Home প্রণয় ব্যাকুলতা প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ৫৩

প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ৫৩

প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ৫৩
ইনান হাওলাদার

আহির জ্ঞান ফেরার ২৪ ঘন্টা পার হয়ে গেছে।এখনো হসপিটাল বেডে ও। কাল সকালে রিলিজ করা হবে। জ্ঞান ফিরলে কথা বলার অবস্থায় নেই ও। গলা প্রচণ্ড রকমে ব্য’থা হয়ে আছে।যে যা বলছে শুধু শুনছে। ওষুধের প্রভাবে এতক্ষণ ঘুমিয়ে ছিল।কিছুক্ষণ হয়েছে জ্ঞান ফিরেছে। আপাতত ওর কাছে কেউ নেই। সেই সুযোগে একটু কাঁন্না করে নিচ্ছে মেয়েটা। কাঁন্না করাও ক’ষ্টসাধ্য,সামান্য ঢোক গিললেই গলা ব্যথা করছে।ডাক্তার বলেছেন কিছুদিন নরম খাবার খেতে। তার জ্ঞান ফেরার একটা দিন হয়ে গেল তবুও তূর্য ওকে দেখতে আসলো না। চোখের কোণা বেয়ে একাধারে জল গড়িয়ে পড়ে বালিশ ভিজছে।

” আম্মা,ঘুম কখন ভাঙলো?”
আসলাম চৌধুরীর কথার আওয়াজে দুই হাতে দ্রুত চোখের পানি মুছলো আহি।এই ২৪ ঘন্টায় তার কাছে সবচেয়ে বেশি যেই লোকটা থেকেছে সে তার বাবা। আসলাম চৌধুরী এসে মেয়ের পাশে বসলেন। মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন,
” কাঁন্না করছিলে মা? কেন ? ”
আহি বাবার দিকে তাঁকিয়ে দুই পাশে মাথা নাড়লো। যার অর্থ ‌’না,সে কান্না করেনি।’ আসলাম চৌধুরীও আর মেয়েকে জেরা করলেন না।বললেন,

” ক্ষুধা লেগেছে ? কিছু খাইয়ে দিবো ? ”
এবারেও ‘না’ বোধক মাথা নাড়লো আহি। আসলাম চৌধুরী সেই শুরু থেকেই খেয়াল করছেন মেয়েটার জ্ঞান ফিরেছে ধরে শুধু দরজার দিকে তাঁকিয়ে আছে। একটু সময় এদিক-সেদিক তাঁকিয়ে আবারো দরজায় দৃষ্টি ফেলছে।সবাই-ই বুঝছেন কার অপেক্ষায় আছে মেয়েটা। হয়তো মুখে বলতে পারছে না ” তূর্য ভাই কোথায়? আসছেন না কেন? ”
তিনি মেয়ের মন অন্যদিকে ঘোরানোর জন্যে বললেন,
” তোমাকে আর এখানে থাকতে হবে না,আম্মা।সকালে বাড়ি চলে যাবো আমরা ”
এই কথায় হাসি ফুটলো মেয়েটার মুখে। বাড়ি গেলে তূর্যের সাথে দেখা হবে ।তখন কথাও হবে। আরো কিছুক্ষণ ধরে মেয়ের সাথে এটা-ওটা কথা বললেন আসলাম চৌধুরী। তাদের বিয়ের কথাও তুললেন। আহি মনে মনে খুশি হলেও মুখে লজ্জার আভা ফুটে উঠলো। মেয়েকে লজ্জা পেতে দেখে আসলাম চৌধুরীও থেমে গেলেন ,অন্য প্রসঙ্গ টানলেন।

