রাগে অনুরাগে পর্ব ৩১
সুহাসিনি ফাতেহা
ফারাজ শ্বশুরের সাথে ড্রয়িংরুমে এসে সবার সাথে নতুন জামাইর মতো কথা বলে এখন সোফায় বসেছেন। ডাইনিং টেবিলে হড়েক রকমের নাস্তা- পানি মিষ্টি, ফলমূল দিয়ে ভরা।
ফরিদা বানু নামজামাইকে বললেন,
“নাতজামাই আইয়ো আমরা একলগে গপ্পো করি।”
ফারাজ মোবাইলের স্ক্রিন থেকে চোখ তুলে পাশ ফিরে তাকালো। বৃদ্ধমহিলাটা তার সাথে গল্পও করবে? যেমন নাতিন তেমন দাদি। সেটা সে বিয়ের দিন থেকেই টের পেয়েছে। কিছু না বললে খারাপ দেখায়। তাই সে সম্মতি জানাতেই ফরিদা বানু আস্তে করে করে বললেন,
“মোর নাতিন কেমন নাতজামাই?”
ফারাজের শৈলপ্রান্ত বেঁকে গেল এমন কথায়। গম্ভীর স্বরে বলল,
“আলহামদুলিল্লাহ আপনার নাতিন লাখে একটা।”
ফরিদা বানু খুশি হলেন। মনে করিয়ে দিয়ে ফের বললেন,
“আগে কইছিলাম না আমার নাতিন লাখে একটা দেইখলা কীভাবে মিল্লা গেল? তোমার দাদাশ্বশুর ও দেইখতে তোমার লাহন ছিলো। মাস্টারি কইরতো।”
তাদের কথার মাঝেই তুষার আসলো তখন। অয়নকে সাথে করে এনেছে। রাতে এখানে থাকবে অয়ন। ফারাজ ভাইকে দেখেই তুষার ও অয়ন দুজনেই সালাম দিলো,
“আসসালামু আলাইকুম! কেমন আছেন ফারাজ ভাই?”
“আলহামদুলিল্লাহ ভালো তুমি কেমন আছো?”
তুষার ভদ্রতায় গম্ভীর সুরে বলল,
” এইতো ভালো!”
অয়ন পাশ ফিসফিস করে বলল,
“আরে শালা এখনো ফারাজ ভাই ভাই করে ডাকছিস? তোর ছোট বোনের জামাই! নাম ধরে ডাক!”
তুষার অয়নকে উত্তরে বললো,
“একটা বললেই তো হয়ছে! ফারাজ ভাই বয়সে আমার বড় হয়, শালা! বয়স বা ছোট বোনের জামাই সেটা মেটার করে না সম্মান সবচেয়ে বেশি মেটার করে। ছোট বড় বলে কথা নেই।
অয়ন তুষারের দিকে তাকিয়ে বলল,
“বুঝলাম।”
তুষার ফারাজ ভাইকে বলল,
“আপনি বসেন ফারাজ ভাই! আমি উপর থেকে চেঞ্জ হয়ে আসি।”
তুষার চলে যেতেই তৌসিফ শেখ মেয়ের জামাইর পাশে বসে বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলতে শুর করলেন।
তিতলি শাড়ি চেঞ্জ করে এমব্রয়ডারি গোল জামা পরে গলায় ওড়না জড়িয়েছে। ওসব শাড়ি পরে থাকা যায় না। সে তো পরতেই পারে না। কেউ পরিয়ে দিলেও একঘন্টা পর কিভাবে যেন সব কুচি খুলে যায়।
রুম থেকে বেরিয়ে ভাইয়ের রুম দিয়ে যেতে দরজা খোলা দেখে ভেতরে উঁকি দিয়ে দেখলো রুমে অয়ন বসে আছে।
অয়ন তিতলিকে লক্ষ্য করে চোখ নামিয়ে নেয়। না দেখার মতো পা দুলাতে থাকে।
তিতলি ভেতরে ঢুকে অয়নকে দ বলল,
“অয়ন ভাইয়া তুমি কখন এসেছো?”
