Home মেজর কারদার মেজর কারদার পর্ব ৩৭ (২)

মেজর কারদার পর্ব ৩৭ (২)

মেজর কারদার পর্ব ৩৭ (২)
ফিনারা ঝুমুর

স্টেজে তখন চলেছে এক অপূর্ব ও চমৎকার দৃশ্যায়ন! দুই জোড়া তরুণ-তরুণী—মিথিলা ও আদর এবং মেঘ ও রাহাত তাল মিলিয়ে যুগল নৃত্যে মেতে উঠেছে। সেখানে উপস্থিত সকলের চক্ষু ও মনের পরম প্রশান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে এই চটপটে চারজন। বলিউড তারকা সালমান খান ও সুস্মিতা সেনের বিখ্যাত ‘চুনারি চুনারি’ গানের উন্মাদ তালে অনবদ্য ও নান্দনিক নৃত্য পরিবেশন করে চলেছে তারা।
​স্টেজের কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে থাকা নোমান, তৃষ আর মিরা চিৎকার করে ক্রমাগত চিয়ার-আপ করে চলেছে ওদের।

​“আমাদের মেঘভাবি কত সুন্দর ডান্স জানে দেখছিস? তোর থেকেও কত ভালো নাচ করতে পারে!”
​মিরাকে ঠেস মেরে কথাটা বলে ওঠে তৃষ। তৃষের খোঁচায় মিরার নাকের পাটা রাগে সাথে সাথে ফুলে ওঠে। লোকসমাগম ভুলেই ধুম করে এক তীব্র কিল বসিয়ে দেয় তৃষের পিঠে!
​“একদম চুপ কর তুই, পচা আলুর বস্তা!”
​পিঠে আচমকা কিলের চোটে ব্যথায় কঁকিয়ে ওঠে তৃষ। চোখ দুটো গরম করে পাল্টা হুমকি দিয়ে বলে
​“তুই নিজে আগে চুপ কর, মোটা জলহস্তী কোথাকার!”
​তবে এই দুই ভাই-বোনের নিত্যদিনের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার দিকে নোমানের বিন্দুমাত্র খেয়াল নেই। ওর পুরো মন, মগজ আর আকুল চোখ আটকে রয়েছে মিথিলার দিকে। নাচতে নাচতে মেয়েটা কেমন অবলীলায় গিয়ে আদরের কোলে উঠে গেল! দৃশ্যটা দেখে পলকে চোয়াল শক্ত হয়ে আসে নোমানের। দাঁতে দাঁত চেপে বিড়বিড় করে,

​“শালা আদর— শীর্ষর আপন ছোট ভাই দেখে তুই আজকের মতো বেঁচে যাচ্ছিস!”
সাঙ্গীতের অনুষ্ঠানে স্টেজে নৃত্য করে চলেছে শ্যামাঙ্গিনী। নৃত্যের তালে তালে দুলছে উন্মুক্ত কুন্তল। কাজলটানা হরিণী আখিঁ এদিক-ওদিক ঘুরছে।
স্টেজ হতে বেশকতক দূরে শ্যামাঙ্গিনী মেঘের আদল পানে এক দৃষ্টিতে চেয়ে আছে একপুরুষ। দৃষ্টিতে ধাঁধা, অবিশ্বাস আর কিছু মেলানোর ব্যর্থ প্রয়াস।মিল-অমিলের মধ্যিক্ষণে আগত আগন্তুকের মুখ হতে নির্গত হয় অতিপরিচিত ও ঘৃণ্য চিহ্ননাম,
“মোছা. শারমিন সুলতানা!”

এত কোলাহল ও আনন্দের মাঝে শ্যামাঙ্গিনী মেঘের এই নজরকাড়া নাচের দিকে অপলক চেয়ে রয়েছে আরও অগুনতি জোড়া কৌতূহলী আঁখি। কারদার বাড়ির এই অনুষ্ঠানে আজ নিমন্ত্রিত হয়ে উপস্থিত হয়েছেন শহরের বহু গুণী ও প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব। যাদের মাঝে রাজকীয়ভাবে বসে আছেন স্বয়ং খাদ্যমন্ত্রী নিজাম উদ্দিন এবং ওনার সুযোগ্য পুত্র তানভির ইভান, খান গ্রুপ ও কোম্পানির মালিক খালেক মৃধা ও তার পুরো পরিবার। পাশে অবশ্য বসে আছেন তার পুত্র শাহরিয়ার আদিত্য এবং নামকরা ‘প্রত্যুষ এনজিও’র কর্ণধার চঞ্চল সাদাফ। এছাড়াও বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত হয়েছেন কিঞ্জার ঢাকা মেডিকেল কলেজের শ্রদ্ধেয় শিক্ষকবৃন্দ, যাদেরই একজন হলেন স্বনামধন্য ডক্টর ফায়াজ তানজিম। যিনি একাধারে একজন সফল চিকিৎসক এবং কিঞ্জাদের ক্লাসের জনপ্রিয় লেকচারার!
সূচি হিংসাত্মক চোখে স্টেজে নাচতে থাকা মেঘের দিকে চেয়ে থাকে। বিষাক্ত চাহনি আর সহ্য করতে না পেরে নিজের পাশে বসে থাকা শিউলি বেগমের একদম কানে কানে ফিসফিস করে বলে,

