প্রফেসর উজান চৌধুরী পর্ব ৪৮
বন্যা সিকদার
রুমের খোলা জানালার পাশে নিথর হয়ে দাঁড়িয়ে বৃষ্টির দেখছিল মৌ। আজ তার মনটা বড্ড ভারী। একদিকে রোহান’কে দেওয়া কঠোর আঘাত ও তার চোখের হাহাকার‚ আর অন্যদিকে আগামীকালই এই গ্রাম ছেড়ে ইট-কাঠের শহর ঢাকায় ফিরতে হবে। সে চেয়েছিল গ্রামের এই শান্ত পরিবেশে আরও কিছুদিন কাটিয়ে যেতে কিন্তু উজান একেবারেই রাজি নয়। তাই উজানে’র কথায় অনিচ্ছা সত্ত্বেও সায় দিতে হয়েছে তাকে। তবে তালুকদার বাড়ির সকলের চেয়ে রোহানে’র জন্যই মৌ’য়ের বুকের ভেতর কেমন যেন একটা সূক্ষ্ম অপরাধবোধ আর মায়া কাজ করছে। মানুষটার মনে তার প্রতি ভালোবাসার বিন্দুমাত্র কমতি নেই‚ তবে যে ভালোবাসায় মানসিক শান্তি ঘাতক হয়ে দাঁড়ায়‚ তাকে কীভাবেই বা আপন করে নেওয়া যায়?
মৌ সবসময় রোহানে’র সাথে খারাপ ও রূঢ় আচরণ করে‚ যাতে লোকটা তাকে ঘৃণা করে দূরে সরে যায়। কিন্তু বিধিবাম‚ সে যত দূরে ঠেলতে চায় রোহান তত বেশি তার কাছে আসার পাগলামি করে। উজান এই রোহানে’র একপক্ষীয় পাগলামির কিছুই জানে না‚ আর মৌ নিজেও চায় না এসব নিয়ে কোনো অশান্তি হোক। রোহানে’র জন্য তার মনে কেবল মায়া আর ভাইয়ের প্রতি সম্মানটুকু অবশিষ্ট আছে কিন্তু জীবনসঙ্গী হিসেবে তাকে ভাবা অসম্ভব। এত বুঝিয়েও যখন কাজ হলো না‚ তখন মনটা খারাপ হওয়াটাই স্বাভাবিক।
ঠিক তখনই পিছন থেকে দুটি পরিচিত শীতল হাতের আলতো স্পর্শ মৌ’য়ের কোমরে অনুভূত হলো। মুহূর্তের মধ্যেই এক জোড়া চওড়া হাত তাকে পেছন থেকে পরম ভালোবাসায় আঁকড়ে ধরল। অন্য কোনো পরপুরুষের ছোঁয়ায় যা ভয় ধরায়‚ এই একটা মানুষের স্পর্শে মৌ ততটাই নিরাপদ আর ভালোবাসার স্বর্গ খুঁজে পায়। উজান তাকে একদম আষ্ঠেপৃষ্ঠে নিজের সাথে জড়িয়ে ধরেছে। সে মৌ’য়ের ঘাড়ের খাঁজে মুখ গুঁজে দিয়ে নিজের তপ্ত ঠোঁট ছোঁয়াতেই মৌ এক মিষ্টি শিহরণে খানিকটা কুঁকড়ে উঠল। তবে তাকে আরও অবাক করে দিয়ে উজান এক নিমেষে মৌ’কে নিজের পাঁজা কোলে তুলে নিল। অতপর অতি যত্নে তাকে বিছানায় আধশোয়া অবস্থায় বসিয়ে দিল। উজান এক সেকেন্ডও দেরি না করে নিজের মাথাটা মৌ’য়ের বুকের ওপর নামিয়ে দিল। তাকে জড়িয়ে ধরে অত্যন্ত নিচু গলায় আওড়াল‚
“পিচ্চি হাত দুটো একটু মাথার মধ্যে চালিয়ে দাও তো।
মৌ বাধ্য মেয়ের ধীরে ধীরে আঙুল চালিয়ে উজানে’র ঘন চুলগুলো বিলি কেটে দিতে লাগল। কিছুক্ষণ রুম জুড়ে কেবল বৃষ্টির শব্দ ছাড়া আর কিছুই ছিল না। হুট করেই উজান চোখ না খুলেই জিজ্ঞেস করে উঠল‚
“পিচ্চি তোমার গলার সেই লকেটটা কই?
