Home প্রণয়ের নব্য সূচনা প্রণয়ের নব্য সূচনা পর্ব ১৪

প্রণয়ের নব্য সূচনা পর্ব ১৪

প্রণয়ের নব্য সূচনা পর্ব ১৪
insia isha chowdhury

সোমা বেগম যেন নিজের কানকেই বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। তাঁর মেয়ে এসব কী বলছে? যবে থেকে সুপ্তি মির্জা বাড়িতে রয়েছে, খুব কম সময়ই গ্রামের বাড়িতে এসেছে। এমনকি ঈদ, পারিবারিক অনুষ্ঠান কিংবা বিশেষ কোনো উপলক্ষেও সে গ্রামের বাড়িতে যাওয়ার চেয়ে মির্জা বাড়িতেই থাকতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেছে। অথচ আজ সেই মেয়েটাই নিজে থেকে এই বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে চাইছে!
তিনি ভালো করে মেয়ের দিকে তাকালেন। সুপ্তির চেহারাটা যেন আগের মতো নেই। চোখের নিচে গাঢ় কালচে ছাপ পড়েছে, মুখভর্তি ক্লান্তি। মনে হচ্ছে অনেকদিন ধরে ঠিকমতো ঘুমায়নি। ভেতরে ভেতরে কোনো অদৃশ্য যন্ত্রণা তাকে প্রতিনিয়ত কুরে কুরে খাচ্ছে। সোমা বেগম ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে মেয়ের দু’গালে হাত রাখলেন।

“কী হয়েছে তোর?”
মায়ের কণ্ঠে এতটুকু মমতা পেতেই সুপ্তির চোখের বাঁধ ভেঙে গেল। সে ফুপিয়ে কেঁদে উঠল। মেয়ের কান্না দেখে সোমা বেগম বিচলিত হয়ে পড়লেন।
“কী হয়েছে মা? আমাকে বল। কোনো সমস্যা হয়েছে?”
সুপ্তি কাঁদতে কাঁদতেই বলল,
“মা, আমি আর এ বাড়িতে থাকতে চাই না। আমার দম বন্ধ হয়ে আসে। আমি এখান থেকে চলে যেতে চাই।”
“আচ্ছা, ঠিক আছে। কিন্তু কী হয়েছে সেটা তো বলবি? এত বছর ধরে এখানে আছিস, কোনোদিন তো এমন কথা বলিসনি। কেউ কি তোর সঙ্গে খারাপ আচরণ করেছে?”
সুপ্তি মাথা নাড়ল।
“না মা, আমার সঙ্গে কেউ খারাপ আচরণ করেনি। বরং আমি নিজের একতরফা ভালোবাসার জন্য কষ্ট পেয়ে যাচ্ছি। এই কষ্ট আমি আর সহ্য করতে পারছি না। আমি এখান থেকে অনেক দূরে কোথাও চলে যেতে চাই।”
মেয়ের কথা শুনে সোমা বেগম ভীষণ অবাক হয়ে গেলেন।

“একতরফা ভালোবাসা মানে?”
সুপ্তি এবার তার মাকে জড়িয়ে ধরল। কান্নায় তার গলা ভারী হয়ে এসেছে।
“মা, আমি নিজেও জানি না কবে, কীভাবে প্রণয়কে ভালোবেসে ফেলেছিলাম। কিন্তু ওটা যে শুধু আমার একার ভালোবাসা ছিল! প্রণয় তো বিয়ে করে ফেলেছে। আর ও নিজের স্ত্রীকে অনেক ভালোবাসে। এসব আমি আর দেখতে পারছি না মা। আমার খুব কষ্ট হয়।”
সোমা বেগম যেন হতভম্ব হয়ে গেলেন।
“তুই… তুই প্রণয়কে ভালোবাসিস?”
“হ্যাঁ মা। আর সেই ভালোবাসার জন্যই আমি অনেক বড় পাপ করে ফেলেছি মনে হয়।”
“কিন্তু তুই তো কোনোদিন আমাকে এসব বলিসনি! যদি আগে বলতিস, তাহলে আমি তো বড় আপার সঙ্গে কথা বলে দেখতাম।”
সুপ্তি নাক টেনে চোখ মুছল।

