প্রফেসর উজান চৌধুরী পর্ব ৫২
বন্যা সিকদার
দেয়ালঘড়ির কাঁটায় তখন সকাল দশটা ছুঁই ছুঁই। মৌ কলেজের ড্রেসটা পরে নিজেকে গুছিয়ে নিয়েছে। পড়তে যাওয়ার জন্য টেবিল থেকে সব বই-খাতা গুছিয়ে ব্যাগে ভরে নিচ্ছে‚ এমন সময় আচমকা ঘাড়ে একটা পরিচিত তপ্ত ও ভারী নিঃশ্বাসের স্পর্শ পেল। পর মুহূর্তেই উজান নিজের মুখটা ডুবিয়ে দিল মৌ’য়ের উন্মুক্ত ঘাড়ে। সাথে সাথে এক অদ্ভুত মাদকতাময় শিহরণ বয়ে গেল মৌ’য়ের সারা শরীর জুড়ে। মৌ দুই ভ্রু কুঁচকে পেছনে ঘাড় ঘুরিয়ে জিজ্ঞেস করল।
”অলরেডি দশটা বাজে কিন্তু। কলেজ ড্রেস পরে রেডি হয়ে গেছি আর আপনি এখনও এখানে এসে দুষ্টুমি করছেন? তাড়াতাড়ি চলুন‚ কলেজে যেতে হবে।
উজান কোনো কথা না শুনে আবারও মৌ’য়ের নরম কোমরটা পিছন থেকে দু-হাতে শক্ত করে আঁকড়ে ধরে তাকে নিজের দিকে ঘুড়িয়ে চওড়া বুকের সাথে লেপটে পাজাকোলা করে সামান্য উঁচুতে তুলে নিল। তারপর নিজের নাকটা মৌ’য়ের নাকে ঘষে একদম ফিসফিসিয়ে আওড়াল…
“কী করব বলুন তো ম্যাডাম? আপনার মাঝে যে এতটাই নেশা মাখানো আছে যে‚ আপনাকে কাছে পেলে আমার আর ঘড়ির কাঁটার দিকে তাকাতেই ইচ্ছে করে না।
”হয়েছে ছেড়ে দিন তো। এমনিতেই দেরি হয়ে যাচ্ছে।
মৌ মৃদু ধাক্কা দিল।
“উঁহু তার আগে….
”শাশুড়ি আম্মাকে ডেকে আনব এখন? সকালে শাওয়ারের পরও বিরক্ত করলেন‚ আর এখনও আবার শুরু করছেন?
“আমার ভালোবাসা তোমার এত বিরক্ত লাগে পিচ্চি?
উজান একবারে নিচু ও শান্ত স্বরে শুধাল। মৌ ফ্যালফ্যাল করে উজানে’র মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। সে তো একদম ঠাট্টা করে কথাটা বলেছিল‚ এভাবে শোনানোর জন্য তো বলেনি। এর মাঝেই উজান আলতো করে তাকে ছেড়ে দিল। তারপর নিজের মাথা নিচু করে একবারে বিষণ্ণ নিচু গলায় বলল‚ “ওকে ফাইন। আর কখনো তোমাকে বিরক্ত করতে আসব না।
মৌ তড়িঘড়ি করে এক ঝটকায় উজানে’র হাতটা চেপে ধরল। সে লাফ দিয়ে দ্রুত বেডের ওপর উঠে উজানে’র সামনা সামনি একদম সোজা হয়ে দাঁড়াল। উজানে’র মাথার এলোমেলো চুলগুলো হাত দিয়ে আর একটু নেড়েচেড়ে দিয়ে ভালোবাসায় চওড়া কপালে নিজের ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল। অতঃপর উজানে’র গলায় দু-হাত পেঁচিয়ে একবারে আদুরে গলায় বলল—
“আপনি সব সময় আমার কথার উল্টো মানে বোঝেন কেন‚ বলুন তো? আমি কখন বললাম আপনার ভালোবাসা আমার বিরক্ত লাগে? একটু আগেই তো শাওয়ার নিলাম, তাই বললাম এখন আর দুষ্টুমি করবেন। আর আপনি অমনি ধরে নিলেন আমি আপনার ভালোবাসাকে ‘বিরক্ত’ বলছি? এতটাও খারাপ ভাবেন আমায়?
“ভাবি না…তবে বড্ড ভয় হয় পিচ্চি। আমার এই পিচ্চিটা আবার অন্য কারো মায়ার বাঁধনে পড়ে হারিয়ে যাবে না তো?
