রোমান্টিক ভাইয়া পর্ব ৬৯
মহাসিন
পরের দিন সকাল। ঘড়িতে ঠিক ১০টা বাজে।
শাপলা নিঃশব্দে পা টিপে টিপে ড্রয়িং রুমে এলো। চারপাশে একবার চোখ বুলালো। কেউ আছে কিনা দেখল। না, বাড়িটা নিস্তব্ধ।এক মুহূর্ত দেরি না করে দরজা খুলে বেরিয়ে গেল।আড়াল থেকে কবিতা বেরিয়ে এলো। ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি।
_”এবার কি করবি তুই শাপলা? তোর সব জারিজুরি এবার শে ষ।”
অন্যদিকে শাপলা একটা সিএনজিতে উঠে বসেছে। গন্তব্য একটাই।
আর একটু দূরত্ব রেখে সিয়ামও তার কালো গাড়ি নিয়ে শাপলাকে ফলো করতে লাগলো।
সময় গড়িয়ে গেছে। দুজনেই এসে পৌঁছাল সেই পুরোনো বাড়িটায়। শাপলা ভিতরে ঢুকলো। সিয়াম দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে সব শুনতে লাগল। ভিতরে একটা অন্ধকার ঘর। মাঝখানে চেয়ারের সাথে
বাঁ’ ‘ধা সিরাজ। মুখে কা’প’ড় পেঁচানো।
শাপলা ধীর পায়ে এগিয়ে এলো। দীপার দিকে তাকিয়ে কঠিন গলায় বলল,
”ওর মুখের বাঁধন খুলে দে।”
দীপা কাঁপা হাতে বাঁধন খুলে দিল।
শাপলা সিরাজের চোখে চোখ রাখল।
”কি বলতে চাস তুই?”
সিরাজ হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,
”আমাকে একদম শে ষ করে দে… আর না হলে
মু ক্তি দে। আমি শিখার ব্যাপারে কিছু জানি না। সত্যি বলছি।”
শাপলা সিরাজের গালে জো রে একটা থা ‘প্প :’ড়
মে’ ‘রে দিলো। চোখ রাঙিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
”তুই সব জানিস! তাড়াতাড়ি বল, শিখা আপু কোথায়?”
সিরাজ কেঁদে ফেলল।
”আমি… আমি ওদের নোং রা কাজের সাথে যুক্ত ছিলাম। অনেক খা রা প কাজ করেছি। এমনকি তোর সাথেও… খা রা প কিছু করার চেষ্টা করেছি। আমি অনুতপ্ত শাপলা। আর পারছি না। মু ক্তি চাই।”
সিরাজ একটু থেমে আবার বলতে লাগলো,
”আমি জানি না শিখাকে কোথায় আটকে রেখেছে। তবে আমি জানি ওদের গোপন আস্তানাটা কোথায়। যেখানে ওরা শিখাকে রাখতে পারে। আমাকে ছেড়ে দে, আমি নিজে তোকে সেখানে নিয়ে যাব।”
শাপলা সন্দেহের চোখে তাকাল।
”তোকে বিশ্বাস করব কিভাবে?”