অয়ন আড়চোখে তিতলির দিকে তাকায়।
মুচকি হেসে বলল,
“এখন আসলাম। তো কেমন আছেন ভাবি?”
তিতলি লজ্জায় মুখ লাল করে নিলো ভাকি ডাক শুনে। নিজেকে ফারাজের বউ বউ লাগে। এমনিতে তো বউ। তবে ভাবি ডাক শুনলে কেমন যেন লাগে তার। পরক্ষণেই বলল,
“ভালো আছি ভাইয়া। তুষার ভাইয়া কই?”
“ওয়াশরুমে গোসল করছে। আসার পথে প্রেমিকার সাথে কথা বলতে বলতে ময়লার ডাস্টবিনে পরে গেছে।”
তিতলি অয়নের কথা শুনে চেঁচিয়ে বলল,
“কিহহহ! কার সাথে প্রেম করছে?”
“প্রেম করছে না শুধু! বিয়ে করার জন্য উঠে পড়ে লেগেছে।”
তিতলির জানামতে তার ভাইয়ের কারো সাথে কখনো প্রেমের সম্পর্ক ছিলো না। এখন এসব শুনে অবিশ্বাস নিয়ে বলল,
“সত্যি? কার সাথে একটু বলেন না অয়ন ভাইয়া?”
পেছন থেকে তুষার বেরিয়ে এলো। ওয়াশরুম থেকে প্যান্ট গেঞ্জি পরে বের হয়ছে। দতোয়ালে দিয়ে মাথার ভেজা চুল মুছতে মুছতে পেছন থেকে তিতলির মাথায় টোকা দিয়ে বলল,
“তুই জেনে কি করবি?”
তিতলি পেছনে ফিরে ভাইকে বলল,
“বাহ রে আমার ভাইয়া কার প্রেমে পড়ে ডাস্টবিনে পরেছে সেটা আমি জানতে চাইবো না? দেখি সে মেয়ের বাড়ি চলো দুইটা কথা শুনিয়ে আসি।”
অয়ন চোখ বড় বড় করে ফেলল। তবে তুষারের মুখে বিন্দুমাত্র পরিবর্তন দেখা গেলে না। সে আগের মতোই বলল,
“বেশি বুড়ি হয়ে গেছিস তিতলি।”
তিতলি নাক ফুলিয়ে বলল,
“আমাকে বুড়ি না? তুমি ১০০ বছরের বুড়া ভাইয়া।
আমি এখন নিচে গিয়ে আব্বুকে নালিশ দিবো তুমি প্রেম করো। বলে তিতলি বেরিয়ে এলো।
এর ভেতরে আরো একদিন কেটে গেছে। তিতলি এখনো বাবার বাড়িতেই। ফারাজ প্রথম রাত থাকতে পারেনি। আফজাল খানের প্রেসার বেড়েছিল সেদিন রাতে। তাকে নিয়ে হাসপাতলে যেতে হয়েছে অনেক রাতে। তাই আসতে পারেনি। কিন্তু আজকে আসার কথা। এখনো আসছে না কেন?
এখন রাত নয়টা। তিতলি লেডিস গেঞ্জি পরে বিছানায় কোলবালিশ জড়িয়ে শুয়ে শুয়ে ফেসবুক স্ক্রল করছে। এটা তার আগের ফোন। বিয়ের পর ফারাজ ফোন একটা কিনে দিলেও সেটায় ফেসবুক একাউন্ট খুলে নি।
ফারাজকে দুবার কল করেছে একবার রিসিভ করেনি। ফোন বিজি দেখাচ্ছে। মেসেজও সিন করে রিপ্লাই করিনি। কেন ফোন রিসিভ করেনি মেসেজ দেয় নি। তাই তার কিশোরী মনে প্রচন্ড অভিমান জমেছে। চোখ ভিজে এসেছে। তখন নিধির কল এলো।
তিতলি ফোন রিসিভ করে কানে ধরলো,
ওপাশ থেকে নিধি বলল,
“কি খবর বেইবি?”
