প্রণয়ের নব্য সূচনা পর্ব ১৩
insia isha chowdhury
নিলুফা খাতুন যেন মুহূর্তের জন্য বাকরুদ্ধ হয়ে গেলেন। কী প্রতিক্রিয়া দেখাবেন, তা বুঝে উঠতে পারছিলেন না। বহু বছর পর কোনো সন্তান যখন মায়ের কাছে ফিরে আসে, তখন একজন মায়ের আনন্দে আত্মহারা হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু নিলুফার মনে সেই আনন্দের লেশমাত্রও নেই। বরং বুকের ভেতর অদ্ভুত এক অস্থিরতা আর ভয় ঘনীভূত হয়ে উঠছে। এই কয়দিনে যা কিছু ঘটেছে, রাফি দেশে এসে সব জানতে পারলে পরিস্থিতি কোন দিকে গড়াবে, তা ভেবেই তিনি শঙ্কিত।
ফোনের ওপাশ থেকে রাফির উচ্ছ্বসিত কণ্ঠ ভেসে এলো,
“মা, প্লিজ, তুমি আগে থেকে বাবাকে কিছু বলো না। আমি দেশে এসে বাবাকে সারপ্রাইজ দিতে চাই।”
কথা শেষ করেই ফোন কেটে দিল রাফি। ওদিকে এখন তার অনেক কাজ বাকি, সবকিছু গুছিয়ে নিতে হবে। ফোন নামিয়ে নিলুফা কিছুক্ষণ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। ঠিক তখনই নাজমুল সাহেব বেডরুমে ঢুকে স্ত্রীকে অস্বাভাবিকভাবে উদ্বিগ্ন দেখে প্রশ্ন করলেন,
“কী হয়েছে নীলু? এত চিন্তিত দেখাচ্ছে কেন তোমাকে?”
নিলুফা গভীর শ্বাস নিয়ে বললেন,
“রাফির বাবা… রাফি দেশে আসছে।”
নাজমুল সাহেবের মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
“এ তো খুব ভালো খবর! ছেলে দেশে আসছে, আর তুমি এমন মুখ করে আছো কেন? তোমাকে দেখে তো মনে হচ্ছে কোনো বড় বিপদ হয়েছে।”
নিলুফার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল।
“তুমি জানো না আমি কেন চিন্তায় আছি? সবকিছু তো ঠিকঠাকই চলছিল। আর মাত্র পাঁচ মাস পরে দেশে আসলেই হতো। এখনই আসার কী দরকার ছিল?”
নাজমুল সাহেব গম্ভীর হয়ে বললেন,
“নীলু, তুমি এখন যতটুকু ভয় পাচ্ছো, তার এক শতাংশও যদি তোমার ছেলের অনুভূতির মূল্য দিতে, তাহলে আজ পরিস্থিতি এতদূর গড়াত না।”
নিলুফা তীক্ষ্ণ স্বরে বললেন,
“তার মানে তুমি বলতে চাও তোমার বোনের মেয়ের সঙ্গে আমি আমার একমাত্র ছেলের বিয়ে দিতাম?”
