প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ১৮
ইনান হাওলাদার
ঢাকা হতে রাজশাহীর দূরত্ব প্রায় ২৫০ কিলোমিটার।হাই ওয়ে হয়ে যেতে প্রায় ছয় থেকে সাত ঘণ্টা সময় লাগে। আর যেহেতু আজকেই গায়ে হলুদের অনুষ্ঠান তাই চৌধুরী বাড়ির সদস্যরা সকাল সকাল বেরিয়ে পড়েছে।প্রথম গাড়িতে আছেন আসলাম চৌধুরী ও বাড়ির তিন গিন্নি।আর দ্বিতীয় গাড়িতে তূর্য ও বাকি চার বিচ্ছু।
আহি ,তাহি আর প্রান্ত পিছনের সিটে বসে দু’ষ্টুমি করে যাচ্ছে ।কিন্তু শান্ত সামনে বসায় সবকিছু মিস করছে।আর মনে মনে আহিকে ইচ্ছামতো বক’ছে।সামনে বসার কথা ছিল আহির, তবে সে কায়দা করে শান্তকে বসিয়ে দিয়েছে।সে কিছুতেই তূর্যের পাশের সিটে বসতে চায় না। ইচ্ছা ছিল তূর্য যে গাড়িতে যাবে সেই গাড়িতেই যাবে না।কিন্তু ভাই – বোনেরা সব এই গাড়িতে ওঠায় সেও উঠেছে।
অনেক দূরের রাস্তা হওয়ায় আহি সাথে করে একটা উপন্যাসের বই নিয়ে এসেছে, গাড়ির মধ্যে পড়ার জন্য।কিন্তু সেটা ভুলে সে দু’ষ্টুমিতে মেতে আছে।হঠাৎ মনে পড়ায় ব্যাগ হতে বই বের করে পড়া আরম্ভ করলো।এসব উপন্যাসের বইটই সে জীবনেও পড়েনি।এটাই প্রথম।তবে হ্যাঁ,একাডেমিক বইয়ে দুই একটা পড়েছে এই যা।
উপন্যাস সম্পর্কে তার তেমন কোনো ধারণাও নেয়।তবে নামটা দেখে রোমান্টিক ,রোমান্টিক মনে হচ্ছে।প্রথম কয়েকটা পৃষ্ঠা দায় সারা ভাবে পড়লেও ধীরে ধীরে ইন্টারেস্ট বাড়ছে তার।
এভাবে অনেকক্ষণ পড়ার পর একটা ক্লিপ এসেছে যেখানে গল্পের মেইন চরিত্রে যে আছে, মানে নায়কা ও তার বন্ধুরা
মিলে আইসক্রিম খাচ্ছে।এখন তারও খেতে মন চাইছে।কিন্তু তূর্য ভাইকে বললে তো লা’থি মে’রে গাড়ি থেকে বের করে দিবে। তবে বলতে তো হবেই !সে মনে মনে কথা সাজিয়ে বলল,
” তূর্য ভাই,তাহি আইসক্রিম খাবে ”
” তাহি খাবে নাকি তুই খাবি?”তূর্য একবার গাড়ির সামনে থাকা লুকিং গ্লাসে আহিকে দেখে নিলো তারপর কথাটা বলল।
” না না..! আমি কেনো খেতে যাব! তাহি খাবে।তাই না তাহি?”বলে তাহির দিকে তাঁকাতেই দেখতে পেলো সে ঘুমিয়ে আছে। সে কেবলা মার্কা হাসি দিয়ে তাহিকে খোঁ’চা দিয়ে বলল,
“খাবে কথাটা বলেই ঘুমিয়ে গিয়েছে।তাহি ওঠ না! ”
কিছুক্ষণ পর একটা আইসক্রিমের দোকান সামনে করে গাড়ি পার্ক করলো তূর্য।পকেট হতে ওয়ালেট বের করে শান্তর কাছে কিছু টাকা দিয়ে বলল,
” চারটা আইসক্রিম নিয়ে আয়।পারবি?”
