Home না চাইলেও তুমি শুধু আমারই না চাইলেও তুমি শুধু আমারই পর্ব ৪২

না চাইলেও তুমি শুধু আমারই পর্ব ৪২

না চাইলেও তুমি শুধু আমারই পর্ব ৪২
মাইশা জান্নাত নূরা

আরেকজন পাহারাদার ভিতর থেকে কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে ভিতরে প্রবেশ করতেই অন্য পাহারাদারটির এমন ক্ষ*ত-বি*ক্ষ*ত লা*শ দেখে যেই না ভ*য়ে চিৎকার করতে নিবে ওমনি সময় নির্ঝর দরজার আড়াল থেকে বেড়িয়ে নিজের হাতে থাকা লাঠিটা দিয়ে লোকটার মাথায় বা*রি মা*রলো। সঙ্গে সঙ্গে লোকটা জ্ঞান হারিয়ে নিচে পরে গেলেন। নির্ঝর অনুকে বললো…..

—”আমাদের আর একমূহূর্তও সময় নষ্ট করলে চলবে না।পালাতে হবে এখান থেকে।”
অনু ভিতু কন্ঠে বললো…
—”আমরা পালাবো কিভাবে নির্ঝর! বাহিরে যে আরো অনেক পাহারাদাররা আছেন। তাদের সবার চোখকে ফাঁ*কি দিয়ে পালানো অ*সম্ভব।”
নির্ঝর শ্বাস ফেলে বললো….
—”কিচ্ছু করার নেই। সবার সাথে মোকাবিলা করে হলেও পালাবো আমরা৷ যদি শেষ পর্যন্ত আর না পারি আমি তবে নিজেকে তাদের হাতে সঁপে দিবো কিন্তু আপনাকে এখান থেকে বের করবোই আমি৷”
—”এসব কি উল্টো-পাল্টা কথা বলছেন আপনি এই সময়?”
—”এখন ত*র্ক-বিত*র্ক করার সময় না। চলুন।”
অনু নির্ঝর হাত শক্ত করে বললো…..
—”আমাকে বাঁচাতে এসেছেন জন্য নিজেকে ভুলে কেবল আমাকেই বাঁচাবেন এমনটা আমি হতে দিবো না। যদি বাঁচি তবে একসাথে বাঁচবো। আর যদি দেখি আপনি মর*ণের দিকে নিজেকে সঁ*পে দিচ্ছেন আমাকে বাঁচানোর খাতিরে তাহলে আপনার আগে আমি ম…..।”

নির্ঝর অনুর ঠোঁটের উপর নিজের আঙুল ঠেকিয়ে ওর কথা সম্পূর্ণ হতে দিলো না। তিরিক্ষি মেজাজ নিয়ে বললো….
—”বেশি কথা বলা মেয়ে মানুষ আমি পছন্দ করলেও অসময়ে অপ্রয়োজনীয় কথা বলা মেয়ে মানুষ আমি পছন্দ করি না। তাই অপ্রয়োজনীয় কথা কম বলবেন। বুঝেছেন?”
অতঃপর নির্ঝর অনুকে নিয়ে সাবধানে রুম থেকে বেড়িয়ে এলো। দোতলার বারান্দাটা এইসময় পুরো ফাঁকা রয়েছে। নির্ঝর হালকা ঝুঁকে নিচে তাকালো। নিচটাও ফাঁকা দেখে নির্ঝরের মনটা কিছুটা হালকা হলো। হয়তো ঝা*মেলা ছাড়াই বেড়িয়ে আসতে পারবে ওরা৷ সিঁড়ির ধাপগুলো খুব সাবধানে পা ফেলে ফেলে অতিক্রম করছে ওরা। নিচে চলে আসার পর পরই হঠাৎ দোতলার বারান্দা থেকে চিৎকারের আওয়াজ ভেসে এলো…
—”এই ধর ধর, ওদের ধর। পালাচ্ছে ওরা। ধর সব মিলে।”
অনু একবার উপরে তাকাতেই দেখলো নির্ঝর যেই পাহারাদারটিকে মে*রে অ*জ্ঞান করে দিয়েছিলো তারই জ্ঞান ফিরেছে। সেই চিল্লিয়ে সবাইকে সতর্ক করে দিচ্ছে। নির্ঝর বললো….