“না মা। প্রণয় আমার জন্য তৈরি হয়নি। যদি ও আমার জন্যই হতো, তাহলে হাজার বাধা পেরিয়েও একদিন না একদিন আমার কাছেই ফিরে আসত। কিন্তু ও তো আমার নয়। আমি অনেক কষ্টে এই সত্যিটা মেনে নিয়েছি। তুমি শুধু একটা কাজ করো, আমাকে এখান থেকে নিয়ে চলো।”
সোমা বেগম বুঝতে পারলেন, তাঁর মেয়ে এখন ভীষণ আবেগপ্রবণ অবস্থায় আছে। এই মুহূর্তে তাকে বোঝানো ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। কিন্তু একই সঙ্গে তিনি এটাও জানতেন, যদি সুপ্তি এখন গ্রামের বাড়িতে স্থায়ীভাবে চলে যায়, তাহলে খুব শিগগিরই তার বাবা এবং দাদী মিলে তার বিয়ের জন্য চাপ দিতে শুরু করবেন। সুপ্তি কত সংগ্রাম করে আজ এতদূর এসেছে, সেটা একজন মা হিসেবে সোমা বেগমের চেয়ে ভালো আর কে জানে? তিনি মেয়েকে নিজের বুকে টেনে নিয়ে শান্ত কণ্ঠে বললেন,
“আমার কথা শোন মা। নিজেকে শক্ত কর। একবার ভেবে দেখ, তুই ছোটবেলা থেকে কত কষ্ট করে পড়াশোনা করেছিস। তোর বাবা আর দাদী কতবার তোর বিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছে। কিন্তু তুই নিজের স্বপ্ন ছাড়িসনি। তোর স্বপ্ন ছিল একজন ভালো লেকচারার হওয়ার। আর এটা শুধু তোর স্বপ্ন নয়, এটা আমারও স্বপ্ন।”
তিনি একটু থেমে আবার বললেন,

“শুধুমাত্র একটা কষ্টের জন্য তুই নিজের পুরো ভবিষ্যৎ নষ্ট করে দিতে পারিস না। তোর সামনে এখনও অনেক পথ পড়ে আছে। ঠিক আছে, তুই কিছুদিন আমার সঙ্গে গ্রামের বাড়িতে চল। পরিবেশ বদলালে হয়তো মনটাও একটু ভালো হবে। তারপর আবার ফিরে এসে পড়াশোনা শুরু করবি। কারণ তুই তো জানিস, তোর বাবা কোনোদিনই তোকে হোস্টেলে থেকে পড়াশোনা করতে দেবে না। শুধু আমার বড় আপার বাড়িতে থাকবি বলেই তিনি রাজি হয়েছিলেন। আমি চাই না, তুই নিজের স্বপ্ন থেকে সরে আসিস।”
মায়ের কথাগুলো মন দিয়ে শুনল সুপ্তি। ধীরে ধীরে তার কান্না থেমে এল। আসলে সে নিজেও জানত, পড়াশোনার জন্য কতটা ত্যাগ স্বীকার করেছে। নিজের স্বপ্ন পূরণের জন্য কত বাধা-বিপত্তির সঙ্গে লড়াই করেছে। ভালোবাসার অনুভূতি থাকা সত্ত্বেও কখনো সেটাকে প্রশ্রয় দেয়নি। চাইলে বহু আগেই প্রণয়কে নিজের মনের কথা জানাতে পারত। কিন্তু সে সবসময় ভেবেছে, এসব আবেগে জড়িয়ে পড়লে তার পড়াশোনার ক্ষতি হবে। তাই নিজের অনুভূতিগুলো বুকের ভেতরই লুকিয়ে রেখেছিল।
কিন্তু সে কখনো কল্পনাও করেনি, এত দ্রুত প্রণয়ের বিয়ে ঠিক হয়ে যাবে। যেদিন প্রণয়ের বিয়ের খবর সে জানতে পেরেছিল, সেদিন ছিল বিয়ের ঠিক আগের দিন। খবরটা শোনার পর পুরো রাত একফোঁটা ঘুমাতে পারেনি সে। বুকের ভেতর হাজারো আর্তনাদ জমে ছিল, অথচ মুখ ফুটে কাউকে কিছু বলার সাহস হয়নি। হয়তো এ কারণেই বলা হয়,