” হ্যাঁ ,ভাইয়া ”
বলে গাড়ি হতে বের হলো শান্ত।
” বি কেয়ারফুল !”
” ওকেই ”
শান্ত বের হওয়ার পরপর আহি ও গাড়ি থেকে নামল।এবার আর পিছনে বসা যাবে না।তাহলে তাহি আইসক্রিম দিয়ে তার জামা ন’ষ্ট করে দেবে নিশ্চিত।সে গিয়ে তূর্যের পাশের সিটে গিয়ে বসলো।তূর্য সেটা একবার আড়চোখে লক্ষ্য করে বাঁ’কা হাসলো।
শান্ত মিনিট দশেক পর চারটা কোন আইসক্রিম নিয়ে ফিরে এলো।ততক্ষণে তাহিও সজাগ হয়ে গিয়েছে। শান্ত আহিকে সামনে বসতে দেখে মনে মনে খুশি হলো ।এতক্ষণ ধরে পিছনে বসে ওরা খুব মজা করেছে।কিন্তু সে পারেনি।এবার তারা মজা করবে আর আহি বসে বসে আপ’সোস করবে।
তারা তিনজন তিনটা রেখে আরেকটা আহির দিকে
ধরলো। তবে সেটা আহি হাতে নেওয়ার আগেই তূর্য নিয়ে খোসা ছাড়াতে আরম্ভ করল।
” আরে আমাকে দিন,ভাইয়া।আমি ছাড়িয়ে নিবো ”
” কী দেবো তোকে? তুই না বললি খাবি না ?”
” মানে কী? সেটা তো এমনিই বলেছি।তাই বলে আপনি সবাইকে দিবেন ,আমাকে দিবেন না?”
তূর্য দুই পাশে মাথা নাড়ল।যার অর্থ দেবে না । কাহিনী করে আইসক্রিম কেনালো সে।আর এখন সে বাদে বাকি সবাই খাবে ! এটা কোনো কথা?
হঠাৎ কিছু একটা মাথায় আসতেই মুচকি হাসি দিলো আহি।খ’প করে তূর্যের হাতের আইসক্রিমটা কে’ড়ে নিয়ে মুখে পুরে দিলো।ঘটনার আক’স্মিকতায় তূর্য কিছু বুঝে ওঠার আগেই আইসক্রিম অর্ধেক শেষ। তবে এমন কিছুই যে ঘটবে সে সম্পর্কে অবগত ছিল সে। সে কি আইসক্রিম খায় নাকি? ই’ডিয়েট একটা ! তূর্য ডেস্কে থাকা টিস্যু বক্স থেকে একটা টিস্যু বের করে ভালো করে হাতটা মুছে পুনরায় গাড়ি স্টার্ট দিল।
তূর্য মুখে দেওয়ার আগেই যে আহি কাজটা হাসিল করতে পেরেছে এটা ভেবেই শান্তি লাগছে তার।তবে মুখে দিলেও কোনো স’মস্যা ছিল না ।শুধু ভাগের থেকে কিছুটা কমে যেত এই আর কি।
গ্রামের বুক চিরে দাঁড়িয়ে আছে তিন তলা এক বাড়ি। পুরোনো নির্মাণ হলেও, যত্নে-আদরে আজও ঝকঝকে নতুনের মতো। দেয়ালের রং মাঝে মাঝে খসে পড়লেও, মেরামতের ছোঁয়ায় যেন আবার প্রাণ ফিরে পেয়েছে। বাড়িটির সামনে বিস্তীর্ণ খোলা জায়গা—যেখানে দিনের আলো পড়ে যেন সোনালি আভা ছড়িয়ে দেয়।
আজ সেই আঙিনায় অন্য রকম আবহ। বিয়ের গান, মানুষের কোলাহল আর খুশির রঙে যেন চারদিক ভরে উঠেছে। রঙিন বাতি ঝুলে আছে ছাদের বারান্দা থেকে শুরু করে খোলা প্রান্তর অবধি। সাদা, লাল, হলুদ ফুলের মালায় মোড়া হয়েছে প্রবেশদ্বার। বাঁশের খুঁটিতে ঝোলানো রঙিন কাপড়গুলো বাতাসে দুলে যেন অতিথিদের আহ্বান জানাচ্ছে।
আঙিনার মাঝ বরাবর সাজানো হয়েছে মঞ্চ, সোনালি কাপড়ে মোড়ানো চেয়ার আর পেছনে ঝলমলে আলো। আশেপাশের গ্রাম থেকে মানুষজন আসতে শুরু করেছে। শিশুদের কোলাহল, যুবকদের ব্যস্ততা আর মহিলাদের হাসি-ঠাট্টায় পরিবেশ মুখর হয়ে উঠেছে।
