প্রণয়ের ঘোর রাত পর্ব ৬
আরাফাত আদনান সামি
সারা রাতের অন্ধকার ধীরে ধীরে সরে গিয়ে আকাশে উঁকি দিল নতুন সকাল। ভোরের আলো যেন সোনালি রঙের তুলির আঁচড়ে পুরো দিগন্তকে রাঙিয়ে তুলল। সূর্য ধীরে ধীরে মাথা উঁচু করে উঠছে, আর তার উজ্জ্বল কিরণ আলতো করে ছড়িয়ে পড়ছে চারদিকে। গাছের পাতায় জমে থাকা ছোট্ট ছোট্ট শিশিরবিন্দু আলোয় ঝলমল করে উঠছে, যেন মুক্তার মালা ছড়িয়ে আছে পাতার উপর। বাতাসে হালকা শীতলতা, সেইসঙ্গে পাখিদের কিচিরমিচিরে ভরে গেছে চারপাশ। মনে হচ্ছে প্রকৃতি যেন এক নতুন সুরে গান গাইছে।
দূরের মাঠের ঘাসভরা জমিতে শিশির কণারা ঝলসে উঠছে সূর্যের আলোয়, যেন আকাশের তারারা নেমে এসেছে মাটিতে। ফুলগুলো তাদের ঘুম ভেঙে মাথা উঁচু করেছে, হাওয়ার ছোঁয়ায় আস্তে আস্তে দুলছে, যেন সকালের হাসি ছড়িয়ে দিচ্ছে চারদিকে। এই সকালটা ছিল অন্য দিনের মতো নয়। মনে হচ্ছিল, যেন প্রকৃতি নতুনভাবে সাজিয়েছে নিজেকে শান্ত, নির্মল আর সজীব এক আবহ তৈরি করে।
সকালটা ছিল কুয়াশায় মোড়ানো। জানালার ফাঁক গলে আসা ঠান্ডা বাতাস মায়ার গায়ে হালকা কাঁপুনি ধরিয়ে দিলো। ঘুম ভাঙতেই সে অনুভব করল, চারপাশটা যেন এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতায় আচ্ছন্ন।
মায়া চোখ মেলে চারপাশে তাকাল। জানালার ওপাশে ধূসর কুয়াশার পর্দা নেমে এসেছে। হালকা শীতল হাওয়া ভেতরে ঢুকে তাকে আরও গুটিয়ে নিল চাদরের ভাঁজে। গা শিউরে ওঠায় সে অনিচ্ছা সত্ত্বেও নিজেকে চাদরে ঢেকে ফেলল।
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
আজকের সকালটা অন্যরকম এটা মায়া সঙ্গে সঙ্গেই টের পেল। পরিবেশে একরকম গুমোট ভাব ছড়িয়ে আছে, যা তাকে অস্বস্তিতে ফেলল। সূর্যের আলো একবার ঘরের ভেতর এসে উজ্জ্বল করে তুলছে, আবার হঠাৎ করেই মেঘের আড়ালে মিলিয়ে যাচ্ছে।
না, এভাবে আর শুয়ে থাকলে চলবে না মায়া নিজের মনে ভাবল। সে ধীরে ধীরে বিছানা ছেড়ে নামল। মখমলের চাদর গায়ে জড়িয়ে জানালার পর্দা সরিয়ে পাশের আরেকটা জানালা খুলে দিল। মুহূর্তের মধ্যে উত্তরের হাওয়া এসে তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে নিলো।
হাই তুলে জানালা দিয়ে নিচে তাকাতেই তার মনে পড়ে গেল গত রাতের কথা। মনে পড়তেই গা শিউরে উঠল।
“আমি জ্ঞান হারানোর পর ভাইয়া আমার সঙ্গে কিছু করেছে নাকি? রাতে আমাদের মাঝে আর কিছু হয়নি তো? উফ্! কিছুই মনে পড়ছে না মাথাটাও ভারি হয়ে যাচ্ছে।”
মায়া মাথায় হাত দিয়ে আয়নার দিকে এগোতে লাগল। আয়নায় নিজেকে দেখে হঠাৎ থ হয়ে গেল সে।
“এ কী! আমি তো এই জামাটা কাল পড়িনি। কাল তো আমি নীল জামা পরে বৃষ্টিতে ভিজেছিলাম। তাহলে আমার জামা বদলালো কে?”
