Home রাগে অনুরাগে রাগে অনুরাগে পর্ব ৪১

রাগে অনুরাগে পর্ব ৪১

রাগে অনুরাগে পর্ব ৪১
সুহাসিনি ফাতেহা

“তোর বউ নাদান শিশু হতে পারে কিন্তু খুব চালাক। তাইনা ভাবি ঠিক বলছি না?”
তিতলি প্রত্যুত্তরে আলভীকে কিছু বলার জন্য মুখ খুলবে খুলবে ভাব তক্ষুনি ফারাজের চোখ রাঙানো দেখে নিজের মুখ দুহাত দিয়ে চেপে ধরে মনে মনে বলে, “চুপ, চুপ তিতলি কথা বলা যাবে না সামনে ভাল্লুক তোকে চোখ রাঙাচ্ছে।”
ফারাজ গাড়ির ভেতরে হাত ঢুকিয়ে মাথাটা ঝুঁকিয়ে এনে তিতলির সিটবেল্ট লাগিয়ে দিচ্ছে। তিতলি লজ্জায় জড়সড় হয়ে ব্যাকসিটের সাথে মিশে গেলো। গাড়ির ভেতরে সবকটা মুচকি মুচকি হাসা শুরু করেছে। ফারাজ শুধু তাতেই থামল না। প্যান্টের পকেট থেকে রুমাল বের করে তিতলির চোখের নিচে এলোমেলো হয়ে লেপ্টে যাওয়া কাজল টুকু মুছে দিতে নিলো তিতলি নড়চড় করে আমতাআমতা করল,

“সবাই দেখছে!”
ফারাজের মুখের অভিব্যক্তি একটুও বদলালো না। ভাবখানা এমন যেন এখানে শুধু সে আর তিতলি। রক্ষণশীল গলায় আওড়ালো,
“আই ডোন্ট কেয়ার! নড়চড় করলে গাড়ি থেকে বের করে আনবো।”
আলভী হঠাৎ সুর তুলে নিজে একটা বানিয়ে বানিয়ে এবটা গান গেয়ে উঠল,
“ওওও…এই ভালোবাসা চলবে… যৌবন যতদিন থাকবে… নতুন নতুন বিয়ের পর প্রথমত এমনি তো হয় এমনিতো হয়।”
আলভীর গান শুনে সবাই হেসে উঠল। এমনকি তিতলিও। ফারাজ মেজাজ দেখিয়ে বলল,
“ভালো থাকতে চাইলে চুপচাপ থাক তুই। নয়তো তোদের সবকয়টাকে গাড়ি থেকে নামানোর ব্যবস্থা করব।”
আফজাল খান গাড়িতে উঠবেন এখন। ছেলেকে এখানো দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে কথা বলতে আসলেন। ভদ্রলোক শ্বশুর বাড়ি যাচ্ছেন অনেক দামি পোশাক-আশাক পরেছেন। তাছাড়া ওনি অনেক স্মাট ও বটে। সাথে একটু রসিকতাও আছে ওনার মাঝে। হাতের মোবাইল পকেটে রাখতে রাখতে ছেলেকে বললেন,
“তুই ঘর থেকে বের হয়েছিস কেন? যাবি না যখন তাহলে রুমে গিয়ে বসে থাক। আলভী গাড়ি স্টার্ট দে তো।”
আলভী চাচার কথা শুনে দাঁত কেলিয়ে হেসে উঠল। সে এক্ষুনি বলতে যাচ্ছিলো কথাটা তার আগে চাচা বলে দিলো। সাব্বাস চাচা। চাচার সাথে একটু কোলাকোলি করতে ইচ্ছে করছে।
তবে মুখে বলল,

