Home প্রফেসর উজান চৌধুরী প্রফেসর উজান চৌধুরী পর্ব ৩৯

প্রফেসর উজান চৌধুরী পর্ব ৩৯

প্রফেসর উজান চৌধুরী পর্ব ৩৯
বন্যা সিকদার

​“হাউ সুইট। ইফাত চৌধুরীকে ভয়ও পাও বুঝি? ভালোবাসো না আমায়?
ইফাতে’র কণ্ঠে তীব্র মাদকতা। ​মেহের লাজুক হেসে মাথা নাড়িয়ে স্বীকার করল যে সে ভালোবাসে। বউ’য়ের এই স্বীকারোক্তিতে ইফাত বেজায় সন্তুষ্ট হলো। সে মেহেরে’র সাথে নিজের ঘনিষ্ঠতা আরও একধাপ বাড়িয়ে দিল। মেহেরে’র দুই ঠোঁটের দূরত্ব ঘুচিয়ে দিতে সে যেই না নিজের মুখটা মেহেরে’র দিকে এগিয়ে নিয়ে গেল। ​ঠিক তখনই মৌ চিৎকার দিয়ে উঠে।

​“মেহু শেষে তুইও এমন পঁচা কাজ করতে যাচ্ছিস? প্রফেসরের বাচ্চা ছাড়ুন আমায়।
​উজান পেছন থেকে টেনেও মৌ’কে আর ধরে রাখতে পারল না। মৌ এক ঝটকায় উজান’কে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে সোজা মেহেরে’র কাছে চলে গেল। ইফাতে’র শক্ত বাঁধন থেকে মেহের’কে এক টানে নিজের দিকে সরিয়ে নিল সে। তারপর মুখ বাঁকিয়ে চরম বিরক্তি নিয়ে ইফাতের দিকে তাকাল।
​”খ্রাপ বেডাছেলে একটা! তোমার সাহস হয় কীভাবে আমার মেহু’কে কিস করতে যাচ্ছিলে‚ হ্যাঁ?
মৌ কোমরে হাত দিয়ে জেরা করার ভঙ্গিতে বলল। ​তার কথায় ইফাত পুরো ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেল। একে তো নিজের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পার্সোনাল মুহূর্তে এমন অনাকাঙ্ক্ষিত হস্তক্ষেপ‚ তার ওপর আবার এমন অদ্ভুতুড়ে অভিযোগ। নিজের পুরুষত্বে আঘাত লাগায় ইফাতও আর চুপ থাকতে পারল না। সেও চিৎকার করে উঠল‚

​“হোয়াটটট? বেডাছেলে? উজান তোর বউ এসব কী বলছে? আমাকে তোর বউ’য়ের কোন অ্যাঙ্গেল দিয়ে হিজড়া মনে হয়? শোন মামা আমি সব দিক দিয়েই পারফেক্ট। হোক সেটা খাটে কিংবা….
​ইফাত তার বাকি কথা শেষ করার আগেই উজান পেছন থেকে এসে সটান তার পাছা বরাবর এক জোরালো লাথি বসাল। পার্সোনাল মুহূর্তে মৌ’য়ের এভাবে আসাটা ঠিক হয়নি সত্য। তাই বলে ইফাত তার পিচ্চি বউয়ের সামনে এমন বিশ্রি কথা উচ্চারণ করবে? আর কোন আক্কেলমান্দ পুরুষ মানুষ বাসর রাতে রুমের দরজা খোলা রেখে রোমান্স করে? উজান নিজেই এবার দাঁত খিঁচিয়ে বলে উঠল‚
​“দাঁত ভেঙে ফেলব তোর বেয়াদব ছেলে। একে তো দরজা খুলে রেখে মাঝরাতে ‘ইয়ে’ করছিস‚ তার ওপর আমার নাদান বউটার দিকে আঙুল তুলছিস? জুতো চিনিস জুতো?
​ইফাত একটা শুকনো ঢোক গিলল। মনে মনে ভাবল শালা ভাইটা আমার‚ বউ পেয়ে নিজের বন্ধুকেই ভুলে গেল। এই দুঃখ সে এখন কোথায় রাখবে? এত বড় ধাড়ি একটা মেয়ে‚ যে কিনা মলে গিয়ে পুরো এক মল শপিং করে এসেছে। তাকে উজান বলছে ‘নাদান’ ভাবা যায়?
​হঠাৎই ইফাতে’র মনে পড়ল যে দরজাটা আসলে খোলা ছিল না। উজান নিজেই তো লাথি মেরে লক ভেঙেছে। সেই কথা মনে হতেই সে একটু বেলুনের মতো চুপসে গেল। তবুও নিজের ভেতরের তেজটুকু ধরে রেখে ওল্টো উজান’কে শুনিয়ে বলল‚