মৌ এক লহমায় চমকে উঠে উজানে’র দিকে তাকাল। উজানে’র ভেতরের কথার অসীম গভীরতা সে খুব ভালো করেই আঁচ করতে পেরেছে। তবুও বুকের ভেতরের কম্পন সামলে নিয়ে কাঁপা কাঁপা গলায় প্রতিধ্বনি করল।
”আ আ আপনি হুট করে এমন অদ্ভুত কথা কেন বলছেন বলুন তো?
উজান এক মুহূর্ত সময় না দিয়ে মৌ’কে তীব্র আবেশে নিজের বুকের ভেতর শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। তার বুকের ভেতর থাকা হৃদপিণ্ডটা তখন রীতিমতো প্রলয়ংকরী বিদ্যুৎ গতিতে লাফাচ্ছে। বুক জুড়ে জমা হয়ে আছে এক অজানা বিষাদময় ভয়। একদিকে নিজের বিপজ্জনক জীবনের অজানা পরিণতি‚ অন্যদিকে নিজের সবচেয়ে প্রিয় নারীকে চিরতরে হারিয়ে ফেলার তীব্র শঙ্কা। সে কাতর স্বরে ফিসফিসিয়ে আওড়াল‚
“আমি সব জানি পিচ্চি। আমি খুব ভালো করে জানি রোহান তোমাকে অসম্ভব ভালোবাসে। কিন্তু তোমায় ছাড়া এই উজান চৌধুরী যে একদম শূন্য‚ একবারে নিঃস্ব। আমার অতীত তো আগেই কেউ একজন এসে ভেঙে চুরমার করে দিয়েছিল…তারপর তোমার এই ভালোবাসায় ভর করেই তো উজান চৌধুরী আবার নতুন করে বাঁচতে শিখেছে। এরপর তুমি যদি অন্য কারো মায়ায় আমাকে ছেড়ে চলে যাও‚ তবে আমি নিশ্বাসহীন হয়ে যাব। একটুও বাঁচব না তোমায় ছাড়া।
মৌ’য়ের বুকের ভেতরটা তীব্র এক আশঙ্কায় কেঁপে উঠল। উজান রোহানে’র কথা জানে অথচ এতদিন তার আচরণে বিন্দু পরিমাণও টের পেতে দেয়নি. মৌ উজানে’র বুক থেকে সামান্য সরে আসতে চাইল কিন্তু উজান তাকে আরও আষ্টেপৃষ্ঠে বুকের সাথে জাপটে ধরে রইল। মৌ অবশ্য অবাক হলো না‚ সে ভালো করেই জানে উজানে’র পুরো অতীত কতটা ক্ষতবিক্ষত আর বেদনাময়। এই মানুষটা জীবনে কতটা গভীর আঘাত আর বিশ্বাসঘাতকতা পেয়েছে‚ তা তার কাছে অজানা নয়। কিন্তু উজান কীভাবে ভাবতে পারল যে মৌ তাকে এভাবে ফেলে রেখে অন্য কোনো পুরুষের হাত ধরবে? মৌ অনেক চেষ্টা করে অবশেষে উজানে’র শক্ত বুক থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে আনল। তারপর নিজের কাঁপা কাঁপা দু-হাতের তালুতে উজানে’র গাল দুটো আঁকড়ে ধরে, অশ্রুসিক্ত চোখে তাকিয়ে রুদ্ধ কণ্ঠে শুধাল।
”প প প্রফেসর সাহেব। এসব কী ভুলভাল বকছেন আপনি?
“আমি সব সত্যি জানি পিচ্চি। তোমাদের ব্যাপারে সব কথা সুইটহার্ট আমাকে আগেই বলেছিল। সত্যি বলছি পিচ্চি‚ তোমায় ছাড়া আমি আর বাঁচতে পারব না। আমি জানি‚ হয়তো রোহানে’র ভালোবাসা আমার মতো এত নিঃস্বার্থ নয়…কারণ উজান চৌধুরী তোমাকে ভালোবাসে নিজের প্রয়োজনে। তোমাকে ছাড়া আমি অচল‚ তাই তোমায় এত ভালোবাসি! প্লিজ পিচ্চি‚ কেবল আমার এই বেঁচে থাকার জন্য হলেও আমার কাছে চিরকাল থেকে যাবে তো তুমি?
