প্রফেসর উজান চৌধুরী পর্ব ৫০
বন্যা সিকদার
উজানে’র মাথার রগগুলো রাগে রিও রিও করে তপ্ত হয়ে উঠল। সে চোখ বড় বড় করে দাঁতে দাঁত চেপে আওড়াল‚ “ফেল করে আবার এত বড় বড় মুখ করে আমার সামনে দাঁড়িয়ে তর্ক করছো শয়তান ছেমড়ি?
”আপনি শয়তান! আপনার চৌদ্দ গোষ্ঠী শয়তান। আসছে আমাকে শয়তান বলতে।
উজানে’র চোখ জোড়া মুহূর্তের মধ্যে ছানাবড়া হয়ে গেল। উজান নিজের চোখ দুটো লাল করে চোখ রাঙিয়ে থমথমে গলায় কড়া ধমক দিল। “পিচ্চি জাস্ট স্টপ ইট‚ প্লিজ। আমার কিন্তু মাথা ভীষণ গরম হয়ে আছে‚ ভীষণ রাগ হচ্ছে বলে দিচ্ছি।
মৌ একটুও পিছাল না বরং এক পা এগিয়ে নিজের কোমরে দু-হাত গুঁজে উজানে’র চোখের দিকে চোখ রেখে দ্বিগুণ তেজ নিয়ে চেঁচিয়ে উঠল‚ ”রাগ হচ্ছে বললেই হলো নাকি? আমি এমন কী মহাভারত অশুদ্ধ করেছি যে আপনি আমার সাথে এমন বিহেভ করবেন? মারবেন নাকি আমাকে? মারেন‚ মারেন দেখি।
উজানে’র সহ্যশক্তির বাঁধ এবার একবারে ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। সে এক কদম এগিয়ে এসে মৌ’য়ের একদম মুখোমুখি দাঁড়িয়ে দাঁতে দাঁত চেপে এক গর্জন তুলল।
“ইডিয়ট মেয়ে। তিন-তিনটে সাবজেক্টে ডাব্বা মেরে ফেল করে এখন উল্টো আমার সামনে দাঁড়িয়ে মুখে মুখে এত বড় বড় কথা বলছো? আর একটা ফালতু কথা যদি তোর মুখ থেকে বের হয়‚ তবে এক থাপ্পড় মেরে মুখের সবকটা দাঁত ভেঙে দেবো।
সঙ্গে সঙ্গে মৌ উজানে’র হাতে কামড় বসিয়ে দিলো। মৌ’য়ের এমন হঠাৎ আকাস্মিক আক্রমণে উজান কয়েক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। হাতের তালুর উল্টো পিঠে তীব্র ব্যথায় তার মুখের অবয়ব কুঁকড়ে উঠল। সে নিজের সমস্ত জোর দিয়ে হাতটা ছাড়ানোর চেষ্টা করল কিন্তু মৌ যেন নিজের ভেতরের সমস্ত রাগ আর ক্ষোভ আজ দাঁত দিয়ে উজানে’র হাতেই উগড়ে দিচ্ছে। কিছুতেই কামড় আলগা করছে না। উজান নিজের মেজাজ আর ধরে রাখতে পারল না। বাজখাঁই গলায় চেঁচিয়ে উঠল‚
“শ্বাশুড়ির মেয়ে ছাড়ো বলছি। আমার হাতটা কি চিবিয়ে খাবে নাকি? পৃথিবীতে খাওয়ার মতো এত শত সুস্বাদু জিনিস থাকতে কেবল আমার রক্তই কেন তোমায় খেতে হবে? আল্লাহ গো। বাঁচাও আমায় এই রক্তচোষা ডাইনির হাত থেকে।
