Home Tell me who I am 2 Tell me who I am 2 part 23

Tell me who I am 2 part 23

Tell me who I am 2 part 23
আয়সা ইসলাম মনি

ভোরের আলো ফুটতেই ঢাকা থেকে ছুটে এসেছিল আকবর। স্বয়ং আম্বিয়া জমাদ্দারের আকস্মিক মৃ*ত্যুর খবরটা পাওয়ামাত্রই সে হন্তদন্ত হয়ে ইসহাক আর আসাদকেও ফোনে অবহিত করে। তারাও পরিবারের বাকি সদস্য সহ রওনা হয়েছে।
এদিকে অন্দরমহলে ফাতিমাকে কোনোভাবেই শান্ত করা যাচ্ছিল না। সে নিথর মায়ের শরীরটাকে দুই হাতে শক্ত করে জাপটে ধরে বারবার কেঁদে চলেছে। কান্নার তোড়ে তার পুরো শরীরটা কাঁপছিল। চোখের জলে মায়ের ঠান্ডা গালটা ভিজিয়ে দিয়ে সে ডুকরে কেঁদে উঠল, ​”মা গো, ও মা! আমারে এই অকূল দরিয়ায় এতিম কইরা তুমি কেমনে চইলা গ্যালা? ও আমার সোনার আম্মাজান, আমার লগে একটা বার কথা কও, বুকে টাইন্যা নিয়া একটাবার শুধু ‘ফাতমা’ বইলা ডাকো! কার বুকে মাথা রাখুম আমি? কারে আম্মা বইলা ডাকুম? আম্মা গো… ও আম্মাজান, চোখ ম্যালো, তোমার ফাতমার দিকে একটাবার চাও মা গো…!”

মিরা নিজের চোখের অবাধ্য জলধারাকে আঁচলে চেপে ধরে একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজেকে সান্ত্বনা দেওয়ার নিষ্ফল চেষ্টা করছে, অন্তত এই মহীয়সী নারী তার নাতি-নাতনিদের মুখ তো দেখে যেতে পেরেছেন।
উঠোন পেরিয়ে সদর দরজা অবধি পুরো গ্রামের মানুষের ঢল নেমেছে। পুরুষেরা বাইরের প্রাঙ্গণে বিষণ্ন মুখে দাঁড়িয়ে ফিসফিস করছে, আর অন্দরে নারীরা ফাতিমাকে ঘিরে সান্ত্বনার বৃথা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ছোট্ট তুব্বাও সকাল থেকে ‘নানি, ও নানি’ বলে কেঁদে কেঁদে চোখ ফুলিয়ে ফেলেছে; মিরা তাকে সস্নেহে বুকে আগলে ধরে রেখেছে।
ভেতরের এই শোরগোলের ভিড় থেকে কিছুটা দূরত্ব বজায় রেখে, ঘরের এক কোণে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে কারান। তার পরনে ধবধবে সাদা সুতি পাঞ্জাবি, বুকে দুই হাত আড়াআড়িভাবে রাখা, সে স্থির দৃষ্টিতে লা’শের দিকে চেয়ে আছে।

তারান্নুম আর ফারহানকে যে এই চরম সত্যটা জানানো হবে, সেই উপায়টুকুও নেই। বারবার চেষ্টা করেও ওপ্রান্তে নেটওয়ার্কের কারণে কাউকে পাওয়া যাচ্ছিল না।
এক পর্যায়ে কারান মিরার কাছে দাঁড়িয়ে নিস্পৃহ স্বরে বলেছিল, “ওদের এখন জানানোর দরকার নেই। ওদের লাইফটা জাস্ট শুরু হতে যাচ্ছে। এই ট্র্যাজেডি দিয়ে ওদের নতুন জার্নিটা নষ্ট করার কি খুব দরকার? তাছাড়া যে পরিস্থিতি, ওরা পৌঁছাতে পৌঁছাতে লা’শ দাফন করা হয়ে যাবে!”
​মিরা কারানের এমন যুক্তিহীন কথায় ক্ষোভে ফেটে পড়ে প্রতিবাদ জানিয়েছিল, “তাই বলে তরু তার সবথেকে পছন্দের মানুষটাকে শেষবারের মতো দেখবেও না? এটা কেমন কথা, কারান? ও যখন পরে জানতে পারবে ওর নানি আর নেই, আর এই খবরটা ওর থেকে লুকিয়ে রাখা হয়েছিল, তখন ওর মনের অবস্থা কেমন হবে, একবার ভেবেছ?”
​কিন্তু বাস্তবতার কাছে মিরাকে শেষমেষ নতি স্বীকার করতেই হলো। কারণ সত্যি বলতে যোগাযোগের কোনো মাধ্যমই নেই। কারান মিরাকে আর কী-ই বা বোঝাবে? ভেতরের ধাক্কা সামলে ভাঙা গলায় দুটো কথা বলতেই তার মস্তিষ্ক যেন অসাড় হয়ে আসছিল।

অস্ট্রেলিয়ায় অবস্থানরত তালহা আর সোফিয়াকেও খবর দেওয়া হয়েছিল। তালহা আপ্রাণ চেষ্টা করছিল আসার জন্য, কিন্তু মাত্র কয়েক দিন আগেই সে সেখানে ফিরে গেছে। এত অল্প সময়ে আবার ফ্লাইটের টিকিট জোগাড় করা প্রায় অসম্ভব। তালহার চোখও টইটম্বুর, কিন্তু নিজের অসহায়ত্বে সে রুদ্ধ। সোফিয়া বারবার অনুরোধ করছিল, “ঠুমি প্লিজ কোনো এখটা ব্যবস্থা করো, তালহা। যে-খোনো ফ্লাইটের টিকিট কাঠো, আই ক্যান ম্যানেজ মাইসেলফ হিয়ার। বাট ঠোমার এই সময় ফ্যামিলির পাশে থাকা দরকার।”
কিন্তু আন্তর্জাতিক ভ্রমণের আনুষ্ঠানিকতা আর আইনি জটিলতার কারণে তা আর সম্ভব হচ্ছিল না। এই চরম সংকটের মুহূর্তেও পরিবারের পাশে থাকতে না পারার আক্ষেপ তালহাকে ভেতর থেকে কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছিল।
এদিকে আশ্চর্যের বিষয় হলো, পুরো গ্রামে একমাত্র কারানের চোখেই এক ফোঁটা জলের দেখা মিলল না। সে ব্যতীত আকবর থেকে শুরু করে গ্রামের প্রতিটি আবালবৃদ্ধবনিতা আজ কান্নায় ভেঙে পড়েছে।
গ্রামের বৃদ্ধ মাতব্বর, যার নিজের শরীরটাই বার্ধক্যের ভারে নুয়ে পড়েছে, তিনি কাঁপা কাঁপা হাতে নিজের লাঠিতে ভর দিয়ে ডুকরে কেঁদে উঠলেন। চোখের জলে তার পাকা দাড়ি ভিজে একাকার হয়ে যাচ্ছিল। “আমগো আম্বিয়া বুজি তো শুধু এই বাড়ির কর্তা আছিল না, হে তো পুরা গেরামের পরান আছিল! কারোর ঘরে চাউল নাই, কারোর মাইয়ার বিয়ার টাকা নাই—বুজির দুয়ারে গ্যালে কেউ কোনোদিন খালি হাতে ফেরে নাই। ও বুজি… একবার উইঠা আইসা দ্যাখো, তোমার দুয়ারে আজ কত মানুষ মরাকান্নায় চোখ ভিজাইতাছে! ও বুজি, তোমার এই চইলা যাওয়া আমরা ক্যামনে সইব? কে আমগো আগলায়া রাখব?”

এরই মধ্যে বাইরে একটা গুঞ্জন শোনা গেল; আম্বিয়ার মৃ*ত্যুর আগের রাত থেকেই নাকি স্থানীয় ইউনিয়ন চেয়ারম্যানসহ তার দুই কুলাঙ্গার ছেলে এবং থানার বড়োবাবু রহস্যজনকভাবে এলাকা থেকে গায়েব হয়ে গেছে। তবে গ্রামবাসীদের এই নিয়ে কোনো মাথাব্যথা বা অনুশোচনা নেই। এলাকার মানুষ এদের অত্যাচারে দীর্ঘদিন ধরে অতিষ্ঠ ছিল। এক চা-দোকানি উঠোনের এক কোণে দাঁড়িয়ে ফিসফিস করে বলল, “বালা গেছে! গ্রামের একটা বড়ো আপদ বিদায় হইছে। অরা যে কত মানুষের র*ক্ত চুষে খাইছে, তার হিসাব নাই।”
এমন সময় বাড়ির আঙিনায় এসে পৌঁছাল আশমিনি, রোমানা আর আয়াশ। রোমানা আর আয়াশ তো জানতই না যে তাদের এমন একটা শিকড়, এমন একটা পরিবারও আছে। আয়াশ এগিয়ে গিয়ে প্রথমবারের মতো তার দাদির ফরসা, বরফ-শীতল কপালটা ছুঁয়ে দিল। র*ক্তের টানে অবোধ শিশুটির চোখ থেকেও অঝোরে জল গড়িয়ে পড়ল। সে দ্রুত আশমিনির কাছে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরে অভিমানী গলায় বলল, “দাদু কি আমাকে একবারও মিস করেনি, মাম্মাম? আমার সাথে কখনো দেখাও হলো না… একটু ভালোও তো বাসলো না!”

ছেলের এই সরল, বুকভাঙা প্রশ্নে আশমিনির ভেতরের সুপ্ত ক্ষোভটা আবার জেগে উঠল। সে ঘরের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা আসাদ আর ইসহাকের দিকে কঠোর দৃষ্টিতে তাকাল। এই মানুষগুলোর কারণেই তো আজ আয়াশ তার ফুফুর আদর থেকে বঞ্চিত হয়েছে, দাদির স্নেহ পায়নি, আর তুব্বা ও তারান্নুমের মতো বোনদের সাথে কোনোদিন তার পরিচয়ই ঘটেনি।
আসাদ আর ইসহাক অপরাধীর মতো তখনো ঘরের চৌকাঠের বাইরেই দাঁড়িয়ে আছে। তাদের পিছনে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে আরিয়ান আর রোমানা। আসার পথে গাড়িতে বসে আরিয়ান যতটা সম্ভব রোমানাকে এই বাড়ির জটিল ইতিহাস এবং আম্বিয়ার মাহাত্ম্য সম্পর্কে সংক্ষেপে বুঝিয়ে বলেছিল।
রোমানা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মানুষের জনসমুদ্র দেখছিল। যে বাড়ি সে কোনোদিন দেখেনি, যে মানুষটার অস্তিত্ব সম্পর্কে সে কয়েক ঘণ্টা আগেও সম্পূর্ণ অজ্ঞ ছিল, আজ তার মৃ*ত্যুতে কীভাবে নিজের আবেগ প্রকাশ করবে, তা সে বুঝতে পারছিল না। তার এই মানসিক দ্বন্দ্ব আর একাকিত্ব টের পেয়ে আরিয়ান এসে তার গা ঘেঁষে দাঁড়াল, “এই বাড়ির সাথে বা এই মানুষগুলোর সাথে আমারও কোনো মেমোরি নেই, রোমানা। আমি এখানে শুধু একবারই এসেছিলাম, বাকিটা সময় শহরেই থেকেছি। সো, আই’ম অলসো আ স্ট্রেঞ্জার হিয়ার।”

“কারানের ক্ষেত্রেও কি এমন? ও-ও কি পরবাসী?”
“উঁহুঁ, একদমই না,” আরিয়ান মাথা নাড়ল। “ওর সাথে তো এ বাড়ির সম্পর্ক আমাদের ফ্যামিলির সবার থেকেও গভীর। ও তো এক রকম এখানেই বড় হয়েছে বলা যায়। মায়ের সাথে চাইল্ডহুডের অনেক মেমোরি জড়িয়ে আছে ওর এখানে।”
‘মা’ শব্দটা আরিয়ানের ঠোঁটে উচ্চারণ হতে দেখে রোমানা যেন একটু চমকে উঠল। এতগুলো বছরের দাম্পত্যে আরিয়ানের মুখে এই শব্দটি সে কবে শুনেছে, তা স্মৃতির ধুলো ঝেড়েও মনে করতে পারল না। রোমানা এক পলক আরিয়ানকে ওপর-নিচ পরখ করল। ইদানীং আরিয়ানকে বেশ সিরিয়াস মনে হচ্ছে। কেন এমন মনে হচ্ছে, তার কোনো যৌক্তিক কারণ সে খুঁজে পাচ্ছে না। আসলে আরিয়ানকে সে কোনোদিন সিরিয়াস পুরুষ হিসেবে গণ্যই করেনি, তাই হুট করে তার এই চারিত্রিক পরিবর্তনটা রোমানার বোধগম্য হচ্ছিল না। তবে এতটুকু আঁচ করা যায়—আরিয়ান হয়ত ফ্যামিলি ম্যান হওয়ার চেষ্টা করছে। অবশ্য, তার এই চেষ্টার মাঝেও তাদের মধ্যকার সেই চিরাচরিত সতিনের মতো চুল ছেঁড়াছিঁড়ি আর সাপে-নেউলে ঝগড়ার স্বভাবটা এক চুলও কমেনি।
রোমানা ভ্রূ কুঁচকে ঠোঁট দুটো সামান্য বেঁকিয়ে বলল, “স্ট্রেঞ্জ! কারান আসত, অথচ তুমি আসতে না? মানে কি?”