মায়ার বুক ধড়ফড় করতে লাগল। ভয় যেন আস্তে আস্তে গ্রাস করে নিল তাকে।
“কাল কৌশিক ভাইয়া আমার সঙ্গে কোনো উল্টো-পাল্টা কিছু করে নি তো?”
তার এমন ভাবনা ভেদ করে দরজা খুলে ভেতরে এলেন সালমা বেগম। হাতে এক কাপ ধোঁয়া ওঠা চা। মুচকি হেসে বললেন,
“আমি জানি তুমি কী নিয়ে ভাবছো। চিন্তা করার কিছু নেই। কাল তোমার ভেজা জামা আমি-ই বদলে দিয়েছি,আর নতুন জামা পরিয়েছি। বাহ্, মানতেই হবে ছেলেটা তো বেশ বুদ্ধিমান, আর স্মার্টও বটে। সে-ই আমাকে বলেছিল, তুমি ঘুম থেকে উঠলে যেন আমি সব খুলে বলি। না হলে নাকি তুমি উল্টো-পাল্টা চিন্তা করবে। দেখো, ছেলেটার কথাই তো হলো এখন তুমি ঠিক তাই ভেবেই ঘাবড়ে ছিলে, তাই না?”
সালমা বেগম এইসব বলতে বলতে চায়ে চিনি মিশাচ্ছিলেন।
মায়া এতক্ষণ একটা ব্যাপারে ঘাবড়ে ছিলো, সেটা কেটে যেতেই যেন আরও বড় চিন্তার মধ্যে পড়ে গেল সে। বিড়বিড় করে বলল,
“না মানে ইয়ে..আসলে ব্যাপারটা হলো…”
ওমনি সালমা বেগম আবার বলে উঠলেন,
“হইছে হইছে, আমি এই বাড়ির কাজের লোক। আমাকে এত সাফাই দিতে হবে না। তোমার মালিকানা মানতে আমার দরকার নেই।”
মায়া ভ্রুকুচকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকালেন তার দিকে।
“সই, তুমিও না! তোমাকে না আমি কতবার বলেছি তুমি কখনো তোমাকে এসব চাকর-ফাকর বলবে না। আমরা তো কখনো ভাবি না তুমি কাজের লোক। তুমি আমাদের পরিবারের একজন। আর আমার মিষ্টি সইও। বুঝেছো? আমার জন্মের আগেই আমার দাদা-দাদি মারা গেছেন। কিন্তু তাদের অভাবটা তুমি কোনোদিনই আমাকে বুঝতে দাওনি, সই।”
এক মুহূর্ত থেমে মায়া মিষ্টি হেসে বলল,
“ইউ আর মাই ক্লোজেস্ট ফ্রেন্ড।”
সালমা বেগম বলে উঠলেন,
“হইছে হইছে বাপু, এত এংরেজি-টিংরেজি আমি বুঝি না। তোমাকে আমাকে নিয়ে চিন্তা করতে হবে না। কালকের রাতের ব্যাপারে আমি কাউকে কিছু বলব না। তবে একটা কথা মনে রেখো ছেলেটা তোমাকে সত্যিই ভালোবাসে, আর আমিও জানি তুমি-ও তাকে ভালোবাসো। মনে রেখো,
ভালোবাসা এক বিস্ময়কর রহস্য। কখনো তা মানুষকে ভেতর থেকে ভেঙে দেয়, ধ্বংস করে ফেলে সব স্বপ্ন; আবার কখনো নিস্তেজ প্রাণকে নতুন করে বাঁচতে শেখায়। চোখের প্রতিটি অশ্রু জানান দেয়, মায়া কতটা ভয়ংকর হতে পারে। ভালোবাসা যতটা সুন্দর, মায়ার আঁকড়ে ধরা ততটাই নির্মম।