চৌধুরী বাড়িতে আজকের সকালটা একটু বেশিই আনন্দমুখর।প্রায় চার – পাঁচ দিন পর বরাবরের মতো উৎফুল্লতায় মেতে উঠেছে বাড়ি। এগারোটা বাজতে বাজতে আহিকে নিয়ে বাড়ি ফিরেছেন আকবর চৌধুরী। মেয়েটার অন্য কোনো শারিরীক সমস্যা না থাকলেও কথা বলতে পারছে না। ডাক্তার বলেছেন সপ্তাহ দুয়েক গলা ব্য’থা থাকতে পারে। আস্তে আস্তে ঠিক হয়ে যাবে ,ততদিন নরম খাবার খেতে।
বাড়ির তিন গিন্নি মেয়ের জন্যে কয়েক প্রকারের খাবার রান্না করেছেন।আহি বাড়িতে ফিরে কিছুক্ষণ বাদে ফ্রেশ হয়ে বেরোনোর পর প্রত্যেকটা খাবার নিয়ে হাজির হয়েছেন তারা। আহি নিজের কাজ নিজে করতে পারলেও মারুফা বেগম নিজে হাতে মেয়েকে খাইয়ে দিচ্ছেন আর চোখের পানি ফেলছেন। আহিও এখন অপরাধ বোধে ভুগছে। গলা নাড়িয়ে মা’কে কোনো সান্ত্বনা বানিও দিতে পারছে না।আর পারলেও কি-ই বা বলতো!মেয়েটার চোখের কোনেও জল জমেছে। পারভিন বেগম খেয়াল করলেন তারপর জা’কে ধ’মক দিয়ে কাঁন্না থামাতে বললেন। এতে আরো শব্দ করে কেঁদে উঠলেন তিনি। বললেন,

” আমার মেয়েটার কিছু একটা হয়ে গেলে আমি তো রাস্তার পাগল হয়ে যেতাম বুবু ”
আহি মাথা নিচু করে চোখের পানি ফেলতে লাগলো। এসব করার আগে একটাবার পরিবারের কারো কথা ভাবলো না।কেন? মৃ’ত্যুই কি সকল সমস্যার সমাধান?
আহি নিজের উপর আশ্চর্য হলো।যেখানে একটু হাত ছিলে গেলেই ব্যথায় ম’রে যায় সেখানে আ’ত্মহত্যার মতো ডিসিশান নিয়ে ফেলেছিল।আর সেই কাজে মোটামুটি সফলও হয়ে যাচ্ছিল ।যদি না ঠিক সময় সকলে পৌঁছাতো তাহলে এতদিনে হয়তো মাটির নিচে থাকা তার দেহ থেকে মাংস পঁচে গলতে আরম্ভ করতো। মা – মেয়ের কান্না দেখে মারুফা বেগমকে নিয়ে চলে গেলেন লতা বেগম। বাকি খাবারটা পারভিন বেগম খাইয়ে দিলো ওকে।

এখন বিকাল হলেও গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন আহি। এ কদিন হাসপাতালের মেডিসিনের উদ্ভট গন্ধে ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া, ঘুম কিছুই হয়নি মেয়েটার।প্রায় ঘন্টা তিনেক আগে — দুপুরের খাবার খেয়েই ঘুমিয়েছে।সূর্য পশ্চিমে হেলে পড়লেও গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন ও।আরো দশ মিনিট পার হলে দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে তাহি এলো।বেশ কয়েকটা ডাক দিয়েও আহির ঘুম ভাঙাতে পারলো না ও। দুই হাতে ওর শরীর ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে আরম্ভ করলো ।এইবার হুসে এলো আহি। হড়বড় করে চারিদিকে চাইলো।তাহি বিরক্তির সাথে বলল,
” কেমন ঘুমিয়েছিলে আপু? ডাকতে ডাকতে গলা শুকিয়ে গেল । একটু আগেই ভাইয়া এসেছে ”
বলে আবার দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে চলে গেল।
আহির বাড়ি ফেরার এক দিন পার হয়ে গেছে তবু তূর্যের দেখা মেলেনি। আর লোকটা কখন বাড়ি ফেরে কখন বের হয় বুঝতে পারে না ও। তাছাড়া বাড়ি ফেরার পর থেকে বেশির ভাগ সময় ঘুমিয়েই কাটছে ওর। তাই তাহিকে বলে রেখেছিল তূর্য বাড়ি ফেরার সাথে সাথে তাকে জানাতে।ঘুমিয়ে থাকলেও !