মৌ’য়ের মুখের সমস্ত ভাষা যেন এক লহমায় হারিয়ে গেল। প্রফেসর উজান চৌধুরী’কে কখনো এতখানি অসহায় আর কাতর হতে দেখেনি সে। মৌ উজানে’র গালে জমে থাকা এক ফোঁটা জল মুছে দিয়ে দৃঢ় আশ্বাসের স্বরে বলল‚
”এমন ব্যাকুল হয়ে বলছেন কেন বলুন তো? আমি আপনাকে ছেড়ে কোথায় যাব? আপনিহীনা আমি নিজে কীভাবে বেঁচে থাকবো শুনি? হয়তো রোহান ভাইয়া আমাকে অনেক বছর ধরে ভালোবাসে কিন্তু আমি তো তাকে কোনোদিন সেই নজরে দেখিনি। তাকে আমি সত্যি ভালোবাসি‚ তবে সেটা নিজের বড় ভাই হিসেবে। নিজের জীবনসঙ্গী হিসেবে তো কেবল আপনাকেই ভাবি। আর সত্যি বলতে‚ প্রয়োজন ছাড়া কি দুনিয়ায় কোনো মানুষ কাউকে ভালোবাসতে পারে? যেমন আপনাকেই আমার প্রতিটা নিশ্বাসে চাই‚ তাই তো আপনাকে ভালোবাসি‚ এটাও তো আমার আত্মিক প্রয়োজন! আবার রোহান ভাইয়াও আমাকে নিজের করে চায়‚ সেটাও তার প্রয়োজন। তাই বলে নিজের এত গভীর ভালোবাসাকে এভাবে ছোট করবেন না প্লিজ।
“আমি আমার ভালোবাসাকে ছোট করছি না পিচ্চি।
উজান মৌ’য়ের কপালে কপাল ঠেকিয়ে বুজে আসা গলায় বলল‚ “তবে তোমায় ছাড়া সত্যি উজান চৌধুরীর আর কোনো অস্তিত্ব থাকবে না…আমি মরে যাব। প্রমিজ করো আমাকে‚ কখনো এই পুরুষটাকে একা ফেলে মাঝপথে হারিয়ে যাবে না? এমনকি আমি যদি কখনো কোনো দুর্ঘটনায় মরেও যাই‚ তবুও আমার এই পিচ্চি বউটা অন্য কোনো দ্বিতীয় পুরুষের হবে না…প্রমিজ করো!
মৌ আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। উজানে’র বুকের ওপর মাথা রেখে ডুকরে কেঁদে উঠল। উজানে’র এই বুকফাটা কণ্ঠস্বর আজ কেমন যেন অচেনা আর ছন্দহারা পাখির মতো শোনাল। কেন হঠাৎ এমন পাগলের মতো আচরণ করছে লোকটা? কিসের এত ভয় তার মনে? এই অচেনা ভয়ের কোনো উত্তরই খুঁজে পেল না মৌ।
উজান মৌ’য়ের চোখ থেকে গলে পড়া এক ফোঁটা মুক্তোঝরা জল নিজের আঙুলে মুছে ফেলল। এরপর তার চিবুকে আলতো একটা চুমু খেয়ে নিজের মুখোমুখি করে নরম কণ্ঠে আওড়াল‚
”রিলাক্স পিচ্চি। আর কেঁদো না প্লিজ। তোমার চোখের অশ্রু দেখতে ভালো লাগে না আমার। কষ্ট হয় কেন বুঝো না?