“নীলু, মাথা ঠান্ডা করে কথা বলো। সূচনার বিয়ে হয়ে গেছে, এবং খুব ভালো একটি পরিবারে হয়েছে। আমি এইমাত্র অনুষ্ঠান থেকে ফিরলাম। এখন এসব অর্থহীন কথা শুনতে ভালো লাগছে না। আর রাফি যদি আমাকে কিছু জিজ্ঞেস করে, আমি তাকে সত্যিটাই বলব।”
ঠিক তখনই নাজমুল সাহেবের ফোনে একটি মেসেজ এলো। তিনি ফোন বের করতেই নিলুফা তাড়াতাড়ি বলে উঠলেন,
“খবরদার! তুমি যদি এখনই রাফিকে কিছু বলে থাকো! ও নিজেই আমাকে বলেছে, বাবাকে কিছু বলবে না। ও দেশে এসে সারপ্রাইজ দিতে চায় তোমাকে।”
নাজমুল সাহেব হালকা হাসলেন।
“আমার এত শখ নেই তোমার ছেলেকে ফোন করে এসব বলার। তবে একটা কথা ঠিক, দেশে এসে সে নিজেই বড় একটা সারপ্রাইজ পাবে। তার মা তার জন্য কী কী করে রেখেছে, সেটা দেখে।”
নিলুফা এবার ক্রোধে ফেটে পড়লেন।
“আমার মেজাজ খারাপ করো না। আমার ছেলে সরল-সোজা বলেই তোমার ওই বোনের মেয়ে সূচনাকে পছন্দ করেছিল। কিন্তু আমি বেঁচে থাকতে আমার ছেলের জীবনে কোনো ভুল সিদ্ধান্ত আসতে দেব না। ওই মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে, এটাই আমার জন্য স্বস্তির বিষয়। কোনো দিক থেকেই ও আমার ছেলের যোগ্য ছিল না, এই পরিবারের বউ হওয়ারও যোগ্য ছিল না।”
নাজমুল সাহেবের মুখ কঠিন হয়ে উঠল। নিজের ছোট বোনের একমাত্র মেয়েকে নিয়ে এমন অপমানজনক কথা তিনি আর সহ্য করতে পারলেন না।
“তুমি হয়তো ইচ্ছে করেই একটা বিষয় ভুলে যাচ্ছো। সূচনা কোনোদিন রাফিকে পছন্দ করেনি। বরং রাফিই সূচনাকে পছন্দ করত। তাহলে এখানে সূচনার অপরাধটা কোথায়? এত বছর পরও তোমার মনে ওর প্রতি এত ক্ষোভ কেন, সেটা আজও আমি বুঝতে পারিনি।”
নিলুফা ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বললেন,
“অপরাধ কোথায়? তুমি ভুলে গেছো? মাত্র বারো বছর বয়সে সে আমার ছেলেকে বলেছিল, “আমি বড় হয়ে তোমাকেই বিয়ে করব।” এতটুকু বয়সে এসব কথা বলার কী দরকার ছিল?”
নাজমুল সাহেব হতাশ দৃষ্টিতে স্ত্রীর দিকে তাকালেন।
“আজ বুঝতে পারছি, রাফি কেন ছোট ছোট বিষয় নিয়েও এত বাড়াবাড়ি করে। কারণ সে তোমার কাছ থেকেই এসব শিখেছে। একটা বারো বছরের বাচ্চা মেয়ে নিষ্পাপ মনে একটা কথা বলেছিল। কিন্তু আমার প্রশ্ন হলো, তখন রাফি তো ছোট ছিল না। সে কেন সেই কথাকে এত গুরুত্ব দিল? আর একটা কথা মনে রেখো, তোমার এই আচরণ যদি আমার বোন কোনোদিন দেখত, তাহলে সে নিজেই কখনো তার মেয়েকে এই বাড়ির বউ হিসেবে পাঠাতো না। সূচনার এখন নিজের সংসার আছে, নিজের জীবন আছে। যার সঙ্গে তার বিয়ে হয়েছে, সে যথেষ্ট ভালো মানুষ। মেয়েটা তার জীবনে সুখে থাকুক, সেটাই চাই।”
কথাটা শেষ করেই নাজমুল সাহেব ধীর পায়ে কক্ষ ত্যাগ করলেন। দরজাটা বন্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ঘরজুড়ে এক অদ্ভুত নীরবতা নেমে এলো। নিলুফা খাতুন গিয়ে ধপ করে বিছানার কিনারায় বসে পড়লেন। তাঁর চোখদুটো শূন্যে স্থির, মস্তিষ্কের ভেতর চলছিল হিসাব-নিকাশের ঝড়। কীভাবে পরিস্থিতি সামলানো যায়? কীভাবে এমন একটা পথ বের করা যায়, যাতে সাপও মরে, আবার লাঠিও না ভাঙে?
