রোমান্টিক ভাইয়া পর্ব ১৫
মহাসিন
সকাল হয়ে গেছে অনেকক্ষণ। বাড়ির প্রায় সবাই অফিসের পথে বেরিয়ে পড়েছে। শুধু নিরব এখনো যায়নি। ডাইনিং টেবিলে বসে নাস্তা সারছে সে, ধীরেসুস্থে।
শাপলা গুটি গুটি পায়ে এসে নিরবের সামনের চেয়ারটায় বসল।
নীলাঞ্জনা শাপলার দিকে তাকিয়ে মিষ্টি করে বলল,
“খাবার দেব কি?”
শাপলা মাথা নাড়ল।
“হ্যাঁ ভাবি, খেয়ে স্কুলে যাব।”
নিরব খাবার চিবোতে চিবোতেই ভ্রু কুঁচকে বলল,
“কিরে, তুই ভুলে গেলি? মা না তোকে কয়েকদিন স্কুলে যেতে বারণ করেছে?”
শাপলা ঠোঁট উল্টাল।
“বাসায় থাকতে একদম ভালো লাগে না, ভাইয়া। স্কুলে গেলে মনটা ভালো থাকে। বন্ধুদের সাথে দেখা হয়।”
নিরব একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
“আচ্ছা ঠিক আছে। তাহলে তাড়াতাড়ি খেয়ে নে। আমি অফিসে যাওয়ার পথে তোকে স্কুলে নামিয়ে দিয়ে যাব।”
কথা শেষ হতেই দুজনেই খাওয়ায় মন দিল। খাওয়া শেষ করে নিরব আর শাপলা বেরিয়ে পড়ল একসাথে।
গাড়িতে শাপলা নিরবের পাশের সিটেই বসা। জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে ছিল কিছুক্ষণ। হঠাৎ নিরবের দিকে ফিরে বলল,
“আচ্ছা ভাইয়া, আপনি যে মেয়েটাকে ভালোবাসেন, তার বয়স তো আপনার চেয়ে অনেক কম, তাই না?”
নিরব স্টিয়ারিংয়ে চোখ রেখেই হাসল।
“হ্যাঁ। তোকে তো বলেছিলাম সেদিন।”
শাপলা নাছোড়বান্দার মতো বলল,
“আপনি এটা বলেন তো, মেয়েটার বয়স কত?”
নিরব অবাক হয়ে তাকাল।
“তুই এত কিছু জেনে কী করবি?”
শাপলা জেদ ধরল।
“কিছু না। আপনাকে বলতে বলেছি, বলেন না,”
নিরব হাল ছেড়ে দিল।
“আঠারো বছর।”
শুনেই শাপলার চোখ চকচক করে উঠল।
“তাহলে তো কোনো সমস্যাই নেই! সে তো সাবালিকা। প্রপোজ করে দিলেই তো হয়, ভাইয়া। এত ভাবছেন কেন?”
নিরবের মুখটা কেমন মলিন হয়ে গেল।
“আরে পাগলী, তুই বুঝলি না। ওকে প্রপোজ করলে যদি না করে দেয়? ও তো আর আমাকে ভালোবাসে না। আমি জোর করতে পারি না।”
শাপলা ভ্রু কুঁচকে বলল,
“আপনি কীভাবে এত নিশ্চিত হলেন যে ওই মেয়েটা আপনাকে ভালোবাসে না? এমনও তো হতে পারে, সেও আপনাকে ভালোবাসে। শুধু লজ্জায়, ভয়ে বলতে পারছে না। মেয়েরা তো সহজে মনের কথা বলে না।”
নিরব গাড়ির জানালার বাইরে তাকাল। গলাটা কেমন ভারী শোনাল।
“জানি না রে, শাপলা। সত্যি জানি না। তবে একটা কথা কি জানিস? আমি ওই মেয়েটাকে অনেক… অনেক বেশি ভালোবেসে ফেলেছি। ওকে ছাড়া আমার নিঃশ্বাস নিতেও কষ্ট হয়।”
শাপলার বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। সে নিরবের দিকে তাকিয়ে নরম গলায় বলল,
“আচ্ছা ভাইয়া, প্লিজ বলেন না মেয়েটা কে? আমি তো আপনার বোন। আমাকে বলা যায় না?”