“কারণ আমাকে ড্যাড আসতে দিত না। রেস্ট্রিকশন ছিল। যাই হোক, লিভ ইট,” আরিয়ান পাঞ্জাবির পকেটে হাত পুরে চারপাশের ভিড়ের দিকে তাকিয়ে একটু অস্বস্তিতে পড়ল। “তুমি এভাবে বাইরে শনের মতো দাঁড়িয়ে আছ কেন? ভেতরে যাও। এখানে সব লোকাল ছেলেপেলে ঘুরঘুর করছে, আই ডোন্ট ওয়ান্ট কোনো ফালতু সিচুয়েশন তৈরি হোক। এমন একটা মুহূর্তে বউয়ের জন্য মারামারি করার কোনো ইচ্ছা আমার নেই!”
“ইশশ, কি পিরিতটাই না দেখাচ্ছে! শোন শালা, তোর বউয়ের ওপর ক্রাশ খাওয়ার জন্য এখানকার ছেলেরা বসে নেই। আর তাছাড়া আমার পাশে তুই খাম্বার মতো দাঁড়িয়ে আছিস, তুই না থাকলে অবশ্য এতক্ষণে কয়েকটা প্রোপোজাল পেয়েই যেতাম।”
“আমি পাশে আছি মানে কী?” আরিয়ান চোখ দুটো ছোট ছোট করে তাকাল।
“সিম্পল,” রোমানা বাঁকা হাসি দিয়ে বলল, “ফুলের পাশে যদি পচা ডোবা থাকে, তখন সেই ডোবার দুর্গন্ধ তো ফুলেও ছড়ায়। সো, তোমার ওই গন্ধের কারণেই সবাই আমার থেকে চার হাত দূরে আছে!”
আরিয়ান দাঁত দিয়ে নিচের ঠোঁটটা সজোরে কামড়ে ধরল। একটা আন্তর্জাতিক বাংলা গালি প্রায় মুখের ডগায় চলে এসেছিল, কিন্তু ম’রদেহের খাটিয়া আর চারপাশের কান্নার রোল দেখে সে নিজেকে চরম আত্মনিয়ন্ত্রণে আটকে নিল। মনে মনে ভাবল, “আজ দিনটা পার হোক, বাসায় ফিরি… তারপর এর পিঠের ওপর চড়ে ধুমধাম কয়টা কিল মেরে কড়ায়-গন্ডায় সব শোধ উসুল করব।”

এদিকে ঘরের মেঝেতে বসে মিরা অনবরত সান্ত্বনা দিয়ে যাচ্ছিল ফাতিমাকে, আর মিরার কোমর জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে কাঁদছিল অবোধ তুব্বা। আশমিনি গিয়ে আলতো করে মিরার কাঁধ স্পর্শ করল। হাতের স্পর্শ পেয়ে মিরা যখন মাথা তুলে তাকাল, মিরার চিবুক আর ঠোঁট কাঁপতে লাগল, কিন্তু সে কিছু বলল না। আশমিনি এরপর মিরার পাশ কেটে সরাসরি গিয়ে ফাতিমার ভেঙে পড়া কাঁধ দুটো আঁকড়ে ধরল। নিচু স্বরে ডাকল, “আপা।”

বহু সময় পর পরিচিত কণ্ঠস্বর ফাতিমার কানের পর্দায় আঘাত করতেই তার অবশ চেতনা হঠাৎ জেগে উঠল। তিনি শূন্য দৃষ্টিতে আশমিনের দিকে তাকালেন। পরক্ষণেই তিনি আশমিনিকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন, “আমার মা… আমার কলিজার আম্মাটা আর নাই গো, মিনি! আমার আম্মা আমারে এই দুনিয়ায় একলা ছাইড়া চইলা গেল গো, আমার আম্মা নাই! আম্মা আমারে কেমনে এই সংসারে ফেলায় রাইখা চইলা গেল, মিনি? ও মিনি, তুমি-ই কও, আমি অহন কেমনে বাঁচুম? আমার আম্মা… ও আম্মা গো! আমারে একটু ডাকো না, আম্মা! আমারে ক্যান সাথে নিয়া গ্যালা না?”
ফাতিমার অশ্রুর অবিরাম ধারা তার শাড়ি ভিজিয়ে একাকার করেছে, লোনা নদীর মোহনা তার চিবুকে এসে মিলেছে। আশমিনির আত্মনিয়ন্ত্রণের দেয়াল ভেঙে তার চোখের কোণ থেকেও এক ফোঁটা তপ্ত জল গড়িয়ে পড়ল। তিনি দ্রুত হাতের উলটো পিঠে চোখটা মুছে ফাতিমাকে আরও নিবিড়ভাবে জাপটে ধরে শান্ত স্বরে বললেন, “আমরা তো কেউ এখানে সারাজীবন বেঁচে থাকার জন্য আসিনি, আপা। আজ মা চলে গেলেন, কাল হয়ত আমি যাব কিংবা তুমি। এই দুনিয়ায় আমাদের আসাটাই তো এক বুক ধার করা নিশ্বাস নিয়ে; সময় ফুরিয়ে গেলে প্রকৃতির এই ঋণ আমাদের ফিরিয়ে দিতেই হয়। মৃ’ত্যুই তো জীবনের একমাত্র খাঁটি সত্যি আপা, বাকি সবটাই ক্ষণিকের মায়া মাত্র। এই নির্মম সত্যটাকে এক্সেপ্ট করেই আমাদের বাকি পথটুকু পার করতে হবে। নিজেকে এভাবে ভেঙে ফেললে তো চলবে না। মা সারাটা জীবন যেমন পুণ্যবতী মানুষ ছিলেন, আল্লাহ ওনাকে জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করুন, এখন আমাদের শুধু এই দোয়াই করা উচিত। উঠবে চলো, একটু হাত-মুখ ধোবে।”

কিন্তু ফাতিমা পারলেন না। তার শরীরের সমস্ত শক্তি যেন মায়ের ওই নিথর দেহের সাথে মাটির নিচে যাওয়ার জন্য আকুল হয়ে উঠেছিল; তিনি উঠতে গিয়েও আবার মেঝেতে ভেঙে পড়লেন।
এদিকে মিরা হুট করে উঠে পাশের ছোট ঘরটায় চলে গেল। ওজু করে সে জায়নামাজে বসল। কিছুক্ষণ আল্লাহর কাছে কান্নাভেজা কণ্ঠে আম্বিয়ার জন্য মাগফেরাত কামনা করল। এরপর কুরআন শরিফ খুলে তিলাওয়াত শুরু করল।
রোমানাও ঘরের ভেতর প্রবেশ করল। এই বাড়ির উঠোন, দেয়াল কিংবা এই মানুষগুলো—কোনো কিছুর সাথেই তার পূর্বপরিচয় নেই। অথচ ভেতরের এই শোকাবহ পরিবেশটাকে তার বড্ড আপন, বড্ড চেনা মনে হতে লাগল। সে পা টিপে টিপে আশমিনির দিকে এগিয়ে আসতেই আশমিনি ফাতিমার দিকে ইশারা করে একদম নিচু স্বরে বললেন, “তোমার ফুফু শাশুড়ি।”

রোমানা বুদ্ধিমতী, পরিস্থিতি বুঝতে তার এক মুহূর্তও লাগল না। সে আলতো করে মাথা নাড়িয়ে ফাতিমার ঠিক পাশে গিয়ে বসল। সে ফাতিমার পিঠে হাত বোলাতেই ফাতিমা তার ক্লান্ত, ভাঙা শরীরটা সম্পূর্ণ এলিয়ে দিলেন রোমানার অনভিজ্ঞ কাঁধের ওপর। এই মুহূর্তে কে তাকে স্পর্শ করছে, কার কাঁধে সে মাথা রাখছে, তা ভাবার মতো মানসিক ভারসাম্য ফাতিমার ছিল না।
হঠাৎ ঘরের এক কোণের কারানের দিকে তাকালেন আশমিনি, তার ওই পাথুরে নির্লিপ্ততা তাকে ভেতর থেকে নাড়া দিল। তিনি ফাতিমার কাছ থেকে উঠে কারানের দিকে এগিয়ে গেলেন। কারানের ঠিক পাশে গিয়ে তিনিও বেশ কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে রইলেন। তারপর একটা ভারী নিশ্বাস ছেড়ে তিনি বলতে শুরু করলেন, “ইসহাককে বিয়ে করার পর এই বাড়িতে মাত্র দুইবার আমার পা পড়েছিল। আজ নিয়ে থার্ড টাইম হলো। প্রথমবার এসেছিলাম আমাদের রিসেপশন উপলক্ষ্যে, নতুন বউ হয়ে। তুই তো জানিসই, আমার নিজের মা সেই ছোটোবেলাতেই মা’রা গেছেন। তো, এ বাড়িতে আসার পর আমি লাইফে প্রথম দুটো অমূল্য মানুষ পেয়েছিলাম, একটা বড় বোন, আর একটা মা। তখন ফাতিমা আপা তার শ্বশুরবাড়িতে থাকত; এ বাড়িতে শুধু কৌশি ভাবি আর মা ছিলেন। ওনারা আমাকে এতটাই ভালোবাসা আর কেয়ার দিয়েছিলেন যে আমি ভুলেই গিয়েছিলাম আমার কোনো আপন ভাই-বোন নেই। কিন্তু সেই সুখের দিনগুলো বেশিদিন লাস্ট করেনি। ইসহাকের বদলির চাকরির সূত্রে আমাদের আবার ঢাকা ব্যাক করতে হলো। আমারও তখন পড়াশোনা রানিং, তাই এত ভালোবাসা আর যত্নকে এক প্রকার পায়ে ঠেলেই চলে যেতে হয়েছিল।”

আশমিনি একটু থামল। তার দৃষ্টি এবার জানালার বাইরে চলে গেল, যেখানে রোদের আলো উঠোনের আমগাছটার ওপর পড়ছে। সে আবার বলতে লাগল, “এরপর আরেকবার এসেছিলাম, যখন কৌশি ভাবি হুট করেই নিখোঁজ হয়ে গেল। তার পরপরই শুনলাম এ বাড়ির সাথে আসাদ চৌধুরী আর ইসহাক চৌধুরীর সমস্ত সম্পর্ক মা চিরকালের জন্য নষ্ট করে দিয়েছেন। মা যদিও আমাকে পার্সোনালি ত্যাজ্য করেননি, বলেছিলেন, ‘মিনি, এইটা তোমার নিজের বাড়ি, তুমি যে-কোনো সময় আইতে পারো।’ কিন্তু এরপর আর কোনোদিন আসা হয়ে ওঠেনি। আসলে বাধ্য ছিলাম, ইসহাকের ওই অবস্ট্যাকল আর ফ্যামিলি ড্রামার কারণে। আর আজ… আমি স্বপ্নেও ভাবিনি যে আবার এই চেনা উঠোনে পা রাখব, অথচ আমার মাকে আর জীবিত দেখতে পাব না। এমনকি যে বোনটার টানে আসতাম, সেই কৌশি ভাবিও তো নেই! এই চলে যাওয়াটা শুধু ফাতিমা আপাকে একা করেনি রে কারান… করেছে আমাকে, তোকে, এমনকি এ বাড়ির প্রতিটি মানুষকে। বড্ড কান্না পাচ্ছে জানিস, বুকটা একদম ফেটে যাচ্ছে! কেন যে আরেকটু মায়ের ভালোবাসা ব্যাকআপে রাখলাম না! আমি মানুষটা কিছুটা তোর মতোই। বাইরে যতই পাথরের দেয়াল তুলে রাখিস না কেন, আমি খুব ভালো করেই জানি এই মুহূর্তে তোর বুকের ভেতর ঠিক কীরকম একটা ভয়াবহ টর্নেডো চলছে, অথচ কেউ তা নোটিশ করছে না।”
কারান পুরোটা সময় নিশ্চুপ হয়ে সব শুনে গেল। সে শুধু শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল আগরবাতির হালকা নীলাভ ধোঁয়ার আড়ালে শুইয়ে রাখা ধবধবে সাদা কাফনে মোড়ানো তার দাদির লা’শের দিকে। অথচ তার এই অস্বাভাবিক স্তব্ধতা কান্নার চেয়েও ভয়ংকর।