আমরা যাকে পেতে চাই, সে প্রায়শই আমাদের হয় না; আর যারা আমাদের পেতে চায়, তাদের দিকে আমরা ফিরেও তাকাই না। এ-ই ভালোবাসার অদ্ভুত নিয়তি। তাই ভালোবাসাকে কখনো অবহেলা করো না। কারণ পৃথিবী বড়ই নিষ্ঠুর। তুমি বুঝে ওঠার আগেই তোমার ভালোবাসার মানুষ হয়তো হারিয়ে যাবে অনেক দূরে, এমন এক স্থানে, যেখান থেকে তাকে আর ফেরানো যাবে না। যদি সত্যিই ওই ছেলেটিকে ভালোবাসো, তবে তাকে আর কষ্ট দিও না। কারণ একবার ভালোবাসার মানুষ হারিয়ে গেলে, সেই শূন্যতাই মানুষের জীবনে সবচেয়ে বড় শাস্তি হয়ে দাঁড়ায়, যা জীবিত থেকেও মৃত্যু ঘোষণা করে দেয়।”
“চা রেডি আছে, খেয়ে নিও।”
এই বলে সালমা বেগম হনহন করে চলে গেলেন।
মায়া বাংলার পার্চের মতো মুখ বেঁকিয়ে ভেবাচেকা খেয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
“কী বলে গেল আমার সই আমাকে? আর এতকিছুই বা কীভাবে জানল? সবকিছু ছেড়েই দিলাম, কৌশিক ভাইয়া আমাকে সত্যিই ভালোবাসে এটা এত জোর দিয়ে কীভাবে বলল? তাহলে আমি কেনো কৌশিক ভাইয়ার ভালোবাসা দেখতে পাচ্ছি না?”
হঠাৎ মায়ার ভেতর থেকে আবেশে কালো ড্রেস পরা আরেকটা ‘মায়া’ বেরিয়ে এলো। সে তিরস্কারের সুরে বলল,
“এত কী ভাবছো মায়া? তুমি আসলে একটা বোকা মায়া। বোকা তুমি! অতীতের কথা কী সব ভুলে গেছো? মনে করো কীভাবে তোমাকে সবার সামনে তোমার ভালোবাসাকে ছোট করেছিল? কীভাবে তোমাকে অপমান করেছিল? সব ভুলে গেছো?”
ঠিক তখনই বিদ্যুৎ চমকানোর মতো শব্দে হঠাৎ সাদা রঙের সুন্দর এক সাদা ড্রেস পরা আরেকটা ‘মায়া’ বেরিয়ে এলো। সে শান্ত স্বরে বলল,
“আমার কথা মন দিয়ে শোনো মায়া। মানুষ মানেই অতীত-বর্তমান। মানুষ মানেই ভুল, আবার মানুষ মানেই সঠিক। মানুষের স্বভাব দুই ধরনের হয়।
প্রথমঃ একজন মানুষ প্রথমে ভুল পথে গেলেও পরে সেটা বুঝে নিজের ভুল শুধরে সঠিক পথে আসে।
দ্বিতীয়ঃ কেউ প্রথমে ভালো পথে থেকেও সঙ্গীর টানে কিংবা নিজের কারণে ভুল পথে যায়।
এমন অতীত কারও না কারও থাকবেই। তাই বলে কি আমরা সারাজীবন অতীত আঁকড়ে ধরে থাকব? না, আমাদের বর্তমান দেখতে হবে। যাতে অতীতের মতো বর্তমান না হয়, সেইজন্য বর্তমানকে সুন্দর করে সাজাতে হবে। আর সঠিক জীবনসঙ্গী খুঁজে নিতে হবে। ছেলেটা প্রথমে হয়তো বুঝতে পারেনি। আর তখন তুমিই বা কতটা বড় ছিলে? তখন তোমার প্রেম ছিল কেবল আবেগ। আবেগের বসে তোমার তাকে দেখে ভালো লাগত, তাকে দেখে লজ্জা পেতেই একটা ভাব আসত এসব কেবল নামে ভালোবাসা ছিল। তখন বিশেষ করে তোমার কৌশিক ভাইয়ার কাছে, কারণ তুমি তখন ছোট ছিলে ক্লাসের দিক থেকেও, বয়সের দিক থেকেও। কিন্তু এখন তুমি বড় হয়েছো। এখন বুঝতে হবে, আগে কেনো কৌশিক ভাই তোমাকে ভালোবাসেনি আর এখন কেনো ভালোবাসছে। অনেক হয়েছে, অন্তত একটা সুযোগ তো তুমি তাকে দিতে পারো। তাই না? আর যাকে তুমি ভালোবাসো, তার ওপর তুমি কি এমন করে অভিমান করে থাকতে পারবে?”