“আমার বউ‚ আমার বাসর রাত। আমি দরজা খুলে ‘ইয়ে’ করব নাকি দরজা লক করে করব সবটাই আমার ম্যাটার। তুই তোর এই পাগলী বউ’কে নিয়ে এখান থেকে যা তো ভাই। শালী আমার রোমান্সের বারোটা বাজিয়ে মনটাই ভেঙে দিল।
​ইফাতে’র মুখে ‘বউ’ আর ‘বাসর রাত’ শব্দ দুটো শুনে মৌয়ের চোখ এবার কপালে উঠল। সে মেহেরে’র দিকে ফিরে বলল‚
“বউ? বাসর রাত? মেহু তুই আমাকে না জানিয়ে বিয়ে করে ফেলেছিস? এই আমি তোর বেস্ট ফ্রেন্ড? গুল্লি মারি তোর বেস্ট ফ্রেন্ডের কাঁথায়।
​এই বলেই অভিমানে ঠোঁট উল্টে গটগট করে রুম থেকে বেরিয়ে গেল মৌ। তার পিছু পিছু মেহেরও ভারী শাড়ির কুঁচি দুইহাতে উঁচু করে ধরে দৌড়াতে লাগল। পেছন থেকে মেহের অনবরত ডেকে চলল কিন্তু মৌ তার কোনো কথাই শুনল না বরং আরও তাড়াহুড়ো করে নিজের রুমের দিকে এগিয়ে গেল।

​”মৌ দাঁড়া বইন‚ একটাবার আমার কথা শোন।
মেহের হাপাচ্ছ আর ডাকছে। ​কিন্তু কে শোনে কার কথা। মৌ ততক্ষণে নিজের রুমে ঢুকে পড়েছে। মেহেরও যেই না মৌ’য়ের দেখাদেখি রুমে পা রাখল‚ অমনি মৌ বিদ্যুৎ গতিতে রুমের কোণ থেকে একটা চেয়ার টেনে আনল। দরজার হাতলে চেয়ারের কোণটা ঠেস দিয়ে এক ঝটকায় সে ভেতর থেকে রুম লক করে দিল। ​মৌ’য়ের এমন আকস্মিক আর অদ্ভুত কাণ্ডে মেহের খানিকটা ঘাবড়ে গিয়েছিল। কিন্তু পরক্ষণেই মৌ’য়ের এই কাণ্ডকারখানা আর চেহারার ভঙ্গি পরখ করে সে আর নিজের হাসি চেপে রাখতে পারল না। খিলখিল করে হেসে উঠল মেহের। ​মৌ এবার চেয়ার থেকে নেমে দৌড়ে গিয়ে মেহের’কে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। যেন কত যুগের চেনা আপন এক আশ্রয়।
​এদিকে উজান আর ইফাত দুজনে মৌ‚ মেহেরে’র পিছু পিছু ছুটে এসে দরজার সামনে দাঁড়াল। ভেতর থেকে খটাস করে দরজা লক হওয়ার শব্দ শুনে দুজনেই চমকে তাকাল। ইফাত পুরো ব্যাপারটা বুঝতে না পেরে বোকার মতো মাথা চুলকাতে লাগল। তবে উজান আর বুঝতে বাকি রইল না তার এই ধুরন্ধর পিচ্চি বউ আসলে মেহেরে’র ওপর রাগ করেনি বরং বাসর রাতে মেহেরে’র সাথে ঘুমানোর জন্যই এই অভিনব নাটকটি সাজিয়েছে। উজান কপালে হাত দিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল‚ আর ইফাত নিজের কপাল চাপড়াতে লাগল।

