প্রফেসর উজান চৌধুরী পর্ব ৫৮
বন্যা সিকদার
মৌ’য়ের সেই আত্ম চিৎকারের শব্দ শুনে কিচেন রুম থেকে ছুটে এলেন শাশুড়ি মৌসুমি চৌধুরী আর মেহের। মৌ’কে সিঁড়ির নিচে পড়ে থাকতে দেখে মেহের পাগলের মতো দৌড়ে গিয়ে তাকে ধরে বুকে জড়িয়ে ধরল। ঠিক তখনই টিভিতে আবারও নিউজের সেই একই বীভৎস বাক্যটি রিপিট করা হলো। সংবাদটির সত্যতা নিশ্চিত হতেই মৌসুমি চৌধুরী দুই হাতে বুক চেপে ধরে ডুকরে কেঁদে উঠলেন। নিজের ছেলের মৃত্যুর খবর এভাবে নিউজের পর্দায় দেখতে হবে‚ তা যে কোনো মায়ের কল্পনারও অতীত ছিল। মৌ নিজের পুরো শরীর ছেড়ে দিয়ে মেহের’কে শক্ত করে আঁকড়ে ধরে অঝোর ধারায় কাঁদতে লাগল।
”মেহু আমার প্রফেসর সাহেব সত্যিই আর নেই। সত্যি সত্যি আমাদের সবাইকে একা করে চলে গেল সে? মামণি দেখো‚ তোমার ছেলে আজ সত্যিই আমাকে এই বিশাল পৃথিবীতে নিঃস্ব করে দিয়ে চলে গেল।
মৌ মেঝেতেই বসে ছটফট করে কাঁদতে লাগল। তার হাত দুটো দিয়ে মেহেরে’র কাঁপা কাঁপা হাত জোড়া এমন ভাবে খামচে আঁকড়ে ধরল‚ যেন মেহের চাইলেই এক্ষুণি উজান’কে এনে দিতে পারবে! সে রক্তিম‚ জলভরা চোখে মেহেরে’র দিকে তাকিয়ে ব্যাকুল গলায় আওড়াতে শুরু করল।
”মেহু‚ এই মেহু! দে না আমার প্রফেসর সাহেবকে আমার কাছে ফিরিয়ে। তাকে ছাড়া যে মৌ’য়ের কোনো অস্তিত্ব নেই। বাঁচতে পারবো না আমি তাকে ছাড়া। দম বন্ধ হয়ে আসছে আমার…তাকে ফিরে আসতে বল না আমার কাছে।
মৌ’য়ের সেই বুকচেরা করুণ আত্মচিৎকারে চৌধুরীর বাড়ির প্রতিটি ইটের দেয়াল পর্যন্ত যেন কেঁপে উঠল। সেখানে উপস্থিত প্রতিটি মানুষের বুকের ভেতরটা হাহাকার করে উঠল‚ কেউ আর নিজের চোখের জল ধরে রাখতে পারল না। সবাই হাঁটু গেড়ে বসে অঝোরে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল। ইফাত হাত-পা থরথর করে কাঁপা অবস্থায় ফোনটা হাতে নিয়ে বারবার চেষ্টা করছে উজানে’র ব্যক্তিগত ফোনে রিং করার। কিন্তু ফোনের ওপার থেকে প্রতিবারই শীতল কন্ঠস্বর ভেসে আসছে—’সংযোগ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না‚ নম্বরটি বন্ধ রয়েছে’। অধৈর্য হয়ে ইফাত তন্ময়ে’র সাথে কনটাক্ট করার চেষ্টা করলো যাতে কোনো অলৌকিক খবর অন্তত পাওয়া যায়। অন্যদিকে উজানে’র মা মৌসুমি চৌধুরী নিজের দুই হাতে বুক চাপড়ে অঝোরে কেঁদে চলেছেন। একজন মা হয়ে এত বড় সত্য তিনি কীভাবে মেনে নেবেন? বুকফাটা গলায় বারবার আক্ষেপ করে বলছেন‚ যদি কোনো দিনও ঘুণাক্ষরে টের পেতেন যে