না, না তো কোনো জেদ। ওর কেবলই মনে পড়ছিল, কীভাবে মায়া ওকে বাঁচানোর জন্য নিজের হাতে লাঠি আর জ্বলন্ত হ্যারিকেন তুলে নিয়েছিল। কীভাবে ওকে ধাক্কা দিয়ে বাইরে পাঠিয়ে নিজে ওই হিংস্র পশুর কবলে পড়ে গিয়েছিল।
​“মা… আমি খুব পাপ করেছি মা!”
তিয়াশা ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল।

“আমি মায়া আপুকে কত ছোট ভেবেছি, কত কাজের লোক বলে অপমান করেছি! আর আপু… আপু নিজের জীবনের পরোয়া না করে আমাকে ওই নরক থেকে বের করে দিল। ওই লোকটা আপুর মাথাটা লোহার পিলারে ধাক্কা মেরে ফেলে দিল, মা! আপুর কপাল দিয়ে রক্ত পড়ছিল… ওহ খোদা, আমি এই মুখ ভাইয়াকে কীভাবে দেখাব মা!”
অপর দিকে আশরাফ চৌধুরী কৌশিক যাওয়া মাত্র মায়া’র বাবা-মা অমিতাভ পাটোয়ারী ও রুবিনা পাটোয়ারী’কে সব কিছু ফোন কলের মাধ্যমে মায়ার ঘটনাটা খুলে বলেছেন। নিজের মেয়ে কিডন্যাপ হয়ে শুনে ফোন কলের মাঝেই ধপাস করে মেঝেতে জ্ঞান শূন্য হয়ে লুটিয়ে পড়েন। রুবিনা পাটোয়ারী জ্ঞান ফিরছিল না বলে অমিতাভ পাটোয়ারী এই রাত বিরেতে নিজের বউকে নিয়ে হসপিটালে যান। একদিকে নিজের মেয়ে কিডন্যাপ হয়েছে শুনে সেই চিন্তা তাকে কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে অপর দিকে নিজের বউয়ের।

চৌধুরী ভিলাতে,​মাহিমা চৌধুরী সোফার কোণে পাথরের মতো বসে ছিলেন। ওনার চোখের জল শুকিয়ে গেছে। ওনার একমাত্র ছেলের বউ, ওনার এই চৌধুরী বাড়ির লক্ষ্মী মায়া আজ নিখোঁজ। সে তিয়াশার মাথায় হাত রেখে এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
“এখন কেঁদে আর কী হবে তিয়াশা? কৌশিক তোকে সবসময় নিজের বোনের মতো করে আগলে রাখতে চেয়েছিল এই নোংরা দুনিয়া থেকে। আর তুই ওর শাসনকে শত্রুতা ভেবেছিলি। আজ ওর সেই ভালোবাসার মায়া তোরই ভুলের মাশুল দিচ্ছে।”
​ঠিক তখনই ড্রইংরুমের মেইন দরজা ঠেলে হন্তদন্ত হয়ে ভেতরে ঢুকল নিধি। ওর পরনে একটা সাধারণ ও তাড়াহুড়ো করে পরা কামিজ, চুলগুলো এলোমেলো। ওর চোখে-মুখেও তীব্র আতঙ্ক আর ভয়। রোহিতের ফোন পাওয়ার পর সে আর নিজের বাসায় স্থির থাকতে পারেনি। গভীর রাতেই সে ওর বাবার এক পরিচিতের গাড়িতে করে সরাসরি চৌধুরী ভিলভ চলে এসেছে। ​নিধি ঘরে ঢুকেই তিয়াশাকে সামনে বসে থাকতে দেখে সোজা তিয়াশার সামনে গিয়ে ওকে জড়িয়ে ধরল।

“তিয়াশা! তুই ঠিক আছিস তো? ওহ গড, তুই এত বোকা কবে থেকে হলি? আমি কী তোকে কখনো আগে চিঠি লিখেছি? এই কথাটা তোর মাথায় কেন আসলো না? তুই, নিধির নাম করে যেই চিঠিটা আসছিল ওই ঠিকানায় কেন গেলি? আমি তো তোকে কোনো মেসেজ বা ঠিকানা পাঠাইনি! তুই ভালো করেই জানতিস আমার দরকার পড়লে আমি সোজা তোর বাড়িতে চলে আসি তাহলে এই বোকামিটা কীভাবে করে বসলি তুই? যদি তোর কিছু হয়ে যেতো?”
​তিয়াশা নিধিকে দেখে আরও জোরে কেঁদে উঠল,
“নিধি… ওরা আমার ফোনে তোর নাম দিয়ে মেসেজ করেছিল রে। আমি ভেবেছিলাম তুই ওটা পাঠিয়েছিস। আমি বুঝতে পারিনি ওটা ওই মেয়ে পাচারকারী চক্রের ফাঁদ ছিল। আপু… আপু আমাকে বাঁচাতে গিয়ে…”
“তোকে বলতে হবে না আমি সব শুনেছি।”
“আমি তো তোকে বলি নি তাহলে কার কাছ থেকে শুনলি?”
“উফ্ এখনো এত প্রশ্ন? শুনেছি কোন এক জায়গা থেকে বাদ দে।”
“কীহ্? এই কথাটা এলাকায় ছড়িয়ে গেছে? মা এখন আমার কী হবে?”
“তিয়াশা তুই একটু চুপ করবি?”