সাদা ড্রেস পরা ‘মায়া’র কথা থামতে না থামতেই কালো ড্রেস পরা ‘মায়া’ তাচ্ছিল্যের সুরে বলে উঠল,
“ওহ্! তুমি আর তোমার ভালোবাসা… ছিঃ! মায়া, ওর কথা শোনো না। তুমি আমার কথা শোনো। যে যেমন, তার সাথে তেমন ব্যবহার করতে হয়। তুমি তখন ছোট ছিলে বলেই কেউ তোমার ভালোবাসাকে ছোট করে দেখবে? এটা মানা যায়?”
সাদা ড্রেস পরা ‘মায়া’ সঙ্গে সঙ্গেই প্রতিবাদ করল,
“না মায়া, তুমি ওর কথা শুনবে না।”
“না মায়া, তুমি এই সাদা ড্রেস পরা মায়ার কথা শুনো না। তুমি আমার কথা শোনো, মায়া।”
“না মায়া, ওর কথা শুনো না। তুমি আমার কথা শোনো।”
“না, আমার কথা শুনবে মায়া!”
“না, আমারটাই শোনবে!”
“বলছি না, আমার কথা শুনবে!”
“না, আমার কথাই শুনবে!”
তাদের এমন অকারণ কথা-কাটাকাটির মাঝেই হঠাৎ মায়া দু’হাত কানে দিয়ে চিৎকার করে উঠল,
“চুপ করো তোমরা দুইজন! কোনো সমাধান দিতে পারবে না, অন্তত আমার মাথাটা খেও না। যাও! তোমরা এখনই যাও বলছি!”
মায়ার কণ্ঠে এমন কঠিন সুর আগে শোনা যায়নি। কথাটা শোনার সঙ্গে সঙ্গেই সাদা ড্রেস আর কালো ড্রেস পরা দুই ‘মায়া’ কেমন যেন হাওয়ার মতো মিলিয়ে গেলো। মায়া হাঁপাতে হাঁপাতে চায়ের কাপটা হাতে তুলে নিয়ে সোজা বারান্দায় চলে এলো। ঠান্ডা বাতাসের স্পর্শ তাকে কিছুটা শান্ত করলেও মাথার ভেতর যেন তোলপাড় শুরু হলো। বারান্দার সোফায় বসে পড়তেই নিজেকে গুটিয়ে নিলো সে।
প্রণয়ের ঘোর রাত পর্ব ৫
“আমার মাথা কাজ করছে না,আমি কী করব? প্রতিশোধ নেব? না কি সবকিছু ভুলে কৌশিক ভাইকে আপন করে নেব? উফ্, মাথাটা যেন ফেটে যাচ্ছে! চোখ বুজে মায়া মাথাটা ঠেসে দিলো সোফার পেছনে। চারপাশের নীরবতায় শুধু তার অস্থির শ্বাসপ্রশ্বাস ভেসে উঠতে লাগল।