”বিশ্বাস না করলে কিছু করার নেই।” সিরাজ ফিসফিস করে বলল।
বাইরে থেকে সব কথা শুনছে সিয়াম।
দীপা চিৎকার করে উঠল,
”না শাপলা! এই নোং রা লোকটাকে বিশ্বাস করিস না। ও নিশ্চয়ই কোনো চালাকি করছে।”
সিরাজ মাথা নাড়ল।
”না দীপা। আমি কোনো চালাকি করছি না।”
শাপলা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। তারপর ধীরে ধীরে সিরাজের হাত পায়ের বাঁধন খুলে দিল।
বাঁধন খুলতেই সিরাজ হুমড়ি খেয়ে শাপলার পা
জ ড়ি য়ে ধরল।
”শাপলা… আমাকে ক্ষমা করে দে। আমি অনেক খা রা প কাজ করছি। তোর সাথেও অনেক কিছু ক রা র চেষ্টা করেছি। আমাকে মাফ করে দে। ওই ন রপিশাচদের সাথে থাকতে থাকতে আমি নিজেকে হারিয়ে ফেলেছিলাম।”
শাপলার চোখে পানি। কিন্তু গলা শক্ত।
”ক্ষমা করব। তবে একটা শর্তে। আমাকে সাহায্য করতে হবে শিখা আপুকে খুঁজে বের করতে।”
সিরাজ উঠে দাঁড়াল।
”হ্যাঁ। তাই হবে।”
হঠাৎ দরজা ঠেলে রুমে ঢুকল সিয়াম।
শাপলা এক পা পিছিয়ে গেল।
সিয়াম বলতে লাগলো,
”বাহ বাহ! ভালোই তো অভিনয় জানিস। তোর তো সিনেমা করা উচিত।”
শাপলা কাঁপা গলায় বলল,
”আপনি আমার কথাটা শুনেন প্লি’জ।”
সিয়াম গর্জে উঠল,
”চুপ! একদম চুপ। আমি বলব, তুই শুনবি। তুই সিরাজকে আ’ ট’কে রেখেছিস। আর আমাদের সবাইকে মিথ্যা বলছিস।”
শাপলা আর ধরে রাখতে পারল না। কান্নায় ভেঙে পড়ে চিৎকার করে উঠল,
”তো কি করব আমি? আমি কি মানুষ না? আমার কষ্ট হয় না? আজ শুধু আপনার মা বাবার জন্য আমার পুরো পরিবার শে ষ। আমি সবাইকে হারিয়েছি। সব।”
সিয়াম রেগে বলল,
”আমার মা বাবা কি করেছে হ্যাঁ?”
”কি করেছে? যা করেছে শুনলে আপনার পায়ের নিচের মাটি সরে যাবে।”
”কি?”
”অনাথ আশ্রম আছে না? ওই আশ্রমের সুন্দরী মেয়েদের বি’দে’শে বি’ ‘ক্রি করে দেয়। আর কিছু নোং রা বিজনেসম্যান ওই আশ্রমের মেয়েদের
সা থে জো _র করে খা_রা_ প কা’জ করে।”
সিয়াম অবিশ্বাসের চোখে তাকাল।
”তোর কাছে প্রমাণ আছে?”
শাপলা আবার চিৎকার করে উঠল,
”প্রমাণ থাকলে আমার অবস্থা শিখার মতো হতো! আমার বোনকে আপনার বাবা আ’ট’ কে রেখেছে!”
”তুই কি সব বলছিস?তোর কাছে আদৌ কোনো প্রমাণ আছে?”
শাপলা দুই হাতে মাথা চেপে ধরল,
”উফ্! প্রমাণ! প্রমাণ চুলোয় যাক! আপনার বাবা মা, সাথে সিরাজের বাবা, আর জাবেদ আলী… এরা সবাই ওই নোং রা কা জের সাথে জড়িত।”
সিয়াম চিৎকার করে বলল,
”আমি কখনো বিশ্বাস করব না আমার মা বাবা এমন করতে পারে!”