নিজের রক্ত পানি করা সন্তানকে এভাবে প্রফেশনের তাগিদে অকালে হারাতে হবে। তবে কিছুতেই ছেলেকে ওই মৃত্যুর ফাঁদে পা বাড়াতে দিতেন না। সন্তানের মরণোত্তর মেডেল কিংবা দেশের জন্য আত্মত্যাগ কোনো বাবা-মায়ের বুকের ভেতরের খালি স্থানটা কোনোদিন পূরণ করতে পারে না। জীবনের শেষ বয়সে এসে নিজের চোখের সামনে কলিজার টুকরো তরুণ সন্তানের এই নির্মম পরিণতি যে কতটা জঘন্য ও সহ্যনাতীত নরক যন্ত্রণা‚ তা কেবল ভুক্তভোগী মা-বাবাই বোঝেন।
আরিফুল চৌধুরী এক কোণে সোফায় বসে নিজের দুই হাতের তালুতে মুখ ঢেকে কোনো ছোট শিশুর মতো অঝোরে চোখের জল ফেলছেন। যে ছেলেকে নিজের হাতে গড়ে তুলেছেন‚ নিজের সমস্ত শক্তি আর ঐতিহ্য যার কাঁধে ন্যস্ত করার স্বপ্ন দেখেছেন। সেই ছোট্ট ছেলেটা আজ চিরকালের জন্য না ফেরার দেশে পাড়ি জমাল। এক ব্যর্থ বাবা হয়ে এই পাষাণ দৃশ্য তিনি কীভাবে সহ্য করবেন‚ তা সৃষ্টিকর্তাই ভালো জানেন!
হঠাৎই মৌ মেহের’কে আবার দুই বাহু দিয়ে জাপটে ধরে ডুকরে কেঁদে উঠে বলল‚
”এই মেহু‚ তুই কথা বলছিস না কেন? একটাবার বল না গিয়ে প্রফেসর সাহেবকে ফিরে আসতে। তাকে ছাড়া যে তার এই পিচ্চিটা এক মুহূর্তও ভালো নেই। সে তো আমাকে ছেড়ে এতদিন এক সেকেন্ডের জন্যও দূরে থাকতে পারতো না‚ তাহলে আমি কিভাবে থাকবো। তুই গিয়ে বল না তার পিচ্চি কাঁদছে তার জন্য। সে তো আমার চোখের এক ফোঁটা অশ্রু গাল বেয়ে পড়লেও সহ্য করতে পারত না‚ ব্যস্ত হয়ে হাত দিয়ে মুছে দিত। তাহলে আজ আমি এত ডুকরে ডুকরে কাঁদছি তবুও সে কেন আমার কাছে আসছে না? তাকে অন্তত একটা শেষবারের মতো ফিরে আসতে বল না। তাকে ছাড়া যে আমি বড্ড নিঃস্ব‚বড্ড শূন্য…হে মাবুদ‚ আমি কীভাবে সইব এই কষ্ট।
মৌ’য়ের সেই করুণ কান্নার তোড়ে পুরো ড্রয়িংরুমে যেন বিষাদের ঘন কালো মেঘ নেমে এলো। মৌসুমি চৌধুরী নিজের অবুঝ ও অনাথ হয়ে যাওয়া বৌমাটার আকুতি আর সহ্য করতে পারলেন না। তিনি হাঁটু গেড়ে মেঝেতেই বসে পড়লেন‚ তারপর ভেজা চোখে মৌ’কে পরম মমতায় একদম নিজের বুকের নিবিড় খাঁজে শক্ত করে চেপে ধরলেন। বিয়ের বয়স পার হয়েছে মাত্র কয়েকটা মাত্র মাস। ভালোবাসার মায়ায় বাঁধা পড়তে না পড়তেই ছেলেটা মাঝপথে হাত ছেড়ে দিয়ে মেয়েটার সাজানো দুনিয়া এক লহমায় তছনছ করে দিয়ে ছাই বানিয়ে চলে গেল। কোন মুখে‚ কী সান্ত্বনার ভাষা দিয়ে এই ফুলের মতো নিষ্পাপ মেয়েটাকে আজ স্থির করবেন তারা? তিনি অশ্রুসিক্ত আর কাঁপা গলায় মৌ’কে শান্ত করার আপ্রাণ চেষ্টা করে ফিসফিসিয়ে বললেন।