নিলুফা খাতুন সম্পর্কে সূচনার মামি এবং নাজমুল সাহেব তার মামা। আর রাফি হলো সূচনার মামাতো ভাই। নিলুফা খাতুন জন্মেছিলেন একটি অত্যন্ত প্রভাবশালী ও সম্মানিত পরিবারে। তাঁর বাবা ছিলেন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। ছোটবেলা থেকেই সম্মান, মর্যাদা আর অভিজাত পরিবেশের মধ্যে বড় হওয়ায় তাঁর স্বভাবের ভেতর এক ধরনের সূক্ষ্ম অহংকার গড়ে উঠেছিল। অবশ্য নাজমুল সাহেবকে তিনি ভালোবেসেই বিয়ে করেছিলেন। কারণ ভালোবাসার পাশাপাশি নাজমুল সাহেবের পরিবারও ছিল বংশ-মর্যাদা ও সামাজিক অবস্থানে সমান সম্মানিত। বিয়ের বহু বছর পর অসংখ্য অপেক্ষা আর কষ্টের শেষে তাঁদের ঘরে আসে একমাত্র সন্তান রাফি। সেই এক সন্তানকে ঘিরেই ছিল নিলুফা খাতুনের পুরো পৃথিবী। রাফি ছিল তাঁর প্রাণ, তাঁর অহংকার, তাঁর সমস্ত স্বপ্নের কেন্দ্রবিন্দু।
ছোটবেলা থেকেই রাফি ছিল একটু অন্যরকম। শান্ত, নিরীহ আর ভীষণ চুপচাপ স্বভাবের। আর সমবয়সীদের সঙ্গে খুব একটা মিশতে পারত না। বন্ধু-বান্ধবও ছিল হাতে গোনা। তাই সুযোগ পেলেই সে ছুটে যেত তার ফুফির বাড়িতে। সেখানে হৃদয় আর সূচনার সঙ্গে সময় কাটাত। তবে তাদের দুজনের মধ্যে সূচনাকেই সবচেয়ে বেশি পছন্দ করত রাফি।
আসলে রাফি আর সূচনা ছিল একেবারে দুই মেরুর মানুষ। রাফি যেখানে নরম, শান্ত আর সংযত, সেখানে সূচনা ছিল ঝড়ের মতো চঞ্চল, প্রাণবন্ত আর দুষ্টুমিতে ভরা। তার হাসি, ছুটোছুটি, তার অগোছালো স্বভাব পুরো বাড়িটাকেই সবসময় মাতিয়ে রাখত।
কিন্তু নিলুফা খাতুন কখনোই এই মেলামেশাকে ভালো চোখে দেখতেন না। নিজের ছেলের সঙ্গে সূচনার অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠতা তাঁর পছন্দ ছিল না। যদিও প্রথমদিকে তিনি বিষয়টিকে গুরুত্ব দেননি। কিন্তু সবকিছু বদলে যায় একদিন। তখন সূচনার বয়স মাত্র বারো বছর। শিশুসুলভ দুষ্টুমিতে ভরা এক বিকেলে সে হেসে হেসে রাফিকে বলেছিল,
“তুমি আমাকে এত চকলেট কিনে দাও! আমি তো তোমাকেই বিয়ে করব।”
কথাটা ছিল নিছক মজা। কিন্তু সরলমনা রাফি সেটাকে মজা হিসেবে নিতে পারেনি। সে সত্যি সত্যিই বিশ্বাস করে ফেলেছিল কথাটা। বাড়ি ফিরে সোজা মায়ের কাছে গিয়ে জেদ ধরে বসেছিল। সে বড় হয়ে সূচনাকেই বিয়ে করবে। সেদিন থেকেই নিলুফা খাতুনের মনে এক অদৃশ্য ভয় বাসা বাঁধে।
তিনি কোনোভাবেই সূচনাকে নিজের ছেলের ভবিষ্যৎ স্ত্রী হিসেবে কল্পনা করতে পারতেন না। তাই সুযোগ বুঝেই তিনি রাফিকে উচ্চশিক্ষার জন্য কানাডায় পাঠিয়ে দেন। পড়াশোনা শেষ হওয়ার পরও নানা অজুহাতে ছেলেকে দেশে ফিরতে দেননি। কখনো বলতেন আরও অভিজ্ঞতা দরকার, কখনো বলতেন ক্যারিয়ার গুছিয়ে নিতে হবে।
