মেজর কারদার পর্ব ৩৬
ফিনারা ঝুমুর
মধ্যদুপুর পার হয়ে ধরা দিয়েছে সোনালী গোধূলি। আসমানে ছড়িয়ে পড়ছে মুগ্ধকর কমলা রঙের আভা। পশ্চিমাকাশে নিভু নিভু পদচলে হেলে পড়েছেন সূয্যি মামা; সারা দিনের অকোমল তেজটুকু যেন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশে বিভাজিত করে ছড়িয়ে দিচ্ছেন আকাশের ক্যানভাসে। এই মায়াবী কমলা আভার অমূল রহস্য হয়তো এটাই!
ব্যস্ত জনপদ ঢাকার কেন্দ্রস্থলে দাঁড়িয়ে থাকা দোতলা ডুপ্লেক্স বাড়িটার চারপাশজুড়ে মুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে ঝকঝকে মরিচ বাতি। বিশাল বড় গেটের জমকালো আয়োজন ও সাজসজ্জা যেন দূর থেকে হলফ করে বলে দিচ্ছে‘ইহা একটি বিবাহযোগ্য গৃহ!’
এদিকে কারদার বাড়ির প্রাঙ্গণে চলছে আরেক হইচই আর আনন্দের ঘনঘটা। বিশালাকার মাঠের এক পাশে নিপুণ হাতে সাজানো হয়েছে আজ সন্ধ্যার ‘সঙ্গীত’ এর মূল স্টেজ। স্টেজের সামনে সারিবদ্ধভাবে সাজিয়ে বাঁধাই করা হয়েছে শতাধিক প্লাস্টিকের চেয়ার। পুরো স্টেজটা সুবিন্যস্তভাবে সাজানো হয়েছে নানা রঙের কৃত্রিম অর্কিড, লাল-সাদা গোলাপসহ আরও রকমারি বাহারি পুষ্পে। স্টেজের এক কোণে রাখা আছে সাউন্ড সিস্টেম ও মিউজিক বক্স।
ছাদের কার্নিশে দাঁড়িয়ে নিচের এই তড়িঘড়ি আর ব্যস্ততার সবটুকু গভীর মনোযোগ দিয়ে পর্যবেক্ষণ করছে মেঘ। তার এক হাতে মৃদু ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপ। চায়ে এক চুমুক দিয়ে অন্য হাতে ধরা হুমায়ুন আহমেদের বইয়ের পাতায় চোখ বুলায় সে। হঠাৎ পাতার মাঝামাঝি থাকা হৃদয়স্পর্শী একখানা অদ্ভুত সুন্দর উক্তির ওপর গিয়ে আটকে যায় তার দৃষ্টি। লাইনটা যেন সোজা গিয়ে আঘাত করে তার বুকের গহীনে। মুগ্ধ হয়ে সেই বিশেষ লাইনটি কয়েক বার গুনগুন করে বিড়বিড় করে উঠল মেঘ।
আনমনে নিজের নরম ঠোঁটের ওপর আলতো করে হাত বুলায় মেঘ। ঠোঁটের ঠিক মাঝখানটায় এসে থমকে যায় তার আঙুল। স্পষ্ট অনুভব করে রাতের সেই শেষ প্রহরটির মাতাল করা রহস্যময়তা। তার অবচেতন মনের একাংশ বারবার সতর্ক করে জানিয়ে দিচ্ছে ওষ্ঠের ওপর পাওয়া সেই সতেজ ও তীব্র স্পর্শটা কাল্পনিক নয়, এক পরম সত্য! শীর্ষ স্বশরীরে এসে উদিত হয়েছিল তার সম্মুখে, ঘট দিয়েছিল দুই জোড়া ব্যাকুল ঠোঁটের গভীর মিলন।
কিন্তু অন্য অবচেতন মন আবার উল্টো ধ্বনি তুলে সতর্ক করছে সবই তো মেঘের অবচেতন ঘোর, কেবলই এক নিছক স্বপ্নের অরাজকতা! শীর্ষ তো বাস্তবে আসেইনি। দুটো বিপরীত অনুভূতির দোলাচলে পড়ে পুরোপুরি এক গোলকধাঁধায় আটকে যায় মেঘ।
অথচ সেই ওষ্ঠের মিলনের শেষ মুহূর্তে মেঘের ঘুমটা যখন হালকা হয়ে আসছিল, পুরো ঘরজুড়ে স্পষ্ট সুবাসিত হচ্ছিল শীর্ষের গায়ের পরিচিত গন্ধ! তার ব্যবহৃত সেই সিগনেচার ট্যাবেস্কোর পারফিউমের মাতাল করা ঘ্রাণ ঘরের এপাশ থেকে ওপাশে ভেসে বেড়াচ্ছিল।
“উনি কি সত্যিই এসেছিলেন? কিন্তু — উনি এসে থাকলে তো অন্তত আমায় ঘুম থেকে ডেকে তুলে জানাতেন!”