​নিধি তিয়াশাকে সান্ত্বনা দিতে দিতে ড্রইংরুমের চারদিকে তাকাল। সে কৌশিক বা রোহিত কাউকেই দেখতে পেল না। ওর মনের ভেতর হঠাৎ করেই এক তীব্র শূন্যতা আর ভয় কাজ করতে লাগল। বিশেষ করে রোহিতের সেই গম্ভীর, চিন্তিত মুখটা ওর চোখের সামনে ভেসে উঠল। আজ দুপুরেই যে ছেলেটা ওনাকে ‘মিরচি পকোড়া’ বলে ক্ষ্যাপাচ্ছিল, ওকে আগলে রাখার জন্য নিজের গাড়িতে করে বাসায় পাঠিয়েছিল, সেই রোহিত আজ এক ভয়ংকর বিপদের মুখে ওনার ভাইয়ের সাথে রাস্তায় নেমেছে। ​নিধি মাহিমা চৌধুরীর সামনে গিয়ে ওর হাত দুটো নিজের হাতের মুঠোয় নিল। ওর নিজের চোখ দুটোও ভিজে উঠেছিল। ওর ব্যবহার মুখে যতই রাগী বা কড়া হোক না কেন, ওর মনটা ছিল একদম আয়নার মতো পরিষ্কার ও পবিত্র। সে বলল,
“আপনারা এইভাবে একদম ভেঙে পড়বেন না। কৌশিক ভাইয়া আর রোহিত ভাইয়া থাকতে মায়া ভাবির কিচ্ছু হবে না। আমি ভাবিকে চিনি, ও খুবই ভদ্র আর ভালো মেয়ে, ওনার ভেতরে এক অন্যরকম শক্তি আছে। আল্লাহ ওনাকে রক্ষা করবেন দেখো।”
​নিধির এই সান্ত্বনা চৌধুরী ভিলার গুমোট হাওয়াকে কিছুটা হালকা করলেও, মায়ার নিখোঁজ হওয়ার সেই গভীর ক্ষতটা কাউকেই শান্তি দিচ্ছিল না। নিধি মনে মনে ওর চেনা সেই রাগী ও জেদি মনটাকে একপাশে সরিয়ে রেখে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করতে লাগল, যেন রোহিত আর কৌশিক ভাইয়া সুস্থভাবে মায়া ভাবিকে ফিরিয়ে আনতে পারেন।

​রাত ৩ টা বেজে ২৭ মিনিট। কৌশিকের জিপটি এখন বাড্ডা রামপুরা লিংক রোডের এক অন্ধকার মোড়ে এসে থামল। জিপের হেডলাইট নেভানো, শুধু ড্যাশবোর্ডের হালকা আলোয় কৌশিক আর রোহিতের মুখ দেখা যাচ্ছে। রোহিতের ল্যাপটপের স্ক্রিনে একটা লাল ডট অনবরত ব্লিংক করছিল।
​“ব্রো! আইটি হেড সাকসেসফুল হয়েছেন!”
রোহিত উত্তেজিত হয়ে বলল, কিন্তু ওর গলার আওয়াজ ছিল ফিসফিসানি।
“ভাবির ফোনটা বন্ধ হওয়ার ঠিক দুই মিনিট আগে এই বাড্ডার আনন্দ নগর এলাকার একটা টাওয়ার থেকে সিগন্যাল পেয়েছিল। এই যে এই গলিটা… এই গলির শেষ মাথায় একটা পুরনো ভাঙাচোরা গ্যারেজ আছে। ওটাই এই এরিয়ার একমাত্র নির্জন স্পট।”
​কৌশিক ল্যাপটপের স্ক্রিনের দিকে এক নজর তাকাল। ওর চোখ দুটো অন্ধকার বিড়ালের মতো ধারালো হয়ে উঠল। সে জিপের দরজাটা আলতো করে খুলে নিচে নামল। ওর কোমর থেকে এক চকচকে, কালো রঙের নাইন-এমএম পিস্তল বের করে ওটার ম্যাগাজিনটা চেক করে নিল। ওর এই অ্যাকশন দেখে রোহিতও ওর জিপের গ্লাভস বক্স থেকে একটা রিভলভার বের করে নিল। কৌশিক অত্যন্ত নিচু স্বরে বলল,
​“রোহিত, তুই জহিরের টিম ব্যাকআপে আসার আগ পর্যন্ত এই গলির মুখে পজিশন নে। আমি একাই ভেতরে যাচ্ছি।”