নিরব শাপলার মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে দিল।
“চিন্তা করিস না, পাগলী। খুব তাড়াতাড়ি জানতে পারবি। সময় হোক।”
এরপর দুজনে টুকটাক কথা বলতে বলতে কখন যে শাপলার স্কুলের সামনে চলে এল, টেরই পেল না।
গাড়ি থামল। শাপলা নামার আগে নিরবের দিকে তাকিয়ে হাসল।
“আসি ভাইয়া। সাবধানে যাবেন।”
নিরব মাথা নাড়ল।
“ক্লাস মন দিয়ে করবি। ছুটির পর আমি নিতে আসব। না হলে সিয়াম আসবে।”
শাপলা গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকে গেল। আর নিরব গাড়ি স্টার্ট দিয়ে অফিসের পথ ধরল। তার মন জুড়ে তখন শুধু একটাই নাম, একটাই মুখ। সেই আঠারো বছরের মেয়েটা, যাকে সে নিজের চেয়েও বেশি ভালোবাসে।
শাপলা চুপচাপ বসে আছে ক্লাসরুমে। চারপাশে আরও অনেক ছেলেমেয়ে। শাপলার ঠিক পাশেই বসেছে কলি আর দীপা। বাইরে রোদ ঝলমল করছে।
কলি শাপলার দিকে তাকিয়ে বলল,
“শাপলা, একটা মজার ঘটনা ঘটেছে।”
শাপলা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,
“আবার কী ঘটল?”
দীপা হেসে বলল,
“ঘটনাটা তোকে নিয়েই। শুনলে তুইও অবাক হবি।”
শাপলা কৌতূহলী হয়ে বলল,
“কী হয়েছে, আগে বল তো।”
দিপা বলল,
“ক্লাস টেনের অনিক নামের ছেলেটা তোকে পছন্দ করে।”
শাপলা চমকে উঠে বলল,
“মানে? তোরা কীভাবে জানলি?”
দীপা বলল,
“আরে, ও নিজেই আমাদের কাছে বলেছে। আর বলেছে তোকে জিজ্ঞেস করতে, তুই ওর সাথে প্রেম করবি কি না।”
শাপলা ভ্রু কুঁচকে বলল,
“তোরা তখন কী বললি?”
কলি বলল,
“আমরা বলেছি তোর সাথে কথা বলে জানাব।”
শাপলা রেগে গিয়ে বলল,
“আমি যদি তখন থাকতাম, পায়ের জু*তা খুলে ইচ্ছেমতো দিতাম। ফা*লতু ছেলে একটা!”
দীপা অবাক হয়ে বলল,
“আরে, এমন করছিস কেন? ছেলেটা তো ভালোই, দেখতেও সুন্দর। আমার ক্রাশ ও, শুধু আমার না, এই স্কুলের বেশিরভাগ মেয়েরই ক্রাশ।”
শাপলা বিরক্ত হয়ে বলল,
“তাহলে তুই-ই প্রেম শুরু করে দে। আমাকে কেন বলছিস? যেসব মেয়েদের রুচির দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছে, তারা ওর সাথে প্রেম করবে।”
কলি হাসতে হাসতে বলল,
“আরে, এভাবে বলিস না। যতই হোক, আমাদের দীপার ক্রাশ বলে কথা!”
দিপা লজ্জা পেয়ে বলল,
“উফ্, চুপ কর তো। শাপলা, শোন, ছেলেটা তোকে ওর নাম্বারও দিয়েছে। নিবি?”
শাপলা রাগে বলল,
“তুই-ই ওই নাম্বার নিয়ে চুটিয়ে প্রেম কর গিয়ে। ফা*লতু যতসব!”
হঠাৎ দরজা ঠেলে হাঁপাতে হাঁপাতে ঢুকল রাজু। মুখটা ফ্যাকাশে, কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম।
শাপলা ভ্রু কুঁচকে তাকাল।
“কিরে, অমন করে হাঁপাচ্ছিস কেন? কী হয়েছে?”
রাজু কোনোমতে দম নিয়ে বলল,
“ক্লাস এইটের রুপালী… রুপালীকে কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। গতকাল নাকি স্কুল থেকে বাড়িতেই যায়নি!”