“মা রে আমার‚ আর কেঁদো না। এভাবে কাঁদলে আরো কষ্ট হবে। একটু শান্ত হও তুমি‚ একটু ধৈর্য ধরো মা।
মৌ সাথে সাথে পাগলের মতো শাশুড়ির শাড়ির আঁচল দুই হাতে শক্ত করে চেপে ধরে চেঁচিয়ে উঠল,
“মামনি‚ তুমিই বলো না আমি কীভাবে শান্ত হব? তোমার ছেলে আমার সাথে এত বড় অন্যায় আর নিষ্ঠুর কাজ কেন করল? আমি আজ সকালেই তো কত করে বললাম‚ যাত্রা পথে হোঁচট লেগেছে প্রফেসর সাহেব‚ আপনি অন্তত দুটো মিনিট থমকে বসে যান। কিন্তু সে তো বরাবরের মতোই আমার কোনো আকুতি কানেই তুলল না। মামনি‚ তুমিই বলো না একটু পর কাজে গেলে কি তার মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যেত? সে কেন ভালোবাসার দোহাই দেওয়ার পরও আমার কথাটা শোনেনি?
“মৌ আমার কথাটা শোন বনু।
মেহের হাত বাড়িয়ে পরম ভালোবাসায় মৌ’য়ের গায়ে হাত রাখতে চাইল। মৌ এক ঝটকায় নিজের শরীর দোলা দিয়ে মেহের’কে ঠেলে দূরে সরিয়ে দিল।
“একদম টাচ করবি না তুই আমায়। তোকে আমি কতবার বললাম আমার প্রফেসর সাহেবকে ডেকে দিতে‚ তাকে একটা বার ফোন করে আনতে…কিন্তু তুই একটা কথাও শুনলি না আমার। তুই তো খুব ভালো করেই জানিস‚ তাকে ছাড়া এই পৃথিবীতে আমার বেঁচে থাকার দ্বিতীয় আর কোনো কারণ নেই‚ কোনো অস্তিত্ব নেই।
মৌ’য়ের কান্নার বেগ অঝোর ধারায় ঝরতে থাকা চোখের পানির সাথে সাথে আরও কয়েক গুণ বাড়তে লাগল। সে যেন নিঃশ্বাস নেওয়ার মতো স্বাভাবিক শক্তিটুকুও হারিয়ে ফেলছে। মৌসুমি চৌধুরী আর কোনো কথা না বলে তাকে পরম স্নেহে নিজের বুকের সাথে শক্ত করে চেপে পেঁচিয়ে রাখলেন। মৌ শাশুড়ির বুকের খাঁজেই মাথা গুঁজে হাঁসফাঁস করে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে আফসোস আর অনুযোগের সুরে প্রলাপ বকতে লাগল।
”মামনি‚ তোমার ছেলে কীভাবে আমাকে নিঃস্ব করে দিয়ে হারিয়ে যেতে পারলো? একটুও কি তার আমার কথা মনে পড়লো না? একটাবারও কি এই মেয়েটার মুখটা ভেসে উঠলো না তার চোখের সামনে? এভাবে পর করে দিয়ে হারিয়ে গেলো। আমাকে বাঁচিয়ে রেখে জিন্দা লাশ বানিয়ে গেলো।
হঠাৎই মৌ পরম আশ্রয়ে শাশুড়ি মৌসুমি চৌধুরীর বুকে ঢলে পড়ল। মৌ’য়ের আকস্মিক এমন নীরবতা দেখে থমকে গেলেন মৌসুমি চৌধুরী। নিচু হয়ে বৌমার মুখের দিকে তাকাতেই আঁতকে উঠলেন তিনি। মৌ সম্পূর্ণ জ্ঞান হারিয়ে নিশ্চল হয়ে তাঁর বুকে লুটিয়ে রয়েছে। তিনি সাথে সাথে চিৎকার করে উঠলেন‚