​“অ্যাই, ওই হাবা মেয়েটাকে বাড়ি থেকে কবে তাড়াবে, বলো তো?”
​“আহা, তাড়াব বললেই তো আর তাড়ানো যায় না! সময় হতে দে”
​সূচি আরও অস্থির হয়ে ওঠে। পায়ের ওপর পা দুলিয়ে চরম অধৈর্য নিয়ে আবার বলে,
​“আর কতদিন অপেক্ষা করব, ফুফি? কবে আমায় ওই শীর্ষর বউ করে ঘরে তুলবে, বলো না?”
​শিউলি বেগম স্নেহের ছলে সূচির মাথায় আলতো হাত বুলিয়ে কুটিল হেসে বলেন,
​“খুব শীঘ্রই এই অনাত্মীয় মেয়েটাকে লাথি মেরে তাড়িয়ে তোকে আমি আমার শীর্ষর একমাত্র বউ বানাব, দেখে নিস তুই!”
​ওদের এই বিষাক্ত কূটনামি আর ষড়যন্ত্রের মাঝেই শেষ হয় স্টেজে চলতে থাকা জমকালো নৃত্য। আর শেষ মিউজিকের সাথে সাথেই পুরো স্টেজ এক নিমেষে ঘুটঘুটে অন্ধকার হয়ে যায়!

​“এ কী হলো আবার? স্টেজের সব বাতি আলো কোথায় গেল হঠাৎ?”
​উপস্থিত অতিথিদের ভিড় থেকে সকলে অবাক হয়ে হৈ-হৈ করে ওঠে। কিন্তু সবাইকে চরম অবাক করে দিয়ে ঠিক সেই নিস্তব্ধ অন্ধকার স্টেজে হঠাৎ বেজে ওঠে একখানা স্প্যানিশ গিটারের ঝংকার তোলা মিষ্টি সুর! ধীরে ধীরে ধোঁয়াটে আবহে আবছা আলোতে ফুটে ওঠে পুরো স্টেজ। গিটারের তারে নিপুণ আঙুল চালিয়ে ভেসে আসে এক গভীর ও অদ্ভুত সুরেলা মায়াবী কণ্ঠ,

​“এমনও নিদানের দিনে বিনীত প্রার্থনা গো,
লক্ষ্য-কোটি ভুল আর ত্রুটি করিও মার্জনা গো,
শোনাইবো তোমারে আজ করেছি বাসনা গো,
ঐরাবতের হৃদয় হতে ক্ষুদ্র এ রচনা
আমি কি করিব? কোথায় যাব?
কোন সাধনে পাব গো?
​আর একটি বার তোমারই দর্শন…
আর একটি বার তোমারই দর্শন…
কোন বাধনে বাধি?
​আমি কেমনে তোমায় রাখি গো?
তুমি ছাড়া হৃদয় অচেতন…
তুমি ছাড়া হৃদয় অচেতন…
তুমি ছাড়া তুমি ছাড়া…
তুমি ছাড়া তুমি ছাড়া…
তুমি ছাড়া তুমি ছাড়া…
তুমি ছাড়া হৃদয় এ…
তুমি ছাড়া হৃদয় অচেতন—!”