​“ভাই তোর বউ এটা কী করল?
ইফাত কপালে হাত দিয়ে একপ্রকার আর্তনাদ করে উঠল। ​উজান ইফাতে’র দিকে তাকাল। তার থমথমে মুখের আড়ালে আলতো একটা দুষ্টুমির হাসি ফুটে উঠল। তা দেখে ইফাতে’র গা-পিত্তি জ্বলে উঠল। একে তো এত ঝড়-ঝাপটা পার করে মেয়েটাকে পবিত্রভাবে আজ কাছে পাওয়ার সুযোগ এসেছিল কিন্তু মৌ এসে পুরো বাসর রাতটাই ভেস্তে দিল। রাগে-ক্ষোভে ইফাত আর নিজেকে সামলাতে না পেরে চেঁচিয়ে উঠল‚
​“শা*লা ভণ্ডের ঘরে ভণ্ড। নিজে তো বাসরের ‘ব’-ও করতে পারলি না কিন্তু আমার বাসর রাত তোর বউ ভেস্তে ঠিকই দিল। শালীর মেয়ে আমার বউ’টাকে নিয়ে চলে গেল। এখন আমি কার সাথে বাসর করব? তোর মতো খ্রাপ বেডার সাথে?

“হাউ সুইট। যেখানে তোর বড় ভাই হয়ে আমি নিজে এখনো পর্যন্ত কোনো কিছু-মিছু করতে পারলাম না‚ সেখানে তুই বাসর রাতে এত কিছু করে ফেলবি এটা তুই ভাবলি কীভাবে? আমার বউজান আমার মনের কথাটা একদম ঠিকঠাক বুঝেছে‚ তাই তোর বউ’কে টেনে নিজের কাছে নিয়ে চলে গিয়েছে। ইসসস‚ কী সুইট আমার পিচ্চিটা। মন চাইছে এখনই গিয়ে ওকে কষে হাজার খানেক চুমু দিয়ে আসি।
উজানে’র এমন তাচ্ছিল্যভরা কথা শুনে ইফাত চরম বিরক্তি নিয়ে নাক কুঁচকাল। একে তো তার জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সময়ে এসে ওই মেয়েটা হুলস্থুল বাধাল‚ তার ওপর আবার এই উজান এসে তাকে রীতিমতো ভ্যাঙাচ্ছে। ​ইফাত খানিকটা রাগ দেখাল‚

“জীবনেও পারবি না শালা। তোর কপালে কোনোদিন বউ’য়ের ভালোবাসা নেই। তোকে আমি আজ অভিশাপ দিলাম‚ তুই এভাবে সারাজীবন বউ থেকেও সিঙ্গেল মরবি।
​“তাতে আমার বা*ল যাবে। বউ যখন আমার‚ তাকে আমি যখন-তখন নিজের করে নিতে পারব।
উজান একটা বিন্দাস ভাব নিয়ে বলল। ​ইফাত এবার নিজের রাগ সামলে একটু নরম সুরে আকুল মিনতি করল‚ “ভাই তুই তোর বউয়ের সাথে যা ইচ্ছে তা-ই কর ‚ তাতে আমার কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু প্লিজ‚ আমার বউ’টাকে ফিরিয়ে দে না রে। তুই গিয়ে একবার বললেই ভাবি আমার ফুলকন্যাকে দিয়ে দেবে। একটু হেল্প কর ভাই।
​উজান এবার মুখে এক অদ্ভুত দুষ্টুমিভরা হাসি ঝুলিয়ে মাথা নাড়ল। “নো নো‚ অসম্ভব। আমার স্পেশাল নাইটে যখন কোনো কিছু-মিছু হয়নি। তখন তোর স্পেশাল নাইটেও আমি কিচ্ছু হতে দেবো না। সমান সমান হিসাব।
​ইফাতে’র ধৈর্যের বাঁধ এবার পুরোপুরি ভেঙে গেল। সে দাঁত কিড়মিড় করে রেগে মেগে উজানে’র পুরুষত্বে সরাসরি আঘাত হেনে বলে উঠল‚