সিরাজ সামনে এসে দাঁড়াল।
”বিশ্বাস করতে হবে সিয়াম। আমিও ওদের সাথে ছিলাম। প্রতি বছর ত্রিশটা মেয়েকে বি দে শে
বি’ ‘ক্রি করে। কিছু বিজনেসম্যান রাতের জন্য মেয়ে ভা” “ড়া নেয়। সব সত্যি।”
শাপলা সিয়াম কে উদ্দেশ্য করে বলল
”তাহলে শুনুন… সবটা ।”
একটা দম নিয়ে শাপলা বলতে লাগলো,
____”আমার বোন… আমার শিখা আপু। ও আমাদের বাড়িতে এসেছিল বাবা মাকে রাজি করাতে। ও চেয়েছিল বির আর ওর সম্পর্কটা যেন বাবা-মা মেনে নেয়। একটু সম্মান নিয়ে বাঁচতে চেয়েছিল। বাবা তখন ভীষণ রেগে ছিলেন। বাড়িতেই আসতেন না। তাই শিখা আপু ঠিক করল, ফ্যাক্টরিতে গিয়ে বাবার সাথে সরাসরি কথা বলবে। ওর সাথে গিয়েছিল রিদি ফুপি। মানে দীপার মা। দুজন সাহসী মেয়ে। একটা আশা বুকে নিয়ে বেরিয়েছিল। কিন্তু গেটের সামনে বাবাকে না পেয়ে ওরা ফ্যাক্টরির ভিতরে চলে যায়। আর তখনই… তখনই ওরা আপনার বাবা মা আরো যতো লোক আছে সবার নোং রা প্ল্যানের কথা শুনে ফেলে। শিখা আপু দেরি করেনি। সাথে সাথেই ফোন বের করে সব রেকর্ড করে ফেলে। কিন্তু ওরা আমার ফুপি আর শিখা আপু কে দেখে ফেলে।
ফুপি চিৎকার করে বলেছিল – শিখা, পালা! আমি দেখছি। শিখা আপু দৌড় দেয়। আর ফুপি… ফুপি একা ওদের আটকানোর চেষ্টা করে। কিন্তু পারে না। ওরা ফুপির উপর এমন অ ত্যা চা র করে যে ফুপি কো মা য় চলে যায়। ওরা শিখা আপুকে ধরে ফেলে। ফোন খোঁজে। কিন্তু পায় না। কারণ আমার বোন অনেক আগেই সব লুকিয়ে ফেলেছিল। প্রমাণ না পেয়ে ওরা পাগল হয়ে যায়। শিখা আপুকে আটকে রাখে। দিনের পর দিন… রাতের পর রাত অ ত্যা চা র করে। জিজ্ঞেস করে – বল, প্রমাণ কোথায়? কিন্তু আমার বোন… একটা শব্দও বলেনি। আমাদের বাড়িতে পাঠানো হয় রিদি ফুপিকে। আর একটা গিফট বক্স।
সবাই ভাবল বক্সের ভিতর শিখা আপু। কিন্তু না। ওটার ভিতর ছিল অনাথ আশ্রমের একটা অসহায় মেয়ে। আর সাথে হুমকি। যদি বাবা মা পুলিশের কাছে যায়, শিখাকে কারা মে রে ছে বের করার চেষ্টা করে… তাহলে আমাকে আর দীপাকে ওরা ওই অবস্থা করবে। আমরা সবাই ভেবে নিয়েছিলাম শিখা আপু আর নেই। আমি যখন আপনাদের বাড়িতে আসি, তার ঠিক ১০ দিন পর ঐশী এসে বলে – শাপলা, জরুরি কথা আছে। আমার সাথে চল। আমি গিয়েছিলাম। ওখানে শিখা আপুর চিঠি পরে সব জানতে পারি।”
সিয়াম এসব শুনে বলল,
”আমি কিছুই বিশ্বাস করি না। তুই মিথ্যা বলছিস। সব মিথ্যা। তুই আগে আমাকে প্রমাণ দে, তাহলে সব বিশ্বাস করব।”
শাপলা বলল,
”আপনি বিশ্বাস না করলে আমার কিছুই করার নেই।”
সিয়াম বলল,
”আচ্ছা ধরে নিলাম সব সত্যি। শিখা আপুকে তো আ ট কে রাখা হয়েছে, তাহলে সে চিঠি কিভাবে দিল?”
শাপলা বলল,
”আমি জানি না। কিছুই জানি না।”
সিয়াম বলল,
”আমি বিশ্বাস করি না।”
সিরাজ বলল,
”সবাই চলো। আমি তাদের যে যে গোপন জায়গার কথা জানি, ওখানে গিয়ে দেখি শিখা আছে কিনা।”
এরপর সবাই বেরিয়ে পড়ল।
নদীর তীরে হালকা বাতাস। পানিতে ঢেউ খেলছে আর তার সাথে তাল মিলিয়ে নিরব আর চুমকি হেঁটে যাচ্ছে।
দুজনের হাত দুটো শক্ত করে জ ড়া নো।
হঠাৎ চুমকি ঠোঁট ফুলিয়ে বলল,
”আপনি একদম আন রো মা ন্টি ক।”
নিরব ভ্রু কুঁচকে তাকাল।
”তুমি কিভাবে বুঝলে?”