আহি একটু সময় নিয়ে বিছানা ছাড়লো। ঘুমে এখনো চোখ লেগে আসছে।ও উঠে চোখ-মুখে একটু পানি দিলো।তারপর একটা প্যাড আর কলম হাতে তূর্যের রুমের উদ্দেশ্যে রওনা হলো । এখন ওর কথা বলার একমাত্র মাধ্যমই এই প্যাড আর কলম।তূর্যকে সে কি কি বলবে ,কি কি প্রশ্ন করবে সেটা ঘুমোনোর আগেই নোট প্যাডে লিখে রেখেছিল। যেতে যেতে সেগুলোকে আরেকবার দেখে নিলো। আরো কোনো কথা বা প্রশ্ন করার আছে কিনা সেগুলোও ভেবে নিলো। প্রথমবারের মতো কোনো ভ’য় – ডর ছাড়া তূর্যের রুমে প্রবেশ করলো ও।
বরাবরের মতো মুখে কোনো হাসি নেই। এমন করে রেখেছে যেন ছেলেটা মহা কোনো ভুল করে ফেলেছে।সত্যিই তো ভুল করেছে। এই একটা দিনের মধ্যে একবারও তার সাথে দেখা করলো না, এমনকি হাসপাতালেও নাকি তাকে দেখতে যায়নি।শুধু করিডোর দিয়ে ঘুরঘুর করে বেরিয়েছে।এসব ভেবে মুখ আরো লা’ল হয়ে উঠলো ওর। রাগে লাল হওয়া মুখ নিয়েই রুমে প্রবেশ করলো।
এই মুহূর্তে তূর্য মোবাইলের সাথে ল্যাপটপ কানেক্ট করতে ব্যস্ত। দরজা খোলার শব্দে একবার সেদিকে তাঁকালো। তারপর আবার নিজের কাজে মন দিলো। আহি এগিয়ে এসেছে বুঝতে পেরে সেদিকে মাথা না তুলেই বললো,

” ওয়েলকাম হোম ”
কোনো পরিবর্তন দেখা গেল না আহির মুখে।ও প্যাড থেকে কয়েকটা পৃষ্ঠা উল্টে একটা প্রশ্ন বের করলো। তারপর সেটাকে নিজের বুক বরাবর দুই হাতে মেলে ধরলো। কিন্তু তূর্য সেদিকে খেয়াল করলো না। সে নিজের কাজে ব্যস্ত। আহির রাগ ক্রমশ বাড়তে থাকলো।কিছু সময় যাওয়ার পর তূর্য ল্যাপটপ সাইডে রেখে ওর দিকে তাঁকালো।রাগে র’ক্তিম হওয়া মুখশ্রীতে একবার নজর বুলিয়ে মেলিয়ে ধরা প্যাডের দিকে তাঁকালো।তারপর ভ্রু কুঁচকে বিড়বিড় গোটা গোটা অক্ষরের লেখাটা পড়লো,
” আপনার সমস্যা কি তূর্য ভাই ? ”
তূর্য তাঁকালো ওর মুখের দিকে তাঁকিয়ে ঠোঁট উল্টে এদিক-ওদিক মাথা নাড়লো।যার অর্থ ‘ কোনো সমস্যা নেই ‘। আহির জানা ছিল তূর্য এমন কিছুই বলবে ।সে আরেকটা পৃষ্ঠা উল্টে পরের প্রশ্ন বের করলো,

” তাহলে আমাকে একবারও দেখতে যাননি কেন? আমার সাথে একবারও কথা বলেননি কেন ?”
তূর্য একই কায়দায় এই লেখাটাও পড়লো।
তারপর বলল,
” কথা বলতে পারছিস? কি কথা বলবো তোর সাথে? ”
পরবর্তী প্রশ্ন বের করলো আহি ,
” হসপিটালেও দেখতে যাননি আমাকে ”
তূর্য পুনরায় ল্যাপটপ ঊরুর উপর রাখতে রাখতে বলল,
” কাজের কথা থাকলে বল । নাহলে অযথা ডিস্টার্ব করিস না ”
আহির চোখ টলমল করছে। আরেকটা পলক ফেললে হয়তো জল গড়িয়ে পড়বে। হলোও তাই! পানির ফোঁটা গিয়ে পড়লো তূর্যের ট্রাউজারের উপর । ও ল্যাপটপ থেকে চোখ সরিয়ে একপলক সেদিকে তাঁকালো। এটা কোথা থেকে এসেছে সেটা বুঝতে আর বাকি রইলো না ওর। তারপর মাথা উঁচু করে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটার দিকে তাঁকালো।আরেকটা লেখা বের করে দাঁড়িয়ে আছে ও,

