প্রণয়ের দহন পর্ব ১০ || তাসনিম জাহান রিয়া || SA Alhaj

2656

প্রণয়ের দহন পর্ব ১০
তাসনিম জাহান রিয়া

উফ আমিও কাকে কী বলছি? উনি তো জন্মগত ঘাড় ত্যারা। জীবনে কারো কথা শুনে না। আর অলটাইম লোকে যা বলে তার উল্টোটা বুঝা উনার স্বভাব। আমি বললাম কী আর উনি বুঝলেন কী?

অনেক কথা বলে ফেলছি। এখন যদি তুই না খাস। তাহলে থাপড়ায়া তোর গাল লাল করে দিব বেয়াদব। নে হা কর।
আমি কথা না বলে খেয়ে নিলাম। কিন্তু অবাক করা বিষয় হচ্ছে উনি নিজে না খেয়ে বার বার আমার মুখে খাবার তুলে দিচ্ছেন। এক লোকমা শেষ হতে না হতেই আরেক লোকমা। আমি কথা বলতে পারছি না। পানি খেয়ে কোনো মতে মুখের খাবারটা শেষ করে কিছু বলতে যাব তার আগে উনি আবার এক লোকমা খাবার মুখে ঢুকিয়ে দিলেন। তারপর গ্লাসের পানি সম্পূর্ণ আমাকে খাইয়ে দিলেন।

মাথা কেমন যেনো ঘুরছে। চোখের সামনে সবকিছু ঝাপসা হয়ে আসছে। মুহূর্তের মাঝে অঙ্গান হয়ে ঢলে পড়লাম উনার বুকের ওপর। চোখ বন্ধ করার আগে উনার ঠোঁটের কোন ঝুলে থাকা বাঁকা হাসিটা আমার নজরে এলো।

চোখ খুলে নিজেকে বিছানায় আবিষ্কার করলাম। কিছু পাখির কিচিরমিচির শব্দ কানে আসছে। সূর্য মামা পূর্ব দিকে উদিত হচ্ছে। সেই সাথে ছড়িয়ে দিচ্ছে ভোরের স্নিগ্ধ আলো। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি ৬ টা বাঁজে তার মানে সকাল হয়ে গেছে। আস্তে আস্তে মনে পড়তে থাকে কালকের ঘটো যাওয়া ঘটনাগুলো।

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

আরিয়ান আমাকে খাইয়ে দিচ্ছিল। তারপর হঠাৎ করে আমি অঙ্গান হয়ে গেলাম। আর এতক্ষণ অঙ্গান ছিলাম। এটা কীভাবে সম্ভব? আচ্ছা আরিয়ান কিছু করেনি তো? খাবারে উনি কিছু মিশিয়ে দিয়েছিলেন? উনি খাবার কিছু কেনো মেশাবেন? খাবারে কিছু কখন মেশালেন? যদি কিছু মিশিয়ে না থাকেন। তাহলে ঐভাবে হাসছিলেন কেনো?
কিছু ভাবতে পারছি না। সবকিছু এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। আরিয়ান কী চায়? আর উনি এসব কী করছেন কিছুই মাথায় ঢুকছে না। কারো পায়ের শব্দ শুনে দ্রুত চোখ খুলে তাকাই। আমি ভাবলাম আরিয়ান এসেছে। কিন্তু আমার ধারণা ভুল করে দিয়ে আম্মু এসেছে। আমার পাশে বসে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলে,

না খেয়ে খেয়ে শরীরের কী হাল করেছিস দেখতে পাচ্ছিস? হুট হাট অঙ্গান হয়ে যাচ্ছিস। এখন থেকে দিনে তিন বার না চার বার করে খেতে হবে। কালকে সারা রাত কতোটা টেনশনে কেটেছে আমাদের তুই জানিস?
আমি কালকে সারা রাতই অঙ্গান ছিলাম?
হুম। আরিয়ান বললো খাবার খাওয়ায় অনিয়মের জন্য এমন হয়েছে। পরে তোকে আরিয়ান একটা ঘুমের ইনজেকশন দিয়ে দেয়। আর বলে, সকাল হলেই সব ঠিক হয়ে যাবে। ঠিক হয়ে যাবে বললেই হয়। টেনশন হয় না বল? টেনশনে তোর বাবা আর আমি সারা রাত দু চোখের পাতা এক করতে পারি নাই। জানিস গতকালকে কতো কিছু হয়েছে?
কী হয়েছিল গতকালকে?