—”দৌঁড়ান অনু, দৌঁড়ান।”
নির্ঝর অনুর হাত ধরে দৌঁড়াচ্ছে। আঙিনা পেরিয়ে মূল দরজার সামনে আসতেই পিছন থেকে একজন পাহারাদার নির্ঝরের মাথায় একটা লাঠি দিয়ে আ*ঘা*ত করলো। অনুর হাত ছুটে গেলো নির্ঝরের থেকে। নির্ঝর দু’হাতে ওর মাথার ক্ষ*ত স্থান চেপে ধরে ব্য*থায় আ*র্ত*নাদ করে উঠলো। অনু পিছন ঘুরে ‘নির্ঝর’ বলে চিল্লিয়ে উঠতেই চারপাশ থেকে ৫-৬ জন লোক মূহূর্তেই ওদের দু’জনকে ঘেরাও করে ফেললো। অনুর দু’হাত দু’পাশ থেকে দু’জন ধরলো আর চারজন মিলে নির্ঝরের দু’হাত-পা ধরে তুলে আঙিনার মাঝবরাবর আনলো। অনুকে ঐ লোক দু’টো ধরে থাকলো নির্ঝরকে ফেলনা বস্তুর ন্যায় আঙিনার উপর একপ্রকার ছুঁড়ে ফেললো। মুখ পার্শে পড়ার ফলে নির্ঝর ওর ডান পাশটায় ব্য*থা বেশি পেলো। আগের মাথার ব্য*থার পাশাপাশি শারিরীক এই ব্য*থাগুলো নির্ঝরকে প্রায় কা*বু করে ফেললো যেনো। অনু নিজেকে ছাড়ানোর জন্য ছটফট করতে করতে বললো….
—”ওনাকে মা*রবেন না। দয়া করে মা*র*বেন না ওনাকে। ছেড়ে দিন ওনাকে। ওনার কোনো দো*ষ নেই। সব দো*ষ তো আমার। উনি তো আপনাদের চেনেন ও না, আর না আপনারা ওনাকে চিনেন। ছেড়ে দিন ওনাকে। আল্লাহর দোহাই লাগে।”
তখুনি চেয়ারম্যান সেখানে উপস্থিত হলেন ভাড়ি ভাড়ি পা ফেলে। চেয়ারম্যান তার নোং*রা চিন্তাধারার বহিঃপ্রকাশ করলেন একটি কথার দ্বারাই….

—”আমার সোনার টুকরা পোলারে ফালাইয়া রাইখা শহুরে নাগর ধরছোস রে মাগ*..! এই বয়সেই পতি*তা গো মতো শরীর বিলানোর ব্যবসায় নামছোস!”
নির্ঝরের কান পর্যন্ত কথাগুলো যেতেই ওর শরীর ঝাঁকি দিয়ে উঠলো। মাথার পিছনের ক্ষ*ত থেকে টপটপ করে র*ক্ত পড়ছে। তবুও সে মাথা তুলে তাকালো চেয়ারম্যানের দিকে। চোখ দু’টো রক্তবর্ণ হয়ে আছে নির্ঝরের। সে হিসহিসিয়ে বললো….
—”শুয়ো*** বাচ্চা। খবরদার অনুর চরিত্র নিয়ে একটাও বাজে কথা বলবি না তুই৷ নয়তো জি*ন্দা গে*রে দেবো তোকে তোরই ভিটার ৫০ হাত মাটির নিচে।”
চেয়ারম্যানের চেহারা মুহূর্তেই বি*কৃত হয়ে গেলো রাগে। তৎক্ষনাৎ চেয়ারম্যান তার পাশেই দাঁড়ানো একজন পাহারাদারের হাত থেকে মোটা লাঠিটা ছিনিয়ে নিয়ে ঝড়ের গতিতে এগিয়ে নির্ঝরের সম্মুখে এসে দাঁড়িয়ে স্ব*জোরে আ*ঘাত করলো ওর ডান কাঁধে। নির্ঝরের মুখ দিয়ে চাপা আর্ত*নাদ বের হলো। তবুও সে মাথা নিচু করলো না। চেয়ারম্যান এবার ওর বাম কাঁধে মা*রলো ততোটাই জোড়ে। অতঃপর দাঁতে দাঁত চেপে বললেন….

