Home প্রণয় ব্যাকুলতা প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ৫৪

প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ৫৪

প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ৫৪
ইনান হাওলাদার

আজকের আড্ডার স্থান নাবিল-পিংকির ফ্ল্যাট। ড্রয়িং রুমে হাসি-ঠাট্টায় ব্যস্ত নাবিল ,তাসিন আর তূর্য। যদিও তূর্য সেখানে নীরব দর্শক বৈকি আর কিছু না।অথচ হাসি ঠাট্টার কেন্দ্রবিন্দু-ই সে।পিংকি ওদের জন্যে কিছু স্ন্যাকস তৈরি করতে কিচেনে গিয়েছে ।আর ওকে হেল্প করছে আলিয়া। মাঝে মাঝে কিচেন থেকে তারাও ওদের আড্ডায় সামিল হচ্ছে।এটা-ওটা বলে উঠছে। শেষ আধ ঘন্টা ধরে তাসিন তূর্যকে কিছু একটা বলতে চেষ্টা করছে । কিন্তু কথাগুলো গুছিয়ে বলতে পারছে না ,অন্যথায় বলার সাহস পাচ্ছে না। তাই ইনিয়ে-বিনিয়ে বলার চেষ্টা করে যাচ্ছে।তূর্য আরো কিছুক্ষণ সময় দিলো ওকে।তারপর বি’রক্তি নিয়ে বলল,

” যেটা বলতে চাচ্ছিস ক্লিয়ারলি বল। আদারওয়াইজ এখানেই থেমে যা। ”
তাসিন-নাবিল একে অপরের মুখের দিকে তাঁকালো।তারপর তাসিন আমতা-আমতা করতে করতে বলল,
” তোদের …মানে তোর আর আহির বিয়ে তো অলমোস্ট ঠিকঠাক , তাই না? ”
তূর্য এবার মনোযোগী হলো ওর দিকে। একটু নড়ে-চড়ে বসে আগ্রহী হয়ে বলল,
” হ্যাঁ! তো ? ”
” থাক ভাই , কিছু না ….”
তাসিন কাঙ্ক্ষিত কথাটা বলতে গিয়েও পারল না। ভড়কে গেল ! বেশ বুঝতে পারছে সে যা বলতে চাইছে তূর্য বুঝেছে।কিন্তু এখনো অবুঝ হয়ে বসে আছে। নাবিল গ’র্জে উঠলো ওর উপর,
” বা’ড়ার একটা কথা কইতে যাইয়া মাইয়া মানুষের মতো ঢং শুরু করছস। আমি কইতাছি , এই তূর্য তুই…… ”
ব্যস! তারও দম ফুরিয়ে গেল। মাঝ পথে মুখে কুলুপ আটলো। তাসিন ওর পিঠে এক ঘু’ষি দিয়ে দাঁত চেপে বলল,

” বল শালা! থামলি কেন ? ”
এবার শুরু হলো দুইজনের হাতাহাতি। পিংকি আর আলিয়া কিচেন থেকে দেখছে আর মজা নিচ্ছে।
” তাসিন ,বেশি করে দে ওই নাপিতকে ” চেঁ’চিয়ে উঠলো পিংকি।
ততক্ষণে তাসিন নাবিলের বাহু বন্ধি হয়ে গিয়েছে। নাবিলও চেঁ’চিয়ে উঠলো,
” ওরে মাংকির বাচ্চা ! পেটে আমার বাচ্চা নিয়ে ঘুরস আর আমাকেই বেশি করে দিতে কস ”
কিছুক্ষণ এভাবে হা’তা’হা’তি-মা’রা’মা’রি করে ওরা নিজেরাই মিটমাট করে থেমে গেল।ওদের নিরিবিলি হতে দেখে তূর্য বলল,

” হয়েছে তোদের ?”
তাসিন বিচার দেওয়ার ভঙ্গি করে বলল,
” ভাই তুই-ই দেখ , দুইদিন পর বাপ হবে ও।তারপরেও ছেলে মানুষী যায় না । ”
” আর তুই যে চাচা হবি? ”
” আমি চাচা না ,মামা হবো। শা’লা তোর সাথে সকল সম্পর্ক ছিন্ন করলাম আজ ”
আবার শুরু করলো দুজনে। নাবিল বলল,
” আমার বাচ্চার কাছে তোর পরিচয়ই দিবো না শা’লা ”
” নট শালা ,ইট’স বা’ড়া!” এতক্ষণে ওদের ঝ’গড়ার মধ্যে বাম হাত ঠেললো তূর্য। কিন্তু তূর্য যখন ঠেলেছে ডান হাতই ঠেলেছে।সে কখনো বাম হাত ঠেলতে পারে না। তার কথায় সাঁয় দিলো নাবিল,
” ঐতো বা’ড়া। বা’ড়া!”

