প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ৪৬
ইনান হাওলাদার
” হোয়াট হ্যাপেনড? ”
সিঁড়ির শেষ ধাপ অতিক্রম করে নামতে নামতে পারভিন বেগমের দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাঁকিয়ে প্রশ্নটা করলো তূর্য।
আসিফ চৌধুরী বললেন,
” কখন থেকে মেজো ভাইজান তোকে ডাকছে।দেখে তো কি হয়েছে।আমি তাহলে এখন আসছি ” বলে তাড়াহুড়ো করে বেরিয়ে গেলেন আসিফ চৌধুরী। জরুরী মিটিং আছে তার।এমনিতেই অনেকটা দেরি হয়ে গেছে।আরেকটু অপেক্ষা করলে আরো দেরি হয়ে যাবে।
বাড়ির প্রতিটা সদস্য ড্রয়িং রুমে এলো-মেলো ভাবে দাঁড়িয়ে আছে। আসলাম চৌধুরীর রা’গের কারণ এখনো পর্যন্ত কেউ জানে না।তূর্য যখন বাড়ি ফিরেছে তিনি ড্রয়িং রুমে বসে চা পান করছিলেন।ওকে দেখে কিছু বলার জন্য উদ্যত হলে তূর্য বলে,
” ফ্রেশ হয়ে আসছি ”
কিন্তু আসলাম চৌধুরী মানেন না।তিনি মোবাইল হাতে তূর্যের সামনে আসেন।এবং গোটা কয়েক পিকচার দেখান।যেখানে তূর্য – আহির একসঙ্গে স্পষ্ট কিছু ছবি।কোনো একটা রেস্টুরেন্টের ছাদে তোলা ছবি গুলো।রাতের পরিবেশ হলেও আলোকসজ্জার দরুন চারপাশটা পরিষ্কার,জ্বলজ্বল ।
একটা ছবিতে দেখাচ্ছে, তূর্য আহির গাল আঁজলা করে ধরে কিছু একটা বোঝাচ্ছে বা বলছে।আরেকটা, একে অপরকে জড়িয়ে রেখেছে।এবং অন্যটা তূর্য আহির গালে চু’মু খাচ্ছে।ছবি গুলো খুব কাছ থেকে না তুললে এতটা স্পষ্ট আসার কথা নয়। তূর্য মনোযোগ সহকারে চাচার দেখানো ছবিগুলো দেখে তারপর পুনরায় বলে,
” ফ্রেশ হয়ে আসছি ”
আসলাম চৌধুরী ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থেকে রা’গে ফুঁ’সতে থাকেন।অতিরিক্ত রে’গে গেলে ওনার মাথা ঠিক থাকে না।কখনো কথা জড়িয়ে ফেলেন ,তো কখনো উল্টো-পাল্টা লজিক টেনে আনেন। আবার কখনো কখনো কথা-ই বলতে পারেন না।
তূর্য চলে যাওয়ার পর তিনি দম ধরে বসে থাকেন ওর অপেক্ষায়।কিন্তু এতক্ষন পার হওয়ার পরও না আসায় চেঁ’চামেচি শুরু করে দেন। এখন আবার এসে তূর্যের এমন গা ছাড়া প্রশ্ন শুনে মে’জাজ আরো চো’টে গেল তার। গ’র্জে উঠে বললেন,
” কি হয়েছেন তুমি বুঝছো না? কখন নিচে আসার কথা ছিল তোমার?”
