প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ১
ইনান হাওলাদার
” গার্লফ্রেন্ড না বউ আছে ! তোর সমস্যা?”
যাকে নিয়ে সমালোচনা করছিল হঠাৎ তার কন্ঠ শুনে তড়িৎ বেগে পিছনে ফিরে তাকালো আহি । লোকটা শক্ত মুখে তাঁকিয়ে আছে । এমনভাব যেন মাত্র কারো সাথে ঝগড়া করে গো হারা হেরে এসেছে।যদিও তার ভাব সবসময় এমনই থাকে।বিশেষ করে আহির ক্ষেত্রে।
একটু আগের ঘটনা :
২ মাস পরই আহিদের এইচ এস সি এক্সাম তাই আজ কলেজ থেকে বিদায় অনুষ্ঠানে আয়োজন করা হয়েছে।অনুষ্ঠান আরো ঘণ্টা খানেক আগে শেষ হলেও কোনো শিক্ষার্থীই ঘরে ফেরেনি। নিজেদের বন্ধু মহল নিয়ে আলাদা আলাদা আড্ডা দিচ্ছে।আহিরাও ৮ – ১০ বন্ধুবান্ধব মিলে আড্ডা দিচ্ছিল। তার মধ্য থেকে তারিনা নামের মেয়েটি, যে আহির বেস্ট ফ্রেন্ড, বলে উঠল,
” এই আহি? তোর ডক্টর কাজিন আছে না ? উনি বিয়ে করছেন না কেন ?”
” মনে হয় গার্লফ্রেন্ড আছে ! বাড়িতে বলতেও পারছে না আর বিয়ে করাও হচ্ছে না ” কথাটা বলে ঢোক গেলার আগেই পুরুষালি গম্ভীর কণ্ঠের আওয়াজ ভেসে আসলো
” গার্লফ্রেন্ড না বউ আছে । তোর সমস্যা ?”
সূর্য প্রায় ডুবিডুবি।আকাশ জুড়ে এখনো লালচে আভা বিদ্যমান।চৌধুরী বাড়ির তিন সদস্য ছাদে ক্রিকেট খেলছে । পরপর ৪ টা ইট একটার উপর একটা দিয়ে স্ট্যাপ বানিয়েছে।যার পিছনে দাঁড়িয়ে দুই হাত ক্যাচ ধরার মতো করে পিঠ কুঁজো করে রেখেছে পার্থিব চৌধুরী প্রান্ত । প্রান্ত না রেখে দুরন্ত রাখলেই ক্যারেক্টারের সাথে নামটা যুৎসই হতো।এইতো ব্যাট হাতে দাঁড়িয়ে বারবার ছাদের মেঝেতে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বাড়ি মারছে পঞ্চম শ্রেণীতে পড়ুয়া এক বালিকা তাহি ,তাবাসসুম চৌধুরী তাহি।চৌধুরী বাড়ির সবচেয়ে কনিষ্ঠা সদস্য। তারই সামনে দাঁড়িয়ে বল করার প্রস্তুতি নিচ্ছে সাফওয়ান চৌধুরী শান্ত।যার নাম শান্ত হলেও কাজ – কর্ম,কথা – বার্তা সবই অশান্ত।
মেয়েটা যতটা প্রস্তুতি নিয়ে ব্যাট হাতে দাঁড়িয়ে ছিল ঠিক ততটা অপ্রস্তুতি নিয়ে প্রথম বলেই কুপোকাত। পরপর সাজিয়ে রাখা ইটের মাঝের দুটি ইট বেঁকিয়ে স্ট্যাম্প ভেঙে যায় যায় অবস্থা।সাথে সাথে বাকি দুইজন একসাথে চিৎকার করে বলে উঠলো,
” আউট, আউট…”
” ভাইয়া,ভাইয়া,আরেকটা বল করো ,প্লীজ “মায়াভরা কন্ঠে আর্জি করলো তাহি
চৌধুরী বাড়ির তিন গিন্নি ড্রয়িং রুমের একপাশে মাদুর ফেলে শাক ছিঁড়ছেন আর নানা সাংসারিক আলাপ করছেন।বড় গিন্নি পারভিন আরা বেগম, মেজো গিন্নি মারুফা বেগম আর ছোট গিন্নি লতা বেগম। ছেলে – মেয়েদের হইহুল্লোড় শুনে থেকে থেকে গলা উঁচু করে ডাক ছাড়ছেন।কে শোনে কার কথা ! বিচ্ছু গুলো তো তাদের কাজে ব্যস্ত।
বাড়ির বড় কর্তা আকবর চৌধুরী যার দুই সন্তান তাশরীক চৌধুরী তূর্য আর তাহি, মেজো কর্তা আসলাম চৌধুরী,যার একমাত্র কন্যা আফহানা চৌধুরী আহি আর ছোট কর্তা আসিফ চৌধুরী ,যার দুই পুত্র শান্ত ও প্রান্ত যাদের বয়সের পার্থক্য মাত্র দুই বছর হলেও দেখে বোঝা মুশকিল।হঠাৎ কেউ দেখলে ভাববে তারা যমজ।
কলেজ গেটের একপাশে পার্কিং করে রাখা ব্লাক কার।যদিও এই গাড়িতে ওঠার সৌভাগ্য এখনো চৌধুরী বাড়ির কারোই হয়নি। হাঁটার গতি কিছুটা দৌঁড়ের মতো করে এগিয়ে যাচ্ছে আহি।তার পিছন পিছন এক হাত পকেটে গুঁজে আরেক হাতে মোবাইল ধরে কথা বলতে বলতে সাহেবী কায়দায় হেঁটে আসছে দ্যা গ্রেট তাশরীক তূর্য ।
” কোথায় ওঠার চিন্তা – ভাবনা করছিস তুই ?”