মৌ তখনো ছোট বাচ্চাদের মতো হেঁচকি তুলছে। সে কিছুটা ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে বলে উঠল‚ ”তাহলে আপনি এমন আজব কথা কেন মুখে আনলেন বলুন তো? আপনাকে কাছে না পেয়ে‚ দুচোখ ভরে সামনাসামনি দেখতে না পেয়ে‚ আপনার হাতে হাত না রেখে একটানা দুটো বছর আপনার জন্য অপেক্ষা করেছি। তাহাজ্জুদের জায়নামাজে বসে চোখের পানি ফেলে কেবল আপনাকে চেয়েছি আল্লাহর কাছে। এত কাঠখড় পুড়িয়ে পাওয়ার পর আজ আপনি বলছেন আমি অন্য কোনো পুরুষের মায়ায় পড়ে যাব? আপনার কি একটুও মনে হয় না যে আমার ভালোবাসা এতটা ঠুনকো নয়? আর আপনি সামান্য কারণেই আমাকে একা ফেলে মরে যাওয়ার কথা কেন বলছেন? আপনিহীন এই তাসফিয়া মৌ চৌধুরীর কোনো অস্তিত্ব থাকবে না? আপনিই আমার প্রথম আর আপনিই আমার শেষ। এই তাসফিয়া মৌ চৌধুরী আপনাকে আজ ওয়াদা করছে‚ জীবনের শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করার এক সেকেন্ড আগেও আমার চোখ অন্য কোনো পুরুষের দিকে যাবে না।
মৌ’য়ের মুখে কথা গুলো শুনে উজানে’র মনটা পলকে জুড়িয়ে গেল। সে একরাশ মুগ্ধতা নিয়ে মৌ’কে শক্ত করে নিজের পাঁজা কোলে তুলে নিল এবং তার কলেজ ব্যাগটা নিজের অন্য কাঁধে ঝুলিয়ে নিল। মৌও উজানে’র চওড়া গলায় দু-হাতে শক্ত করে নিজের বাহু পেঁচিয়ে ধরে রাখল। ঠিক সেই মুহূর্তেই গাড়ির দিকে যাওয়ার সময় উজানে’র চওড়া বুক চিরে বেরিয়ে এল তৃপ্তির একটা বাক্য।
“লাভ ইউ জান। আই রিয়েলি লাভ ইউ!
এইটুকুই মাত্র বলে সে মৌ’কে নিয়ে কলেজের উদ্দেশ্যে রওনা হলো। এরপর সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় বাড়ির সবাই হা করে তাকিয়ে ছিল। তবে চারপাশের কে কী দেখল‚ কে কী ভাবল এসব নিয়ে উজানে’র বিন্দুমাত্র মাথাব্যথা ছিল না‚ তার সমস্ত দুনিয়া জুড়ে তখন কেবল তার এই পিচ্চি বউটাই আচ্ছন্ন হয়ে ছিল
এদিকে কলেজের মূল ভবনের বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে মৌ আর মেহের। সবেমাত্র হাফ টাইমের বেল পড়েছে। চারপাশের সব স্টুডেন্ট হইচই করতে করতে ক্লাস থেকে বাইরে বেরিয়ে গেছে‚ কেউ গেছে ক্যানটিনে‚ কেউ বা কলেজের সবুজ মাঠে কিংবা ক্যাম্পাসের বাইরে একটু হাওয়া খেতে। ঠিক তখনই মৌ’য়ের নজর হঠাৎ গিয়ে পড়ল একটু দূরে দাঁড়িয়ে থাকা ললিতা’র ওপর। মেয়েটা কেমন যেন একটা দৃষ্টি নিয়ে একধ্যানে কার দিকে যেন তাকিয়ে আছে। মৌ কৌতূহল নিয়ে ললিতা’র চোখের সেই দৃষ্টির অনুসরণ করে সামনে তাকাতেই তার কপালে ভাঁজ পড়ে গেল। সে দেখল‚ অনার্স ডিপার্টমেন্টের ক্লাস শেষ করে অন্য একটা ভবন থেকে সিঁড়ি দিয়ে নেমে আসছেন স্বয়ং উজান স্যার। আর সেই দিকেই চোখের পলক না ফেলে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে আছে ওই শাঁকচুন্নি ললিতা। কলেজের চত্বরে দাঁড়িয়ে তার প্রফেসর স্বামীকে এভাবে গিলে খাওয়ার মতো চাউনিতে তাকিয়ে থাকতে দেখে মৌ’য়ের মাথার রক্ত চড়ে বসল। চোখের পলকে তার সমস্ত রাগ গিয়ে জমা হলো নাকের ডগায়। বিষয়টি টের পেয়ে মেহের সঙ্গে সঙ্গে মৌ’য়ের হাত খপ করে চেপে ধরে ফিসফিস করে বলে উঠল—
”দোস্ত প্লিজ‚ এখানে কোনো পাগলামি করিস না বলছি। এমনিতেই চারদিকে কত স্টুডেন্ট।
দাঁতে দাঁত চেপে মৌ ফোস করে উঠল‚ “ওই ডাইনিটা আমার প্রফেসর সাহেবকে চোখের দিয়েই গিলে খাচ্ছে আর তুই বলছিস আমি সাইলেন্ট হয়ে এই রোমিও-জুলিয়েট মার্কা দৃশ্য চুপচাপ দাঁড়িয়ে দেখব?