​“হবে কীভাবে? তুই তো নিজেই একটা থার্ড জেন্ডার। নয়তো ঘরে এমন রূপবতী বউ থাকার পরেও আজ পর্যন্ত তুই…..
​উজান আর সহ্য করতে পারল না। সে রাগ নিয়ে ইফাতে’র দিকে তেড়ে যেতেই ইফাত এক দৌড়ে ওখান থেকে পালালো। পেছন থেকে উজানও তার পিছু নিয়ে চেঁচাতে লাগল‚
“ইফাতের বাচ্চা দাঁড়া বলছি।
​ইফাত দৌড়াতে দৌড়াতেই পেছন ফিরে জবাব দিল‚ “হ আমি দাঁড়িয়ে যাই আর তোর হাতে কেলানি খাই। শা*লা নিজের বউকে তো সামলে রাখতে পারিস না কিন্তু আমাকে ঠিকই কেলানি দিতে আসিস। আমার তো এখনো সত্যি তোকে সন্দেহ হচ্ছে। ভাই তুই আদেও পুরুষ তো? নয়তো বিয়ে হওয়ার মাস কয়েক হয়ে গেল‚ তবুও বউয়ের সাথে আজ পর্যন্ত ‘ইয়ে’ করতে পারলি না।

​ইফাত পেছন ফিরে এক পলক তাকিয়েই উজানে’র রূদ্রমূর্তি দেখে আবারও ‘ভো’ দৌড় দিল। উজানে’র মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে সে আজ চরম ক্ষ্যাপা। তাই নিজের মূল্যবান প্রাণ বাঁচাতে ইফাত সোজা নিজের রুমে ঢুকে ধড়াম করে দরজা আটকে দিল। আর এদিকে মৌ মেহের’কে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বিছানায় শুয়ে পড়েছে। মেহের’কে আজ অনেক দিন পর এভাবে নিজের এত কাছে পেয়ে মৌ’য়ের আনন্দের সীমা নেই। সে আজ মনে হয় পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী। যে মেয়েটাকে একসময় সবাই তাচ্ছিল্য করত‚ আজ সেই মেয়েটাই কোনো এক শ্রেষ্ঠ পুরুষের শখের নারী‚ তার রাজপ্রাসাদের রানি। এবার মৌ গর্ব করে সবাইকে বলতে পারবে‚ দুনিয়ার সব পুরুষ খারাপ হয় না‚ কিছু পুরুষ ইফাতে’র মতো শ্রেষ্ঠ বীর পুরুষও হয়।
​মৌ পরম মায়ায় মেহেরে’র গালে আঙুল বোলাতে লাগল। তার এই কাণ্ড দেখে মেহের দুই ভ্রু কুঁচকে তাকাল‚ “কী হয়েছে তোর?

​”মেহু তুই এত সুইট কেন বল তো? জানিস‚ আমি আজ অনেক অনেক অনেক হ্যাপি। আমার মেহু আজ লাল বেনারসি সেজে আমার ভাইয়ের বউ হয়েছে। কিন্তু…
​“কিন্তু কী পাখি? —মেহের করে শুধাল।
​”তোকে তো ভাইয়ার কাছ থেকে একপ্রকার কেড়েই নিয়ে এলাম। ভাইয়া মনে হয় অনেক কষ্ট পাচ্ছে‚ তাই না? পাক তাতে আমার কী? মিসেস উজান চৌধুরী কখনো কথার খেলাপ করে না। তোকে বলেছিলাম না‚ তোর বাসর রাতে তোকে আমার কাছে ছিনিয়ে নিয়ে আসবো? দেখ ফাইনালি নিয়েই এলাম। ইসস কী যে ভালো লাগছে আমার।
​মৌকে এভাবে খিলখিল করে হাসতে দেখে মেহের নিজের ভেতরের সব কষ্ট ভুলে হেসে ফেলল। তারও অনেক ইচ্ছে ছিল‚ তারা দুজনে সারাজীবন এক ছাদের নিচে একসাথে থাকবে। কিন্তু কে জানত‚ ওপরওয়ালা সত্যি সত্যি তাদের মনের এই গোপন আশাটা এভাবে পূরণ করে দেবেন। মেহের মৌ’য়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে ফিসফিস করে বলল‚

