না চাইলেও তুমি শুধু আমারই পর্ব ৪১
মাইশা জান্নাত নূরা
নির্ঝর নিজের শারিরীক ব্যথাগুলোকে এইমূহূর্তে এতো গুরুত্ব না দিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে বেলকনির আধভিরানো দরজাটা খুলে রুমের ভিতরে প্রবেশ করলো। হঠাৎ ওভাবে কিছু পড়ার শব্দ হওয়ায় অনু যখন উঠে দাঁড়িয়েছে কে এসেছে দেখার উদ্দেশ্যে তখুনি নির্ঝরকে ও নিজের চোখের সামনে স্বশরীরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে অত্যন্ত অবাক হলো। নির্ঝরের চোখ অনুর উপরে পড়তেই ওর ফুলো ফুলো চোখদু’টো, এলোমেলো চুলগুলো ও চোখে-মুখে লেগে থাকা আতঙ্কের ছাপ ফুটে থাকতে দেখে নির্ঝরের বুকের ভিতরটা অজানা ব্য*থায় মোঁ*চড় দিয়ে উঠলো যেনো। অনু ওর অবিশ্বাস্য চোখ ও কাপান্বিত ঠোঁটের ভাঁজ থেকে বের করলো কয়েকটি শব্দ……
—”নি-নির্ঝর! আ-আপনি? আপনি সত্যিই এসেছেন?”
নির্ঝর স্থির হয়ে তাকিয়ে আছে অনুর দিকে। মেয়েটার এমন ভাঙাচোরা অবস্থা ওর সহ্য হচ্ছে না কোনোভাবেই। নির্ঝর কিছু বলতে নিবে তার পূর্বেই অনু ওর নিজের সমস্ত সংযম হারিয়ে ফেলে সোজা দৌড়া এসে জড়িয়ে ধরলো নির্ঝরকে। অতঃপর বললো….
—”আপনি এসেছেন! আপনি সত্যি এসেছেন! ম*রতে নিয়েছিলাম আমি জানেন! যদি আপনি সত্যিই এসে না থাকেন তবে কি ম*রার আগে আপনাকে সামনে থেকে দেখা, একটু ছোঁয়া এসব আমার মি*থ্যে ভ্রম! বলুন না নির্ঝর, আপনি এসেছেন তো সত্যিই? এসেছেন?”
বলতে বলতেই অনু হু হু করে কেঁদে উঠলো। নির্ঝর পুরোপুরি হতভম্ব হয়ে গিয়েছে অনুর আচরণে। কয়েক সেকেন্ড এর জন্য নির্ঝর বুঝতেই পারলো যে সে না কী করবে! তারপর ধীরে ধীরে নির্ঝরের হুস ফিরলে ও নিজের দু’হাত তুলে খুব আলতো ভাবে আগলে নিলো অনুকে নিজের বুকের মাঝে। জানে ও এটা ঠিক না, তবুও অনুকে এই সময় আগলে নেওয়াটা ভিষণ জরুরী। নির্ঝর ফিসফিসিয়ে বললো….
—”আমি এসেছি অনু। এসেছি আপনাকে নিতে। সত্যিই এসেছি।”
অনুর জড়িয়ে ধরা হাতের বাঁধন আরো শক্ত হলো এবার। অদ্ভুত শিহরণে নির্ঝরের সর্ব শরীর কম্পিত হলো। অনু কাঁদতে কাঁদতেই বললো….
