রোমান্টিক ভাইয়া শেষ পর্ব
মহাসিন
শাপলা সিয়ামকে মেসেজ করলো,
“আমি সুইজারল্যান্ড ঘুরতে যেতে চাই। নিয়ে যেতে পারবেন কি?”
সিয়াম মেসেজ করলো,
“ঠিক আছে, তাই হবে। কবে যেতে চাস বল?”
শাপলা মেসেজ করলো,
“আরে না, সুইজারল্যান্ড যাবো না। এমনি মজা করলাম। আচ্ছা আসল কথা বলি। আমি ভাবছি, আমরা যদি সমুদ্রের পাড়ে ঘুরতে যাই তাহলে কেমন হয়?”
সিয়াম মেসেজ করলো,
“আচ্ছা, বাড়ি এসে তারপর ডিসাইড করি।”
বিকেলের আলোয় ঘরের ভেতরটা যেন বি’ষা’দ’ম’য় হয়ে উঠেছে। শাপলা নিজের রুমে এসে তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে ড্রয়িং রুমে এসে দাঁড়ালো। চুমকি আর কলি সোফায় বসে গল্প করছে। শাপলা হালকা গলায় বলল,
_“আমি একটু বেরোচ্ছি।”
কলি জিজ্ঞাসু চোখে তাকাল।
_“কোথায় যাস?”
_“শিখা আপুর কাছে। একটু দেখে আসি কেমন আছে।”
বলেই শাপলা দরজার দিকে পা বাড়াল। তার বুকের ভেতরটা কেমন ভারী হয়ে আছে।
আধঘণ্টা পর ঐশীদের বাড়ির উঠোনে পা রাখতেই শাপলার বুকটা ছ্যাঁৎ করে উঠল। রান্নাঘর থেকে হালকা ঝালের গন্ধ ভেসে আসছে। বারান্দার চৌকিতে শিখার ছোট্ট ছেলেটা কাঁদছে। দীপা তাকে কোলে নিয়ে দোলাচ্ছে, কিন্তু শিশুটির কান্না থামছে না। শিখা পাশেই বসে আছে, কিন্তু তার চোখ দুটো যেন অনেক দূরে, অন্য কোনো জগতে হারিয়ে গিয়েছে। তার মুখটা ফ্যাকাশে, চুল এলোমেলো, চোখের নিচে কালি।
শাপলা ধীর পায়ে এগিয়ে এসে শিখার সামনে দাঁড়ালো। শিখা মুখ তুলতেই শাপলাকে দেখে চোখ দুটো জলে ভরে গেছে। হঠাৎ সে উঠেছে দাঁড়িয়ে শাপলাকে জ ড়ি য়ে ধর’ল। তার শরীরটা কাঁপছে।
_“শাপলা… তুই তো আমাকে কথা দিয়েছিলি… আমাকে বিরের কাছে নিয়ে যাবি। বল, কবে নিয়ে যাবি? আমি আর একটা মুহূর্তও… এভাবে থাকতে পারছি না রে।”
শিখার গলা ভেঙে গেল। তার
শাপলা কিছু বলতে যাবেই, কিন্তু দীপা তাকে চোখের ইশারায় থামিয়ে দিলো। শাপলা আর চুপ করে থাকতে পারল না। তার গলা কেঁপে উঠল।
_“আর কতদিন মিথ্যে আশা দিয়ে যাবো? আজ সব বলে দিতে চাই।”
শিখা উন্মাদিনীর মতো তার হাত চে’পে ধরল, “তাড়াতাড়ি বল শাপলা… আমার বির কোথায়?”
শাপলার চোখ দিয়ে দু’ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল। সে কাঁপা কাঁপা গলায় বলল,
_ “আর নে ই আপু… বির আর নে ই।”
এক মুহূর্ত নীরবতা। তারপর শিখার চোখ দুটো বিস্ফারিত হয়ে গেল।
_“কী বলছিস তুই?”
তার গলা ফিসফিস করে বেরোল, যেন বিশ্বাস করতে চাইছে না।
_”ক্যা_ন্সা_র.. হয়ে… অনেক আগেই… চ লে গেছে।শেষবার তোকে দেখতে চেয়েছিল। কিন্তু পারেনি।”
_“না… না… নাআআআআআআ!”