আশমিনি এবার কারানের শক্ত হয়ে থাকা ডান বাহুটা আলতো করে চেপে ধরলেন। “তোর এই ফ্যাকাশে চোখ-মুখ দেখে খুব ভালো করেই বুঝতে পারছি, কাল রাত থেকে তুই মুখে এক দানা খাবারও তুলিসনি। আপাও যে সকাল থেকে না খেয়ে আছে, সেটাও বুঝতে পারছি। চল, ভেতরে চল, কিছু একটা মুখে দিয়ে নে।”
কারান এবারও কোনো উত্তর দিল না। সে যেমন ছিল, ঠিক তেমনই অনড় হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
আশমিনি তার মুখের দিকে তাকিয়ে এবার গাঢ় স্বরে বললেন, “তুই এই ভেঙে পড়া বাড়ির সেকেন্ড পিলার, কারান। ফার্স্ট পিলারটা তো আজ চিরতরে ভেঙে গেল, তাই সেকেন্ড পিলারটাকেও কি আমি একটা মা হয়ে এভাবে চোখের সামনে কোল্যাপ্স করতে দিতে পারি?”

‘মা’ শব্দটা এবং আশমিনির কণ্ঠের নিখাদ অধিকারবোধ কারানের ভেতরের পাথুরে দেয়ালে প্রথম একটা বড় ফাটল ধরাল। সে এবার তার জল টলমল, র*ক্তবর্ণ চোখ দুটো তুলে আশমিনির দিকে তাকাল। দাঁতে দাঁত চেপে, চোয়াল শক্ত করে ভেতরের বাঁধভাঙা কান্নাটাকে আটকে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করছিল। চোখের কোণটা অনবরত কাঁপছিল, এক ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ার ঠিক পূর্বমুহূর্তে দাঁড়িয়ে ছিল। কিন্তু না, সে নিজেকে সবার সামনে দুর্বল হতে দেবে না, কিছুতেই পড়তে দেবে না ওই অশ্রু।
গতরাতে পতনের সেই ভয়ংকর মুহূর্তে শামসুজ্জামানের পাপবিদ্ধ শরীরটাকেই যেন নিয়তি ঢাল বানিয়ে দিয়েছিল আম্বিয়ার জন্য। পাহাড়ের খাড়া ঢালের অবাধ্য ঝোপঝাড় আর শামসুজ্জামানের শরীরের ওপর আছড়ে পড়ার কারণে আম্বিয়ার ম’রদেহে কোনো বীভৎস ক্ষতের সৃষ্টি হয়নি। শুধু ওপর থেকে পতনের ঝাঁকুনিতে ওনার ঘাড়ের হাড়টা মটকে গিয়েছিল।
কারান গত রাতেই অত্যন্ত গোপনে দাদির সেই পবিত্র দেহ খাদের গভীর অন্ধকার থেকে উদ্ধার করে এনেছিল। পরম মমতায় ওনার শেষশয্যা সাজিয়ে দিয়েছিল ওনার নিজের চন্দন কাঠের বিছানাটিতে। এরপর যে প্রবীণ ইমাম সাহেব অতীতে তারান্নুমের দাফন সম্পন্ন করেছিলেন, তারই বৃদ্ধা স্ত্রীকে ডেকে এনে আম্বিয়ার শরীরের ধুলোবালি মুছে, গায়ের র*ক্তাক্ত শাড়ি পাল্টে একটি শুভ্র চাদর টেনে ওনাকে এমনভাবে শুইয়ে রেখেছিল, যেন দূর থেকে দেখলে যে কেউ ভাববে—বয়সের ভারে ক্লান্ত এক বৃদ্ধা ঘুমের মাঝেই ইহকাল ত্যাগ করেছেন।

অন্ধকারের মাঝেই কারান চুপচাপ বসে ছিল দাদির পায়ের কাছে। ওনার নিথর পা দুটো নিজের দুই হাতের শক্ত মুঠোয় জাপটে ধরে রেখেছিল।
এই পায়ের ওপর ভর দিয়ে ছোটোবেলায় সে কত হেঁটেছে, কত পথ চিনেছে, ঝড়ের রাতে এই আঁচলের নিচেই তো ছিল তার পরম আশ্রয়। অথচ আজ সেই চেনা চরণযুগল বরফের মতো ঠান্ডা, নিস্পন্দ। কারান ওনার পায়ে আলতো করে নিজের ঠোঁট ছোঁয়াল। এক দীর্ঘ চুম্বনে লেপ্টে রইল দাদির পায়ের পাতায়। তারপর মাথা তুলে আবার তাকিয়ে রইল ওনার শান্ত মুখের দিকে। কারানের চোখে তখনো কোনো পানি ছিল না। এক ফোঁটাও না।
আম্বিয়া জমাদ্দার কোনো হেরে যাওয়া কাপুরুষের মতো জীবনাবসান ঘটাননি; তিনি বিদায় নিয়েছেন একজন অপরাজেয় বীরের মতো, নিজের আত্মসম্মান, চিরন্তন সাহস আর জেদ বজায় রেখে শত্রুকে পায়ের নিচে পিষে দিয়ে। এমন এক বিজয়ী গৌরবের মুহূর্তে কারান কেন চোখের জল ফেলে ওনার এই মহিমান্বিত মৃ*ত্যুকে দুর্বল করবে? দাদির ধমনিতে বয়ে চলা যোগ্য র*ক্ত হিসেবে সেও আজ পাথরের মতো শক্ত হয়ে রইল, শুধু বুক চিড়ে বেরিয়ে এসেছিল একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস।

এদিকে এতগুলো বছর পর, নিজের পৈতৃক ভিটায় কোনোভাবেই পা রাখতে পারছিলেন না আসাদ আর ইসহাক। অবশেষে সমস্ত জড়তা ভেঙে ইসহাকই প্রথম ঘরের ভেতর প্রবেশ করলেন।
মাকে এই নিথর অবস্থায় দেখে অজান্তেই তার চোখের কোণ বেয়ে পানির ধারা নেমে এল। পায়ের সব শক্তি হারিয়ে তিনি ধপাস করে মেঝেতে বসে পড়লেন। স্বামীর এই আকস্মিক ও শোচনীয় অবস্থা দেখে আশমিনি দ্রুত দৌড়ে গিয়ে ইসহাককে আগলে ধরলেন। ইসহাক অপরাধবোধে জর্জরিত চোখ নিয়ে, শুকনো ঠোঁট দুটো জিভ দিয়ে সামান্য ভিজিয়ে ভাঙা গলায় বললেন, “আমি… আমি তো মায়ের কাছে ক্ষমাটুকুও চাইতে পারিনি, আশমিনি। শেষবারের মতো তার সামনে মাথানত করে দাঁড়িয়ে ‘আমাকে ক্ষমা করে দাও’, এই কথাটুকু বলার সুযোগটাও আমার ভাগ্যে জোটেনি। এক বুকভরা অভিমান আর আমার প্রতি অগণিত আক্ষেপ নিয়েই মা পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলেন। সবচেয়ে বড় কষ্টটা জানো কী? আমি কোনোদিন তাকে সামনাসামনি বলতে পারলাম না, আমি তাকে কতটা ভালোবাসতাম।
আমি ব্যর্থ, আশমিনি… ভীষণ ব্যর্থ। শুধু একজন মানুষ হিসেবে নয়, একজন সন্তান হিসেবেও আমি সম্পূর্ণ ব্যর্থ।”

বলতে বলতে তিনি কান্নায় ভেঙে পড়ে স্ত্রীর কাঁধে মাথা সঁপে দিলেন। আশমিনি দুই হাতে শক্ত করে ধরে ফেললেন তাকে। এর আগে সে কখনো তার স্বামীকে এভাবে চূর্ণ-বিচূর্ণ হতে দেখেনি। বাইরের কঠোর খোলসটার নিচে চাপা পড়া মানুষটা যে ভেতরে ভেতরে কতটা বিষণ্ন আর নিঃস্ব হয়ে গেছে, তা বুঝতে আজ আর কারও বাকি রইল না।
উঠোনের এক কোণে নিঃসঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন আসাদ চৌধুরী। তার দৃষ্টি মাটির দিকে নিবদ্ধ, হয়ত নিজের ফেলে আসা অতীতের সমস্ত অপরাধের হিসাব মেলাচ্ছেন। বাবাকে এভাবে একাকী, অপরাধীর মতো দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আরিয়ান এগিয়ে গেল। নিজের দুই হাত বুকের ওপর আড়াআড়িভাবে বেঁধে, বাবার ঠিক সমান্তরালে গিয়ে দাঁড়াল। বেশ কিছুক্ষণ এই স্তব্ধতা বজায় রাখার পর আরিয়ান মুখ খুলল, “কখন থেকে স্ট্যাচুর মতো দাঁড়িয়ে আছ, ড্যাড! ভেতরে যাবে না?”
আসাদ শুষ্ক কণ্ঠে বললেন, “তুই যা। আমার এ বাড়িতে ঢোকার পারমিশন নেই। আমি এখানে একজন বহিরাগত মাত্র।”

“তাহলে আর কি, আমিও এখানে দাঁড়িয়েই থাকি। ভেতরে যাওয়ার অথরিটি কি আমারও আছে নাকি? আমার তো মনে হয় না তোমার যেখানে নো-এন্ট্রি, সেখানে আমার কোনো রাইট আছে। ছোটোবেলা থেকে তো তোমার তৈরি করা রুলস আর রেগুলেশনেই বড়ো হলাম, এখন এই মুহূর্তে এসে ভিন্ন কিছু কেন হবে?”
“বুদ্ধিশুদ্ধি কবে হবে তোমার, আরিয়ান? দাদির মরণে এসেছ, ভেতরে গিয়ে শেষবারের মতো ওনাকে দেখে আসো। যাও!”
বাবার সেই বজ্রকঠিন কণ্ঠস্বরের পর আরিয়ানের পক্ষে সেখানে দাঁড়িয়ে থাকা আর সম্ভব হলো না। সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে হনহন করে ভেতরের ঘরের দিকে পা বাড়াল। অন্দরে পা রাখতেই চারপাশের ম’রা কান্না আর বিলাপের সুর তার কানে এসে আঘাত করল। সে একটা ভারী নিশ্বাস ফেলে আম্বিয়ার নিথর দেহের পাশে গিয়ে দাঁড়াল। শুভ্র চাদরের নিচ থেকে উন্মুক্ত থাকা ওনার স্নিগ্ধ মুখাবয়বটার দিকে সে বেশ কিছুক্ষণ চেয়ে রইল। এমন পবিত্র, অপার্থিব ও শান্ত মৃ*ত্যু সে ইতঃপূর্বে আর কখনো দেখেনি। যেহেতু শৈশবে বা কৈশোরে এই বাড়িতে তার তেমন যাতায়াত ছিল না, তাই স্বাভাবিকভাবেই ওনার প্রতি আরিয়ানের ভেতর কোনো গভীর আবেগ বা কান্নার জোয়ার উপচে পড়ল না। সে শুধু নীরব সম্মান জানিয়ে সেখান থেকে সরে এগিয়ে গিয়ে কারানের ঠিক পাশে দাঁড়াল।
বেশ কিছুক্ষণ দুই ভাইয়ের মাঝে কোনো কথা হলো না। কারানের সেই অনড়, পাথুরে ভাব দেখে আরিয়ানই প্রথম নীরবতা ভাঙল, “এভাবে জাস্ট একটা অবজেক্টের মতো দাঁড়িয়ে না থেকে তোর উচিত দাদির জন্য দোয়া করা। যা, গিয়ে নামাজ পড়ে আয়।”