পর পর দুটি গাড়ি এসে থামলো সজনিকুঞ্জের সামনে।গাড়ি দুটি থামতেই বাড়ির ভিতর থেকে হুড়মুড় করে বাচ্চারা বেরিয়ে এসেছে।গ্রামের রাস্তায় সাধারণত এমন গাড়ি প্রবেশ করতে দেখা যায় না।তাই এত কৌতূহল।বাচ্চাদের ভিড় ঠেলে বেরিয়ে এলেন পারভিন বেগমের ভাই,পলাশ মোল্যা এবং তার স্ত্রী সুমি বেগমসহ বাড়ির বাকি সদস্য।
পারভিন বেগম গাড়ি হতে বেরোনো মাত্রই পলাশ মোল্যা তাকে বুকে জড়িয়ে নিলেন।প্রায় পাঁচ বছর পর দুই ভাই বোনের দেখা।দুজনেই আবেগে ভাসলেন।এরপর একে একে সকলের সাথে কথা বার্তা সেরে বাড়ির ভিতরে প্রবেশ করলো সবাই।অন্দর মহলে আত্মীয় স্বজনদের আতিথেয়তার ব্যবস্থা করা হয়েছে।সেখানেই তাদের বসানো হলো।সবাই সেখানে বসলেও তূর্য টুকটাক কথা বার্তা সেরে সোজা ছাদরুমে চলে গিয়েছে।নানা বাড়িতে আসলেই এটা তার ফিক্সড রুম।এই যে এখন বাড়ি ভর্তি মেহমান একেক রুমে তিন চার জন বা তারও বেশি লোক থাকবে ।কিন্তু তার রুমে একটা মাছিও ঢুকতে পারবে না।
সে রুমে এসেই আগে গোসল সেরেছে।এখন একটা লম্বা ঘুমের প্রয়োজন তবে সেটা চিন্তা করাও পা’প।যে পরিমাণে কোলাহলের শব্দ ভেসে আসছে তাতে ঘুমের ‘ ঘ ‘ ও হবে না।তবুও সে রুমের সকল দরজা জানলা বন্ধ করে ঘুমোনোর চেষ্টা চালালো।
ছাদে দাঁড়িয়ে ইচ্ছা মতো মায়ের বকা খাচ্ছে আহি।একটু আগের ঘটনা:
গায়ে হলুদ দিতে কনের বাড়িতে যাচ্ছিল সবাই।আহিও সুন্দর একটা শাড়ি নিয়ে বড় মায়ের কাছ থেকে পরে এসেছে।সবার আগে গিয়ে গাড়িতেও বসেছে।কিন্তু হঠাৎ বর অর্থাৎ আদিলের মামাতো বোন শবনম লক্ষ্য করলো আহি চুলের সাথে কোনো ফুল দেয়নি। সেই কথা আহিকে জানাতেই সে দৌঁড়ে রুমে আসে।হাতের কাছে কাউকে না পেয়ে একা একা সেট করতে অনেকটা দেরি হয়ে যায়।ততক্ষণে গাড়ি বেরিয়ে পড়েছে।
এখন সেটা নিয়েই নাকে কান্না করছে সে।যার ফলস্বরূপ মারুফা বেগমের ব’কুনি খাচ্ছে।এত বকা তার আর স’হ্য হচ্ছে না।তাই নাক ফুলিয়ে ছাদ হতে নেমে গেল সে।
এদিকে একটু খানি ঘুমোনোর জন্য তূর্য যে এত প্রস্তুতি নিলো ,সেটা এই মা – মেয়ের জন্য বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না।এমনিতেই তার ঘুম পাতলা।তার উপর মারুফা বেগমের চেঁ’চামেচিতে ঘুম একদম ভে’ঙে গেছে ।উঠে বসে উস্খ-খুস্কো চুলগুলো তুই হাতে ব্যাক ব্রাশ করে নিল।তারপর ল্যাগেজ হতে একটা টিশার্ট বের করে উন্মুক্ত গায়ে জড়িয়ে নিল।দরজা খুলে ছাদে প্রবেশ করলো। মারুফা বেগম নিচে নামছিলেন তূর্যকে দেখে পা থামিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
” কফি খাবি,আব্বা ?”