শিখার গলা থেকে একটা আ র্ত চিৎকার বেরিয়ে এলো। সে দু’হাতে মাথা চেপে ধরে বসে পড়ল। তার রূদয় যেন ভে ঙে টু’ক’রো টু’ক’রো হয়ে যাচ্ছে।
_“বির আমাকে ছে ড়ে যেতে পারে না! আমি কীভাবে বাঁ চব না রে শাপলা? আমার বুকের ভেতরটা তো খালি হয়ে গেছে… প্রতিটা রাতে তার নাম নিয়ে ঘুমাতাম, প্রতিটা সকালে তার ফেরার আশায় বসে থাকতাম… আর তুই বলছিস সে নে ই?”
শিখার কান্না যেন আকাশ ভেদ করে উঠছে। সে দৌড়ে ঘরের ভেতর চলে গেল। দরজা বন্ধ করে দিল। ভেতর থেকে তার ফোঁপানি, আ র্ত নাদ, আর অসহায় কান্না ভেসে আসছে। শাপলা তার পেছন পেছন এসে দরজায় মাথা ঠেকিয়ে দাঁড়াল। তার নিজের চোখও অঝোরে বয়ে যাচ্ছে পানি তে।
_“আপু… আমি জানি এই ক’ষ্ট কতটা গভীর। কিন্তু তুই একা না… আমরা আছি।”
কিন্তু শাপলা জানত, এই কথাগুলো এখন শিখার কাছে শুধুই ফাঁকা আওয়াজ।
ববারান্দায় দীপা ছোট ছেলেটাকে কোলে নিয়ে বাড়ির বাইরে চলে এসেছে। বাচ্চাটা এখনও কাঁদছে। হঠাৎ সিরাজ এসে দাঁড়াল।
_“আমার কাছে দাও।”
সিরাজ নরম গলায় বলে বাচ্চাটাকে কোলে তুলে নিলো। অদ্ভুতভাবে ছেলেটা কান্না থামে তার বুকে মাথা রাখল।
দীপা অবাক হয়ে তাকালো।
_“এতদিন পর এখানে?”
_“তোমাকে দেখতে ইচ্ছে করছিল। তাই চলে এলাম।”
সিরাজের চোখে এক ধরনের গভীর আবেগ। সে কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
_“দীপা, আমি তোমাকে বিয়ে করতে চাই।”
দীপা মুচকি হাসল।
রাত এখন নয়টা।
ঘরের এক কোণে টেবিল ল্যাম্পের হলুদ আলো। সিয়াম ল্যাপটপ নিয়ে বসে আছে সেই কখন থেকে। চোখ স্ক্রিনে, আঙুল কিবোর্ডে।
আর খাটের ওপর বসে শাপলা। বারবার আড়চোখে তাকাচ্ছে। বিরক্তিতে ভুরু কুঁচকে যাচ্ছে।
“মানুষটা সেই কখন থেকে কাজ করেই যাচ্ছে। একবারও কি আমার দিকে তাকাবে না?”
শেষমেষ আর সহ্য হলো না। শাপলা উঠে এসে ধপ করে সিয়ামের হাত থেকে ল্যাপটপটা ছিনিয়ে নিলো। তারপর বন্ধ করে দিলো।
সিয়াম ভ্রু কুঁচকে তাকালো।
“কি হলো? ল্যাপটপ নিলি কেন?”
শাপলা চোখ রাঙিয়ে বলল,
“তো কি করবো? সেই কখন থেকে ল্যাপটপ নিয়েই পড়ে আছেন।”
সিয়াম কিছু বলল না। শুধু বাঁকা হাসলো। পরের মুহূর্তে এক টা নে শাপলাকে নি জে র বুকের কা ছে টে নে নিলো।
শাপলা হকচকিয়ে গেল। বুকের ধুকপুকানি বেড়ে গেল।
সিয়াম কানের কাছে ফিসফিস করে বলল,
“তা আমার বউ… কোথায় ঘুরতে যেতে চাও তুমি?”
শাপলার রাগ নিমিষেই পানি হয়ে গেল। লজ্জা মিশ্রিত গলায় বলল,
“সমুদ্রে… সমুদ্রের পাড়ে ঘুরতে যেতে চাই।”
“আচ্ছা।” সিয়াম গালে হালকা করে ঠোঁ ট
ছোঁ য়া লো।
“তাহলে তাই হবে। আমরা কালকেই যাবো।”
শাপলা ছটফট করে বলল, “তো এবার আমাকে
ছা ড়ু ন।”
সিয়ামের বাঁকা হাসিটা আরও গাঢ় হলো। শ ক্ত করে আরও কা ছে টে নে বলল,
“ধরেছি কি ছা ড়া র জন্য?”