—”ওরা বলেছিলো, আমার মা নাকি বেঁচে আছেন। আমার মা আমাকে একপলক দেখার আশায় এখনও বেঁচে আছেন।আমি ওদের মি*থ্যা কথার ফাঁ*দে পা রেখে চলে আসি ওদের সাথে। কিন্তু আসার পথে আস্তে আস্তে জানতে পারি সবটা। সেইরাতে কি নিষ্ঠু*র ভাবেই না ওরা মে*রেছিলো আমার মা’কে! ওতো মা*ইর খাওয়ার পরও কে বাঁচে বলুন তো! যেই মা আমাকে বাঁচানোর জন্য এই গ্রাম থেকে পালানোর পথ খুলে দিলেন, নিজের জীবন জীবন ত্যাগ করতে দু’বার ভাবলেন না সেই মা যদি বেঁচে যেতোও সেই রাতের পর তাহলেও আমাকে দেখার জন্য অন্তত ঐ নোং*রা লোকগুলোর কাছে নত হতো না, অনুরোধ করতো না। এই চিন্তাগুলো তখন একবারের জন্যও আসে নি আমার মনে নির্ঝর। আসে নি।”
নির্ঝর চেষ্টা করছে অনুকে শান্ত করার। কিন্তু অনু এখন আর নিজের মধ্যে নেই যেনো। অনু বড় বড় করে শ্বাস ফেলে আবারও বলতে শুরু করলো……
—”অ*মানুষ হলেও কিছুটা ধর্মজ্ঞান নিশ্চয়ই আছে ওদের মধ্যে বলুন! ওরা দিয়েছে নিশ্চয়ই কোথাও না কোথাও আমার মা’কে ক*বর! ওরা জানে সব। কিন্তু বলবে না আমায়। ও নির্ঝর সাহেব আপনি তো বলেছিলেন আপনি আমার ইচ্ছে পূরণ করবেন! দেখুন আল্লাহ তায়ালা কোনো না কোনো ভাবে আমাকে আর আপনাকে এনেই দিলেন এই গ্রামে। তাহলে আমার ইচ্ছেটা যেকোনো ভাবে পূরণ করে দিন না এবার! খুঁজে বের করুন আমার মা’র কবরটা!আ-আমি শুধু একবার আম্মুর কবরটা দেখতে চাই। উনি যে একটুকরো জমির নিচে নিজের চিরস্থায়ী ঠিকানাটুকু পেয়েছে সে বিষয় নিশ্চিত হতে চাই। করবেন তো আমার ইচ্ছে পূরণ? বলুন না! দয়াকরে বলুন!”
কথাগুলো বলার সময় অনুর কন্ঠ ভেঙে ভেঙে আসছিলো। তবুও সে থামছিলো না৷ অনরগল বলেই যাচ্ছিলো আর নির্ঝরের বুকের সাথে মুখ গুঁজে কাঁদছিলো। নির্ঝর বললো…..
—”আগে শান্ত হতে হবে আপনাকে অনু। নিজের এমন উথাল-পাতাল অবস্থা নিয়ে আপনার ইচ্ছে আপনি পূরণ করতে পারবেন না। আরো বেশি দূর্বল হয়ে পড়বেন এতে।”
অনু নাক টানতে শুরু করলো। কান্নার বেগ কমিয়ে নিচ্ছে সে আস্তে আস্তে। কিছুক্ষণ পর অনু নিজেকে অনেকটাই সামলে নিয়ে বললো…..
—”ওরা আমাকে এখানে নিয়ে এসেছে ওই চেয়ারম্যানের ছেলের সাথে জোর করে বিয়ে দেওয়ার জন্য। আমি রাজি না বলাতে দরজা বন্ধ করে রেখেছে। একটু পর হয়তো আসবে ওরা আমাকে নেওয়ার জন্য৷ তখন আপনাকে এখানে দেখে ফেললে ওরা আপনাকেও মে*রে ফেলবে নির্ঝর সাহেব। আমি আমার চোখের সামনে আমার আরো একজন প্রিয় মানুষের মৃ*ত্যু দেখতে পারবো না। সত্যি বলছি সেই ক্ষমতা আর নেই আমার মাঝে।”
অনু নির্ঝরের বুক থেকে মুখ তুলে তাকালো নির্ঝরের দিকে। নির্ঝর অনুর দু’গালের উপর হাত রেখে ওকে পুরোপুরি শান্ত করার চেষ্টা নিয়ে বললো…..
—”শশ, শান্ত হন। কেউ কিচ্ছু করবে না আমাদের। ইনশাআল্লাহ আমরা সেফলি এখান থেকে বেড়িয়ে যেতে পারবো।”
অনু ওর ভেজা চোখজোড়া নিয়ে মাথা উপর-নিচ নাড়ালো। এই মূহূর্তে নির্ঝরের থেকে নিরাপদ আশ্রয়স্থল আর কোথাও খুঁজে পাবে না অনু তা সে বুঝে গিয়েছে। অনুর মুখে প্রিয়জন শব্দটা শুনে নির্ঝরের মনোবলও আরো খানিকটা বেড়ে গিয়েছে। তখুনি ওদের রুমের বাহির থেকে পাহারাদারদের মাঝে হওয়া কথপোকথনের হালকা আভাস ভেসে এলো….