তিতলি: “ভালো নাই।”
নিধি: “দুলাভাই..থু্ক্কু ফারাজ স্যার কোথায়?”
তিতলি: “আমি কি জানি!”
“তুই জানবি না আর কে জানবে? কতটুকু ঘায়েল করতে পেরেছিস? পুরুষ মানুষ কিন্তু চম্বকরের মতো। দুলাভাই যদি তোকে এখনো কিছু না করে তাহলে সিস্টেমে সমস্যা আছে।”
“কল রাখ নিধি! আজকে আমার মন ভালো নেই।”
বলে তিতলি ফোন কেটে দিলো। তিতলি ফেসবুকে আবার ঢুকে ফারাজের আইডিতে ঢুকলো। এক্টিভ দেখাচ্ছে। হোয়াসঅ্যাপ এ তার কল রিসিভ করছে না। তিতলির হঠাৎ মনে পড়ল ফেইক আইডির কথা। কিছু একটা ভেবে ফেইক আইডি লগইন করলো। ভাল্লুককে মেসেজ দিবে। তাকে তো চিনে না? একটু পরিক্ষা করে দেখা যাক। অনেক ভেবেচিন্তে লিখলো,
“শুনলাম আপনি বিয়ে করে ফেলেছেন? হাউ ডেয়ার ইউ? আমার ফিউচার আলু-পটলের বাপ হয়ে অন্য একটা মেয়েকে বিয়ে করলেন? থাক ব্যাপার নাহ! আপনার বিবাহিত জীবন কেমন চলছে শুনি? বউ কি রোজ ঝাড়ি দেয়? মেয়ে আমার মতো কিউট তো?”
পাশে দুইটা দুঃখের ইমোজি দিয়ে সেন্ড করে দিলো।
ফারাজ খান শ্বশুর বাড়ির গেইটে নিজের বাইক থামিয়ে আফজাল খানের সাথে কি নিয়ে যেন কথা বলে ফোন রাখতেই হঠাৎ নোটিফিকেশনে বেজে উঠছে দেখে ভ্রু কুঁচকে এক নজরে পুরো মেসেজ পড়লো। সহসা যুবক ঠোঁটের কোণ বাঁকিয়ে ক্রুর হাসল। ভেতরে যেতে যেতে ব্যস্ত হাতে টাইপ করে লিখলো,
“আলহামদুলিল্লাহ! বিবাহিত জীবনে আপনার কার্বন কপি একটা বেয়াদব বউ পেয়েছি। এখন তার কাছেই যাচ্ছি দুই গালে দুইটা থাপ্পড় দিতে। পরে কথা হবে অচেনা বউ!”
রাগে অনুরাগে পর্ব ৩০
তিতলি মোবাইল নিয়েই বসে ছিলো। ভেবেছিলো কোনো মেসেজ আসবে না। কিন্তু এখন টুং করে মেসেজের শব্দ হয়ে সে দেখলো ফারাজের মেসেজ। তিতলি চোখ পিটপিট করল বিস্ময়ে। নাক টানল। কোটর সব ভরে উঠেছে। অভিমান হলো তার। অনুরাগের পাহাড় এত উঁচু হলো যে সব ছেড়ে ছুড়ে বেদুইন হতে মন চাইল। তার কল রিসিভ করে না। মেসেজ সিন করে রিপ্লাই দেই না। এখন ফেইক আইডি থেকে মেসেজ দিতেই সাথেসাথে রিপ্লাই দিলো। না জানি আর কত মেয়ের সাথে কথা বলে। আবার অন্য মেয়ের কাছে বলে সে বেয়াদব। বিছানা থেকে নেমে ড্রয়ার থেকে ইনজেকশন নিয়ে বসে থাকলো। মনে মনেনে বিড়বিড় করে বলল,
“আজকে আসুক! এই ইনজেকশন দিয়ে আমি ছাড়া মনের সিন্দুকে আর কয়টা বেডি আছে সব একটা একটা করে বের করবো।”