মেঘ ভেবে কুল পায় না সবই কি তবে তার তীব্র বিরহের তীব্র ভ্রম? নিজের ভাবনার এক গভীর জগতে হারিয়ে ফেলে নিজেকে। হাতে থাকা চায়ের কাপে ছোট ছোট চুমুক বসায় সে। তার ঘন কালো চুলে আজ নিপুণভাবে একটা লম্বা বেণি গাঁথা, আর সেই বেণিতে গাঁথা থোকা থোকা ধবধবে সাদা জুঁই ফুল। প্রতিটি স্তরে সুবাস ছড়ানো সেই পুষ্পসজ্জিত বেণিটা অবহেলায় ফেলে রাখা হয়েছে তার এক কাঁধের ওপর।
সূর্যের ডুবে যাওয়ার মায়াবী দৃশ্য পর্যবেক্ষণ করতে করতে চায়ের কাপে শেষ চুমুকটা দিতে গিয়ে থমকে যায় মেঘ। দেখে কাপে তো এক ফোটাও চা নেই! কিন্তু এই অষ্টাদশীর স্পষ্ট মনে আছে কাপে কিছুটা চা তো অবশিষ্ট ছিলই! তবে কই গেল সেই চা?
“আজ কিন্তু আপনাকে যেকোনো মূল্যে আমার এই সঙ্গীতে আসতেই হচ্ছে!”
হঠাৎ ছাদের ওপাশ থেকে কিঞ্জার চরম রাগান্বিত ও কড়া স্বর ভেসে আসে। বোঝা যাচ্ছে সে ফোনের ওপারে থাকা কারও ওপর বেশ চোটপাট চালাচ্ছে। কিঞ্জার সেই রাগান্বিত মুখশ্রী দেখেই মেঘের মানসপটে নিমেষে ভেসে ওঠে শীর্ষর রাগী চেহারাটা।
“হুঁহ! ভাই-বোন দুটোই একেবারে এক ছাঁচে ঢালা! খালি রাগ আর রাগ, চোটপাট দেখানো ছাড়া জীবনে আর কিচ্ছু শেখে নাই!”
মনে মনে এমন ভেংচি কেটে মেঘ ছাদের ওপাশ থেকে কিছুটা সরে যায়।ওদিকে ওপাশে কিঞ্জাকে উদ্দেশ করে ফোনে আগন্তুক ব্যক্তিটি ঠিক কী বলছে, তা স্পষ্ট শোনা যায় না। তবে ঘুমানো সিংহিনীর মতো চাপা গর্জন করে ওঠে কিঞ্জা,
“আপনাকে খুব ভালো করেই শেষবারের মতো বলছি, প্রহর! আমায় অহেতুক খেপাবেন না একদম! যা বলব, চুপচাপ সেটাই শুনবেন। আজ অনুষ্ঠানে আসবেন মানে আপনাকে আসতেই হবে!”
ওপাশ থেকে এবার স্পষ্ট ভেসে আসে প্রহর নামের সেই পুরুষের বেশ ভারী ও গম্ভীর গলা,
“তুমি কিন্তু আমার ঘরের বিবাহিত বউ নও! তাই তোমার অযৌক্তিক কথা বা হুকুম শুনতে আমি বিন্দুমাত্র বাধ্য নই, কিঞ্জা!”
“বউ হতে আর কতক্ষণ, প্রহর? তাই চটজলদি চলে আসুন! আর যদি না আসেন, তবে আপনার এই মাথাগরম কিঞ্জা আপনার সাথে কী করতে পারে তা কিন্তু আপনার চেয়ে ভালো আর দ্বিতীয় কেউ জানে না!”
কথাটা শুনে ওপাশ থেকে প্রহরেরও এক তীব্র চাপা গর্জন ভেসে আসে,
“অন্যের হবু স্ত্রী হয়ে একটা পরপুরুষকে এভাবে একঘেয়ে উত্ত্যক্ত করতে আপনার একটুও লজ্জা করছে না, কিঞ্জা?”