মাত্র গাড়ির দরজা খোলার জন্য হাত বাড়িয়েছিল আহি।তখনই কথাটা বলল তূর্য।
” কেন? বাড়িতে যাবো না ?”
“তোর কি মনে হয়, এই বেশে তোকে আমি গাড়িতে উঠতে দেবো ? নিজের দিকে একবার তাঁকা”
আহি একবার নিজের পা থেকে মাথা অব্দি দেখে ঠোঁট গোল করে ছোট করে একটা শ্বাস ছেড়ে মনে মনে বলল,
” যেই লোক সদ্য গোসল সেরে আসলেও গাড়িতে উঠতে দেয় না ,সেই লোক কি আর আবিরসহ গাড়িতে তুলবে ? এমন ভাব করে যেন পৃথিবীতে একটাই গাড়ি আছে আর যেটা ওনার ।ছোটলোক কোথাকার ! ”
আহির নানান ভাবনার মাঝে তূর্য একটা রিক্সা ডেকে তাকে উঠতে বলে নিজে গাড়িতে বসে স্টার্ট দিল।যতটা সম্ভব রিক্সার সাথে তাল মিলিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে।আহি রিক্সার ভিতর থেকে ঘনঘন মাথা বার করে দেখছে তার বন্ধু – বান্ধব কেউ আবার দেখে নিলো না তো ?
কত বড় অপমান ! ভাই গাড়ি নিয়ে এসেছে অথচ বোনকে রিক্সায় করে বাড়ি পাঠাচ্ছে । সেটা যদি ওরা দেখে নেয় তাহলে ? এতদিন বলে এসেছে আমার চাচারা আমাকে আমার আব্বুর থেকে বেশি আদর করে , চাচিরা মায়ের থেকেও বেশি ভালোবাসে আর তূর্য ভাই , সেতো পুরো আপন বোনের নজরে দেখে ,তাহির থেকেও তাকে বেশি ভালোবাসে । কিন্তু তূর্য যে তাকে দেখলেই বকতে থাকে ,বারবার মারার ভয় দেখায় , প্রতিটা কথার শেষে বে’য়া’দ’ব ট্যাগ লাগিয়ে দেয় ,সে কথা যদি ওরা জানতে পারে তাহলে কিভাবে মুখ দেখাবে আহি?আর ওরা ভাববে সে এতদিন চাপা মেরে এসেছে।
সে তো মিথ্যা বলেনি! তূর্য ছাড়া সবাই ওকে মাথায় করে রাখে।সময় সময় শান্ত আর প্রান্তের সাথে ঝগড়া – মারামারি লেগে যায় কিন্তু ওরাও আহিকে ভালোবাসে ।তূর্য ব্যতীত সবাই তাকে ভালোবাসে।
জানালার থাই গ্লাস টেনে ,এসি অন করে,রেগুলেটর ঘুরিয়ে আস্তে করে ফ্যান ছেড়ে রুমের দরজাটা ভেজিয়ে দিয়ে খুব সুন্দর একটা পরিবেশ তৈরি করে পড়তে বসেছে আহি ।পারলে ঘরটাকে সাইলেন্ট মুডে করে নিতো ।কেনোনা তার কাছে পড়তে বসার আগে পড়ার স্থান নিরিবিলি হওয়া দরকার ।যদি বিড়াল – কুকুরের মতো অন্ধকারেও আরামসে দেখতে পেতো তাহলে লাইটটাও অফ করে বসতো।
কিন্তু আফ’সোস এত সুন্দর পরিবেশ তৈরি করেও পড়ায় মন বসাতে পারছে নাহ।বইয়ে মুখ গুজে বসে আছে। অথচ,২ মাস পরই পরীক্ষা। তবু সে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
আধ ঘণ্টা ধরে একই পড়া পড়ছে তবু মাথায় ঢুকছে না।আবার যখন পড়তে মন চাইবে তখন একেকটা পড়া মুখস্ত করতে হাতে গোনা কয়েক মিনিট সময় লাগে।তখনই কেউ না কেউ এসে ডিস্টার্ব করে।অথচ,এখন কেউ আসছে না ।আর পড়া রেখে নিচে গেলেও মারুফা বেগম বকাঝকা করবেন। একটু ঘুরাঘুরি করলে যে মাইন্ড ফ্রেশ হয় এটা তিনি বোঝেন না ।
” আহি? রুমে আছিস?”