রাত এগারোটা নাগাদ নাবিল দের ফ্ল্যাট হতে বের হয়েছে ওরা সবাই। প্রথম দিক থেকে আলিয়া খুব হাসি-খুশি থাকলেও শেষ মুহূর্তে এসে মুডের পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়।সবাই ওর হুটহাট মুড সুইং সম্পর্কে অবগত। কোনো কারণ ছাড়াই মন খারাপ করে ফেলে। কিছুক্ষণ যেতেই আবার ঠিক হয়ে যায়। তবে আজ ওর মুড সুইংয়ের চক্করে ফেঁসে গেছে তাসিন। তূর্যের কথা মতো ওকে ড্রপ করতে এসেছিল তাসিন।যদিও তূর্য না বললেও ও নিজে থেকেই ড্রপ করে দিতো। বরাবর এটাই হয়ে আসছে। ওদের গ্রুপের দুই মেয়ে সদস্যকে আড্ডা শেষে ওরা নিজেরাই ড্রপ করে। পিংকির জন্যে নাবিল ফিক্সড ছিল।আর আলিয়াকে তূর্য অথবা তাসিন — যখন যার সময় হতো বা হয় সে ড্রপ করে । তবে আজকে তাসিন বেকায়দায় পড়ে গেছে। অর্ধেক রাস্তা আসার পর আলিয়া বলে সে হেঁটে হেঁটে বাসায় ফিরবে। তাসিন ওকে বোঝানোর শত চেষ্টা করলেও শেষ পর্যায়ে হার মেনে নেয়। বাইক একটা গ্যারেজে ওয়াশ করতে দিয়ে ফ্রেন্ডের জিদ মেনে নেয়।

নির্জন রাস্তা ধরে ল্যাম্প পোস্টের আলোয় হেঁটে চলছে দুজন। আলিয়ার কিছুটা পিছনে তাসিন। হাঁটতে হাঁটতে কিছু একটা ভাবছে মেয়েটা ,তাসিন শত কথা বলা সত্ত্বেও তার কথায় কোনো খেয়াল দিচ্ছে না ও। ব’কবক করতে করতে এক পর্যায়ে থেমে গিয়েছে ছেলেটা। কোনো রকমে বাড়ির গেইট অবধি পৌঁছে দিতে পারলে বাঁচে। কিছুটা দূরে গিয়ে কি একটা ভেবে থেমে গেল আলিয়া।পিছনে ফিরে ওর আর তাসিনের দূরত্ব মেপে নিলো। তাসিন ওকে থেমে যেতে দেখে জোর পায়ে হেঁটে ওর পাশাপাশি এসে হাঁটতে হাঁটতে বলল,

” চল ”
বলে ও কিছুটা এগিয়ে যাওয়ার পরেও দেখলো আলিয়া ওর দিকে তাঁকিয়ে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে আছে।আবার ব্যাক করলো তাসিন।
” তোর কি হয়েছে ইয়ার?”
বেহায়ার মতো ফের একই প্রশ্ন করলো ছেলেটা। এইটুকু রাস্তায় এই নিয়ে নাহলেও শ’খানেক বার একই প্রশ্ন করেছে ও।তবুও কোনো উত্তর পায়নি। এবার উত্তর এলো। তবে এ প্রশ্নের জবাব না । যেটা এলো তার জন্যে তাসিন মোটেও প্রস্তুত ছিল না।
” আমাকে বিয়ে করবি তাসিন? ”
তাসিনের মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল।চোখ বড়বড় করে চাইলো আলিয়ার দিকে। আলিয়া স্বাভাবিক ভাবে ওর দিকে তাঁকিয়ে আছে।এক মুহূর্তের জন্যে তাসিন ভাবলো সে বোধ হয় ভুল শুনেছে। নিশ্চিত হতে বলল,