প্রহরের এই ঝাঁঝালো কথা শুনে পাওয়ারি চশমায় বদ্ধ কিঞ্জার ধারালো দুটি চোখ যেন চকচক করে হেসে ওঠে! শরতের অস্তগামী সূর্যের নরম আলো চোখের চশমায় মাখিয়ে বিজয়ী ভঙ্গিতে উত্তর দেয় কিঞ্জা,
“প্রেমিক পুরুষ যদি বড্ড বেশি লাজুক আর গম্ভীর হয়, তবে তার প্রেমিকাকে যে একটু লজ্জাহীনা আর বেপরোয়া হতেই হয়, প্রহর! আর আপনি তো স্রেফ কোনো পরপুরুষ নন আপনি যে আমার সেই একমাত্র একগুঁয়ে প্রেমিক! বুঝলেন, প্রহর?”
কিঞ্জা ধপ করে ফোনটা কেটে পকেটে রেখে দেয়। পা বাড়িয়ে একপ্রকার গটগট করে নেমে পড়ে ছাদ থেকে।
নিচে নেমে বসার ঘর পার হতেই তার তীক্ষ্ণ নজর গিয়ে পড়ে রান্নাঘরের দিকে। সেখানে গিয়ে সে দেখে পড়ন্ত বিকেলে এক মনে আটার খামির মাখছে মেঘ!
“তুমি এখানে এখন কী করছো, মেঘ?”
আচমকা পেছনে কিঞ্জার গমগমে স্বর শুনে ভীষণ চমকে ওঠে মেঘ! আটা মাখা দুটি হাত নিয়েই তড়িঘড়ি করে পেছন ঘুরে তাকায় সে। সামনে কিঞ্জাকে দেখে আমতা আমতা করে একগাল হেসে বলে,
“এই তো রুটির জন্য আটার খামির মাখছি, কিঞ্জাপু!”
কিঞ্জা এক নজর রান্নাঘরের চারপাশের দিকে তাকায়। তারপর কড়া আর চাপা রাগে ফুঁসে উঠে বলে,
“খানিক পর আমার সঙ্গীত আর বিয়ের অনুষ্ঠান শুরু হবে, আর তুমি এই সময়ে সেজেগুজে রেডি না হয়ে রান্নাঘরে ঢুকে এসব ছাইপাশ কেন করছো, হ্যাঁ? কে করতে বলেছে তোমাকে এসব?”
কিঞ্জার এমন হঠাৎ চটে যাওয়া আর রাগী গলা শুনে একেবারে থতমত খেয়ে যায় মেঘ। কিঞ্জার চশমার পেছনের বাদামী চোখ জোড়া যেন রাগে একদম লাল হয়ে উঠেছে, নাকের পাটাদুটো ক্ষোভে ফুলছে! ভয়ে ঢোক গিলে মনে মনে নিজের অবচেতন মনকে প্রশ্ন করে মেঘ,
“এবার আমি কী বলব? সোজা আন্টির নাম বলে দেব? আন্টি আমায় এসব করতে বলেছেন এ কথা হুট করে বললে তো এখন পুরো বাড়িতে আগুন লেগে যাবে! মেঘ, তুইই বল এখন কী বলবি?”
“কী হলো? থমকে গিয়ে চুপ করে আছ কেন? কথা বলছ না কেন, মেঘ?”
প্রচণ্ড বিরক্তি নিয়ে উচ্চস্বরে চেঁচিয়ে ওঠে কিঞ্জা। এই মুহূর্তে মেঘের এমন অপরাধীর মতো নীরবতা ওর একদমই সহ্য হচ্ছে না। মেঘ হাতভর্তি আটা নিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে। তারপর তোতলে গিয়ে খুব মিনমিন করে উত্তর দেয়,
“আ — আন্টি রান্নাঘরে একা একা অনেক কাজ করছিলেন তো, তাই ভাবলাম আমি একটু হাত চালিয়ে সাহায্য করি”
“মা! ও মা!”
মেঘের মুখ থেকে এই কথাটুকু শোনা মাত্রই গলা চড়িয়ে শিউলি বেগমকে হাঁকডাক ছাড়তে শুরু করে কিঞ্জা! রাগ ওর রন্ধ্রে রন্ধ্রে রক্তে যেন দ্বিগুণ গতিতে ছড়িয়ে পড়ছে। কিঞ্জার এমন বিকট চিৎকার আর ডাকাডাকি শুনে বাড়ির সকলেই তড়িঘড়ি করে রান্নাঘরের সামনে এসে থমকে দাঁড়ায়।
“কী হয়েছে রে বু? এত চেঁচাচ্ছিস কেন?”