আর রাফি? সে তো বরাবরই মায়ের বাধ্য সন্তান। মায়ের প্রতিটি কথাকেই সে সত্যি বলে মেনে নিয়েছিল।
অন্যদিকে নিলুফা খাতুন যখনই তাঁর ভাবির সঙ্গে কথা বলতেন, ঘুরেফিরে একটাই প্রসঙ্গ তুলতেন। সূচনার বিয়ে। যত দ্রুত সম্ভব মেয়েটার বিয়ে হয়ে যাক, এটাই যেন ছিল তাঁর একমাত্র চাওয়া।
অবশেষে সেই প্রতীক্ষিত দিনও এলো। একদিন খবর পাওয়া গেল, সূচনার বিয়ে ঠিক হয়েছে।
খবরটা শুনে নিলুফা খাতুনের মনে যে স্বস্তি আর আনন্দের ঢেউ উঠেছিল, তা হয়তো সূচনা নিজেও অনুভব করেনি। তাঁর কাছে মনে হয়েছিল, বহুদিনের এক দুশ্চিন্তার অবসান ঘটেছে।
কারণ সত্যিটা হলো, তিনি কোনোদিনই সূচনাকে পছন্দ করতেন না। অতিরিক্ত চঞ্চল, অগোছালো, প্রাণখোলা মেয়েটিকে তিনি নিজের ছেলের পাশে কল্পনা করতে পারতেন না। নিলুফা খাতুন চেয়েছিলেন তাঁর ছেলের বউ হবে এমন একজন, যে হবে রূপে, গুণে, শিক্ষায়,আচার-ব্যবহার সবদিক থেকেই নিখুঁত হবে, একেবারে তাঁর মনের মতো।
বৌভাতের অনুষ্ঠান বেশ সুন্দরভাবেই সম্পন্ন হয়েছে। অতিথিদের কোলাহল, হাসি-আড্ডা আর শুভকামনায় ভরে উঠেছিল পুরো মির্জা বাড়ি। এখন নিয়ম অনুযায়ী সূচনা ও প্রণয়ের শিকদার বাড়িতে যাওয়ার পালা। যদিও ওখানে কয়েকদিন থাকার কথা ছিল, কিন্তু প্রণয়ের হাতে ছুটি খুব বেশি নেই। তার ওপর সূচনার সামনেই পরীক্ষা। সবকিছু বিবেচনা করে ঠিক হয়েছে, তারা শুধু আজকের রাতটুকু থাকবে। পরদিন বিকেলের মধ্যেই আবার ফিরে আসবে।
অন্যদিকে বেচারি সূচনা প্রায় ভেঙে পড়ার অবস্থায় আছে। ভারী লেহেঙ্গা, তার সঙ্গে আকাশছোঁয়া হিল।
সব মিলিয়ে তার অবস্থা করুণ। অনেকক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে থেকে অতিথিদের সঙ্গে কথা বলতে বলতে তার পা দুটো যেন আর শরীরের অংশ বলেই মনে হচ্ছে না। খাওয়াদাওয়া শেষ করে প্রণয় আর সূচনা পাশাপাশি বসে ছিল। কিন্তু বেশ কিছুক্ষণ ধরেই প্রণয়ের চোখ এড়ায়নি একটি বিষয়। সূচনা বারবার নিচের দিকে তাকাচ্ছে, অস্বস্তিতে পা নাড়ছে, কখনো আবার ঠোঁট কামড়ে বসে থাকছে।
প্রথমে কিছু না বললেও ধীরে ধীরে প্রণয় সমস্যাটা বুঝতে পারল। নিঃশব্দে ফোন বের করে কাউকে একটা ছোট্ট মেসেজ পাঠিয়ে দিল সে।
কিছুক্ষণ পর সূচনার দিকে একটু ঝুঁকে এসে খুব নিচু স্বরে বলল,
“সূচনা, আমার সঙ্গে একটু সাইডে চলো।”
সূচনা মনে মনে ভীষণ বিরক্ত হলো। এই মুহূর্তে তার ইচ্ছা করছে শুধু কোথাও বসে পা দুটো ছড়িয়ে দিতে। সেখানে আবার সাইডে গিয়ে কী করবে?
