রাগে অনুরাগে পর্ব ৩১ (২)
সুহাসিনি ফাতেহা
“আজকে আসুক! এই ইনজেকশন দিয়ে আমি ছাড়া মনের সিন্দুকে আর কয়টা বেডি আছে সব একটা একটা করে বের করবো।”
বিড়বিড় করে তিতলি সম্পূর্ণ রুম জুড়ে পায়চারি শুরু করল। বুকের ভেতর দাউদাউ করে জ্বলছে। ফাঁকাফাঁকা লাগছে মস্তিষ্কের মধ্যে। মাথায় অনেক চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে। কিন্তু কিছুই বুঝতে চাইছে না, জানতে চাই না, ভাবতে চাই না। সে শুধু জানে ফারাজ তাকে কেন কল করলো না সারাদিনে। সে দিলেও ধরে নি। আর যখনই ফেইক আইডি থেকে মেসেজ দিলো সাথে সাথে রিপ্লাই? আবার বলে তাকে থাপ্পড় দিতে আসছে এখন? তিতলির হাতজোড়া নিজের নরম দুগালে চলে গেল। সত্যি কি তাকে মারবে? মারলে সেও মারবে। সে ভয় পাবে না একদম! শেষমেষ আবার বিছানায় এসে বসল। কেঁদেকেটে ভাসিয়ে ফেলেছে। একসময় নাকের পানির জ্বালায় উঠে টিস্যু নিয়ে বসলো৷ আমতাআমতা করে বলল,
“কান্না করেও শান্তি নেই৷”
আচমকা দরজায় টোকা দিলো কেউ। তিতলি নিজের দুঃখে বাঁচেনা। এখন সে রুম থেকে বেরোতে পারবে না। বিছানায় বসে থেকেই তিতলি নাক টেনে বলল,
“আমি ঘুমিয়ে গেছি আম্মু! উঠতে পারবো না।”
আবার দরজা ধাক্কালেন কেউ। শোনা গেল ফরিদা বানুর কন্ঠ,
“দেহি দরজা খোল নাতজামাই আইছে। পরে ঘুম যাইতে পাইরবি।”
তিতলি বসা থেকে দাঁড়িয়ে পড়ল দাদুর কথা শুনে। অভিমানে বুক কেঁপে উঠলো সপ্তদশীর। নাতজামাই আসুক, টাতজামাই আসুক, নাহলে নদীতে ভাসুক! সে দরজা খুলবে না। অচেনা বউয়ের কাছে যাক। আমার কি? দরজার কাছে গিয়েও আবার ফিরে এসেছে। গলা ছেড়ে দিয়ে বলল,
“তো আমি কি করবো? গেস্ট রুমে পাঠিয়ে দাও।”
ফরিদা বানু একবার নাতজামাইর দিকে তাকালেন। পাশে দাঁড়িয়ে আছে। নাতিনের কথা শুনে কি ভাবছে কে জানে। নাতিনকে আবার বললেন,
“এগিন কি কস নাতজামাই গেস্টরুমে থাইকতো যাইবো ক্যান?”
তিতলি বিছানায় বসে পা দুলাতে থাকে। আজকে যেভাবেই হোক ইনজেকশনটা বুক বরাবর পুশ করে দিবে। কিভাবে কি করবে সব বুদ্ধি খাটিয়ে ভাবলো। আবারও একই ভাবে উত্তর দিলো,
“মেহমানরা তো গেস্ট রুমে থাকে দাদু!”