বড় মা জোবায়েদা খাতুনের উদ্বিগ্ন ও চিন্তিত গলা শুনেও কিঞ্জা সেদিকে বিন্দুমাত্র পাত্তা দেয় না। তার অগ্নিদৃষ্টি তখন দরজায় এসে দাঁড়ানো শিউলি বেগমের দিকে। সোজা মায়ের চোখে চোখ রেখে প্রশ্ন করে,
“মেঘকে তুমি এই সময়ে রান্নাঘরে কাজ করতে ঢোকালে কেন, মা?”
শিউলি বেগম আড়চোখে একবার ভয়ার্ত মেঘের দিকে তাকান। তারপর চরম বিরক্তি আর খোঁচা মারা গলায় ঠাণ্ডা মাথায় বলেন,
“কেন? বাড়ির বউ হয়ে ঘরের কাজ করবে না তো কি নবাবজাদীর মতো বসে বসে খালি রূপচর্চা করবে, নাকি?”
“তুমি ওকে মন থেকে সত্যিই বউ বলে মানো, মা?”
কিঞ্জার এই ধারালো প্রশ্ন শুনে শিউলি বেগম চকিতে মেয়ের দিকে তাকান। কিঞ্জা যে এখন প্রচন্ড রেগে আছে, তার চোখমুখই বলে দিচ্ছে।
“যাকে তুমি মন থেকে বউ বলে মানতেই পারো না, তাকে দিয়ে বাড়ির কাজের লোকের মতো খাটানোর সাহস পাও কোন জোরে? ভাইয়া কি ওকে এই বাড়িতে কাজ করার জন্য এনেছে?”
“প্লিয আন্টিকে বকো না, কিঞ্জাপু! আন্টি তো আমায় সত্যি কিছু করতে বলেননি আমিই সেচে— ”
কিঞ্জার কড়া কথার মাঝে মেঘ আলতো করে কথাটা বলতে গেলেই কিঞ্জা সঙ্গে সঙ্গে সিংহীর মতো গর্জে ওঠে,
“এই মেয়ে, একদম চুপ! তোমাকে কেউ এখানে কথা বলতে বলেছে? যাচ্ছ এখান থেকে? সোজা নিজের ঘরে গিয়ে রেডি হও! আর এর পর থেকে বড়দের কথার মাঝখানে টপ করে একবারও কথা বললে চড়িয়ে সবকটা দাঁত একদম হাতে তুলে দেব!”
কিঞ্জার এমন রণচণ্ডী রূপ আর কড়া ধমক খেয়ে মেঘ আর এক মুহূর্তও না দাঁড়িয়ে বিড়ালের মতো সুরসুর করে সিঁড়ি দিয়ে ওপরে নিজের ঘরের দিকে পালিয়ে যায়।
দূর থেকে পুরো তামাশাটা দাঁড়িয়ে পর্যবেক্ষণ করছিল নোমান। মনে মনে ভাবে ভাই-বোন দুটো সত্যিই একদম এক ছাঁচে ঢালা! কাউকেই বিন্দুমাত্র ছাড় দেয় না। হয়তো ঠিক এই কারণেই মেঘের সুরক্ষার কথা ভেবে ওকে এই কারদার বাড়িতে এনে রেখেছিল নোমান।শিউলি বেগম এবার গজগজ করে মুখ বাঁকিয়ে বলেন,
“কেন? আমরা বুঝি এই সংসারে কোনো কাজকাম করি না? খালি ও একাই খাটে?”
পাশ থেকে এবার রাহাত মায়ের দিকে তাকিয়ে শান্ত কিন্তু কঠিন কণ্ঠে বলে ওঠে,
“ভালোবেসে নিজের ইচ্ছেয় কাজ করা আর মনের ভেতর ঘৃণা পুষে রেখে কাউকে বাধ্য করে কাজ করানো কিন্তু এক জিনিস না, মা! কিঞ্জা বা মিথুকে কি তুমি কখনো এভাবে শাড়ির আঁচল গুঁজে কাজ করতে দাও? তাহলে মেঘ ভাবির বেলায় বারবার কেন তোমার এমন রূপ বের হয়ে আসে, বলো তো?”
ছেলের মুখে এমন কড়া প্রতিবাদ শুনে শিউলি বেগমের পিত্তি জ্বলে যায়। চোখ-মুখ খিঁচিয়ে ঝাঁঝালো গলায় বলে ওঠেন,
“ঐ কালনাগিনী রূপসী তোদের দুই ভাই-বোনকে কী জাদু-টোনা যে করেছে! দাঁড়াও, আজ ওই মেয়ের একটা হেস্তনেস্ত আমি করে ছাড়ব!”
কথাটা শেষ করেই শিউলি বেগম রাগে গটগট করে নিজের ঘরের দিকে হনহন করে হেঁটে চলে যান। আর রান্নাঘরের সামনে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে বাকি সবাই!