কয়েক সেকেন্ড পর মৌ যখন উজান’কে ছেড়ে দিল। তখন উজানে’র ফর্সা হাতে তার ধারালো দাঁতের স্পষ্ট লাল দাগ বসে গেছে। উজান চোখ পাকিয়ে তার দিকে তাকাল কিন্তু মৌ’য়ের সেদিকে বিন্দুমাত্র ভীতি বা ভ্রুক্ষেপ নেই। সে উল্টো দুই চোখ ছোট ছোট করে আরও রাগী দৃষ্টি ছুড়ে দিল উজানে’র দিকে। উজান হাত ঘষতে ঘষতে অতিরিক্ত রাগে গিজগিজ করে বলে উঠল‚
“এসব কোন ধরনের বাচ্চাদের মতো পাগলামি‚ পিচ্চি? তুমি কি এখনো পাঁচ বছরের বাচ্চা রয়েছো? বয়স তো কম হলো না‚ তবুও এখনো এসব পাগলামি করতে হবে তোমাকে? একে তো তিন-তিনটে সাবজেক্টে ডাব্বা মেরে বসে আছ‚ আবার সেটা বড় মুখ করে আমার সাথে তর্ক করেছো। ভালো রেজাল্টের কথা না হয় বাদই দিলাম‚ তাই বলে টেনেটুনে পাস মার্কসটুকুও তুলতে পারলে না? আদরে আদরে একদম বাঁদর হয়েছ তুমি।
”আ আ আ আসলে আমি তো…
মৌ আমতা আমতা করে কিছু একটা বলতে চাইল। কিন্তু উজান তাকে কিছু বলার সুযোগ দিলো না।
“জাস্ট শাট আপ। আজ থেকে তোমার ফোন চালানো‚ সব সময় আড্ডা দেওয়া‚ ঘুরতে যাওয়া সব বন্ধ। একটা জিনিস মুখ দিয়ে বের করার আগেই তোমার সামনে এনে হাজির করি‚ আর তুমি সামান্য পরীক্ষার পাস মার্কসটুকু তুলতে পারো না? কই‚ তোমার সাথে মেহেরও তো পরীক্ষা দিয়েছে। ও যদি এত ভালো মার্কস পেয়ে পাস করতে পারে‚ তবে তুমি মিনিমাম টেনেটুনেও কেন পাস করতে পারলে না? জীবনটা কি শুধুই খেলাধুলা আর ঢং করার জায়গা মনে হয় তোমার?
উজানের মুখ এমন ধমক শুনে মৌ’য়ের ফর্সা মুখটা মুহূর্তের মধ্যে ফ্যাকাশে হয়ে গেল। সে যে পড়াশোনায় খুব একটা পারদর্শী নয়‚ তা উজান প্রথম থেকেই খুব ভালো করে জানে। তবে রেজাল্ট খারাপ হয়েছে বলেই এভাবে মেহেরে’র সাথে তুলনা করে হ্যারাস করবে‚ তা মৌ স্বপ্নেও ভাবেনি। সবাই পরীক্ষা দিলে যে সবাইকে প্রথম হতে হবে বা এক চান্সে পাস করতে হবে এমন তো কোনো কথা নেই। তাছাড়া এটা তো কোনো ফাইনাল পরীক্ষা ছিল না‚ স্রেফ একটা সেমিস্টার এক্সাম। এমনিতেই সে উজানে’র খুব সামান্য বকাতেও মনে বড্ড আঘাত পায়‚ আর সেখানে আজ হাজারটা প্রমাণের সামনে দাঁড়িয়ে সবার সাথে তুলনা করে এভাবে অপদস্ত করায় তার বুকের ভেতরটা যেন দু-টুকরো হয়ে গেল। চোখের কোণে জল চলে এলেও সে নিজেকে শক্ত রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করল। তোঁতলাতে তোঁতলাতে কাঁপা কণ্ঠে শুধাল‚
”আ আ আ আপনি এমন করছেন কেন‚ প্রফেসর সাহেব?