“জ্বি চাচা এক্ষুনি গাড়ি স্টার্ট দিচ্ছি।”
পাশ থেকে ফরহাদ মোবাইলের স্ক্রিন থেকে চোখ তুলে বলল,
“কখন থেকে বলছিস গাড়ি স্টার্ট দিচ্ছিস। তুই তো ঠিকমতে গাড়িও চালাতে পারিস না। সর আমি ডাইভিং করি।”
আলভী ফরহাদকে ব্যঙ্গাত্মক কন্ঠে বলল,
“আমি যে পজিশনে গাড়ি চালায় সেটা তোর চৌদ্দগুষ্টিও জানেনা ফরহা কোথাকার।”
ফরহাদের খোঁচা মেরে বলতে ইচ্ছে হলো, “আর কোন কোন পজিশনে অন্য কাজ গুলো করিস যদি একটু বলতি।” তবে ভাবি, আর মেয়ে কাজিন থাকায় বলল না কথাটা। মুখে বলল,
“আমার চৌদ্দগুষ্টি গুলো কারা একটু মনে করে দেখ তুই নিজেও আছিস আলভু কোথাকার! ”
আরো কিছু বলার জন্য আলভীর মুখটা নিসপিস করছে। কিন্তু কোনো কথা খুঁজে না পাওয়ায় চুপ হয়ে গেলো। ফরহাদ ডেবিল হাসি দিয়ে আবার ফোনের স্ক্রিনে নজর দিলো।
আফজাল খান ছেলের সাথে আরো টুকটাক কথা বললেন। তারপর নিজেদের গাড়ির দিকে চলে গেলেন। তিতলি ফারাজকে আর দেখছে না। গাড়ি স্টার্ট দিবে সেটা বুঝতেই কাঁচের জানালা দিয়ে মাথা বের করে দিয়েছে। ফারাজ তার সাইড দিয়ে গাড়ির পেছনে দাঁড়ানো। সে এদিকেই তাকানো ছিলো। তিতলি তাকাতেই দুজনের চেোখাচোখি হলো। ফারাজ হাত দিয়ে ওটাএটা ইশারা করতে করতে এক পা দু পা এগিয়ে এসে হুকুমের স্বরে বলল,

“গাড়ি চলন্ত অবস্থায় জানালা দিয়ে মাথা বের করবে না, ওকে।”
“বুঝেছি একদম মাথা বের করব না এইতো ঢুকিয়ে নিয়েছি মাথা।”
সামনের সিট থেকে অয়ন সেটা দেখে মনেমনে বলে
“ফারাজ ভাই তিতলিকে কতভাবে সাবধান করে দিচ্ছে।”
তিতলি মুখ ফুলিয়ে মাথাটা সম্পূর্ন ঢুকিয়ে নিতেই ফারাজকে আবার তিতলির পাশে জানালার কাছে আসতে দেখা গেলো। লোকিং মিররে সেটা দেখে আলভী বাঁকা হাসে। মনে মনে বলে,
“এত যেহেতু বউকে দেখার ইচ্ছে তাহলে বউয়ের সাথে যাচ্ছিস না কেন?”
মনেমনে কথাটা বলে স্টিয়ারিং হাত ঘুরাতে ঘুরাতে তক্ষুনি গাড়ি স্টার্ট দিলো আলভী।
ফারাজ হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে যায়। ঘাড়ের রগগুলো টানটান হয়ে আসে রাগে। দাঁত কটমট করে হাতদুটো মুষ্টিবদ্ধ করে নেয়। আলভীকে হাতের কাছে পেলে ছাড়বে না। তিতলি আর ফারাজকে দেখলো না। মাথা বের করে যে দেখবে সে সুযোগ ও নেয়। তাও শুধু ঘুরেঘুরে দেখতে চাই কিন্তু আর দেখেনা। ঘুরানো পেঁচানো রাস্তা হওয়ার তারা মেইন রোডে চলে এসেছে। ফারাজ যতক্ষণ গাড়ি দেখা যাচ্ছিলো ততক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলো।
মোট চারটে গাড়ি একসাথে রওনা হয়েছে টাঙ্গাইলের উদ্দেশ্য। ঢাকা থেকে টাঙ্গাইলে যেতে প্রায় আড়াই ঘন্টার বেশি সময় লাগে। আর যদি জ্যাম রাস্তাঘাট মেরামত এসব সমস্যা থাকে তাহলে পাঁচ থেকে ছয়, সাত ঘন্টার বেশি সময়ও লেগে যায়।