কথাটা শুনেই দীপা চমকে উঠে বেঞ্চ থেকে দাঁড়িয়ে পড়ল।
“মানে কী? অসম্ভব! রুপালীকে তো আমি আর কলি গতকাল ওদের বাসার গলির মুখে নামিয়ে দিলাম। নিজের চোখে দেখেছি ও গলিতে ঢুকেছে।”
রাজু আরও অবাক হলো।
“কী বলছিস! তাহলে রুপালী গেল কোথায়? ওর মা-বাবা তো হেড স্যারের রুমে এসেছে। কান্নাকাটি করছে।”
ক্লাসের ভেতর একটা চাপা গুঞ্জন শুরু হলো। ঠিক তখনই একটা মেয়ে বিকট চিৎকার করে উঠল,
“লা….লা…..লা… লা*শ!”
বলেই মেয়েটা হড়হড় করে ব*মি করে দিল। সারা ক্লাস মুহূর্তে আতঙ্কে জমে গেল। কেউ কেউ ভ*য়ে কা*ন্না জুড়ে দিল।
শাপলা ছুটে গেল মেয়েটার কাছে। কাঁধ ধরে ঝাঁকিয়ে বলল,
“কী বলছিস তুই? কোথায় লা*শ? কী দেখেছিস?”
মেয়েটা কাঁপা হাতে ক্লাসের পিছনের দরজার পেছন দিকটা দেখিয়ে দিল। ঠোঁট দুটো থরথর করে কাঁপছে, কিন্তু গলা দিয়ে কোনো শব্দ বেরোচ্ছে না।
শাপলার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। ধীর পায়ে এগিয়ে গেল সে দরজার দিকে। উঁকি দিয়ে যা দেখল, তাতে তার শরীরের র*ক্ত হিম হয়ে গেল।
দরজার পেছনে পড়ে আছে ক্লাস এইটের রুপালী। না, আস্ত রুপালী ন*য়। টু*করো টু*করো রুপালী। ধড় থেকে মা*থাটা আ*লাদা। হাত, পা, শরীরের বিভিন্ন অংশ টু*করো টু*করো করা। রুপালীর মুখটা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে—সেই চেনা মুখ, কালও যে হাসতে হাসতে স্কুল থেকে বেরিয়েছিল।
শাপলা পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। চোখের পলক পড়ছে না। নিঃশ্বাস নিতেও ভুলে গেছে যেন। মুখ দিয়ে একটা শব্দও বেরোল না।
পুরো ক্লাস এখন ক*বরের মতো নিস্তব্ধ। সূঁচ পড়লেও শব্দ হবে।
দীপা গুটি গুটি পায়ে শাপলার পাশে এসে দাঁড়াল। ভয়ে ভয়ে শাপলার কাঁধে হাত রাখে শুধাল,
“এই শাপলা… কোথায় হারিয়ে গেলি? কী হয়েছে?”
শাপলা যন্ত্রের মতো হাত তুলে আঙুল দিয়ে দেখাল। গলা দিয়ে ফ্যাসফ্যাসে স্বর বেরোল,
“ওই… ওই দেখ… রুপালী…”
দীপা উঁকি দিয়েই বিকট চিৎকার করে উঠল। শাপলাও আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। দুজনে একসাথে আর্তনাদ করে উঠল,
“ও মা গো! রুপালীর লা*শ! রুপালী ম*রে গেছে!”
মুহূর্তে ক্লাসরুমে হুলস্থূল পড়ে গেল। কান্না, চিৎকার, ছোটাছুটি। খবর পেয়ে দৌড়ে এলেন স্কুলের টিচাররা। তাদের পেছন পেছন কাঁদতে কাঁদতে ঢুকলেন রুপালীর মা-বাবা।
একজন স্যার কাঁপা হাতে ফোন বের করে পুলিশে কল দিলেন।
আর রূপালীর মা? মেয়ের টু*করো টু*করো দে*হটা দেখে তিনি আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারলেন না। বুকফাটা চিৎকার করে মেঝেতে লুটিয়ে পড়লেন,
“আমার মেয়ে… আমার রুপালী… কে করল আমার মেয়েটার এই অ*বস্থা… আল্লাহ গো…”
পুরো স্কুলটা এখন শুধু এক মায়ের আর্তনাদে কাঁপছে। আর শাপলা? সে এখনও দরজার পাশে দাঁড়িয়ে। চোখ দুটো স্থির। রুপালীর কা*টা মা*থাটা যেন তার দিকেই তাকিয়ে আছে।
হেডস্যারের রুমের বাতাসটা ভারী হয়ে আছে। চেয়ারে গম্ভীর মুখে বসে আছেন হেডস্যার। পাশে দাঁড়িয়ে আছেন ক্লাস টিচার, মুখ থমথমে।
সামনের চেয়ারে জড়সড় হয়ে বসে আছে শাপলা, কলি আর দীপা। তিনজনের চোখেমুখে এখনও আতঙ্কের ছাপ স্পষ্ট।
পুলিশ অফিসার দেব রায় শাপলার দিকে তীক্ষ্ণ চোখে তাকালেন। “তোমার নাম কী?”