—”কিরে? ভিতর থেইকা অন্যরকম কথা বলার আওয়াজ আসতেছে বলে মনে হচ্ছে না?”
আরেকজন বললো….
—”হ, মেয়েটা তো ভিতরে একাই আছিলো। তাইলে এমন লাগতেছে ক্যান যে ভিতরে আরো কেউ আছে?”
প্রথমজন বললো….
—”দরজা খুইলা দেখি কি হইছে।”
ঠিক তখনই আরেকটা কণ্ঠ ভেসে এলো আরো খানিক দূর থেকে….
—”এই রশিদ! চেয়ারম্যান সাহেব ডাকতেছে তোকে!”
—”এই সময়? কি জন্যে?”
—”আমি ওতো জানি নাকি! কইছে জরুরি কাম আছে। বেশি পেঁচাল না পাইরা যা গিয়া দেখ তাড়াতাড়ি।”
রশিদ পাহারাদারটি খেঁ*ক খেঁ*ক করে বললো….
—”আচ্ছা, আচ্ছা যাইতেছি। আর তুই দরজা খুইলা দেখ কি হইছে ভিতরে। আমি আইতেছি একটু পর।”
পরপরই পায়ের শব্দ দূরে মিলিয়ে গেলো। ভেতরে দাঁড়িয়ে সব কথাগুলো শুনে মুহূর্তেই নির্ঝরের চোখ-মুখের অবস্থা বদলে গেলো। নির্ঝর অনুকে আলতো করে নিজের থেকে সরিয়ে চারপাশে তাকালো। বাঁচার জন্য সময় খুব কম ওদের হাতে। নির্ঝরের চোখে পড়লো দরজার পাশে রাখা একটা মোটা বাঁশের লাঠির উপর আর তার ঠিক পাশের টেবিলেই রাখা রয়েছে একটা মোটামুটি সাইজের কাঁচের ফুলদানি।
নির্ঝর দ্রুত এগিয়ে গিয়ে লাঠিটা একহাতে নিলো আর ফুলদানিটা অন্য হাতে নিয়ে পুনরায় অনুর কাছে এসে ওর হাতে ধরিয়ে দিলো তা। অনু খানিক ভয়ার্ত চোখে তাকালো নিজের হাতে থাকা ফুলদানি ও নির্ঝরের দিকে। নির্ঝর নিচু স্বরে বললো….
—”মন দিয়ে শুনো। ভয় পেলে চলবে না এখন।”
নির্ঝর অনুকে দরজার ডান পাশের দেওয়ালের দিকে দাঁড় করিয়ে দিয়ে নিজের হাত দিয়ে ঘাড়ের একটা জায়গা দেখিয়ে বললো….
—”লোকটা ভিতরে ঢুকলেই এই জায়গায় আ*ঘাত করবে। যতোটা জোরে পারো ততোটা। তাহলে কিছু সময়ের জন্য সে অজ্ঞান হয়ে যাবে।”
অনুর হাত কাঁপছিলো। সে বললো….
—”আ-আমি যদি না পারি?”
নির্ঝর শান্ত স্বরে বললো….
—”পারবে। তোমাকে পারতেই হবে। আর আমি আছি তো পরিস্থিতি বেগতিক হতে নিলে সামলে নেওয়ার জন্য। ভরসা রেখো।”
অনু মাথা নেড়ে বুঝালো নির্ঝরের প্রতি ওর পূর্ণ বিশ্বাস-ভরসা আছে। অতঃপর নির্ঝর নিজের হাতে থাকা লাঠিটার দিকে তাকিয়ে বললো….
—”একই কাজ আমিও করবো। এরপর খুব সাবধানে এখান থেকে বের হবো আমরা। ঠিক আছে!”