”বুঝব না? আপনি তো কখনো রো মা ন্টি ক কথা বলেন না।” চুমকি মুখ ঘুরিয়ে নিল।
নিরব থেমে গেল। চুমকির একদম কা ছে এসে কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল,
”কি রকম রো মা ন্টি ক কথা শুনতে চাও আমার কাছ থেকে, হুম?”
চুমকির বুক ধক করে উঠল। লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেলল।
”জানি না…”
নিরব বাঁকা হাসি দিল। চুমকির থুতনি আঙুল দিয়ে একটু উঁচু করে ধরল।
”গাড়িতে চলো। শুধু বলব না… ক রে ও দেখাব।”
চুমকি কাঁপা কাঁপা গলায় বলল,
”মা… মানে? বুঝলাম না।”
”আর মানে বুঝতে হবে না।”
কথা শেষ করেই আচমকা নিরব চুমকিকে কোলে তুলে নিল।
চুমকি ভয়ে নিরবের শার্ট খামচে ধরল।
”কি করছেন কি! ছাড়েন!”
নিরব ঠোঁটে আঙুল দিয়ে বলল,
”শ… একদম চুপ।”
তারপর ধীরে ধীরে গাড়ির কাছে এসে দরজা খুলে চুমকিকে বসিয়ে দিল। নিজেও সিটে উঠে বসল।
গাড়ির ভিতর নিস্তব্ধতা। শুধু এসির মৃদু শব্দ।
নিরব ধীরে ধীরে চুমকির দিকে ঝুঁ কে এলো। খুব কা ছে। এত কা ছে যে চুমকি ওর গরম নিঃশ্বাস নিজের গালে অনুভব করছে।
নিরব চুমকির চুলের কাছে মুখ নিয়ে গভীর করে শ্বাস নিল।
”তোমার চুলের গন্ধটা… আমাকে পা গ ল করে দিচ্ছে।”
ওর ফিসফিস কণ্ঠটা কেঁপে উঠল।
চুমকি লজ্জায় চোখ বন্ধ করে ফেলল। দুই গাল লাল হয়ে গেছে।
নিরব আর অপেক্ষা করল না। আলতো করে চুমকির ঠোঁটে নি জে র ঠোঁ ট ছোঁ য়া ল।
প্রথমে খুব আস্তে। তারপর গভীর।
চুমকি প্রথমে কেঁপে উঠলেও একটু পর নিরবকে শক্ত করে জ ড়ি য়ে ধরল।
সময় থেমে গেল কয়েক মুহূর্তের জন্য।
হঠাৎ নিরব নিজেকে সরিয়ে নিল। কপালের সাথে কপাল ঠেকিয়ে ফিসফিস করে বলল,
”আজ এতটুকুই। বাকি সব… বিয়ের পর।”
চুমকি লজ্জায় আর তাকাতে পারছে না। মুখ লুকাল নিরবের বুকের মধ্যে।
দুপুরের রোদটা চারপাশে ঝলমল করছে। কিন্তু সিয়াম দের পুরোনো ফ্যাক্টরির ভিতরটা একদম নিস্তব্ধ, অন্ধকার।
গেটের সামনে দাঁড়িয়ে আছে চারজন সিয়াম, সিরাজ, দীপা আর শাপলা।
সবার মুখ শক্ত। বুকের ভিতর টেনশন।
চারজন পা টিপে টিপে ভিতরে ঢুকল। চারপাশে ধুলো, মাকড়সার জাল আর পুরোনো মেশিনের গন্ধ।
নিচতলার একটা রুম থেকে তাসের আওয়াজ আসছে। দরজার ফাঁক দিয়ে দেখা গেল — ৩টা ছেলে মেঝেতে বসে তাস খেলছে। সিগারেটের ধোঁয়ায় ঘরটা ঝাপসা।
সিরাজ ফিসফিস করে বলল, “উপরে চল।”
সবাই সিঁড়ি বেয়ে দুইতলায় উঠে এলো।
লম্বা করিডোর। দুই পাশে সারি সারি রুম। প্রতিটা দরজা হাট করে খোলা। ভিতরে শুধু ভাঙা চেয়ার আর ধুলো।
চারজন আলাদা আলাদা রুমে খুঁজতে লাগল।
শাপলার বুকের ভিতর ধুকপুক করছে। প্রতিটা রুমে গিয়ে কাঁপা গলায় ডাকছে,
”আপু… শিখা আপু… তুই কি এখানে?”