​“আমার তাহার কথা বাদ দে। তার আগে বল‚ তুই ভাইয়ার সাথে এমন করছিস কেন? আমি সত্যি ভাইয়ার মুখের দিকে তাকাতে পারি না। তুই তো আর ছোট নোস‚ বুঝিস তো সব। তবুও কেন এমন বাচ্চামো করিস? জানি ভাইয়ার ধৈর্য অনেক‚ ইভেন তোকে অনেক ভালোবাসে। তাই বলে সবসময় এভাবে দূরে দূরে থাকবি?
​মৌ’য়ের মুখের হাসি এবার মিলিয়ে গেল। সে একটু ক্ষোভ নিয়ে বলল‚ “তো কী করব? শা*লা আমাকে অনেক কষ্ট দিয়েছে‚ এখন তার বুঝার পালা। দুই-দুটো বছর আমাকে কোনো পাত্তাই দেয়নি। এমনকি লাস্ট কয়েক মাস এক ছাদের নিচে থেকেও নিজে থেকে একটা পাপ্পিও দেয়নি। কষ্ট হয় না বুঝি আমার? এটলিস্ট বলতে তো পারত ‘পিচ্চি আমার কিছু দিন টাইম লাগবে। কিন্তু না‚ সে তখন ভাব দেখাতো আমাকে বউ বলেই মানে না‚ আমার সাথে সংসার করতে পারবে না। নে শা*লা‚ এবার ঠেলা সামলা। চমচম পেয়েছিস ঠিকই কিন্তু সহজে টেস্ট করতে পারবি না।
​মৌ’য়ের মুখে এমন পাকা পাকা কথা শুনে মেহের আলতো করে তার মাথায় একটা গাট্টা মারল। মেয়েটা দিন দিন ভারী দুষ্টু হয়ে যাচ্ছে। সে হেসে বলল‚ “হয়েছে অনেক জ্ঞান দিয়েছিস। এবার ঘুমা নয়তো একটু পর ভোর হয়ে যাবে।

​মৌ হঠাৎ চোখ টিপে বলল‚ “তার আগে চল তোকে ভাইয়ার কাছে রেখে আসি?
​মেহের অবাক হয়ে চোখ তুলে তাকাল। মৌ সাথে সাথে এক গাল হেসে দিল। মেহের সন্দেহভরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো।
“তার মানে তুই ভাইয়াকে মিস করছিস‚ আর সেই জন্য এখন আমাকে তার কাছে ফেরত দিয়ে আসতে চাইছিস?
​”ধুর। প্রফেসর সাহেব আর তুই দুজনই আমার লাইফের বেস্ট দুটো মানুষ। তোদের দুজনকেই আমি ভীষণ মিস করি। ভাবলাম ভাইয়ার কাছ থেকে আজকের রাতটা অন্তত তোকে আলাদা করা ঠিক হয়নি। না থাক কালকে তো তোকে দিয়েই দেবো। আর ওই খাটাশ লোকটাকে মাঝে মাঝে একটু-আধটু শাস্তি দিতে হবে‚ নয়তো ভালোবাসার জোর কমে যাবে। গুড নাইট‚ জানু উম্মাহহহহ।
মৌ মেহেরের বুকে মুখ লুকাল। ​মেহের হেসে মৌ’কে নিজের বাহুবন্ধনে জড়িয়ে নিলো।
“গুড নাইট পাগলী।