—”আমারে হুমকি দিস? আমার এলাকাতে আইসা আমারেই ভয় দেখাস?”
এই বলে চেয়ারম্যান নির্ঝরের পেটে লাঠির মুখ দিয়ে গুঁ*তো মারলো একটা। নির্ঝর দাঁতে দাঁত চেপে খানিক কুঁ*ক*ড়ে গেলো। পরপরই চেয়ারম্যান নির্ঝরের দুই পায়ের হাঁটুর নিচের মাংসপেশিতে আ*ঘাত করলো। নির্ঝরের মনে হলো ওর পা দু’টো এবার অবশ হয়ে হয়ে আসবে। দু’হাতে বাঁধা দড়ির ভার বেড়ে গেলো যখন নির্ঝর ওর পা দু’টো বেঁ*কিয়ে ফেললো। এছাড়াও ওর সর্ব শরীর র*ক্ত দিয়ে ভিজে রয়েছে।অনু চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে বললো….

—”থামেন! দয়া করে থামেন! মানুষটাকে আর মাইরেন না। র*ক্ত কতো ঝড়তেছে শরীর থেকে। ম*রে যাবে মানুষটা। দোহাই লাগে আপনাদের, আল্লাহর দোহাই লাগে, থামেন৷”
চেয়ারম্যান উন্মাদের ন্যায় নির্ঝরের শরীরে একের পর এক আ*ঘাত করতে লাগলো। অনুর চি*ৎকার করে বলা কথাগুলো তার কান পর্যন্ত পৌঁছালেও তিনি থামছেন না। মারতে মারতেই আবারও বললেন…
—”শহুরে নায়ক হইতে আইছস তাই না? আজ তোর সব নায়কগিরি বাইর কইরা দিমু!”
চেয়ারম্যানের করা শেষ আ*ঘাতটা এতোটাই জোরে পড়লো যে নির্ঝরের মাথা নিচের দিকে ঝুঁ*কে গেলো। ওর শরীরটাও নিস্তেজ হয়ে আসছে এবার। তবুও নির্ঝর ক্ষি*প্ত চোখে চেয়ারম্যানের দিলে তাকিয়ে বললো…..
—”মার। মে*রে ফেল আমায়।”
এই বলে নির্ঝর একটু কাশলো। ভ্রু চুয়ে র*ক্ত পড়ছে। ঠোটের কোনের র*ক্ত শুকিয়ে এসেছে প্রায়। নির্ঝর আবারও বললো……