” হ্যাঁ! বাট কী হয়েছে?চেঁ’চামেচি করছিলেন কেন?”
” কী আর হবে বাবা।গায়ে হলুদ দিতে সবাই কনের বাড়িতে গিয়েছে।উনি সাজুগুজু শেষ করতে পারেননি।আর সব গাড়িও চলে গিয়েছে।এখন বসে বসে নাকে কান্না করছে ”
” তূর্য ? আব্বা ! তুই একটু আহিকে নিয়ে যা ,আব্বা।কা’ন্না করছে খুব ” পারভীন বেগম ছাদের শেষ দুটো সিঁড়ি বেয়ে উঠতে উঠতে বললেন।তূর্য হ্যাঁ বা না কিছু বলার আগেই মারুফা বেগমকে নিয়ে আবার চলে গেলেন তিনি ।আর বললেন,
” আহিকে গেটের সামনে অপেক্ষা করতে বলছি। আর কফিও পাঠিয়ে দিচ্ছি ।খেয়ে রেডি হয়ে আয় ।”
তূর্য মায়ের যাওয়ার পানে তাঁকিয়ে শুধু ফুস করে একটা নিশ্বাস ছাড়লো।সবাই শুধু ওই স্টু’পিডটার দিকই দেখে। তার অবস্থা একবার ভেবে দেখে না।কিছুক্ষণ পর রেডি হয়ে
বাড়ির বাইরে যেতেই আহিকে দেখতে পেল। গোল্ডেন পাড়ে মিন্ট গ্রিন রঙের শাড়ি পড়ে উল্টো দিকে ফিরে দাঁড়িয়ে আছে।হাঁটু ছুঁই ছুঁই লম্বা চুলগুলো বাতাসে দুলছে ।যেন পরিপূর্ণ এক নারী। পিছন থেকে দেখে তূর্যের চিনতে একটু সময় লেগেছে বটে।বড় হওয়ার পর এই প্রথমই তাকে শাড়িতে দেখছে কিনা! সময় তো একটু লাগাই উচিত!
এই মেয়ের ভেতর যে পুরোটাই বাচ্চামোতে ভরা সেটা এখন দেখে বোঝার উপায় নেয়।
” শাড়ি পরেছিস কেন?”
গ’ম্ভীর কন্ঠস্বর শুনে পিছন দিকে ফিরল সে।হাসি হাসি মুখ করে বলল,
” আল্লাহ! সবাই পরেছে আমি পরব না ?”