“মেয়েদের বুক ফাটে, তবু মুখ ফোটে না।”
সেদিন সুপ্তির অবস্থাও ঠিক তেমনই ছিল। বুকভরা অসহ্য যন্ত্রণা নিয়ে সে সারারাত নীরবে কেঁদেছিল, অথচ পৃথিবীর কেউ সেই কান্নার শব্দ শুনতে পায়নি।
অন্যদিকে সিকদার বাড়িতে প্রণয় এই মুহূর্তে সূচনার ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে। ধীর দৃষ্টিতে চারপাশটা দেখছে। ঘরটাতে পা রাখলেই বোঝা যায় এটা এমন একজন মানুষের ঘর, যার মনটা এখনো শিশুসুলভ সরলতায় ভরা।
বিছানার দু’পাশে সারি সারি টেডি বিয়ার সাজানো। দেয়ালজুড়ে অসংখ্য ছবি কোথাও ছোট্ট সূচনা দুই বেণী করে দাঁড়িয়ে আছে, কোথাও স্কুল ড্রেসে হাসিমুখে, আবার কোথাও বর্তমানের পরিণত, লাজুক তরুণী।
একপাশে বুকশেলফ ভর্তি একাডেমিক বই, আর তার পাশেই গল্প-উপন্যাসের ছোট্ট এক জগৎ। ব্যালকনিতে সারি সারি ফুলের টব, রাতের হালকা বাতাসে দুলছে তাদের পাতাগুলো। ছোট ছোট শোপিসে সাজানো পুরো ঘরটা সূচনার ব্যক্তিত্বেরই প্রতিচ্ছবি।
প্রণয় ধীরে ধীরে ঘুরে ঘুরে সবকিছু দেখছিল। অজান্তেই তার মনে হচ্ছিল, এই ঘরের প্রতিটা কোণে যেন সূচনার উপস্থিতি ছড়িয়ে আছে।

ঠিক তখনই বাথরুমের দরজাটা খুলে গেল।
চুল মুছতে মুছতে বেরিয়ে এলো সূচনা।
তার পরনে রানী গোলাপি রঙের একটি চুড়িদার। সদ্য ধোয়া ভেজা চুলগুলো কাঁধ ছুঁয়ে নেমে এসেছে, মুখে নেই কোনো বাড়তি সাজ। অথচ তাকে দেখে মনে হচ্ছিল, পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর সাজটাই যেন তার এই স্বাভাবিক রূপ।
প্রণয়ের দৃষ্টি অনিচ্ছাসত্ত্বেও আটকে গেল।
সে প্রায়ই ভাবতে চেষ্টা করে সূচনাকে কি সত্যিই এ সুন্দর, নাকি ভালোবাসার কারণে তার চোখে সূচনা সবসময়ই অন্যদের চেয়ে বেশি সুন্দর লাগে? তবে একটা বিষয় সে নিশ্চিত তার চোখে সূচনা অসম্ভব সুন্দর। এমন সুন্দর, যাকে দেখলে কিছুক্ষণ শব্দ হারিয়ে যায়।
সূচনার অবশ্য সেদিকে কোনো খেয়াল নেই। সে ড্রেসিং টেবিলের সামনে গিয়ে হেয়ার ড্রায়ার চালু করল। গরম বাতাসে ভেজা চুলগুলো বারবার উড়ে যাচ্ছে। প্রণয় কখন যে নিঃশব্দে তার পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে, সূচনা বুঝতেই পারেনি। উড়ে আসা ভেজা চুলের গোছাগুলো বারবার প্রণয়ের মুখ ছুঁয়ে যাচ্ছিল। চুল থেকে ভেসে আসা শ্যাম্পুর মিষ্টি সুবাস আর সূচনার উপস্থিতি মিলিয়ে মুহূর্তটাকে অদ্ভুত কোমল করে তুলেছিল।