অনু আবারও মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো। নির্ঝর দাঁড়িয়ে পড়লো লাঠিটা উঁচিয়ে অনুর মুখোমুখি দুই পাল্লার দরজার অপর পার্শে। ঠিক তখনই দরজার তালা খোলার শব্দ ভেসে এলো। নির্ঝর আর অনু দু’জনেই যেনো নিঃশ্বাস আটকে দাঁড়িয়ে আছে দরজার দু’পাশে।
দরজার তালাটা খুলে হালকা শব্দ করে মাঝবয়সী লোকটা দরজা খুলে সন্দিহান চোখে ভিতরে উঁকি দিলো। সামনা-সামনি কাউকে চোখে না পড়লে লোকটা ভিতরে প্রবেশ করতে করতে বলতে লাগলো….
—”এই মাইয়া? কিসের শব্দ হইতেছিলো রে ভি….!”
কথাটা শেষ করতে পারলো না পাহারাদার লোকটা। অনু ওর চোখজোড়া বন্ধ করে সমস্ত শক্তি দিয়ে ফুলদানিটা স*জোরে আ*ঘাত করলো লোকটার মাথার পিছনে। আকস্মিক আ*ঘা*তে লোকটা চিৎ*কার করতেও যেনো ভুলে গেলো। তার সর্ব শরীর কেঁপে উঠলো। লোকটা তার মাথার পিছনে হাত রেখে ঘুরে দাঁড়াতেই অনু আবারও আ*ঘাত করলো। এইবারের আ*ঘা*তটা আরো শক্তিশালী ছিলো যা গিয়ে লেগেছে লোকটার মাথার সামনের অংশে একেবারে মাঝ বরাবর। ফুলদানিটার নিচের অংশ ভে*ঙে কয়েকটুকরো কাঁচ লোকটার মাথায় গেঁথে গিয়েছে আর কিছু ছড়িয়ে পড়লো মেঝের উপর হালকা শব্দ তুলে।২য় আ*ঘাতে পাহারাহারটির চোখ উল্টে গেলো প্রায়। তার শরীরটা এবার টাল সামলাতে না পেরে সোজা কলাগাছের মতো ধ*প করে পড়ে গেলো মেঝেতে। নির্ঝর লাঠি হাতেই হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলো। কিন্তু এর পরের দৃশ্যটা দেখে সে পুরোপুরি থম*কে গেলো। অনু একপ্রকার ঝাঁ*পিয়ে পড়লো লোকটার উপর। নিজের দুই হাঁটু লোকটার বুকের উপর চেপে ধরে সমানে আ*ঘাত করতে লাগলো আধভাঙা ফুলদানিটা দিয়ে লোকটার মুখের উপর – মাথায়। ফুলদানিটা ভে*ঙে ভে*ঙে কাঁচগুলো গেঁ*থে গেঁ*থে যাচ্ছে লোকটার মুখে-মাথায়। মুখটা ক্ষ*ত-বি*ক্ষ*ত হয়ে যাচ্ছে। থে*ত*লে যাওয়ার মতো হয়ে যাচ্ছে। র*ক্ত-ছিঁ*ড়ে আসা চামড়া-মাংস গুলো অনুর শরীরে ছিঁ*টকে ছিঁ*টকে আসছে। মেঝের উপর গিয়ে পড়ছে। তবুও থামছে না অনু। পা*গলের ন্যায় বিলাপ করে বলছে…..
—”আমার মা’কেও তোরা এভাবেই মেরেছিলি তাই না! লাঠি দিয়ে আমার মায়ের শরীরের সব জায়গায় মেরে*ছিলি সেই রাতে তোরা!”
অনুর গলা তিরতির করে কাঁপছে। কান্নারা আর চাপা রাগেরা একসাথে মিশে ভ*য়ং*কর শোনাচ্ছে ওর কন্ঠটা। অনু আবারও বললো…..
—”তোরা সবাই মিলে এতোই নি*ষ্ঠুর ভাবে মে*রে*ছিলি আমার মা’কে আমার মা-টা চিৎকার করতেও ভুলে গিয়েছিলো। আমি কতো করে থামতে বলেছিলাম থামিস নি তোরা। কেউ থামিস নি। বারংবার আ*ঘাত করে গিয়েছিস আমার মা’কে। আমার জন্মদায়িনী মা’কে।”
লোকটার মুখ ইতিমধ্যেই থেঁ*তলে গিয়েছে। নড়াচড়া পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গিয়েছে৷ কিন্তু অনুর সেসব দিকে কোনো খেয়াল নেই। এখনও সে আগের ন্যায় মে*রেই চলেছে লোকটার থে*ত*লানো মুখের উপর। অনু বললো….