মৌ এক লহমায় চমকে উঠল। রুমের শান্ত পরিবেশ যেন থমকে গেল। সে তো এই প্রশ্নটাকেই সবচেয়ে বেশি ভয় পাচ্ছিল। লকেটটা কখন‚ কোথায় হারিয়ে গেছে সে নিজেও জানে না। মানুষটা নিজের পছন্দের জিনিস তাকে স্পেশালভাবে উপহার দিয়েছিল‚ আর সেটা হারিয়ে গেছে শুনলে উজান নিশ্চয়ই কষ্ট পাবে। ভয়ে মৌ একদম চুপ মেরে মাথা নিচু করে রইল। উজান সব বুঝতে পেরে উঠে বসলো এবং মৌ’য়ের ফর্সা মুখটা আলতো করে টেনে দিল। শান্ত স্বরে বলল‚
“লকেট হারিয়েছে বলে কি কেউ এভাবে চুপ করে মাথা নিচু করে রাখে? একটা হারিয়েছে‚ দশটা নতুন কিনে দেবো। এর জন্য এত সুন্দর মোডটা অফ করবে না।
”আবার কিনে দেবেন? কিন্তু ওটা তো আপনি স্পেশালভাবে গিফট করেছিলেন? ওটাতে তো আপনার নামের প্রথম অক্ষরটাও খোদাই করা ছিল। —মৌ একদম নিচু স্বরে অপরাধীর মতো জবাব দিল
উজান বাঁকা হাসল। মৌ’য়ের কপালে নিজের ঠোঁট ছুঁইয়ে গাঢ় কণ্ঠে আওড়াল‚ “হুম আবার কিনে দেবো। তাছাড়া তোমার এই মাথা থেকে পা অবধি অন্য কারও দেওয়া কোনো জিনিস কি পড়ার পারমিশন এই উজান চৌধুরী দিয়েছে? না তো! এমনকি তোমাকে পুরোপুরি নিজের করে স্পর্শও উজান চৌধুরীই করেছে। ওটাই কি তোমার জন্য সবচেয়ে স্পেশাল গিফট নয়‚ মিসেস চৌধুরী?
বউ’কে লজ্জায় লাল হতে দেখে উজান মনে মনে মুচকি হাসল। তারপর ইশারায় পাশের টি-টেবিলে রাখা নিজের লেদার ওয়ালেটটা চেক করতে বলল। মৌ অবাক চোখে উজানে’র দিকে তাকিয়ে ওয়ালেটটা হাতে নিয়ে খুলল। ভেতরে উজানে’র নিজের হাসিমুখের ছবির পাশে নিজের ছবি দেখতেই তার ঠোঁটের কোণে পরম তৃপ্তির এক ফালি হাসি খেলে গেল। উজান মৌ’য়ের আরও গা ঘেঁষে বসল। কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিসিয়ে আওড়াল‚
“ভালোবাসি আপনাকে। আর আমার ভালোবাসাকে সযত্নে সামলে রাখার পুরো দায়িত্বটা কিন্তু আমার নিজেরই!
উজানে’র মুখ থেকে এত গাঢ় ভালোবাসার প্রকাশ শুনে মৌ ক্ষণিকের জন্য বিমোহিত হয়ে গেল। কিন্তু তখনই উজান ইশারায় ওয়ালেটের ভেতরের গোপন পকেটটার দিকে তাকাতে বলল। মৌ কৌতূহল নিয়ে পকেটটা খুলতেই খুশিতে উৎফুল্ল হয়ে উঠল। সেখানে চকচক করছে তার সেই হারিয়ে যাওয়া লকেটটি। আনন্দের আতিশয্যে কোনো কিছু না ভেবেই মৌ উজানে’র গলায় দু-হাত জড়িয়ে ধরে তার গালে এক চুমু বসিয়ে দিল। উজান মৃদু হাসল আর নিজের এমন কাণ্ডে পরক্ষণেই চরম লজ্জায় লাল হয়ে গেল মৌ। তবে সেসব লজ্জা একদিকে সরিয়ে রেখে সে চিৎকার করে বলে উঠল‚
“লকেট পেয়ে গেছি প্রফেসর সাহেব। থ্যাংক ইউ সো মাচ। এটা আমার লাইফের বেস্ট অফ দ্য বেস্ট গিফট!
উজান অত্যন্ত শান্ত চোখে মৌ’য়ের দিকে তাকিয়ে রয়। একদম ধীর কণ্ঠে শুধাল‚ “কোথায় পেলাম‚ সেটা জিজ্ঞেস করবে না পিচ্চি?
মৌ পিটপিট চোখে উজানে’র শান্ত মুখের দিকে তাকাল। মাথা দুলিয়ে হালকা স্বরে জিজ্ঞেস করল‚ “ক ক কোথায় পেলেন আপনি?