” সবাই যেটা করবে তোরও সেটা করতে হবে ? ”
আহি একবার তূর্যকে ভালো করে দেখে নিলো ।সাদা পাঞ্জাবি পায়জামা পরেছে।হাতে কালো রঙের এক্সপেন্সিভ ওয়াচ ।জেল দিয়ে চুলগুলো পরিপাটি করা। মোবাইলখানা মনে হয় পাঞ্জাবির পকেটে ।খুবই সুদর্শন দেখাচ্ছে।সে যে উপন্যাস পড়ছে সেই নায়কের বর্ণনার তুলনা যদি তূর্যের সাথে করে তাহলে হুবহু মিলে যাবে নিশ্চিত।
“ওসব ছাড়ুন। আপনাকে খুব সুন্দর লাগছে তূর্য ভাই।আমাকে কেমন লাগছে ?”
” জ’ঘন্য !”
খুব উৎসাহ নিয়ে প্রশ্নটা করেছিল আহি।কিন্তু কাঙ্খিত উত্তর না পেয়ে মুখটা চুপসে গেল।শুধু শুধু খ’চ্চর লোকটার প্রশংসা করল। কোথায় ভেবেছিল সে এসেই বলবে ,
” আহি ,তোকে খুব সুন্দর লাগছে বোন ”
সেটা তো করলই না ! নিজে সেধে জিজ্ঞেস করার পরও অ’পমান করলো।
যাক গে ,ওনার কথায় কি আসে যায়! বাড়ি শুদ্ধু সবাই বলেছে সুন্দর লাগছে।তাতেই হবে !
” গাড়িতে ওঠ ,ফাস্ট ” কথাটা বলে
বড়বড় পা ফেলে গাড়িতে গিয়ে বসলো তূর্য।আহিও পিছন পিছন গেলো।যদিও শাড়ি পরে হাঁটতে একটু ক’ষ্ট হচ্ছে। সে গিয়ে ড্রাইভিং সিটের পাশের সিটে বসলো । বসা মাত্রই চুল হতে ফুলগুলো খুলে নিচে পড়ে গেল।যেই ফুলের জন্য এত কিছু সেই ফুলই খুলে গেল? সে ফুলগুলো তুলে একা একাই ঠিক করার চেষ্টা করে যাচ্ছে।এদিকে তূর্য গাড়ি স্টার্ট দিয়ে দিয়েছে।একেতো হচ্ছে না তার উপর ঝাঁকুনিতে মোটেও হচ্ছে না।সে মিনমিন করে বলল,
” তূর্য ভাই,গাড়িটা একটু থামান প্লীজ ”
গাড়ি থামালো তূর্য।তার চোখে মুখে বিরক্তির ছাপ স্পষ্ট।তবু কিচ্ছু বলল না।
প্রায় মিনিট দশেক ধরে একা একাই ঠিক করার চেষ্টা করে ব্যর্থ আহি।হাতটাও লেগে এসেছে।সে আবারো বলল,
” একটু লাগিয়ে দিবেন ?”
তূর্য প্রথমবারের মতো আহির পানে এক মুহুর্তের জন্য তাঁকালো ।চাহনিটা সর্বোচ্চ দুই সেকেন্ড স্থায়ী করে সে গ’ম্ভীর কন্ঠে বলল,
” পারি না ”
” আমি শিখিয়ে দিচ্ছি ” বলে আহি ফোন ঘেঁটে একটা ভিডিও বের করে তূর্যের সামনে ধরলো আর বলল,
” এটা দেখে দেখে লাগিয়ে দিন ”
” পারবো না ”
” দিন না,প্লীজ !” আহ্লাদি গলায় বলল আহি।আশ্চর্যভাবে তূর্য যেন গলে গেল।দুই মিনিটের ভিডিওটা একবার দেখে নিলো।তারপর বলল,
” দেখি, ওদিকে ঘোর ”
সিট বেল্ট খুলে খুশি মনে উল্টো দিক ঘুরে বসলো আহি।তূর্য নিজের আসন ছেড়ে তার দিকে এগিয়ে বসলো।অনেক ক’ষ্টে কোনো রকমে সেটাকে চুলের সাথে আটকালো ।পারফেক্ট না হলেও ,খারাপ হয়নি। ফুল লাগিয়ে নিজ আসনে আসতে না আসতেই আহি ফের বলল ,
” তূর্য ভাই,গলার হারের সাথে চুল আটকে গেছে।একটু ছাড়িয়ে দিন ”
” এত য’ন্ত্রণা না দিয়ে একেবারে মে’রে ফেল আমায় ” দাঁতে দাঁত পি’ষে বলল তূর্য।
” দিন প্লিজ ! আর কিচ্ছু বলব না ”
মন না চাইতেও এগিয়ে গেল তূর্য।আহি পিঠ হতে চুল সরিয়ে দিতেই তড়িৎ বেগে পুনরায় নিজ জায়গা ফিরে আসল সে।গাড়ি স্টার্ট দিয়ে বলল,
” পারবো না।”
” টান লাগছে শুধু । একটু ছাড়িয়ে দিন না !”