শাপলা ঢোক গিলল। গলাটা কেঁপে উঠল ভয়ে। “শা….শা….শা… শাপলা।”
দেব রায় এবার কলি আর দীপার দিকে ফিরলেন। “তোমাদের দুজনের নাম?”
দুজনেই একসাথে বলল, “দীপা, কলি।”
এরপর একে একে অনেক প্রশ্ন। রুপালীকে শেষ কবে দেখেছে, কোথায় দেখেছে, কোনো অস্বাভাবিক কিছু চোখে পড়েছে কি না—সব খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জানলেন অফিসার।
সব শেষে দেব রায় শাপলার চোখের দিকে সরাসরি তাকালেন। “আচ্ছা শাপলা, এমন কাউকে কি কখনো দেখেছ যে তোমাকে ফলো করে? তোমার ওপর নজর রাখে?”
শাপলা মাথা নাড়ল। “না স্যার, এমন কাউকে কখনো দেখিনি।”
দেব রায় আরও কিছু জিজ্ঞাসাবাদ করে নোট নিয়ে উঠে দাঁড়ালেন। “ঠিক আছে, তোমাদের সাহায্যের জন্য ধন্যবাদ। কিছু মনে পড়লে সাথে সাথে থানায় জানাবে।”
এই বলে চলে গেলেন।
তিনজন হেডস্যারের রুম থেকে বেরোতে যাবে, ঠিক তখনই পেছন থেকে ভারী গলা ভেসে এল, “দাঁড়াও।”
সবাই চমকে ঘুরে তাকাল।
কলি আমতা আমতা করে বলল, “স্যার, কিছু বলবেন?”
হেডস্যার চশমার ফাঁক দিয়ে তাকালেন। “হ্যাঁ। মন দিয়ে শোনো। আজ থেকে স্কুল অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ থাকবে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে স্কুল খুললে জানিয়ে দেওয়া হবে।”
একটু থেমে গলাটা কঠিন করলেন তিনি। “কিন্তু মনে রেখো, বাসায় বসে সবাই পড়াশোনা করবে। ফাঁকি দিলে পরীক্ষায় গোল্লা ছাড়া কিছুই জুটবে না। ঘোড়ার ডিম পাবে।”
কলি আর চুপ থাকতে পারল না। ঠোঁটের কোণে চাপা দুষ্টু হাসি টেনে বলল, “স্যার, চিন্তা করবেন না। যদি ঘোড়ার ডিম পাই, আপনার জন্য একটা ভাগ রেখে দেব। কথা দিলাম!”
হেডস্যার রাগে কিছু বলতে যাবেন, তার আগেই তিনজন—শাপলা, কলি, দীপা—হুড়মুড় করে রুম থেকে বেরিয়ে দৌড় দিল।
ছাত্রীর নির্মম মৃ*ত্যুর পর স্কুল কর্তৃপক্ষ বাধ্য হয়েই অনির্দিষ্টকালের জন্য স্কুল বন্ধ ঘোষণা করেছে। আর যেন কোনো নিষ্পা*প প্রা*ণ এভাবে ঝ”রে না যায়।
ধীরে ধীরে স্কুল ফাঁকা হয়ে গেল। আতঙ্কিত অভিভাবকেরা এসে তাদের সন্তানদের নিয়ে গেছে।
স্কুলের বিশাল গেটের সামনে এখন দাঁড়িয়ে আছে শুধু চারজন—শাপলা, কলি, দীপা আর রাজু। চারপাশটা অদ্ভুত নীরব।
কলি রাগে ফুঁসছে। “ধুর! এই শয়*তান টাকলা হেডস্যারটাকে আমার একদম সহ্য হয় না। বিরক্তিকর লোক একটা! স্কুল বন্ধ দিয়েছে, তাও খোঁচা মারা বন্ধ নেই। বাসায় বসে পড়ো, নাহলে ঘোড়ার ডিম পাবে! উফ!”