“ইডিয়ট একটা। ফেল করে আবার জিজ্ঞেস করছে আমি এমন করছি কেন? ফাজলামো করছো তুমি আমার সাথে? কিছু বলছি না বলে দিন দিন বেশি মাথায় চড়েছ। ধুর বা*ল থাকবই না আমি এখানে।
কথাটা বলেই উজান রাগে রক্তচক্ষু নিয়ে গটগট করে রুম থেকে বেরিয়ে গেল। মৌ কেবল শূন্য‚ ফ্যাকাশে চোখে তার চলে যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে রইল। চোখের কোণ বেয়ে এক ফোঁটা তপ্ত জল গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ল নিচে। সামান্য একটা রেজাল্ট খারাপ হওয়ার জন্য মানুষটা তাকে এতটা পর করে দিল? উজান সোজা নিচে নেমে নিজের বাইকটা স্টার্ট দিল। মনের ভেতর জমা সমস্ত রাগ‚ ক্ষোভ আর বিরক্তি যেন বাইকের এক্সেলেটরে গিয়ে আছড়ে পড়ল। ঝড়ের বেগে বাইক চালিয়ে দ্রুত হেডকোয়ার্টারের একটা আন্ডারগ্রাউন্ড সেলে গিয়ে পৌঁছাল। তার মুখের অবয়ব তখন অতিরিক্ত রাগে ও রক্তচাপে একবারে টকটকে লাল হয়ে আছে। উজান বিদ্যুৎ গতিতে আন্ডারগ্রাউন্ডের গোপন রুমটার ভেতর গিয়ে প্রবেশ করল। সেই রুমে অলরেডি তার টিমের অন্য সদস্যরা উপস্থিত ছিল। আর তাদের ঠিক মাঝখানে চেইন দিয়ে বাঁধা অবস্থায় দুজন লোক হাঁটু গেড়ে বসে আছে। গ্রাম থেকে নারী পাচার ও নিখোঁজের সাথে জড়িত থাকা সন্দেহে এদের গ্রেফতার করে আনা হয়েছে। তাদের মধ্যে একজন বয়স্ক আর অন্যজন তরুণ যুবক। উজান’কে প্রবেশ করতে দেখে তন্ময় তড়িঘড়ি করে এগিয়ে এলো। হতাশ কণ্ঠে নিচু স্বরে বলল‚
“কোনো লাভ হচ্ছে না দোস্ত। কোনো ভাবেই মুখ খুলছে না ওরা। শত আঘাত‚ চেষ্টার পরও স্বীকার করছে না এদের মূল লিডার কে?
উজান আর এক সেকেন্ডের জন্য কোনো কথা বলল না। তার ভেতরের জমে থাকা মৌ’য়ের ওপরের রাগ আর এই ক্রিমিনালদের ওপরের আক্রোশ একসাথে যেন বিস্ফোরিত হলো। সে তড়িৎ গতিতে পাশেই দেয়ালের সাথে রাখা একটা ভারী‚ শক্ত লোহার রড নিজের হাতে তুলে নিল। এক মুহূর্ত সময় না দিয়ে উজান অন্ধের মতো রডটা দিয়ে হাঁটু গেড়ে বসে থাকা যুবকটির পিঠে আর পায়ে সজোরে আঘাত করতে শুরু করল। লোহার রডের প্রতিটি সজোর আঘাতে ছেলেটির হাড়গোড় ভেঙে যাওয়ার বীভৎস শব্দ হতে লাগল। রুমের ভেতর তাজা রক্তের গন্ধ ছড়িয়ে পড়ল। ছেলেটির জামাকাপড় ছিঁড়ে ফিনকি দিয়ে রক্ত বের হতে দেখেও উজানে’র চোখ-মুখে বিন্দুমাত্র দয়া ফুটল না।
হুট করেই উজান রডটা পাশে ছুড়ে ফেলে দিয়ে এক ঝটকায় ছেলেটির রক্তে ভেজা কলার আর চুল মুঠো করে ধরে নিজের একদম মুখোমুখি নিয়ে এলো। তার হুংকারে পুরো রুম কেঁপে উঠল।
“তোদের আসল লিডার কে? কোথায় নিয়ে রাখা হয় গ্রাম থেকে নিখোঁজ হওয়া নিষ্পাপ মেয়েদের?
কিন্তু ছেলেটির মুখ থেকে তখনও কোনো রেসপন্স এলো না। তার এই নীরবতা দেখে উজান আরও কয়েক গুণ বেশি রাগান্বিত হয়ে উঠল। সে পাশের তন্ময়ে’র দিকে তীক্ষ্ম দৃষ্টিতে তাকিয়ে আবারও ছেলেটির চিবুক চেপে ধরে গর্জে উঠল‚ “কী হলো কথা বলছিস না কেন? সাপের পাঁচ পা দেখেছিস?