​“না ব্রো, আমি তোকে একা যেতে দেব না। মায়া আমার সম্পর্কে বোন আবার ভাবিও হয়। আমি তোর সাথেই যাব।”
রোহিত দৃঢ় গলায় বলল। ওর চোখে আজ ওর ভাইয়ের মতোই এক প্রতিরক্ষামূলক দেওয়াল তৈরি হয়ে গেছে। ওরা দুজনে চৌধুরী বংশের দুই স্তম্ভ, আজ কোনো জানোয়ারের দল ওনাদের শক্তিকে খাটো করতে পারবে না। কৌশিক রোহিতের দিকে তাকিয়ে আর বারণ করল না। দুই ভাই সিংহের মতো নিস্তব্ধ পায়ে বাড্ডার সেই অন্ধ, নোংরা গলির ভেতর ঢুকতে লাগলেন। চারদিকের ড্রেনের দুর্গন্ধ আর ভাঙা দেওয়ালগুলোর মাঝে এক গা ছমছমে পরিবেশ। গলির শেষ মাথায় সত্যি একটা বিশাল লোহার সাটার দেওয়া গ্যারেজ দেখা গেল। ওটার ভেতর থেকে মৃদু আলোর আভাস পাওয়া যাচ্ছিল এবং কিছু মানুষের নিচু কণ্ঠস্বরের আওয়াজ আসছিল। ​কৌশিক সাটারের একটা ছোট ফুটো দিয়ে ভেতরে তাকাল। ওর বুকের ভেতরটা এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। গ্যারেজের ভেতরে সেই কালো মাইক্রোবাসটা দাঁড়িয়ে আছে! গাড়ির বনেট তখনো গরম, আর চার-পাঁচজন লোক ওটার চারপাশে দাঁড়িয়ে অস্ত্র হাতে কথা বলছে। কিন্তু… কিন্তু মায়া সেখানে কোথাও নেই।
​“বস, ওই মেয়েটাকে তো আমরা অলরেডি বড় ট্রাকে তুলে দিয়েছি। কাঁচপুর ব্রিজ পার হয়ে ওটা তো এতক্ষণে ঢাকার বাইরে চলে গেছে হয়তো।”
ভেতরের একজন লোক ওর অন্য সহযোগীকে বলছিল। এই কথাটি কৌশিকের কানে পৌঁছানো মাত্রই ওর ভেতরের সেই অবরুদ্ধ বাঘ এক ঝটকায় শিকল ছিঁড়ে বেরিয়ে এল। ওর মায়াকে ওরা অলরেডি ঢাকার বাইরে পাঠিয়ে দিয়েছে! কৌশিক আর এক সেকেন্ডও নিজের মাথা ঠান্ডা রাখতে পারলেন না। সে নিজের ডান পা দিয়ে সেই লোহার সাটারে এক প্রচণ্ড জোরে লাথি মারলেন। ​কড়কড়াত… ধপাস! লোহার সাটারটা ওর পায়ের তীব্র শক্তিতে লক ভেঙে ভেতরের দিকে পড়ে গেল। গ্যারেজের ভেতরের লোকগুলো চমকে উঠে ওদের অস্ত্রের দিকে হাত বাড়ানোর আগেই কৌশিকের পিস্তল থেকে বের হলো প্রথম বুলেট।