​সেই অস্পষ্ট মানবমূর্তির অলৌকিক ও পুরুষালি ব্যাকুল কণ্ঠের গানে পুরো প্রাঙ্গণের সব মানুষ একমুহূর্তে একদম বিমোহিত হয়ে যায়! সবার মনের ভেতর কেবল একটাই ভাবনা কে গাইছে এই গান? কার গানের গলা এত সুন্দর, এত মায়াবী আর জীবন দিয়ে গাওয়া প্রাণবন্ত? যখন আমন্ত্রিত অতিথি আর পরিবারের সবাই হা হয়ে কেবল গান শুনছে, ঠিক তখনই একমাত্র নোমান আর প্রহর এক পলকেই চিনে ফেলে এই গম্ভীর গলার আসল মালিককে!
​আবছায়া আলোর মানবদেহের অবয়বটা সম্পূর্ণ স্পষ্ট হওয়ার আগেই, অন্ধকার স্টেজ ডিঙিয়ে হুট করে এক ব্যাকুল রূপসী গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে তার সেই চওড়া সুঠাম বুকের মাঝে! চারপাশ থমকে যায়। অন্ধকার ঘরে হালকা ফোঁপানির শব্দ শোনা যায়। তারপরই সেই মেয়ের কাঁপাকাঁপা ভাঙা গলায় ভেসে আসে এক আর্তনাদ,
​“মেজর সাহেব!”

​শীর্ষ একহাতে গিটারটা সরিয়ে অন্য হাত দিয়ে শক্ত করে নিজের বুকের মাঝে খামচে ধরে মেঘকে। মেয়েটার উন্মুক্ত কেশে গাঁথা থোকা থোকা গোলাপ আর সুবাসিত চুলের ভাঁজে নিজের ওষ্ঠ ডুবিয়ে দিয়ে গভীর অনুরাগে চুম্বন এঁকে দেয়! পরম আশ্রয়ে নিজেকে উজাড় করে দিয়ে আগলে নেয় মেঘের কাঁপতে থাকা তনুমন,
​“মাই ব্ল্যাক ব্যাট!মাই ফ্লাওয়ার!”
শীর্ষর চেনা ও আকুল সুবাসটুকু ব্যাকুল হয়ে গ্রহণ করে মেঘ। ঠিক তখনই হঠাৎ কোনো আগাম বার্তা ছাড়াই দপ করে জ্বলে ওঠে স্টেজের সবকটি জমকালো লাইট! এক মুহূর্তেই সেখানে উপস্থিত শত শত মানুষের চোখে ধরা পড়ে স্টেজজুড়ে আলিঙ্গনরত এই কপোত-কপোতী। বাহ্যিক পৃথিবীর সমস্ত কোলাহল ভুলে নিবিড়ভাবে নিজেদের ভালোবাসার মাঝে মত্ত হয়ে আছে তারা দুজন।
​তবে চারপাশ থেকে ভেসে আসা অজস্র অবাক আর বিস্ময় ভরা গলার আওয়াজে অবশেষে ওদের দুজনের মধুর ধ্যান ভঙ্গ হয়,

​“ভাইয়া!”
​উপস্থিত সবার ভিড়ে নিজের ছোট বোন কিঞ্জার হতবিহ্বল ও আনন্দাশ্রু ভরা আননের পানে চেয়ে পরম তৃপ্তির এক চিলতে মিষ্টি হাসি হাসল শীর্ষ। মেঘকে বুক থেকে আলতো করে ছাড়িয়ে নিয়ে পরম মায়ায় কিঞ্জার দিকে তাকায়। ধবধবে সাদা লেহেঙ্গার সাথে সবুজ রঙা দোপাট্টাটা চমৎকারভাবে শাড়ির মতো জড়িয়ে কনে সেজেছে মেয়েটি। শীর্ষর মনে হলো—ওর অবাধ্য ছোট বোনটা যেন সত্যি সত্যিই আজ বড্ড বড় হয়ে গেল!
​“তুমি যে আজ হুট করে এভাবে চলে আসবে, আমাকে একবারও আগে থেকে বলোনি তো!”
​শীর্ষর বাড়িয়ে দেওয়া দু-হাত আর শক্ত সুঠাম বুকের মাঝে ডানাভাঙা পাখির মতো ছুটে গিয়ে আছড়ে পড়ে কিঞ্জা। অবাধ্য বিড়ালছানার মতো আপন ভাইয়ের বুকের উষ্ণতায় মুখ লুকিয়ে ধরে রাখে, পরম শান্তিতে ওম নেয়। কান্নায় ভিজে আসা গলায় ভাইকে শুধায় সে।

​“আমার নিজের কলিজার টুকরো ছোট বোনটার বিয়ে, আর এই বড় ভাই হয়ে আমি আসব না। তা কখনো হতে পারে, বল?
​কথাটা শুনেই শীর্ষর চওড়া বুকে ধুম করে একখানা আলতো কিল বসিয়ে দেয় কিঞ্জা। বানানো রাগ আর তীব্র অভিমান দেখিয়ে বলে,
​“তবে আসার কথাটা আগে থেকে আমাকে বলিসনি কেন? মিছে মিছে ফোন ধরে না আসার এত ভান ধরলি কেন তুই?”
​“আগে থেকে যদি বলেই দিতাম, তবে কি আর তোর মুখশ্রীতে ভেসে ওঠা এই অপরূপ বিস্ময়ের দেখা পেতাম?”