—”আজ আমিও এতোটাই মারবো তোদের যে য*ন্ত্রণা কাকে বলে তা বুঝবি তোরাও। আমার মা কতোটা কষ্ট পেয়েছিলো তা একটু হলেও অনুভব করতে পারবি তোরাও। তবেই আমার মনে একটু শান্তি কাজ করবে।”
নির্ঝর পুরোপুরি হত*ভম্ব হয়ে তাকিয়ে আছে অনুর দিকে। এ এক অন্য রকম অনুকে দেখছে সে। অনু সেদিন নিজের শখের কথা বলতে গিয়ে বলেছিলো ও ওর মায়ের খু*নি*দের নৃ*শং*স ভাবে খু*ন করতে চায় আজ তার বাস্তব নমুনা নির্ঝর দেখতে পেলো। অনুর মনে বহুদিনের জমে থাকা আ*তঙ্ক, প্রতি*শোধের আ*গু*নে আর ছিন্নভিন্ন হয়ে গেলো লোকটা। পরক্ষণেই নির্ঝরের হুঁশ ফিরলে সে দ্রুত এগিয়ে এসে পিছন থেকে অনুর কোমর জড়িয়ে ধরে এক টানে ওকে উপরে তুলে সরিয়ে আনলো লোকটার কাছ থেকে।
অনু এখনও ছটফট করছে। হাতে থাকা ভাঙা ফুলদানিটা ছুঁ*ড়ে মা*রলো লোকটার উপর। অনু হিং*স্র আহ*ত বা*ঘি*নীর ন্যায় বললো….
—”ছাড়ুন! ছাড়ুন আমাকে! আমি মে*রে ফেলবো ওদের! সবাইকে মে*রে ফেলবো আমি! ছাড়ুন।”
নির্ঝর আরো শক্ত করে ধরে রাখলো অনুকে। অতঃপর বললো….
—”অনু! শান্ত হন। শান্ত হতে হবে আপনাকে।”
—”না! ছাড়ুন আপনি আমায়। ছাড়ুন। ওরা আমার মা’কে মে*রে ফেলেছে। কি অ*প*রাধ ছিলো আমার মা-টার? ঐ নিষ্পাপ মানুষটা জীবনে কোনোদিন সুখের মুখ দেখে নি। শেষ যাত্রাটা তো তার একটু সুখকর হতে পারতো! ওরা তো তা হতে দেয় নি।
অনু এখনও হাত-পা ছুঁড়ছে। নির্ঝর এবার খানিকটা গম্ভীর কণ্ঠে বললো….
—”লোকটা মা*রা গিয়েছে অনু। বেঁ*চে নেই উনি।”
অনু থমকালো এবার হালকা। ক্লা*ন্তিতে হাঁপাচ্ছে সে। নির্ঝর ভারী নিঃশ্বাস ফেলে আবার বললো….
—”ম*রাকে আর কতো মা*রবে তুমি?”
অনুর সর্বশরীর হালকা ঝাঁ*কু*নি দিয়ে উঠলো। চোখ দু’টো অস্বাভাবিক ভাবে বড় বড় হয়ে গেলো। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই অনু বুঝতে পারলো আজ ও আরো একটা খু*ন করেছে। ওর বাবার খু*ন হয়েছিলো যেই হাতে, যেই র*ক্তের দা*গগুলো আজও অনুকে তা*ড়া করে বেড়ায় সেই হাতেই আজ আরো একটা খু*ন করলো অনু। এই খু*ন টা করেছে খুবই নৃ*শং*স ভাবে। লোকটা মুখ-মাথা বা*জে ভাবে থে*ত*লে গিয়েছে। হুট করে যেই দেখবে লা*শটা তারই আ*ত্মা শুকিয়ে যাবে যেনো। অনু কাঁ*পা গলায় বললো….
—”আ-আমি-আমি আবার খু*ন করলাম!”
নির্ঝর দ্রুত অনুকে ঘুরিয়ে নিলো নিজের দিকে। ওর মুখটা নিজের বুকের মধ্যে লুকিয়ে নিয়ে বললো…..