” এক কথা কয় বার বলা লাগে তোকে?”আর একটা কথা বললে বাড়ি ফেরত নিয়ে যাব,আহি”
সন্ধ্যা নামতেই উঠোন ভরা লণ্ঠনের আলো আর রঙিন লাইটের ঝলকানি গোটা পরিবেশটাকে যেন আলোকময় করে তুলেছে।সকালে যে বিরাট বড় প্যান্ডেল সাজানো হয়েছিল।তার একপাশে এখন নাচ গান করার জন্য সাজানো হয়েছে। কিছুক্ষণ পর থেকেই অনুষ্ঠান শুরু হবে। বাড়ির মেয়েরা মিলে সেখানে বসে হাতে মেহেদি পরছে।মেহেদী দেওয়ার দায়িত্বে আছে শবনম আর আহি।আহি বরাবরই ভালো মেহেদী ডিজাইন করতে পারে। বাম হাতের
এপিঠ – ওপিঠ নিজেই লাগিয়েছে।কিন্তু ডান হাত এখনো ফাঁকা।শবনমের হাত খালি হলেই সে বসবে।এতক্ষণ ধরে শবনম আর সে এক জায়গা বসেই হাত সাজাচ্ছিল।হঠাৎ মায়ের ডাক পড়ায় শবনম বাড়ির ভিতরে গিয়েছে।
আহি – শবনম দুজনেই মিশুক স্বভাবের হওয়ায় একদিন পার না হতেই দুজনের ভালো বন্ডিং হয়ে গেছে।
আহি বাড়ির পাশের এক পিচ্চির হাতে মেহেদি পরিয়ে দিচ্ছিল । দেওয়া শেষ হওয়ার মিনিটের ব্যবধানে মেহেদী নামের ছেলেটি,যে আদিলের মামাতো ভাই, তার সামনে এসে বসলো।নিজের হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
” এবার আমাকে লাগিয়ে দেও ”
আহি খিলখিল করে হাসি আরম্ভ করলো আর বলল,
” ছেলেরা মেহেদী পরে নাকি ?কেমন দেখা যাবে! ”
” আমি পরি।লাগিয়ে দেও তাড়াতাড়ি।কে আবার কোন কাজে ডাক দিবে ”
” আপনার নামই তো মেহেদী ,আবার মেহেদী পরার কি আছে? ”
” অত কথা না বলে দাও তো! বাই দ্যা ওয়ে,তোমার হাসিটা মাশাআল্লাহ ”
” থ্যাংক ইউ ”
” কী হচ্ছে এখানে ?”