ফারাজ খান দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে আছেন ফরিদা বানুর সাথে। কাল আসলেও উপরে উঠা হয়নি। তাই তিতলির রুম কোনটা সেটায় অবগত নয়। ফারাজের রাগ হচ্ছে তিতলির কথা শুনে। হাতজোড়া মুষ্টিবদ্ধ হয়েছে তার আনমনে। তাও অনেকটা শান্ত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে। তার সুদর্শন গম্ভীর মুখখানা আরো গম্ভীর হয়েছে এবার।
ফরিদা বানু নাতজামাই কে বললেন,
“নাতিনের কথায় কিচ্ছু মনে কইরো না নাতজামাই! নাতিন মনে হইতাছে ঘুমের ঘোরে আবলতাবল বকতেছে।”
ফারাজের চিবুক শক্ত! কত যে ঘুম যাচ্ছে সে খুব ভালো করেই সে জানে। ইচ্ছে করে এসব বলছে। শুধু দরজাটা খোলুক তারপর জন্মের ঘুম পাড়াবে সে। দাদি শাশুড়ির কথা শুনে ভদ্রতা দেখিয়ে গম্ভীরস্বরে বলল,
“কিছু মনে করার নেই।”
তিতলি রুমে বসে বসে শুনল সব। মুখ ভেঙিয়ে নিজেও বলল, কিছু মনে করার নেই! কিছু মনে করবে কেন? সে দরজা না খুললে তো ওনি আরো খুশি। চলে যাবেন। তিতলি এবার উঠে এলো দরজার কাছে। হাতের ইনজেকশন টা পেছনে লুকিয়ে রেখেছে। দরজার ছিটকিনি খুলতে গিয়ে হাত কাঁপছে তার। দরজা খুলে দিয়ে আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকল।
ফরিদা বানু নাতজামাইকে হাসিমুখে বললেন,
“ঢুইকা পড়ো নাতজামাই! আমি যাই তাইলে।”
ফরিদা বানু চলে গেলেন। ফারাজ রুমের ভেতরে ঢুকে পুরো রুমে একবার নজর বুলালো। বিছানার চাদরের অবস্থা বেগাতিক। কোলবালিশ মেঝেতে পড়ে আছে। মনে হচ্ছে এখনই রুমের ভেতর কোনো ছোটখাটো যুদ্ধ হয়েছে। বেয়াদব বউকে দেখছে না কেন? হঠাৎ দরজার আড়ালে তিতলির ফর্সা পা দুটো দেখল। সহসা ধারালো দাঁতের স্পর্শে নিজ নিম্নাংশের ঠোঁটখানা পিষ্ট করল যুবক। দরজাটা সুশব্দে লাগিয়ে দিয়ে নজর বন্দী করল তিতলির দিকে। কাঁদতে কাঁদতে লাল টুকটুকে ভাব ধরেছে সপ্তদশীর সরু নাকের ডগাটা। ঠোঁট ফুলে কলাগাছ! ফুসছে নাক। যেন কেঁদে উঠবে।
অশ্রুসিক্ত নয়নে মেঝেতে তাকিয়ে আছে তিতলি। ফারাজ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে। গায়ে ওড়না নেই। তারউপর একটা গেঞ্জি পরা। মাথার ঘনকালো কেশরাশি গুলো খোঁপা করে বাঁধা। গালের দুপাশে বিক্ষিপ্ত আকারে আছড়ে পড়েছে ছোটবড় কিছু চুল। পুরো পিচ্চি মেয়ে লাগছে তার বউকে। আশ্চর্য! মেয়েটার এহেন রুপ তার বড্ড মনে ধরল। কেমন গভীরদৃষ্টে তাকিয়ে থেকে বিড়বিড় করে আওড়াল,
এই পিচ্চি বউ বড় হবে কবে? ভাবছিলো, রুমে এসে দু গালে দুইটা থাপ্পড় বসিয়ে দিবে। তবে এইমুহূর্তে তার রাগী চেহারায় পরিবর্তন দেখাল। তৎক্ষণাৎ দু কদম এগিয়ে এসে একদম তিতলির সম্মুখে এসে দাঁড়াল। তিতলি কেঁপে উঠল। হাত বাড়িয়ে চোয়ালখানা ধরতে গেলেই তিতলি পেছনে সরে যায়। হাত একটা পেছনে লুকিয়ে রেখেছে। ইনজেকশন দিয়ে সুযোগ বুঝে কাজ করবে। অভিমানে তার কন্ঠে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে,
“কেনো এসেছেন আপনি? আপনাকে কি আমি আসতে বলছি?”