“ঠিক যেখানে আজ দু-দুটো ছেলেকে নৃশংসভাবে মার্ডার করা হয়েছে।
উজানে’র মুখ থেকে কথাটা শোনামাত্রই মৌ’য়ের বুকের ভেতরটা যেন ‘ধক’ করে উঠল। তার হাত-পা বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে এলো। সে বনের ভেতর অত তাড়াহড়োয় যে একপর্যায়ে তার গলার লকেটটি ছিঁড়ে মাটিতে পড়ে গিয়েছিল সেটা খেয়ালই নেই। বুকটা দড়দড় করে কাঁপতে লাগল তার কিন্তু উজানে’র সামনে সে কীভাবে নিজেকে সামলাবে ভেবে পেল না। ঠিক তখনই মেঘের গর্জনের মতো উজানে’র গম্ভীর আওয়াজ তার কানে বিঁধল।
“মার্ডারটা করেছো ওই জানোয়ার দুটোকে?
মৌ থমকে গেল। সে ভয়ে ফ্যাকাশে চোখে উজানে’র দিকে একপলক তাকিয়েই দ্রুত চোখ নামিয়ে নিল। এই মানুষটার তীক্ষ্ণ চোখের দিকে চেয়ে মিথ্যা বলার মতো সাহস বা ক্ষমতা কোনোটাই তার নেই। তাই মাথা নিচু করেই কাঁপা গলায় আত্মরক্ষার চেষ্টা করল।
”আ আ আ আমি কেন ওদের মার্ডার করতে যাব? তাছাড়া আমি তো সামান্য একটা মেয়ে‚ একটা মেয়ে হয়ে কীভাবে দুটো ছেলেকে এভাবে মেরে ফেলা সম্ভব‚ বলুন?
“দ্যাটস গুড যুক্তি‚ মিসেস চৌধুরী! —উজান ঠোঁটের কোণে এক রহস্যময় ও হিংস্র হাসি ঝুলিয়ে আরেকটু ঘনিষ্ঠতা বাড়িয়ে বসল।
“তবে আপনি একটা মারাত্মক ভুল করে ফেলেছেন। আপনি কি জানেন খুনি যতই চালাক হোক না কেন‚ অকুস্থলে সে কোনো না কোনো প্রমাণ রেখেই আসে? আর আপনি তো কেবল এক ইমোশনাল নবাগত খুনি।
মৌ অসহায় চোখে উজানে’র দিকে তাকাল। উজান অনামিকা আঙুল দিয়ে মৌ’য়ের চিবুকটা ধরে মুখটা ওপরে তুলে মৃদু স্বরে বলল‚ “আপনি হয়তো ভেবেছিলেন নদীর তীরে পানি আর কাদায় সব প্রমাণ মুছে গেছে তাই না?
কিন্তু শুনুন ঘটনাস্থলে আপনার জুতোর ছাপ স্পষ্ট পাওয়া গেছে। আপনার মাথার দুটো ছিঁড়ে যাওয়া চুল আমি সেখান থেকে তুলে এনেছি‚ যা ল্যাবে টেস্ট করলে হুবহু আপনার ডিএনএ-র সাথে মিলবে। সাব্বিরে’র জুতো জোড়ার সাইজ ও ছাপও সেখানে বিদ্যমান। এমনকি আপনারা দুজন এখন যেই জুতো দুটো পড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন‚ সেগুলোর তলায় এখনো সেই নদীর তীরের বিশেষ লালচে কাদা-মাটি লেগে রয়েছে। এখন বলুন মিসেস চৌধুরী…পেশাদার আইনি আদালতে আপনাদের দুজনকে খুনের আসামি প্রমাণ করার জন্য এই প্রমাণ কি যথেষ্ট নয়?
মৌ’য়ের চোখ দুটো আতঙ্কে বড় বড় হয়ে গেল। বুক ফেটে কান্না আসার উপক্রম হলো তার। সে তো প্রতিটা পদক্ষেপ সাব্বিরে’র সাথে মিলে অত্যন্ত সাবধানেই ফেলেছিল। পাঁচ বছর আগের সেই ঘটনার সময়েও তো সে নিখুঁত কাজ করেছিল‚ তখন তো কেউ তাকে ধরতে পারেনি। তবে এই মানুষটা কীভাবে এত কম সময়ে এত সূক্ষ্মভাবে সমস্ত প্রমাণের সুতো এক জায়গায় গুটিয়ে নিয়ে এলো?