মুখটা গোমড়া করে বসে থাকতেই প্রণয় শান্ত স্বরে বলল,
“তুমি কি যাবে, নাকি তোমাকে কোলে করে নিয়ে যেতে হবে?”
কথাটা শুনেই সূচনা চমকে চারপাশে তাকাল।
এখনও বাড়িতে অনেক মানুষ। অতিথিদের আনাগোনা পুরোপুরি শেষ হয়নি। এই অবস্থায় যদি সত্যি সত্যিই প্রণয় তাকে কোলে তুলে নেয়, তাহলে লজ্জায় সে মাটির সঙ্গে মিশে যাবে। তাই অনিচ্ছা সত্ত্বেও উঠে দাঁড়াতে হলো তাকে। প্রণয় তার হাত ধরে বাড়ির ভেতরের একটি নিরিবিলি ঘরে নিয়ে গেল।
ঘরে ঢুকেই সূচনা হাঁফ ছেড়ে কাউচে বসে পড়ল।
প্রণয় একবার ঘরের কোণায় তাকিয়ে দেখল, যে জিনিসগুলো আনতে বলেছিল সেগুলো ঠিকঠাক রাখা আছে। সে এগিয়ে গিয়ে সেগুলো হাতে তুলে নিল।
সূচনা তখনও কিছু বুঝতে পারছে না। হঠাৎ করেই নিজের পায়ের কাছে কারও স্পর্শ অনুভব করে সে চমকে উঠল। চোখ মেলে তাকাতেই দেখল, প্রণয় তার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে আছে। আর ধীরে ধীরে তার জুতোগুলো খুলে দিচ্ছে। সূচনা যেন আকাশ থেকে পড়ল।
“আরে! আপনি কি পাগল নাকি? আমার পায়ে হাত দিচ্ছেন কেন?”
প্রণয় কোনো উত্তর দিল না। জুতো দুটো খুলে নিয়ে সে সূচনার পায়ের দিকে তাকাল। ফর্সা, নরম পা দুটো লাল হয়ে গেছে। কোথাও কোথাও জুতোর চাপে দাগও পড়ে গেছে। দৃশ্যটা দেখেই প্রণয়ের ভ্রু কুঁচকে গেল। এতটা কষ্ট হচ্ছিল, অথচ মেয়েটা একটা কথাও বলেনি! মনে মনে বিরক্ত হলেও সেটা প্রকাশ না করে সে অয়েন্টমেন্ট নিয়ে আলতো করে লাগাতে লাগাতে বলল,
“এত উঁচু জুতো পরার কী দরকার ছিল? সত্যি বলতে আমি এর কোনো যুক্তিই খুঁজে পাচ্ছি না।”
সূচনা এবার মুখ ফুলিয়ে বলল,
“আপনি নিজের হাইটটা দেখেছেন? আপনি কোথায় আর আমি কোথায়! এই জুতো পরে তবুও আপনার বুক পর্যন্ত আসতে পারেছি। না হলে তো সবসময় আপনার বুকেরও নিচে থাকি। তাই ভেবেছিলাম একটু মানানসই লাগবে। যাতে আপনাকে কারও সামনে লজ্জিত না হতে হয়। আমি এত কিছু ভাবলাম, আর আপনি উল্টো আমাকেই বকছেন!