“মৌ এই মৌ…কথা বল মা। ইফাত তাড়াতাড়ি একটু পানি নিয়ে আয়।
মৌসুমি চৌধুরীর আর্তচিৎকারে ড্রয়িংরুমে উপস্থিত সবাই ভিড় করে এগিয়ে এলো। মেহের এক দৌড়ে কিচেন থেকে এক গ্লাস পানি নিয়ে এলো। তারপর কাঁপাকাঁপা হাতে মৌ’য়ের মুখে-চোখে পানির ঝাপটা দিতে লাগল কিন্তু মৌ চোখ খুলল না। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে ইফাত আর এক মুহূর্তও দেরি করল না। সে মৌ’কে পরম যত্নে পাজাকোলা করে পাশেই সোফায় এনে শুইয়ে দিল। মেহের কান্নাকাটি করতে করতেই মৌ’য়ের বরফশীতল হাত ও পায়ের তালু ডলে দিতে লাগল। এরই মধ্যে খবর পেয়ে ফ্যামিলি ডক্টর এসে হাজির হলেন। তিনি মৌ’কে চেক-আপ করলেন। বিষাদ ও শকে মৌ’য়ের মানসিক কন্ডিশন খুব খারাপ উল্লেখ করে দ্রুত ঘুম ও শান্ত থাকার কিছু হাই-ডোজ মেডিসিন সাজেস্ট করে চলে গেলেন। ইফাত এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে দৌড়ে গিয়ে ফার্মেসি থেকে মেডিসিন গুলো নিয়ে এলো। ইতিমধ্যেই শহরের বাইরে থাকা আরিয়ান আর তুবা’কেও ফোন করে খবরটা জানিয়ে দেওয়া হয়েছে‚ তারা ঝড়ের গতিতে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছে। প্রায় ঘণ্টাখানেক পর অবশেষে মৌ’য়ের জ্ঞান ফিরল। কিন্তু জ্ঞান ফিরতেই বাস্তবের নিষ্ঠুর সত্যটা আবার তার মনে পড়ে গেল‚ আর সে অঝোর ধারায় কাঁদতে শুরু করল। নিজের প্রফেসর সাহেবকে শেষবারের মতো দেখার জন্য পাগলের মতো ছটফট করতে লাগল সে। বাড়ির কেউ কিছুতেই তাকে ধরে রাখতে বা শান্ত করতে পারছে না।
ইফাত আর সহ্য করতে না পেরে মৌ’য়ের সামনে হাঁটু গেড়ে বসল। পরম স্নেহে নিচু ও নরম স্বরে আওড়াল‚
“ভাবি‚প্লিজ অন্তত নিজেকে একটু শান্ত করো। কিচ্ছু হয়নি তো…তুমি ভেঙে পোড়ো না। আমি নিজে সিআইডি হেডকোয়ার্টারে যাচ্ছি উজানে’র কাছে‚ ওখানে পৌঁছেই তোমাকে প্রতি মুহূর্তের সব খবর দেব। কিন্তু তুমি প্লিজ নিজের শরীরটাকে এভাবে শেষ করে দিও না।
মৌ ইফাতে’র হাত দুটো শক্ত করে আঁকড়ে ধরে ডুকরে উঠে বলল‚ “ভাইয়া প্লিজ আমাকেও সাথে নিয়ে চলো না। আমি নিজের চোখে দেখব আমার প্রফেসর সাহেবকে৷ সে কেন এভাবে আমাকে এই নির্মম দুনিয়ায় একা ফেলে চলে গেল। আমি জবাব চাইব।
“না ভাবি‚ এ মুহূর্তে তোমাকে সাথে নিয়ে যাওয়া আমার পক্ষে কোনোভাবেই সম্ভব নয়। বাইরের পরিস্থিতি তোমাদের জন্য এই মুহূর্তে মারাত্মক রিস্কি আর ডেঞ্জারাস। তুমি এখানেই সেফ থাকো‚ আমি কথা দিচ্ছি। পরিস্থিতি একটু কন্ট্রোলে এলেই তোমাকে নিয়ে যাব।