​ঠাস! ঠাস!
​কৌশিকের নিখুঁত নিশানায় প্রথম দুজন লোকের পায়ে বুলেট বিঁধল এবং ওরা আর্তনাদ করে মেঝেতে লুটিয়ে পড়ল। রোহিতও ওর রিভলভার থেকে এক রাউন্ড ফায়ার করে অন্য একজনের হাতের অস্ত্রটা ফেলে দিল। পুরো গ্যারেজ জুড়ে মুহূর্তের মধ্যে এক রুদ্ধশ্বাস যুদ্ধের পরিবেশ তৈরি হলো। ​কৌশিক ঝড়ের গতিতে এগিয়ে গিয়ে সেই টিমের মেইন লোককে, যে কিনা দুপুরে মায়ার ওপর ক্লোরোফর্ম চেপে ধরেছিল, ওর কলারটা এক হাতে ধরে ওকে দেয়ালের সাথে সপাটে আছাড় মারল। কৌশিকের হাতের প্রতিটি আঘাত ছিল এক একটা লোহার হাতুড়ির মতো। সে লোকটার মুখে পরপর দুটো ঘুষি মারল, যার আঘাতে লোকটার তিনটে দাঁত ভেঙে পড়ে গেলো আর সেখান থেকে অঝরে রক্ত বের হতে লাগল।
​“কু*ত্তা*র বাচ্চা বল আমার মায়া কোথায়? স্পষ্ট বল, অন্যথায় তোর এই নোংরা জিভ আমি নিজের হাতে টেনে টেনে হিঁচড়ে বের করব!”
কৌশিক লোকটার গলায় ওর পিস্তলের নলটা শক্ত করে চেপে ধরল। ওর চোখের সেই তীক্ষ্ণ চাহনি দেখে সেই হিংস্র অপরাধীও ভয়ে নিজের প্যান্ট ভিজিয়ে ফেলার মতো অবস্থা হলো।
​“আ-আমি জানি না বস, আমাকে ছেড়ে দিন। ওনাকে তো বড় ট্রাকে করে,চিটাগং পোর্টের দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। ভোর ৫ টার মধ্যে ওখানকার জাহাজে তুলে দেওয়া হবে,এর বেশি আমি আর কিছু জানি না প্লিজ আমাকে মারবেন না!”

লোকটা কাঁপতে কাঁপতে সত্য কথাটি উগড়ে দিল।
​চিটাগং পোর্ট! ভোর ৫টা! কৌশিক নিজের হাতের ঘড়ির দিকে তাকাল। সময় এখন ৩টা বেজে ৫৫ মিনিট। ঢাকা থেকে চিটাগং পোর্টে পৌঁছাতে সাধারণ গাড়িতেও অন্তত তিন থেকে চার ঘণ্টা সময় লাগে। কিন্তু ওর কাছে আছে মাত্র এক ঘণ্টা ৫ মিনিট! ​কৌশিক লোকটাকে এক ঝটকায় মেঝের ওপর ছুঁড়ে ফেলে দিল। ওর ভেতরের সেই ভালোবাসার শক্তি ওকে এক অবিশ্বাস্য সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করল। সে রোহিতের দিকে তাকিয়ে বলল,
“রোহিত! জহিরের টিমকে বল এই গ্যারেজের প্রতিটা কুত্তাকে যেন পুলিশে দেওয়ার আগে ওদের হাত-পা ভেঙে দেয়। আর তুই… তুই এই মুহূর্তে এয়ারফোর্সের ওয়ান অব মাই ফ্রেন্ডস ‘শাফিন’কে কল কর। চৌধুরী গ্রুপের প্রাইভেট হেলিকপ্টারটা যেন এই মুহূর্তের মধ্যে তেজগাঁও ওল্ড এয়ারপোর্টে রেডি করা হয়! আই নিড টু ফ্লাই রাইট নাউ!”
​রোহিত কৌশিকের এই রাজকীয় ও তীব্র সিদ্ধান্ত শুনে এক সেকেন্ডের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল, কিন্তু পরক্ষণেই সে ওর ভাইয়ের ক্ষমতার গভীরতা বুঝতে পারল। কৌশিক নীর চৌধুরী ওর মায়াবতী পরীকে ফিরিয়ে আনার জন্য পুরো আকাশটাকেও নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে আসতে পারে।

ঢাকা-চট্টগ্রাম হাইওয়ের ওপর দিয়ে এক বিশাল দশ চাকার কার্গো ট্রাক তীব্র গতিতে ছুটে চলেছিল। ট্রাকের পেছনের বিশাল লোহার কন্টেইনারের ভেতরটা পুরোপুরি অন্ধকার, ঘুটঘুটে কালো। সেখানে কোনো জানালা নেই, কোনো আলোর বিন্দু নেই। শুধু তীব্র ভ্যাপসা গরম আর বাতাসের অভাব। সেই অন্ধকারের মাঝে এক কোণে নিথর হয়ে পড়ে ছিল মায়া। ওর কপাল বেয়ে পড়া রক্তটা এতক্ষণে শুকিয়ে কালো হয়ে জমাট বেঁধে গেছে। ​ক্লোরোফর্মের তীব্র নেশাটা আস্তে আস্তে কেটে আসছিল। মায়া ওর চোখ দুটো খুব কষ্ট করে মেলল। চারদিকের নিশ্ছিদ্র অন্ধকার দেখে ওর মনে হলো সে যেন কোনো জ্যান্ত কবরের ভেতর শুয়ে আছে। ওর সারা শরীর ব্যথায় ভেঙে আসছিল, বিশেষ করে মাথার সেই আঘাতের জায়গাটা অনবরত দপ দপ করছিল। ​মায়া ধীর পায়ে উঠে বসার চেষ্টা করল। ওর সাধের বাসন্তী শাড়িটা এখন পুরোপুরি ধুলো আর রক্তে নোংরা হয়ে গেছে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, ওর মনের ভেতর এখন আর কোনো ভীতি নেই। তিয়াশাকে সে সফলভাবে বাঁচাতে পেরেছে, এই একটিমাত্র চিন্তা ওকে এক অদ্ভুত মানসিক শক্তি দিচ্ছিল। সে চৌধুরী ভিলার বড় বউ, সে আজ নিজের জীবন বাজি রেখে প্রমাণ করেছে যে সে কৌশিকের কেবল এক ভীরু ‘চিপকালি’ নয়।