​কথাটা শেষ হতে না হতেই রাহাত, আদর আর তৃষরা একসাথে বাঁধভাঙা উন্মাদের মতো ওদের দুজনের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে! এক জোট হয়ে আনন্দে চিৎকার করে বলতে থাকে,
​“আমরা সবাই তোকে যে কী পরিমাণ মিস করছিলাম রে, ভাই! তুই পাশে না থাকলে কারদার বাড়ির এই হুটোপুটি পুরো ফাঁকা আর অর্থহীন লাগছিল!”
​একঝাঁক স্নেহের ছোট ভাই-বোনের ভালোবাসার নিচে যেন পুরোপুরি চাপা পড়ে যায় জাঁদরেল মেজর শীর্ষ কারদার! দর্শক সারিতে বসে থাকা আমন্ত্রিত অতিথি আর আত্মীয়স্বজনের সবাই গভীর মুগ্ধতা নিয়ে ভাই-বোনের এই খাঁটি ও মধুর মিলনদৃশ্য উপভোগ করতে থাকে।
​“মাশাল্লাহ!”
​উপস্থিত সবার মুখ থেকেই আপনা-আপনিই যেন বেরিয়ে আসে এই একটিমাত্র পবিত্র বাক্য।​ওদিকে কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে মেঘ, নোমান আর প্রহর একমনে এই অপরূপ দৃশ্য দেখে পরম আনন্দ লাভ করে। সবার আলিঙ্গন ও খুনশুটি শেষে শীর্ষ ধীরপায়ে প্রহরের দিকে এগিয়ে যায়। মুখে হালকা দুষ্টুমি মেশানো হাসি ফুটিয়ে কুশল পুছায়,

​“রিটায়ার্ড ক্যাপ্টেন প্রহর ইবনাত! তা কেমন আছেন, প্রহর সাহেব?”
​প্রহর কৃত্রিম ক্ষুব্ধ ও গম্ভীর চোখে শীর্ষর দিকে তাকায়। খানিকটা বাঁকা আর ত্যাড়া সুরে উত্তর দেয়,
​“তোর মতো এমন একখানা বেপরোয়া ও পাগল বন্ধু যার কপালে জোটে, তার আর কেমন থাকা দরকার, বল?”
​“আরে শালা—!”

​গালিটা মুখ থেকে বের হওয়ার মাঝপথেই শীর্ষর নজর গিয়ে পড়ে নোমানের ওপর। সে হাতের মিষ্টি ইশারায় নোমানকে কাছে ডেকে আনে। প্রহরকে উদ্দেশ্য করে বেশ গর্বের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়,
​“ও নোমান। আমার একমাত্র শ্যালক, আর তোর মতোই আরেকখান আস্ত লাফাঙ্গা বন্ধু!”
​প্রহর হালকা হেসে এবার একনজর চারপাশে তাকিয়ে শীর্ষকে শুধায়,
​“তা তো বুঝলাম, কিন্তু তোর আসল বউ কোনটা রে, শীর্ষ?”
​“প্রিয়া!”

মেজর কারদার পর্ব ৩৭

​শীর্ষর সেই মায়াবী গম্ভীর ডাক কানে পৌঁছানো মাত্রই লাজুক পায়ে গুটিগুটি হেঁটে প্রদীপের আলোর নিচে এগিয়ে আসে মেঘ। শীর্ষর পাশাপাশি এসে একদম ঘনিষ্ঠ হয়ে দাঁড়ালে, সেখানে উপস্থিত শত শত অতিথির সামনে গম্ভীর কিন্তু স্পষ্ট ও গর্বিত উচ্চস্বরে শীর্ষ বলে ওঠে,
​“মিট মাই ওয়াইফ! মিসেস মেঘালয়া কারদার — মাই হার্টবিট এন্ড মাই পার্সোনাল ব্ল্যাক ব্যাট ফ্লাওয়ার!”

মেজর কারদার পর্ব ৩৮