দীপা দাঁতে দাঁত চেপে বলল, “শা*লার টাকলার বাচ্চাকে আমার দুচোখে দেখতে ইচ্ছে করে না। যত্তসব!”
রাজু হাত নেড়ে ওদের থামাল। “উফ্, চুপ কর তো তোরা। এখন তো আর আড্ডা, মজা কিছুই হবে না। স্কুল বন্ধ… এখন কী করব? কবে খুলবে কে জানে!”
কলি দীর্ঘশ্বাস ফেলল। “হ্যাঁ রে, আর কোনো মজা নেই। কবে যে এই অ*ভি*শা*প কাটবে!”
দীপা হঠাৎ শাপলার দিকে তাকাল। “এই শাপলা, তুই তো ফোনও চালাস না। তোর ফোন থাকলে তাও কল দিয়ে কথা বলা যেত। এখন কীভাবে যোগাযোগ করব?”
শাপলা ব্যাগ থেকে একটা ছোট কাগজ বের করল। “একটা নাম্বার দিচ্ছি, তোরা তুলে নে। এই নাম্বারে কল দিলে আমাকে পাবি।”
দীপা অবাক হয়ে গেল। “কী! তুই আবার ফোন পেলি কোথা থেকে? তোর কাছে তো ফোন ছিল না।”
শাপলা চোখ পাকাল। “চুপ কর তো। তোরা একটু বেশি কথা বলিস। নাম্বারটা রাখ, কাজে লাগবে।”
নাম্বারটা নিয়ে ওরা তিনজন একে একে বিদায় নিল। রাজু বাইকে উঠে চলে গেল। কলি আর দীপাও হাঁটতে হাঁটতে মিলিয়ে গেল রাস্তার মোড়ে।
স্কুলের সামনে শুনশান নীরবতা। শাপলা একা দাঁড়িয়ে আছে বিশাল লোহার গেটটার পাশে। চারপাশে কেউ নেই। শুধু দূরে কোথাও কুকুরের ডাক আর পাতা ঝরার শব্দ।
হঠাৎ নিস্তব্ধতা চিরে একটা কালো রঙের চকচকে গাড়ি এসে থামল ঠিক গেটের সামনে। জানালার কালো কাচ নামতেই বেরিয়ে এল সিরাজ।
সিরাজকে দেখে শাপলার ভ্রু কুঁচকে গেল। বিস্ময় লুকাতে পারল না সে। এই সময়, এই জায়গায় সিরাজ?
সিরাজ ধীর পায়ে এগিয়ে এল শাপলার দিকে। ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি।
“কিরে, এভাবে একা একা এখানে দাঁড়িয়ে আছিস কেন?”
শাপলা চোখ নামিয়ে নিল।
“বাড়ি যাব, তাই। গাড়ির জন্য দাঁড়িয়ে আছি।”
একটু থেমে সে-ও পাল্টা প্রশ্ন করল,
“আপনি এখানে কেন? কোনো কাজে এসেছেন?”
সিরাজ পকেটে হাত ঢুকিয়ে হাসল।
“একটা কাজে এদিকটায় এসেছিলাম। এখন বাড়ি ফিরছিলাম। তোকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে গাড়ি থামালাম।”
এক মুহূর্ত চুপ থেকে আবার বলল,
“আয়, আমার সাথে চল। তোকে বাড়িতে পৌঁছে দিই।”
শাপলা সঙ্গে সঙ্গে মাথা নাড়ল।
“না, না। প্রয়োজন নেই। আমি একটা সিএনজি নিয়ে চলে যাব।”
সিরাজ চারপাশে একবার চোখ বুলিয়ে নিল। “এই ভরদুপুরে এদিকে সিএনজি পাবি কোথায়? তেমন কোনো গাড়ি তো দেখছি না। কতক্ষণ এভাবে দাঁড়িয়ে থাকবি?”