হঠাৎ করিডোরের একদম শেষে শাপলা থেমে গেল।
একটা রুম। বাইরে মোটা তালা ঝুলছে।
শাপলার গলা কেঁপে উঠল।
”এই… এই রুমটা বন্ধ!”
ওর ডাক শুনে এক মুহূর্তে বাকি তিনজন ছুটে এলো।
সিয়াম আর এক সেকেন্ডও ভাবল না। পা তুলে সজোরে লা থি মা র ল।
দরজাটা ভেঙে গেল।
সাথে সাথেই ভিতর থেকে বেরিয়ে এলো একটা স্যাঁতস্যাঁতে, পচা গন্ধ।
সবাই ভিতরে ঢুকল।
ছোট্ট একটা ঘর। জানালা নেই। বাতাস আটকে আছে। মেঝেতে দুটো মেয়ে পড়ে আছে। গায়ে ময়লা, ছেঁড়া পুরোনো জামা। চুল উস্কোখুস্কো। দেখে মনে হচ্ছে কতদিন ধরে না খাওয়া, না গোসল করা।
শাপলার দম বন্ধ হয়ে আসছে।
ও দৌড়ে প্রথম মেয়েটার কাছে এলো। দুই হাতে মুখটা তুলে ধরল।
না… এটা শিখা না।
কাঁপতে কাঁপতে দ্বিতীয় মেয়েটার কাছে এলো। মেয়েটার মাথাটা নিজের কোলে তুলে নিল।
আর চেহারাটা দেখতেই শাপলার চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল।
”আপু…”
এটা শিখা। ওর নিজের রক্তের বোন শিখা।
শাপলা আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। শিখাকে বুকের সাথে শক্ত করে জ ড়ি য়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল।
”আপুরে… আমি তোকে পেয়েছি। আমি তোকে পেয়েছি রে আপু।”
ওর কান্নায় পুরো ঘরটা ভারী হয়ে উঠলো।
শিখার শরীরটা একদম নিস্তেজ। ঠোঁট ফে’ টে গেছে। গালে কালশিটে। কিন্তু শাপলার কান্না শুনে ওর চোখের পাতা একটু নড়ে উঠল।
দীপা পাশে বসে মুখ চেপে কাঁদছে।
সিরাজ মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। চোখে অপরাধবোধ।
আর সিয়াম? ওর মুঠো শক্ত। চোখ দুটো রাগে লাল হয়ে আছে।
শাপলা শিখার কপালে বারবার চু মু খাচ্ছে আর ফুঁপিয়ে বলছে,
”আর ভয় নেই আপু। আমি এসেছি। আর কেউ তোকে ক ষ্ট দিতে পারবে না। কথা দিলাম।”
সিয়াম ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো। শিখার দিকে তাকিয়ে ওর গলা ধরে এলো।
”শিখা আপু… আপনার এই অবস্থা কে করেছে?”
শিখা ধীরে মাথা তুলল। চোখ দুটো গর্তে বসে গেছে। সেই উজ্জ্বল মুখটা আজ মলিন। লম্বা চুলগুলো জট বেঁধে কাঁধে লেপ্টে আছে।
শিখা তেতো হাসি হাসল।
”কে? তোর মা… তোর বাবা। ওরাই আমার জীবনটা শে ষ করে দিয়েছে।”
কথাটা শুনে সিয়ামের পায়ের নিচের মাটি সরে গেল।
শিখা কষ্ট করে উঠে দাঁড়াল। আর হঠাৎ সবার চোখ আটকে গেল ওর পেটের দিকে।
শিখা গর্ভবতী।
শাপলা হতবাক হয়ে বলল,
”কিভাবে এমন হলো আপু? এই বাচ্চা… এই বাচ্চা কার?”