“তো কি করবেন শুনি?”
সিয়াম শাপলার চুলে মুখ গুঁজে দিয়ে বলল,
“মুখে বলে লাভ কি? ডিরেক্ট ক রে দেখাই?”
“কি?”
“আমার… যা খুশি তাই ক র বো।”
পরের দিন ।
আকাশে নরম নীল, বাতাসে লবণাক্ত গন্ধ। ঢেউগুলো এসে পায়ে লুটোপুটি খাচ্ছে।
শাপলা ওড়না আঁচল শক্ত করে ধরে দাঁড়িয়ে আছে। চোখে বিস্ময়।
“এত সুন্দর! আমি আগে কখনো এত কাছ থেকে সমুদ্র দেখিনি।”
সিয়াম পাশে দাঁড়িয়ে শুধু ওকেই দেখছে।
সিয়াম হাসলো। তারপর শাপলার হাতটা শক্ত করে ধরলো।
“চল। পা ভেজাই।”
নরম বালির ওপর দিয়ে দুজন হাঁটছে। ঢেউ আসছে আর পা ভিজিয়ে দিয়ে চলে যাচ্ছে। শাপলা খিলখিল করে হাসছে। মাঝে মাঝে সিয়ামের গায়ে পানি ছিটিয়ে দিচ্ছে।
সিয়াম একবারে কা ছে টে নে কানের কাছে ফিসফিস করে বলল,
“কাল বলেছিলাম না? আমার ইচ্ছা যা খুশি তাই
ক র বো…”
শাপলা লজ্জা পেয়ে মুখ ঘুরিয়ে নিলো। “এটা পাবলিক প্লেস!”
“তো?” সিয়াম শাপলার কপালে আলতো করে
ঠোঁ ট ছোঁ য়া লো। সমুদ্রের গর্জন ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই।
বেলা বাড়ছে। সূর্যের আলো পানিতে ঝিকমিক করছে।
শাপলা গলাটা কেমন শুকিয়ে গেছে। সে সিয়ামের দিকে তাকিয়ে বলল,
“আমার খুব পানি পিপাসা পেয়েছে।”
“ঠিক আছে। তুই এখানেই দাঁড়া। আমি পানি নিয়ে আসছি।”
এই বলে সিয়াম বালির ওপর দিয়ে দ্রুত পা ফেলে দোকানের দিকে চলে গেল।
শাপলা একা দাঁড়িয়ে আছে। সামনে উত্তাল সমুদ্র। ঢেউয়ের গর্জন। বাতাসে ওড়না উড়ছে।
সময় যেন কাটছেই না। ৫ মিনিট, ১০ মিনিট… সিয়াম এখনো ফিরছে না।
শাপলার বুকের ভেতর কেমন অজানা ভ য় দানা বাঁধছে। সে চারপাশে তাকাচ্ছে।
হঠাৎ দূরে চোখ পড়লো। একটা লোক। মুখে কালো মুখোশ। অনেক দূর থেকে একদৃষ্টিতে ওর দিকেই তাকিয়ে আছে।
শাপলার গা শিউরে উঠলো। লোকটা কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে তারপর ভিড়ের মধ্যে মিশে গেল।
ভয়টা আরও বেড়ে গেল।
আরও কিছুক্ষণ পর।
পরিচিত পায়ের শব্দ। সিয়াম। হাতে দুইটা ঠান্ডা পানির বোতল।
শাপলা আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলো না। দৌড়ে সিয়ামকে শক্ত করে জ ড়ি য়ে ধরলো।
রোমান্টিক ভাইয়া পর্ব ৬৯
“উফ! সেই কখন গেছেন! এত দেরি হলো কেন? আমি খুব ভ’য় পাইছি। আপনি আমাকে ভালোবাসেন না? একটু ভালোবাসলে কি হয়?”
সিয়াম বাঁকা হাসি দিয়ে চিৎকার করে বলতে লাগলো,
” এত ভালোবাসা দেবো তোমায়, যে ভালোবাসা এই পৃথিবীতে নেই।
সমাপ্ত