—”এখন এসব ভাবার সময় না। আমাদের এখান থেকে বের হতে হবে যতো দ্রুত সম্ভব।”
ঠিক তখনই বাইরে থেকে আরেকজন পাহারাদারের কণ্ঠ ভেসে এলো। যেই লোকটার তখন ডাক পড়েছিলো সেই রশিদ নামের লোকটা এসেছে ফিরে।
—”এই! এতোক্ষণ লাগতেছে ক্যান ভিতরে তোর? কচি মাইয়া একলা পাইয়া কি মজা লু*টার চেষ্টা করতাছোস নাকি? চেয়ারম্যান জাইনা গেলে কিন্তু তোরে জ্য*ন্ত ক*বর দিবো গোলামের পু*ত।”
নির্ঝর আর অনু দু’জনেই নিরব হয়ে রইলো। কি হবে এখন? কিভাবে বের হবে ওরা?
রাতের অন্ধকার চিরে একের পর এক গাড়ি দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলেছে গ্রামের ভিতরের কাঁচা রাস্তা ধরে। স্পেশাল বুলেটপ্রুফ কালো গাড়িটার ভিতরে বসে থাকা সারফারাজের মুখভর্তি স্থিরতার ছাপ ফুটে আছে। সারফারাজ ওর ডান হাতের আঙুলগুলো বারবার সিটের উপর ঠুকছে ধীরে ধীরে।
এটা ওর বহু বছরের পরিচিত অভ্যাস। যখন সারফারাজ খুব বেশি রেগে যায় তখন ও বাহ্যিকভাবে আরো বেশি শান্ত হয়ে যায়। ঠিক যেমন বড় কোনো ধবং*স উপযুক্ত ঝ*ড় হওয়ার আগে পরিবেশটা ভ*য়ং*কর রকম শান্ত হয়ে থাকে তেমন। তেজ বললো….
—”ভাইয়া আমরা মনে হয় গ্রামের প্রায় শেষ পর্যায়ে এসে পড়েছি। এখন আমরা কি করবো? ভিতরে সরাসরি না ঢুকলে ভিতরের অবস্থা আমরা বুঝবো কিভাবে?”
সারফারাজ জানালার বাইরে তাকিয়েই উত্তর দিলো….
—”সরাসরি ভিতরে যাওয়া যাবে না।”
—”হুম ভিতরে হয়তো অনু আছে। কিন্তু নির্ঝর যদি ভিতরে থাকে তখন?”
—”আমি জানি নির্ঝর ভিতরেই আছে।”
সাথে সাথেই তেজ চুপ হয়ে গেলো। সারফারাজ এবার মাথা ঘুরিয়ে নিজের অস্বাভাবিক ঠান্ডা চোখ জোড়া আইজিপির দিকে স্থির করে বললো…..
—”চেয়ারম্যানের বাড়ির আশেপাশে কয়টা বের হওয়ার রাস্তা আছে?”
আইজিপি ম্যাপের উপর আঙুল রেখে বললেন….
—”সামনের দিকে মেইন গেট একটাই। পিছনে বাঁশঝাড়ের দিক দিয়ে সরু রাস্তা আছে একটা আর ডানদিকে পুরোনো পুকুরের পাশ দিয়ে আরেকটা পথ বের হয়েছে।”
সারফারাজ একবার ম্যাপটার দিকে তাকিয়েই ওর মতিষ্কে পুরো হিসাব কষে ফেললো যেনো। পরপরই ঠান্ডা গলায় সে বললো….
—”ওদের পালানোর রাস্তা আগে বন্ধ করতে হবে।”
আইজিপি ভ্রু কুঁচকে বললেন….
—”কি করতে চাইছেন আপনি?”
সারফারাজ এবার সামনের দিকে ঝুঁকে ড্রাইভারকে বললো….
—”গাড়ি থামাও। এখানেই।”
ড্রাইভার ব্রেক কষে থামালেন গাড়ি। সামনের ও পিছনের সব গাড়িও থেমে গেলো সাথে সাথে। সারফারাজ দরজা খুলে নিচে নামলো। স্পেশাল ফোর্সের সদস্যরা সতর্কতা বজায় রেখে নেমে দাঁড়িয়ে গেলো। সারফারাজ চারপাশে একবার চোখ বুলালো। অতঃপর ধাঁ*রালো স্বরে বললো….