কথাটা মিথ্যে নয়। রাস্তাটা সত্যিই ফাঁকা। কতক্ষণ আর ঠায় দাঁড়িয়ে থাকা যায়? শাপলা মনে হিসেব কষল। তার চেয়ে সিরাজের সাথে চলে যাওয়াই ভালো।
শাপলা হালকা গলায় বলল,
“আচ্ছা, ঠিক আছে।”
সিরাজ গিয়ে ড্রাইভিং সিটে বসল। শাপলা অভ্যাসবশত পেছনের দরজা খুলতে যাবে, তখনই সিরাজের গম্ভীর গলা ভেসে এল, “
এই, সামনে আয়। পেছনে বসতে হবে না। আমার পাশে বোস।”
শাপলার অস্বস্তি হলো। তবু কথা না বাড়িয়ে সে সামনের সিটে গিয়ে বসল।
সিটবেল্টটা টেনে লাগাতে যাবে, ঠিক তখনই সিরাজ তার হাতটা চেপে ধরল।
“তোর লাগাতে হবে না। আমি লাগিয়ে দিচ্ছি।”
বলেই সিরাজ শাপলার দিকে ঝুঁকে পড়ল। তার শরীরের গন্ধ, গরম নিঃশ্বাস শাপলার মুখের ওপর এসে লাগল। শাপলা জমে গেল। বুকের ভেতরটা কেমন ধক করে উঠল। ভয়, এক অজানা অস্বস্তিতে সে সিটের সাথে সেঁটে গেল।
সিরাজ খুব যত্ন করে, ধীরে ধীরে বেল্টটা টেনে শাপলার বুকের ওপর দিয়ে নিয়ে ক্লিক করে আটকে দিল। তার আঙুলের ছোঁয়া ইচ্ছে করেই যেন একটু বেশি সময় ধরে লেগে রইল শাপলার গায়ে।
“হয়ে গেছে,” ফিসফিস করে বলল সিরাজ। তার চোখে এক অদ্ভুত ঝিলিক।
এরপর সোজা হয়ে বসে সিরাজ গাড়ি স্টার্ট দিল। ইঞ্জিনের গর্জনের সাথে সাথে কালো গাড়িটা ছুটে চলল সামনের দিকে।
শাপলা জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল। কিন্তু তার মন পড়ে রইল পাশে বসা মানুষটার দিকে। সিরাজের এই অযাচিত ঘনিষ্ঠতা, এই চাহনি—কিছুই স্বাভাবিক লাগছে না তার।
গাড়ি যত এগোচ্ছে, শাপলার বুকের ভেতরের অস্বস্তিটাও ততই বাড়ছে।
অনেক সময় চলে গেল। রাত গভীর হয়েছে। দেওয়াল ঘড়িতে এখন কাঁটায় কাঁটায় এগারোটা।
পুরো বাড়ি নিস্তব্ধ, ডুবে আছে ঘুমের দেশে। কিন্তু শাপলার চোখে ঘুমের লেশমাত্র নেই।
এপাশ-ওপাশ করছে সে বিছানায়। চোখ বন্ধ করলেই ভেসে ওঠে একটাই মুখ—সিয়ামের। সেই চেনা হাসি, সেই গভীর চোখ। বুকের ভেতরটা কেমন হাহাকার করে উঠছে।
শাপলার আর এক মুহূর্তও সহ্য হচ্ছে না। শুধু একবার, একবার সিয়ামকে দেখতে ইচ্ছে করছে। এক পলক দেখলেই বুঝি এই অস্থিরতা কমবে।
আর শুয়ে থাকতে পারল না সে। নিঃশব্দে উঠে বসল বিছানায়। খালি পায়ে, পা টিপে টিপে বেরিয়ে এল ঘর থেকে।
শাপলা এসে দাঁড়াল সিয়ামের রুমের দরজার সামনে।
বুকের ভেতরটা ধুকপুক করছে। হাতটা কাঁপছে একটু একটু।
রোমান্টিক ভাইয়া পর্ব ১৪
সাহস সঞ্চয় করে দরজায় আলতো করে টোকা দিল সে। ঠক… ঠক…
ভেতরে কোনো সাড়া নেই। সিয়াম তো গভীর ঘুমে অচেতন। সারাদিনের ক্লান্তি শেষে বিছানায় পড়তেই ঘুম এসে জড়িয়ে ধরেছে তাকে।
শাপলা আবার টোকা দিল। এবার একটু জোরে। ঠক… ঠক… ঠক…
হঠাৎ দরজার সেই মৃদু ঠকঠক শব্দে সিয়ামের ঘুমটা আলগা হয়ে গেল। ভ্রু কুঁচকে গেল তার। এত রাতে কে?
সিয়াম পাশ ফিরে শুলো। ঘুমের ঘোরেই কান পাতল। আবার সেই শব্দ—ঠক… ঠক…
এবার পুরোপুরি ঘুম ভেঙে গেল তার।