​“আপনি নিশ্চয়ই আমাকে খুঁজছেন, আমি জানি।”
​মায়া অন্ধকারের মাঝেই মনে মনে ওর স্বামীর সেই গম্ভীর, নেশাতুর আর কর্তৃত্ববাদী মুখটা স্মরণ করল। সে জানত, কৌশিক ওকে খুঁজতে পুরো পৃথিবীটা ওলটপালট করে ফেলবে। ওর প্রাণ থাকতে ওকে এই নরকে এক মুহূর্তের জন্যও বন্দি থাকতে দেবে না। কিন্তু মায়াকে নিজের দিক থেকেও শক্ত হতে হবে। সে যদি শুধু ওর স্বামীর আসার অপেক্ষায় হাত গুটিয়ে বসে থাকে, তবে হয়তো এই আন্তর্জাতিক অপরাধীরা ওকে এমন এক জায়গায় নিয়ে যাবে, যেখান থেকে ওর ফেরা কোনোদিন আর সম্ভব হবে না। ​মায়া অন্ধকারের মাঝেই নিজের হাত দুটো দিয়ে চারপাশটা হাতড়াতে লাগল। হুট করেই ওর নরম হাতটা লাগল একটা ধারালো লোহার পাতের ওপর, যা ট্রাকের কন্টেইনারের এক কোণে পড়ে ছিল। মায়া ওটা নিজের হাতে শক্ত করে কামড়ে ধরার মতো করে তুলে নিল। ওর চোখের দৃষ্টি এখন আর কোনো ভীরু মেয়ের নয়, ওটা এক লড়াকু রানীর দৃষ্টির মতো ধারালো। ​ঠিক তখনই ট্রাকটি একটা তীব্র ঝাঁকুনি দিয়ে ব্রেক কষল। মায়া ছিটকে গিয়ে ট্রাকের লোহার দেওয়ালে সপাটে ধাক্কা খেল। বাইরে কিছু মানুষের চিললানোর আর বুট জুতোর কর্কশ শব্দ শোনা গেল। ট্রাকের পেছনের বিশাল ভারী লকটা খোলার শব্দ হলো,
‘খটখট… ক্যাঁচ!’
​কন্টেইনারের দরজাটা একটু খুলতেই বাইরের ভোরের আবছা আলো ভেতরের জমাট বাঁধা অন্ধকারকে চিরে দিল। মায়া চোখ পিটপিট করে বাইরে তাকিয়ে দেখতে পেল তারা একটা বিশাল জাহাজের জেটির কাছে এসে থামছে। চারদিকে বড় বড় ক্রেন আর সমুদ্রের নোনা জলের গন্ধ। তার মানে, তারা চিটাগং পোর্টে পৌঁছে গেছে! ​দরজার সামনে এসে দাঁড়াল দুজন সশস্ত্র প্রহরী। ওদের একজন কন্টেইনারের ভেতরে মায়ার দিকে তাকিয়ে কুৎসিতভাবে দাঁত বের করে হাসল,
“কী রে বা*ন্দি*র বাচ্চা? তোর জ্ঞান ফিরেছে দেখছি? চল, এবার তোর আসল রাজপ্রাসাদে যাওয়ার সময় হয়েছে। এই জাহাজে একবার উঠলে তোকে আর এ দেশের কেউ কোনোদিন খুঁজে পাবে না। তোর ওই জাঁদরেল সোয়ামীও না।”