গতকাল এ বাসায়……….
আম্মু আব্বু তোমাকে ডাকছে।
ও হ্যাঁ। আমি তো ভুলেই গিয়েছিলাম। তোর আব্বুর শার্টের বোতাম ছিঁড়ে গেছে। তুই আরশিকে খাইয়ে দে।
আচ্ছা আমি খাইয়ে দিচ্ছি তুমি যাও।
ঠিক করে খাইয়ে দিবি। আমি গেলাম।
আচ্ছা।

উনি খাবারের প্লেটটা নিয়ে এসে আমার সামনে বসলেন। উনি আমার মুখের সামনে খাবার ধরলেন।
আজকে আবার এই খাবারের কী মিশিয়ে নিয়ে আসছেন?
উনি বোধহয় একটু চমকে গেলেন। কিন্তু আমাকে বুঝতে দিলেন নাহ। বেশ স্বাভাবিক গলায় বললেন,
আমি আবার কী মিশাবো খাবার?

আপনি কী জানেন অভিনয়ে আপনি বড় বড় ফিল্ম স্টারদেরও হার মানিয়ে দিবেন? অবশ্যই আপনার ডক্টর না হয়ে হিরো হওয়া উচিত ছিল। বেশ অল্প সময়ে অনেক নাম ডাক হয়ে যেতো আপনার।
অন্য দিন হলে হয়তো আপনার অভিনয়ের ছলে আমি ভুলে যেতাম। কিন্তু আজকে আপনি কোনো রকম অভিনয়ে ভুলাতে পারবেন নাহ। আমি জানি গতকাল আপনি খাবার ঘুমের ঔষধ মিশিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু কেনো?
দরকার ছিল তাই। তোকে সব প্রশ্নের উত্তর দিতে আমি বাধ্য নই।

না দিলেন সব প্রশ্নের উত্তর। কিন্তু কেনো এতো অভিনয় করছেন? কেনো আমাদের সম্পর্কের মাঝে এতো লুকোচুরি? আর এসব লুকোচুরি আমার সহ্য হয় না। আপনি তো আমাকে ভালোবাসেন তাহলে কেনো এতো ঘৃণার অভিনয় করছেন? বলুন নাহ?
উনি একটু চমকে বলেন, কে বলেছে আমি তোকে ভালোবাসি? আমি শুধু তোকে ঘৃণা করি। বুঝতে পেরেছিস?
না পারিনি। কেনো শুধু শুধু নিজের অনুভূতিগুলো লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন? আমি জানি আপনি আমাকে ভালোবাসেন।আমি আপনার ডায়েরী পড়েছি।

তোকে আমি শুধু শুধু মেনার্সলেস বলি। তুই জানিস না বলে কারো জিনিসে হাত দেওয়া ঠিক না? আর ডায়েরী তো আমার একান্ত ব্যক্তিগত জিনিস। ডায়েরীতে হাত দেওয়ার সাহস হলো কী করে তোর?
বেশ করেছি হাত দিয়েছি। আমার অধিকার আছে আপনার জিনিসে হাত দেওয়ার। কারণ আপনি আমার স্বামী। আপনার ডায়েরী না পড়লে তো জানতেই পারতাম না আমার প্রতি আপনার ফিলিংসের কথা। কেনো ঘৃণার নিচে ভালোবাসাকে ফেলার ব্যর্থ চেষ্টা চালাচ্ছেন। স্বীকার করুন নাহ আপনার ভালোবাসার কথা।
ভালোবাসার কথা স্বীকার করে কী লাভ? তুই তো আমাকে ভালোবাসিস না। হয়তো কোনোদিন ভালো বাসবিও না। তুই তো নিহানকে ভালোবাসিস।

কে বললো বাসবো না। পৃথিবীতে প্রেম অল্পতেই শেষ হয় না। প্রেম জীবনে একবারও আসে না। প্রেম জীবনে বহুবার বহুরুপে আসে।
তার মানে তুই আমাকে ভালোবাসিস?
ভালোবাসি কী না তা জানি না। আমি তো সত্যিকারের ভালোবাসার সঙ্গায় জানি না। যার কাছ থেকে ভালোবাসার সঙ্গা শিখেছিলাম সে তো শুধুই আমার সাথে অভিনয় করে গেছে ভালোবাসার নামে। আচ্ছা আপনি কী পারেন নাহ আমাকে ভালোবাসার সঙ্গা শিখাতে? পারেন নাহ বাধ্য করতে আপনাকে ভালোবাসতে?