ফারাজের ভ্রুযুগলে সূক্ষ্ম ভাঁজ পড়েছে। তিতলির কথাটা গায়ে না মেখে ফের কাছে যেতে চাইলে তিতলি দরজার দিকে ঘুরে গেল। সরু নাকের পাটাটা সামান্য ফুলিয়ে, মুখ ঝামটি মে’রে বলে বসে,
“খবরদার ছোঁবেন না আমায়!”
অলক্ষ্যে ঠোঁট পিষে হাসল ফারাজ। বউকে জ্বালানোর জন্য তার অশান্ত মনটা খুবই অস্থির হয়ে উঠেছে। এমন সুযোগ হাত ছাড়া করবার মানুষ কি আর সে? তক্ষুনি তিতলির একদম পেছনে এসে দাঁড়লো। ফর্সা তুলতুলে ঘাড় উন্মুক্ত। লম্বা করে নিশ্বাস ফেলল সেখানে। নারীদেহের ঘায়েল করা স্মেল নাকে এসে ঠেকল। তার ইচ্ছে হলো বাড়াবাড়ি করে অনেক কিছু করে ফেলতে। সেদিনের কামড়ের জায়গা টা এখনো লাল দাগ হয়ে আছে। সেখানে নজর রেখেই হিসহিসিয়ে শুধালো,
“তাহলে অন্য কাউকে ছুঁতে হবে মনে হচ্ছে?”
তিতলি ঘুরে তাকাল। তার চোখজোড়া লাল হয়ে গিয়েছে। হিসফিস করছে মুখশ্রী। অন্য মেয়েকে ছুঁতে হবে তো? এখনও তো অচেনা বউকে মেসেজ দিয়ে তার কাছে এসেছে। যদিও মানুষটা সে নিজেই কিন্তু এটা তার কিশোরী মন মানতে নারাজ।
কন্ঠে রাগ তেজ সব মিশিয়ে বলল,
“তো যান! আপনার অচেনা বউকে কোলে নিয়ে বসে থাকুন! আমার কি?”
ফারাজের ভ্রজোড়া কুঁচকে গেলো কৌতুকে। বিদ্বিষ্ট চাউনী গভীরতা পেলো। তিতলিকে ঘুরিয়ে এনে নিজের মুখোমুখি দাঁড় করাল। দরজার সাথে মিশে গেল তিতলি। ফারাজ দরজার দুপাশে বলিষ্ঠ দুহাত রেখে সামান্য ঝুঁকে এসে তিতলির মুখের দিকে তাকালো। কিছুই জানে না এমন ভাব-ভঙ্গিমা ধরে রেখে বলল,
“অচেনা বউটা কে আবার? নাম বলো?”
তিতলি নিশ্চুপ! কিছু বলছে না। মূলত কোনো কথায় খুঁজে পাচ্ছে না এবার। অচেনা বউ তো সে নিজেই। তাহলে কি সত্যিটা বলে দিবে? না কিছুতেই বলবে না সে। আরো পরিক্ষা করবে। এবারও ফারাজের চোখে চোখ রাখল না। নিচের দিকে তাকিয়ে থেকে নাক টেনে বলল,
“আপনার অচেনা বউ কে সেটা আমি কীভাবে জানবো? যার সাথে কথা বলার জন্য আমার ফোন ধরেন নি তার কাছে যান।”
জিভের ডগায় গাল ঠেললো ফারাজ। ঘাড়টা সামান্য কাত করে, দৃষ্টি করল তীক্ষ্ণ। ভ্রু নাচিয়ে শুধাল,
“কার কাছে যাবো হুমম ? আমার বউ কে? ওকে বউ তুমি যেহেতু বলছো যেতে তাহলে যাচ্ছি।”
বলে ফারাজ চলে যাওয়ার অভিনয় করলো। এবার তিতলি রাগে ফেটে পড়ে। হিংস্র বাঘিনীর ন্যায় তক্ষুনি ফারাজের সামনে এসে দাঁড়ালো। পাহাড়সম বলিষ্ঠ পুরুষের সামনে সে বড্ড ছোট। যুবকের প্রশস্ত বুকে মাথা এসে ঠেকেছে তার। নাক মুখ সব ফুলিয়ে ডানহাতে ফারাজের শার্টের কলার টেনে ধরল। কেঁদে দিবে এমন ভাব। এত্ত বড় সাহস তাকে রেখে চলে যাবে? বা হাতে লুকিয়ে রাখা ইনজেকশন টা সোজা ফারাজের বুক বরাবর ধরল।