শিখা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে।
”আমি জানি না রে। আমার এই পেটের পা প টা কার আমি জানি না।”
সে শাপলার হাত দুটো শক্ত করে ধরল।
”শাপলা… তুই আমাকে এখান থেকে নিয়ে যাবি তো? বল না নিয়ে যাবি। আমার বিরের কাছে নিয়ে যাবি। বাবা আমাকে আর বিরকে মেনে নিবে তো? বল না, চুপ করে আছিস কেন?”
শিখা কাঁপতে কাঁপতে দীপার কাছে এলো।
”এই দীপা… তুই বল। বাবা আমাকে মেনে নিবে তো? বল না।”
দীপা শিখাকে জ ড়ি য়ে ধরে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল।
”না… না আপু। আর কেউ মেনে নিবে না।
কেউ বেঁ চে নে ই।”
শিখা দীপাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিল।
”কি বলছিস তুই?”
শাপলা কান্নায় ভেঙে পড়ল।
”কেউ বেঁ চে নেই আপু। সবাই ম- -রে গেছে। সবাই।”
কথাটা শুনে শিখা ধুপ করে মেঝেতে বসে পড়ল। চোখ দিয়ে শ্রাবণের মতো অশ্রু নামতে লাগল।
এমন সময় মেঝেতে পড়ে থাকা দ্বিতীয় মেয়েটা উঠে দাঁড়াল। সিয়ামের দিকে তাকিয়ে বলল,
”তুমি সিয়াম তাই না?”
সিয়াম অবাক।
”আপনি কে? আমাকে কিভাবে চিনেন?”
মেয়েটা মলিন হাসল।
”আমি স্বর্ণকেশী।”
”নামটা চেনা চেনা লাগছে।”
সিয়াম ভ্রু কুঁচকাল।
”আরিফ ভালো আছে তো?” স্বর্ণকেশী ফিসফিস করে বলল।
”আমার না খুব ইচ্ছা আরিফের সাথে কথা বলার।”
আরও কিছু বলতে যাবে, হঠাৎ পায়ের শব্দ।
তাস খেলতে থাকা ৩টা ছেলে দৌড়ে উপরে উঠে এলো। আর তাদের সাথে… মহুয়া আর সায়েক আহমেদ।
শিখা আতঙ্কে শাপলাকে শক্ত করে জ ড়ি য়ে ধরল।
মহুয়া হাসতে হাসতে বলল,
”বাহ! শাপলা দেখি শিখাকে খুঁজে পেয়েই গেছে। আরে আমার ছেলে সিয়ামও তো এখানে।”
সিয়াম রাগে কাঁপছে।
”মা! তুমি… বাবা… তোমরা এসব কিভাবে করলে?”
মহুয়া ঠাস করে বলল,
”এই চুপ কর। আমরা টাকার জন্য সব করতে পারি। নিজের পেটের ছেলেকে রাস্তা থেকে স রা তে হলেও পারব।”
বলে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল।
দীপা এই সুযোগে লুকিয়ে পুলিশকে মেসেজ করে দিল।
সায়েক আহমেদ সিরাজের কাছে এসে ঠা স করে একটা থা প্প ড় মা র ল।
”বেঈমান! আমাদের খেয়ে আমাদেরই থাল ফুটো করলি?”
সিয়াম বাবার দিকে তে ড়ে এলো।
”বাবা! তুমি কেন এমন করলে? কেন?”
সায়েক আহমেদ নি’র্ল’জ্জে’র মতো বলল,
”তোর মা বলল না? টাকার জন্য সব করা যায়। আমিও তাই বলি।”
কিছু সময় এরা এভাবে তর্ক করে গেলো
হঠাৎ সায়েক আহমেদ ছেলে তিন জন কে বললেন,”এই ধর ওদের।”
কিন্তু তার আগেই নিচ থেকে পুলিশের সাইরেনের শব্দ।
ধুপধাপ করে পুলিশ উপরে উঠে এলো।
”হাত উপরে করুন। সবাইকে গ্রেফতার করা হলো।”
সায়েক আহমেদ আর মহুয়াকে হাতকড়া পরানো হলো। ওই তিন গুন্ডাকেও।
অফিসার দীপার দিকে তাকিয়ে বললেন,
”আপনাদের কাছে যা প্রমাণ আছে সব থানায় জমা দিবেন।”
সবাইকে নিয়ে পুলিশ চলে গেল।
ঘরটা আবার ফাঁকা।
সিয়াম স্বর্ণকেশীর দিকে তাকাল।
”আপনাকে এখানে কেন আটকে রেখেছিল?”