” আপনার মেয়ের জন্যে লেইট হয়ে গেছে।বলুন কি বলবেন ” কথাটা বলে সোফায় বসলো তূর্য।তারপর মাকে বলল,
” আম্মু এক কাপ কফি…. ”
পারভিন বেগম বি’রক্তি নিয়ে চেঁ’চিয়ে উঠলেন,
” কি শুরু করেছিস দুই চাচা-ভাতিজা? এতক্ষণ ধরে তোর চাচা সমানে চেঁ’চিয়ে যাচ্ছে।কেনো চেঁ’চাচ্ছে কিচ্ছু বলে না।
‘ তোমার ছেলে আসুক ‘ ‘ ছেলেকে ডাকো,ভাবি ‘ করেছে।
এখন তুই ভাত খাওয়ার সময় এসে কফি চাচ্ছিস? ”
” কফি খেতে খেতে বলছি। চাচ্চু আপনার জন্যে চা দিতে বলবো ?” বলে আসলাম চৌধুরীর দিকে তাঁকালো সে।
তার এমন ভাবলেশহীন কান্ড কারখানা দেখে গা-পিত্তি জ্ব’লে যাচ্ছে আসলাম চৌধুরীর।অতিরিক্ত রে’গে যাওয়ার ফলে থরথর করে শরীর কাঁ’পছে।তিনি ধপ করে তূর্যের বিপরীত প্রান্তের সোফায় বসে পড়লেন। রা’গের তোপে মুখ খুলতে পারছেন না।
পারভিন বেগম সত্যি সত্যি দুইজনের জন্যে চা আর কফি করে নিয়ে আসলেন।তাদের মাঝখানে থাকা টি-টেবিলের উপর ট্রেসহ রাখলেন।তূর্য কফির মগ তুলে নিয়ে সাবলীল গলায় বলল,
” গত পরশুর পিকচার ওগুলো ”
” কবের ছবি আমি জানতে চাইনি। এগুলো সত্যি কিনা বলো ”
” বললাম তো গত পরশুর পিকচার ”
” আহির মা,তোমার মেয়েকে ডাকো ” তূর্যের দিকে র’ক্তিম চোখে তাঁকিয়ে থেকে বললেন আসলাম চৌধুরী।বাড়ির তিন গিন্নি এখন বুঝলেন বিষয়টা কি।
অবশেষে সেই মুহূর্ত চলেই আসলো।তিন জা অসহায় চোখে এক অপরের দিকে চাওয়া চাওয়ি করলেন। তাহি ,
শান্ত – প্রান্তকে খোচ্চাচ্ছে বিষয়টা কি বোঝার জন্যে।শান্ত – প্রান্ত নিজেরাই বুঝছে না ওকে কি বোঝাবে! তারা চোখের ইশারায় চুপ থাকতে বলল তাহিকে। তাহিও ভদ্র মেয়ের মতো চুপ হয়ে গেল।
তূর্য গ’ম্ভীর গলায় বলল,
” বিয়ে করতে চাই আপনার মেয়েকে ”
সাথে সাথে বাড়ির ছোট তিনটার হাত আপনা – আপনি মুখে চলে গেল।মুখ ঢেকে চোখ বড় বড় করে তাঁকিয়ে সবার ভাব বুঝছে।তাদের ধারণা তূর্য ভাইয়া নিশ্চয় মজা করছে।
” বিয়ে করতে চাও মানে? তুমি বললে বললে আর আমি আমার মেয়েকে তোমার হাতে তুলে দিবো? এসব কথা ভাবলে কিভাবে তুমি? আমার সামনে কিভাবে জোর গলায় বলছো আমার মেয়েকে বিয়ে করবে?আমি তো এটাই বুঝতে পারছি না। বুকে একটু ভ’য় নেই? নিজের বোনকে বিয়ে করবে বলতে ল’জ্জা করছে না তোমার, বে’য়াদব ছেলে ? ”
” এখানে ভ’য় করার মতো আমি কিছুই দেখছি না। আর ল’জ্জাই বা পাওয়া পাবো কেন? আপনার মেয়ে প্রেগনেন্ট ?নাকি আমি এ জাতীয় কিছু করেছি ওর সাথে? ”
” তুমি মুখপোড়া,ঘরকুনো ,অসামাজিক জানতাম ।কিন্তু এরকম নি’র্লজ্জ ,বে’য়াদব জানতাম না ”
” কোনো বে’য়াদবি এখনো করিনি চাচ্চু। আই হোপ ,বাধ্য করবেন না ”
” ভাবি তুমি এখনো চুপ থাকবে? তোমার ছেলেকে কিছু বলবে না?”
” তোমার মেয়ে দিতে কি সমস্যা ভাই? আমার ছেলে আহিকে খারাপ রাখবে না। আর আহির জন্যে তোমরা কেমন ছেলে চাও বলো? উচ্চ বংশ,উচ্চশিক্ষিত, সুদর্শন,ভালো পেশা, এগুলোই তো চাও? তাহলে আমার ছেলে কোন দিক দিয়ে কম ? ”
” ভাবি!চুপ করো তুমি । তুমিও ছেলের কথায় নাচছো ? ওদের বয়সের তফাৎ,চারপাশের মানুষ কি বলবে এসব কিছু তোমার মাথায় আসছে না ?”
” আই ফা’ক ইউওর এজ ডিসটেন্স, আই ফা’ক ইউওর সোসাইটি!”