—”কিন্তু আমি যদি আজ বেঁচে যাই, তাহলে তোদের একটাকেও ছাড়বো না আমি। জানের ভয়ে পালাইলেও ধরে ধরে মারবো সব ক’টারে। সব ক’টারেই।”
নির্ঝর চোখ তুলে তাকালো চেয়ারম্যানের দিকে ও ওর আশে-পাশে থাকা সব লোকজনদের দিকে। চেয়ারম্যান এবার নির্ঝরের চুল মুঠো করে ধরে ওর মুখের সামনে ঝুঁকে বললো….
—”তোরে এমনে মাইরা ফেললে চলবো না। এতে কইরা মজা তাড়াতাড়ি শেষ হইয়া যাইবো। তোরে তিলে তিলে যন্ত্রণা দিমু আমি।”
এই বলে চেয়ারম্যান অনুর দিকে লো*ভাতুর নজরে তাকিয়ে পৈ*শা*চি*ক হাসি হেসে বললো……
—”তোর সামনেই যদি তোর নাগরীনির বিয়া দি আমার পোলার লগে তারপর তোর সামনেই সবাই মিলা ওরে ছিঁ*ড়া খাই! তাইলে কেমন মজা হবো?”
অনুর ঘৃ*ণায়, অপ*মানে মাথা নুইয়ে এলো। নির্ঝরের আ*হত চোখজোড়া একেবারে র*ক্ত লাল হয়ে গিয়েছে। চেয়ারম্যান হিসহিসিয়ে আবারও বললো….
—”তুই খালি দেখবি আর ধুঁইকা ধুঁইকা মরবি। আমার একটা বা*ল ও ছিঁ*ড়*তে পারবি না শালা শু*য়ো***।”
পরের মুহূর্তেই নির্ঝর ওর মুখভর্তি রক্তমাখা থু*থু ছুঁ*ড়ে মা*রলো সোজা চেয়ারম্যানের মুখের উপর। চেয়ারম্যান কয়েক সেকেন্ড হত*ভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। তারপর চেয়ারম্যান ঘৃ*ণায় মুখ মুছতে মুছতে গর্জে উঠা কন্ঠে বললেন…..

—”এই বুইড়া কাজী! বিয়া পড়াস না কে রে! তোরে কি এইহানে সা*র্কাস দেখবার জন্য আইনা বসায় রাখছি?”
কাজী সঙ্গে সঙ্গে নিজ কাজে মনোনিবেশ করলেন। অনু সাথে সাথে মাথা নাড়িয়ে কাঁদতে কাঁদতে বললো….
—”না! আমি এই বিয়ে করবো না!”
চেয়ারম্যান চোখ রাঙিয়ে বললেন….
—”বিয়া তো তোর করোন লাগবোই। এমনে এমনে না করতে চাইলে তোর নাগরের উপর আরো পা*ষ*বিক অ*ত্যা*চার করমু। তখন আর না কইরা যাবি কই বল মাগ***!”
এই বলে চেয়ারম্যান তার হাতে থাকা লাঠিটা উঠিয়ে আবারও নির্ঝরকে মা*রার জন্য উদ্যত হলে অনুর বুকটা কেঁ*পে উঠলো। নির্ঝরের দিকে তাকাতেই ওর র*ক্তা*ক্ত, আ*হত চেহারা দেখে ওর বুকটা মোঁ*চড় দিয়ে উঠলো। অনু অঝোরে ধারায় ওর দু’চোখ থেকে পানি ঝরাতে ঝরাতে কাঁপান্বিত গলায় বললো….
—”আমি রাজি।”
নির্ঝর সঙ্গে সঙ্গে ছট-ফট করে উঠলো। নিজের সর্বোচ্চ শক্তি প্রয়োগ করে দড়ির বাঁধন ছাড়াতে হাতজোড়া মোঁ*চ*ড়াতে চেষ্টা করলো। দু’হাতেই এবার দড়ি শক্ত ভাবে বসে গিয়ে চামড়া কেঁ*টে আরো ভিতরে যাওয়ার পথ ধরলো। র*ক্ত ঝড়তে লাগলো টপটপ করে। নির্ঝর খানিক চিৎকার করে বললো….

—”না অনু। আপনি এই বিয়ে করবেন না। কিছুতেই না। এই বিয়ে হতে পারে না। অনু দয়াকরে এই বিয়েতে রাজি হব…..!”
নির্ঝর পুরো কথা শেষ করার আগেই পাশ থেকে একজন পাহারাদার নির্ঝরের নাক-ঠোঁট বরাবর শক্ত ভাবে ঘুঁ*ষি মা*র*লো। নির্ঝরের থেকেই খানিকটা দূরে কয়েকটা চেয়ার রাখা হয়েছে। যেখানে বসে রাখা হয়েছে অনুকে। ওর পাশেই চেয়ারম্যান, কাজী সাহেব, আর যারা সাক্ষী হবেন তারা বসে আছেন। অনুর অন্যপাশেই হুইলচেয়ারে বসে আছে চেয়ারম্যানের ছেলে। অনু হিঁচকি তুলে তুলে কাঁদছে আর একটু পর পর ব্য*থিত চোখে তাকাচ্ছে নির্ঝরের দিকে। কাজী সাহেব বললেন….
—”আপনার ছেলের তো কথাবার্তার তাল ঠিক নেই সাহেব, কবুল বলতে পারবে?”
চেয়ারম্যান খেঁক খেঁক করে বললেন….
—”আমার ছেলের হয়ে কবুল আমি বলমু তাতে চলবো আপনের?”
অনু ঘে*ন্না*য়, লজ্জায় ভিতর থেকে গুটিয়ে যাচ্ছে। কাজী সাহেব মনে মনে বললেন….