”আরে আমি তোর রাগ বুঝতে পারছি কিন্তু তুই তো জানিস কলেজে এসে এসব পাগলামি করতে স্যার নিজেই নিষেধ করে দিয়েছেন। প্লিজ মৌ‚ প্লি-ই-জ! ঝগড়া করতে যাস না বলছি।
মেহের আকুল হয়ে বোঝানোর চেষ্টা করল। কিন্তু কার কথা কে শোনে! মৌ তখন রাগে অন্ধ হয়ে গেছে। মেহেরে’র হাত ছাড়িয়ে সে একরকম তেড়েই গিয়ে সোজা ললিতা’র সামনে গিয়ে হাজির হলো। ললিতা তখন মাঠের ঠিক মাঝে দাঁড়িয়ে আনমনে উজান’কে দেখতে ব্যস্ত ছিল‚ আর ঠিক সেই সুযোগেই মৌ পিছন থেকে গিয়ে সজোরে একটা ধাক্কা মারল। হঠাৎ এমন আচমকা ধাক্কায় ললিতা সামলাতে না পেরে সোজা গিয়ে ধড়াস করে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল৷ নিজের এই অপমানজনক অবস্থা দেখে ললিতা যখন চোখ তুলে তাকাল এবং সামনে মৌ’কে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখল, তখন তার নিজের রাগও সাত আসমান ছাপিয়ে দ্বিগুণ হয়ে গেল। কিন্তু ললিতা’র এই কোমর ভাঙা অবস্থা দেখে মৌ’য়ের আর হাসি থামল না। সে খিলখিল করে এমন উচ্চস্বরে হেসে উঠল যে আশেপাশের উপস্থিত সবকিছুর নজর তাদের দিকে ঘুরে গেল। হাসতে হাসতে খিলখিয়ে উঠে মৌ ভরা মজলিশের মাঝেই কটাক্ষ করে বলে উঠল‚
”তোমার কোন কোন জায়গায় ব্যথা গো বান্ধবী ললিতা? যে যে জায়গায় ব্যথা‚ সেই সেই জায়গায় লঙ্কার গুঁড়ো লাগিয়ে রাখো‚ তবুও আরেকজনের ভাতারের দিকে নজর দিও না!
আচমকা মাটিতে পড়ে যাওয়ার কারনে ললিতা উঠে দাঁড়াতে পারছিল না। তবে সে দাঁতে দাঁত চেপে চেঁচিয়ে উঠল‚
“মৌয়ের বাচ্চা…
কথাটা শেষ না করেই সে মাটি থেকে কোনোমতে কাপড় ঝেড়ে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠে দাঁড়াল। ললিতা’কে তেড়ে আসতে দেখে মৌ আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াল না‚ ভোঁ দৌড় দিল মাঠের অন্যপ্রান্তের দিকে।
ললিতাও দাঁতে দাঁত চেপে তার পিছন পিছন গজড়াতে গজড়াতে ছুটল। দৌড়াতে দৌড়াতে সে হাঁপাতে হাঁপাতে রাগে ফেটে পড়ে বলতে লাগল।
“দাঁড়া বলছি মৌ’য়ের বাচ্চা! আজ তোর একদিন কি আমার একদিন। তোর এত বড় সাহস হলো কী করে সবার সামনে আমাকে এমন বিশ্রীভাবে অপমান করিস? তুই জানিস আমি কে?
দৌড়াতে দৌড়াতে মৌ ততক্ষণে কলেজের পুরনো পুকুরঘাটের কাছে গিয়ে একটা গাছের আড়ালে থমকে দাঁড়িয়ে গেল। তারপর একটু দম নিয়ে মুখটা বাঁকিয়ে পটাপট জবাব দিল।
”শাঁকচুন্নি তুই তো নিজেই জানিস না তুই আসলে কে? তাহলে আমি কিভাবে বলবো তুই কোন শওড়া গাছের পেত্নী? আর আমি তো কোনো মিথ্যা কথা বলিনি‚ যা সত্যি তাই তো সবার সামনে মুখের ওপর শুনিয়ে দিয়েছি। একটুও কি লজ্জা করে না তোর? আরেকজনের ভাতারের দিকে তাকিয়ে থাকিস। নির্লজ্জ মেয়ে‚ লজ্জা নেই একটুও।
“মৌ তোর বাড়াবাড়ি কিন্তু এবার সীমানা ছাড়িয়ে যাচ্ছে বলে দিচ্ছি।
”রাখ তোর বা*লের সীমানা। ডাইনি একটা। নেক্সট টাইম যদি আমার প্রফেসরের দিকে লুচ্চামির নজরে তাকিয়েছিস‚ তবে তোর ওই চোখ দুটো আমি উপড়ে ফেলবো।
ললিতা এবার তীক্ষ্ণ কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল‚ “তোর প্রফেসর মানে? তোর সাথে উজান স্যারের কোনো সম্পর্ক আছে?