​“আসসালামু আলাইকুম‚ মিসেস চৌধুরী।
​ঘুমের ঘোরে পরিচিত পুরুষালি কণ্ঠস্বর পেয়ে মেহের খানিকটা নিভু নিভু দৃষ্টিতে তাকাল। কিন্তু চোখের সামনে সরাসরি ইফাত’কে দেখতে পেয়ে সে ধড়ফড় করে তড়িঘড়ি বিছানায় উঠে বসল। পাশ ফিরে মৌ’কে দেখতে না পেয়ে তার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল‚ সে বেশ ঘাবড়ে গেল। এমনকি পুরো কক্ষটায় চোখ বুলিয়ে দেখল‚ চারপাশটা কেমন অচেনা লাগছে তার। সে ভয় পেয়ে যেই না চিৎকার দিতে যাবে‚ অমনি ইফাত দ্রুত তার মুখটা হাত দিয়ে চেপে ধরল।
​“এই পঁচা মেয়ে শান্ত হও। আমি তোমায় কিডন্যাপ করিনি‚ প্লিজ একটু রিল্যাক্স হও।
ইফাত মুচকি হেসে বলল। ​মেহের বড় বড় চোখ করে ইফাতে’র দিকে তাকিয়ে রইল। ইফাতও নিজের দৃষ্টি স্থির রেখে তার দিকে চেয়ে আছে। মেহের নিজের মুখ থেকে ইফাতে’র শক্ত হাতটা সরানোর আপ্রাণ চেষ্টা করল কিন্তু পারল না। উল্টো তার দম বন্ধ হয়ে আসার উপক্রম হলো। উপায় না পেয়ে সে ততক্ষণে ইফাতে’র আঙুলে জোরে একটা কামড় বসিয়ে দিল। কামড় খেয়ে ইফাত চিৎকার করে উঠল।

​“ফুলকন্যা তুমি আমায় কামড়ালে? সিরিয়াসলি? আমার বউ আবার উজানে’র বউয়ের সাথে অদল-বদল হয়ে যায়নি তো? স্বভাব তো দেখি একদম ওর মতোই।
​মেহের রেগে বলল‚ “চুপ করুন আপনি। একটুর জন্য আমার দমটাই বেরিয়ে যাচ্ছিল। মৌ কই? আর আমাকে কোথায় নিয়ে এসেছেন আপনি?
​সাথে সাথে ইফাত মেহেরে’র একদম পাশে ঘেঁষে বসল। তার সাথে খানিকটা ঘনিষ্ঠতা বাড়িয়ে মেহেরে’র কাঁধে নিজের মাথাটা এলিয়ে দিয়ে স্লো ভয়েসে আওড়াল‚ “এই রুমটাও আমার। আর এখানে বসে থাকা এই টুকটুকে মিষ্টি বউটাও আমার।
​”আ আ আমি এখানে কীভাবে এলাম?
মেহের অবাক হয়ে শুধাল।
​ইফাত ঘাড় বাঁকিয়ে মেহের’কে এক পলক দেখল। তারপর আবারও আগের মতো আয়েশ করে বসে মুচকি হাসল। চোখ বন্ধ করে বলতে লাগল‚

“উজান ওর পিচ্চি বউ’কে ছাড়া এক মুহূর্তও থাকতে পারে না। সেই জন্য সে রুমের সিক্রেট দরজা দিয়ে মৌ’য়ের রুমে ঢোকে। কিন্তু সেখানে তো আমার বউও ছিল। সে নিজের বউ’য়ের কাছে থাকার জন্য আমার মিষ্টি বউ’টাকে পরম যত্নে আমার কাছে ট্রান্সফার করে দিল। আমিও সুযোগ বুঝে আমার মিষ্টি বউ’টাকে কোলে তুলে এই রুমে নিয়ে এলাম। সত্যি বলতে‚ রুমে এনে তোমায় অনেক জ্বালাতন করতে ইচ্ছে করছিল কিন্তু আমার মিষ্টি বউ’টার এই ইনোসেন্ট বাচ্চার মতো মুখটা দেখে নিজেকে সামলে নিলাম। একটা রাতেরই তো ব্যাপার‚ তাই আর বিরক্ত করলাম না। বাকি জীবন তো পড়েই আছে আমার মিষ্টি বউ’টাকে বিরক্ত করার জন্য।