​লোকটা মায়ার হাত ধরে টেনে বাইরে আনার জন্য কন্টেইনারের ভেতর ঢুকতেই মায়া ওর সেই নরম-শরম স্বভাব পুরোপুরি বর্জন করে এক অবিশ্বাস্য স্ট্রং মুভ নিল। সে নিজের হাতের সেই লোহার পাতটা দিয়ে লোকটার চোখের ওপর এক তীব্র ও ধারালো আঘাত করল।
​“আহ্! আমার চোখ! শা*লী তোকে আমি ছিঁড়ে ফেলব!”
লোকটা নিজের চোখ চেপে ধরে তীব্র ব্যথায় চিৎকার করে মেঝেতে লুটিয়ে পড়ল।
​অন্য লোকটা মায়ার এই আকস্মিক রূপ দেখে এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। সে ওর হাতের রিভলভারটা তুলতে যাবে, ঠিক তখনই মায়া ট্রাকের কন্টেইনার থেকে নিজের পুরো শরীরের ওজন দিয়ে লোকটার ওপর বাঘিনীর মতো ঝাঁপিয়ে পড়ল। দুজনে মিলে জেটির শক্ত সিমেন্টের মেঝের ওপর আছাড় খেয়ে পড়ল। মায়া লোকটার হাতের অস্ত্রটা কেড়ে নেওয়ার জন্য ওর কব্জিতে নিজের দাঁত দিয়ে সজোরে কামড় বসাল। ​কিন্তু অপরাধী টিমটা ছিল অনেক বড়। এই ধস্তাধস্তির শব্দ শুনে চারপাশ থেকে আরও তিন-চারজন লোক লাঠি আর চাবুক হাতে মায়ার দিকে দৌড়ে এল। মায়া একা এই হিংস্র পুরুষগুলোর সাথে কতক্ষণ পারবে? একজন পেছন থেকে ওর পিঠে এক প্রচণ্ড জোরে লাথির আঘাত করল, যার চোটে মায়া ছিটকে গিয়ে সিমেন্টের মেঝেতে মুখ থুবড়ে পড়ল। ওর ঠোঁট কেটে এক চিলতে তাজা রক্ত বের হয়ে জেটির মেঝেতে লেপ্টে গেল।

​“এই মা*গী তো দেখছি আস্ত এক ডাইনি রে! ওর এত সাহস কীভাবে হলো?”
টিমের অন্য একজন মায়ার চুলটা মুঠো করে ধরে হেঁচকা টানে ওকে সোজা করে দাঁড় করাল। ওরা মায়ার ওপর বর্বর নির্যাতন করার জন্য চামড়ার চাবুকটা ওপরে তুলল। ​মায়া ওর চোখ দুটো বন্ধ করে ফেলল। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, ওর ঠোঁটের কোণে তখনো এক অবাধ্য, অদম্য হাসি রয়ে গেছে। সে ওর শেষ নিশ্বাস পর্যন্ত লড়বে, এই প্রতিজ্ঞা ওনার মনে স্থির। ​ঠিক তখনই… ঠিক সেই মুহূর্তে চিটাগং পোর্টের মেঘাচ্ছন্ন সকালের আকাশ কাঁপিয়ে এক অবিশ্বাস্য ও ভয়ংকর গর্জন শোনা গেল। সমুদ্রের নোনা বাতাসকে চিরে দিয়ে পোর্টের ওপর হুট করে এসে হাজির হলো এক বিশাল, কালো রঙের বিলাসবহুল প্রাইভেট হেলিকপ্টার। ওটার গায়ে সোনালী অক্ষরে জ্বলজ্বল করছিল,
‘CHOUDHURY GROUP’

​হেলিকপ্টারের রোটরের তীব্র বাতাসে পোর্টের চারদিকের ধুলোবালি, কন্টেইনারের চাদর আর অপরাধীদের জামাকাপড় ওলটপালট হতে লাগল। পাচারকারী চক্রের লোকগুলো অবাক হয়ে আকাশের দিকে তাকাল। ওরা বুঝতে পারছিল না যে এই ভোরের আলো ফোটার আগে পোর্টের এই হাই-সিকিউরিটি জোনে কার হেলিকপ্টার এভাবে নিয়ম ভেঙে ল্যান্ড করার চেষ্টা করছে। ​হেলিকপ্টারটি জেটির মেঝের ঠিক কয়েক ফুট ওপরে এসে স্থির হলো। ওটার মেইন স্লাইডিং দরজাটা এক ঝটকায় খুলে গেল। আর সেখান থেকে যে পুরুষটি নিচে লাফিয়ে পড়ল, ওকে দেখে পোর্টের সমস্ত পরিবেশ যেন এক সেকেন্ডে বরফ হয়ে গেল। ​পরনে সেই সাদা শার্ট, যার হাতা দুটো কনুই পর্যন্ত গুটানো। বুকে জমাট বাঁধা আগুন, আর দুই হাতে দুটো নাইন-এমএম অটোমেটিক পিস্তল। কৌশিক নীর চৌধুরী! ওর পেছনেই লাফিয়ে পড়ল রোহিত, ওর হাতেও তখন জ্বলন্ত রিভলভার। ওরা দুজনে যেন এই পোর্টের বুকে নেমে আসা দুই সাক্ষাৎ যমদূত।
​কৌশিকের চোখ যখন মাটিতে ধুলোবালি আর রক্তে মাখামাখি অবস্থায় পড়ে থাকা মায়ার ওপর পড়ল, মায়াকে দেখা মাত্রই কৌশিকের ভেতরের সেই লাভার রূপ পুরোপুরি এক শয়তানে রূপান্তরিত হলো। ওর চোখের মণি দুটো রাগে যেন ফেটে চৌচির হয়ে গেল। ওর বুকের ভেতরটা কেউ যেন জ্যান্ত পুড়িয়ে দিল।