” আমি যদি সত্যি সত্যি ম’রে যেতাম তূর্য ভাই ? ”
” যেতিস! ম’রার জন্যেই তো কান্ডটা পাকিয়েছিলি। ” বলে একটু থামলো তূর্য তারপর পুনরায় বলল,
” সামান্য একটা দিন কথা বলিনি,দেখা করিনি তাই সহ্য করতে পারছিস না ।আর তিন তিনটা দিন নিজে তো ম’রার মতো পড়ে ছিলিস,একদম টেনশান ফ্রি! বাকিদের অবস্থা কি হতে পারে তোর কোনো আইডিয়া ছিল ? ” ধীরে ধীরে উঁচ্চ‌ হলো তূর্যের গলা।
আহি মাথা নিচু করে শুধু চোখের পানি ফেলছে। তূর্য ফের ল্যাপটপ সাইড করে রাখলো । উঠে আহির দুই বাহু ধরে ওকে বিছানায় বসালো। তারপর নিজে হাঁটু গেড়ে মেঝেতে বসে আলতো হাতে ওর চোখের পানি মুছলো। কিয়ৎক্ষণ প্রেয়সীর দিকে তাঁকিয়ে থেকে নরম কন্ঠে বলল,
” আর কাঁন্না করতে হবে না। সুস্থ্য হয়ে ওঠ ফাস্ট। আমি আর এতো অপেক্ষা করতে পারছি না ”
আহি চোখ তুলে তাঁকালো তূর্যের দিকে। গভীর চোখে তাঁকিয়ে আছে লোকটা। আহি চেষ্টা করলো সেই চোখের ভাষা পড়তে।কিন্তু বরাবরের মতো ব্যর্থ হলো। অনেক কষ্টে মৃদু কন্ঠে বলল,

” স্য’রি ”
আহি কি বলল খেয়াল হলো না তূর্যের। ও ডান হাতের তর্জনী আঙুল দ্বারা প্রেয়সীর ঠোঁ’ট চেপে ধরলো। অন্যমনস্কতায় মৃদু আওয়াজে বলল,
” প্লিজ ডো’ন্ট টক। লেট ম্যি স্যি ইউ জা’ন ”
তূর্যের এহেন কথায় দ্রুত এদিক সেদিক এলোমেলো চাহুনি ফেলতে আরম্ভ করলো আহি। হুশে ফিরলো তূর্য । নিজেও এলোমেলো চাহুনি ফেলে দৃষ্টি স্বাভাবিক করলো। অতঃপর উঠে যেতে নিতেই আহির গলায় চোখ পড়লো। পুরো গলায় গোল করে কালচে রঙের দাগ দেখে বুকের মধ্যে খচ করে উঠলো । পিছনে কাটিয়ে আসা য’ন্ত্রণাময় দিনগুলোর কথা মনে পড়লো। আলতো হাতে আহির কাঁধের চুলগুলো সরিয়ে দিয়ে কিছুক্ষণ এক দৃষ্টিতে সেদিকে তাঁকিয়ে রইলো। তারপর হাত বাড়িয়ে গলার এক পাশ ছুঁয়ে দিলো। আহি নড়ে-চড়ে উঠলো।জায়গা ছাড়ার পায়তারা করতে লাগলো। তূর্য বিরক্তি নিয়ে ওর দিয়ে তাঁকালো। বলল,