​মেহের আর কিছু বলল না। লজ্জায় ও আবেশে মাথা নিচু করে রইল। মেহেরে’র এই লজ্জারাঙা মুখ দেখে ইফাতে’র ঠোঁটের কোণে হাসি আরও চওড়া হলো। সে যেই মেহেরে’র দিকে আরেকটু ঝুঁকে যেতে যাবে‚ অমনি কেউ একজন হুরমুরিয়ে রুমে ঢুকে পড়ল। ​হঠাৎ কাউকে আসতে দেখে মেহের বিদ্যুৎ গতিতে ইফাতে’র থেকে দূরে সরে গেল। আর মেহের আচমকা সরে যাওয়ায় ইফাত নিজের শরীরের ভারসাম্য সামলাতে না পেরে বিছানায় ধপাস করে পড়ে গেল। মেহের চোখ তুলে দরজার দিকে তাকিয়ে নিজের শাশুড়িকে দেখে লজ্জায় একপ্রকার লাল হয়ে গেল। ​ইফাতও নিজের মাকে দেখে দ্রুত সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে গেল। সে ধীরপায়ে মায়ের পাশে গিয়ে দাঁড়াল এবং খানিকটা ঝুঁকে ফিসফিসিয়ে আওড়াল‚
“কেমন আছো আম্মু?

​ছেলের এমন রসিকতা দেখে ইমরোজা চৌধুরী সাথে সাথে ইফাতে’র পিঠে একটা কষে থাপ্পড় বসিয়ে দিলেন। তারপর হাসতে হাসতে মেহেরে’র দিকে এগিয়ে গেলেন। মেহের’কে আলতো করে নিজের দিকে ঘুরিয়ে তার কপালে স্নেহের এক গভীর চুমু এঁকে দিয়ে মুচকি হাসলেন।
​“আমার এই বাঁদরের মতো ছেলের গলায় এমন মুক্তোর মালা কীভাবে ঝুলল‚ শুনি?
​মেহের চমকে উঠে এক অজানা ভয়ে থমকে রইল। সে ভেবেছিল‚ হয়তো তাকে এই ভোরে ইফাতে’র রুমে দেখে শাশুড়ি বাজে কিছু বলবেন বা খোটা দেবেন। কিন্তু তার এই অভাবনীয় ব্যবহারে মেহের বাকরুদ্ধ হয়ে গেল। সে অবুঝের মতো ইফাতে’র দিকে তাকিয়ে দেখল‚ ইফাত একদম স্বাভাবিক আছে কিন্তু মেহের নিজে কিছুতেই স্বাভাবিক হতে পারছে না। ​এমন সময় ইমরোজা চৌধুরী মেহেরে’র চিবুকটা আলতো করে উঁচিয়ে ধরে বললেন‚

“ওদিকে তাকাতে হবে না তোমায়। ইফাত আমাদের সবকিছু আগে থেকেই বলেছে। আর তোমার অতীত নিয়ে আমাদের কোনো অভিযোগ বা ক্ষোভ নেই‚ মা। আমরা সবকিছু আগে থেকেই জানি। তোমার সাথে অতীতে যা হয়েছিল‚ তা জাস্ট একটা দুর্ঘটনা ছিল। সেসব কুৎসিত স্মৃতি একদম মনে রাখবে না‚ মা। মানুষের জীবনে এমন একটু-আধটু ঝড় আসেই‚ সেসব আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকলে চলে না। এখন শুধু আমার এই বেপরোয়া ছেলেটার দিকে মনোযোগ দাও। তাকে নিয়ে ভাববে‚ তাকে শুধরে দেবে এছাড়া আর কোনো চিন্তা যেন তোমার মাথায় না ঢোকে নয়তো কিন্তু খুব খারাপ হয়ে যাবে।
​মেহেরে’র চোখ দুটো আবারও অশ্রুসিক্ত হয়ে উঠল। আপনা-আপনিই তার দু-চোখ বেয়ে নোনা জল গড়িয়ে পড়ল। সে ভেবেছিল তার অতীত জানার পর এই সমাজ‚ এই পরিবার হয়তো তাকে দূরে ঠেলে দেবে‚ অপয়া ভাববে। কিন্তু তারা যে সবকিছু আগে থেকেই জানত। এমনকি কত সহজে‚ বুকভরা ভালোবাসা দিয়ে তাকে নিজেদের ঘরের বউ হিসেবে মেনে নিয়েছে। অথচ সে এতদিন এক আকাশ সমান ভয় বুকে নিয়ে নিজেকে গুটিয়ে রেখেছিল। ​ইমরোজা চৌধুরী পরম মমতায় মেহেরের চোখের জল মুছে দিয়ে কৃত্রিম রাগ দেখিয়ে বললেন‚