ছেলেটি ব্যথায় গোঙাতে গোঙাতে ভাঙা গলায় উত্তর দিল। “আ আ আ আপনারা যা ইচ্ছে করেন আমাদের সাথে স্যার…তবুও আমরা কিচ্ছু বলব না।
“মরণের ভয়ও নেই তোদের?
উজানে’র চোখ দুটো থমথমে হয়ে এলো। পাশের বয়স্ক লোকটি ভয়ের কারনে বারবার শুকনো ঢোক গিলছিল। একজন বয়স্ক মানুষের গায়ে হাত তুলতে উজানে’র নীতিতে বাধছিল‚ তাই সে এতক্ষণ ধরে পুরো রাগটা এই যুবকের ওপর উগড়ে দিচ্ছিল। কিন্তু এই ছেলেও যখন মুখ খুলতে নারাজ‚ তখন উজানে’র ভেতরের পৈশাচিক রূপটা জেগে উঠতে বাধ্য। ঠিক তখনই ছেলেটি বলে‚
”ভয় করে আর কী হবে স্যার? আপনাদের সত্য কথা বললেও আমাদের ওপাশে লিডারের লোক গুলো মেরে ফেলবে‚ আর না বললেও আপনারা ছাড়বেন না। আমাদের কপালে মরণই লেখা আছে।
“তুই কেবল মুখ খোল। তোদের ফুল প্রটেকশন আর সেফটি সিআইডি দেবে। হাজারটা মেয়ের জীবন নরকের মুখে ঠেলে দিয়েছিস তোরা‚ তবুও তোদের ভেতরে বিন্দুমাত্র অনুশোচনা হচ্ছে না? তোরা যে মেয়ে গুলোকে বিক্রি করে দিয়েছিস‚ তারাও তো কারো না কারো বোন‚ কারো না কারো মেয়ে। সামান্য কিছু টাকার লোভে তোরা এতটা নিচে নামতে পারলি?
”স্যার‚ এসব নৈতিক কথা বলে আমাদের কোনো লাভ হবে না। আপনার যা ইচ্ছে হয় করুন আমাদের‚ আমরা কিচ্ছু বলব না।
ছেলেটির উত্তরে উজান বিন্দুমাত্র সন্তুষ্ট হতে পারল না বরং তার রগে রগে আগুন জ্বলে উঠল। আসামিদের ধৃষ্টতা দেখে কোনো কথা না বলে আচমকা উজান নিজের কোমর থেকে রিভলভারটা টেনে বের করল। কয়েক সেকেন্ডের মাঝে ছেলেটির বাঁ পায়ে সোজাসুজি ট্রিগার চেপে শুট করে দিল। গুলিটা পিস্তল থেকে বের হয়ে থাই চিরে ভেতরে সেঁধিয়ে গেল। ছেলেটির চিৎকার আছড়ে পড়ল পুরো রুম জুড়ে। কিন্তু উজান বিন্দুমাত্র বিচলিত হলো না। সে একদম শান্ত চোখে ছেলেটির দিকে তাকিয়ে এক বাঁকা‚ বিষাক্ত হাসি হাসল।
“উজান চৌধুরীর ডিকশনারিতে ‘ওয়ার্নিং’ বলে কোনো ওয়ার্ড নেই। মরতে যখন তোরা প্রস্তুতই আছিস‚ তবে শান্তিতে নয়। একটু ভয়ংকর ও যন্ত্রণাদায়ক ভাবেই মারি তোদের। তন্ময় জ্বলন্ত রডটা নিয়ে আয় তো।
ছেলেটি গুলিতে আর যন্ত্রণায় তীব্র চিৎকার করতে লাগল। পা থেকে গলগল করে গরম রক্ত মেঝেতে ছড়িয়ে পড়ছে। ঠিক তখনই টিমের একজন সদস্য রক্তবর্ণের জ্বলন্ত রড নিয়ে তাদের দিকে এগিয়ে এলো। সে সতর্কভাবে রডটি উজানে’র হাতে তুলে দিল। উজান রডটি হাতে নিয়ে পাশে থাকা সেই ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া বয়স্ক লোকটির দিকে তাকিয়ে এক তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল।
“চাচাজান মাইন্ড করবেন না‚ এই ছেলের পর নেক্সট টার্গেট কিন্তু আপনি নিজে।