” কি প্রবলেম হচ্ছে তোর ? ”
আহি ওর ঘাড় তূর্যের হাত নামিয়ে অন্যদিকে দৃষ্টি ঘোরালো। নিজের অজান্তে ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসলো তূর্য। ওকে আরেকটু ভড়কে দিতে বলল,
” এত নেগেটিভ মাইন্ডেড তুই? ”
আহি তূর্যকে ধাক্কা দিয়ে উঠে পালাতে চাইলো ।কিন্তু ব্যর্থ হলো।উল্টে তূর্য ওকে আলতো ধাক্কায় বিছানায় ফেলল।তারপর নিজে ওর উপর আধ শোয়া হলো। আহির হৃৎপিণ্ডের গতি কয়েক গুণ বেড়ে গিয়েছে। তূর্য বোধ হয় চাইলো আরেকটু বাড়িয়ে দিতে। মেয়েটা উঠে যেতে চাইলে দুই হাত বিছানায় চেপে ধরলো ও। বাঁকা হেসে কিছুক্ষণ ওর কান্ড কারখানা দেখে কানের লতির সাথে ঠোঁট লাগিয়ে ফিসফিস করে বলল,
” এখন থেকে আর হুটহাট আমার রুমে আসবেন না। আর আসলে প্রস্তুতি নিয়ে আসবেন, যেকোনো কিছু ঘটে যেতে পারে। এনিথিং! তার দ্বায় কিন্তু আমার থাকবে না । ওকেই ?”

আহি একটা ঢোক গিলে দ্রুত উপর নিচ মাথা নাড়তে লাগলো।মেয়েটা ভাবলো এইবার হয়তো ছাড়া পাবে কিন্তু সেটা হলো না। তূর্য মুখ উঠিয়ে আহির বদ্ধ দুচোখের পাতায় চুমু খেল। তারপর কপালে ,দুই গালে ,নাকের ডগায়,থুতনিতে । এবার তিরতির করে কাঁপতে থাকা প্রেয়সীর ঠোঁট গিয়ে দৃষ্টি থামলো। এক দৃষ্টিতে কিয়ৎক্ষণ সেদিকে তাঁকিয়ে রইলো। ওখানে ডুব দেওয়ার সাহস দেখলো না সে।একবার ডুবে গেলে হয়তো আর ওঠার সাধ্য হবে না। জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে নিজেকে ধাতস্থ করে উঠে পড়লো। আহি ছাড়া পেয়ে দ্রুত উঠে দৌঁড় লাগালো। রুমের বাইরে যেতেই পারভিন বেগমের দেখা পেল।আপনা-আপনি পা থমকে গেল ওর।মেয়েটার এমন লালচে হয়ে থাকা মুখ দেখে তিনি প্রশ্ন করলেন,

” গাল-মুখ লাল হয়ে আছে কেন ? কি হয়েছে মা? ”
আহি এদিক-ওদিক ‘ না ‘ বোধক মাথা নাড়লো। পারভিন বেগম বললেন,
” নিচে যা।সবাই ডাকছে ”
আহি ‘ হ্যাঁ ‘ সূচক মাথা নেড়ে চলে গেল। পারভিন বেগম কিছুক্ষণ ওর যাওয়ার দিকে তাঁকিয়ে থেকে তূর্যের রুমে প্রবেশ করলেন। ছেলেকে দেখে তিনি আরেক দফা অবাক হলেন। একা একা দাঁড়িয়ে মুচকি হাসছে ও।তিনি আর তূর্যকে কিছু জিজ্ঞেস করলেন না। বুঝে নিলেন মেয়েটার ওভাবে ছুটতে থাকা আর ছেলের এভাবে হাসতে থাকার মধ্যের কারণ একটাই।কিন্তু সঠিক কারণ না বুঝতে পারলেন,আর না জিজ্ঞেস করলেন ।
তূর্য মাকে দেখে স্বাভাবিক হলো। বলল,

