প্রণয়ের নব্য সূচনা পর্ব ১
insia isha chowdhury
নিজের বিয়ের দিন। কবুল বলার পর আয়নায় হঠাৎ নিজের বরকে দেখেই মুহূর্তের মধ্যে জ্ঞান হারিয়ে ফেলল সূচনা। ঘটনাটা এতটাই আকস্মিক ছিল যে উপস্থিত সবাই হতভম্ব হয়ে গেল। চারদিকে ছোটাছুটি পড়ে গেল, দ্রুত সূচনাকে ঘরে নিয়ে যাওয়া হলো।
এদিকে বউয়ের বড় ভাই হৃদয় শিকদার উদ্বিগ্ন মুখে নিজের স্ত্রী তামান্নার দিকে তাকিয়ে বলল,
“হঠাৎ করে সূচনার কী হলো?”
তামান্নাও অবাক। কপালে ভাঁজ ফেলে ধীর স্বরে বলল,
“আমি নিজেও কিছু বুঝতে পারছি না। সূচনা তো নিজের বিয়ে নিয়ে ভীষণ খুশি ছিল। সারাদিন শুধু বিয়ে বিয়ে করেই পাগল হয়ে ছিল। এত উত্তেজিত ছিল যে ঠিকমতো খাবার পর্যন্ত খায়নি।”
কথা শেষ করেই হালকা বিরক্তির সুরে হৃদয় বলল,
“এই মেয়েটাকে আর কী বলব! কোনো কিছুরই ঠিকঠাক খেয়াল থাকে না। সব সময় শুধু চঞ্চলপনা আর দুষ্টুমি নিয়ে মেতে থাকে।”
এদিকে নিজের বউ, অর্থাৎ সূচনার অবস্থা দেখে প্রণয় নিজেও ভীষণ অবাক হয়ে গেছে। যেন বিস্ময়ের শেষ সীমায় পৌঁছে গেছে সে। ঠিক তখনই পাশে দাঁড়ানো তার বন্ধু রাজা মজা করে বলে উঠল,
“আরে শা’লা! ভাবি তোকে দেখেই অজ্ঞান হয়ে গেল বন্ধু। তোর রূপের ঝলক সহ্য করতে পারেনি!
প্রণয় সঙ্গে সঙ্গে চোখ পাকিয়ে রাজার দিকে তাকাল। কিন্তু কিছু বলল না। বরং তার মনে পড়ে গেল মায়ের কথা। কয়েকদিন আগেই শায়লা খাতুন তাকে বলেছিলেন,
“প্রণয়, আমি তোর জন্য একদম সেরা মেয়েটাকেই পছন্দ করেছি। তুই যেমন মেয়ে চাস, ঠিক তেমনই।”
আর সেই “সেরা মেয়ে” হলো সূচনা! প্রণয়ের ক্লাসের সবচেয়ে দুষ্টু, চঞ্চল আর ফাঁকিবাজ ছাত্রী হলো সূচনা। পড়াশোনার প্রতি যার বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই। ক্লাস ফাঁকি দেওয়া, কলেজ বাংক করা, হোমওয়ার্ক না করা। এসব তার নিত্যদিনের কাজ। তার ওপর সারাক্ষণ দুষ্টুমি আর ফাজলামো তো আছেই।
প্রণয় মনে মনে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
“মা আমার জন্য এই মেয়েকে পছন্দ করল?”
হঠাৎই তার মনে পড়ে গেল ঠিক একদিন আগের ঘটনা।
একদিন আগে–
কলেজে তখন ক্লাস টেস্ট পরীক্ষা চলছিল। প্রণয় নিজের অফিস রুমে বসে কিছু কাগজপত্র দেখছিল। এমন সময় দরজাটা হালকা ফাঁক করে মাথা ঢুকিয়ে সূচনা মিষ্টি হেসে বলল,
’স্যার, আসসালামু আলাইকুম। মে আই কাম ইন?”
প্রণয় ভ্রু কুঁচকে তাকাল। কারণ মেয়েটা ইতোমধ্যেই রুমের ভেতরে ঢুকে পড়েছে, অথচ এখন অনুমতি চাইছে!
প্রণয় গম্ভীর গলায় বলল,
“ইয়েস, কাম ইন।”
সূচনা আরো ভেতরে এসে দাঁড়িয়ে মিষ্টি হেসে বলল,
“থ্যাঙ্ক ইউ স্যার। আসলে একটা রিকোয়েস্ট ছিল। আপনি কি খুব ব্যস্ত ছিলেন? গুরুত্বপূর্ণ কারো সঙ্গে কথা বলছিলেন নাকি?”