” কি বললি ভাই? বুঝিনি ”
” বিয়ে করবি আমাকে?” একই কায়দায় ফের বলল ও। তাসিন এবার বুঝলো এই মেয়ে সত্যিই পাগল হয়ে গিয়েছে। ও কপালে হাত ছোঁয়ালো আলিয়ার।ভালো করে পরখ করে বলল,
” নাহ! জ্বরও আসেনি ,তাহলে ভুলভাল ব’কছিস কেন? ”
” ভুল ব’কছি না আমি ” কপাল থেকে তাসিনের হাত সরিয়ে বলল ও। তারপর পুনরায় বলল,
” এখন বল করবি বিয়ে? ”
তাসিন ওকে বোঝানোর কায়দায় বলল,
” আমি তোকে ওসব নজরে কোনোদিন দেখিনি আলিয়া ”
” দেখিসনি ,এখন থেকে দেখবি !” ভাবলেশহীন উত্তর ওর।
” ফ্রেন্ড হোস আমার ,বেস্ট ফ্রেন্ড! আমি এসব জীবনেও ভাবতে পারবো না ।আমি তোকে বোনের চোখে দেখি ভাই ” তাসিনের কথায় কোনো রুডনেস নেই। আলিয়া বোধহয় বিরক্ত হলো। কিছুটা রা’গ নিয়ে বলল,
” এমনভাব বলছিস যেন আমি তোকে এতদিন বয়ফ্রেন্ডের নজরে দেখে এসেছি ? ”
তাসিন গণনায় ধরলো না ওর কথা। মেয়েটার সমস্যা বোঝার চেষ্টা করলো। জানতে চাইলো,
” কি হয়েছে তোর ? আমাকে বল ,দেখি সলভ করতে পারিনি কিনা !”
” বললামই তো ! ”

দুজনেই কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলো।তারপর আলিয়া একটা বড়সড় নিঃশ্বাস ফেলে সামনে হাঁটা ধরলো।তাসিনও পিছুপিছু চলল। হাঁটতে হাঁটতে এক পর্যায়ে কথা বলে উঠলো আলিয়া।মিহি কন্ঠে বললো,
” একটা বিয়ে তো করতেই হবে বল। বাড়ি থেকে ছেলেও দেখছে।কেন জানি কাউকেই আমার ভালো লাগছে না।বলতে পারিস সারাটা জীবনের জন্য অপরিচিত কারো হাত ধরতে সাহস পাচ্ছি না। ” বলে আবার পা থামিয়ে তাসিনের দিকে চাইলো ও। প্রশ্ন করলো,
” আমাকে বিয়ে করতে কি সমস্যা তোর।জাস্ট,ফ্রেন্ড হই এইজন্যে?”
” হুমম ” আস্তে করে উত্তর দিলো তাসিন।
” তাহলে নাবিল-পিংকি কিভাবে সংসার করছে ? ”

” নাবিল পিংকিকে সেই শুরু থেকে পছন্দ করতো ভাই। সেটা তূর্য,তুই,আমি , সবাই জানতাম।ইভেন পিংকিও জানতো।এই কারণে হয়তো ওর মধ্যেও একটা সফট কর্নার তৈরি হয়েছিল।আর ধীরে ধীরে সেটা ভালোবাসায়! ”
” হ্যাঁ,বুঝলাম ! এবার যা তুই ।আমি একা চলে যেতে পারবো ” বলে ফের হাঁটা শুরু করলো ও। তাসিন কিছুক্ষণ সেখানেই দাঁড়িয়ে রইলো।মিনিট খানেক ধরে কিছু একটা ভাবলো।তারপর দৌঁড়ে আলিয়াকে ধরলো।ওর পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে বলল,
” এত খানি রাস্তা হাঁটিয়ে আ’হত করলি ,বাকিটুকু হাঁটিয়ে একেবারে নি’হত করে দে ”
” রাত বাড়ছে চলে যা তুই ”
” সেটা তো তুই না বললেও যাবো ”
” হুম ! যা তাহলে ”

বাকি রাস্তাটুকু এভাবেই তাসিনকে তাঁড়াতে তাঁড়াতে কাটলো আলিয়ার। তাসিনও ‘ যাবো ‘ ‘ যাবো ‘ বলতে বলতে একদম বাড়ির সদর দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে আসলো। গেইট থেকে দাঁড়িয়ে আলিয়ার মায়ের সাথে সাধারণ কথা বার্তাও বলল।ভদ্র মহিলা জানালায় দাঁড়িয়ে থেকে ওকে বারবার ভিতরে আসতে বললেন।তাসিনও যেতে চাইলো।কিন্তু আলিয়া ওকে বাইরে ধাক্কা দিয়ে গেইট লাগিয়ে দিল।তারপর পুরোটা রাস্তা আলিয়ার ব্যাপারে ভাবতে ভাবতে কাটালো ও।