কথাটা বলেই উজান যেই না জ্বলন্ত রডটি রক্তভেজা ছেলেটির খোলা পিঠের মাংসে চেপে ধরতে গেল। অমনি বয়স্ক লোকটি আর স্থির থাকতে পারল না। সে ভয়ে আতঙ্কে চিৎকার করে হাতজোড় করে বলে উঠল‚ ”কইতাছি কইতাছি বাবা৷ দাড়াও…আমি সব কইতাছি কার লিগা আমরা এই কাজ করতাম। তাও তুমি দয়া কইরা এই পুলাডারে আর কষ্ট দিও না‚ ছাইড়া দাও ওরে।
উজানে’র ঠোঁটের কোণে মুহূর্তের মধ্যে পরম তৃপ্তির এক ফালি হিংস্র হাসি খেলে গেল। আহত যুবকটি শত বারণ করা সত্ত্বেও‚ জীবনের ভয়ে বয়স্ক লোকটি একে একে সেই নিখোঁজ সিন্ডিকেটের নেপথ্যে থাকা আসল মাস্টার মাইন্ডের নাম উজানদে’র সামনে ফাঁস করে দিল। তার মুখ থেকে নামটা শোনামাত্রই উপস্থিত সকল মেম্বার আর তন্ময় তীব্র শিহরণে শিউরে উঠল। যে মানুষটার নাম উঠে এসেছে‚ সমাজে তার ব্যাপক প্রভাব-প্রতিপত্তি। উপযুক্ত ও নিখুঁত প্রমাণ ছাড়া সেই হাই-প্রোফাইল লোকটাকে ছোঁয়া বা গ্রেফতার করা একেবারেই অসম্ভব। কাজের আসল সূত্র হাতে পেতেই উজান হঠাৎ শান্ত হয়ে গেল। সে রডটা পাশে ফেলে দিয়ে বরফ শীতল গলায় টিম মেম্বারদের উদ্দেশে আওড়াল‚
“গাইজ এদের একটু ভালো করে ‘ডিম থেরাপি’ দাও। আর তন্ময়…চল আমার সাথে।
কথাটা শেষ করেই উজান হনহন করে আন্ডারগ্রাউন্ড সেলের দরজা ঠেলে বাইরের দিকে হেঁটে চলে গেল। সে খুব ভালো করেই জানে‚ সামনে এক মহা ভয়ংকর প্রলয় আর রক্তের খেলা অপেক্ষা করছে। নিজের জীবনের বিনিময়ে হলেও দেশকে বাঁচাতে হবে।
সাঁঝের আঁধার নেমে আসার ঠিক পরপরই বাসায় ফিরল উজান। সারা দিন কেসের অমানবিক ক্লান্তি আর আন্ডারগ্রাউন্ড সেলের সেই ভয়ংকর রক্তের খেলা পার করে নিজের রুমে ঢুকেই তার চোখ দুটো যেন কাউকে খুঁজতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। কিন্তু পুরো রুমে মৌ নেই। মুহূর্তের মধ্যে এক অদ্ভুত শূন্যতায় উজানে’র বুকের ভেতরটা কেমন যেন ধড়ফড় করে উঠল। আর এক সেকেন্ডও সময় নষ্ট না করে‚ সে ওই ক্লান্ত শরীর নিয়েই ধীর পায়ে মেহেরে’র রুমের দিকে এগিয়ে গেল। রুমের দরজার আলতো খাঁজে উঁকি দিতেই এক পরম ভালোবাসার দৃশ্য তার চোখে পড়ল‚ মৌ চুপচাপ মেহেরে’র কোলে মাথা রেখে শুয়ে আছে। দুইকন মিলে গল্প করছে আর মেহের অতি মমতায় মৌ’য়ের মাথার এলোমেলো চুলগুলো বিলি কেটে দিচ্ছে। দৃশ্যটা দেখে উজানে’র দীর্ঘ শ্বাস বেরিয়ে এলো। সকালে নিজের করা আচরণের কারণে মেয়েটার মন এমনিতেই ভেঙেচুরে চুরমার হয়ে আছে‚ তাই এখন গিয়ে তাকে আর বিরক্ত করার ইচ্ছে হলো না তার। উজান নিশব্দে সেখান থেকে পা বাড়িয়ে নিজের রুমে ফিরে এলো।
