প্রফেসর উজান চৌধুরী পর্ব ৬৩
বন্যা সিকদার
কেটে গিয়েছে দীর্ঘ তিনটি বছর। এই দীর্ঘ তিনটি বছরে সময়ের তোড়ে বদলে গিয়েছে অনেক কিছু। জীবনের স্বাভাবিক নিয়মে শোকের মাতম কমে এলেও চৌধুরী পরিবারের হৃদয়ের এক কোণে একটি নাম আজও সমানভাবে জীবন্ত— রোহান তালুকদার।
আর এই তিন বছরে বদলে যাওয়া সবচেয়ে সুন্দর সত্যিটি হলো মৌ এখন আট মাসের অন্তঃসত্ত্বা। তার ছোট্ট অস্তিত্বের ভেতরে দিনে দিনে বড় হয়ে উঠছে উজান আর মৌ’য়ের ভালোবাসার প্রথম রূপান্তর‚ এক নতুন প্রাণ!
মৌ’য়ের পেটে গড়ে উঠা এই ছোট্ট শিশুকে ঘিরে উজান চৌধুরীর খুশির কোনো সীমা নেই। তবে জীবনে এত সুখ আর নতুন আলোর আগমন ঘটলেও‚ উজান বা মৌ কেউ এক মুহূর্তের জন্যও রোহান তালুকদারকে ভুলে যায়নি। এই যে এখন‚ বিকেল নামতেই মৌ গিয়ে বসে আছে চৌধুরী বাড়ির বাগানের কোণে রোহানের সেই চিরশান্তির কবরের পাশে। অঝোর ধারায় ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে সে। আট মাসের উঁচু পেট নিয়ে এমন কাঁচা মাটির কবরের পাশে একভাবে বসে থাকতে ইদানীং তার বেশ কষ্ট হয়‚ তবুও মৌ প্রতিদিন নিয়ম করে দু-বেলা এখানে এসে বসে। বেঁচে থাকতে যে মানুষটাকে মানুষ হিসেবে কদর দিতে পারেনি‚ আজ সে না ফেরার দেশে চলে যাওয়ার পর অনুশোচনায় মৌ তাকে রোজ সঙ্গ দেয়। কবরের মাটির দিকে তাকিয়ে সে কত হাজারো গল্প করে। কখনো নিজের অজান্তেই মুচকি হাসে‚ আবার কখনো অনুশোচনায় বুক ভাসিয়ে কাঁদে।
মাঝে মাঝে হাওয়ার দোলায় মৌ স্পষ্ট অনুভব করে‚ রোহান যেন ঠিক তার গা ঘেঁষে বসে রয়েছে। বাতাসে রোহানে’র সেই পরিচিত সুবাস ভেসে আসে‚ মৌ’য়ের অনায়াসে মনে হয় রোহান হয়তো আগের মতোই তার দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে খিলখিল করে হাসছে। মৌ একমনে কান্না সামলে হাত তুলে আল্লাহর দরবারে পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত করে‚ রোহানে’র ওপারে শান্তির জন্য চোখের পানি ফেলে শুকরিয়া আদায় করে মোনাজাত করে। হঠাৎই মৌ তার পাশে কারো এক সুপরিচিত‚ উষ্ণ উপস্থিতি অনুভব করল। সে ধীর পায়ে ঘাড় বাঁকিয়ে পাশে তাকাতেই উজান’কে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখল। উজান’কে দেখেই মৌ জোরপূর্বক ঠোঁটের কোণে একটুখানি মিষ্টি হাসি ফুটাল। কারণ উজান তাকে এখানে এসে কাঁদতে বারণ করেছে। কান্নাকাটি করলে উজান আর তাকে রোহানে’র কবরের কাছে আসতে দেবে না।
উজান এসে শান্ত ভঙ্গিতে মৌ’য়ের ঠিক পাশের দোলনাটিতে বসে পড়ল। মাটিতে নিচু হয়ে বসলে মৌ’য়ের বেশ কষ্ট হয়‚ তাই উজান নিজ হাতে বাগানের এই কবরের পাশটিতে সুন্দর একটি দোলনা বানিয়ে দিয়েছে‚ যাতে তার বউটার রোহানে’র পাশে বসতে কোনো ধরনের কষ্ট না হয়।
উজান পাশে বসতেই মৌ পরম ভালোবাসায় ও ক্ষণিকের ক্লান্তিতে উজানে’র চওড়া কাঁধে নিজের মাথাটা এলিয়ে দিল। কিন্তু নিজের অজান্তেই চোখের কোণ গড়িয়ে দু-ফোঁটা তপ্ত অশ্রু এসে বিদ্ধ হলো উজানে’র শার্টের কাঁধে। উজান পরম আবেশ ও মমতায় মৌ’য়ের দিকে তাকাল। তার কপালে নিজের ঠোঁট দুটো আলতো করে ছুঁইয়ে স্নিগ্ধ ফিসফিসানি কণ্ঠে আওড়াল…
“পিচ্চি একদম কাঁদবে না। হাজারবার বলেছি না‚ কবরের পাশে বসে এভাবে চোখের পানি ফেলতে নেই? তুমি কি চাও তোমার এই কান্নার জন্য ওপারে আমাদের রোহান কষ্ট পাক‚ বলো? না তো? তাহলে একটুও কাঁদবে না একদম। রোহানে’র জন্য যত পারো মন থেকে দোয়া আর ইস্তিগফার করবে‚ বুঝতে পেরেছ?