প্রায় সপ্তাহ দুয়েক পর পুরোপুরি সুস্থ্য হয়েছে আহি। এখন আর কথাবার্তা বলতে কোনো সমস্যা হচ্ছে না। গত দুইদিন আগে বিয়ের ডেইট ফিক্সড করা হয়েছে। মার্চের শেষ সপ্তাহে বিয়ে। এখন থেকেই নেমতন্ন পর্ব শুরু করে দিয়েছেন চৌধুরী পরিবার। বাড়ির তিন কর্তা আজ গরুর বাজারে গিয়েছেন। এদিকে বিয়ের তারিখ ঠিক হওয়ার পর লাপাত্তা হয়েছে আহি,যেন ডুমুরের ফুল। গত দুইদিন ধরে এড়িয়ে চলছে তূর্যকে।
মিনিট বিশেক আগে বাড়ি ফিরেছে তূর্য।বাড়ি ফিরেই দেখেছে আহি ড্রয়িং রুমে বসে টিভি দেখছে। সে ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে দেখলো ও নেই সেখানে। সে গিয়ে ড্রয়িং রুমের সোফায় বসলো । পুরো ড্রয়িং রুমে একবার নজর বুলিয়ে কফির মগ হাতে উপরে গেল।কাঙ্ক্ষিত রুমের সামনে গিয়ে কোনো কাল বিলম্ব না করে কয়েকবার কড়া নাড়লো।তবে ঘরের মালিকের অনুমতি পাওয়ার অপেক্ষা করলো না। তার পূর্বেই পূর্বেই রুমে প্রবেশ করলো। নিরিবিলি হেঁটে গিয়ে স্টাডি টেবিলের চেয়ার টেনে বসলো। আহি ওয়াশরুমে ছিল।বের হয়ে তূর্যকে দেখে ভুত দেখার মতো মুখ করলো। আস্তে করে প্রশ্ন করলো,

” কিছু বলবেন তূর্য ভাই? ”
কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে থাকা মানবীর কথায় খেয়াল দিলো না তূর্য ।সে শান্ত ভঙ্গিতে কফির কাপে চুমুক দিচ্ছে। খুব ইমারজেন্সি ছাড়া তূর্য আহির রুমে আসে না বললেই চলে।ও পুনরায় বলল,
” কিছু হয়েছে ? ”
” কেন ? কিছু হওয়ার ছিল নাকি? ” বলে তাঁকালো আহির দিকে। ও এখনো ওয়াশরুমের দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আছে। তা দেখে কপাল গোটালো তূর্য। আহি কিছু বলতে নিচ্ছিল তার আগেই ও বললো,
” ইদানিং পর্দা করছিস মনে হচ্ছে? তাও কড়া পর্দা ”
আহি অবাক হয়ে তাঁকালো ওর দিকে।অবুঝ ভঙ্গিতে বলল,

” এ্যাঁহ ? কই না তো..! ”
অবাক হওয়ার ভঙ্গিতে প্রশ্ন করলো তূর্য,
” না? ” সেকেন্ড খানিকের ব্যবধানে পুনরায় প্রশ্ন ছুড়লো,
” তাহলে আমার সামনে পড়ছিস না কেন? ”
” কই? এইযে এখনো তো দাঁড়িয়ে আছি। ড্রয়িং রুমেও তো …..”
কথা শেষ করতে পারলো না আহি । তূর্য টেবিলের উপর শব্দ করে কফির মগ রেখে উঠে দাঁড়ালো। খানিকটা ক’ঠিন গলায় বলল,
” তাহলে কি? ই’গনোর করছিস আমাকে? ”
আহি যেন আসমান থেকে পড়লো। তূর্যের কায়দায় ভ্রু কুঁচকে ওর দিকে কিছুক্ষন তাঁকিয়ে রইলো।তারপর কাঁ’দো কাঁ’দো গলায় বলল,
” আমি কখন ইগনোর করলাম তূর্য ভাই? ”
” করিসনি? গতকাল তাহিকে দিয়ে তোকে ডাকতে পাঠিয়েছিলাম । এসেছিলি? আজ সকালে আমি ডাইনিংয়ে আসার পর উঠে গেলি ।কেন? দ্যান একটু আগে ড্রয়িং রুমে বসে টিভি দেখছিলিস তোকে রুমে আসতে বলেছিলাম আমি? এসেছিস? ”

আজকে তাদের দুইজনের রোল যেন পাল্টে গিয়েছে।তূর্য আহির মতো ছেলে মানুষী করছে।আর আহি তূর্যের মতো ঠান্ডা মাথায় সেগুলো শুনছে। তফাৎ শুধু ,আহি হলে ন্যাকা কাঁন্না করতে করতে বলতো আর তূর্য রে’গে বলছে।না চাইতেও পেট ফেঁটে হাসি পাচ্ছে আহির।ও পারলো না নিজের হাসি আটকাতে। ফিক করে হেসে উঠলো।তূর্য আরো বিরক্ত হলো। শ’ক্ত করে দাঁত চেপে দাঁড়িয়ে রইলো। ধারালো চোয়াল আরো কিছুটা ধারালো হয়ে উঠলো। আহি হাসতে হাসতেই এক্সপ্লেনেশন দিলো,