ঝটপট শাওয়ার নিয়ে ফ্রেশ হয়ে ল্যাপটপ আর ভার্সিটির কিছু জরুরি পেপারস নিয়ে বসে পড়ল নিজেকে ব্যস্ত রাখার আশায়। এর কিছুক্ষণ পর ডিনার করার জন্য ডেকে গেলেন মা মৌসুমি চৌধুরী। সারাদিনের ধকল শেষে পেটে প্রচণ্ড ক্ষুধা থাকায় উজান এক কথায় ডাইনিং টেবিলের দিকে এগিয়ে গেল। কিন্তু টেবিলে বসতেই সে খেয়াল করল‚ পরিবারের সবাই তার দিকে কেমন যেন একটা থমথমে ও অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। উজান অবশ্য চোখ দেখেই সবটা আঁচ করতে পারল। ডাইনিং টেবিলে সবাইকে দেখতে পেলেও শুধু মৌ’কে দেখতে না পেয়ে উজান নিচু গলায় মাকে শুধাল‚
“আম্মু…পিচ্চি কই?
মৌসুমি চৌধুরী ততক্ষণে রাগের প্রকাশ ঘটিয়ে উত্তর দিলেন। “নিজে খেতে এসেছিস‚ নিজে চুপচাপ খেয়ে রুমে চলে যা। কারো জন্য এখন আর দরদ না দেখালেও চলবে।
মায়ের গলার এমন তীব্র রাগ দেখে উজান আর কথা বাড়াল না। না খেয়ে উঠে যাওয়া যাবে না বলেই কোনো রকমে গুটিকয়েক ভাত মুখে গুঁজে টেবিল ছাড়ল। নিজের ওপর তীব্র বিরক্তি আর রাগ আছড়ে পড়ছে তার। সকালে রেজাল্টের জন্য মেয়েটার সাথে অত বাজে ব্যবহার করার পর সারাটা দিন কেটে গেল‚ মৌ তাকে একটা কলও করেনি। এমনকি উজান যে নিজে বারবার কল ব্যাক করেছে‚ মৌ তার একটা ফোনও ধরেনি। বাসায় এসেছেও তো অনেক্ষণ হলো‚ অথচ মেয়েটা একবারের জন্যও উজানে’র সামনে আসার প্রয়োজন মনে করেনি।
রাত যত ধীরে ধীরে গভীর থেকে গভীরতর হতে লাগল‚ উজানে’র বুকের ভেতরের শূন্যতা আর মোচড় তত তীব্র হয়ে উঠতে লাগল। বিয়ের পর থেকে আজ অব্দি একটা রাতও এই পাগলী মেয়েটাকে নিজের বুক ছাড়া করে ঘুমিয়েছে বলে মনে পড়ে না উজানে’র। কিছুক্ষণ ছাদে গিয়ে একা একা অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে সিগারেট ফুঁকল উজান‚ তারপর আবার রুমে ফিরে এসে উন্মাদের মতো এদিক-ওদিক পায়চারি করল। কিন্তু মন কোনো ভাবেই শান্ত হতে চাইছে না। দেয়াল ঘড়ির কাঁটায় তখন রাত সাড়ে বারোটা বাজে। আর এক সেকেন্ডও ধৈর্য ধরা উজানে’র পক্ষে অসম্ভব হয়ে দাঁড়াল। সে অবশেষে নিজের রুম ত্যাগ করল।
প্রথমে মনে করেছিল মৌ হয়তো আরিয়ানে’র রুমে কিন্তু পরক্ষণেই মনে পড়ল আরিয়ান তো চট্টগ্রাম ঘুরতে গেছে। তারপর ইফাতে’র রুমের সামনে গিয়ে এক মুহূর্তের জন্য থামল সে কিন্তু ভেতর থেকে রুম বন্ধ। তাছাড়া মৌ তো আর অতটাও অবুঝ নয় যে মাঝরাতে ওদের ব্যক্তিগত মুহূর্তে হস্তক্ষেপ করবে।
তাহলে বাকি থাকে একটা মাত্র রুম‚ তার মায়ের রুম। উজান দ্রুত পায়ে মা মৌসুমি চৌধুরীর রুমের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। দরজায় আলতো দুটি টোকা দিতেই ভেতর থেকে কর্কশ ও বিরক্ত কণ্ঠে মায়ের আওয়াজ ভেসে এলো।
“রাত বিরেতে ডিসটার্ব করছিস কেম? নিজের রুমে গিয়ে শান্তিতে ঘুমাতে পারিস না?