অয়েন্টমেন্ট লাগানো শেষ করে প্রণয় তার পাশে এসে বসল। তারপর গম্ভীর গলায় বলল,
“তোমাকে শুধু বকা উচিত না। আমার এখন ইচ্ছে করছে তোমাকে একটা চড় দিই।”
সূচনা বিস্ময়ে চোখ বড় বড় করে ফেলল।
“কী বললেন? বিয়ে হয়েছে মাত্র কয়দিন, আর এখনই আমাকে মারার প্ল্যান করছেন?”
কথা শেষ করেই সে রাগ দেখিয়ে উঠে দাঁড়াতে গেল। কিন্তু যাওয়ার আগেই প্রণয় তার হাত ধরে হালকা টান দিল। পরের মুহূর্তেই সূচনা নিজেকে আবিষ্কার করল প্রণয়ের কোলের ওপর। ঘটনাটা এত দ্রুত ঘটল যে সে কয়েক সেকেন্ড বুঝতেই পারল না কী হয়েছে। প্রণয় ধীরে ধীরে মুখটা তার দিকে এগিয়ে আনতেই সূচনা অজান্তেই চোখ দুটো শক্ত করে বন্ধ করে ফেলল। মুহূর্তখানেক পর কানের কাছে ভেসে এলো প্রণয়ের গভীর কণ্ঠস্বর।
“তুমি এমনটা ভাবলে কী করে যে আমি তোমার জন্য লজ্জিত হব?”
কথাটা শুনেই সূচনা ধীরে ধীরে চোখ খুলল।
প্রণয় মুচকি হেসে তার নাকে আলতো একটা টোকা দিল।
“তোমাকে আমার সঙ্গে এমনিতেই মানায়। আমার সঙ্গে হাইট মেলানোর জন্য তোমাকে কষ্ট করতে হবে না। আমি চাই না তুমি নিজের অস্বস্তি লুকিয়ে শুধু অন্যদের জন্য কিছু করো।”
সূচনা নিচু স্বরে বলল,
“কিন্তু মানুষ তো কথা বলত… বলত, বউটা কত খাটো!”
প্রণয় সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ করল,
“প্রথমত, তুমি মোটেও খাটো নও। তুমি আমার ছোট্ট লিলিপুট বউ। আর দ্বিতীয়ত, মানুষ কী বলল তাতে আমার কিছু যায় আসে না। আমি শুধু এটা নিয়ে ভাবি, তুমি কেমন আছো, তুমি কেমন অনুভব করছো।”
সূচনা চুপচাপ প্রণয়ের প্রতিটি কথা শুনতে লাগল।
মনের ভেতর কোথাও যেন উষ্ণ একটা অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ল। তবে হঠাৎ করেই তার মনে পড়ল, তারা অনেকক্ষণ ধরে ঘরের ভেতরে আছে।
বাইরে নিশ্চয়ই সবাই খোঁজাখুঁজি শুরু করেছে।
তাই সে বলল,
“এবার বাইরে যাওয়া উচিত। আমার জুতোগুলো দিন, পরে নিই।”
“না, তুমি এখন ওই জুতো পরবে না।”
সূচনা মুখ বাঁকিয়ে বলল,
“তাহলে কী? খালি পায়ে ড্যাং ড্যাং করে হাঁটব? সবাই আমাকে দেখে হাসবে।”
প্রণয় ভ্রু তুলে বলল,
“আমি কি বলেছি তুমি খালি পায়ে হাঁটবে?”
“তাহলে আমি কি…”
কথা শেষ করার আগেই প্রণয় পাশ থেকে একটি নরম, আরামদায়ক সফট জুতো এনে তার পায়ে পরিয়ে দিল। পায়ে দিয়েই সূচনার মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
“বাহ! এটা তো অনেক আরামদায়ক!”