” এই ছেলে ভাষা ঠিক করো ”
তূর্য রেগে গিয়ে আরো কিছু বলবে তার মধ্যেই পারভিন বেগম দৌঁড় ছেলের কাছে গেলেন।পিঠে হাত বুলিয়ে বললেন,
” শান্ত হ ,আব্বা।এভাবে উত্তেজিত হোস না।চাচা রা’গ করছে একটু মুখ বুজে শোন।রাগ পড়লে আমরা এক সাথে বুঝিয়ে বলবো ”
” ভাবি কি বোঝাবে তুমি? ওরা ভাই-বোন হয়।ভুলে যাচ্ছ তুমি ?”
” বারবার ভাইবোন ভাইবোন করবেন না ,কানে লাগছে। ও আমার বোন না ”
” ভাই দেখো, ওরা একে অপরকে ভালোবাসে,পছন্দ করে ।তাহলে আমরা বাঁধা দিয়ে কি করতে পারি বলো।আমরা তো চাই আমাদের ছেলেমেয়ে ভালো থাকুক,খুশি থাকুক,সুখী থাকুক।ওরা দুজন দুজনার সাথে সুখী থাকলে আমাদের মেনে নিতে কি সমস্যা বলো ভাই?”
” তোমার সমস্যা না-ই থাকতে পারে আমার আছে । ভাবি তোমার ছেলের সাপোর্ট না টেনে ওকে বোঝাও।ভাইজানকে কল করো।বাড়ি আসতে বলো শিগগিরি। আর আহি কোথায়? ওকে ডাকো আহির মা ।”
মারুফা বেগম ঠাঁয় দাঁড়িয়ে রইলেন দেখে ধমকে উঠলেন আসলাম চৌধুরী,
” কথা কানে যাচ্ছে না তোমার? কখন থেকে মেয়েকে ডাকতে বলছি?”
মারুফা বেগম তবুও দাঁড়িয়ে রইলেন।আসলাম চৌধুরী আরেকদফা চেঁ’চিয়ে ওঠার আগেই নিচে নামলো আহি।মাথা নিচু করে ছোট ছোট পায়ে এসে দাঁড়ালো সবার মাঝে।এত এত শোরগোল শুনে সেই কখন ঘুম ভে’ঙেছে মেয়েটার।করিডোরে দাঁড়িয়ে থেকে এতক্ষণের সকল কথা শুনেছে সে।ভয়ে নিচে নামতে পারেনি।এখনো হাত পা কাঁপছে তার।মেঝেতে চোখ নিবদ্ধ করে দাঁড়িয়ে আছে।আসলাম চৌধুরী আহির উদ্দেশ্যে শান্ত গলায় বললেন,
” তূর্যকে পছন্দ করো তুমি ? ”
বাবার এমন প্রশ্ন আর গম্ভীর চেহারা দেখে পারভিন বেগমের পিছনে গিয়ে দাঁড়ালো আহি। সে কোনো উত্তর করার আগে ধ’মকে উঠলো তূর্য,
” তোকে নিচে নামতে কে বলেছে? যা এখান থেকে ”
” কে বলেছে মানে? আমি তখন থেকে বলছি শুনতে পাচ্ছো না তুমি? ” বলে মেয়ের দিকে তাঁকিয়ে ধারালো কন্ঠে আসলাম চৌধুরী বললেন,
“ওই ছেলেকে তুই বিয়ে করবি? ”
আহি এবারেও চুপ।ভ’য়ে গলা কাপছে তার।পিছন থেকে পারভিন বেগমের শাড়ীর আঁচল ধরে রেখেছে।ঘনঘন ঢোক গিলছে। তূর্য শান্ত কন্ঠে বললো,
” আহি উপরে যা তুই । আমার যেন দ্বিতীয়বার রিপিট করতে না হয় ”
আহি কারো কথা শুনলো না।না উপরে গেল আর না কোনো প্রশ্নের উত্তর দিলো।নিশ্চুপ হয়ে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে রইলো।
আসলাম চৌধুরী তূর্যের দিকে তাঁকিয়ে তাচ্ছিল্য গলায় বললেন,
” বারবার উপরে পাঠাতো চাইছো কেন ওকে? ভ’য় পাচ্ছো নাকি ? যদি ….”
তার কথা শেষ হওয়ার আগেই তূর্য আহির উদ্দেশ্যে বলল,
” সেইম কোশ্চেন আমি সেকেন্ড টাইম রিপিট করবো না। সো,ভেবেচিন্তে আন্সার করবি।ভালোবাসিস আমাকে?”