—”আসতাগফিরুল্লাহ, নাউজুবিল্লাহ।”
ঠিক তখনই বাড়ির সামনের গেটের দিক থেকে অনেক জোড়ে কিছু ভা*ঙার মতো শব্দ ভেসে এলো। উপস্থিত সবাই চমকে উঠে তাকালো সেদিকে। নির্ঝরও আস্তে আস্তে মাথা তুলে ঘাড় হালকা বাঁকিয়ে তাকালো। পরের মুহূর্তেই
প্রায় ১৫ জনের মতো কালো পোশাকধারী অস্ত্রধারী মানুষ ঢুকে পড়লো চেয়ারম্যানের বাড়ির আঙিনায়। চেয়ারম্যানের লোকজন কিছু বুঝে ওঠার আগেই ভেসে এলো কঠিন স্বরে বলা কথাগুলো…..
—”সবার হাতে থাকা যাবতীয় হা*তি*য়ার-অস্ত্র-সস্ত্র নিচে ফেলে দাও। আমরা ইতিমধ্যেই চারদিক ঘেরাও করা ফেলেছি।”
চেয়ারম্যান সহ তার লোকদের চেহারায় হত*ভম্বতার ছাপ ফুটে উঠলো। আবছা আলো-অন্ধকারের বুক চিঁ*রে ভিতরে প্রবেশ করলো সারফারাজ। ওর পিছন পিছন আইজিপি ও তেজও প্রবেশ করলো। সারফারাজ শুরুতে আসতে নিষেধ করলেও পরমূহূর্তে পরিস্থিতি বেগতিক হয়েছে বুঝে তেজ আর স্থির হয়ে বাহিরে থাকতে পারে নি। তাই আইজিপি নিজেও চলে এসেছেন ওদের পিছন পিছন। আর একটু আগে অনুর চিৎকার শুনেই তৈরি হয়েছিলো ওদের সবার মনে বেগতিক পরিস্থিতির আশংকা। তাই সারফারাজ সহ আইজিপির স্পেশাল ফোর্সরা মিলে পরিকল্পনা অনুযায়ী বাহিরটা পুরোপুরি ভাবে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে ভিতরে আসতেই খানিক সময় লাগলো।
আঙিনায় এসে দাঁড়াতেই সারফারাজের চোখ প্রথমেই পড়লো নির্ঝরের উপর। র*ক্তা*ক্ত অবস্থায় খুঁটির সাথে বাঁধা নিজের ছোট ভাইকে দেখে সারফারাজের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠলো। কয়েক সেকেন্ড ওভাবেই ওর দিকে তাকিয়ে থাকার পর সারফারাজ চেয়ারম্যানের দিকে এমন ভাবে তাকালো ওর দৃষ্টি দেখেই চেয়ারম্যানের বুকের ভিতরটা পর্যন্ত কেঁপে উঠলো। সারফারাজ বললো….