দরজাটা সামান্য ফাঁক হতেই মৌসুমি চৌধুরী ছেলের দিকে চোখ রাঙিয়ে দাঁড়ালেন। উজান ভালো করেই বুঝতে পারল‚ ছেলের ওপর মা কতটা চটে আছেন। উজান অসহায় ও নিচু স্বরে আর্জি জানাল।
“আম্মু…পিচ্চি কি এখানে এসেছে? ওকে নিজের কাছে নিয়ে যেতে এসেছি। ওকে নিয়েই চলে যাব আর তোমাদের ডিস্টার্ব করব না‚ প্রমিজ!
মৌসুমি চৌধুরী হাত দুটো বুকের কাছে বেঁধে স্পষ্ট গলায় সাফ জানিয়ে দিলেন‚ “আমার বউমা তোর রুমে যাবে না। তুই নিজে রুমে গিয়ে শুয়ে পড়।
উজান মায়ের এমন জবাবে মোটেই অবাক হলো না বরং এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে অত্যন্ত আকুল গলায় আবারও বলল‚ “ট্রাই টু আন্ডারস্ট্যান্ড আম্মু। পিচ্চিকে ছাড়া আমার একটুও ভালো লাগছে না…ঘুম আসছে না আমার। প্লিজ‚ ওকে আমার কাছে দিয়ে দাও না।
মৌসুমি চৌধুরী আগের মতোই রাগী গলায় প্রশ্ন ছুড়ে দিলেন‚ “মেয়েটাকে সকালে বকার সময় মনে ছিল না যে তাকে ছাড়া তোর ভালো লাগে না?
“আম্মু প্লিজ একটু বোঝার চেষ্টা করো। হ্যাঁ‚ আমি ওকে একটু বকেছিলাম তখন। কারণ আমার মাথায় রাগ চড়ে গিয়েছিল। আচ্ছা তুমিই বলো আম্মু‚ আমি কি এমনি এমনি বকেছি? সারাদিন টু টু করে ঘুরে বেড়ায়‚ পড়াশোনার ‘প’-ও করে না। তিনটা সাবজেক্টে ডাব্বা মেরে ফেল করে বসে আছে। তুমি বুঝতে পারছো প্রেন্সিপাল স্যার কি ভাবছেন? তাছাড়া আমার মতো একজন প্রফেসরের ওয়াইফ হয়ে তিন-তিনটে সাবজেক্টে ফেল করলে বাইরের লোকে কী বলবে বল তো?
”তুই কবে থেকে বাইরের লোকের ফালতু কথায় কান দেওয়া শুরু করলি‚ উজান?