”আ আ আমি এসব…
মৌ কাঁপতে কাঁপতে অস্ফুট স্বরে কিছু একটা বলতে চাইল কিন্তু কথাগুলো যেন তার গলায় এসে আটকে গেল। উজান তার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে অত্যন্ত শান্ত ও ধীর কণ্ঠে বলল‚
“হুম‚ আমি এসব একদম ঠিক বলছি মিসেস চৌধুরী। কারণ আপনি গ্রামের মানুষ কিংবা পুলিশের চোখ ফাঁকি দিতে পারলেও এই সিক্রেট সিআইডি এজেন্টের চোখে ধুলো দিতে পারবেন না। অনেক বছরের অভিজ্ঞতা তো আর এমনি এমনি হয়নি‚ তাই না?
উজানের কথা শুনে মৌ আগের চেয়েও দ্বিগুণ নয়‚ দশগুণ অবাক হলো। তার চোখ দুটি চড়কগাছে ওঠার জোগাড়। উজান নিজেকে সিআইডি এজেন্ট বলছে? কিন্তু সে তো এক বিশ্ববিদ্যালয়ের নামকরা প্রফেসর। এই সাধারণ মানুষটার ভেতর এত বড় একটা রহস্য লুকিয়ে ছিল? মৌ’কে এভাবে হতবাক ও হা করে তাকিয়ে থাকতে দেখে উজান আর নিজের হাসি চেপে রাখতে পারল না। সে হুট করে এক হেঁচকা টানে মৌ’কে একদম নিজের বুকের ওপর এনে ফেলল। তার ভেজা ওষ্ঠ জোড়ায় মিষ্টি এক চুমু এঁকে দিয়ে বাঁকা হাসলো।
“ভীষণ অবাক হচ্ছেন‚ তাই তো? তবে অবাক হওয়ার কিছু নেই পিচ্চি। তোমার এই হ্যান্ডসাম হাসব্যান্ড সত্যি সত্যিই একজন সিক্রেট সিআইডি অফিসার এবং একই সাথে ইউনিভার্সিটির প্রফেসর। ইচ্ছে ছিল সঠিক সময় এলে তোমাকে সারপ্রাইজ দেবো কিন্তু নিজের প্রাণের চেয়ে প্রিয় ওয়াইফির কাছ থেকে নিজের পরিচয় লুকিয়ে রাখা একজন সত্যিকারের বীর পুরুষের কাজ নয়। তোমাকে আমি ভিষণ ভালোবাসি‚ তাই সবটা সত্যি বলে ফেললাম। আর হ্যাঁ‚ এই বাপের বাড়িতে তোমার সাথে আসার মূল কারণও এই এলাকা থেকে ইদানীং বেশ কয়েকজন মেয়ে আচমকা নিখোঁজ হয়ে যাচ্ছে। সেই কেসের তদন্তেই আমার এখানে আসা। বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য অলরেডি পেয়ে গেছি‚ বাকিটা ঢাকায় ফিরে সলভ করব। আর ঠিক এই কারণেই কাল সকালে আমরা ঢাকায় ব্যাক করছি।
তবে একটা কথা সত্যি বলতেই হয় মিসেস চৌধুরী। আজ উজান চৌধুরী তার বউকে নিয়ে ভিষণ প্রাউড ফিল করছে। যে মেয়েটা নিজের বোনের ওপর হওয়া অবিচারের প্রতিশোধ নিতে‚ বোনকে ন্যায়বিচার দিতে চার-চারটে নরপিশাচকে এক হাতে খুন করেছে। নিজেকে এতটা সাহসী করে তুলেছে‚ ছেলেদের মতো ফাইটিং শিখেছে তার জন্য তো একটা থ্যাঙ্কস। যদিও দেশের আইন অনুযায়ী স্বহস্তে বিচার তুলে নেওয়ার জন্য তোমার একটা বড়সড় শাস্তি পাওয়া উচিত ছিল।
”আ আ আমার শাস্তি পাবো? —মৌ চোখ দুটো বড় বড় করে ভিতু গলায় ঢোক গিলল।
“হুম‚ আপনার। তবে আপনি যদি এই প্রফেসরের একটা ছোট শর্ত মেনে নেন‚ তবে এই সিআইডি অফিসার আপনাকে সব কেস থেকে বেকসুর খালাস করে দেবে।
মৌ ভীতু কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল‚ “ক ক ক কী শর্ত?