প্রণয় বিরক্ত চোখে তাকিয়ে বলল,
“এসব জেনে তোমার কী কাজ? আর এটা তো নতুন কিছু না। তুমি যখনই আসো, কোনো না কোনো নতুন রিকোয়েস্ট নিয়েই আসো। নিশ্চয়ই এবারও বলতে এসেছো তুমি এক্সাম দিতে পারবে না। এম আই রাইট?”
সূচনার ফর্সা মুখটা সঙ্গে সঙ্গে কাঁচুমাচু হয়ে গেল।আর বলল,
“জি স্যার… আসলে সোমবারের যে ক্লাস টেস্টটা আছে, আমি সেটাতে জয়েন করতে পারব না।”
প্রণয় হাতের ফাইলটা টেবিলের উপর রেখে জিজ্ঞাসা করল,
“কারণ?”
“স্যার, আমার দাদিমা খুব অসুস্থ। আমি ওনার সঙ্গে দেখা করতে যাব। না জানি কখন কী হয়ে যায়!”
কথাটা বলতেই সূচনার চোখ-মুখ কেমন আবেগী হয়ে উঠল। তারপর হঠাৎ করেই কাঁদো কাঁদো সুরে বলল,
“প্লিজ স্যার, আমার রিকোয়েস্টটা একসেপ্ট করে নিন। আমি আপনার জন্য আর আপনার গার্লফ্রেন্ডের জন্য অনেক দোয়া করব, যাতে আপনি খুব তাড়াতাড়ি আপনার গার্লফ্রেন্ডকে বিয়ে করতে পারেন।”
কথাটা শুনেই প্রণয়ের মেজাজ মুহূর্তে বিগড়ে গেল।
এই মেয়ে তার ব্যক্তিগত বিষয় নিয়েও কথা বলতে শুরু করেছে!
রাগ চেপে সে কঠিন গলায় বলে উঠল,
“আবার উল্টাপাল্টা কথা বলছো তুমি! তোমার সাহস কত বড় হলে তুমি আমার পার্সোনাল বিষয় নিয়ে কথা বলো?”
সূচনা নিষ্পাপ মুখে বলল,
“স্যার, আমি তো আপনার ভালোর জন্যই বলছিলাম।”
প্রণয় এবার ধমক দিয়ে উঠল,
“শাট আপ অ্যান্ড গেট আউট! আর শুনে রাখো, তুমি ক্লাস টেস্ট দাও বা না দাও, আমি তোমাকে মেইন এক্সামে কোনো মার্কস দেব না। গেট আউট!
সূচনা প্রনয়ের এর ধমক শুনে কেঁপে উঠল।
হঠাৎ আচমকাই এক ঝটকায় বিছানা থেকে উঠে বসল সূচনা। মাথাটা ভীষণ ঘুরছে, চোখের সামনে সবকিছু কেমন ঝাপসা লাগছে। কপালে হাত রেখে কয়েক সেকেন্ড চোখ বন্ধ করে রইল সে। তারপর ধীরে ধীরে চোখ মেলে চারপাশে তাকাতেই বিস্ময়ে তার নিঃশ্বাস আটকে গেল।
চারদিকে শুধু ফুল আর ফুল। পুরো ঘরজুড়ে গোলাপ আর রজনীগন্ধার মিষ্টি সুবাস। বিছানাটাও ফুল দিয়ে সাজানো। মুহূর্তেই সূচনার মনে হলো, সে হয়তো কোনো অদ্ভুত স্বপ্ন দেখছে।
বিড়বিড় করে সূচনা বলল, “এটা কোথায় আমি…?”
পরক্ষণেই মাথায় এলো গতকালের ঘটনা। প্রণয় স্যারের অফিসে যাওয়া, তারপর ওভাবে অপমানিত হয়ে রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বেরিয়ে আসা।সবকিছু স্পষ্ট মনে পড়ে গেল তার।
সেদিন অফিস রুম থেকে ঝড়ের বেগে বেরিয়ে আসতেই পেছন থেকে তার বান্ধবী প্রীতি ডেকে উঠেছিল,
“কিরে সূচনা! এভাবে কোথায় যাচ্ছিস?
রাগে গজগজ করতে করতে সূচনা বলেছিল,
“কোথাও যাচ্ছি না! আমার মাথায় এখন আগুন জ্বলছে, বুঝলি? ওই প্রণয়ের বাচ্চা আবার আমাকে ধমক দিয়েছে! আমার বাপের জন্মে আমি এমন হিটলার স্যার দেখিনি!”