কথাটা বলেই ইফাত দ্রুত বাসা থেকে বেরিয়ে গেল। ইফাত চলে যেতেই মৌ আর এক সেকেন্ডও সেখানে স্থির হয়ে বসে থাকতে পারল না। সে যাওয়ার জন্য ছটফট করতেই মেহের তাকে শক্ত করে চেপে ধরে রাখল কিন্তু মৌ কারো কোনো বারণ শুনল না। এক ঝটকায় মেহেরে’র বাঁধন ছাড়িয়ে সে উন্মাদিনীর মতো বাসা থেকে বাইরের দিকে দৌড় দিল। পিছু পিছু মেহের’সহ পরিবারের বাকি সদস্যরাও আতঙ্কে দৌড়ে বের হলো।
বাইরে এসে মৌ দেখতে পেল ইফাতে’র গাড়ি অলরেডি ধুলো উড়িয়ে গেট পার হয়ে বেরিয়ে গেছে। মৌ এক মুহূর্তও কালক্ষেপণ না করে সোজা মেইন রোডের দিকে ছুটে গেল গাড়ির খোঁজে‚ গ্যারেজ থেকে ড্রাইভারকে ডেকে গাড়ি বের করানোর মতো ধৈর্য তখন তার মনে অবশিষ্ট ছিল না।
মেহের ছায়াসঙ্গীর মতো তার পেছনেই দৌড়াচ্ছিল। কিন্তু কোনো ভাবেই তাকে থামাতে পারছিল না। ঠিক তখনই ঘটে গেল চরম অঘটন। রাস্তার মোড়ে পৌঁছাতেই আচমকা কাল রঙের একটি গ্লাস-কালো মাইক্রোবাস বিকট শব্দে ব্রেক কষে থামল। কিছু বুঝে ওঠার আগেই গাড়ি থেকে কয়েকজন মুখোশধারী লোক নেমে এক ঝটকায় মৌ আর মেহের’কে টেনে-হিঁচড়ে গাড়ির ভেতরে তুলে নিল। তারা দুজনে চিৎকার করার সুযোগটুকুও পেল না। লোক গুলো মুহূর্তের মধ্যে স্প্রে দিয়ে তৈরি রাসায়নিক ক্লোরোফর্ম তাদের মুখে চেপে ধরল‚ আর সাথে সাথেই জ্ঞান হারিয়ে নিস্তেজ হয়ে পড়ল দুজনে। মুহূর্তের মধ্যে কাল গাড়িটি ধুলো উড়িয়ে উধাও হয়ে গেল। দূর থেকে দৃশ্যটি দেখে স্তব্ধ ও বাকরুদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন আরিফুল চৌধুরী আর আকবর চৌধুরী আর মৌসুমি চৌধুরী নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে না পেরে মাটিতে হাঁটু গেড়ে বসে আবারও বুক চাপড়ে ডুকরে কেঁদে উঠলেন। একদিকে তরুণ ছেলের অকাল মৃত্যুর সংবাদ‚ আর অন্যদিকে একই দিনে চৌধুরী বাড়ির দুই আদুরে বৌমাকে চোখের সামনে কে বা কারা এভাবে কিডন্যাপ করে নিয়ে গেল। শোক আর আতঙ্কে পুরো পরিবারে যেন প্রলয় নেমে এলো।
এদিকে মাঝপথে গাড়ি চালানোর সময় মায়ের কান্না জড়ানো ফোন পেয়ে দ্রুত চৌধুরী বাড়ি ফিরে এলো ইফাত। বাসায় পা রাখতেই সে দেখল পরিবারের সবাই কান্নায় ভেঙে পড়েছে‚ চারিদিকে হাহাকার। ইফাত উদ্বিগ্ন কণ্ঠে এগিয়ে গিয়ে নিজের মায়ের কাছে জিজ্ঞেস করল।
“আম্মু! কী হয়েছে এভাবে ভেঙে পড়েছো কেন? আর তোমরা আমাকে মাঝপথ থেকে হঠাৎ ফোন করে কেন ফিরে আসতে বললে?