প্রণয়ের বুকের ভেতর কেমন যেন অচেনা একটা অনুভূতি জেগে উঠল। সে ধীরে ধীরে একটু ঝুঁকল।
সূচনার চুলের ভাজে মুখ ডুবিয়ে দিল। দুজনের মাঝের দূরত্বটুকু যেন অজান্তেই কমে এলো। ঠিক তখনই সূচনা হঠাৎ পেছন ফিরল। আর ফিরেই থমকে গেল। প্রণয় একদৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে আছে। সেই দৃষ্টিতে ছিল শুধু গভীর মুগ্ধতা। যেন অনেক কথা বলতে চায়, অথচ কোনো শব্দ খুঁজে পাচ্ছে না।
সূচনার বুকটা হঠাৎ কেঁপে উঠল। অকারণেই গাল দুটো গরম হয়ে এলো। নিজেকে সামলে নিয়ে সে দ্রুত বলল,
“আ… আসলে আমার মেকআপ তুলতে একটু সময় লেগেছিল। তাই ফ্রেশ হতে দেরি হয়ে গেল। আপনি এখনো এখানে দাঁড়িয়ে আছেন কেন? যান, গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নিন।”
সূচনার কথায় যেন প্রণয়ের ঘোর কাটল। সে বুঝতে পারল, কতক্ষণ ধরে যে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল! হালকা গলা খাঁকারি দিয়ে নিজেকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করে বলল,

“হ্যাঁ… আমি ফ্রেশ হয়ে আসছি।”
তারপর গুছিয়ে রাখা পোশাক হাতে নিয়ে বাথরুমের দিকে চলে গেল। দরজাটা বন্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সূচনা যেন দীর্ঘ একটা নিঃশ্বাস ফেলল।
মনে হচ্ছিল, এতক্ষণ বুকের ভেতর ছোট্ট একটা ঝড় বয়ে যাচ্ছিল। ধীরে ধীরে আয়নার সামনে এসে দাঁড়াল। নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর ফিসফিস করে বলল,
“আশ্চর্য! এত লজ্জা পাওয়ার কী আছে?”
কিন্তু কথাটা শেষ করেই নিজেই হেসে ফেলল।
দু’হাত দিয়ে মুখ ঢেকে নিল লজ্জায়।
আজ প্রণয় আর সূচনা দুজনেই ভীষণ ক্লান্ত। সূচনা এখন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ধীরে ধীরে চুলে চিরুনি চালাচ্ছে। ঠিক তখনই বাথরুম থেকে বেরিয়ে এলো প্রণয়। ভেজা চুলে তোয়ালে ঘষতে ঘষতে সে সূচনার দিকে তাকিয়ে বলল,
“সূচনা, আজ কিন্তু চুল বেঁধে ঘুমাবে। খবরদার, চুল খুলে রেখে ঘুমাবে না।”
সূচনা পেছন ফিরে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,