” কালকে তো তাহি আমাকে ডাকতে আসেনি।তাছাড়া সারাদিন আমি বাড়িতেও ছিলাম না।যখন এসেছি তখন আপনি ফোনে কারো সাথে রে’গে কথা বলছিলেন এইজন্যে ভ’য়ে যায়নি। আর সকালে ডাইনিং থেকে উঠে গেলাম কেন খেয়াল নেই।আর এখন আপনি ডেকেছিলেন ? আমি তো খেয়ালই করিনি তূর্য ভাই ”
এইটুকু বলে হুট করে মুখের হাসি নিভিয়ে ফেললো আহি। ভ্রু কুঁচকে ওর দিকে তাঁকালো তূর্য । নিজে যে ছেলে মানুষী করে ফেলেছে বুঝতে আর বাকি নেই তার। তবে এর আবার হঠাৎ কি হলো বুঝতে পারল না সে। আহি অভিমানী গলায় বলল,
” তাছাড়া আমি আর আপনার রুমে যাবোও না।আপনি তো আমাকে যেতে নিষেধ করেন তূর্য ভাই।তবুও আমি নির্লজ্জের মতো যাই ।আর যাবো না ”
তূর্য টেবিল থেকে কফির মগটা উঠিয়ে এক স্লিপ নিতে নিতে আবার চেয়ারে বসলো।আহির দিয়ে তাঁকিয়ে চোখ ছোট ছোট করে ভাবলেশহীন কন্ঠে বললো,

” ওহ রিয়েলি? নি’র্লজ্জের মতো? নি’র্লজ্জ নোস তুই? ”
আহি বিরোধিতা করে বলল,
” না! আপনি যেটাকে নি’র্লজ্জ বলছেন ওটাকে নির্লজ্জতা বলে না”
” মাত্র নিজেই তো বললি। ওকে ফাইন ! তাহলে কি বলে?”
“বে’হায়াপনা বলে।”বেশ কিছুক্ষণ ভেবে-চিন্তে বলল ও।
” দ্যাট মিনস মানছিস তুই বে’হায়া? ” আহি কোনো জবাব দিলো না। তূর্য জানতে চেয়ে বলল,
” আচ্ছা বে’হায়া আর নি’র্লজ্জের মধ্যে ডিফারেন্স কি? ”
উদাহরণ দিয়ে বোঝালো আহি,
” আপনি আমাকে বারবার আপনার রুমে যেতে নিষেধ করেন তবুও আমি যাই ,এটা হলো বে’হায়াপনা। যদিও এটা বেহায়াপনা নয় । আসলে ….”
তূর্য আটকালো ওকে ।বলল,
” হ্যাঁ,বুঝেছি।আর নি’র্লজ্জ? ”
আহি এগিয়ে এলো তূর্যের কাছে।সামান্য দূরত্ব রেখে ওর মুখের উপর তর্জনী আঙুল তুলে বলল,
” সেটা হলেন আপনি ! ”

মুহুর্তেই তূর্যের মুখের হাবভাব বদলে গেল ।আহি কিছুটা ভ’য় পেল বোধহয়। থতমত করতে করতে বলল,
” মানে আগে ছিলেন না তূর্য ভাই।এখন হয়েছেন ”
বলে তূর্যের তাঁক করে রাখা তর্জনী আঙুলটা সরিয়ে নিতে গেল। কিন্তু তার আগেই তূর্য সেটাকে মুঠ করে ধরলো ।নিজের দিকে কিছুটা টান দিলো সে। ফলস্বরূপ আহি খানিকটা ঝুঁকে পড়ল ওর দিকে। তূর্য নিজেকেও এগিয়ে নিলো আহির দিকে। অতঃপর ঠোঁ’টে কু’টিল হাসি ঝুলিয়ে বলল,
” লজ্জা ? সেটা তো কোনোকালেই ছিল না। এ্যান্ড নি’র্লজ্জতার লাস্ট স্টেজ অবধি দেখিয়ে আনবো। জাস্ট একটা মাসের অপেক্ষা ”
কান গরম হয়ে উঠলো আহির।চুপসে যাওয়া মুখ নিয়ে তাঁকিয়ে রইলো তূর্যের দিকে। ওর মুখের দিকে দৃষ্টি স্থির করলো তূর্য । ঠোঁটে হাসি রেখেই দুইবার ভ্রু নাচালো। ভ্রুর ইশারায় জানতে চাইলো ‘ কি হলো?’ আহি একটা ঢোক গিয়ে এদিক-ওদিক ‘ না ‘ বোধক মাথা নাড়লো। আঙুল ছাড়ানোর চেষ্টা করতে করতে বলল,