স্বর্ণকেশী হঠাৎ চিৎকার করে উঠল।
”আরিফকে বলে দিয়ো! আমি ওকে কখনো ঠকাইনি। সবসময় ভালোবেসেছি।”
বলেই দৌড়ে বেরিয়ে গেল।
সবাই বাইরে এসে গাড়ির কাছে দাঁড়াল।
শিখা কাঁপা গলায় বলল,
”এখন কোথায় যাব?”
সিয়াম বলল, “আমাদের বাড়ি। ওখানেই থাকবেন।”
দীপা বলল, “না শিখা আপু ঐশীদের বাড়ি যাবে।”
শিখা অসহায় গলায় বলল, “আমাদের বাড়িটা আছে তো?”
শাপলা কাঁদতে কাঁদতে মাথা নাড়ল।
”না আপু… নেই।”
একটু চুপ থেকে শাপলা আবার জিজ্ঞেস করল,
”আপু… তোর পেটের বাচ্চাটা কার?”
শিখা আকাশের দিকে তাকাল।
”আমি জানি না। কতজন পু রু ষ আমাকে ভো গ ক রে ছে… তাদের মধ্যে হয়তো কারো।”
গলা কেঁপে উঠল।
”এই নোং রা জি নিস টা কে আমি পৃথিবীতে
আ ন তে চাই না।”
শাপলা শক্ত করে শিখার হাত ধরল।
”তা সম্ভব না আপু। অনেক দেরি হয়ে গেছে। আনতেই হবে।”
শিখা চিৎকার করে উঠল।
”না! না! এই নোং। রা স ন্তা ন আমি জ ন্ম দিব না!”
বাতাসে শুধু শিখার আ র্ত নাদ ভেসে বেড়াচ্ছে।
সময় কারো জন্য থেমে থাকে না।
দেখতে দেখতে ৬টা মাস কেটে গেল।
নীলাঞ্জনা, আলো, আরিফ আর কবিতা ওরা অনেক আগেই দেশ ছেড়ে বিদেশে চলে গেছে। ওখানে বসেই এখন ওরা বিজনেস সামলায়।
আর দেশে রয়ে গেছে বিরাজ, সিরাজ, সিয়াম আর নিরব।
ওরা চারজন মিলে এখন সব দায়িত্ব কাঁধে নিয়েছে।
নিরব আর চুমকির বিয়েও হয়ে গেছে ২ মাস হলো। বিয়ের পর দুজন এখন খুব সুখে আছে।
শিখা, দীপা একসাথে ঐশীদের বাড়িতেই থাকে।
শিখার কোল জুড়ে এসেছে একটা ছেলে সন্তান। ছোট্ট ফুটফুটে বাচ্চা। কিন্তু…
কিন্তু শিখা আগের শিখা নেই।
ওর মানসিক অবস্থা একদম ভালো না। প্রায় পাগলের মতো হয়ে গেছে।
ওকে নিয়মিত ডাক্তার দেখানো হচ্ছে।
আর যারা এই সব নোং রা কাজের সাথে জড়িত ছিল…
সায়েক আহমেদ, মহুয়া আর ওদের দলের সবাইকে কোর্ট ওদের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছে।
রোমান্টিক ভাইয়া পর্ব ৬৮ (২)
শাপলা ব্যালকনিতে বসে সিয়ামকে মেসেজ করছে আর মিটমিট করে হাসছে।
”চলেন না কোথাও থেকে ঘুরে আসি।”
সিয়াম মেসেজ করল, “কোথায় যাবি?”
তো খুব সংক্ষেপে সব রহস্য ফাঁস করা হয়েছে।
জানি না কেমন হয়েছে। আমার ইচ্ছা ছিল ধীরে ধীরে সুন্দর করে গুছিয়ে সব রহস্য ফাঁস করবো তবে আপনাদের মন তো আবার মানে না। যাই হোক আর হয় তো তিন চার পর্ব দিয়ে উপন্যাস এর ইতি টানবো