কিন্তু পরক্ষণেই মুখটা আবার মলিন হয়ে গেল।
“কিন্তু এটা তো আমার লেহেঙ্গার সঙ্গে একদমই যাচ্ছে না। সবাই ভাববে আমার কোনো ফ্যাশন সেন্স নেই।”
প্রণয় মুচকি হেসে বলল,
“তুমি একটু দাঁড়াও তো।”
সূচনার দাঁড়াতেই দেখা গেল, ভারী লেহেঙ্গার ঘের পুরো পা ঢেকে রেখেছে। সে কী জুতো পরেছে, সেটা একদমই বোঝা যাচ্ছে না।
দৃশ্যটা দেখে প্রণয় বলল,
“দেখলে? তুমি শুধু শুধু বেশি চিন্তা করো। কেউ বুঝতেই পারবে না তুমি কী জুতো পরেছ।”
সূচনা নিজের লেহেঙ্গার দিকে তাকিয়ে খুশিতে বলে উঠল,
“আরে! সত্যিই তো!”
তারপর হাসিমুখে প্রণয়ের দিকে তাকিয়ে বলল,
“বাহ! আমার হাসব্যান্ড তো অনেক ইন্টেলিজেন্ট। আমি যে কেন টেনশন করছিলাম?”
প্রণয় হেসে মাথা নাড়ল।
“যাক, ম্যাডাম খুশি হয়েছে। এবার চলুন, বাইরে যাওয়া যাক।”
তারপর দুজন পাশাপাশি দরজার দিকে এগিয়ে গেল।
প্রণয় আর সূচনাকে নিয়ে একটু আগেই সূচনার বাড়ির লোকজন শিকদার বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিয়ে দিয়েছে। অন্যদিকে সোমা বেগম বসে আছেন নিজের মেয়ের ওপর চরম রাগ নিয়ে। বিয়ে বাড়ি থেকে ফিরেই সুপ্তি সরাসরি নিজের ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিয়েছিল। বারবার ডাকলেও কোনো সাড়া মেলেনি। শুধু ভেতর থেকে ভেসে আসছিল একটাই উত্তর, সে অসুস্থ, তাকে বিরক্ত না করতে। এখন সে ঘুমিয়ে আছে। এমনটাই ভাবছেন সোমা বেগম।
কিন্তু বাস্তবটা ছিল ভিন্ন। বিছানার ওপর শুয়ে থাকা সুপ্তির চোখ জোড়া খোলা। ঘুমের কোনো চিহ্নই নেই সেখানে। বরং নিঃশব্দে সে অভিনয় করে যাচ্ছে। চোখ বন্ধ করে পড়ে আছে, যেন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। কিন্তু এই ভান কতক্ষণ টিকিয়ে রাখা যায়? নিজের ভেতরের অস্থিরতা আর দমিয়ে রাখা অনুভূতিগুলো ধীরে ধীরে তাকে ভেঙে দিচ্ছিল। শেষমেশ আর থাকতে পারল না সে। ধীরে ধীরে উঠে বসে পড়ল। ঠিক তখনই সোমা বেগম ঘরে ঢুকলেন। মেয়েকে জেগে উঠতে দেখে তার চোখে মায়া আর বিরক্তি মিশে একসঙ্গে ফুটে উঠল।
তিনি আলতো স্বরে বললেন,
প্রণয়ের নব্য সূচনা পর্ব ১২
“যা, ফ্রেশ হয়ে আয়। আমি তোর জন্য খাবার আনছি। আজকে সারাদিন তুই কিছু খেয়েছিস তো? পড়াশোনার চিন্তায় নিজেকে এভাবে অসুস্থ বানিয়ে ফেলিস না।”
কথাটা বলে তিনি ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে লাগলেন। ঘরের দরজা বন্ধ হওয়ার আগেই নিস্তব্ধতা ভেঙে ভেসে এলো সুপ্তির কাঁপা কণ্ঠ।
“মা… আমার পক্ষে আর মির্জা বাড়িতে থাকা সম্ভব না। আমি… আমি আর এই বাড়িতে থাকতে চাই না।”