আরিয়ানের মতো এক বেপরোয়া যুবকের মুখে ‘নামাজ’ শব্দটা শুনে কারান কিঞ্চিৎ বিস্মিত হলো। তবে তার মুখাবয়বে কোনো পরিবর্তন সে প্রকাশ পেতে দিল না। আরিয়ান তার নির্বাক ভাব দেখে আবার বলল, “আমি তো ছোটোবেলা থেকেই অজাত, সবার অপছন্দের একটা ক্যারেক্টার। কোনো কাজ আজ পর্যন্ত পারফেক্টলি করতে পারলাম না, করতে গেলেই হাজারটা বোকামি আর ভুল করি। তুই হয়ত এখন বলবি, দাদি তো তোরও ছিল, সো নামাজ তোরও পড়া উচিত। আসলেই উচিত, আই নো দ্যাট। কিন্তু আমি তো নামাজের কোনো নিয়মকানুন জানি না, কখনো প্র্যাকটিসই করিনি। তুই তো জাতের, এ বাড়ির সবার কাছের মানুষ। সবার আদরের গুড বয়। সব কাজও রেসপন্সিবিলিটির সাথে ঠিকঠাক করিস। আমি তো শুনেছি নামাজে ভুলভাল করলে পাপ হয়, তাই তুই-ই পড়তে যা। মন ভরে দাদির জন্য দোয়া করিস। আমার তো ভেতর থেকে কোনো ইমোশনই আসছে না, তাই ওনাকে কী দোয়া দেব, তাও বুঝতে পারছি না।”

কথাগুলো শেষ হতে না হতেই কারান হুট করেই আরিয়ানের পাশ কাটিয়ে ঘরের ভেতরের অন্ধকার কক্ষটার দিকে চলে গেল। আরিয়ান সম্পূর্ণ অপ্রস্তুত অবস্থায় বোকার মতো সেখানে ঠায় দাঁড়িয়ে রইল। সে নিজের ঠোঁটটা সামান্য বাঁকিয়ে, বিড়বিড় করে স্বগতোক্তি করল, “এর কি সবসময় চলে যাওয়াটা হ্যাবিট হয়ে গেছে নাকি? কত ভালো একটা কথা বললাম, আমার পুরো লাইফে এত ম্যাচিউর আর পজিটিভ কথা আর কখনো বলেছি কিনা, আমার নিজেরই মনে পড়ছে না। তাও আমার কথা শুনলো না। অথচ মরাল সায়েন্সের বইয়ে পড়ে এসেছি বড়োদের কথা সবসময় শুনতে হয়। ধুর বা’ল! আমি তো ভুলেই গিয়েছিলাম, এই শালা আবার আমাকে বড়ো ভাই বলে কবেই বা সম্মান দিয়েছিল!”

নিজের অজান্তেই মুখ থেকে বেরিয়ে যাওয়া শব্দটার জন্য সে জিভ কেটে আবার আওড়ালো, “তওবা, তওবা! এমন একটা ট্র্যাজিক মোমেন্টেও কারো মুখ থেকে গালি বের হয়? ড্যাড আসলে ঠিকই বলত, আমার মতো ইউনিক ছাগল দুনিয়াতে দ্বিতীয়টা আর নেই!”
তার এই আত্মদহনের মাঝেই হঠাৎ কারান অন্দরের কক্ষ থেকে বের হয়ে এল। সে সোজা আরিয়ানের সামনে এসে তার হাতটা টেনে ধরল এবং জোরপূর্বক হাতের মুঠোয় একটা কালো টুপি গুঁজে দিল; কারণ আরিয়ান আজ একটা কালো রঙের পাঞ্জাবি পরে এসেছিল। কারান নিজের মাথায় একটি সাদা টুপি পরতে পরতে আরিয়ানের সামনে দিয়ে হাঁটতে শুরু করল। গম্ভীর সুরে বলল, “সামনেই গ্রামের বড়ো মসজিদ। জুমার নামাজটা জামাতে আদায় করে আসি, চল। তারপর ফিরে এসে দাদির জানাজায় শরিক হতে হবে।”

এই বলেই কারান দীর্ঘ পদক্ষেপে সামনের মেঠোপথ ধরে হাঁটা দিল। আরিয়ান পেছনে সম্পূর্ণ স্তব্ধ, বাকরুদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার এই উদ্ধত, অহংকারী ছোট ভাইটা আজ এত ভালোভাবে তার সাথে কথা বলল? তার সাথে? অবিশ্বাস্য! সে ভ্রূ জোড়া কপালে তুলে মনে মনে ভাবল, “এখন কোনো ফালতু প্রশ্ন করে নিজের কপাল পুড়িয়ে লাভ নেই। ও যা বলছে, শুনে নেওয়াই বেটার। নইলে ওর যে টেম্পারামেন্ট, রাস্তার পাশে পড়ে থাকা ইটগুলোর একটা তুলে আমার নাক বরাবর ছুঁড়ে মারতে ওর একটুও বাঁধবে না! একটা জুটেছে পাবনার দেয়াল টপকে পালিয়ে আসা বউ, আরেকটা আবার উগান্ডার জঙ্গল থেকে আমদানি করা ভাই। আমার নাম তো এতদিনে গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকার কথা! পা’গলদের মাঝখানে বসবাস করেও এখনও নিজের নাম, বাবার নাম, এমনকি জাতীয় সংগীত পর্যন্ত ভুলিনি। একদম সুস্থ আছি, আবার মাথার একটা তারও ছিঁড়েনি, কীভাবে, সেটা একমাত্র আল্লাহই ভালো জানেন!”

সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজের মনেই একটু হাসল। নিজেকে মাঝে মাঝে তার একদম লোকাল, সরকারি মা’লের মতো মনে হয়, যখন যার ইচ্ছা এসে শাসন করে যায়, ধমকে যায়। ঘরে এক বউ জুটেছে, সে তো বউ নয় যেন আস্ত ডাইনি, আর ভাইটা তো আরেক সুদর্শন জল্লাদ। আর ড্যাড তো সুযোগ পেলেই তাকে মাটির নিচে পুঁতে ফেলার জন্য রেডি থাকে। এমনকি মাঝেমধ্যে দুই ইঞ্চির আয়াশটাও তার ইজ্জত এক হাঁটে বিক্রি করে অন্য হাট থেকে কিনে আনে। একমাত্র মিরাই দরবেশের নাতনি, যে কিনা তাকে কিছুটা হলেও সম্মান দেয়।
আরিয়ান তার ভাবনার জাল কেটে দ্রুত পা চালিয়ে কারানের একদম পাশাপাশি এসে দাঁড়াল। হাঁটতে হাঁটতে সে কারানের দিকে আড়চোখে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, “আমি তো তখন জাস্ট কথার কথা বলেছি। তুই কি আসলেই নামাজ পড়তে জানিস? মানে তোকে এই নিয়মকানুনগুলো কে শেখাল?”

“মিরা!”
কারানের এই ছোট উত্তরের পিঠে আরিয়ান ভেংচি কেটে মনে মনে নিজের ক্ষোভ উগরে দিল, “আর আমার কপালটা দেখো! গড নোস, আগের জন্মে কার পকেট মেরেছিলাম! দুনিয়ার সব বউ জামাইকে শুধরে সোজা পথে আনে, আর আমারটা? নিজেরটা ছাড়া আমার কথা কোনোদিন ভুলেও ভাবে না। নামাজ পড়ুক, কুরআন খতম দিক, রোজা রাখুক—সব ভালো কাজ একা একা করে জান্নাতে যেতে চায়। আমাকে একটু গাইড করা তো দূর, ও পারলে আমাকে বাড়ি থেকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে নিজে সব সওয়াব লুটে নেয়! আল্লাহ বাঁচিয়েছে যে জান্নাতে মেয়েদের জন্য কোনো হুরের অপশন রাখেনি, নইলে আমার যা সেলফিশ বউ, ও নির্ঘাত আমাকে সেখানেও একলা ফেলে নিজের জন্য বিশ-ত্রিশটা হ্যান্ডসাম হুর বুকিং দিয়ে রাখত!”
সে এবার গলার স্বর চড়িয়ে বলল, “কিন্তু আমিই… আই মিন, আমি তো জানি না কীভাবে কী করতে হয়!”
“তোর ভাই আছে শেখানোর জন্য। ডোন্ট ওয়ারি।”

কারান খুব বেশি শব্দ খরচ করেনি, অথচ এই সামান্য কয়েকটা শব্দের অভিঘাত আরিয়ানের বুকে গিয়ে এতটা তীব্রভাবে লাগল যে, এই প্রথম তার চোখের কোণ বেয়ে এক ফোঁটা তপ্ত জল টলমল করে উঠল। এতক্ষণ দাদির মৃ*ত্যুতেও যে পাথরটা গলেনি, আজ কারানের মুখ থেকে নিজেকে ‘ভাই’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া এবং এতখানি অধিকারের সুর শোনাটা আরিয়ানের মনের সমস্ত পুরুষালি অহংকারকে এক নিমেষে গুঁড়িয়ে দিল। সে বিস্ময়ে ও আবেগে স্থবির হয়ে পথের মাঝখানেই দাঁড়িয়ে রইল।
কিছুটা পথ পেরিয়ে যাওয়ার পর কারান যখন পেছন ফিরে তাকাল, তখন আরিয়ানকে ওভাবে মাঝরাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সে সামান্য ভ্রূ কুঁচকে দাঁড়িয়ে গেল। কারান গভীর চোখে ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে কেন জানি আবার বলল, “আজকে নিজের সমস্ত ভুলের জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা চেয়ে নিস। হয়ত আল্লাহ জান্নাতে তোর জন্য একটা জায়গার ব্যবস্থা করে দিতেও পারেন।”

এই শেষ বাক্যের পর আরিয়ানের ভেতরের সমস্ত বাঁধ একবারে ভেঙে গেল। সে আর কোনো সামাজিকতার তোয়াক্কা না করে হুট করেই দৌড়ে গিয়ে কারানকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরল। কারান স্বভাবসুলভভাবেই এই আকস্মিক আলিঙ্গনে সাড়া দিল না, কিন্তু আরিয়ানের চোখের এক ফোঁটা অবাধ্য জল যে তার পাঞ্জাবির পিঠের অংশটা ভিজিয়ে দিয়েছে, সেই উষ্ণতা সে ঠিকই উপলব্ধি করতে পারল।
এই মুহূর্তে রোমানা যদি এখানে উপস্থিত থাকত, তবে কি সে সবসময়কার মতো কোনো টিটকিরি কাটত? নাকি বিষয়টাকে নিয়ে ফান করত? একদমই না। বরং দুই ভাইয়ের এই মেলবন্ধন দেখলে হয়ত সে নিজেই ইমোশনাল হয়ে আড়ালে চোখ মুছত। কারণ সে খুব ভালো করেই জানত, কারান আর আরিয়ান আদতে সহোদর হলেও তাদের মধ্যকার মানসিক দূরত্বটা ছিল মাইলের পর মাইল বিস্তৃত।

বেশ কিছুক্ষণ পর আরিয়ানের ভেতরের সেই আবেগের জোয়ার কিছুটা থিতু হলে, দুই ভাই একসাথে মসজিদের সদর দরজা ডিঙিয়ে ভেতরে প্রবেশ করল। আর মসজিদের এক কোণে দাঁড়িয়ে সত্যি সত্যি কারান খুব নিপুণভাবে আরিয়ানকে নামাজের প্রাথমিক নিয়মকানুন আর রুকু-সেজদার ধরন বুঝিয়ে দিল। নিয়তের কিছু শব্দে টুকটাক ভুলত্রুটি হলেও আরিয়ান আজ জীবনের প্রথম পরম একাগ্রতায় আল্লাহর সামনে মাথা নত করে নামাজ আদায় করল।
এদিকে চৌধুরি বাড়ির প্রাঙ্গণে, দাঁতে দাঁত চেপে প্রায় ঘণ্টাখানেক ধরে তপ্ত রোদের নিচে দাঁড়িয়ে থাকলেও এবার আসাদের ধৈর্যের দেয়ালটা আর টিকল না। একটু পরই মায়ের জানাজার খাট বাইরে বের করার তোড়জোড় দেখে তার ভেতরের অনুশোচনা তীব্র হয়ে উঠল। অবশেষে তিনি অন্দরের কক্ষের ভেতর পা রাখলেন।