” হাত ছাড়ুন তূর্য ভাই….”
তূর্য ওর ভড়কে যাওয়া মুখের দিকে আরো কিছুক্ষন চেয়ে রইলো।তারপর বিরক্তি নিয়ে বলল,
” কথার মাথায় ভাই লাগানো বন্ধ কর আহি।”
আহি পিঠ সোজা করে দাঁড়াতে চাইলো। অবুঝ ভঙ্গিতে বলল,
” তাহলে কি বলবো? ”
তূর্য ছেড়ে দিলো ওর আঙুল।চলে যেতে যেতে বলল,
” আপাতত কিছু না। কি বলতে হবে এক মাস পর শিখিয়ে দিবো ”
তূর্য যাওয়ায় আহি যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো। বুকে হাত রেখে হৃৎপিণ্ডের গতিবিধি মেপে নিলো। বিছানা থেকে একটা বালিশ উঠিয়ে লজ্জায় রাঙা মুখ ঢাকলো। মনে মনে তূর্যের বলা শেষ কয়েকটা কথা ভাবতে থাকলো।

সকাল সকাল জরুরী বৈঠক বসেছে চৌধুরী বাড়িতে । ছেলেপক্ষ-মেয়েপক্ষ ভাগাভাগি নিয়ে কথাবার্তা ,ত’র্ক চলছে। দীর্ঘ ঘন্টা খানেকের বাকবিতণ্ডা শেষে পক্ষ ভাগাভাগি সম্পন্ন হলো।বাড়ির তিন কর্তা আর তাহি মেয়েপক্ষ ।অন্যদিকে বাড়ির তিন গিন্নি এবং শান্ত-প্রান্ত ছেলেপক্ষ। আরো কিছুক্ষনের আলোচনায় ঠিক করা হলো তারা আজই ছেলে দেখতে আসবে। তবে সমস্যা হলো ছেলেকে এসব বিষয়ে রাজি করানো। জো’র-জ’বরদস্তিতে কাজ হবে না ,টেকনিক্যালি রাজি করাতে হবে তাকে। সেসব প্ল্যানও করে ফেললো তারা। যে প্ল্যান বানিয়েছে একশতে একশো কাজ দিবে। এখন শুধু বিকালের অপেক্ষা।
অপেক্ষা করতে করতে সেই কাঙ্ক্ষিত সময় এলো। তূর্য কিছুক্ষণ আগেই বাড়ি ফিরেছে। ড্রয়িং রুমে সকলে জড় হয়ে তাকে জরুরী ভিত্তিতে ডেকে পাঠালো। তূর্যও এলো।সবাইকে এভাবে একত্রিত হয়ে বসে থাকতে দেখে বুঝলো সকলে মিলে কিছু একটা কাহিনী পাকিয়েছে। আর যেখানে স্বয়ং আকবর চৌধুরী উপস্থিত সেখানের কথাবার্তা তার ফেইভারে হওয়া কোনো ভাবেই সম্ভব নয়।
তূর্য নিচে আসতেই আকবর চৌধুরী ওকে বসার জন্যে ইশারা করলো। বসলো সে।আকবর চৌধুরী একটা গলা খাঁকারি দিয়ে বললেন,

” শুরুতে তোমাকে মেয়ে দেখা-দেখির বিষয়ে বলা হয়েছিল,তুমি সম্মতি দেওনি। তাই আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম ছেলে দেখতে যাব। ”
বি’রক্তিতে তূর্যের চোখ মুখ কুঁচকে আসলো। আশ্চর্য হয়ে বলল,
” এগুলো কেমন ফাজলামো আব্বু ? ”
” এত কথা আমরা শুনতে চাচ্ছি না। ছেলেকে দেখতে এসেছি আমরা। ” সামনে থাকা খাবার গুলো দেখিয়ে বললেন,
” এই দেখো,তোমার মা-চাচিরা আমাদের নাস্তাও দিয়েছে ”
তূর্য একবার সামনে সাজিয়ে রাখা রাজকীয় খাবারগুলোতে নজর বুলালো। কোনো আইটেম বাদ দেওয়া হয়নি সেখানে। কিছুক্ষণের নীরবতা শেষে বললো,
” ছেলেকে দেখেছেন ? এবার আসি? ”
আসলাম চৌধুরী বললেন,