” কিছু বলবে? ”
পারভিন বেগমও ভাবনার জগৎ থেকে বেরিয়ে আসলেন। বললেন,
” হ্যাঁ, তোর বাপ-চাচারা বসে আছে । তোকে নিচে ডাকছে ”
” কেন ? কিছু হয়েছে ? ” চিন্তিত শোনা গেল তূর্যের কন্ঠ। পারভিন বেগম বললেন,
” বিয়ের দিন-তারিখ ঠিকঠাক করার ব্যাপারে মনে হয়। ”
” আমাকে কেন ডাকছে? করুক তারা ” এই কথার অর্থ এমন না যে তূর্য লজ্জা পাচ্ছে। আসলে সে এসব বিষয়ে উপস্থিত থাকবে , কিনা কি বলে ফেলবে তারপর বাবা – চাচারা লজ্জায় পড়ে যাবেন। পারভিন বেগম বললেন,
” ওনাদের মন মতো এক তারিখ দিলেই হলো? তোরও তো সুযোগ – সুবিধার ব্যাপার আছে।”
” আমি ফ্রী আছি। এক বেলার ব্যাপার ,যেদিনই ডেইট দিবে প্রবলেম হবে না ”
ছেলের কথায় যেন আকাশ থেকে পড়লেন পারভিন বেগম।বিস্ময় ভরা কন্ঠে বললেন,
” পাগল হয়ে গেছিস আব্বা? এক বেলা মানে? এটা কি একদিনের ব্যাপার? কয়েকদিন সময় লেগে যাবে।তারপর তুই ব্যস্ততা দেখলে তোর বাবা ব’কাঝকা করবে ”
মায়ের কথায় মুখ বিকৃত করলো তূর্য।বি’রক্ত ভঙ্গিতে বলল,

” এত আয়োজনের তো কিছুই দেখছি না। সাদা-মাঠা বিয়েতে আল্লাহ রহমত বেশি। এগুলো করতে নিষেধ করো ”
এত দিন তিনিও চাইতেন ছেলে মেয়ে দুটোর ধুমধাম করে বিয়ে হোক।পুরো মহল্লার মানুষ জানুক চৌধুরী বাড়িতে বিয়ে হচ্ছে।কিন্তু,ধর্মীয় কথায় মন গলে গেল পারভিন বেগমের।বললেন,
” এইজন্যেই তোকে যেতে বলছি । নিচে আয় তুই।তারপর তাদের বল ” বলে আবার ব্যস্ত পায়ে চলে গেলেন তিনি। কিছু সময় পর নিচে নামলো তূর্য।

বাড়ির বড় থেকে ছোট সকল সদস্য ড্রয়িং রুমে উপস্থিত। এতক্ষণ ধরে আহিও ছিল। বিয়ের প্রসঙ্গে কথা হচ্ছে শুনে পিছু কেঁটে পালিয়েছে। নিজের বিয়ের কথা-বার্তায় থাকা একটা লজ্জার ব্যাপার-স্যাপার । আর কিছুক্ষণের মধ্যে তূর্য ভাইও চলে আসবেন। প্রত্যেকের মুখে খুশির ঝলক।শান্ত প্রান্ত আর তাহি সবচেয়ে বেশি এক্সসাইটেড। বড়দের প্রত্যেকটা কথা মনোযোগ দিয়ে শুনছে তারা। আর ঘুরে ফিরে বলছে ” অনেক বড় করে বিয়ে দিবে কিন্তু। ”
“আমরা অনেক মজা করবো।”
“আমাদের সকল ফ্রেন্ডদের ইনভাইট করবো ”
আকবর চৌধুরী সাঁয় দিলেন বাচ্চাগুলোর কথায়।
বললেন,
” হ্যাঁ,সবাইকে দাওয়াত দিবে তোমরা।শুধু ফ্রেন্ড না, পুরো ক্লাসের ছেলে-মেয়েদের দাওয়াত দিবে।চৌধুরী বাড়ির ছেলে-মেয়ের বিয়ে বলে কথা ”
পারভিন বেগম বললেন,