আসাদ আবেগভারাক্রান্ত হৃদয়ে কিছুক্ষণ এক কোণে দাঁড়িয়ে দূর থেকেই তার মায়ের নিথর দেহের অবয়বটা দেখতে থাকলেন। এই নারীর কথা সে তার জীবনে কোনোদিনই তেমন একটা কান দিয়ে শোনেনি। তার ওপর শৈশব থেকেই ঢাকার চাকচিক্য আর আধুনিকতায় বড়ো হওয়ায় এই গ্রামীণ পৈতৃক ভিটার প্রতি আসাদের কোনোদিন আত্মিক টান গড়ে ওঠেনি। অতীতে একমাত্র কৌশিকার জেদ আর ভালোবাসার টানেই তাকে অনিচ্ছা সত্ত্বেও এই গ্রামে আসতে হতো; কারণ কৌশিকা এই মাটির সুবাস ছাড়া শহরের ওই কংক্রিটের জঙ্গল একদম পছন্দ করত না।

আসাদ তপ্ত নিশ্বাস ফেলে অত্যন্ত ধীর পায়ে খাটিয়ার দিকে এগিয়ে গেলেন। কেন জানি প্রতিটি কদম ফেলার সময় মনে হচ্ছিল তার পায়ের তলায় কে যেন সিসা ঢেলে দিয়েছে, পা দুটো কিছুতেই এগোতে চাইছে না। অবশেষে খাটিয়ার একদম কিনারায় পৌঁছে সে যখন একটু ঝুঁকে মায়ের মুখের ওপর থেকে শুভ্র চাদরটা সামান্য সরাতে যাবে, ঠিক তখনই এক ঝটকায় তার কবজিটা শক্ত করে চেপে ধরল কেউ।
আসাদ চমকে উঠে তাকিয়ে দেখল, লাল ও ফোলা চোখ নিয়ে হিংস্র চাহনিতে তার দিকে তাকিয়ে আছেন তার আপন বোন ফাতিমা। ফাতিমা ঠোঁট কামড়ে ধরে চরম ঘৃণায় বললেন, “একদম ছুঁইবা না আম্মারে! তোমার এই বেইমান, অপবিত্র হাত যেন আমার নিষ্পাপ আম্মার গায়ে না লাগে! এইখান থেইকা দূরে সরো!”
ভরা পরিবার আর গ্রামের সবার সামনে এমন প্রকাশ্য অসম্মান বরাবরের মতোই আসাদের পুরুষালি আভিজাত্যে আঘাত করল প্রচণ্ডভাবে। চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল তার, কপালের রগগুলো তিন ভাঁজ হলো। কিন্তু পরিস্থিতি বিবেচনা করে আজ সে কোনো বিশৃঙ্খলা তৈরি করতে চাইল না। সে এক ঝটকায় ফাতিমার হাতটা নিজের কবজি থেকে সরিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াল। পাঞ্জাবির হাতাটা সামান্য ঠিক করে নিয়ে বরফশীতল কণ্ঠে বলল, “আমার নিজের মাকে ছোঁয়ার পারমিশন নিশ্চয়ই আমি তোর থেকে নেব না।”
পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা আশমিনি টের পেল যে এই পারিবারিক মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ এখন কদর্য মোড় নিতে যাচ্ছে। সে চতুরতার সাথে ঘরের অন্য কোণে দাঁড়িয়ে থাকা গ্রামের মহিলাদের বুঝিয়ে-সুঝিয়ে কক্ষের বাইরে পাঠিয়ে দিল।

“কীসের মা? হা? তুমি আমার মারে নিজের মা বইলা একদম পরিচয় দিবা না! কোনোদিন মা আর বোনের খোঁজ নিছিলা? আমরা মেয়েছেলেরা এইহানে কেমনে বাঁইচ্যা আছি, জানবার চাইছ কোনোদিন?”
“সব কিছু কি ঢাকঢোল পিটিয়ে, লোক-দেখানো উপায়ে জানাতে হবে আমাকে? আকবরের মাধ্যমে এই বাড়ির এবং তোদের খোঁজ রাখতাম আমি।”
ফাতিমা সংশয় নিয়ে দরজার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা আকবরের দিকে তাকালে, আকবর সামান্য মাথা দোলালো।
“সে তুমি যাই করো, তোমার ওই ভুলের লাইগাই আমগো সাজানো সুখের সংসারটায় আগুন লাগছে! পুরো পরিবারটা দুই ভাগে ভাগ হইয়া গেছে। তুব্বা আর আয়াশরা তো জানেও না যে ওগো র*ক্তেরই আরও আপনজন এই দুনিয়ায় বাঁইচা আছে। তোমার লাইগা আমার সোনার টুকরা ভাবীটা আজ সংসার-সমাজ ছাইড়া কই হারায় গেল, কেউ বলতেও পারে না! মা জ্যান্ত থাকলে তোমারে কোনোদিনও ক্ষমা করত না, আসাদ চৌধুরি।”

“একদম মুখে মুখে তর্ক করবি না, ফাতিমা!” আসাদ আঙুল উঁচিয়ে ধমকে উঠল, “ভুলে যাস না, আমি তোর বড়ো ভাই।”
“আপনারা কি এবার একটু থামাবেন? এখানে কতগুলো ইনোসেন্ট বাচ্চা আছে, সেদিকে কি আপনাদের বিন্দুমাত্র খেয়াল নেই? আপা, তুমি প্লিজ ভেতরে যাও। রোমানা, আপাকে সাথে নিয়ে ওদিকের ঘরে যাও, মিরার মাধ্যমে তুব্বা আর আয়াশের জন্য কিছু খাওয়ার অ্যারেঞ্জ করো। আর ভাইয়া, আপনিও কাইন্ডলি এই এনভায়রনমেন্টটা আর ভারী করবেন না। অতীত হাতড়ে লাভ নেই, দিনের শেষে ভুলটা কিন্তু আপনারই ছিল, সেটা ভুলে যাবেন না।”
আশমিনির কথার সূক্ষ্ম অথচ ধারালো খোঁচাটা আসাদের বুকে গিয়ে বিঁধল। তিনি অগ্নিদৃষ্টিতে আড়চোখে আশমিনির দিকে তাকালেন। আসাদের এই মারমুখী চাহনি দেখে ইসহাক কিছুটা শঙ্কিত হয়ে দ্রুত এগিয়ে এলেন। তিনি আশমিনির হাতটা শক্ত করে চেপে ধরে বললেন, “কী করছ কী, আশমিনি? আমাদের মা মা’রা গেছেন, সেখানে এই শেষ সময়ে এসে কেন পুরোনো কলহ উঠছে? ওনাকে কি একটু শান্তিতে, শেষ মুহূর্তের জন্য ভালোবাসতে দেবে না তোমরা?”

আশমিনিও এবার চরম ক্ষোভে তার স্বামীর দিকে তাকালেন। তিনি খুব ভালো করেই বুঝতে পারছিল যে, ইসহাক আসলে চাচ্ছে না আসাদের মতো একরোখা মানুষের সাথে আশমিনি কোনো দ্বন্দ্বে জড়াক। কিন্তু আশমিনি তো আর সেই মেরুদণ্ডহীন, ভীরু টাইপের নারী নয় যে স্বামীর ইশারায় দমে যাবে। সে আসাদের দিকে সেই আগের মতোই অবিচল, তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে চেয়ে রইল।
এদিকে আসাদ আর কোনো বাগ্‌বিতণ্ডায় না গিয়ে মায়ের খাটিয়ার পাশে হাঁটু গেড়ে বসে পড়লেন। তার মনের পর্দায় তখন পুরোনো স্মৃতি ভেসে উঠল—ছোটোবেলায় যখনই সে কোনো অন্যায় করত বা বাবা মুস্তাফা কামাল রেগেমেগে তাকে মা’রতে আসতেন, সে ভয়ে মায়ের শাড়ির আঁচলের নিচে গিয়েই আশ্রয় নিত। আজ এত বছর পর, সেই একই টানে তিনি মায়ের আঁচলের এক কোন আলতো করে হাতের মুঠোয় নিলেন। সেখানে পরম শ্রদ্ধায় একটা দীর্ঘ ও গভীর চুম্বন আঁকলেন। নিজের অজান্তেই তার পাথুরে চোখ থেকে এক ফোঁটা তপ্ত অশ্রু মায়ের আঁচলের ওপর টুপ করে গড়িয়ে পড়ল। আসাদ নিজেও কখনো ভাবেনি যে, তার মতো কঠোর হৃদয়ের মানুষের চোখ দিয়েও এই বয়সে এসে জল পড়তে পারে।

কিছুক্ষণ পরই কারান আর আরিয়ান মসজিদ থেকে ফিরে এল। জানাযা শেষে কারান, আরিয়ান, ইসহাক এবং আসাদ—এই চারজন মিলে খাটিয়ার চার কোণ তুলে কাঁধে নিলেন। আম্বিয়ার মহিমান্বিত দেহ নিয়ে তারা প্রাঙ্গণ পেরিয়ে মেঠোপথের দিকে এগোতে লাগলেন।
কিন্তু আসাদ কোনো একটা তীব্র অপরাধবোধের কাঁটায় অনবরত বিদ্ধ হচ্ছিলেন। প্রতিটা কদম ফেলার সময় তার মনে হচ্ছিল, মায়ের পবিত্র শরীরটা বহন করার যোগ্যতা তার মতো পাপী ও অবাধ্য সন্তানের কাঁধের নেই। তিনি সত্যিই পারলেন না। রাস্তার ঠিক মাঝামাঝি এসে, ধুলোবালির মধ্যেই আসাদ পা মটকে বসে পড়লেন।
তাকে এভাবে ধুলোয় লুটিয়ে পড়তে দেখে আকবর দ্রুত এগিয়ে এসে তাকে জড়িয়ে ধরলেন, “ভাইজান, সামলান নিজেকে।”
তারপর আকবর আসাদের ফেলে যাওয়া খাটিয়ার সেই অগ্রভাগ নিজের চওড়া কাঁধে তুলে নিলেন।

দাফন সম্পন্ন হওয়ার পর একে একে গ্রামের সমস্ত মানুষ যখন নিজেদের ঘরের দিকে ফিরে গেল, তখনো মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইল একমাত্র কারান। সে লোকমুখে শুনেছে, দাফনের পর সবাই কবরস্থান ছেড়ে চলে গেলে মুনকার-নাকির এসে মৃ’ত আত্মাকে জেরা করা শুরু করেন। তাই সে নিজের মনে পণ করেছে, দাদিকে এভাবে সম্পূর্ণ একা রেখে সে অন্তত এখন কোথাও যাবে না, কিছুতেই না।
অকস্মাৎ কারানের কাঁধে লম্বালম্বিভাবে একটি হাত পড়ল। কারান না চমকালো, না তার চোখের পলক কাঁপল, এমনকি সে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখার প্রয়োজনও বোধ করল না।
পেছন থেকে আরিয়ান এক গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে কিছুটা আক্ষেপের সুরে বলল, “তুই আসলেই খুব ভাগ্যবান, ছোট ভাই। পৃথিবীর সমস্ত ভালো মানুষের জেনুইন ভালোবাসা তুই পেয়েছিস। অন দ্য আদার হ্যান্ড, জাস্ট লুক অ্যাট মি! আমি নিজের লিগ্যাল বউয়ের মিনিমাম ভালোবাসাটাও পাচ্ছি না। লাইক আ বেগার, আমি ওর কাছে ইমোশন ভিক্ষা চেয়েও রিজেক্টেড হচ্ছি প্রতিদিন।”

আরিয়ানের অপ্রাসঙ্গিক আত্মবিলাপ শুনেও কারান আগের মতোই নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে রইল। তার অবচেতনে তখন একটা তিক্ত প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছিল, সে কি আসলেই ভাগ্যবান? কীভাবে? যেখানে তার জীবনের প্রতিটি নির্ভরযোগ্য আশ্রয়, প্রতিটি আপনজন একে একে তাকে মাঝপথে ফেলে চিরতরে চলে যাচ্ছে, সেখানে তার মতো দুর্ভাগা আর অভিশপ্ত মানুষ তো এই দুনিয়ায় দ্বিতীয়টি নেই। এই ভালোবাসার শেষ পরিণতি যদি শুধুই কবর হয়, তবে এমন সৌভাগ্য সে চায় না।

