মেজর কারদার পর্ব ৩৭
ফিনারা ঝুমুর
মধুলগ্নের শুভ সূচনা। কারদার বাড়ির মাঠে একে একে জ্বলে উঠেছে হাজারো রকমারি বাতি ও আলো। ঝলমলে আলোর বন্যায় রঙিন হয়ে ওঠা স্টেজজুড়ে এখন নানা বয়সের রমণীদের আনাগোনা ও কলকাকলি। স্টেজের মাঝখানে একখানা রকিং চেয়ারে বসে আছে কিঞ্জা, যার দুই নরম হাতে সুনিপুণ ভঙ্গিতে পরানো হচ্ছে মেহেদির গাঢ় আলপনা।
“আপু, মেহেদির ওপর কী নাম লিখব বলুন তো?”
মেহেদি আর্টিস্টের মিহি কথায় কিঞ্জা মায়াবী চোখ দুটি মেলে নিজের হাতের পানে তাকায়। মেয়েটি হাতের তালুতে ইতিমধ্যেই এক অপূর্ব বর-কনের প্রতিচ্ছবি এঁকে তুলেছে। কিঞ্জা সেই হাতের দিকে তাকিয়ে পরম তৃপ্তির এক চিলতে হাসি হাসল। তারপর মিষ্টি করে দুই চোখ মুদে বলে,
“শুধু ‘A + P’ লিখুন।”
মেহেদি আর্টিস্ট মেয়েটি একটু অবাক হয়ে ফের জিজ্ঞাসা করে,
“আরেকটু বড় করে কি ফুল নামটা লিখব না?”
“তালুর একপাশে একদম ছোট করে ‘প্রহর’ নামটা লিখে দিন।”
মেহেদি আর্টিস্ট তার মিষ্টি আবদার মোতাবেক অতি যত্ন নিয়ে বাকি কাজ সম্পূর্ণ করতে শুরু করে।
ওদিকে স্টেজের অন্য কোণে সোফায় বসে বেশ আনন্দে মেতে মেহেদি পরছে মেঘ, মিথিলা আর মিরা। রাহাতদের আড্ডার সাথে জমে উঠেছে তৃষ। শিউলি বেগমের ভাইয়ের অতি আদরের নাকী সুরের বেহায়া মেয়ে সূচিও এসেছে এই অনুষ্ঠানে, তবে সে সারাক্ষণ শিউলি বেগমের সাথে একদম চিপকে এক হয়ে গসিপে ব্যস্ত।
“কেমন আছো, মামি?”
হঠাৎ পাশ থেকে অচেনা এক পুরুষের গমগমে ও চেনা স্বরের ডাক শুনে কৌতূহল নিয়ে মাথা তুলে সামনে তাকায় মেঘ। দেখে সুপারসিডেড লম্বা শ্যামবর্ণের এক সুদর্শন যুবক চমৎকার একখানা হাসি মুখে মেখে চেয়ে আছে পিংকি বেগমের দিকে। ছেলেটার চোখ-মুখে এক অদ্ভুত প্রশান্তি ও তৃপ্তির ছোঁয়া!
পিংকি বেগম এই অপ্রত্যাশিত আগন্তুককে দেখামাত্রই যেন খুশিতে আটখানা হয়ে যান! অবিশ্বাস্য চোখে পলক ঝাপটে, একরাশ বিস্ময় ও আনন্দ কণ্ঠে ঢেলে দিয়ে চিৎকার করে প্রশ্ন করেন,
“প্রহর! তুই এসেছিস রে প্রহর?!”
পিংকি বেগমের চাপা চিৎকার শুনে স্টেজ ও মাঠের চারপাশের উপস্থিত সবাই কৌতূহল নিয়ে ওদিকে তাকায়। কিঞ্জার নজর মুহূর্তেই গিয়ে পড়ে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা গাঢ় সবুজ রঙের রাজকীয় পাঞ্জাবি পরিহিত প্রহরের ওপর! পাঞ্জাবির বুকের বাঁ পাশে সুনিপুণ সোনালী সুতার ঝকমকে কাজ করা।
পিংকি বেগমের এমন বিস্ময় ও অবিশ্বাস্য চোখের চাহনি দেখে মৃদু ও প্রশান্তির হাসি হাসে সেই শ্যামবর্ণ পুরুষ। পিংকি বেগমের মাথায় আদরের হাত রেখে প্রহর ধীরস্বরে প্রশ্ন করে,
“একবারে চমকে গেলে যে, মামি!”