রাত সাতটার মধ্যে টাঙ্গাইলে পৌছানোর কথা। সেখানে তাদের গাড়ি এখনো টাঙ্গাইলের কাছাকাছি ও যেতে পারেনি। জ্যাম দিয়ে ভর্তি ছিলো ঢাকার রাস্তাঘাট। তার উপর মধ্য- রাস্তায় ধর্মঘট পড়েছে৷ সম্পুর্ন রাস্তা পরিবর্তন করতে হয়েছে৷ এখন সন্ধ্যা নেমেছে! আঁধার হয়েছে পৃথিবী৷ আলভীদের গাড়ি নিরবচ্ছিন্ন রাস্তা ধরেছে। রাস্তার দু’পাশে ফেলে যাচ্ছে সারি সারি গাছ, দালানকোঠা! তাদের গাড়ির পেছনে তিনটা গাড়ি সোজাসাপটা সারি করে আসছে৷ একটি গাড়িও আগপাছ হচ্ছে না। আলভীদের গাড়িতে কিছুক্ষণ পরপর গান বেজে উঠছে। এবার একটা গান বেজে উঠল,
“আমার বন্ধু মহা জাদু জানে ওওও আমার বন্ধু মহা জাদু জানে….”
গানের লাইনটা বেজে উঠতে না উঠতেই আয়েশা বিরক্ত হয়ে বলল,
“এবার এটা কি গান চালিয়েছো আলভী ভাইয়া?”
“তোরা বুঝবি না এই গানের মানে।”
অয়ন বলল,

“গান বন্ধ কর!”
আলভীর মনেযোগ গাড়ি চালানো তে থাকলেও সে অয়নকে বলল,
“চুপ কর পাপীর দলেরা। কোথায় গান টাকে একটু ইনজয় করবি তানা বন্ধ কর বন্ধ কর। কানে শিমুল তুলা দিয়ে বসে থাক।”
তিতলি এই প্রথম টাঙ্গাইলে যাচ্ছে তাই একটু অন্যরকম অনুভূতি কাজ করছে। তবে কিছুক্ষণ পরপর ফারাজের কথা মনে করে আবার মন খারাপ করে নিচ্ছে বেচারি। কয়দিন থেকে তো চলে আসবে ওনি থাকতে পারলে সেও থাকবে সে একটু টাঙ্গাইলে গিয়ে সুন্দর সুন্দর জায়গায় ঘুরতে চায়। ঘুরাঘুরি তার পছন্দের তালিকায় পরে। তিতলি অনেক চিন্তায় আছে। অয়নকে বলল,
“অয়ন ভাইয়া আমরা টাঙ্গাইলে গেলে অনেক জায়গায় ঘুরব তাইনা? আমাকে একটু ঘুরাতে নিয়ে যাবে তোমাদের সাথে?”
অয়ন চমকে উঠে কান ধরে হাত পায়ে মাফ চাওয়ার মতো করে বলল,
“বাবা আমি পারবো না। যার বউ সে ঘুরতে নিয়ে যাওয়ার অনুমতি দিলে তবেই নিয়ে যাবো।”
তিতলি মন খারাপ করে বসে থাকে পুরো রাস্তায়। ওই ভাল্লুক কি তাকে ঘুরতে যাওয়ার অনুমতি দিবে? অয়ন তিতলির মন খারাপ করেছে দেখেও কিছু বলেনা ফারাজ ভাইয়ের ভয়ে।

রাত সাড়ে আটটায় অবশেষে টাঙ্গাইলে গিয়ে পৌঁছিয়েছে সবাই। ত্রিশ মিনিটের লম্বা রাস্তা অতিক্রম করেই পেয়েছে বিশাল জমিন নিয়ে তৈরি হুশিয়ার সাহেবের নতুন বাড়ি। বাড়ির কোণায় কোণায় রাতের লাইট জ্বলছে। সাদা কালো রঙে রঙানো বাড়ি থেকে সদর দরজা অবধি। বড়বড় দেওয়াল দিয়ে ঘিরে কারুকার্য করা বাড়ির চারপাশের দেওয়াল।
উপরে বড়বড় কাঁটার রড ব্যাবহার করা হয়েছে। কারণ, চোর, ডাকাত, মলমপাটি, অজ্ঞানপাটিদের হামলা হতেই পারে। বাড়ির চারপাশে আকাশ সমান বড়বড় কড়ি গাছ, মেহগনি গাছ, বড়ই গাছ, আম গাছ, ফলমূল গাছগাছালি। রাতের বেলায় একটা ভূতরে বাড়িও বলা যেতে পারে কিন্তু এতে বাড়ির সৌন্দর্য একটুখানি ঘাটতি পরবেনা।