মৌ ভেজা চোখে মাথা নেড়ে বলল‚ “হুম…
“চলো তাহলে এখন রুমে। আর শোনো তোমার শরীরের এই অবস্থায় হুটহাট একা একা আর এখানে আসবে না। আগে আমাদের বেবিটা পৃথিবীর আলো দেখুক‚ তারপর তাকে কোলে নিয়ে একসাথে আসবে। নয়তো একা চলতে গিয়ে হোঁচট খেলে বড় কোনো বিপদ হয়ে যাবে।
মৌ আর কোনো কথা বাড়াল না। উজান আলতো করে ধরে ধরে তাকে দোলনা থেকে তুলে বাসায় নিয়ে যেতে লাগল। মৌ ধীরপায়ে হাঁটতে হাঁটতে বারবার পেছন ফিরে সেই কবরটার দিকে তাকাতে লাগল‚ মনটা যেন কিছুতেই ছেড়ে যেতে চাইছে না। কিন্তু বাইরের আবহাওয়া ক্রমশ মেঘলা হয়ে আসছে তাই সে উজানে’র পায়ে পা মিলিয়ে বাধ্য হয়ে পা বাড়াল। উজান তাকে ড্রয়িং রুমের আরামদায়ক সোফায় এনে বসাল। তারপর নিজ হাতে প্লেটে খাবার মেখে অত্যন্ত ভালোবাসায় বউ’কে খাইয়ে দিতে লাগল।
ঠিক তখনই হুট করে ড্রয়িং রুমে খুশিতে উৎফুল্ল হয়ে উল্লাসে নাচতে নাচতে প্রবেশ করল ইফাত। সে বাসায় ঢুকেই কিছু না ভেবে সোজা গিয়ে উজান’কে জড়িয়ে ধরে উন্মাদের মতো কোলাকুলি করতে লাগল।
উজান হঠাৎ এমন কাণ্ডে ভ্রূ যুগল কুঁচকে তাকাল। ইফাতে’র এমন পাগলাটে ব্যবহারে রুমের সবাই রীতিমতো অবাক। ইফাতে’র পে পেছনে মেহের লজ্জায় লাল হয়ে মাথা নিচু করে ঢুকল। শাশুড়ি ও বড়দের সামনে সে একদম সোজা হয়ে দাঁড়াতেও পারছে না। তখন ড্রয়িং রুমে চৌধুরী পরিবারের সবাই উপস্থিত ছিলেন। উজান ইফাত’কে হঠাৎ প্রশ্ন ছুড়ে দিল।
“কীরে? হঠাৎ কী হলো তোর? এত লাফাচ্ছিস কেন? ছাড় আমাকে….নাকি জড়িয়ে ধরেই মেরে ফেলবি আজ?