প্রীতি হেসে সূচনা কে শান্ত করার চেষ্টা করেছিল,
“আচ্ছা ঠিক আছে, আগে একটু শান্ত হ।”
“শান্ত হতে পারছি না! যতক্ষণ না কোল্ড কফি খেতে পারছি, আমার মাথা ঠান্ডা হবে না।”
চল তাহলে সামনের ক্যাফেতে যাই। দু’জনে ক্যাফেতে গিয়ে একটি টেবিলে বসতেই সূচনা দু’গ্লাস কোল্ড কফির অর্ডার দিল। প্রীতি এবার কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করল,
“এবার বল, কী হয়েছে?”
সূচনা বিরক্ত মুখে বলেছিল,
“কী আর হবে! আমি তো শুধু বলেছিলাম, “স্যার, সোমবার ক্লাস টেস্টে অংশ নিতে পারব না।”
উনার অফিসে ঢোকার আগে দেখি কারও সাথে ফোনে কথা বলছিলেন। তো আমি মজা করে বললাম, “স্যার, আপনার আর আপনার গার্লফ্রেন্ডের জন্য আমি দোয়া করব, প্লিজ আমার রিকোয়েস্টটা একসেপ্ট করুন।” ব্যাস! উনি সঙ্গে সঙ্গে রেগে গিয়ে আমাকে অফিস থেকে বের করে দিলেন! আমি আর জীবনে উনার ক্লাসে যাব না!
প্রীতি এবার একটু সিরিয়াস গলায় বলেছিল,
“তুই রাগ করেছিস ঠিক আছে, তাই বলে উনার ক্লাসেই যাবি না? এটা কোন কথা হলো! সামনে তো এক্সাম!
সূচনা তখন একটু হেসে কফিতে চুমুক দিয়ে বলেছিল,
“শোন, আর একদিন পর আমার জীবনের সবচেয়ে বড় এক্সাম।”
“মানে?”
“মানে আর একদিন পর আমার বিয়ে। বলতে পারিস, আমি বি.এ পাস করে ফেলব!”
প্রীতি অবাক হয়ে বলেছিল,
“কী বলিস! তোর বিয়ে? আমাকে কিছু বলিসনি!”
“বলব বলব করেও বলা হয়নি দাঁড়া।”
কথাটা বলেই ব্যাগ থেকে বিয়ের কার্ড বের করে প্রীতির হাতে দিয়েছিল সূচনা।
কার্ডটা হাতে নিয়ে প্রীতি হেসে বলেছিল,
“কংগ্র্যাচুলেশন, বান্ধবী!”
“থ্যাংক ইউ, বান্ধবী।”
স্মৃতিগুলো ভাবতে ভাবতেই হঠাৎ সূচনার চোখ গিয়ে পড়ল দেয়ালে টাঙানো বড় এক ছবির দিকে। ছবিটা দেখে সে জমে গেল। দ্য গ্রেট প্রণয় মির্জা।
কালো স্যুটে মোড়া গম্ভীর ব্যক্তিত্ব। শ্যামবর্ণ মুখে তীক্ষ্ণ চোয়াল, খাড়া নাক, সুন্দর করে ব্রাশ করা চুল। সব মিলিয়ে যেন একেবারে মিস্টার পারফেক্ট।
সূচনার বুক ধকধক করে উঠল।
“না… এটা হতে পারে না।”
সূচনা এখনও বিশ্বাস করতে পারছে না। মনে হচ্ছে ও এখনো জেগে জেগেই স্বপ্ন দেখছে। নিজের সন্দেহ দূর করতে আচমকাই হাত তুলে নিজেকেই জোরে একটা চিমটি কাটল।
“আউচ!”
ব্যথায় চিৎকার করে উঠতেই ঠিক সেই মুহূর্তে ঘরের দরজা খুলে গেল। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে প্রণয় মির্জা। তাকে দেখেই সূচনার চোখ আরও বড় হয়ে গেল। আতঙ্কে এক পা এগোতেই হঠাৎ শাড়ির সাথে পা জড়িয়ে গেল তার। মুহূর্তের মধ্যে শাড়ির কুচিগুলো এলোমেলো হয়ে খুলে যেতে লাগল।
তাড়াহুড়ো করে দু’হাতে কুচিগুলো আঁকড়ে ধরল সূচনা। লজ্জায় চিৎকার করল, আহহ্!
প্রণয় স্থির দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে রইল। প্রণয় হতভম্ব! আর বেচারি সূচনা? লজ্জা, ভয় আর অস্বস্তিতে আবারও চোখ উল্টে জ্ঞান হারিয়ে ফেলল। ঠিক সেই মুহূর্তে প্রণয় দ্রুত এগিয়ে এসে দু’হাতে তাকে আগলে নিল।