“কী বললাম আমি মাত্র? ওসব চিন্তা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলো। এটা ভেবো না যে দুটো ভালো কথা বলছি মানে কিছু বলতে পারব না। দ্বিতীয়বার যদি তোমার চোখে আমি অশ্রু দেখি‚ তবে তোমায় কিছু বলব না। এই তোমার স্বামীকে লাথি দিয়ে বাসা থেকে বের করে দেবো।
​“আম্মু ও আমার বউ হয়। আর তুমি ওর সামনে আমার ইজ্জত নিয়ে কিসব বলছো?
ইফাত পেছন থেকে আমতা আমতা করে প্রতিবাদ জানাল।
​“চুপ কর গোলামের পুত।
ইমরোজা চৌধুরী ছেলেকে ধমকে দিয়ে মেহেরের দিকে তাকালেন‚ “শোন মা‚ আমি তোমার শাশুড়ী হলেও সবার আগে আমি তোমার মা। আর মা কখনো সন্তানের অতীত বা দোষ-গুণ দেখে বিচার করে না। যা হবার হয়ে গেছে‚ এবার নিজের নতুন সংসারে মন দাও। নতুন জীবন নিয়ে সুন্দর সুন্দর স্বপ্ন দেখো। আর আমি এখানে কিছু শাড়ি রেখে যাচ্ছি‚ আজকের দিনের জন্য একটু কষ্ট করে এগুলো পড়ে নাও মা। বুঝতেই তো পারছো‚ নতুন বউ দেখতে পাড়া-প্রতিবেশী সবাই আসবে। কাল থেকে যা ইচ্ছে পড়ো কোনো বারন করবে না এই মা। আচ্ছা‚ তুমি এবার রেডি হয়ে নাও। ইফাত আমার মেয়েটাকে একটু পরে নিচে নিয়ে আসিস।

​ইফাত মাথা নেড়ে সায় দিল। ইমরোজা চৌধুরী রুম থেকে চলে যেতেই মেহের ভেজা চোখে ইফাতে’র দিকে তাকাল। ইফাত তার দিকে ধীরপায়ে এগিয়ে এসে মেহেরে’র চোখের দিকে চেয়ে নরম গলায় বলল‚
“শুনলে তো আম্মুর বউমা? আমার বউয়ের চোখে আমি আর এক ফোঁটাও অশ্রু দেখতে চাই না‚ একদম না। এসব কান্নাকাটি আমার একদম পছন্দ নয়। আর পাস্ট নিয়ে এক বিন্দুও ভাববে না। অনলি আমাকে নিয়ে ভাববে‚ আমার করা দুষ্টুমিগুলো মেনে নেবে আর আমার দেওয়া মিষ্টি যন্ত্রণাগুলো উপভোগ করবে‚ ব্যস। বুঝেছো?

আর শোনো‚ তাড়াতাড়ি রেডি হও আমি একটু পর আসছি।
​ইফাত দরজার কাছে গিয়েও যেন মেহেরে’র মায়া কাটাতে পারল না। সে আবার ফিরে এলো মেহেরে’র কাছে। মেহের কিছু বুঝে ওঠার আগেই ইফাত ঝুঁকে এসে মেহেরে’র নরম গালে নিজের ঠোঁট ছোঁয়াল। তারপর তার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল‚

প্রফেসর উজান চৌধুরী পর্ব ৩৮

​“লাভ ইউ মাই জান।
​ইফাত চলে যেতেই মেহের নিজের গালে হাত দিয়ে আলতো করে হাসল। মানুষটা কত ভালো। তার এই বাজে অতীত জেনেও কতটা ভালোবাসে। এমনকি তার পরিবারও৷

প্রফেসর উজান চৌধুরী পর্ব ৪০

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here