​“ফায়ার, রোহিত! এই পোর্টের একটা কুত্তাও যেন আজ জ্যান্ত ফেরত না যায়! সবকটাকে কুচি কুচি করে কেটে সাগরে ভাসিয়ে দে!”
কৌশিক এক আহত বাঘের মতো গর্জে উঠলেন।
‘​ঠাস! ঠাস!ঠাস!ঠাস!’
​কৌশিক আর রোহিতের দুই হাতের অস্ত্র থেকে অবিরাম বুলেটের বৃষ্টি শুরু হলো। পাচারকারী চক্রের লোকগুলো কিছু বুঝে ওঠার বা অস্ত্র তোলার আগেই ওদের বুকের ভেতর তপ্ত বুলেট বিঁধতে লাগল। পোর্টের সেই শান্ত জেটি মুহূর্তের মধ্যে এক রক্তাক্ত কসাইখানায় পরিণত হলো। রোহিত ওর নিখুঁত নিশানায় মায়ার চারপাশে থাকা তিনজনকে এক সেকেন্ডে মাটিতে শুইয়ে দিল। ওর চোখে আজ ওর বড় ভাইয়ের মতোই এক তীব্র রিভেঞ্জের আগুন জ্বলছিল। কৌশিক পিস্তল দুটো হোলস্টারে পুরে ঝড়ের গতিতে মায়ার দিকে এগিয়ে গেল। ওর সমস্ত শরীর তখনো রাগে কাঁপছিল, কিন্তু মায়ার কাছাকাছি আসতেই সেই রাগ এক লহমায় কর্পূরের মতো উড়ে গেল। সে মায়ার সামনে হাঁটু গেড়ে বসল। ওর যে হাত দুটো দিয়ে সে সারাজীবন কর্পোরেট দুনিয়ার কোটি কোটি টাকার ডিল সাইন করেছে, যে হাত অবলীলায় শত্রু দমনে পিস্তল ধরেছে, আজ সেই হাত দুটো কাঁপছিল মায়াকে ছুঁতে। এক তীব্র শঙ্কা আর পরম আকুলতায় সে মায়ার রক্তাক্ত মুখটা নিজের শক্ত বুকের মাঝে টেনে নিল। কৌশিকের ধবধবে সাদা শার্টের কলারটা মায়ার তাজা রক্তে মুহূর্তেই লাল হয়ে গেল।

​“মায়া- এই মায়া,চোখ খোলো, জান! এ-এই
দে-দেখো তোমার কৌশিক চলে এসেছে। আই এম সরি, সুইটহার্ট,আমি তোমাকে বাঁচাতে একটু দেরি করে ফেললাম। আমাকে ক্ষমা করে দাও, আমি আসলেই একটা স্টুপিড মায়া,এই মায়া, মায়া,চোখ খোলো জান আমার।”
​কৌশিকের সেই বজ্রকঠিন কণ্ঠস্বর এবার ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। ওর চোখ ফেটে বেরিয়ে এল অবাধ্য অশ্রুধারা। এক ফোঁটা তপ্ত জল টুপ করে গিয়ে পড়ল মায়ার ফ্যাকাশে, রক্তাভ গালে। চৌধুরী বংশের সেই দোর্দণ্ড প্রতাপশালী পুরুষ, যার এক ইশারায় পুরো ঢাকা শহর থরথর করে কাঁপে, সে আজ তার ভালোবাসার সামনে সম্পূর্ণ অসহায়। ওর এতদিনের অবাধ্য ভালোবাসা আর কঠোর যত্ন আজ এক পরম ব্যাকুল আর্তনাদে রূপ নিল। ​মায়া খুব কষ্ট করে ওর ভারী হয়ে আসা চোখ দুটো মেলল। কৌশিকের সেই চেনা কড়া পারফিউমের সুবাস আর ওর বুকের সেই চিরন্তন চেনা উষ্ণতা অনুভব করতেই মায়ার সমস্ত শারীরিক কষ্ট যেন এক সেকেন্ডে গায়েব হয়ে গেল। সে তার দুর্বল, অবস ও রক্তমাখা হাতটা কোনোমতে তুলে কৌশিকের শক্ত গালে রাখল। ওর রক্তহীন ঠোঁটে এক পরম তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল।