আট দিন পর। পুরোনো সেই জমকালো চৌধুরি বাড়িটা এখন সম্পূর্ণ জনমানবহীন। বাড়ির প্রত্যেককে এক প্রকার জোর করেই ঢাকায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে। বিশেষ করে ফাতিমাকে রাজি করাতে সবাইকে বেশ বেগ পেতে হয়েছিল। কিন্তু কারান জানত, এই বাড়িটা এখন অভিশাপে রূপ নিয়েছে। এখানে আর কাউকে ফেলে রেখে সে নতুন কোনো মৃ*ত্যুর ট্র্যাজেডি দেখতে চায় না।
তবে আপাতদৃষ্টিতে সবাই ঢাকা চলে গেলেও, কারানের রুটিন বদলায়নি। সে প্রতিটা দিন লোকচক্ষুর আড়ালে, পরিবারের কাউকে না জানিয়ে একবার করে এই শূন্য বাড়িতে ফিরে আসে। একা একা ঘণ্টা দুয়েকের মতো সময় কাটায়। অন্দরের ধুলোবালি মাখা আসবাবপত্র ছুঁয়ে দেখে, আর ফেরার পথে কবরস্থানে গিয়ে দাদি আম্বিয়া আর প্রিয় তারান্নুমের কবর জিয়ারত করে।
এদিকে, এই আকস্মিক ঘটনার পর থেকে পরিবারের সাথেও কারানের মানসিক দূরত্ব তৈরি হয়েছে। বাড়ির কারোর সাথেই তার প্রয়োজনীয় দু-একটি বাক্যের বাইরে কোনো কথা বা ভাবের আদান-প্রদান হয়নি।
কারণ ঘরের অন্য সদস্যরা তো কেবল আম্বিয়ার মৃ*ত্যুর শোকটাই দেখছে; অথচ কেউ তো আর জানে না যে কারান এই অল্প সময়ের ব্যবধানে তার জীবনের তিনটি স্তম্ভ—আয়লা, তারান্নুম আর দাদি আম্বিয়াকে হারিয়ে ভেতরে ভেতরে সম্পূর্ণ নিঃস্ব হয়ে গেছে।

ওদিকে, এর মাঝেও কারান বারবার ফারহানের সাথে যোগাযোগ করার আপ্রাণ চেষ্টা করলেও, তা সম্পূর্ণ ব্যর্থ হচ্ছিল। হসপিটালের রিলিজ অর্ডারের পর সে ঠিক কোথায় গেছে, তার কোনো হদিশ কেউ দিতে পারছিল না।
একবার ফারহান নিজেই একটি সম্পূর্ণ ট্র্যাকিং-অযোগ্য, বেআইনি নম্বর থেকে কারানের ফোনে কল করেছিল। সংক্ষেপে এতটুকুই বলেছিল, “ডোন্ট ট্রাই টু ফাইন্ড মি, কারান। আমি নিজের জীবনের এমন একটা খেলায় নেমেছি, যার প্রতিটা সেকেন্ড আর প্রতিটা চাল আমাকে শুধু তারান্নুমের কথাই মনে করিয়ে দেয়। এখন আমি কারও সাথে কোনো ধরনের কমিউনিকেশন রাখতে পারব না। কিছুদিন আমাকে নিজের মতো করে থাকতে দে, এটা তোর কাছে আমার অনুরোধ। সময় হলে আমি নিজেই তোর সঙ্গে যোগাযোগ করব। আর একটা কথা… চিন্তা করিস না। আমি নিজের কোনো ক্ষতি করব না।”
ফারহান লাইনটা কেটে দেওয়ার পর কারানও আর দ্বিতীয়বার চেষ্টা করেনি। আসলে এই পরিস্থিতিতে তার নিজেরও নতুন করে কাউকে কিছু বলার বা সান্ত্বনা দেওয়ার মতো মানসিক ভারসাম্য অবশিষ্ট নেই।

রাত তখন গভীর। একটা অজ্ঞাত হোটেলের চার দেয়ালের মাঝে টেবিল ল্যাম্পের মৃদু হলদেটে আলোয় বসে আছে ফারহান। বাইরে ঝিরঝির করে বৃষ্টি নামার শব্দ আসছে। ঠিক তখনই ঘরের কোণে, জানালার পাশ ঘেঁষে এসে একটা অবয়ব দাঁড়াল। ফারহান অপলক দৃষ্টিতে সেদিকে তাকিয়ে বিষণ্ন হাসিতে মুখ খুলল, “মায়ের সাথে ইদানীং আর কথা বলি না, জানো? কল করলেই ওনার সেই একই প্রলাপ—বউমাকে কবে বাড়িতে আনবি, ও বাড়িতে কবে আমাদের সবাইকে নিয়ে যাবি? ওনাদের এই অতিরিক্ত দরদ কেন জানি আর সহ্য হয় না! ওনাদের সাথে আমার বরাবরই একটা মেন্টাল ডিস্টেন্স ছিল, এখনো না হয় সেটা থাকুক।”
জানালার পর্দাটা সামান্য সরিয়ে সেই অবয়বটি মুখ ফেরাল। সে ফারহানের দিকে এগিয়ে এসে বলল, “কিন্তু এইটা তো আপনি এক্কেবারেই ঠিক করতেছেন না, মিস্টার। আপনার উচিত মায়ের সাথে রেগুলার কথা বলা, ওনারে সুন্দর কইরা বুঝাইয়া বলা।”

“কী বোঝাবো, কুইন? হোয়াট শুড আই সে?” ফারহান চেয়ারে হেলান দিয়ে দুই হাতে মুখ ঢাকল। তার কণ্ঠস্বর কাঁপছিল, “তুমি তো আমাকে মাঝরাস্তায় ফেলে দিয়ে ওই অসীম মহাকাশের সাথে প্রেম গড়ে তুলেছ! আমি তোমাকে কীভাবে মায়ের সামনে নিয়ে দাঁড় করাবো, বলো?”
মেয়েটি এবার ফিক করে হেসে দিল। সে ফারহানের টেবিলের একদম কিনার ঘেঁষে দাঁড়িয়ে নিজের ওড়নার প্রান্তে গিট্টু দিতে দিতে বলল, “ইশশ! যেমনে কথাগুলা কইতাছেন, যেন আমি চিরকালের লাইগা হারাইয়া গেছি! শুনেন বজ্জাত ব্যাটা, এই তারান্নুম আপনারে ম’রার পরও ছাড়ে নাই, আর কোনোদিন ছাড়বেও না। বলছিলাম না একদম আপনার ঘাড়ে উইঠা বইসা থাকমু? দেখছেন, কথা কিন্তু রাখছি…”

ফারহানের চোখের কোণ বেয়ে এক ফোঁটা অবাধ্য, তপ্ত জল গড়িয়ে পড়ল। তখনই অলৌকিকভাবে সেই অবয়বটি নিজের শুভ্র ওড়নাটার কোণ দিয়ে ফারহানের গালের জলটুকু মুছে দিতে লাগল। স্পর্শটা এতটাই জীবন্ত ছিল যে, ফারহান আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে ব্যাকুল হয়ে দুই বাহু বাড়িয়ে তারান্নুমকে জড়িয়ে ধরল। একদম শক্ত করে, যেন একটু আলগা হলেই সে বাতাসে মিলিয়ে যাবে।
“আমাকে ছেড়ে কেন চলে গেলে, গ্লিমার?” ফারহান ওর বুকের মাঝে মুখ লুকিয়ে ডুকরে কেঁদে উঠল, “আমার যে ভীষণ কষ্ট হচ্ছে, তারা… যন্ত্রণায় বুকটা পুড়ে খাক হয়ে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে হৃৎপিণ্ডে কেউ মরচে পড়া ছুরি ঢুকিয়ে মোচড় দিচ্ছে, অথচ আমি হাজার চেষ্টা করেও সেটা বের করতে পারছি না। আই অ্যাম কমপ্লিটলি লস্ট। আমি কীভাবে এই নরকে একা বাঁচব? ও তারা, আমার কাছে ফিরে এসো, প্লিজ কাম ব্যাক টু মি, তারাজান!”

তারান্নুম চোখ দুটো আস্তে বুজে নিল। তার চোখের কোণ বেয়ে একফোঁটা নীরব অশ্রু নেমে এলো। কাঁপা হাতে ফারহানের পিঠে আলতো করে হাত বুলিয়ে, ওর চুলের মাঝে আঙুল ডুবিয়ে বলল, “আমি তো আপনার খুব কাছেই আছি, ফারহান… আপনার ছটফট করতে থাকা বুকের মাঝে, আপনার জখম হওয়া স্মৃতিতে, আপনার প্রতিটা নিশ্বাসে-প্রশ্বাসে। আমরা কি আদৌও কোনোদিন আলাদা হইছি, কন?”
ফারহান নিশ্চুপ। সে শুধু শূন্যতাকে জড়িয়ে ধরে চুপচাপ কেঁদে গেল। বাইরে ঝুম বৃষ্টির একনাগাড়ে ঝপঝপ শব্দটা ক্রমশ তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। আর এই শব্দটাই এই মুহূর্তে ফারহানের কান্নার আওয়াজটাকে খুব সহজেই আড়াল করে দিয়েছে।

কিছুক্ষণ পর চোখের সেই লোনা জল আর ঝাপসা দৃষ্টি নিয়েই সে কাঠের চেয়ারটায় সোজা হয়ে বসল। ঘরের সেই কোণটা এখন সম্পূর্ণ শূন্য, জানালার পর্দাটা বাতাসে অলসভাবে দুলছে, সেখানে কেউ নেই।
ফারহান কাঁপা হাতে টেবিলের ওপর রাখা তারান্নুমের ডায়েরিটা টেনে নিল। এই বিগত কয়েকটা দিনে সে হয়ত এই ডায়েরির পাতাগুলো পাঁচশত বারেরও বেশি উলটেপালটে পড়েছে। আর প্রতিবারই এক বুক হাহাকার নিয়ে জানালার বাইরের ওই মেঘলা আকাশের দিকে তাকিয়ে থেকেছে। আজকেও সে ডায়েরির সেই চেনা লাইনের ওপর আঙুল বোলাল। পড়তে পড়তেই বলতে লাগল, “ফারহানকে এভাবে একলা রেখে তোমরা কেন সবাই স্বার্থপরের মতো চলে যাচ্ছ? আমি কি একটুখানি ভালোবাসা পাওয়ার যোগ্যতাও রাখি না? বন্ধু হয়েও এমন একটা মোমেন্টে তুমি আমার পাশে নেই, আয়লা! আমি তোমার ওপর আর কতখানি অভিমান করলে তুমি এসে আমাকে একবার শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলবে, ‘সব ঠিক আছে ফারহান, সব ঠিক আছে… কেউ কোথাও হারায়নি, এইতো সবাই তোমার খুব কাছেই আছে!’ আর কুইন… তোমাকে আমি কতটা মাসুম ভাবতাম! কিন্তু আমি ভুল ছিলাম। তুমি ঠিকই নিজের শান্তি বুঝে আমাকে একা ফেলে আকাশের বুকে উজ্জ্বল তারা হয়ে গেলে। আমার খুব রাগ হয় তোমার ওপর, খুব ক্ষোভ হয়। মন চায় ওই আকাশ থেকে তোমাকে জোর করে কেড়ে আনি, তারপর বুকে জড়িয়ে ধরে রাখি ততক্ষণ, যতক্ষণ না তোমার অবাধ্য নিশ্বাস আটকে আসে! আর এটাই হতো তোমার চিরন্তন শাস্তি।”

কথাগুলো বলতে বলতে ফারহানের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। সে টেবিল থেকে একটা কালো কালির কলম তুলে নিল। ডায়েরির পাতায় তারান্নুমের হাতের লেখা যেখানে শেষ হয়ে গিয়েছিল, ঠিক সেই লাইনের নিচ থেকেই ফারহান লিখতে শুরু করল,
“আমরা প্রতিদিন কতশত স্বপ্ন বুনি, কিন্তু শেষমেষ জীবন হেঁটে যায় নিয়তির লেখা পথ ধরেই। তোমাকে পাওয়ার ব্যাকুলতা আমার কোনোদিনও কমবার নয়… বরং প্রতিদিন একটু একটু করে তা বুকের ভেতর র*ক্তক্ষরণ তৈরি করে।
সময় বদলায়,
ঋতু পাল্টায়,
মানুষও একসময় স্মৃতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে শেখে, শুধু আমার হৃদয়টা আজও থমকে আছে সেই দিনটাতেই, যেদিন তোমাকে হারিয়েছিলাম।