সদর দরজার সামনে হুশিয়ার সাহেব সহ ছকিনা খাতুন দাঁড়িয়ে আছেন। সেই মাগরিবের আযানের পর থেকে শুধু ঘুরঘুর করছেন। আর স্বামী স্ত্রী সুখে দুঃখের কথা বলছিলেন বুড়ো হয়ে গেছেন আর বাঁচবোও কদিন। ছকিনা খাতুন পান চিবুতে চিবুতে বলছিলেন,
“আমি আমনেরে ছাড়া অন্ধবার কবরে থাইকতে পারমু না হাশেমের বাপ।”
উত্তরে হুশিয়ার সাহেব হাসতে হাসতে স্ত্রীকে বলছিলেন,
“মরন কইয়া কইয়া আইয়ে না ছকিনা….”
গাড়ির ইঞ্জিন থামার আওয়াজ পেয়ে হুশিয়ার সাহেবের কথা অর্ধেকে থেমে গেলো। ছকিনা খাতুন আগেআগে বেরিয়ে এলেন। হুশিয়ার সাহেব ভেতর থেকে ছেলেদের ডাক দিলেন,
“ওই হাশেম, কাশেম, হারুন, শের আলী, সবুর আলী, তোরা কই বাইরে আয় তাড়াতাড়ি তোর বোইন ভাগিনারা আইয়া পড়ছে।”

বাবার ডাক পেয়ে ড্রয়িংরুম থেকে পাঁচ ভাই বের হয়ে এলেন। পাঁচ ছেলে দু মেয়ে হুশিয়ার সাহেবের। সবকয়টার বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি বা আরেকটু কমবেশি। বুড়ো বাবাকে বাঘের মতো ভয় পায় সব ছেলে। ডাকার সাথেসাথে সদর দরজায় হাজির হয়ে বলল,
“আব্বা আইসি।”
শের আলী, আর সবুর আলী লুঙ্গি পরতে পরতে বেরিয়ে এসেছেন। কিছুক্ষণ আগে বাজার থেকে এসেছেন। মেজবান উপলক্ষে বাড়িতে তোড়জোড় চলছে। কত বাজার সাজার করার আছে হিসেব নেই। যদিও মেজবান পরশু। প্রত্যেক বছরে হুশিয়ার সাহেব তার মা বাবার নামে গ্রামবাসীদের সহ অবাবী মিসকিনদের সহ বিশাল করে মেজবানের দাওয়াতের আয়োজন করেন।
আফজাল খানেরা সবাই একেএকে আসছেন। হুশিয়ার সাহেব হেঁটে সামনে এগিয়ে গেলেন। আফজাল খান শ্বশুরের সাথে কোলাকোলি করে বললেন,

“ভালো আছেন আব্বাজান? শরীর ভালো আছে তো?”
হুশিয়ার সাহেব জামাইয়ের পিঠে হাত বুলাতে বুলাতে বললেন,
“আলহামদুলিল্লাহ্‌ বাপজান। ভালাই আছি ।”
হুশিয়ার সাহেব আমরুল খানের সাথেও কোলাকোলি করলেন। ফরহাদকে বুকে জড়িয়ে নিলেন।
ছকিনা খাতুন গিয়ে মেয়ের সাথে মেয়ের, জা সবার সাথে কথা বলে নাতবউকে জড়িয়ে ধরে বললেন,
“নাতবউ গো তুমি আইছো দেইখা মনডা ভালা হইয়া গেলো।”
তিতলি আর কিবা বলবে। নানি শাশুড়ির কথা শুনে বলল,
“আমার মনটাও ভালে হয়ে গেছে নানু।”
ছকিনা খাতুন আবার পেছনে এদিক ওদিক তাকিয়ে বললেন,

রাগে অনুরাগে পর্ব ৪০ (২)

“কিন্তু আমার নাতি ফারাজ কই এই ফারিন ফারাজ কই?”
আফজাল খান আগেআগে বললেন,
“ফারাজ তো আসে নাই আম্মা। কলেজে নাকি পরিক্ষা দায় দায়িত্ব আছে এখন আসা সম্ভব নয়।”
কথাটা বলে আফজাল খান বউয়ের ভাইদের সাথে কৌশল বিনিময় করতে ব্যস্ত হয়ে গেলেন।
হুশিয়ার সাহেব বললেন,
“কি? ফারাজ আইয়ো না মানে কি?
ধরিবান্দি আইনতে পারিস নি? নাতবউ আমার নাতিডারে ওড়নার লগে বাইন্দা নিয়ে আইতে পারো নাই?”

রাগে অনুরাগে পর্ব ৪১ (২)