ওদিকে ফারাজ রেগে গেলো শার্টের কলার ধরায়। যেখানে সবাই তার কথায় উঠে বসে। এই বেয়াদব বউয়ের কত বড় স্পর্ধা তার কলার টেনে ধরে আজকে তো সে ছাড়বে না এই বউকে। কাঁচা চিবিয়ে খেয়ে ফেলবে না? রাগ কন্ট্রোলে আনতে তৎক্ষণাৎ ধারালো নেত্রদ্বয় বন্ধ করে হাতজোড়া মুষ্টিবদ্ধ করে নিলো। ফের খুলতেই তার রাগী চোখদুটো অস্বাভাবিক ভাবে শান্ত হয়ে এলো। তিতলি তার বুকে ইনজেকশন ধরে রেখেছে। হাসবে নাকি রাগবে ঠিক বুঝতে পারছে না সে। তার পাতলা ঠোঁট জোড়া কাঁপছে ধমক দেওয়ার জন্য। গলায় ধমক আটকে রেখে শান্ত ভাবে বলল,
“কলার থেকে হাত নামাও। আমাকে রাগিয়ো না।”
তিতলি কলার আরো জোরে চেপে ধরল এবার। ফুপিয়ে কেঁদে উঠল সে। কান্নার তোড়ে শরীর কাঁপছে। ইনজেকশন মেরে দিবে এমন ভাব নিয়ে বলল,
“কার..কার কাছে যাবেন বলছেন? আবার বলেন?
“কারো কাছে যাচ্ছি না আমি।”
তিতলি সে-কথা শুনেও শুনলো না। ইনজেকশনটা এবার সত্যি সত্যি মেরেই দিবে। না মারলেই যেন নয়। বুক ফুলিয়ে বলল,
“মুখের কথা বিশ্বাস হয় না। আমি ছাড়া আপনার মনের সিন্দুকে আর কয়জন বেডি আছে দেখি তো।”
তিতলি কথা শুনে ফারাজের ভ্রুজোড়া এবার মাত্রাতিরিক্ত কুঁচকে গিয়েছে। এই বউকে কি করতে মন চাই? মনের সিন্দুক? শুনেই তার গম্ভীর মুখে ভীষণ হাসি পেলো। সহসা একঝটকায় তিতলির হাত থেকে ইনজেকশনটা কেড়ে নিলো। তিতলি অন্যমনস্ক ছিলো বিধায় হাত থেকে কেড়ে নিতে ফারাজের কোনো অসুবিধা হয়নি। ইনজেকশনটা আঙুলে ঘুরাতে ঘুরাতে বাঁকা হাসির রেশ ধরে বলল,
“মনের সিন্দুক আবার কি? মনের সিন্দুক কাকে বলে হুমম?”
তিতলিও দমে গেলো না। এবার ফারাজকে বলল,
“মাথাটা একটু নিচে নামান কানে কানে বুঝিয়ে দিচ্ছি। মনের সিন্দুক!”
“মুখে বলো।”
“না মুখে বলা যায় না।”
রাগে অনুরাগে পর্ব ৩১
ফারাজ ভ্রু গুছালো। বউ যেহেতু বলছে দেখি কি বুঝিয়ে দেয়। মনের সিন্দুকে আসলেই কে আছে সেটা সে পরে প্যাক্টিক্যালি বুঝাবে! এখন মাথা নামিয়ে ঝুঁকে এলো তিতলির দিকে। তিতলি পা উঁচু করলো অনেকটা। কানের কাছে মুখ নিয়ে যাবে এমন ভাব-ভঙ্গিমা ধরে রেখেই আচমকা ফারাজের পুরুষালি নাকে কামড় বসিয়ে দিলো। বড্ড জোরে কামড় দিয়েছে সে। নাকের দুপাশে তার ছোট ছোট ইদুরের দাঁতের দাগ বসেছে।