কথাটা পেছন থেকে শোনায় উজান ঘুরে তাকাল। গেস্ট রুম থেকে ধীর পায়ে বেরিয়ে আসছিলেন আরিফুল চৌধুরী। তিনি সোজা এসে ছেলের মুখোমুখি গিয়ে দাঁড়ালেন। বাবার মুখের এমন ধারালো প্রশ্ন শুনে উজান গম্ভীর ও থমথমে গলায় বলল‚
“ড্যাড আমি লোকের কথায় কান দিচ্ছি না। তবে মেয়েটা পড়াশোনা পুরো চাঙ্গে তুলে রেখে এভাবে বেখেয়ালি হয়ে ঘুরবে‚ এটা অন্তত আমি মেনে নিতে পারছি না। আম্মু…প্লিজ আমার পিচ্চির কাছে আমাকে যেতে দাও।
উজান এবার আর দাঁড়িয়ে না থেকে সোজা মায়ের রুমে ভেতর ঢুকে যেতে চাইল কিন্তু মৌসুমি চৌধুরী একদম দরজার মাঝখানে দাঁড়িয়ে পথ আটকে দিলেন। উজান নিজের সমস্ত বিরক্তি চেপে রেখে আবারও অনুনয় করল। “আম্মু আমি সত্যিই এখন কোনো ঝগড়া করার মুডে নেই। আমি জাস্ট আমার বউকে নিয়েই চলে যাবো।
”বললাম তো পাবি না তুই তোর বউকে!
মৌসুমি চৌধুরী নাছোড়বান্দা। উজান একবারে হতাশ হয়ে পড়ল। একে তো মৌ’কে ওই সামান্য রেজাল্টের কারণে সকালে তীব্রভাবে বকা দেওয়ার জন্য সারাদিন ধরে নিজের প্রতিই এক অদ্ভুত ঘৃণা হচ্ছিল তার। আর এখন নিজের মা-ও তাকে মৌ’য়ের কাছে যেতে দিচ্ছে না। উজান নিজের ভেতরের পুরুষালি জেদ আর অহংকার বিসর্জন দিয়ে আবেগপ্রবণ হয়ে কাতর কণ্ঠে শুধাল‚
“আম্মু দাও না আমার বউটাকে আমার বুকে ফিরিয়ে। তাকে ছাড়া তোমার ছেলে যে অসম্পূর্ন।
মৌসুমি চৌধুরী চোখ রাঙিয়ে তীব্র মেজাজে প্রশ্ন ছুড়ে দিলেন‚ “তুই যদি এতই অসম্পূর্ণ তবে মেয়েটার সাথে সকালে ওইরকম বিহেভিয়ার করেছিলি কেন? কোথাও যেতে দেব না আমি আমার বউমাকে।
কিন্তু কে শোনে কার কথা। সে আলতো করে মৌসুমি চৌধুরীকে একপাশে সরিয়ে দিয়ে হনহন করে রুমের ভেতর ঢুকে পড়ল। বিছানার একপাশে চুলগুলো এলোমেলো করে পরম শান্তিতে ঘুমিয়ে আছে তার পুতুলের মতো বউটা। চোখের কোণে এখনও কান্নার শুকিয়ে যাওয়া স্পষ্ট দাগ। উজান আর কারো বারণ বা নিষেধের তোয়াক্কা করল না। সে সোজা বিছানার কাছে গিয়ে হাঁটু গেড়ে বসল। পরম মমতায় মৌ’য়ের গায়ের ওপর ছড়িয়ে থাকা ওড়নাটা টেনে সুন্দর করে জড়িয়ে দিল‚ কপালের ওপর জমে থাকা এলোমেলো চুলগুলো আলতো করে সরিয়ে দিল। তারপর কোনো সুযোগ না দিয়েই এক ঝটকায় বাহুডোরে বেঁধে মৌ’কে বিছানা থেকে সোজা নিজের চওড়া বুকে তুলে নিল। উজান নিজের বউকে বুকের একদম গভীরের গহীনে লেপটে ধরে মায়ের রুমের দরজা অতিক্রম করতে করতে দাপুটে কণ্ঠে আওড়াল‚
প্রফেসর উজান চৌধুরী পর্ব ৪৯
“বউকে ছাড়া উজান চৌধুরী এক সেকেন্ডও শান্তিতে থাকতে পারবে না। আর তার বউকে সে কখন আদরে রাখবে আর কখন শাসন করবে সেটা সম্পূর্ণ তার নিজের ব্যাপার। এর জন্য অন্য কারো কাছ থেকে কোনো অ্যাডভাইস উজান চৌধুরী কোনোদিন নেবেও না‚ শুনবেও না!