“কেন?”
“কারণ এভাবে চুল খুলে ঘুমালে চুল নষ্ট হয়ে যায়।”
সূচনা হালকা হেসে বলল,
“আসলে বাসায় থাকলে আম্মুই সব সময় আমার চুল বেঁধে দিত। আর আপনার বাড়িতে গিয়ে এত ব্যস্ততার মধ্যে ঠিকমতো সময়ই পাইনি। তাই ওভাবেই ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।”
কথাটা শুনে প্রণয়ের ভ্রু সামান্য কুঁচকে গেল। গম্ভীর স্বরে সে বলল,
“এটা আবার কেমন কথা, “আপনার বাড়ি”? ওটা এখন শুধু আমার বাড়ি নয়, আমাদের দুজনের বাড়ি।”
সূচনা একটু থমকে গেল। তারপর ভ্রু নাচিয়ে বলল,
“আচ্ছা, কথা বুঝলাম। কিন্তু আপনি এমন রাগ করছেন কেন?”
“আজব! আমি রাগ করলাম কোথায়?”
“ওই যে, ক্লাসরুমে স্টুডেন্ট এর সঙ্গে যেমন গম্ভীরভাবে কথা বলেন, ঠিক তেমন গম্ভীরভাবে বললেন। তাই তো মনে হলো রাগ করেছেন।”
প্রণয় মুচকি হেসে বলল,

“ওহ, তাহলে তোমার সঙ্গে মিষ্টি গলায় কথা বলতে হবে?”
সূচনা সঙ্গে সঙ্গে মুখ বাঁকিয়ে বলল,
“অবশ্যই। নিজের বউয়ের সঙ্গে মিষ্টি মিষ্টি কথা বলবেন, নাকি প্রতিবেশীর সঙ্গে বলবেন?”
তার কথায় প্রণয়ের ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠল। সে বিছানায় গিয়ে বসে বলল,
“কিন্তু আমার বউ তো আমার কাছেই আসতে চায় না। তাহলে তাকে আমি মিষ্টি কথা শোনাবো কীভাবে?”
সূচনা চিরুনি নামিয়ে রেখে বলল,
“কথা শোনার জন্য কানের দরকার, আর বলার জন্য কণ্ঠের। এতে কাছে আসার কী সম্পর্ক?”
প্রণয় এবার ফোনটা হাতে নিয়ে সময় দেখল। রাত প্রায় এগারোটা। ফোনটা পাশে রেখে সে মাথা নেড়ে বলল,
“থাক, এসব কথা তুমি বুঝবে না। সেটা আমার ভালোই জানা আছে।”
সূচনা সঙ্গে সঙ্গে চোখ বড় বড় করে তাকাল।
“কেন বুঝব না? বুঝিয়ে বললেই তো বুঝব। আপনি কি বলতে চাইছেন আমি কিছুই বুঝি না?”
প্রণয় কিছু বলতে যাবে, ঠিক তখনই দরজায় টোকা পড়ল। সূচনা এগিয়ে গিয়ে দরজা খুলল। দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে আছে তামান্না।
সূচনাকে দেখে মৃদু হেসে বলল,

“কোনো দরকার হলে আমাকে ফোন দিবি। আর ইচ্ছা করলে আমার ঘরেও চলে আসতে পারিস, ঠিক আছে?”
সূচনা মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল।
“আচ্ছা, ঠিক আছে ভাবি।”
গভীর রাত। চারদিকে ঝড়ো হাওয়ার হু হু শব্দ। আকাশ যেন নিজের সমস্ত শক্তি উজাড় করে দিয়ে মুষলধারে বৃষ্টি ঝরিয়ে চলেছে। মাঝে মাঝে বিদ্যুতের তীব্র ঝলকানি অন্ধকার আকাশ চিরে চারপাশকে এক মুহূর্তের জন্য আলোকিত করে তুলছে। আবহাওয়াটা ভীষণ শীতল, তবুও ঘরের এসি চলছিল।
ঘুমের মাঝেই সূচনার হঠাৎ খুব ঠান্ডা লাগতে শুরু করল। ঠিক তখনই আকাশ কাঁপিয়ে এক ঝলক বিদ্যুৎ চমকালো। তীব্র শব্দের ধড়ফড় করে ঘুম ভেঙে গেল। বিছানায় উঠে বসে কয়েক মুহূর্ত দিশেহারা চোখে চারপাশে তাকিয়ে রইল সূচনা। ঘরের কোণে জ্বলতে থাকা হালকা হলুদ ড্রিম লাইটের আলোয় দেওয়ালে টাঙানো ঘড়িটার দিকে নজর যেতেই দেখল রাত দুটো বাজে। ঘুম জড়ানো চোখে পাশে তাকাল সূচনা। কিন্তু প্রণয় নেই। মুহূর্তেই তার বুকের ভেতরটা কেমন হালকা কেঁপে উঠল। এত রাতে প্রণয় কোথায় গেল?
মনে মনে নানা চিন্তা উঁকি দিতেই হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে গেল। নিমিষেই পুরো ঘর ডুবে গেল ঘন অন্ধকারে।
সূচনার গলা শুকিয়ে এল। অজান্তেই একটা ফাঁকা ঢোক গিলল সে। ঠিক তখনই বুঝতে পারল, তার ভীষণ পিপাসা পেয়েছে। অন্ধকারে হাতড়ে হাতড়ে ফোন খুঁজতে লাগল সে। প্রথমে না পেলেও কিছুক্ষণ পর অবশেষে ফোনটা হাতে পেল। দ্রুত ফ্ল্যাশলাইট অন করতেই সাদা আলোয় ঘরের একাংশ আলোকিত হয়ে উঠল। ধীর পায়ে টেবিলের কাছে গিয়ে জগ থেকে এক গ্লাস পানি ঢালল সে। কিন্তু গ্লাসটা হাতে নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বাইরে আকাশ ফাটিয়ে প্রচণ্ড শব্দে বাজ পড়ল।