” তূর্য বলছিল যে, বিয়ে-শাদী যত ছোট-খাটো করে হয় আল্লাহর রহমত বেশি থাকে।সেটা তো সত্যিই!আমার….”
তাকে আর কথা শেষ করতে দিলেন না আকবর চৌধুরী। তিনি খি’টখিট করে উঠে বললেন,
” তোমার কি মনে হয়,রহমতের জন্যে বলেছে তোমার ছেলে? একটু বড় করে আয়োজন করতে গেলে সময় বেশি লাগবে বুঝছো না তুমি? ওর আসলে দেরি সহ্য হচ্ছে না ”
ঠিক সেই মুহূর্তে সিঁড়ি বেয়ে নেমে আসলো তূর্য।ড্রয়িং রুমের দিকে এগোতে এগোতে সাবলীল গলায় বলল,
” এক্সাক্টলি ! বুঝতেই যখন পেরেছেন দেরি না করা-ই বেটার, আই থিঙ্ক ”
তূর্যের এহেন কথায় সবাই একযোগে ওর দিকে তাঁকালো। কেউ যেন মানতেই পারলো না তূর্য এই কথা বললো। তবে আকবর চৌধুরীর মানতে অসুবিধা হয়নি। সকলে কিছুক্ষণ মূর্তির মতো ওর দিকে তাঁকিয়ে রইলো। তূর্য ভাবলেশহীন ভাবে এগিয়ে এসে আসিফ চৌধুরীর পাশে থাকা খালি জায়গা বসলো। আকবর চৌধুরী দাঁত কিড়মিড় করে উঠলেন পারভিন বেগমের উপর।বললেন,

” ছেলে এরকম নি’র্লজ্জ পয়দা কবে হলো ,তূর্যের মা? ”
সে কথায় কান দিলো না তূর্য। ব্যস্ত ভঙ্গিতে বলল,
” বলুন কি হয়েছে ”
আকবর চৌধুরীর বলতে ইচ্ছা হলো ,
” তোর বাপের বিয়ে ” কিন্তু তিনি তা বললেন না। দাঁত চেপে পড়ে রইলেন।আবার কিনা কি বলে বসবে। এত দিন এই ছেলেকে ভদ্র-সভ্য ভাবাই ওনার বোকামি হয়েছে। যদিও ওনার আগেই বোঝা উচিত ছিল ,ছেলে এরকম নির্লজ্জ না হলে কি আর হাঁটুর বয়সী একটা বাচ্চা মেয়েকে বিয়ে করার জন্যে এত পাগল হয় । কিছুক্ষণের জন্য নীরবতা নেমে এলো সেখানে। তারপর আসিফ চৌধুরী নিরতটা ভাঙলেন।বললেন,
” ভাইজান , এক হিসেবে ভালোই হয়েছে। তূর্যের জন্যে মেয়ে দেখা ,আহির জন্যে যোগ্য পাত্র খোঁজা ঝামেলা হয়ে যেত। ওরা নিজেরা নিজেদের পছন্দ করে নিয়েছে এতে করে আমাদের এই ছেলে দেখতে যাওয়া,মেয়ে দেখতে যাওয়া । তাদের বাড়িঘর দেখতে যাওয়া ,এসব ঝামেলা রইলো না ”

” যদি মেয়েটাকে বোঝাতে পারতাম তাহলে ম’রে গেলেও এই ছেলের হাতে আমি আমাদের মেয়ে দিতাম না ” থমথম করতে করতে বললেন আকবর চৌধুরী। ওনার কথা শেষ না হতেই তূর্য বলল,
” ইনসাল্ট করতে ডেকেছেন এখানে? আপনাদের মেয়ের যোগ্য কিনা বিয়ের পর দেখবেন।এখন যেটা করতে ডেকেছেন সেটা করুন আব্বু। আ’ম বিজি ”
” হ্যাঁ, ব্যস্ত থাকবি এইজন্যেই তোকে ডাকা। মাস খানেক পর ফ্রী থাকবি তো ? এর মধ্যে আহিও পুরোপুরি সুস্থ্য হয়ে যাবে ”
আসলাম চৌধুরীর কথায় যেন চরম বিরক্তি নেমে আসলো তূর্যের মুখে। ও আশ্চর্য হয়ে বলল,
” মাস খানেক ?”
মারুফা বেগম বললেন,
” তোর সময় লাগলে আরো বাড়িয়ে দেওয়া যাবে বাবা । নিজের সুযোগ বুঝে বল ”
আবার মুখ খুললেন আকবর চৌধুরী।বললেন,