হয়ত তুমি জানো না, আজও প্রতিটি মোনাজাতের শেষে তোমার নামটাই উচ্চারণ করি। আজও ভিড়ের মাঝে অকারণে তোমার মুখ খুঁজি, তারপর মনে পড়ে, যাদের ঠিকানা আকাশে লেখা হয়ে যায়, তারা আর পৃথিবীর পথে ফিরে আসে না। তবুও এই বোকা মনটা বোঝে না। প্রতিদিন একই অসম্ভব আশা নিয়ে মরে—যদি আর একবার, শুধু একবার তোমাকে আবার নিজের করে পেতাম…”
শেষ টান দিয়ে ডায়েরির একদম নিচে বোল্ড অক্ষরে লিখল, “যে মানুষটা অল্পে সুখ খুঁজে নেয়, ভাগ্য তার কাছ থেকে সেই অল্পটুকুও কেড়ে নেয়। আমি তো সেই পথহারা মাতাল, যার কোনো পানশালা নেই, শুধু তোমার রেখে যাওয়া বিষাদমাখা স্মৃতিগুলোই আমার বেঁচে থাকার একমাত্র নেশা।”

বিগত কয়েকটা দিন ধরে মিরা বেশ কয়েকবার কারানের সাথে কথা বলার আপ্রাণ চেষ্টা করেছে, কিন্তু প্রতিবারই তাকে ব্যর্থ হতে হয়েছে। কারান কাকডাকা ভোরেই অফিসের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে যায়, সেখানে জমে থাকা সমস্ত বিজনেস ডিল আর ফাইলপত্র গোছাতে নিজেকে ব্যতিব্যস্ত রাখে। তবে ইদানীং আরিয়ানের সাথে তার বন্ডিংটা আগের চেয়ে কিছুটা হলেও ইমপ্রুভ করেছে। আরিয়ানও এখন কারানের যে-কোনো কথা বেশ গুরুত্বের সাথেই মেনে চলছে। অবশ্য তাদের মাঝে এখনো ভাই-সুলভ খোশগল্প হয় না বললেই চলে; কথাবার্তা যা হয়, তা মূলত ওই অফিস, প্রজেক্ট আর প্রফেশনাল লাইফ রিলেটেড।
আজ সকাল থেকেই মিরার মনটা ভীষণ খারাপ। রোমানা মাঝেমধ্যেই মিরার ঘরে এসে তার সাথে গল্প জমানোর চেষ্টা করে। মূলত চৌধুরী পরিবারের ভেতরের শেকড়, ইতিহাস আর সম্পর্কের সমীকরণগুলো সে মিরার কাছ থেকে একটু একটু করে জানতে চায়। মিরাও বিষণ্ন মুখ নিয়ে টুকটাক পুরোনো দিনের কথা বলে চলে।

রোমানা এসে মিরার ঠিক পাশে বিছানায় বসল। মিরার ফ্যাকাশে চেহারার দিকে তাকিয়ে কিছুটা উদ্‌বিগ্ন স্বরে প্রশ্ন করল, “শরীর কি ঠিক হয়েছে তোমার, মিরা?”
“বুঝতে পারছি না, ভাবি,” মিরা কপালের অবিন্যস্ত চুলগুলো কানের পিঠে গুঁজে দিয়ে এক ক্লান্ত দীর্ঘশ্বাস ফেলল। “হঠাৎ করে ভেতরটা এত অস্থির কেন লাগছে জানি না। দু-দিন ধরে অনবরত বমি হতে হতে এখন শরীরটা একদম ভেঙে পড়েছে।”
“আমি কী বলি শোনো,” রোমানা মিরার কাঁধে একটা হাত রাখল। “তোমার এবার একজন ডক্টরের কাছে যাওয়া উচিত। এভাবে সেলফ-মেডিকেশন করে আর কয়দিন থাকবে? কারান যদি কোনোভাবে জানতে পারে যে তুমি এই সিচুয়েশনে আছ, দেখবে ও তোমাকেও বকাঝকা করবে প্লাস ফ্যামিলির বাকিদেরও সাবান ছাড়াই ধুয়ে দিবে। ও কিন্তু তোমার সব বিষয়ে বড্ড হাইপার।”

“তার জানার সময় কোথায়? দু-দিন ধরে তো এ বাড়ির সীমানায় পা-ই রাখেনি, কি এক ইম্পর্ট্যান্ট বিজনেস ট্রিপে আটকে গেছে। ইদানীং তো মনে হয় সে আমার অস্তিত্বটাই ভুলে গেছে।”
মিরার মিষ্টি অভিমানভরা কথা শুনে রোমানা মুচকি হাসল। সে মিরার নরম হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিল। অন্য হাতে মিরার চিবুকটা তুলে একটু ঝাঁকিয়ে বলল, “আজ বিকেলেই তোমাকে নিয়ে আমি হসপিটালে যাচ্ছি। বাড়ির বাকিদের না হয় বলব, আমরা দুজন জাস্ট একটু ঘুরতে বের হচ্ছি। নাহলে তোমার অসুস্থতার খবর কারানের কানে পৌঁছাতে এই বাড়ির মানুষদের বড়োজোর দুই মিনিট লাগবে।”

“আচ্ছা।”
“আর ভাবছি, ডাক্তার দেখিয়ে ফেরার পথে নদীর ধার থেকে একটু হেঁটে আসব। মনটাও হালকা হবে। কী বলো?”
মিরা অল্প হাসল, কিন্তু মানসিকভাবে এতটাই বিপর্যস্ত যে তেমন কোনো জোরালো সায় জানাতে পারল না। ঠিক তখনই বাইরে আকস্মিক কিছু উচ্চবাচ্যের আওয়াজ শুনে রোমানা আর মিরা চমকে উঠে সেদিকে তাকাল।
“ইউ গেঁয়ো ভূত! স্টুপিড ব্লাডি ভিলেজার! তোমাকে না কতবার বলেছি আমার রেঞ্জের মধ্যে আসবে না? দূর হও এখান থেকে!”
তুব্বাও কোমরে দুই হাত দিয়ে, চোখ-মুখ কুঁচকে পালটা তোপ দাগল, “তুই গেঁয়ো, তোর চৌদ্দ গুষ্টি গেঁয়ো! এহহ, একটুখানি পিচ্চি একটা ছোকরা, তার ভাবসাব দেহো না একবার, যেন মস্ত বড় লাটসাহেব আইছেন! কাঁচকলা আমার!”
“হোয়াট? তুমি আমাকে গেঁয়ো বললে? জাস্ট ওয়েট এ্যান্ড ওয়াচ!” আয়াশ অপমানে লাল হয়ে তার কোমর থেকে প্লাস্টিকের লাল রঙের খেলনা রিভলভারটা বের করে একদম স্নাইপারের মতো তাক করল তুব্বার বুক বরাবর।

তুব্বা দেখল পরিস্থিতি বেগতিক। সেও সময় নষ্ট না করে পাশের কনসোল টেবিলের ওপর রাখা দামি ক্রিস্টালের ফুলদানিটা দুই হাতে খপ করে ধরে একদম বাহুবলীর মতো মাথার ওপর তুলে ধরল। “পেটমোটা শয়তানের ধাড়িটা, তুই যদি আমারে গুলি করছিস, আমিও তাইলে ফুলদানি দিয়া তোর ওই চকচকা মাথা ফাটায়া এক্কেবারে চৌচির কইরা দিমু!”
কথা শেষ হতে না হতেই দুজনের মধ্যে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ লেগে গেল। আয়াশ বাঘের মতো লাফিয়ে গিয়ে তুব্বার মাথার লম্বা চুলগুলো দুই হাতে খামচে ধরে টানতে লাগল। আর তুব্বাও ধারালো নখ দিয়ে আয়াশের ফরসা, নরম হাত আর গালে এমন এক টান দিল যে মুহূর্তের মধ্যে আয়াশের চামড়া লাল হয়ে স্ক্র্যাচ পড়ে গেল। দুজনের এই ধস্তাধস্তিতে ড্রয়িংরুমের সোফার কুশনগুলো মেঝেতে ছিটকে পড়ল।
ভেতরের কক্ষ থেকে রোমানা আর মিরা প্রায় দৌড়ে এসে এই মিনি-যুদ্ধক্ষেত্রের মাঝে ঢুকল। রোমানা ক্ষিপ্র গতিতে গিয়ে আয়াশকে পেছন থেকে টেনে উপরে তুলে ধরল, আর মিরা দুই বাহু দিয়ে তুব্বাকে শক্ত করে আটকে রাখল।

রোমানা আয়াশের হাত থেকে অস্ত্র উদ্ধার করার জন্য বলল, “আয়াশ! স্টপ ইট! আগে রিভলভারটা নিচে নামাও! নামাও বলছি!”
আয়াশ তখনো রাগে ফুঁসছে, তার চুলগুলো পাখির বাসার মতো উস্কোখুস্কো হয়ে গেছে। সে রোমানার বাঁধন থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য শূন্যেই পা ছুঁড়তে ছুঁড়তে চেঁচিয়ে বলল, “আমাকে ছাড়ো, রমু! আজকে আমি এই জংলি শাকচুন্নির খুলি উড়িয়েই ছাড়ব! উফফ, ছাড়ো না আমাকে, ওর এত বড় সাহস ও আমার হ্যান্ডসাম ফেস স্ক্র্যাচ করে দেয়!”
তুব্বাও মিরার শক্ত বাহুবন্ধনের মাঝে ছটফট করতে করতে পা শূন্যে তুলে লাথি মারার চেষ্টা করল। “দেখছ দেখছ সুন্দরী ভাবি, এইটুকুনি পুঁচকে বান্দর, আমার নাকি আবার খুলি উড়াইবে! ওর হাত-পা আইজকা আমি রশি দিয়া বাইন্ধা রাখুম। তুমি ছাড়ো তো আমারে!”
আয়াশ নিজের আভিজাত্যপূর্ণ কালো টি-শার্টটা টেনেটুনে সোজা করল, যেন সে কোনো হলিউড মুভির ড্যাশিং হিরো। সে নাক উঁচিয়ে বলল, “শোনো জংলি মেয়ে, সুন্দরীদের সাথে মারামারি করতে আমার খারাপ লাগে, ওটা আমার রুলসের বাইরে। কিন্তু তুমি তো দেখতে একদম ওই ড্রেইনের ছ্যাঁচড়া ইঁদুরের মতো! তাই তোমাকে মারতে আমার মেল ইগোতে একটুও লাগবে না। ইউ আর নট ইভেন আ গার্ল টু মি!”
“আর নিজে কী শুনি, হ্যাঁ?” তুব্বা কোমর বাঁকিয়ে ভেংচি কাটল, “নিজে তো একদম ক্ষ্যাতের মুলার মতন সাদা! আমগো গ্রামের বাঁশবাগানের ভূতগুলাও তোরে দেখলে ডরে কোমরের লুঙ্গি খুইল্যা পালাইব, ফাজিল পোলা কোথাকার!”