ইফাতে’র উদ্গ্রীব প্রশ্নের মুখে ইমরোজা চৌধুরী ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে অঝোরে কাঁদতে কাঁদতে বললেন‚ “বাবা রে আমরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই ওই লোক গুলো মৌ আর মেহের’কে টেনে গাড়িতে তুলে কিডন্যাপ করে নিয়ে গেছে। আমরা যাওয়ার আগেই লোক গুলো উধাও হয়ে গেল।
“হোয়াটটটটট? আম্মু‚ আমি তোমাদের বারবার সতর্ক করে গেলাম যে বাইরের পরিস্থিতি খারাপ। ওদের সাবধানে আর সেফ রাখবে। তবুও তোমরা ওদের সামলাতে পারলে না? আমি এখন একা মানুষ একসাথে কীভাবে দুই দিক সামলাব‚ বলো তো? একদিকে উজান আর অন্যদিকে ভাবি আর মেহের।
”বাবা এখন কি হবে বল তো?
ইমরোজা কাঁদতে লাগলেন। ইফাত নিজের রাগকে কষ্ট করে সংবরণ করে মায়ের কাঁধে হাত দিল। “আচ্ছা ঠিক আছে‚ এখন ভেঙে পড়ার সময় নয়! তুমি বড় আম্মুকে সামলাও। আমি যেকোনো মূল্যে ভাবি আর মেহেরকে খুঁজে বের করছি।
কথাটা শেষ করেই আবারও অজানা গন্তব্যের উদ্দেশ্যে ঝড়ের গতিতে বেরিয়ে গেল ইফাত।
একদম নিঝুম‚ নির্জন এক গভীর জঙ্গল। সেই জঙ্গলের মাঝখানে পুরনো একটা পরিত্যক্ত বাড়িতে বন্দি করে রাখা হয়েছে প্রায় শ খানেক মেয়েকে। তাদের মাঝেই এক কোণে বসে আছে মৌ আর মেহের। মেহের আশঙ্কায় কাঁপতে কাঁপতে মৌ’য়ের হাত শক্ত করে আঁকড়ে ধরে অঝোরে কাঁদছে কিন্তু অলৌকিক ব্যাপার হলো মৌ’য়ের চোখে এখন আর এক ফোঁটা জলও নেই। সে নিজের হাঁটু দুটো বুকের সাথে ভাঁজ করে নিশ্চুপ হয়ে বসে আছে। তার এই পাথর হয়ে যাওয়া নীরবতা মেহের’কে মারাত্মক ভাবে ভাবিয়ে তুলছে। মেহের কাঁপা কাঁপা গলায় মৌ’কে ডাকল।
“মৌ তুই এমন চুপ করে আছিস কেন? তুই কি বুঝতে পারছিস না ওরা আমাদের সবাইকে বিদেশে নোংরা কাজে পাচার করে দেওয়ার জন্য এখানে ধরে নিয়ে এসেছে?