ইফাত উজান’কে ছেড়ে দিয়ে এবার ঝড়ের গতিতে গিয়ে নিজের মা ইমরোজা চৌধুরীকে জড়িয়ে ধরল। খুশিতে একদম গদগদ হয়ে গমগম করে বলে উঠল।
“আম্মু‚ আম্মু … উজান আমি বাবা হবো। উজান তোর মতো আমিও অবশেষে বাবা হতে চলেছি। আমার ফুলকন্যার পেটেও এখন আমাদের ভালোবাসার ফুটফুটে সন্তান বেড়ে উঠছে! আমি বাবা হবো…আই অ্যাম গোয়িং টু বি এ ফাদার।
কথাটা বলেই ইফাত আনন্দে উন্মাদের মতো পুরো ড্রয়িং রুম জুড়ে চক্কর কাটতে লাগল। হুট করে এমন এক খুশির খবর শুনে পুরো চৌধুরী বাড়ির সবাই আনন্দে মুখরিত হয়ে উঠল। ইমরোজা চৌধুরী‚ উজান‚ মৌ সবাই খুশিতে আত্মহারা হয়ে গেল। ইফাত খানিকক্ষণ ড্রয়িং রুমে নাচানাচি করে এসে ধপাস করে মায়ের সামনে সোজা হয়ে দাঁড়াল। কিন্তু ইমরোজা চৌধুরী ছেলে ইফাত’কে একপাশে ঠেলে সরিয়ে দিয়ে সোজা এগিয়ে গেলেন মেহেরে’র দিকে। তিনি অতি আদরে মেহেরে’র দুটো ফর্সা গালে চুমু খেয়ে তাকে বুকের মাঝে লেপ্টে জড়িয়ে ধরলেন।
মায়ের কাছ থেকে এমন অবহেলা পেয়ে ইফাত চোখ-মুখ বাঁকিয়ে ভ্রূ কুঁচকাল। একদম বাচ্চাদের মতো অভিমানী সুরে বলে উঠল…
“আম্মু! তুমি এখন আমাকে ফেলে সোজা গিয়ে নিজের প্রিয় বউমাকে জড়িয়ে ধরলে? ও কি একা একা তোমাকে দাদি বানাচ্ছে নাকি? এখানে কি আমার কোনো ভূমিকা নেই?
ইমরোজা চৌধুরী কোমরে দু-হাত গুঁজে রাগে কর্কশ কণ্ঠে গর্জে উঠলেন‚ “ঝাঁটার মার খেতে চাস নাকি এখন? নিজের বউকে তোর হিংসা হচ্ছে লজ্জা করে না তোর?
ইফাত তৎক্ষণাৎ দুই হাত তুলে আত্মসমর্পণের ভঙ্গিতে হেসে বলল‚ “আম্মু, না প্লিজ। বাবা হওয়ার বয়সে এসে আর অন্তত তোমার হাতের ঝাঁটার মার খেতে চাই না। তোমার যা ইচ্ছে হয় করো‚ আমি ভালো ছেলের মতো জাস্ট এক পাশে দাঁড়িয়ে দেখব।
ইফাতে’র এই কথায় ড্রয়িং রুম জুড়ে মুহূর্তেই একরাশ আনন্দের হাসির রোল পড়ে গেল। মৌ আর উজান একে অপরের দিকে তাকিয়ে মিষ্টি হাসলো।
মৌ নিজেও আর চুপ করে থাকতে পারল না‚ সে ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে মেহের’কে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। মেহেরে’র কানের একদম কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিসিয়ে দুষ্টুমির সুরে বলে উঠল।
”জানু তুই না কিছুদিন আগেই খুব ভাব নিয়ে বললি‚ এসব কিছু এত তাড়াতাড়ি হবে না। এখন কী হলো‚ হুম?? তলে তলে ঠিকই টেম্পু চালাচ্ছো আর আমরা বললেই হরতাল।
মৌ’য়ের এমন সরাসরি কথায় মেহের লজ্জায় একদম লাল হয়ে মাথা নিচু করে ফেলল। এই মৌ মেয়েটা যে ইদানীং তাকে লজ্জা দিতে একবিন্দু ছাড়ছে না। যখন-তখন শাশুড়ি আর ভাসুরদের সামনে চরম লজ্জায় ফেলে দেয়। মেহের নিজের লজ্জা ঢাকতে আড়ালে মৌ’য়ের নরম হাতে হালকা করে একটা চিমটি কাটল। আর মৌ তাতেই খিলখিল করে হেসে উঠল।