বড়মার ডাক পেয়ে ভাবনার ছেদ ঘটলো তার।সে দ্রুত বলে উঠলো,
” হ্যাঁ,বড়মা আছি ..আসুন ” সে তো মনে মনে চাইছিল কেউ আসুক আর তার পড়ায় ব্যা’ঘাত ঘটুক।
” তোকে বাড়িতে নামিয়ে তূর্য কোথায় গিয়েছে তোকে কিছু বলেছে ?” চি’ন্তিত কন্ঠস্বর পারভিন বেগমের।
” আপনার ছেলে আমাকে নামিয়ে দেননি বড়োমা ।রিক্সায় উঠিয়ে দিয়েছে ” মুখ গোমড়া করে বললো আহি।
বাড়ি ফিরে না হলেও ১০ বার এই একই কথা বলেছে । এবার পালা বড়ো আব্বুর কাছে বলার।কি কি বলবে মনে মনে সব সাজিয়ে নিয়েছে । বার বার একজন রেখে আরেক জনকে বলছিল দেখে শান্ত বলে উঠেছিল ” নালিশ করার জন্য আহিপু সেরা রেহ ”
” আচ্ছা ,মা।বাড়ি পর্যন্ত তো এসেছিল? তারপর কোথায় গেছে তার কিছু জানিস? তখন থেকে কল করছি ধরছে নাহ।”
” না, বড়োমা…
” দাঁড়া দাঁড়া … এইতো কল করেছে । হ্যালো,বাপ, কোথায় তুই ? ওওও আচ্ছা । ফিরবি কখন ? ঠিক আছে ,আব্বা ” পারভিন বেগম কথা শেষ করা মাত্রই আহি বললো,
” বড়ো মা ,আপনার ছেলে তো হার্টের ডক্টর । ওনাকে বলবেন তার হার্টটা ফুটো করে একটু মধু,চিনি,রসগোল্লা,রসমালাই তারপর জিলেপি ঢুকিয়ে নিতে যাতে ঠোঁট দিয়ে একটু মিষ্টি মিষ্টি কথা বেরোয় ”
আহির কথা শুনে পারভিন বেগম হাসতে হাসতে বলতে লাগলেন ,
” সবাই কি আর এক রকম স্বভাবের হয় ? আর সবার মধ্যে কি আর সব গুণ থেকে ?”
আহি একটু ভাব নিয়ে গর্ব করার ভঙ্গিতে বলতে আরম্ভ করলো,
” কেন, বড়ো মা? আমাকে দেখুন তো ,আমার মধ্যে তো সবগুন ই আছে ।আমি….
” হ্যালো,আম্মু শুনতে পাচ্ছো ?” ফোনের ওপাশ থেকে তুর্যের কন্ঠ শুনে এক লাফ দিয়ে চেয়ার থেকে দাঁড়িয়ে পড়েছে আহি। ভ’য়ে গলা শুকিয়ে গেছে। তাহলে তূর্য ভাই কল কাটেননি । সব শুনে ফেলেছে? এইবার আর আর র’ক্ষে নেই তার।পারভিন বেগম ফোন কানে ধরলেন ,তিনিও বুঝতে পারেননি যে তূর্য এখনো কল কা’টেনি।নরম কন্ঠে ডাক ছুঁড়লেন তিনি,
” আব্বা…” কেবল আহির পক্ষে সুপারিশ করবেন তার আগেই তূর্যের রাশভারী কন্ঠস্বর ভেসে আসলো,
” লাউড স্পিকারে দেও ” ছেলের কথা মত তিনি স্পিকার লেখা জায়গা চাপ দিলেন । ফের জিজ্ঞেস করলো তূর্য,
” দিয়েছো ?”
” হ,বাপ।মেয়েটাকে কিছু ..”
এবারেও পারভিন বেগম কথা শেষ করতে পারলেন না।ওপাশ থেকে গ’ম্ভীর কন্ঠটা চি’বিয়ে চি’বিয়ে বলতে আরম্ভ করলো,
” বাড়ি ফিরে হা’র্ট ফুটো করে গোটা তোকেই ঢুকিয়ে নিবো। রেইডি হ্ ”