—”আমার ভাইয়ের গায়ে কে হাত তুলেছে? ওকে এভাবে র*ক্তা*ক্ত কে করেছে? কে বেঁধেছে ওকে খুঁটির সাথে?”
চেয়ারম্যান কিছু বলার আগেই সারফারাজ ওর সামনে থাকা একটা টেবিল লাথি মেরে উল্টে দিলো। আকস্মিক এই শব্দে চারপাশ কেঁপে উঠলো। সারফারাজ গর্জে উঠে বললো….
—”বাঁধন খোলো ওর!”
তৎক্ষণাৎ দু’জন ফোর্স সদস্য গিয়ে নির্ঝরের দড়ির বাঁধনগুলো খুলতে লাগলো। খোলার সাথে সাথেই নির্ঝর প্রায় পড়ে যাচ্ছিলো দূর্বলতায়। ফোর্স সদস্যরা ওকে ধরে সামলে নেয়। নির্ঝর অনুর দিকেই তাকিয়ে আছে তখনও।এদিকে পরিস্থিতি নিজের হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে বুঝে চেয়ারম্যানের মুখের ধরণ পরিবর্তন হয়ে গেলো। আশপাশে তাকিয়ে চেয়ারম্যান তৎক্ষণাৎ নিজের কোমরের প্যঁ*চ থেকে ছোট সাইজের একটা ছুঁ*রি বের করে অনুর গলায় চেপে ধরলো। তা দেখে উপস্থিত সবাই থম*কে গেলো। চেয়ারম্যানের লোকেদের মুখে বাঁচার আশার আলো দেখা গেলো এবার। খানিক আত*ঙ্কে অনুর শরীর কেঁপে উঠলো।চেয়ারম্যান চিৎকার করে বললো…..
—”কেউ আগাইবি না! এক পা আগাইলে মাইয়াডারে এইখানেই জবা*ই কইরা ফেলমু!”
স্পেশাল ফোর্স চেয়ারম্যানের দিকে অস্ত্র তাক করেও থেমে গেলেন। তেজ দাঁতে দাঁত চেপে বললো…
—”হারাম*জাদা, যা আশংকা করা হয়েছিলো তাই করলো।”
সারফারাজের চোখ দু’টো ভয়ংকর রকম শীতল দেখাচ্ছে। সে ধীর গলায় বললো….

—”অনুকে ব্যবহার করে নিজেকে বাঁচাতে চাইলে সেটা হবে তোর করা সবথেকে বড় বোকামি৷ এতে তোর বাঁচার চান্স আরো কমে যাবে। শা*স্তি*র ভার আরো ভারী হবে। তাই অনুর গল থেকে ছুঁ*রিটা সরায় ফেল ভালোয় ভালোয়।।”
চেয়ারম্যান হিসহিসিয়ে বললো….
—”আমি বাঁচমু না যখন তখন যেই মাইয়ার লাইগা আজ এতো কিছু হইতাছে ওরে কেন বাঁচতে দিমু? নিজের হাতে ওরে জ*বাই দেওয়ার পর যদি মরিও তাও আমার আত্মাটা শান্তি পাইবো।”
নির্ঝর খানিক টলতে টলতেই পুরোপুরি দাঁড়িয়ে গেলো কারোর সাহায্য ছাড়া নিজের পায়ে। মাথাটা এখনও কিছুটা ঘুরছে। দৃষ্টিও হালকা ঝাপসা লাগছে। তবুও নির্ঝর এগোতে লাগলো অনুর দিকে। সবার মনোযোগ এইমূহূর্তে চেয়ারম্যানের দিকে থাকায় কেউ খেয়াল করলো না নির্ঝরের অগ্রসর হওয়ার দিকে। নির্ঝর সাবধানে পিছন দিক দিয়ে ঘুরে এসে আচমকা ঝাঁ*পিয়ে পড়ে চেয়ারম্যানের ছুঁ*রি ধরা কব্জিটা চেপে ধরে অনুর গলা থেকে খানিকটা সরিয়ে বললো…..