আহি একটু সময় নিয়ে ‘ হ্যাঁ ‘ সূচক উপর নিচ মাথা নাড়লো।তূর্য একবার বাঁকা চোখে আসলাম চৌধুরীর মুখের দিকে তাঁকালো। মুখটা পুরো শুকিয়ে গেছে তার।তূর্যের ঠোঁটে তার বিজয়ের হাসি।সে পুনরায় বলল,
” মুখে বল ”
” হ …হ্যাঁ ” কাঁপা কাঁপা গলায় বলল আহি।
” কেমন ভালোবাসা ? বিয়ে করতে পারবি ? ”
” হুমম ” বলে উপর নিচ মাথা দোলালো আহি। তূর্য পুনরায় আসলাম চৌধুরীর দিকে তাঁকালো।আহির দিকে চোখ দিয়ে ইশারা করে কিছু বলল।যার অর্থ ” দেখুন ”
আসলাম চৌধুরী নিজে আবারো একই প্রশ্ন করলেন মেয়েকে,
” তূ ..” তূর্যের নাম নিতে গিয়েও নিলেন না তিনি । বললেন,
“ওই ছেলেকে তুমি বিয়ে করতে চাও ? ”
” হ…হ্যাঁ আব..ব্বু ”
” খবরদার! আমাকে বাবা বলে ডাকবি না তুই। তোর মতো মেয়ের কোনো দরকার আমার নেই ”
আহি আহত দৃষ্টিতে বাবার মুখের দিকে তাঁকালো। দুই চোখ জলে টইটুম্বুর।পলক ফেলার সাথে সাথে সেগুলো গড়িয়ে পড়লো।তিনি পুনরায় বললেন,
” দুইটা অপশন তোর কাছে।এক. তূর্য আর দুই.এই পরিবার।কি চাস তুই? এটাই বাবা হিসাবে আমার শেষ কথা তোর সাথে। ওই ছেলেকে চাইলে আর কোনোদিন আমার চোখের সামনে আসার সাহস দেখবি না।আর এই বাড়ি ছেড়ে চিরতরে বেরিয়ে যাবি। ”
আহি অসহায় দৃষ্টিতে একবার বাবার দিকে তাঁকিয়ে তূর্যের দিকে তাঁকালো।দুজনের চোখেই আশার আলো।আসলাম চৌধুরী ভাবছেন মেয়ের উত্তর তার আশানুরূপ হবে।আর এদিকে তূর্য এক বুক আশা নিয়ে তাঁকিয়ে আছে।যার বিশ্বাস তার আহি শুধু পরিবার কেন? পুরো পৃথিবী ত্যাগ করে হলেও তাকে চাইবে।
তবে আহির চাহনি ভালো ঠেকলো না তূর্যের কাছে।ও কি ভাবছে কে জানে ! একবার যদি বলে দেয় ও ফ্যামিলি চায়,তাহলে? তূর্যের মনে ভয় জেঁকে ধরলো ।
সে আহিকে সাবধান করে বলল,
” যেটা বলবি ভেবে চিন্তে বলবি আহি। যদি ভেবে থাকিস উত্তর তোর বাপের ফেভারে দিবি।তারপর আমি তোর বাপের হাত-পা ধরে অনুরোধ করবো,কান্নাকাটি করবো।তাহলে ভুল ভাবছিস।এরকমটা কোনোদিন হবে না । তোকে ভুলে যেতে আমার দুই সেকেন্ডও লাগবে না।এবার জানা তুই কাকে চাস ,তোর বাপের ফ্যামিলিকে নাকি আমাকে?”