”হুম তো? —মৌ নিচু বরফশীতল স্বাভাবিক গলায় উত্তর দিল।
“পাখি কী হয়েছে তোর‚ বল তো? এতগুলো নিষ্পাপ মেয়ের ভবিষ্যৎ আর জীবন আজ এখানেই শেষ হতে চলেছে আর তুই কিছুই করবি না? কিছু একটা কর না বোন। এতগুলো প্রাণকে এভাবে অকালে ঝরে যেতে দিস না…দেখ সবাই কেমন করে কাঁদছে। ওদের বাঁচা না পাখি।
মৌ এবার ধীরে ধীরে মাথা তুলল। মেহেরে’র দিকে একজোড়া নিস্পৃহ ও শীতল চোখে তাকিয়ে ধীরে ধীরে বলল‚ ”কী হবে অন্যের কথা ভেবে‚ বল? কই‚ এতদিন অন্যের কথা ভেবে‚ সমাজ আর মানুষের উপকার করে আমাদের কী লাভ হলো? আমার প্রফেসর সাহেব তো কত শত মানুষকে বাঁচাল কিন্তু তার পরিণামে শেষমেশ কী হলো? আমার প্রফেসর সাহেবকেই গুলি করে মেরে ফেলা হলো। কই‚ কেউ তো পারল না আমার প্রফেসর সাহেবকে বাঁচিয়ে রাখতে?
“মৌ প্লিজ এমন করিস না। এখানে যে আমাদের নিজেদের জীবনও জড়িয়ে আছে। আমরা যদি আজ এখান থেকে পালাতে না পারি‚ তবে সারাজীবন ওই নরকের মতো অন্ধকার ঘরে কাটাতে হবে আমি পারব না তোর ইফাত ভাইয়া’কে ছাড়া অন্য কারো কথা ভাবতে। তাকে ছাড়া অন্য কারো স্পর্শ যে এই মেহের’কে জ্যান্ত মেরে ফেলবে। তুই কি পারবি অন্য কারো স্পর্শ সহ্য করতে? তুই পারবি এমনটা হতে দিতে?
মৌ ছলছল নয়নে কিছু সময় মেহেরে’র দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর হঠাৎই ঠোঁটের কোণে এক চিলতে বিষাদময় করুণ হাসি ফুটিয়ে তুলল। এই চরম বিপদের মুখে মৌ’য়ের হাসার কারণ মেহেরে’র মাথায় ঢুকল না। মৌ একদম নিচু গলায় জবাব দিল।
“উঁহু! মৌ কখনোই উজান চৌধুরী ছাড়া কারো কথা ভাবতে পারবে না মৌ অনলি উজান চৌধুরীর ছিল‚ আর চিরকাল তার হয়েই থাকবে। আমাদের যখন এখান থেকে অন্য কোথাও পাচারের জন্য নিয়ে যাওয়া হবে‚ আমি চলন্ত গাড়ি থেকে লাফ দিয়ে দেবো। আর তুই টেনশন করিস না‚ তোকে ইফাত ভাইয়া ঠিকই কোনো না কোনোভাবে খুঁজে বের করবে…তোকে যে সে বড্ড ভালোবাসে। কিন্তু আমার প্রফেসর সাহেব তো আমাকে একটুও ভালোবাসে না‚ তাই তো আমাকে এই নিষ্ঠুর দুনিয়ায় একলা ফেলে রেখে নিজে হারিয়ে গেল।
কথা শেষ হতেই রুমে ভারী লোহার দরজা খুলে কয়েকজন শক্তপোক্ত লোক ভেতরে প্রবেশ করল। তারা নির্মমভাবে প্রতিটি মেয়ের হাতে সিল মারতে শুরু করল। ব্যথায় আর আতঙ্কে মেয়েরা চিৎকার করে কাঁদতেই লোকগুলো গর্জে উঠে ধমক দিল। আর সাথে সাথে পুরো রুম নিস্তব্ধ হয়ে গেল। একে একে সবার হাতেই সিল মারা হচ্ছে। ঠিক এমন সময় বাইরে থেকে বিশেষ একজন লোক ওই রুমে প্রবেশ করায় কাজ থামিয়ে পাচারকারী লোকগুলো একসাথে নিচু হয়ে সালাম দিল।