আহি নিজের বাম হাতের উপর মেহেদীর ডান হাত নিয়ে কেবল একটা বৃত্ত আঁকতে শুরু করেছিল।কমপ্লিট করার আগেই গম্ভীর কণ্ঠস্বর ভেসে আসলো।
” মেহেদী ভাইয়াকে মেহেদী পরিয়ে দিচ্ছি, তূর্য ভাই ? ” বলে দাঁত বের করে হাসতে লাগলো আহি।তূর্য একপলক তার দিকে তাঁকিয়ে মেহেদীর পানে চোখ ঘুরিয়ে বলল,
” তোমার ফুফা তোমাকে খুঁজছেন ”
” জ্বি,ভাইয়া! মেহেদী পরেই যাচ্ছি। দুই মিনিট ! আহি দেও,দেও,দ্রুত দেও।ডাক পড়েছে”
” লিভ রাইট নাউ “খুবই ঝাঁ’ঝালো শোনালো কণ্ঠস্বর।
” একটু পর যাচ্ছে বললো তো ভাই… ” আহি কথাটা শেষ করার আগেই তূর্য তার হাতের কব্জি শ’ক্ত করে ধরে টানতে টানতে নিয়ে গেল। এদিকে মেহেদী আহাম্বকের ন্যায় বসে আছে।ঘটনার কিছুই তার বোধগম্য হলো না।শবনম এসে
তাকে এভাবে ‘ থ ‘ হয়ে বসে থাকতে দেখে বলল,
” মেহেদী ভাইয়া কি হয়েছে তোমার ?”
হুশে ফিরলো মেহেদী।সে বিড়বিড় করে বলল,
” কিছু না! ফুফা নাকি ডাকছেন।একবার দেখে আসি ”
বলে উঠে গেল সে।বাড়ির ভিতর যাওয়ার আগেই পলাশ মোল্যাকে দেখে তার দিকে এগিয়ে গিয়ে সে বলল,
” জ্বি,ফুফা বলুন !”
” কী বাজান ?”
” ডাকছিলেন নাকি !”
পলাশ মোল্যা কিছুক্ষণ ভেবে তারপর বললেন,
” ডেকেছিলাম? মনে হয় ডেকেছি!কি জন্যে ডেকেছিলাম এখন খেয়াল নেই বাবা।মনে পড়লে আবার ডাকব।অনেক ক’ষ্ট করেছ তুমি ।এখন যাও আনন্দ কর ”
সারা বাড়ি জুড়ে লাইটিং করায় বাড়ির পিছনের পুকুরঘাটটাও সেই আলোয় আলোকিত হয়েছে।তবে খুব বেশি আলোকিত নয়।দুর থেকে অ’ন্ধকার মনে হলেও কাছে আসলে সেটা অনেকটা পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে।পুকুরের ঘাট ইট দিয়ে বাঁধানো। বসার জায়গাও করা আছে।আপাতত সেখানে বসে অনবরত নাক টেনে যাচ্ছে আহি। তার দুই ঊরুর উপর তূর্যের দুই হাত চিৎ করে রাখা।মাটিতে হাঁটু গেড়ে বসে আহির কোলের উপর হাত রেখে বসে আছে সে।
” কী হলো ? দে ? খুব শখ মেহেদী দেওয়ার ?আমাকে লাগিয়ে দে !” গম্ভীর কণ্ঠের ধ’মক মিশ্রিত কথায় আহির কা’ন্নার বেগ যেন আরো বেড়ে গেল। তূর্য ক্র’ন্ধিত কন্ঠে ফের বলল,
” মে’রেছি তোকে? তাহলে কান্না করছিস কেন? আনসার মি?”
“এভাবে এত জো’রে কেউ টেনে আনে?বাড়ি যাব আমি!” হেঁচকি তুলতে তুলতে বলল আহি।
” যা ,আটকাচ্ছি তোকে ? ”
” তাহলে সামনে থেকে উঠুন ”
প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ১৭
আহির কথা মতো উঠে দাঁড়ালো তূর্য। চোখ ব’ন্ধ করে নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা চালালো। কিছুক্ষণ পর আহি চলে গিয়েছে বোধগম্য হতেই চোখ খুলে সিঁড়ির উপরে ধপ করে বসে দুই হাতে মাথার চুলগুলো খামচে ধরলো ।এভাবে কতক্ষণ বসে ছিল জানা নেয়।তবে অনেকটা সময় নিরিবিলি কাটিয়ে ফের বাড়ির ভিতরে প্রবেশ করলো সে।