এই কথা শুনা মাত্র মৌ ভেতরে ভেতরে ভীষণভাবে ঘাবড়ে গেল। উজান তো তাকে কড়া করে নিষেধ করেছিল কলেজে কাউকেই তাদের সম্পর্কের কথা ঘুণাক্ষরেও না জানাতে। অথচ একটু আগে সে নিজেই নিজের মুখে সব ফাস করে দিতে বসেছিল। মৌ আমতা আমতা করতে করতে ঢোক গিলে তোতলাতে তোতলাতে বলে উঠল‚
”আ আ আ আমার আবার কী হবে? আমাদের মাঝে কোনো সম্পর্ক নেই।
কথাটা শেষ করেই মৌ আর সেখানে এক মুহূর্ত দাঁড়াল না‚ টিকটিকির মতো দ্রুত পা চালিয়ে সেখান থেকে ভোঁ দৌড় দিয়ে সবার মাঝে মিলিয়ে গেল। এদিকে ললিতা একা একা পুকুরপাড়ে দাঁড়িয়ে ভাবলেশহীন চোখে সেই দিকে তাকিয়ে রইল। তার মনের ভেতর তখন শত শত খটকা একসঙ্গে নাড়া দিয়ে উঠেছে। ঠিক সেই মুহূর্তে দীর্ঘ পা ফেলে সেখানে এসে হাজির হলো জিহাদ। ললিতাকে একা ফুঁসতে দেখে জিহাদ এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করল।
”কিরে ললিতা? তুই ঠিক আছিস তো? হঠাৎ এমন হাঁপাচ্ছিস কেন? মৌ তোকে আবার কী এমন বলল?
ললিতা দীর্ঘ একটা শ্বাস ফেলল। তার চোখের কোণে তখন প্রতিশোধের হিংস্র আগুন জ্বলছে। সে শক্ত গলায় জিহাদ’কে বলল‚ “আমি ঠিক আছি জিহাদ। তবে আমার ব্রেন বলছে উজান স্যার আর ওই মৌ’য়ের মধ্যে ডাল মে কুছ কালা তো জরুর হ্যায়। আই অ্যাম ডেড শিওর এবাউট ইট।
”একদম ঠিক বলছি। শুধু তুই একা নয় দোস্ত আমিও তো গত কদিন ধরে খেয়াল করছি। মাঝে মধ্যে মৌ’কে স্যারের কেবিনে ঘুরঘুর করতে দেখা যায়‚ এমনকি স্যার যখন ডিপার্টমেন্টে থাকেন না‚ মৌ’য়ের পাত্তা থাকে না। এই দুটোর মধ্যে একটা গোপন চক্কর চলছেই। কিন্তু এখন তুই কী করবি?
প্রফেসর উজান চৌধুরী পর্ব ৫১
ললিতা’র ঠোঁটের কোণে মুহূর্তেই এক মারাত্মক পৈশাচিক ও তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল। সে চোখ মিটমিটিয়ে বাঁকা সুরে বলল‚ “কী আর করব বল? ওদের এই সিক্রেট রিলেশনশিপটা এবার আমি পুরো কলেজের সামনে নিয়ে এসে এক্সপোজ করব। ওই মৌ সবার সামনে আমাকে যেভাবে অপমান করে কাদা মাখিয়ে দিয়েছে‚ তার এক একটা সুদের পাই পাই করে উশুল না তুললে আমার নাম ললিতা নয়। কলেজের প্রিন্সিপাল‚ বাকি সব প্রফেসর আর সমস্ত স্টুডেন্টদের সামনে ওদের এমন লজ্জায় ফেলব। তখন বুঝবে ললিতা’র সাথে বাঁদরামি করার শখ কত প্রকার ও কি কি। চল আমার সাথে‚ স্যার এখনো মনে হয় নিজের কেবিনে গিয়ে পৌঁছাননি…তার আগেই আমাদের সব করতে হবে।
এরপর জিহাদ আর এক মুহূর্তও নষ্ট না করে ললিতার পিছন পিছন তাদের সেই চেনা অভিসন্ধির গন্তব্যের দিকে পা বাড়াল।