এদিকে ড্রয়িং রুমের হইচই আর আনন্দের মাঝে কিছুটা দূরে একাকী দাঁড়িয়ে নীরবে দু-চোখের জল ফেলছিল তুবা। সবাই নিজের মতো করে আনন্দে ভেসে গেলেও তুবা কোনো ভাবেই মন থেকে সম্পূর্ণ খুশি হতে পারছিল না। কারণ‚ সে মা হতে সম্পূর্ণ অক্ষম। বিয়ের অনেক বছর পেরিয়ে গেলেও যখন কোনো সন্তান হচ্ছিল না‚ তখন আরিয়ানে’র কাছে অনবরত জিদ ধরেছিল ডক্টরের কাছে যাওয়ার জন্য। কিন্তু আরিয়ান সবসময় হসপিটালের কথা শুনলেই সব দোষ নিজের কাঁধে চেপে নিয়ে এড়িয়ে যেত‚ বলত তার নিজেরই শারীরিক প্রবলেম আছে। তাই যাওয়ার দরকার নেই। কিন্তু তুবা তো নাছোড়বান্দা। আরিয়ানে’র ওপর অজস্র রাগ ঝেড়ে সে নিজেই একা একা হসপিটালে গিয়ে চেকআপ করিয়ে এসেছিল। আর তখনই জানতে পারে‚ সমস্যা আরিয়ানের নয় বরং গর্ভধারণে অক্ষম সে নিজে। আরিয়ান কেবল তুবা’কে মানসিক আঘাত থেকে বাঁচাতে পুরো দোষ নিজের ঘাড়ে নিয়েছিল।
সবার এই আনন্দের মাঝে তুবা আর এক সেকেন্ডও দাঁড়াল না‚ এক দৌড়ে সোজা ওপরের রুমের দিকে চলে গেল। তুবার হঠাৎ চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থমকে গেল সবাই। তারা আনন্দের অতিশয্যে ভুলেই গিয়েছিল যে নিজেদের অজান্তেই মেয়েটার মনে কতটা কষ্ট দিয়ে ফেলেছে। আরিয়ান সবার অপরাধবোধের চেহারা দেখে শান্ত গলায় বলল…
“তোমরা বসো‚ আমি দেখছি।
এই বলে আরিয়ান ধীর পায়ে ওপরের রুমে চলে গেল। রুমে ঢুকতেই সে দেখতে পেল তুবা বিছানায় বালিশে মুখ গুঁজে অঝোর ধারায় কাঁদছে। তার এই ব্যাকুল কান্নার শব্দে আরিয়ানে’র বুকটা যেন মোচড় দিয়ে উঠল। মেয়েটা হসপিটালের রিপোর্ট পেয়ে ভেঙে পড়বে জেনেই তো সে এতদিন সব মিথ্যা অপবাদ নিজের ওপর নিয়ে চুপ ছিল। আরিয়ান ধীরে ধীরে তুবা’র পাশে গিয়ে বসল। পাশে বসতেই তুবা আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না‚ আরিয়ান’কে বাহু শক্ত করে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল।
“তুবা প্লিজ কেঁদো না। তুমি কেন বোঝো না‚ আল্লাহ সবাইকে সবদিক দিয়ে পরিপূর্ণতা দেন না? তাছাড়া আমরা দুজন নিজেদের মতো করে এভাবেই তো অনেক হ্যাপি আছি‚ তাই না?
”কতদিন?? তুবা কান্নাজড়ানো গলায় চেঁচিয়ে উঠল।
“একদিন? এক মাস? এক বছর…নাকি পাঁচ বছর? তারপর ঠিকই তোমার মনে হবে আমি তোমার জীবনের এক বিশাল বোঝা। আমার কাছে কি তুমি সত্যি হ্যাপি‚ বলো?? তার চেয়ে আরিয়ান…প্লিজ তুমি অন্য একটা মেয়েকে বিয়ে করে। আমি কথা দিচ্ছি কিচ্ছু বলব না। আমি তোমাকে নিজ হাতে….
কথাটা শেষ করার আগেই আরিয়ান তুবার গালে পর পর দুটো থাপ্পড় বসিয়ে দিল। ত্যাগের কথা বলতে গিয়ে গাল দুটো লাল হয়ে উঠল তুবার। সে ছলছল চোখে একহাত গালে রেখে অবাক হয়ে তাকাল।
“ত ত ত তুমি আমাকে মারলে আরিয়ান?
“তো আর কী করব‚ বলো? তোমাকে আমি কতবার বোঝাব যে এই জীবনে আমার শুধু আর শুধু তোমাকেই চাই। আমার আর কোনো সন্তানের দরকার নেই। বাচ্চা হলেই যে সংসারে শুধু হ্যাপি থাকা যায়‚ তা কিন্তু একদম ভুল ধারণা। তাছাড়া ওই তো উজান আর ইফাতে’র ঘরে দুটো নতুন মেহমান আসছে। আমরা ওদের বাচ্চাদেরই নিজের সন্তানের মতো ভালোবেসে বুকে জড়িয়ে রাখব। ওরা কি নিশ্চয়ই আমাদের কাছ থেকে ওদের বাচ্চাদের দূরে সরিয়ে রাখবে? বল??