উজান এক লহমায় মৌ’য়ের কোমরটা শক্ত করে আঁকড়ে ধরে তাকে একদম নিজের মুখোমুখি নিয়ে এলো। মৌ’য়ের কপালে লেপ্টে থাকা চুলগুলো আলতো ফুঁ দিয়ে সরিয়ে দিল। তারপর নিজের চোখ দুটো গহীন ও তীব্র নেশাসক্ত করে ফিসফিসিয়ে আওরাল‚
“সেই রাতের মতো আবারও ভয়ংকর ভাবে আমাকে কেয়ার করতে হবে। আর যতক্ষণ না উজান চৌধুরী নিজে আপনাকে ছাড়ছে‚ ততক্ষণ আপনি আমার বুক থেকে এক ইঞ্চিও দূরে সরতে পারবেন না। বলুন ম্যাডাম‚ ডিল ফাইনাল?
কথাটা শোনামাত্রই মৌ’য়ের মাথায় যেন রাগের পারদ চড়ে গেল। একটু আগেই যে লোকটার অপরাধী প্রমাণের সামনে সে ভয়ে কাঁপছিল‚ সেই লোকটার এমন নির্লজ্জ প্রস্তাব শুনে তার ভয় মুহূর্তে উধাও হয়ে গেল। সে নিজের সমস্ত জোর দিয়ে উজান’কে সজোরে একটা ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিল। মুখ লাল করে কর্কশ কণ্ঠে চিল চিৎকার করে উঠল‚
”নষ্ট পুরুষ একটা। সরুন এখান থেকে‚ মুখে একটু কথা আটকায় না আপনার?
“জান‚ জান‚ বউজান! প্লিজ এমন কোরো না। আচ্ছা তোমাকে কিচ্ছু করতে হবে না‚ সব আমি সামলে নেবো। তবুও আমাকে এভাবে দূরে ঠেলে দিয়ো না‚ প্লিজ লক্ষ্মীটি।
”একদম কাছে আসবেন না বলে দিচ্ছি!
মৌ হাত উঁচিয়ে হুংকার দিল। কিন্তু কে শোনে কার কথা। উজান এক নিমেষে মৌ’কে আবারও নিজের বলবান দু-বাহুর খাঁজে শক্ত করে আবদ্ধ করে নিল। মৌ ছটফট করে নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করল কিন্তু উজানে’র সেই লোহামার সদৃশ বাঁধন আলগা করা তার সাধ্যের বাইরে। অগত্যা সে নিজের দুটি ছোট ছোট হাত দিয়ে উজানে’র শক্ত বুকে ধুমধাম এলোপাতাড়ি কিল-ঘুষি মারতে শুরু করল। একপর্যায়ে ক্লান্ত হয়ে মৌ রাগী গলায় হাঁপাতে হাঁপাতে বলল‚ “আপনার একটুও লজ্জা করে না? একজন পুরুষ মানুষ হয়ে বউয়ের হাতে মাইর খান?
“যেখানে বনের রাজা সিংহ নিজে বউয়ের হাতে মাইর খায়‚ সেখানে আমি কোথাকার হরিদাস পাল শুনি!
উজানে’র এই আজব আর হাস্যকর যুক্তি শুনে মৌ নিজের রাগ ধরে রাখতে পারল না। সে খিলখিল করে হেসে উঠল। সেই হাসির শব্দে পুরো ঘর যেন এক আলোয় ভরে গেল। উজান অনেকক্ষণ অপলক দৃষ্টিতে নিজের এই মিষ্টি বউয়ের হাসিমুখটার দিকে চেয়ে রইল। মৌ তার হাসি থামিয়ে হুট করেই উজানে’র শক্ত বুকে নিজের মুখটা গুঁজে দিয়ে তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। উজান অবশ্য এতে বিন্দুমাত্র অবাক হলো না। তার বউটা বরাবরই এমন মুখে বলবে দূরে সরুন আবার পরক্ষণেই বিড়ালের মতো এসে বুকে মুখ গুঁজে পরম শান্তিতে ঘুমিয়ে পড়বে। মৌ উজানে’র বুকে মাথা রেখে‚ তার গভীর চোখের দিকে চোখ রেখে অত্যন্ত কৌতূহল নিয়ে প্রশ্ন করল।
প্রফেসর উজান চৌধুরী পর্ব ৪৭
”আচ্ছা আপনাকে এখন থেকে প্রফেসর বলব নাকি অফিসার? তবে যাই বলুন না কেন‚ আমার কাছে আপনি অলওয়েজ আমার সেই খাটাস ‘প্রফেসর সাহেব’। তো প্রফেসর সাহেব…আপনি এত বড় মাপের একজন প্রফেসর এবং হাই-প্রোফাইল অফিসার হওয়া সত্ত্বেও ঠিক কী কারণে আমার মতো একটা সাধারণ মেয়েকে এত গভীরভাবে ভালোবাসলেন? আমার মাঝে তো এমন বিশেষ কিছুই নেই?