—”অনু নিচু হন!”
অনু সাথে সাথে নিচু হয়ে গেলো। নির্ঝর মোচড় দিয়ে চেয়ারম্যানের হাত সরিয়ে অনুকে তার থেকে দূরে সরিয়ে দিলো। কিন্তু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসার জায়গায় আরো বেঁ*কে বসলো। ফোর্সরা চেয়ারম্যানের দিকে আসতে নেওয়ার আগেই চেয়ারম্যান রাগে অন্ধ হয়ে স্বজোরে ছুঁ*রিটা বসিয়ে দিলো নির্ঝরের পেটে। অনু চিৎকার করে উঠলো, “নির্ঝর” বলে। নির্ঝরের শরীর ঝাঁ*কি দিয়ে উঠলো।চেয়ারম্যান থামলো না। পর পর আরো দু’বার ছুঁ*রিটা বের করে তা ঢুকিয়ে দিলো নির্ঝরের পেটে। সারফারাজ নিজের রি*ভ*লভারটা বের করে সরাসরি গু*লি করলো চেয়ারম্যানের পিঠে, দুই পায়ে ও হাতেও। চেয়ারম্যান তৎক্ষণাৎ লুটিয়ে পড়লো আঙিনার উপর। নির্ঝরের মুখ দিয়ে গল গল করে র*ক্ত বেরিয়ে এলো।
স্পেশাল ফোর্স চেয়ারম্যানকে ধরে সরিয়ে নিলো। তিনি যন্ত্র*ণায় কাঁ*ত*ড়াচ্ছেন। নির্ঝরও নিজের শরীরের সব শক্তি হারিয়ে যেই না মাটিতে পড়ে যেতে নিবে সারফারাজ, তেজ ও অনু তিনজনই একসাথে এগিয়ে এসে ধরে ফেললো নির্ঝরকে। অনু কাঁদতে কাঁদতে বললো……

—”না, না, এমনটা হতে পারে না। নির্ঝর! আপনি স্বা*র্থ*পরের মতো একা একা চলে যেতে পারেন না। খবরদার চোখ বন্ধ করবেন না!”
নির্ঝরের ঠোঁটজোরা মৃদুভাবে কাঁপছে। হয়তো কিছু বলতে চাইছে কিন্তু আর পারছে না সে। সারফারাজ নির্ঝরের পেটের ক্ষ*তস্থান হালকাহাতে চেপে ধরলো। ছুঁ*রিটা সেখানে এখনও বসানো আছে। পেট থেকে অবিরাম ভাবে র*ক্ত বের হচ্ছে। তেজ বললো…..
—”নির্ঝর, এই ভাই! এ তুই কি করলি! কেনো এমনটা করলি! একটু ধৈর্য রাখলে তোর জন্য পরিস্থিতিটা এতোটা জটিল হতো না।”
সারফারাজ এক মুহূর্ত দেরি না করে নির্ঝরকে পাঁজাকোলা করে তুলে নিলো। রক্তে ভিজে গেলো ওর নিজের পান্ঞ্জাবিটাও। সারফারাজ দৌঁড়াতে দৌঁড়াতেই কাঁপা গলায় বললো…

—”ভাই! আমার ভাই! কিচ্ছু হবে না তোর। শুনছিস তুই? তোর বড় ভাইয়া তোকে বাঁচিয়ে নিবে।”
নির্ঝরের চোখ বুঁজে আসছে ধীরে ধীরে। তেজ আর অনু ছুটে আসছে সারফারাজের পিছন পিছন। আইজিপি আরতার ফোর্স সেখানেই থেকে চেয়ারম্যান সহ তার সব লোকদের গ্রে*প্তার করে গাড়িতে ভরছেন। কিছুজনকে দায়িত্ব দিয়েছেন চেয়ারম্যানের পুরো বাড়ি চিরুনি তল্লাশি চালাতে। কোনো ধরনের অনৈতিক কাজের প্রমাণ পেলে চেয়ারম্যানকে শক্ত-পোক্ত ভাবে শা*স্তি দেওয়ার রাস্তা আরো সহজ হবে তাদের জন্য।
সারফারাজ গাড়ির দিকে ছুটতে ছুটতে জোড় গলায় বললো….
—”চোখ খোলা রাখ ভাই। শ্বাস ধরে রাখ! আজ তুইএভাবে মরলে তোকে কোনোদিন মাফ করবো না আমি!”
পিছন পিছন আসতে থাকা তেজের চোখও ভিজে গিয়েছে। অনু তো বেসামাল ভাবে কাঁদছেই। সারফারাজেরও ভিতরটা ভে*ঙে আসছে। যার প্রমাণ ওর দু’চোখ দিচ্ছে। যা র*ক্তের ন্যায় লাল বর্ণ ধারণ করে আছে। যেনো কান্নার বদলে ঝরবে সরাসরি র*ক্তই। সারফারাজ বললো…..