”ওরা আমাকে ধরতে দেবে ওদের বেবি? কোলে দেবে? এত আদর করতে দেবে আমাকে?
তুবা ফিসফিসিয়ে আকুল হয়ে জিজ্ঞেস করল। ঠিক তখনই দরজার কাছ থেকে গম্ভীর আওয়াজ ভেসে এলো—
“হ্যাঁ আমরা তো মহা-অমানুষ। আমরা কেন তোমাদের আমাদের বেবি ধরতে দেব? বেবি তো আর তোমাদের কিচ্ছু হয় না। আমরা এতটাই খারাপ যে তোমাদের আমাদের বেবি স্পর্শ পর্যন্ত করতে দেব না‚ বুঝেছো?
কথা গুলো বলতে বলতে রুমে ঢুকে পড়ল উজান। তার পেছনেই দাঁড়িয়ে আছে ইফাত আর মেহের। অন্তঃসত্ত্বা মৌ’কে তারা নিচে সোফায় বসিয়ে রেখে ওপরের চলে এসেছে। উজান আরিয়ানে’র সামনে গিয়ে সোজা দাঁড়িয়ে পড়তেই তুবা লজ্জা পেয়ে কিছুটা সরে দাঁড়াল‚ দ্রুত হাতের উল্টো পিঠে চোখের জল মুছে নিল। এরই মাঝে মেহের গম্ভীর মুখ করে বলে উঠল।
“ভাবি তুমি এতটা পর ভাবতে পারলে আমাদের? আমাদের বেবি আসা মানে তো সেটা তোমারও বেবি‚ তাই না? তোমার মনে কীভাবে এই বাজে ধারণা এলো যে আমরা আমাদের বেবি তোমার কোলে দেব না? এত নিচ আর পর ভাবো তুমি আমাদের?
তুবা লজ্জিত হয়ে তড়িঘড়ি বলল‚ “না না মেহের…আমি সত্যি ওভাবে বলতে চাইনি।
”থাক ভাবি‚ আর বানিয়ে বানিয়ে বলতে হবে না। শুধু মুখে মুখেই এতদিন বোন বোন বলে আসতে কিন্তু ভেতরে ভেতরে তো পর আর শত্রু ভেবে বসে আছ।
তুবা আর সইতে না পেরে ধেয়ে এসে মেহের’কে পরম আদরে বুকে জড়িয়ে ধরল। মেহের সঙ্গে সঙ্গে খুশিতে গদ গদ হলো। ঠিক তখনই উজান গাম্ভীর্য ভেঙে হেসে উঠে বলল….
“এবার কাজের কথায় আসি। শোনো ভাইয়া…বেবি আসছে ঠিক আছে কিন্তু তাই বলে ভেবে নিয়ো না যে সেই বেবি রাতে আমাদের কাছে থাকবে। রাতে বেবি তোমাদের কাছে থাকবে। কিভাবে সামলাবে তা তোমরাই জানো। কারণ আমি তো রাতে আমার পিচ্চির সাথে রোমান্স করব‚ আর তোমরা দুজন নিশ্চিন্তে বেবি সামলাবে ব্যস।
উজানে’র কথায় সবাই হো হো করে উচ্চস্বরে হেসে উঠল। ঠিক সেই মুহূর্তেই নিচের ড্রয়িং রুম থেকে ভেসে এলো মৌ’য়ের হৃদয়বিদারক আর্তচিৎকার—
”আল্লাহ গো…
প্রফেসর উজান চৌধুরী পর্ব ৬২
চিৎকারটা শোনা মাত্রই রুমের সবার হাসির শব্দ বাতাসের সাথে মিলিয়ে গেল। মুহূর্তে সবাই হুরমুড় করে রুম ছেড়ে সিড়ির দিকে দৌড়ে গেল। সিড়ির দোতলার কোণে এসে পৌঁছাতেই উজান একদম বরফ হয়ে থমকে দাঁড়িয়ে গেল। তার চোখের সামনে ঘোর অমানিশা নেমে এলো। নিচে মেঝেতে……