একটা দীর্ঘ সময় নিয়ে উত্তর আসলো আহির,
” ফ্যা….মিলিকে ! ”
তূর্যের হাত পা হঠাৎ করে অসাড় মনে হলো।হুট করেই মস্তিষ্ক শূন্য শূন্য লাগছে।খুব করে চাইছে পা নাড়িয়ে জায়গা ত্যাগ করতে।কিন্তু পা চালানোর কোনো শক্তি পাচ্ছে না।জোর করে অসাড় শরীরটাকে কয়েক কদম এগোনোর চেষ্টা করলো।অথচ সামনে এগোতে না পেরে আরো কয়েক কদম পিছিয়ে গেল। সোফার সাথে গিয়ে পা ঠেকলো।সে দুর্বলের ন্যায় সেখানে বসে পড়লো।কিছুক্ষন চোখ বন্ধ করে রেখে দুই হাতে মাথা চেপে ধরলো।নিজেকে ধাতস্থ করে কোনো রকমে ড্রয়িং রুম ত্যাগ করলো।
আসলাম চৌধুরী মেয়ের আচরণে খুবই সন্তুষ্ট।তিনি মেয়েকে বুকে জড়িয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন। আহি বাবার বুকের মধ্যে কান্না করে যাচ্ছে। কান্নার আওয়াজটা যেন বাইরে না আসে সেজন্যে মুখে চাদর চেপে রেখেছে।ইচ্ছা করছে নিজের মাথার চুল একটা একটা করে ছিঁড়তে।চারপাশের সবকিছু ভেঙে গুড়িয়ে দিতে।সে আসলাম চৌধুরীর বুক থেকে মাথা উঠিয়ে দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে নিজ কক্ষে চলে গেল।দরজা লাগিয়ে বিছানায় ভুট হয়ে পড়ে চিৎকার করে কান্না আরম্ভ করলো।
পারভিন বেগম তূর্যের অস্বাভাবিক হাবভাব দেখে তার পিছন পিছন ছুটেছে। আসতে আসতে গোটা ঘর এলোমেলো করে ফেলেছে ছেলে তার।রুমের ছোট ছোট যাবতীয় জিনিসপত্র মেঝেতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে ।তিনি সাবধানে পা ফেলে ফেলে তূর্যের কাছে গেলেন।ও দক্ষিণের জানালাটার গ্লাস সরিয়ে শূন্যে তাঁকিয়ে আছে। পারভিন বেগম কাছে যেতেই ঘুরে মাকে জড়িয়ে ধরলো।
ছেলে তার ছোট বেলা থেকেই কম কথা বলে, গম্ভীর প্রকৃতির।বাচ্চারা যে বয়সে একটু কিছু হলেই মা বাবার কাছে এসে বলতো,খোলা বই হতো,সেই বয়সে সে পুরো ম্যাচিউরদের ব্যবহার করতো।কোনো সমস্যা হচ্ছে বুঝতেন পারভিন বেগম।কিন্তু ছেলেকে জিজ্ঞেস করলে সে এড়িয়ে যেত।আর বড় হওয়ায় সাথে সাথে সেগুলো ক্রমশ বাড়তে থাকে।প্রয়োজন ছাড়া অন্য কেউ তো দূরে থাক ,মায়ের সাথে কোনো কথা বলে না।তার সেই ছেলে আজকে নিজে থেকে মাকে জড়িয়ে রেখেছে।সেই কখন থেকে জাপটে ধরে আছে।বেশ খানিকক্ষণ পার হওয়ার পর মাকে মলিন কন্ঠে ডাকলো তূর্য,
” আম্মু ? ”
পারভিন বেগম ছেলের পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললেন,
” বল আব্বা।মন খারাপ করছে? আমি আছি না? তোর বাবা আসলে কথা বলবো।জানিস-ই তো তোর চাচার রা’গ একটু বেশি।দুইদিন সময় দে ঠিক হয়ে যাবে।দেখবি নিজে থেকেই সবটা মেনে নিবে ”
” জানো আম্মু? আমি ভাবতাম আহি আমার জন্যে পাগল।আমাকে হারানোর ভয়ে ও পাগলামি করবে।কিন্তু দেখো,সবার সামনে কি সুন্দর করে বলে দিলো ও আমাকে চায় না,ফ্যামিলিকে চায়। একবার বলে দেখতো ও আমাকে চায়,জাস্ট একবার বলতো ।বাকিটা আমি সামলে নিতাম।
তোমরা শুধু ওর ফ্যামিলি?আমার ফ্যামিলি নও? আমি ওকে ওর ফ্যামিলি থেকে আলাদা করতাম? ”
এইটুকু বলে থামলো তূর্য।পারভিন বেগমকে ছেড়ে ড্রয়ার থেকে বাইকের চাবি বের করে যেতে যেতে বিড়বিড় করে বলল,
প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ৪৫
” যে ভয়টা পেয়ে এত বছর অপেক্ষা করলাম,সেই ভয়টাই ও সত্যি করে দিলো।আমাকে কেন এভাবে শেষ করে দিলি, আহি? ”
পেছন থেকে পারভিন বেগম কান্না মিশ্রিত গলায় ডাক ছাড়লেন,
” এই ভর দুপুরে কোথায় যাচ্ছিস বাবা? কয়টা খেয়ে যা। তোর মাথা ঠিক নেই আব্বা।মোটর সাইকেলের চাবি নিয়ে কি করবি? আমি রহিমকে বলে দিচ্ছি তুই যেখানে যাবি ও তোকে গাড়িতে করে দিয়ে আসবে।তূর্য আমার কথা শোন ,আব্বা ।যাস না ” বলতে বলতে ছেলের পিছু পিছু গেলেন তিনি।কিন্তু কোনো লাভ হলো না।তূর্য সদর দরজা পেরিয়ে চলে গেছে।