” শুধু দেখলেই হবে ? কত প্রশ্ন করার আছে সেগুলো করবো না ?”
” এসব বন্ধ করুন চাচ্চু ” অনুরোধ করে বলল তূর্য। আকবর চৌধুরী বললেন,
” তুমি এসব পছন্দ না করলে চলে যেতে পারো।তাহলে আমরাও আমাদের মেয়ে দিতে পছন্দ করবো না ”
” আমি দুই বছরের বাচ্চা নই যে,আমাকে এসব ব্লা’ক মেইল করবেন আর আমি ভ’য় পাবো ”
” তাহলে ত্রিশ বছরের বুড়ো হিসাবে শোনো, এসব রিচ্যুয়্যাল আমরা পালন করবই । তুমি যত দেরি করবে বিয়েই তারিখ ততো পিছনে যাবে। কিন্তু এই রিচ্যুয়্যাল তোমাকে পালন করতেই হবে ,আব্বাজান ”
তূর্য চোয়াল শক্ত করে শুনলো বাবার কথা। কফিনের শেষ পেরেকটা মনে হয় কাজে দিয়েছে।সবাই ঠোঁট টিপে হাসছে। তবে আহি হাসবে না বলে পণ করেছে। সেই শুরু থেকে তূর্য ওকে পরখ করছে ।একবার হেসে ফেললেই সবার অগচরে ওকে ধরা করবে। পানিশমেন্ট দিবে।তারপর মনোমালিন্য হবে।আর আহি আপাতত এসব চাচ্ছে না।তূর্য কিছুক্ষণ দম মে’রে বসে থেকে বলল,

” দয়া করে প্রশ্ন পর্ব শুরু করুন। ”
” ত্যাঁড়া-ব্যাঁকা উত্তর দিলেও হবে না ”
বলে প্রথম প্রশ্ন পর্ব শুরু করতে গেলেন আকবর চৌধুরী।কিন্তু ভাইকে থামিয়ে দিলেন আসিফ চৌধুরী । বললেন,
” এভাবে ট্রাউজার-টিশার্ট পরে? মেয়ে দেখতে গেলে তারা শাড়ি পরে আসে মনে হয় ”
” হ্যাঁ,ছোট বাবা ঠিক বলেছেন ! ” নিজেকে সামলাতে না পেরে সাঁয় দিয়ে ফেললো আহি।তূর্য শক্ত দৃষ্টিতে চাইলো ওর দিকে। দাঁত পি’ষে বলল,
” তো? আমিও শাড়ি পরে আসবো ? ”
” ট্র্যাডিশনাল কিছু পরলেই হবে। ” মিনমিন করে বলল আহি।
” লুঙ্গি আর স্যান্ড গেঞ্জি পরে আসি?” ওর কাছে জানতে চাইলো তূর্য। আহি চুপচাপ বসে রইলো। অন্যসময় হলে এখানে সবাই উপস্থিত সাক্ষী থাকা সত্ত্বেও বিচার দেওয়া হয়ে যেত। কিন্তু এখন সে কাজ করলো না ও।লোকটা এমনিতেই মাইনকা চিপায় পড়ে গিয়েছেন।তার উপর এত বেশি জ্বা’লানো উচিত হবে না।
আসলাম চৌধুরী বললেন,

” থাক পোশাক পাল্টানোর দরকার নেই। ভাইজান কি প্রশ্ন করার করো ”
আকবর চৌধুরী নাম জিজ্ঞেস করার মাধ্যমে প্রশ্ন পর্ব শুরু করলেন।একটু সময় নিয়ে হলেও ঠিকঠাক উত্তর করলো তূর্য। পরের প্রশ্ন করলেন আসিফ চৌধুরী,
” বাবা,তুমি কি কোরআন শরীফ তেলাওয়াত করতে জানো? ”
এবারে সাথে সাথে উত্তর করলো তূর্য,
” সেটা তো আমার থেকে আপনার ভালো জানার কথা। প্রথমদিন হুজুরের কাছে তো আপনিই নিয়ে গিয়েছিলেন ।মনে নেই আপনার? তাছাড়া হুজুর আমাকে বলেছিলেন ,আপনিও নাকি তার কাছে পড়তেন। আরো তার ভাতিজির পিছু ঘুরঘুরও করতেন।এই কারণে হুজুর নাকি একদিন আপনাকে খুব মে’রেছিলেন ,সত্যি নাকি চাচ্চু? ”
ড্রয়িং রুমে যেন হাসির রোল পড়ে গেল। শুধু হাসি নেই দুইটি মানুষের মুখে। একজন, যে এত বড় সত্যিটা ফাঁস করলো, সে ।আর অন্যজন ,যে কিছু কাল আগে অনুনয়-বিনয় করে ভাতিজাকে আটকিয়েছিল এ কথা ফাঁস করা থেকে, সে। ছোট বেলায় কথাটা শুনলেও আজ ঠিকই হাটে হাঁড়ি ভেঙে দিলো ছেলেটা।
আসিফ চৌধুরী ঘনঘন কয়েকটা শুকনো কাশি দিয়ে স্ত্রীর দিকে তাঁকালেন।হাসি থামিয়ে রু’দ্র রূপ নিয়ে স্বামীর দিকে তাঁকিয়ে আছেন লতা বেগম। স্ত্রীর এমন ভ’য়ঙ্কর রূপ দেখে মেকি হাসলেন তিনি। পরবর্তীতে আর কোনো প্রশ্ন করার সাহস দেখালেন না।একটা প্রশ্ন করতে গিয়ে স্ত্রীর কাছে না জানি কত হাজার প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়। এবারের প্রশ্ন করলেন আসলাম চৌধুরী,