—”শুনুন সবাই। আমার সিগন্যাল ছাড়া চেয়ারম্যানের বাড়িতে কেউ ঢুকবেন না। লোকটা পুরোনো ধাঁ*চের ধু*র*ন্ধর খেলোয়ার। পুলিশ দেখলেই প্রথমে নিজের বিরুদ্ধে থাকা সব প্রমাণ গায়েব করবে তারপর জিম্মিদের ব্যবহার করে পালানোর সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে।”
আইজিপি মাথা নেড়ে বললেন….
—”রাইট।”
সারফারাজ সঙ্গে সঙ্গে নির্দেশ দিতে শুরু করলো….
—”ফোর্স দুইভাগ হয়ে যান।”
সে ম্যাপটা সবাইকে একবার দেখে নিতে বললো। সবার দেখা হলে সারফারাজ বললো….
—”এক টিম পিছনের বাঁশঝাড় ঘিরে রাখবে। আরেক টিম পুকুরপাড়ের রাস্তা ব্ল*ক করবে। একটা কেউ যেনো পালাতে না পারে আজ।”
সবাই ওকে স্যার বলে নিজ কাজে লেগে পড়লো। তেজ বললো….
—”ভাইয়া, আমরা কি করবল?”
সারফারাজ ওর কোমরের পাশ থেকে নিজের পারসোনাল পি*স্ত*লটা বের করে ভেতরটা একবার চেক করে বললো….
—”আইজিপি স্যারের সাথে তুই গাড়ির ভিতরেই থাকবি।কয়েকজন গার্ডসকে নিয়ে আমি ভিতরে যাবো।”
আইজিপি সঙ্গে সঙ্গে বললেন….
—”এটা রি*স্কি হয়ে যাবে সারফারাজ। তোমার ভাই থাক ভিতরে। আমাকে যেতে দাও তোমার সাথে। কারণ চেয়ারম্যানের লোকজন অনেক থাকতে পারে ভিতরে আনাচে-কানাচেতে।”
সারফারাজ বললো…..
—”আমার ছোট ভাই ও বোন ভিতরে আছে স্যার। আমি কোনো ভু*ল হওয়ার সুযোগ দিয়ে ওদের জীবনকে রি*স্কে ফেলবো না ইনশাআল্লাহ। আপনি বাহিরে থেকে বাহিরের পরিবেশটা নিয়ন্ত্রণে রাখুন পাশাপাশি আমার এই ভাইটার নিরাপত্তার দায়িত্বও থাকছে আপনার উপর।”
আইজিপি এবার আর বাঁ*ধ সাধতে পারলেন না। তেজ চেয়েও কিছু বলার সাহস করে উঠতে পারলো না। পরপরই সারফারাজ আবারও শান্ত গলায় বললো….
—”আর একটা কথা এখুনি বলে রাখছি আমি আপনাকে স্যার!”
—”কি কথা?”
—”নির্ঝর বা অনুর শরীরে যদি ওরা একটা ফুলের টোকাও দিয়ে থাকে ইতিমধ্যে তাহলে আজ এই চেয়ারম্যান বাড়ির একটা ইটও অ-ক্ষ*ত থাকবে না। জি*ন্দা জ্বা*লাবো আমি ঐ চেয়ারম্যান আর ওর লোকদের।”
তেজের বুকটা কেঁপে উঠলো সারফারাজের হুম*কি মূলক বাক্যগুলো শুনে। কারণ সারফারাজ কখনও ফাঁকা আওয়াজ দেয় না। সে মুখে যা বলে তা কাজেও করে ছাড়ে।
না চাইলেও তুমি শুধু আমারই পর্ব ৪০
তখুনি দূরে চেয়ারম্যানের বাড়ির দিক থেকে একটা মেয়েলি কন্ঠে চিৎকারের শব্দ ভেসে এলো। ওরা সবাই একসাথে সেদিকে তাকালো। সারফারাজের চোখ-মুখের অবস্থা মুহূর্তেই বদলে গেলো। সে এক সেকেন্ডও দেরি না করে কয়েকজন গার্ডসকে নিয়ে ছুটে চলে গেলো সেদিকে।