” এতক্ষণ ধরে এই বুঝলে মেজো বউ ? সময় ওর কম না বেশি হয়ে যাচ্ছে। পারলে কাল-ই বিয়ে করে নেয় ও ”
” আজ হলেও মন্দ হয় না ” বিড়বিড় করে বলল তূর্য। কেউ না শুনলেও আসিফ চৌধুরীর কানে গেল।উনি হোঁ হোঁ করে হেসে উঠলেন। বাকিরা হাসির মূল কাহিনী বুঝলেন না।আর বোঝার চেষ্টাও করলেন না। আকবর চৌধুরী কিছুক্ষণের নীরবতা ছেড়ে বাকি কথা সম্পন্ন করলেন,
” দেখো তুমি চাইলেও আমরা সেটা করতে পারছি না।মেয়েটার সুস্থতারও একটা ব্যাপার আছে ”
” বিয়ের পর আপনাদের মেয়ে সুস্থ্য হবে না? নাকি বিয়ে করলে তার সুস্থ্তা স্থগিত হয়ে যাবে?”
আকবর চৌধুরী চোখ রাঙিয়ে পারভিন বেগমের দিকে চাইলেন। তিনি অসহায় চোখে একবার ছেলের দিকে আরেকবার ছেলের বাবার দিকে তাঁকালেন। তূর্য এখনো স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বসে আছে। লতা বেগম প্রসঙ্গ ঘোরানোর তাগিদে বললেন,

” একটা ভিন্ন কায়দায় বিয়ে হলে ভালো হয় না ? যদিও নিজেদের মধ্যে বিয়ে তবুও আমরা যদি ছেলে পক্ষ হয়ে মেয়ে দেখতে আসি।পুরো গ্রামীণ প্রকৃতে দেখা-শুনার ব্যাপারটা যদি ঘটে । তারপর…..”
সবগুলো দৃষ্টি এসে পড়লো ওনার দিকে।ফলস্বরূপ কথা থামিয়ে দিলেন তিনি। আস্তে করে বললেন,
” আমার মত দিচ্ছিলাম।সবার ইচ্ছা না থাকলে দরকার নেই”
কিয়ৎক্ষণ নীরবতা।তারপর আসলাম চৌধুরী বললেন,
” এটা তো ভালো কথা। জমজমাট একটা পরিবেশ হবে ”
অন্তত একজনের সমর্থন পেয়ে হাসি ফুটলো লতা বেগমের মুখে । তারপর একে একে সকলে মত দিলো। অধৈর্য তূর্য আরো অধৈর্য হয়ে পড়লো। একটু আগে এক মাসের ব্যাপার ছিল,এখন এই বাড়ির লোক সেটাকে এক বছরে নিয়ে দাঁড় করাচ্ছে ।সে গম্ভীর গলায় বললো,
” এসবের মধ্যে আমি থাকতে পারবো না।আপনারা যা খুশি করুন”
এই চিন্তা ভাবনায় বড়দের থেকে ছোটদের উৎফুল্লতা বেশি ছিল।তূর্যের এমন কথা শুনে ওদের মুখ কালো হয়ে গেল।
তাহি বলল,

” কেন ভাইয়া? তুমি শুধু বিয়ের দিন থাকবে নাকি? বিয়ে তো হবেই হবে তাহলে এত পাগল হচ্ছো কেন? ”
তাহির কথায় একযোগে সবাই হেসে দিলো।আসিফ চৌধুরী বললেন,
” তুই যে পাগল হয়েছিস তাহিও সেটা বুঝে নিলো ”
” আপনাদের এই সো কল্ড ডিসকাশানে আমাকে কেন ডেকেছেন?ডিজগাস্টিং !” বলে চলে গেল তূর্য।
বাড়ির বাকিরা আলোচনা বহাল রাখলেন। আসিফ চৌধুরী বললেন,

প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ৫২

” এসব বাদ দেও ভাইজান।ছেলেটা যখন চাইছে না জোরাজুরির দরকার নেই ”
আকবর চৌধুরী কিছুক্ষণ চিন্তা-ভাবনা সেরে বললেন,
” তবে নিয়ম উল্টো হোক ! ছেলেপক্ষ মেয়ে দেখতে নয় ,মেয়েপক্ষ ছেলে দেখতে যাবে। আমরা তো আর আমাদের মেয়েকে যার তার হাতে তুলে দিতে পারি না।”

প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ৫৪