” বলছিলাম ছেলের কি ফোকলা নাকি? গালে দাঁত নেই? এখনো পর্যন্ত হাসতে দেখলাম না ! ”
এহেন প্রশ্নে পুনরায় হাসির রোল পড়লো সেখানে।সেই হাসির ইতি ঘটলো তূর্যের উত্তরে,
” না থাকলে তো আপনাদেরই সুবিধা হতো । পানি ভাত রান্না করে জামাই আদর করে দিতেন।মাছ-মাংসের দরকার পড়ত না। আফসোস ! দুর্ভাগ্য আপনাদের ”
” ছেলের কোনো নেশা-টেশা করার অভ্যাস আছে নাকি? ” এবারের প্রশ্ন করলেন আকবর চৌধুরী।
” জ্বি,আছে ! ”
তূর্যের এমন উত্তরে আকবর চৌধুরীর মুখ রা’গে লাল হয়ে উঠলো।বাড়ির বাকি সবাইও অবাক হলেন।কিন্তু পারভিন বেগম ছেলের এমন উত্তর বিশ্বাস করতে পারলেন না। রা’গে আকবর চৌধুরীর শরীর রীতিমতো কাপছে। ওনাদের চৌদ্দ গুষ্টিতে কেউ নেশাখোর ছিলেন না।আর এই ছেলে নেশাও করে! সেটা আবার বড় মুখ করে সবার সামনে বলছেও ! তিনি ধ’মকে উঠলেন।বললেন,

” কবে থেকে এসব শুরু করেছ? ”
” হয়েছে বেশ কয়েক বছর ! ” সাবলীল গলায় উত্তর করলো তূর্য।
তিনি পুনরায় প্রশ্ন করলেন,
” দুনিয়ায় বিরাজমান সকল নেশাই করো ? ”
” নাহ! একটা-ই ”
” গাঁজা?মদ ? হিরোইন? নাম কি?কি সেই নেশা? ”
” আপনাদের মেয়ের নেশা ! ”
ব্যস! এক উত্তরে ঘর শুদ্ধু সবাই নিশ্চুপ। মুখ লুকানোর জায়গা পেলেন না বড়রা। আহি লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেললো। মনে মনে একশো কথা শুনালো তূর্যকে।

” নির্লজ্জ,অসভ্য ছেলে” বিড়বিড় করে বলতে বলতে চলে গেলেন আকবর চৌধুরী। বাকিরাও একে একে কেঁটে পড়লেন। আর ছোট তিনটা দৌঁড়ালো বাবা-চাচাদের পিছু।প্রশ্ন পর্বে তাদের মন ভরেনি ,একটু হেঁটে দেখাতে বলবে , সূরা ফাতিহা তিলাওয়াত করতে বলবে। এত শিগগিরি সবকিছু শেষ হয়ে গেলে পড়ে কত! ড্রয়িং রুম ফাঁকা হতেই তূর্য আহির হাত ধরে নিজের রুমের উদ্দেশ্যে নিয়ে যেতে লাগলো।
আহি সাফাই দিতে দিতে বলল,
” তূর্য ভাই,বিশ্বাস করুন এসব আইডিয়া আমার মাথার ছিল না। আমি ওনাদের এসব রিচ্যুয়্যাল পালন করতে বলিনি।ওনার নিজেরা-নিজেরাই করেছেন।”

প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ৫৩

” হুম, আই নো ! ”
” তাহলে কোথায় নিচ্ছেন আমাকে? ”
” ছেলে ফোকলা কিনা প্রুফ দিতে। সাথে দাঁতগুলো মজবুত কিনা, কতটুকু জোর আছে সেগুলোও দেখিয়ে দিবো। তোর বাপকে গিয়ে আপডেইট দিয়ে দিস ”

প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ৫৫