মাইলের পর মাইল এক সাথে হাটে যাওয়া,কিংবা ঘণ্টার পর ঘন্টা কারু জন্যে আপেক্ষার নাম ভালবাসা নয় ।ভালবাসা হল, হৃদয়ের সাথে মিশে থাকা,কারু অস্তিত্তের উপস্থিতি নিজের মাঝে ধারন করা ।নিঃশ্বাসে নিঃশ্বাসে শুধু তাকেই অনুভব করা, তার ছোট থেকে ছোট চাওয়া গুলো, পুরন করার আস্থিরতা,তার ভালমন্দ সবখানেই নিজেকে খুজে পাওয়া ।

এটা যদি ভালোবাসার সঙ্গা হয়। তাহলে হ্যাঁ আমি আপনাকে ভালোবাসতে শুরু করেছি।
কেমন ভালোবাসতে শুরু করেছিস সেটা রাতে দেখবো।
রাতে কী হবে? যে আপনি বুঝে যাবেন আমি আপনাকে ভালোবাসতে শুরু করেছি?
এতো বুঝে তোর কাজ নেই। রাত হলেই সব দেখতে পাবি। এখন বেশি কথা না বাড়িয়ে খাবারটা শেষ কর।
হুম।
দুই সপ্তাহ পর তোর এক্সাম না?
হুম।

তাহলে ভার্সিটি যাচ্ছিস না কেনো?
এতো এতো জামেলার মাঝে ভার্সিটির কথা ভুলেই গিয়েছিলাম।
পড়াশোনার কথা তো ভুলেই যাবি। সারাদিন তো শুধু পারিস লাফাইতে। এক্সামে ফেইল করলে একদম বাসায় ঢুকতে দিব না। ডক্টর আরিয়ানের স্ত্রী কিছুতেই ফেলটু মার্কা স্টুডেন্ট হতে পারে না।
এখন কী হবে? আমার পড়াশোনার যে অবস্থা। ঠিক মতো ফেইলও করতে পারবো না। ( মনে মনে কথাগুলো বললাম)
আজকে থেকে নিয়মিত ভার্সিটি যাবি। মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা করবি। খাওয়া শেষে রেডি হয়ে নে আমি তোকে ভার্সিটি ড্রপ করে দিয়ে আসবো।
আমি মাথা দুলিয়ে সম্মতি জানালাম।

প্রণয়ের দহন পর্ব ৯

চলুন আমি রেডি।
আরিয়ান আমার দিকে এক পলক তাকিয়ে আবার হাত ধরে টেনে রুমে নিয়ে আসে।
কী হলো এভাবে টেনে রুমে নিয়ে আসলেন কেনো? আমি ভার্সিটি যাব না?
উনি আমার প্রশ্নের উত্তর দিলেন নাহ। কাবার্ড খুলে একটা শপিং ব্যাগ বের করেন। শপিং ব্যাগটা আমার হাতে ধরিয়ে দিলেন। আমি কৌতূহলি দৃষ্টিতে শপিং ব্যাগটার দিকে তাকাই।
এখানে একটা বোরকা আছে। তাড়াতাড়ি বোরকাটা পড়ে নে।
কিন্তু আমি তো বোরকা পড়ি না।
উফ এতো কথা বলিস কেনো? যা বোরকাটা পড়ে আয়।
বোরকা পড়লে গরম লাগে তো।
গরম লাগলেও পড়তে হবে। আমি পেশায় একজন ডক্টর তাই না?
হুম।

আমার কাজ কী?
মানুষের সেবা করা।
একজন ডক্টরের কর্তব্য অসুস্থ মানুষকে সুস্থ করা। সুস্থ মানুষকে অসুস্থ করা না। তাই বলছি বোরকাটা পড়ে নে। আমি চাই তোর এই পেত্নী মার্কা চেহারা দেখে মানুষ হার্ট এ্যাটাক করুক। যুব সমাজ ধ্বংস করার জন্য তোদের মতো পেত্নী মার্কা চেহারার মেয়েই যথেষ্ট।

প্রণয়ের দহন পর্ব ১১