​“আ-আমি জানতাম, আপনি আসবেন আমাকে বাঁচাতে। আমার কৌশিক আমাকে এই নরকে কোনোদিন একা ফেলে রাখতে পারে না।”
​মায়ার কণ্ঠস্বর এতটাই ফিসফিসে ছিল যে, তা কেবল কৌশিকের কান নয়, সরাসরি ওর কলিজায় গিয়ে বিঁধল। কৌশিক আর নিজেকে সামলাতে পারল না। সে মায়ার কপালে, ওর সেই আঘাতের জায়গাটায় নিজের ঠোঁট দুটো পরম মায়া ও ভালোবাসায় ডুবিয়ে দিল। ওর এই স্পর্শে কোনো দ্বিধা ছিল না, ছিল এক পরম অধিকারবোধ আর সারাজীবন আগলে রাখার অব্যক্ত প্রতিজ্ঞা। সে মায়াকে এক ঝটকায় নিজের চওড়া কোলে তুলে নিল, যেন সে আজ এই পৃথিবীর সবচেয়ে দামী প্রোপার্টিকে, তার নিজের হারিয়ে যাওয়া প্রাণকে আবার নিজের দখলে ফিরিয়ে নিয়েছে। ​সে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে চারপাশের ধ্বংসস্তূপের দিকে এক নজরে তাকাল। তার চোখের সেই খুনে লাল আলো এখনো পুরোপুরি নিভে যায়নি। সে পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা রোহিতের দিকে তাকিয়ে বরফশীতল কিন্তু স্পষ্ট গলায় আদেশ দিল:

​“রোহিত! জহিরের টিমকে বল এই পোর্টের প্রতিটি ইঞ্চি ক্লিন করতে। এখানে যেন ওই জানোয়ারগুলোর কোনো চিহ্ন না থাকে। আর আমরা, আমরা এখনই হেলিকপ্টারে করে ব্যাক করছি। ওদের জান নেওয়ার থেকেও মায়ার ট্রিটমেন্ট এই মুহূর্তের মধ্যে আমার কাছে সবচেয়ে বেশি জরুরি। ওদের আমি পরে দেখে নেব, এই কৌশিক নীর চৌধুরীর হাত থেকে রেহাই পাওয়ার ক্ষমতা ওদের চৌদ্দ পুরুষেরও নেই। তার আগে মায়ার ট্রিটমেন্ট আমাদের পার্সোনাল হসপিটালে শুরু হবে। তার ব্যবস্থা কর। কুইক!”
​রোহিত ওর রিভলভারটা পকেটে পুরে মায়ার দিকে তাকিয়ে একটু হাসল। ওর চোখ দুটোও তখন পরম কৃতজ্ঞতায় আর স্বস্তিতে ভিজে এসেছিল। সে মায়াকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“ভাবি, তুমি আসলেই এক সত্যিকারের সিংহী। আজ তুমি নিজের জীবন বাজি রেখে তিয়াশাকে যেভাবে বাঁচিয়েছ, ওটার পর চৌধুরী ভিলার ইতিহাস চিরকালের জন্য বদলে যাবে। আমাদের পুরো পরিবার তোমার কাছে ঋণী হয়ে রইল। আর ব্রো… তুই আসলেই গ্রেট। তোমাদের নিয়ে আমার খুব গর্ব হচ্ছে। ভাগ্য কতটা ভালো হলে এমন ভাই-ভাবি নিজের লাইফে পাই।”

প্রণয়ের ঘোর রাত পর্ব ৩৩ (২)

​কৌশিক আর কোনো কথার উত্তর দিল না। সে মায়াকে নিজের বুকের সাথে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে পাঁজাকোলা অবস্থায় হেলিকপ্টারের দিকে এগিয়ে গেল। ঠিক তখনই ভোরের প্রথম সোনালী রোদ কুয়াশা ভেদ করে সমুদ্রের নীলাভ জলের ওপর এসে পড়েছে। চারদিকের অন্ধকার কেটে গিয়ে যেন এক নতুন ভোরের সূচনা হলো। মায়া কৌশিকের শক্ত বুকের ভেতর নিজের মুখটা আরও গভীরভাবে লুকিয়ে এক পরম শান্তি অনুভব করল। সে চোখ বুজে মনে মনে হাসল। সে খুব ভালো করেই জানত, এই পুরুষের ভালোবাসার ঘোর, এই তীব্র আকর্ষণের বেড়াজাল থেকে পালানোর কোনো পথ নেই; আর সে কোনোদিন এই খাঁচা থেকে মুক্তি চায়ও না।

প্রণয়ের ঘোর রাত পর্ব ৩৫

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here