পরিস্থিতি আরও বেগতিক হওয়ার আগেই মিরা এবার তুব্বার সামনে হাঁটু গেড়ে বসল। তার দুই হাত নিজের মুঠোয় নিয়ে শান্ত করার ভঙ্গিতে বলল, “এসব কী হচ্ছে, তুব্বা? ও তো তোমার ছোট ভাইয়ের মতো, তাই না? ওকে একটু আদর করবে, আগলে রাখবে, তা না করে তুমি ওর সাথে বাচ্চাদের মতো ঝগড়া করছ? তুমি না খুব বুঝদার মেয়ে!”
“কীসের ছোট ভাই! ওর মতন উটকাল মাছরে আমি ভাই-টাই মানি না। গুন্ডা একটা, আস্ত ব্রিটিশ গুন্ডা!”
“তোমাকেও বা এখানে কে বোন মেনে বসে আছে শুনি? তুমি আমার সিস্টার হতেই পারো না, ইম্পসিবল!”
রোমানা সোফার হাতলে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে দুই পিচ্চির সোৎসাহে মুখ টিপে হাসছিল। কারণ এদের এই অন্তহীন খিটখিট লড়াইয়ের মাঝে সে নিখুঁতভাবে নিজের আর আরিয়ানের প্রতিচ্ছবি দেখতে পাচ্ছিল। রোমানা আয়াশকে পেছন থেকে আলতো করে জড়িয়ে ধরে, থুতনিটা আয়াশের কাঁধে রেখে মিরার দিকে তাকিয়ে চোখ টিপল, “আই ওয়াজ জাস্ট থিংকিং সামথিং ডিফরেন্ট, মিরা। এদের দুজনের যা বর্তমান অবস্থা, ফিউচারে এদের বিয়ে দিয়ে দিলে কিন্তু মন্দ হয় না! সিনিয়র-জুনিয়র রোমান্স… ব্যাপারটা কিন্তু দারুণ ইন্টারেস্টিং, তোমার কি মনে হয়?”
এই আকস্মিক প্রস্তাব শুনে আয়াশ আর তুব্বা একসাথে চোখ বড় বড় করে চিৎকার করে উঠল, “কীহহহ?”
তুব্বা প্রথমে নিজের দুই গালে চড় মেরে তওবা কাটার ভঙ্গিতে বলল, “তওবা তওবা! দুনিয়ার শেষ পুরুষটাও যদি তোমার এই চ্যাং মাছের মতন ঘাউড়া দেবরটা হয়, তাও আমি এরে কোনোদিন বিয়া করতাম না। আবার আমার থেইকা চার-পাঁচ বছরের ছোট্ট একটা নান্টু! এরে তো আমি আজীবন উঠতে-বসতে ঝাড়ুর বাড়ি মারুম।”

“ওহ প্লিজ, জাস্ট স্টপ ইট ছুঁচো ইঁদুর! নিজের মুখটা আয়নায় দেখেছ কখনো? আমার রূপসি গার্লফ্রেন্ডসদের লাইন রেখে আমি বা কেন তোমার মতো এক আনকালচার্ড মেয়েকে বিয়ে করতে যাব, হ্যাঁ? তাছাড়া এই বাড়িতে অলরেডি আমার দু-দুটো ললনা ভাবি আছে, ওদের দিকে তাকালে আমার চোখই সরতে চায় না। অ্যান্ড মোস্ট ইম্পর্ট্যান্টলি, আই অ্যাম এক্সট্রিমলি লয়াল টু রমু। বিয়ে যদি করতেই হয়, আমি শ্যাওড়া গাছের পেত্নী রমুকেই করব, তাও তোমার মতো মায়াবতীকে না! হুহ!”
আয়াশ রাগের মাথায় মুখ দিয়ে কীসব উলটাপালটা থিয়োরি বের করছে, তার নিজেরও কোনো হুঁশ নেই। তবে দুজনের কথাবার্তা শুনে মিরা আর রোমানা একে অপরের চোখের দিকে তাকাল। দুজনেরই ঠোঁটের কোণে রহস্যময়ী, বাঁকা হাসি খেলল।

আম্বিয়া জমাদ্দারের অন্তিম যাত্রার পর পুরো পরিবারটা যেভাবে বিষাদের গহ্বরে নিমজ্জিত হয়েছিল, আজ যেন সেই জটলা কাটতে শুরু করেছে। শোক কাটিয়ে এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে পারেননি ফাতিমা; তবে আজকের এই অভাবনীয় শুভ সংবাদে প্রত্যেকেই নিজের অজান্তে হেসে ফেলেছেন।
আর এই আনন্দযজ্ঞের কেন্দ্রে যিনি আছেন, তিনি স্বয়ং আসাদ চৌধুরি। খুশির আতিশয্যে তিনি ঢাকার বিখ্যাত সব ঐতিহ্যবাহী মিষ্টান্ন ভাণ্ডার থেকে মণকে মণ মিষ্টি আনিয়ে, পুরো ঢাকাবাসীকেই মিষ্টিমুখ করানোর মহোৎসব শুরু করে দিয়েছেন।

কারান প্রতিদিনের মতো ব্ল্যাক স্যুট পরে, গাম্ভীর্য নিয়ে অফিস থেকে মাত্রই ড্রয়িংরুমে পা রেখেছে। হাতের ল্যাপটপের ব্যাগটা টেবিলের উপর রাখতেই, রোমানা কোথা থেকে যেন এক গাল চওড়া হাসি নিয়ে তার পথ আগলে দাঁড়াল। সে দুই হাত কোমরে রেখে কৌতুকপূর্ণ চোখে তাকিয়ে বলল, “কংগ্রাচুলেশনস, মাই ডিয়ার হ্যান্ডসাম দেবরজি! এবার তো অফিস-ল্যাপটপের সঙ্গে প্রেমটা একটু কমান। অবশেষে আমাদের বাড়ির সবচেয়ে গম্ভীর মানুষটার জীবনেও এমন একটা দারুণ সুখবর চলেই এলো! আপনি যে বাবা হতে চলেছেন, আমার এখনও বিশ্বাসই হচ্ছে না! এবার তো অন্তত মুখে একটু হাসি ফুটান, মিরার দিলদরিয়া সোয়ামি!”
রোমানার অতিরিক্ত হাস্যোজ্জ্বল মুখের কথা শুনে কারান কয়েক মুহূর্তের জন্য সম্পূর্ণ পাথরের মতো অনড় হয়ে রইল। কারান খুব ভালো করেই জানে, রোমানা যথেষ্ট ম্যাচিউর একটা মেয়ে; এমন একটা শোকাবহ পারিবারিক আবহে সে কেনই বা তার সাথে এই লেভেলের ইয়ার্কি করতে যাবে?
বেশ কিছুক্ষণ নীরবতা বজায় রাখার পর, কারান নিচের ঠোঁটটা সামান্য উলটে বিভ্রান্ত গলায় প্রশ্ন করল, “বাবা? কে বাবা? কার বাবা?”
রোমানা খপ করে হেসে বলল, “যে ইনোসেন্ট সোলটা এই পৃথিবীতে আসতে চলেছে, তার বাবা!” রোমানা তার হাতের সাদা মেডিক্যাল এনভেলাপটা কারানের চোখের সামনে দোলাতে দোলাতে বলল, “মাই বেবিগার্ল মিরা ইজ প্রেগন্যান্ট, বদ্দা।”

রোমানা কারানের অবশ হাতের মুঠোয় আল্ট্রাসনোগ্রাফি রিপোর্টটা গুঁজে দিল। মিরা মা হতে চলেছে, এই একটি সত্য জাদুমন্ত্রের মতো পরিবারের সবার ভেতরের দীর্ঘদিনের জমাট বাঁধা বরফ গলিয়ে দিয়েছে।
কিন্তু কারান? তার তীক্ষ্ণ মস্তিষ্কের ভেতর তখন যেন বিশ্বযুদ্ধের সাইরেন বাজতে শুরু করেছে! সে চোখের পলক ফেলার ক্ষমতাও হারিয়ে ফেলেছে। একবার হাতের রিপোর্টের দিকে তাকাচ্ছে, আরেকবার ডাইনিং টেবিলে বসা মিরার দিকে চোখ ফেরাচ্ছে।
সেখানে মিরাকে ঘিরে যা হচ্ছে, তা দেখার পর কারানের নিউরনগুলো অবশেষে রেড অ্যালার্ট জারি করল যে, সে যা শুনছে এবং যা দেখছে, তা কোনো দৃষ্টিভ্রম নয়, পরম বাস্তব। কারণ ফাতিমা এক প্রকার জবরদস্তিমূলকভাবে মিরাকে বাটিতে করে পুষ্টিকর স্যুপ খাইয়ে যাচ্ছেন। আর ওদিকে রান্নাঘর থেকে সুগন্ধি ঘি আর মশলার যে সুবাস আসছে, তাতে স্পষ্ট যে আশমিনিও মিরার জন্যই বিশেষ কোনো খাবার তৈরিতে ব্যস্ত। মিরা বারবার দুই হাত নাড়িয়ে অনুনয় করে বলছে যে সে আর এক চামচও খেতে পারবে না, তবুও ফাতিমা মায়ের মতো তার গাল চেপে ধরে এক রকম ঠেসে ঠেসে খাওয়াচ্ছে।

কারান রিপোর্টের দিকে আরও কিছুক্ষণ বোকার মতো তাকিয়ে রইল। লাস্ট কবে তারা দুজন ফিজিক্যালি ইন্টিমেট হয়েছিল? তারিখটা মেলাতেই সে নিজেকেই এক চরম কদর্য বিলেতি গালি দিয়ে বসল।
সে মনে মনে স্বগতোক্তি করল, “এই বান্দা বা বান্দি যে-ই হোক না কেন, ড্যাম শিওর ও ওর বাপের মতোই ঘাড়ত্যাড়া হবে! নাহলে ট্রিপল লেয়ার প্রো’টেক’শন ভেদ করে এন্ট্রি নিল কীভাবে? ইয়া আল্লাহ, আমার পাঁচ বছরের সাজানো প্ল্যানটা এভাবে মুখের উপর লাত্থি মেরে উড়িয়ে দিল?”
ওদিকে ডাইনিং টেবিলের ওপাশ থেকে রোমানা মিরাকে কনুই দিয়ে সামান্য খোঁচা মেরে ইশারায় কারানের সেই হ্যাং হয়ে যাওয়া অবয়বটা দেখিয়ে দিল। মিরা লজ্জা পেয়ে ঠোঁট কামড়ে, আলতো পায়ে কারানের দিকে এগিয়ে এল। মিরা খুব ভালো করেই জানে, দাদির মৃ*ত্যুর পর থেকে কারানের মনের ভেতরের আবহাওয়াটা কতটা বিষণ্ন ছিল; কিন্তু এখন এই আনন্দের মুহূর্তে সে নিশ্চয়ই পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী পুরুষে পরিণত হয়েছে। হওয়াটাই তো স্বাভাবিক, তাই না?
মিরা কারানের ঠিক সামনে এসে নিজের উষ্ণ হাতের তালুটা তার বাম বুকের ওপর রাখল, যেখানে তার হৃৎপিণ্ডটা তখন লাব-ডাব শব্দে কাঁপছে। মিরার কাজল-কালো চোখ দুটো তখন আবেগে টলমল করছে। সে পরম মমতায় প্রশ্ন করল, “তুমি খুশি নও, কারান?”

মিরার এই আকস্মিক প্রশ্ন আর নিজের বুকের ওপর তার স্পর্শ পেতেই কারান শুকনো গলায় এক ঢোক গিলল। সে ভেতরে ভেতরে থতোমতো খেলেও বাইরে নিজের ইমোশন আড়াল করতে ওস্তাদ। সে একটা ফেক কাশি দিয়ে গলার সিল্কের টাইটা সামান্য আলগা করে নিল। মুখে গাম্ভীর্য ফুটিয়ে ধরা গলায় বলল, “অনেক! মানে আমি একদম… স্তব্ধ, হতবিহ্বল, হতভম্ব, হতবাক।”
​মিরার ভ্রূ কিছুটা কুঁচকে গেল, “কী সব আজেবাজে শব্দ ব্যবহার করছ তুমি?”
পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে কারান গলার স্বর কিছুটা নিচু করে অত্যন্ত সিরিয়াস মুখে বলল, “একটা কথা সত্যি করে বলবে, মিরা?”

মিরা সুকৌশলে ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে তাকিয়ে দেখল, বাড়ির সবাই তখনো ডাইনিং টেবিল আর রান্নাঘরের দিকে মিরার পথ্য আর খাওয়ার আয়োজন নিয়েই তুমুল ব্যস্ত। এই সুযোগে সে সন্তর্পণে টুপ করে কারানের ডান গালে নিজের ঠোঁট ছুঁইয়ে চুমু আঁকল। তারপর ফিসফিসিয়ে বলল, “কী বলবে বলুন, জাঁহাপনা?”

মিরা মাতৃত্বের আবেগে কতটা উৎফুল্ল তা তার চোখ দেখলেই স্পষ্ট বোঝা যায়। সে মনে মনে শতভাগ নিশ্চিত যে, কারান নিশ্চয়ই এখন কোনো রোমান্টিক অথবা অত্যন্ত ইমোশনাল কথা বলে তাকে জড়িয়ে ধরবে। এই ভাবনায় মিরার ভেতরের খুশির মাত্রাটা এক ধাক্কায় আরও বহুগুণ বেড়ে গেল।
অথচ ​কারান চারপাশটা একবার দেখে নিয়ে মিরার একদম কাছে এসে ফিসফিস করে বলল, “তুমি… আই মিন, বায়োলজিক্যালি এই প্রেগন্যান্সির ঘটনাটা ঘটল কীভাবে?”

Tell me who I am 2 part 23 (2)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here