আচমকা সেই বিকট শব্দে চমকে উঠল সূচনা। হাত থেকে গ্লাসটা ছিটকে মেঝেতে পড়ে গেল।
ঝনঝন শব্দে কাঁচের গ্লাসটা ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে ছড়িয়ে পড়ল চারদিকে। শব্দটা শোনামাত্রই ব্যালকনি থেকে দ্রুত ভেতরে ঢুকে এলো প্রণয়।
কিছুক্ষণ আগেই তার ঘুম ভেঙেছিল। কিন্তু আর ঘুম আসছিল না বলে চুপচাপ ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে বৃষ্টি দেখছিল সে। হঠাৎ কাঁচ ভাঙার শব্দ শুনেই আর এক মুহূর্ত দেরি না করে রুমে চলে এসেছে।
উদ্বিগ্ন চোখে দ্রুত সূচনার দিকে এগিয়ে গেল প্রণয়।
আর তাকে দেখামাত্রই সূচনা যেন নিজের সমস্ত ভয় ভুলে ছুটে গিয়ে তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।
মাথাটা গিয়ে ঠেকল প্রণয়ের বুকে।
প্রণয় স্পষ্ট অনুভব করল, ভয়ে অস্বাভাবিকভাবে কাঁপছে মেয়েটা। এক হাত দিয়ে সূচনার মাথা আর অন্য হাত দিয়ে তার পিঠ আগলে নিল সে। বুকের সঙ্গে আরও একটু শক্ত করে জড়িয়ে ধরে মাথাটা আলতো করে নামিয়ে আনল নিজের কাঁধে।
তারপর সূচনার কানের কাছে মুখ নিয়ে খুব নিচু স্বরে ফিসফিস করে বলল,

প্রণয়ের নব্য সূচনা পর্ব ১৩

“It’s okay… I’m here. ভয় পাওয়ার কিছু নেই, সূচনা। আমি আছি তোমার কাছে।”
প্রণয়ের শান্ত, আশ্বস্ত করা কণ্ঠস্বর শুনে সূচনা চোখ বন্ধ করে আরও শক্ত করে আঁকড়ে ধরল তাকে। বাইরে তখনও ঝড় চলছে, বৃষ্টি পড়ছে অবিরাম। কিন্তু প্রণয়ের বুকের ভেতর আশ্রয় পেয়ে সূচনার মনে হলো, পৃথিবীর সমস্ত নিরাপত্তা এই এক জায়গাতেই লুকিয়ে আছে।

প্রণয়ের নব্য সূচনা পর্ব ১৫

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here