মৌ’য়ের দৃষ্টি বরাবরের মতোই মেঝের দিকে নিবদ্ধ ছিল কিন্তু মেহের লোকটার দিকে তাকাতেই থমকে গেল। সে নিজের হাতের কনুই দিয়ে মৌ’কে ধাক্কা দিয়ে সামনে তাকাতে বলল। মৌ চরম বিরক্তিকর দৃষ্টি নিয়ে চোখ তুলে তাকাতেই স্তব্ধ হয়ে গেল। সামনে তাদের দিকেই এক জোড়া আকুল ও অসহায় দৃষ্টি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে স্বয়ং রোহান। মৌ কিছু বুঝে ওঠার আগেই রোহান ঝড়ের গতিতে দৌড়ে এসে মৌ আর মেহের দুজনকে একসাথে নিজের বুকের মাঝে জড়িয়ে ধরল। মেহের ভয়ে ছটফট না করলেও মৌ সজোরে ধাক্কা দিয়ে রোহান’কে নিজের থেকে দূরে সরিয়ে দিল। রোহান হতভম্বের মতো অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।
“ফুল‚ মেহু। তোরা এখানে কী করছিস?
কথাটা বলেই সে মেহের’কে ছেড়ে দিয়ে সেই পাচারকারী লোকগুলোর দিকে রক্তচক্ষু নিয়ে ধেয়ে গেল। হিংস্র সিংহের মতো হুংকার তুলে বলল‚ “ওদেরকে তুলে এনেছে কোন শু**য়োরের বাচ্চারা?
রোহানে’র সেই হুংকারে প্রতিটি লোক আতঙ্কে থরথর করে কেঁপে উঠল। একজন লোক ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা কয়েকজনের দিকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিতেই। রোহান এক উন্মাদের মতো রড তুলে নিয়ে তাদের ওপর এলোপাতাড়ি পেটাতে শুরু করল।
“জানোয়ারের বাচ্চা। তোরা কী করেছিস? তোরা আমার এই দুটো প্রাণকে এখানে তুলে এনেছিস?
বলতে বলতেই সে রড দিয়ে পেটানো চালিয়ে যেতে লাগল। তাদের শরীর যন্ত্রণায় ক্ষত-বিক্ষত ও রক্তাক্ত করে দিয়ে তীব্র তেজস্বী গলায় গর্জে উঠল‚
“কুত্তার বাচ্চা! তোদের সাহস হলো কীভাবে তোরা আমারই ফুলকে কিডন্যাপ করে নিয়ে এসেছিস? তোরা জানিস ফুল আমার জান‚ আমার কলিজা‚ আমার সব। আর আমি আমার জানকেই পাচার করবো? তাকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেবো।
প্রফেসর উজান চৌধুরী পর্ব ৫৭
রক্তাক্ত লোক গুলো মাটিতে পড়ে রোহানে’র পা জড়িয়ে ধরে আকুতি-মিনতি করে বলতে লাগল।
“ব ব ব ব বস প্লিজ ছেড়ে দিন আমাদের। আমরা সত্যি কিছু জানি না। আমাদের মাফ করে দিন। আমাদের যা বলা হয়েছে আমরা ঠিক তাই তাই করেছি।
রোহান রড উঁচিয়ে চিৎকার করে উঠল‚ “জানিস না মানে? তোদের কোন বাপ বলেছে আমার এই প্রাণ দুটোকে এখানে ধরে আনতে‚ বল আমাকে?
ঠিক তখনই……