দর্পণের সামনে দাঁড়িয়ে একই সাথে সেজেগুজে তৈরি হচ্ছে মেঘ আর মিথিলা।মেঘের পরনে চমৎকার একখানা পেস্টেল ব্লু রঙের রেডি-টু-ওয়্যার শাড়ি। শাড়ির হালকা ও স্নিগ্ধ রঙে ওকে আজ সত্যি বড্ড রূপসী ও মানানসই লাগছে! ঠোঁট দুটোকে রাঙিয়ে নিয়েছে মনকাড়া ডাস্টি মেভ লিপস্টিক দিয়ে। ঘন চুলগুলোর একদম নিচের দিকের কিছুটা অংশ হালকা কার্ল করে উন্মুক্ত ছেড়ে রেখেছে সে। দুই হাতে জ্বলজ্বল করছে ডায়মন্ড কাটের একজোড়া আভিজাত্যপূর্ণ চুড়ি, আর কপালে মানিয়ে বসেছে সিম্পল স্টোনের ছোট্ট একটি টিপ।
ওর ঠিক পাশেই দাঁড়িয়ে পাল্লা দিয়ে রেডি হচ্ছে মিথিলা। ওর পরনেও একই ঢঙের রেডি-টু-ওয়্যার শাড়ি, তবে সেটির রঙ অভিজাত ক্রিম। নিজের ওষ্ঠদ্বয়কে সে রাঙিয়ে তুলেছে প্রাণবন্ত কোরাল পিচ শেডের সাহায্যে। একদম মেঘের স্টাইল অনুকরণ করেই মিথিলা নিজেও চুলে সেইম কার্ল হেয়ারস্টাইল করেছে, হাতে চুড়ি আর কপালে ম্যাচিং টিপও পরেছে হুবহু এক! সাজগোজ শেষে গায়ে চটজলদি মেয়েলি ভ্যানিলা ফ্লেভারের ‘ওয়াট্টাগার্ল’ পারফিউমের সুবাস মাখিয়ে ড্রেসিং রুম থেকে বের হয় দুজন। ওদিকে অন্য পাশের ঘরে নিজের মতো করে সাজতে ব্যস্ত কিঞ্জা।
রুমের দরজা ঠেলে করিডোরে পা রাখতেই সোজা মুখোমুখি হয়ে যায় আদরের সাথে রাহাত! মেঘ আর মিথিলার এমন জমকালো ও নজরকাড়া রূপ দেখে দুজনই একেবারে চমকে গিয়ে মাথায় হাত দিয়ে দাঁতে জিব কাটে! আদর ড্রামাটিক ভঙ্গিতে বলে ওঠে,
“আই লাল্লা — ভাবিসাব! আপনারে তো পুরাই আসমানের হুরপরী লাগতাসে! আয় হায় –আইজ অনুষ্ঠান প্রাঙ্গণে আপনার উপ্পরে কয়ডা পোলা যে নতুন কইরা ক্রাশ খাইবো, কে জানে! আহায়ায়াহ!”
মেঘ নিজের শাড়ির আঁচলের কোণা আঙুলে পেঁচিয়ে একটু দুষ্টুমি করে শুধায়,
“ক্যান দেওরা সাহেব? তা আপনেরা কি ক্রাশ খাইসেন নি, হ্যঁ?”
“ছি ছি, ছি ভাবিসাব! এসব কিতা কন? আপনের জাঁদরেল জামাই মেজর সাব জানতে পারলে তো পিডাইয়া সোজা অর্জুন গাছে ঝুলাইয়া রাখবো! আমাদের থেইকা মাফ করেন!”
মেজর কারদার পর্ব ৩৫
কথাটা বলেই আদর দুই কানে আড়াআড়ি করে হাত রেখে তওবা করার ভঙ্গি করে। ওদের এমন কাণ্ড দেখে মেঘ আর মিথিলা একসাথে খিলখিল করে হেসে গড়িয়ে পড়ে।
করিডোরের বেশ খানিকটা দূর থেকে নিজের মনের প্রেয়সী মিথিলার সেই প্রাণখোলা অপূর্ব হাসি দেখে বুক পকেটে হাত দিয়ে বুকটা চেপে ধরে নোমান। এক গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিড়বিড় করে স্বগতোক্তি করে,
“এই মেয়ের হাসির ধারেই তো আমি শেষ! কবে জানি এই মেয়ে আমায় না মাইরাই ফেলে উফফ, আমার বিয়েটা যে কেন দেয় না আব্বা-আম্মা!”