—”বাঁচবি তুই! দীর্ঘদিন বাঁচতে হবে তোকে। তোর অনুকে পেতে চাস না? তাহলে বাঁচতে হবে তো তাই না!”
গাড়ির কাছে আসতেই সেখানে থাকা ড্রাইভার দরজা খুলে দিলো। অনু আগে ভিতরে বসলো। আর নির্ঝরকে অনুর কোলে মাথাটা রেখে শুইয়ে দিলো সারফারাজ। তারপর গাড়ির দরজাটা লাগিয়ে দিয়ে সারফারাজ বললো….
—”গাড়ি আমি ড্রাইভ করবো। তেজ বসে পর। আমাদের জলদী শহরে ফিরতে হবে। নির্ঝরকে হাসপাতালে ভর্তি করাতে হবে। আমার ভাইটাকে এভাবে ম*র*তে দিবো না আমি। কিছুতেই না।”
অতঃপর তেজ আর সারফারাজ বসে পড়লো গাড়িতে। সারফারাজের নিয়ন্ত্রনে থাকা গার্ডসরাও নিজ নিজ গাড়িতে বসে পড়েছে। সারফারাজ গাড়ি স্টার্ট করলো। নির্ঝর অনেক কষ্ট করে চোখ খুলে মায়াভরা দৃষ্টিতে তাকালো অনুর দিকে। অনুর চোখ থেকে টপটপ করে পানি পড়ছে যা নির্ঝরের চোখে-মুখে এসে লাগছে। সারফারাজ বললো…..
—”অনু! নির্ঝরের গালে আলতো করে করে বা*রি মে*রো। ওকে চোখ বন্ধ করতে দেওয়া যাবে না কোনো ভাবেই।”
অনু কেবল মাথা নাড়লো। বোঝালো সে চেষ্টা করবে। নির্ঝর খুব আস্তে ঠোঁটের ফাঁ*ক গলিয়ে বললো…..

—”কাঁদবেন না অনু। আপনার কান্না আমার বুকের ব্য*থা বাড়িয়ে দেয়।”
অনু আরো ফুঁপিয়ে উঠলো তা শুনে। পরপরই নির্ঝরের সর্বশরীর খানিক কেঁপে উঠলো। আবারও বেড়িয়ে এলো মুখভর্তি র*ক্ত। নির্ঝর এবার নিস্তেজ হয়ে গেলো পুরোপুরি। অনু নির্ঝরের গালে আলতো করে করে বা*রি দিচ্ছে। নির্ঝর কোনো রেসপন্স করছে না। অনু পা*গ*লের ন্যায় বললো….

না চাইলেও তুমি শুধু আমারই পর্ব ৪১

—”না, না, নির্ঝর আপনি এমন ভাবে চলে যেতে পারেন না। আপনার সাথে আমার অনেক কথা আছে। অনেক কিছু জানার আছে আপনার থেকে। আপনি এভাবে আমাকে ফেলে যেতে পারেন না। আমি আরো একবার আমার জন্য আমার প্রিয় কাউকে ম*রতে দেখতে পারবো না।”
সারফারাজ ওর সম্পূর্ণ দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে ফুল স্পিডে গাড়ি চালাচ্ছে। গ্রামের রাস্তা শেষ করে গাড়ি শহরের মেইন রাস্তায় উঠে গিয়েছে। তেজ কেবল মনে মনে আল্লাহকে স্মরণ করছে।

না চাইলেও তুমি শুধু আমারই পর্ব ৪৩