“তুই সত্যি সত্যি এসেছিস, প্রহর? এতদিন পর অবশেষে তোর এই বুড়ো মামির কথা মনে পড়লো তবে?”
প্রহর হালকাভাবে এক চিলতে হাসে।ওদিকে প্রহরকে দেখে স্টেজ থেকে একে একে উৎসুক হয়ে নিচে নেমে আসে রাহাত, আদর আর মিথিলা। কেবল স্টেজে একা বসে রয় কিঞ্জা, যার দুই পাশে তখনও দাঁড়িয়ে মেঘ আর মিরা। কিঞ্জার অপলক মায়াবী চোখ জোড়া যেন স্থির হয়ে আটকে আছে প্রহরের সেই ব্যক্তিত্বময় অবয়বের দিকে।কিঞ্জার চোখের সেই আনমনা মুগ্ধতা খেয়াল করে মেঘ বেশ কৌতূহল নিয়ে সোজা প্রশ্ন করে,
“উনি কে, কিঞ্জাপু?”
প্রহরের দিক থেকে এক মুহূর্তের জন্যও চোখ না ফিরিয়ে কিঞ্জা ধীর কিন্তু গর্বিত গলায় উত্তর দেয়,
“আমার বড় ফুফাতো ভাই প্রহর ইবনাত। রিটায়ার্ড ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আ.খ.ম তোফাজ্জল হায়দারের বড় ছেলে আর ঢাকার ৬ ও ৭ নম্বর আসনের আসন্ন জাঁদরেল এমপি প্রার্থী!”
মেঘ এবার গোল গোল চোখে ড্যাবড্যাব করে চেয়ে থাকে কিঞ্জার পানে। শীর্ষর যে এক প্রভাবশালী ফুফু আর এমন দাপুটে ফুফাতো ভাই রয়েছে তা তো এতদিন ওর জানাই ছিল না!
“প্রহর ভাইয়া! তুই সত্যি এসেছিস?!”
রাহাত আর আদর প্রায় একই সাথে চোখ কপালে তুলে অতি আশ্চর্যের সঙ্গে চিৎকার হাঁকায়! ওদের দুজনেরই মুখ বিস্ময়ে একবারে হা হয়ে গেছে!ওদের এই হাঁ হয়ে থাকা রূপ দেখে প্রহর ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি ফুটিয়ে কৌতুকের সুরে শুধায়,
“কী রে গুলু-মুলু দল! তোরা কেমন আছিস, বল?”
“আমরা একদম বিন্দাস আছি, ভাই! তুই যে অবশেষে আসলি আজ চল চল, সোজা স্টেজে গিয়ে কনেকে দেখবি চল!”
রাহাত আর আদর মহা উৎসাহে প্রহরের দু-হাত ধরে প্রায় টেনে নিয়ে গিয়ে দাঁড় করায় স্টেজে বসে থাকা কনে কিঞ্জার সামনে। হাতজোড়া মেহেদিতে সাজানো, লাজুক ও আনত মুখে চুপচাপ বসে আছে কনে। প্রহর তার দিকে তাকিয়ে ঠোঁটের কোণে চমৎকার এক মুচকি হাসি ফুটিয়ে অভিবাদন জানায়,
“শাদী মোবারক, দুলহানিয়া!”
“আপকো ভি, প্রহর সাহেব!”
প্রহরের গাঢ় চোখ দুটোতে অপলক চোখ রেখে কিঞ্জা খুব কায়দা করে চটজলদি কথাটা ঘুরিয়ে উল্টো তার দিকেই ছুড়ে দেয়! কিঞ্জার এমন উপস্থিত বুদ্ধিসম্পন্ন জবাব শুনে প্রহর হালকা করে হেসে ফেলে। তার সাথে যেন হাসে ওর গভীর চোখ জোড়াও, আর চমৎকারভাবে টোল পড়ে ওঠে ডান গালে।
মেজর কারদার পর্ব ৩৬
“চল এবার এখান থেকে সরি, ভাই! এখানে এখন সব লেডিজদের জমকালো ডান্স পারফর্ম্যান্স শুরু হবে।”
প্রহরকে আর কথা বলার সুযোগ না দিয়ে রাহাত আর আদর ওকে সাথে নিয়ে স্টেজ থেকে কেটে পড়ে।আর ঠিক তখনই জমকালো মিউজিকের তালে তালে স্টেজের প্রদীপালোকে ধীরে ধীরে শুরু হয় মিরার একাকী ও চমৎকার এক একক নৃত্য!
